সন্ধ্যা নামার সময় কলকাতা শহরটা যেন এক অন্য মানুষ হয়ে যায়।
দিনের কোলাহল তখনও পুরো থামে না, কিন্তু তার ভেতরে ক্লান্তির একটা নরম রং মিশে যায়। অফিসফেরা মানুষ, বাসের ভিড়, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা কাঁচের কাপ, দূরে ট্রামের ঘণ্টা—সব মিলিয়ে শহরটা যেন নিজের দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বেঁচে থাকে।
অয়ন বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
মানুষ ফিরছে।
কেউ বাড়ি ফিরছে, কেউ প্রিয়জনের কাছে, কেউ নিজের একাকিত্বের ঘরে। অয়নের মনে হলো, ঘরে ফেরা আসলে সবার জন্য একরকম নয়। কেউ ফেরে অপেক্ষার কাছে, কেউ ফেরে অভ্যাসের কাছে।
আর সে?
সে কোথায় ফিরছে?
বর্ধমানের বাড়ি এখন অনেক দূরে। মা হয়তো সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালিয়ে রান্নাঘরে ব্যস্ত। বাবা হয়তো উঠোনে বসে ধানের হিসেব করছেন। ছোট বোন হয়তো বই খুলে বসেছে, কিন্তু মন পড়ায় নেই। এই সময়টায় আগে অয়ন বাড়ির বাইরে থাকত—কখনো বন্ধুর সঙ্গে, কখনো গ্রামের কোনো ছেলের পড়া দেখিয়ে, কখনো শুধু খোলা আকাশের নিচে হাঁটত।
এখন সে পাঁচতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে শহর দেখে।
শহর তাকে আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এখনো আপন করে নেয়নি।
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“না, এসব ভাবলে চলবে না।”
সে নিজেকে সামলে ঘরে ফিরে এল। টেবিলে বই খোলা। আজ পড়া শেষ করতে হবে। স্বপ্ন দেখতে হলে প্রথমে নিজের জায়গাটা শক্ত করতে হয়—এই কথাটা বাবা বারবার বলতেন।
অয়ন বইয়ের দিকে ঝুঁকল।
কিন্তু মন পুরোটা বইয়ে গেল না।
কারণ পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছিল বাসনের শব্দ।
সঙ্গীতা রান্না করছে।
অয়ন শব্দটা আলাদা করে চিনতে শিখেছে—কড়াই নামানোর শব্দ, ঢাকনা চাপা দেওয়ার শব্দ, জল ঢালার শব্দ। অদ্ভুত ব্যাপার, কয়েকদিন আগেও এসব শব্দ তার কাছে শুধু ঘরের শব্দ ছিল। এখন মনে হয়, শব্দগুলোর ভেতরে একজন মানুষ আছে।
একজন মানুষ, যে সারাদিন ঘর সামলায়।
যে সবাইকে খাওয়ায়।
যে হাসে।
আর মাঝরাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলে— “সব মানুষের গলায় একটু না একটু দুঃখ থাকে।”
সঙ্গীতা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ডাল নেড়ে দিচ্ছিল।
ঘড়িতে তখন সাড়ে আটটা। সূর্য সাধারণত এই সময়ের মধ্যে ফেরে না। কখনো সাড়ে নয়টা, কখনো দশটা, কখনো তারও পরে। প্রথম প্রথম অপেক্ষা করত সঙ্গীতা। বারবার দরজার দিকে তাকাত, ফোন দেখত, খাবার গরম রাখত।
এখন আর অপেক্ষা করে না।
অথবা অপেক্ষা করলেও নিজেকে সেটা স্বীকার করে না।
অভ্যাস মানুষকে শক্ত করে দেয়—কিন্তু সেই শক্তির ভেতরেই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি ক্লান্তি জমে থাকে।
আজ রান্না করতে করতে তার মনে পড়ছিল বিকেলের বারান্দার কথা।
“জীবনে অনেক সময় মানুষ এমন পথে হাঁটে, যেটা সে নিজে বেছে নেয়নি।”
কথাটা সে অয়নকে বলেছিল। কিন্তু আসলে সে নিজেকেই বলছিল।
তার বিয়ে হয়েছিল খুব স্বাভাবিকভাবে। পরিবার দেখেছে, ছেলে ভালো, চাকরি ভালো, সংসার ভালো। সবাই বলেছিল—“মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিন্ত।”
নিশ্চিন্ত?
সঙ্গীতা কড়াইয়ের আগুন একটু কমাল।
নিশ্চিন্ত জীবন আর সুখী জীবন এক জিনিস নয়—এ কথা বুঝতে তার বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু বুঝেও কারও কাছে বলতে পারেনি।
কারণ বাইরে থেকে তার সংসারে কোনো অভাব নেই।
ভালো ফ্ল্যাট আছে। স্বামীর চাকরি আছে। টাকা আছে। সমাজের চোখে সম্মান আছে।
শুধু কথার অভাব।
শুধু স্পর্শের অভাব।
শুধু সেই একটিমাত্র প্রশ্নের অভাব— “তুমি ভালো আছ তো?”
সঙ্গীতা একটু থেমে গেল।
তারপর নিজের মনে হালকা হেসে ফেলল।
আজকাল এই প্রশ্নটা মনে পড়লেই অয়নের মুখ ভেসে ওঠে। ছেলেটা মুখে খুব বেশি কিছু বলে না, কিন্তু তাকানোর ভঙ্গিটা যেন জিজ্ঞেস করে—“কষ্ট হচ্ছে?”
এটাই কি বিপদ?
নাকি এটাই সেই আশ্রয়, যার কথা অয়ন বলেছিল?
সঙ্গীতা আর ভাবল না। রান্না নামিয়ে টেবিল সাজাতে লাগল। রাত সাড়ে নয়টার পর সূর্য ফিরল।
দরজা খুলতেই তার কাঁধে অফিস ব্যাগ, চোখে ক্লান্তি, আর হাতে ফোন। ফোনের স্ক্রিনে কারও মেসেজ আসতেই সে সামান্য হেসে ফেলল। খুব ছোট্ট হাসি। এমন হাসি সঙ্গীতা অনেকদিন নিজের জন্য দেখেনি।
সঙ্গীতা দরজার কাছে এসে বলল,
“এলে? হাত-মুখ ধুয়ে নাও। খাবার দিচ্ছি।”
সূর্য ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,
“হ্যাঁ, দাও। ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে।”
একবারও জিজ্ঞেস করল না— “তুমি খেয়েছ?” “সারাদিন কেমন কাটল?” “অয়ন ঠিক আছে তো?”
অয়ন ডাইনিং টেবিলে বসে ছিল। সে সবকিছু দেখছিল নীরবে।
সূর্য ফ্রেশ হয়ে এসে চেয়ারে বসল।
“অয়ন, কেমন চলছে পড়াশোনা?”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“ভালোই চলছে দাদা। তবে কিছু বই আর খাতা কিনতে হবে। এখানে আসার তাড়াহুড়োয় সব আনা হয়নি।”
সূর্য ভাত মাখতে মাখতেই বলল,
“হ্যাঁ, সেটা তো লাগবেই। কাল আমার অফিসে একটু বাইরে কাজ আছে, তাই সময় পাব না। তুই সঙ্গীতার সঙ্গে কলেজ স্ট্রিটে চলে যা। ও জায়গাটা চেনে।”
অয়ন একটু থামল।
“বৌদির অসুবিধা হবে না তো?”
সঙ্গীতা ভাত বাড়ছিল। সে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“না, অসুবিধা কী? আমি নিয়ে যাব।”
সূর্য দ্রুত বলল,
“হ্যাঁ, ও প্রায় যায়। বইটই কিনে দেবে। তোর যা দরকার একটা লিস্ট করে রাখিস।”
তারপর সে আবার ফোনের দিকে তাকাল।
সঙ্গীতা চুপচাপ ডাল দিল।
হঠাৎ সূর্য মুখ কুঁচকে বলল,
“ডালে লবণ একটু কম হয়েছে।”
সঙ্গীতা থেমে গেল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“দিচ্ছি।”
সে লবণ আনতে উঠল।
অয়ন তাকিয়ে রইল।
ডালে সত্যিই লবণ কম ছিল কি না, সেটা তার জানা নেই। কিন্তু সূর্যর বলার ভঙ্গিটা এমন ছিল যেন এই ঘরের সব কাজের মধ্যে সঙ্গীতার ভুলটাই সবচেয়ে সহজে চোখে পড়ে।
সে কোনো উত্তর দিল না।
শুধু খেতে লাগল।
কিন্তু তার বুকের ভেতরে একটা ছোট্ট অস্বস্তি গাঢ় হতে লাগল।
খাওয়া শেষ করে সূর্য উঠে গেল নিজের ঘরে।
“আমি একটু laptop খুলছি। কাল সকালেই বেরোতে হবে।”
সঙ্গীতা শুধু বলল,
“ঠিক আছে।”
এই “ঠিক আছে” কথাটার ভেতরে কোনো অভিমান নেই, কোনো দাবি নেই। যেন বহুদিনের চর্চায় সে শিখে গেছে—যে দরজায় বারবার কড়া নেড়ে কেউ উত্তর পায় না, সেখানে একসময় কড়া নাড়াই বন্ধ করে দিতে হয়।
অয়ন প্লেট তুলে নিতে গেল।
সঙ্গীতা বলল,
“না না, তুমি রাখো। আমি করছি।”
“আমি নিজেরটা ধুয়ে দিতে পারি।”
“আজ দরকার নেই।”
“তুমি সারাদিন এত কাজ করো। অন্তত নিজের প্লেটটা…”
সঙ্গীতা তার দিকে তাকাল।
অয়নের গলায় চাপা আন্তরিকতা। কোনো প্রদর্শন নেই, কোনো দয়া নেই—শুধু সহজ যত্ন।
সে মৃদু হেসে বলল,
“তোমার এসব কথা শুনলে মনে হয়, তুমি এই বাড়িতে নতুন নও।”
অয়নও হালকা হাসল।
“নতুন মানুষও তো কাজ করতে পারে।”
সঙ্গীতা প্লেটটা তার হাত থেকে নিয়ে বলল,
“কাল থেকে করবে। আজ আমার কথা শুনো।”
অয়ন আর জোর করল না।
কিন্তু রান্নাঘর থেকে বাসন ধোয়ার শব্দ আসতে থাকলে সে টেবিলে বসে রইল কিছুক্ষণ। নিজের ঘরে যেতে ইচ্ছে করছিল না। অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, সঙ্গীতাকে একা রেখে চলে যাওয়া ঠিক হবে না।
অথচ সে জানে, এই ভাবনাটাই ঠিক নয়।
রাত আরও গভীর হলো।
সূর্য ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই। অথবা ঘুমিয়ে পড়ার আগে ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলেছে কি না, সঙ্গীতা দেখেনি। দেখার অভ্যাসও আর নেই। কখনো কখনো না জানাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
সঙ্গীতা নিজের ঘরে বই খুলে বসেছিল। আজ সে ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের একটা পুরোনো উপন্যাস হাতে নিয়েছে। বইয়ের পাতা খুললেই পুরোনো দিনের গন্ধ বেরোয়—যে গন্ধে প্রেম থাকে, অপ্রাপ্তি থাকে, মানুষের দীর্ঘশ্বাস থাকে।
কিন্তু আজ বইয়ে মন বসছিল না।
পাতার অক্ষরগুলো বারবার অয়নের কথায় মিশে যাচ্ছিল।
“যার সামনে নিজের দুর্বলতাও লুকোতে হয় না—সেটাই সুখ।”
সঙ্গীতা বই বন্ধ করল।
তার জীবনটা কি তবে শুধু শক্ত থাকার অভিনয়?
স্বামী আছে, সংসার আছে, পরিচয় আছে। তবু দুর্বল হওয়ার জায়গা নেই। কাঁদলে কেউ বিরক্ত হবে। অভিমান করলে কেউ বলবে—“এত নাটক করো না।” চুপ থাকলে সবাই ভাববে—সব ঠিক আছে।
সে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
ঘরের আলো নিভিয়ে বারান্দায় এল।
রাতের বাতাস একটু ঠান্ডা। দূরে শহরের আলো। নিচে রাস্তার শব্দ অনেক কমে এসেছে। আকাশে মেঘ নেই, তবু একটা নীলচে অন্ধকার ছড়িয়ে আছে।
বারান্দায় এসে সে দেখল, অয়ন আগেই দাঁড়িয়ে আছে।
রেলিংয়ে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
সঙ্গীতা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। অয়ন টের পায়নি। তার মুখে এমন এক মনোযোগ, যেন সে আকাশের ভেতর কিছু খুঁজছে।
সঙ্গীতা মৃদু গলায় বলল,
“এই যে, রাতের বেলা আকাশে কী খোঁজা হচ্ছে?”
অয়ন চমকে তাকাল না। শুধু ধীরে ঘুরে বলল,
“ঘুম আসছিল না।”
“তোমার তো রোজ ঘুম আসে না।”
“তোমারও তো আসে না।”
সঙ্গীতা একটু হেসে ফেলল।
“তা ঠিক।”
দুজনের মাঝখানে নীরবতা নেমে এল। কিন্তু এই নীরবতা আর অস্বস্তিকর নয়। বরং যেন নীরবতারও একটা ভাষা তৈরি হয়ে গেছে।
সঙ্গীতা পাশে এসে দাঁড়াল।
“কী ভাবছিলে?”
অয়ন আকাশের দিকে তাকাল।
“ভাবছিলাম, আকাশটা কত বড়। মানুষ যদি নিজের সব দুঃখ আকাশে ছেড়ে দিতে পারত, তাহলে বুকটা হালকা হতো।”
সঙ্গীতা এবার একটু গম্ভীর হলো।
“তোমার আবার এত দুঃখ কী?”
অয়ন মৃদু হাসল।
“দুঃখ বয়স দেখে আসে না।”
“তা ঠিক। কিন্তু তোমার দুঃখ শুনতে ইচ্ছে করছে।”
অয়ন চুপ করল।
কিছু কথা বলার জন্য মানুষ চাই, কিন্তু সাহস লাগে আরও বেশি।
সে ধীরে বলল,
“সব দুঃখ কাউকে বলা যায় না।”
সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল।
“তাহলে হয়তো আমাকেও বলা যাবে না।”
অয়ন তার দিকে তাকাল।
সঙ্গীতার গলায় অভিযোগ নেই। শুধু নরম একটা অপেক্ষা।
অয়ন বলল,
“একদিন হয়তো বলব।”
“আমি শুনব।”
কথাটা খুব ছোট। কিন্তু অয়নের মনে হলো, কেউ তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভারের পাশে একটা নরম জায়গা করে দিল।
সে হালকা হাসল।
“তুমি খুব সহজে কথা বলো।”
“সহজে?”
“হ্যাঁ। যেন কথা বললে বিচার করবে না।”
সঙ্গীতা মৃদু গলায় বলল,
“আমি নিজেই তো অনেক না-বলা কথার মানুষ। তাই অন্যের কথা শুনতে পারি।”
অয়ন চুপ করে গেল।
রাত আরও গভীর হলো। কিছুক্ষণ পর সঙ্গীতা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, তোমার কেমন মেয়ে পছন্দ?”
অয়ন প্রশ্নটা শুনে হেসে ফেলল।
“এটা আবার কী প্রশ্ন?”
“সাধারণ প্রশ্ন। সবাই করে।”
“সবাই করলেই প্রশ্নটা ভালো হয় না।”
“কেন?”
অয়ন রেলিং থেকে হাত সরিয়ে বলল,
“মানুষকে পছন্দ করার জন্য কি তালিকা বানানো যায়? লম্বা হবে, ফর্সা হবে, চুল বড় হবে, কম কথা বলবে, বেশি হাসবে—এভাবে? মানুষ কি মেনুকার্ড?”
সঙ্গীতা একটু থমকাল।
অয়ন বলল,
“আমার মনে হয়, এসব প্রশ্ন একটু অন্যায়। কেউ যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করত—তোমার স্বামী কেমন বউ চেয়েছিল? তখন কেমন লাগত? মনে হতো না তুমি মানুষ নও, কোনো পণ্য?”
সঙ্গীতা চুপ হয়ে গেল।
প্রশ্নটা তার বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে বিঁধল।
বিয়ের আগে সত্যিই তো তাকে কতভাবে দেখা হয়েছিল। গায়ের রং, উচ্চতা, রান্না জানে কি না, শান্ত স্বভাব কি না, বংশ, পড়াশোনা—সব। কেউ কি জিজ্ঞেস করেছিল, “সঙ্গীতা কী চায়?”
না।
সে প্রথমবার বুঝল, অয়ন শুধু ভালো কথা বলে না—কিছু কথা দিয়ে মানুষের ভিতরের পুরোনো ক্ষত খুলে দেয়।
সঙ্গীতা ধীরে বলল,
“তাহলে তুমি কাউকে কীভাবে ভালোবাসবে?”
অয়ন একটু ভেবে বলল,
“জানি না। হয়তো হঠাৎ করে। হয়তো কারও কথা শুনতে শুনতে। হয়তো তার হাসির ভেতরে দুঃখ দেখে। হয়তো একদিন বুঝব, তার না থাকাটা আমার দিনকে ফাঁকা করে দিচ্ছে।”
সঙ্গীতার বুকের ভেতর কেমন যেন হল।
সে মুখ ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল।
“তুমি খুব ভয়ঙ্কর কথা বলো, অয়ন।”
“আমি তো শুধু সত্যি বলি।”
“সব সত্যি বলা ভালো না।”
“কেন?”
“কারণ কিছু সত্যি মানুষকে বদলে দেয়।”
অয়ন আর উত্তর দিল না।
রাতের বাতাসে সঙ্গীতার চুল সামান্য উড়ছিল। অয়ন তাকিয়ে ছিল না, কিন্তু তবুও তার উপস্থিতি অনুভব করছিল। এই অনুভূতিটাই বিপজ্জনক—কেউ কাছে না থেকেও যদি খুব কাছে লাগে, তখন দূরত্বের হিসেব আর ঠিক থাকে না।
সঙ্গীতা হঠাৎ বলল,
“আমার একসময় খুব একা লাগত।”
অয়ন তাকাল।
“এখন লাগে না?”
“এখনও লাগে। তবে মানুষ অভ্যাস করে ফেলে।”
“একা থাকারও অভ্যাস হয়?”
সঙ্গীতা হেসে বলল,
“সবচেয়ে বেশি অভ্যাস হয় একা থাকারই। কারণ সেটা কাউকে বোঝাতে হয় না।”
অয়ন নরম গলায় বলল,
“তোমার কী করলে মন ভালো হয়?”
প্রশ্নটা শুনে সঙ্গীতা প্রথমে উত্তর দিল না।
অনেকদিন কেউ তাকে এমনভাবে জিজ্ঞেস করেনি।
তারপর ধীরে বলল,
“খুব বেশি কিছু না। কেউ যদি পাশে বসে থাকে। আমার কথা শুনে। আমি হাসলে বুঝুক, আমি সত্যিই হাসছি কি না। কাঁদলে বিরক্ত না হয়ে একটু চুপ করে থাকুক। কেউ যদি আমাকে শুধু দায়িত্ব না ভেবে মানুষ ভাবে… তাহলেই হয়তো মন ভালো হয়।”
অয়নের বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে গেল।
সে খুব আস্তে বলল,
“আমি যদি সেটা করি?”
কথাটা বেরিয়ে যেতেই দুজনেই স্থির হয়ে গেল।
সঙ্গীতা তার দিকে তাকাল।
অয়নের চোখে কোনো দুষ্টুমি নেই, কোনো সহজ খেলা নেই। আছে এক অদ্ভুত আন্তরিকতা। যেন সে সত্যিই জানতে চাইছে—সে কি সঙ্গীতার একাকিত্বের পাশে বসতে পারে?
সঙ্গীতা কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল।
তারপর নিজের চোখ সরিয়ে নিল।
“তুমি এসব কথা এত সহজে বলো কীভাবে, অয়ন?”
অয়ন মৃদু গলায় বলল,
“কারণ তোমার একাকিত্বটা খুব কঠিন মনে হয়।”
সঙ্গীতা উত্তর দিতে পারল না।
নীরবতা ঘন হয়ে উঠল।
দূরে কোথাও একটা গাড়ি চলে গেল। শহরের আলো স্থির। গোলাপগাছের কুঁড়ি রাতের অন্ধকারেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
সঙ্গীতা নিজের কণ্ঠকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
“হয়েছে। অনেক রাত হয়েছে। যাও, ঘুমাও।”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ। কাল তো কলেজ স্ট্রিট যেতে হবে।”
“হুম। বইয়ের লিস্ট করে রেখো।”
“করেছি।”
“আর বেশি ভারী বই কিনবে না। বহন করতে কষ্ট হবে।”
অয়ন একটু হেসে বলল,
“আমি বহন করব। তুমি শুধু পথ দেখাবে।”
সঙ্গীতা মৃদু হেসে বলল,
“পথ দেখানো সবসময় সহজ নয়।”
“কিন্তু কেউ পাশে থাকলে পথ হারালেও ভয় লাগে না।”
সঙ্গীতা তাকাল তার দিকে।
এই ছেলেটা সত্যিই বিপজ্জনক।
কারণ সে এমন কথা বলে, যা কোনো সীমা ভাঙে না, তবু হৃদয়ের ভিতরে ঢুকে যায়।
সে আর দাঁড়াল না।
“শুভরাত্রি, অয়ন।”
“শুভরাত্রি।”
সঙ্গীতা নিজের ঘরে চলে গেল।
অয়নও কিছুক্ষণ পর ঘরে ফিরল।
কিন্তু ঘুম দুজনের কারও চোখে সহজে এল না।
নিজের বিছানায় শুয়ে সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল।
সূর্য পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। তার শ্বাসের শব্দ নিয়মিত, স্থির। এই মানুষটার সঙ্গে তার সংসার আছে, পরিচয় আছে, সামাজিক নিরাপত্তা আছে।
তবু আজ পাশের ঘরের উনিশ বছরের এক ছেলের বলা কয়েকটা কথা তার বুকের ভেতর এত আলোড়ন তুলছে কেন?
“আমি যদি সেটা করি?”
সঙ্গীতা চোখ খুলল।
না, এভাবে ভাবা উচিত নয়।
সে বিবাহিত।
অয়ন তার দেবর।
এই সম্পর্কের একটা নাম আছে, একটা সীমা আছে, একটা দূরত্ব আছে।
কিন্তু মন কি সবসময় সমাজের দেওয়া নাম মেনে চলে?
সঙ্গীতা জানালার দিকে তাকাল। বাইরে রাত গাঢ় হয়ে এসেছে।
তার মনে হলো, বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা কোনো জানালার কপাট আজ সামান্য নড়েছে। পুরোটা খুলে যায়নি। কিন্তু ফাঁক দিয়ে একটু বাতাস ঢুকেছে।
আর সেই বাতাসের নাম—অয়ন।
অয়ন নিজের ঘরে শুয়ে ছিল।
বই বন্ধ। আলো নিভিয়ে দিয়েছে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই সঙ্গীতার মুখ ভেসে উঠছে।
“কেউ যদি আমাকে শুধু দায়িত্ব না ভেবে মানুষ ভাবে…”
অয়নের বুকের ভেতর কিছু একটা ব্যথা করল।
সে জানে না, এটা প্রেম কি না। জানে না, এই অনুভূতির কোনো অধিকার আছে কি না। শুধু জানে, সঙ্গীতার একাকিত্ব তাকে নিজের দিকে টানে।
সে তাকে পেতে চায় কি না, সে উত্তর এখনো তার কাছে স্পষ্ট নয়।
কিন্তু সে তাকে হাসাতে চায়।
তার কথা শুনতে চায়।
তার পাশে দাঁড়াতে চায়।
যদি এই চাওয়াগুলো ভুল হয়, তবে ভুলটা খুব কোমল।
আর যদি এটাই ভালোবাসার শুরু হয়, তবে সেই ভালোবাসা জন্ম নিচ্ছে এমন এক জায়গায়, যেখানে আলোও আছে, ছায়াও আছে।
রাত বাড়তে লাগল।
দুজন মানুষ দুটো আলাদা ঘরে শুয়ে রইল।
কেউ কাউকে ডাকল না। কেউ কোনো স্বীকারোক্তি করল না।
তবু অদৃশ্যভাবে তাদের মাঝখানে একটা নতুন পথ খুলে গেল।
পরদিন তারা একসঙ্গে কলেজ স্ট্রিট যাবে।
অয়ন জানত না, সেই বইয়ের গলি, পুরোনো কাগজের গন্ধ, আর হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টি তাদের সম্পর্কের ভেতর আরেকটা দরজা খুলে দেবে।
সঙ্গীতাও জানত না, যে পথ দেখাতে সে রাজি হয়েছে—সেই পথেই হয়তো সে নিজেই হারিয়ে যেতে শুরু করবে।