ভালোবাসা বেঁচেআছে . . সেখানে তোমার ভালোবাসা শুয়েআছে . .

Valobasha bencheaache . . sekhane tomar valobasha suyeaache

লেখক: TrulySukhen

ক্যাটাগরি: প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন

প্রকাশের সময়:16 Apr 2026

বি. দ্র. ] গল্পের নামটি বাংলা ছায়াছবি "ঘরে & বাইরে" (২০১৮) থেকে গৃহীত, তাই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতিই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ॥

IPS সোমরাজ অচৈতন্য অবস্থায় পড়েআছে। রক্তে ভেসেযাচ্ছে পরিহিত খাঁকি পুলিশীউর্দিটা যার পেছনের অংশ, ধূলোময়লায় মাখামাখি হয়েআছে। কলকাতার হৃদপিন্ডের এক অন্যতম অংশ পার্ক স্ট্রিট-ময়দান মেট্রোস্টেশন-মেয়ো রোড সংলগ্ন রাস্তায় Force Traveller গাড়িমধ্যে দুই, ইতিউতি রক্তক্ষত সিংহবাহু ছড়িয়ে পুলিশ ইউনিফর্মে চক্ষুমুদে শুয়েরয়েছে সোমরাজ এবং শহুরে সড়কপথের ওপর দু'টো Scorpio চতুষ্চক্রবাহনের মাঝে কেমন যেন বেঁকে, জোরকরে কোনওরকমে পার্ককরাধরনে, মুখেরসামনে আড়াআড়ি দাঁড়করানো চালক সিট-সন্নিকটস্থ দরজাখুলেরাখা Scorpioটার গাঘেঁষে চালকআসনসংলগ্ন (পেছনেও যেন ধাক্কামারতে মারতে কোনওক্রমে মুখসরিয়েনিয়ে মহানগরপথের মাঝামাঝি বাঁকাহয়ে কোণাকুণি দাঁড়িয়েথাকা Scorpio র পাশাপাশি চারটে দরজাই খোলা) এবং যাত্রীওঠা-নামায় ব্যবহৃত দরজাখোলা আর sliding, কাঁচের পাল্লাবিশিষ্ট জানালার একখানা পাল্লা ঠেলেসরানোঅবস্থায়থাকা, তখনও শীততাপনিয়ন্ত্রিতব্যবস্থাচালুথেকেযাওয়া Force Traveller গাড়ি যারমধ্যে এবং বাইরে, তখনও ভোরেরআলো ভালোকরে নাফোটা সময়কালে, দলের পান্ডা অমরজিৎসহ মোট দশ দশটা হৃষ্টপুষ্ট চেহারার পুরুষদুষ্কৃতীর নিথর দেহ এদিকওদিক ছড়িয়েছিটিয়ে পড়েরয়েছে যাদের প্রায় ৭জনকে একক পৌরুষে ও পুলিশী দক্ষতায় শেষকরে, তাদেরই সঙ্গে ঘটেযাওয়া ও এতক্ষণের চলতেথাকা খন্ডযুদ্ধয় ধরাশায়ী কেন্দ্রীয় সরকারী পদমর্যাদার উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক সোমরাজ যাঁর দাড়িকামানো, গোঁফরাখা মুখবাহক মস্তক কোলেনিয়েবসে নিজের দু'হাতেধরে, কখনও কখনও সোমরাজের সাথে অতিবাহিত জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তের ঝলক মনের দৃষ্টিতে ভেসেওঠায় কলেজের প্রাক্তন সহপাঠী ও তৎসূত্রে প্রগাঢ় পারস্পরিক অনুভূতির সম্পর্কে লিপ্ত হয়েযাওয়া বিবাহপূর্বেকার জীবনের একমাত্র পুরুষের পরেথাকা পুলিশীপোশাকের জামার কলারটেনেধরে তীব্র যন্ত্রণাকাতরতার বহিঃপ্রকাশ দেবারতির -

সোম, সোম, অ্যাই সোম, সোম চোখ খোল, চোখ খোল, চোখ খুলে দেখ প্লিজ ! তাকা, তাকিয়ে দেখ, একবার তাকা না ! অ্যাই সোম, সোম, অ্যাই সোম, সোম রে ! শুনতে পাচ্ছিস, শুনতে পাচ্ছিস আমার কথা, শুনছিস !? শোন না ! চোখ খোল, চোখ খোল বলছি ! চোখ খুলে দেখ সোম, অ্যাই সোম ! এই তো আমি, মুক্ত, সম্পূর্ণ মুক্ত ! ওরা আর কেউ বেঁচেনেই সোম, কেউ বেঁচেনেই, সম্পূর্ণ মুক্ত ! কথা বল, কথা বল সোম, আমার সঙ্গে কথা বল একবার ! কথা বল, কথা বল, বল না রে ! তাকিয়ে দেখ না সোম আমায় একটিবার ! আমার নামধরে একবার ডাক না সোম ! আমি তোকে আজও ভালোবাসি সোম, আজও ভালোবাসি‼️ আমায় ক্ষমা করে দে প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দে ! I'm sorry সোম I'm extremely sorry ! প্লিজ সোম প্লিজ একবার, একবার চোখমেলে তাকা না !

শতআর্তিতেও সোমরাজ সাড়া নাদেওয়ায় যন্ত্রণাবিদ্ধ, ক্রন্দনরত, অনুতপ্ত, অসহায় দেবারতি সোমরাজকে প্রায় মৃত ঠাওরে 'সোওওওওওওওওমমমম'বলে বিদীর্ণকরা চিৎকার করেউঠে সোমরাজের প্রশস্ত বুকে মাথারেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো . . এখনও পর্যন্ত অবিবাহিত থেকেযাওয়া, সমাজের দুর্বৃত্তায়নের মূলোচ্ছেদনে নিবেদিত এবং এযাবৎ যথেষ্ট স্বীকৃতিলব্ধ, নিজ কর্মখ্যাত, অনেক তরুণের আইকনে পরিণতহওয়া পুলিশ অফিসার সোমরাজের উর্দি, ত্বক ভেদকরে যেন প্রাক্তন প্রেয়সীর মর্মস্পর্শী অশ্রুধারারা বিশল্যকরণীরূপে সোমরাজের হৃদপিন্ডে পৌঁছোলো, হৃদয়ের বিশেষ প্রকোষ্ঠকে ছুঁয়ে বোধহয় আবারও জাগিয়েতুললো প্রাণসত্তাকে, পুনরায় জ্বলেউঠলো সোমরাজের প্রায় ক্ষীণহয়েগিয়ে নিভতেবসা জীবনদীপ . . . শ্বাসবায়ু গ্রহনের জন্য স্পন্দিত হলো সোমরাজের কিছুক্ষণ আগেপর্যন্তও দশ-দশজন নররাক্ষসরূপী অর্বাচীন, নারকীয় কীটের সাথে দেবারতিকে রক্ষার্থে একেবারে leading from the front রণদাপটে, অতিমানবীয় লড়াইচালিয়েযাওয়া ও অতঃপর কিছুসময়ের জন্য নিশ্চুপ হয়েযাওয়া শরীর, যা টেরপেয়ে খুশিতে কেঁদেউঠে দেবারতি, সোমরাজের মুখপানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো প্রাণের উপস্থিতি বুঝেনেওয়ার উদ্দেশ্যে আর তারপর একসময় নিশ্চিতহলো এবং বাঁধভাঙ্গা আনন্দে আত্মহারাহয়ে অতীতের কলেজ-মিত্রের হতক্লান্ত, আবেগশূন্য ঠোঁটে নিজের শুকিয়েওঠা ঠোঁটদু'টো মিশিয়েদিয়ে ধরেথাকলো কিছুক্ষণ . . . . স্নেহচুম্বন এঁকেদিল দেবারতিকে সমাজদানব অমরজিৎ র করেনেওয়া অপহরণ দশাথেকে মুক্তকারীর মুখাগ্রয় যেমনকরে বেশকয়েকবছর আগে প্রায়শই এঁকেচলতো ! . . . . এরপর সময়বুঝে সোমরাজের একমাত্র জীবিত সহযোদ্ধার কাছথেকে স্মার্টফোনখানা একবার চেয়েনিয়ে স্বামী চিরাগের নাম্বার ডায়াল করলো . . . ভালোবাসা বেঁচেআছে . . Somraj is still alive and kicking❗️

কিন্তু এটা কাহিনীর সূচনা নয়‼️গল্পের অন্তিমে প্রবেশের আগের অংশ। এইস্থানে আমরা আবারও ফিরবো তবে এখন আসুন আমরা শুরুথেকে শুরুকরি❗️

সরস্বতী পূজো, বাঙালীর ভ্যালেন্টাইন'স ডে‼️ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ, শহরের বুকে এক ঐতিহ্যবাহী কলেজের অধ্যক্ষ পার্থসারথীবাবুর রুমের অন্দরেথাকা প্রিন্সিপালের টেবিলের ওপররাখা মেরুন রঙের পুরোনো মডেলের হাতলওয়ালা টেলিফোনের রঙচটেযাওয়া রিসিভারটা, চুড়িতেভরা ডানহাতে (যার মধ্যমায়, তুলনায় বড় গোলাকার চাকতিসদৃশ অংশের মাথাযুক্ত মডেলের আংটি) কানেধরে, স্নানের পর নিপুণহাতে মাঝখানে সিঁথিকরা সুগন্ধীফুলের মালায় সজ্জিত খোঁপায়বাঁধা ঘনকালোচুলে, কপালে ছোট্ট লাল টিপ, নাকে নাকচাবি, কানে ঝুমকো, গলায় সুদৃশ্য, কারুকার্যমন্ডিত নেকলেসসহ হালকা লালচেরঙা হাতাওয়ালা ব্লাউজের সঙ্গে গাঢ় গেরুয়াবর্ণের শাড়িতে টেবিলের একপাশে দাঁড়িয়ে চুড়িরগোছায়ভরা নিজের বাঁহাতের আঙ্গুলগুলো ফোনের হাতলসংযুক্ত পেঁচানো কালো তারে বোলাতে বোলাতে যথাযথ সাযুজ্যযুক্ত পরিমাণে লিপস্টিকমাখাঠোঁটে মোহিনী হেসে হেসে কথাবলেচলেছে মেয়েটা আর অন্যমনস্কতায় সরেযাওয়া বুকের আঁচলের আড়ালেথাকা ভরেওঠা ব্লাউজের কেন্দ্রে গভীর স্তনবিভাজিকারেখা সুস্পষ্ট। অগাঢ় লাল এবং প্রগাঢ় কমলারঙের আবরণমাঝে কমললোচনার শ্বাস-প্রশ্বাসে উদ্ভাসিত হতেথাকা গৌড়গাত্রবর্ণের বিস্তৃত যুবতী বক্ষদেশসহ শাড়ি-ব্লাউজে শোভিত আধুনিকা, বাঙালিনীর জাজ্বল্যমান উপস্থিতিটাই এমন চৌম্বকীয় সম্মোহক হয়েউঠেছে পলাশপ্রিয়ার আবাহনের দিনে যাতে লাইকস, কমেন্টস এর ঢলনেমে ফলোয়ার্স-সংখ্যা বৃদ্ধিপাওয়ারই কথা ! কলেজ-চত্বরে মেয়েটির বন্ধু-বান্ধবীসংসর্গে তাকে বহুবার দেখে-কন্ঠস্বর শুনেথাকলেও পরিচিতি না থাকা, নিজের শ্রেণীকক্ষের না হওয়ায় কখনও, কোনওদিন আগবাড়িয়ে আলাপকরতে যায় নি ব্যক্তিত্বে গাম্ভীর্য ধরেরাখা সোমরাজ কিন্তু আজকের এই সরস্বতীপূজোর পরিবেশগত মধুর আবহে কেমন যেন আত্মভোলা, তন্ময় হয়ে মুগ্ধদৃষ্টিতে প্রায় অপ্সরারূপী দেবারতিকে কলেজ-প্রধানের কার্যালয়-কক্ষের জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখেচলা, সরস্বতীপূজোয় কলেজের প্রথম বর্ষ থেকে অধ্যক্ষসহ অধ্যাপকমন্ডলীকর্তৃক মনোনীত সহকারী সম্পাদক, সাহিত্য বিভাগের মেধাবী, পরিশ্রমী, লেখাপড়াব্যতীতও বিভিন্ন সামাজিক গুণে ভীষণভাবে ঋদ্ধ কিন্তু শুধুই প্রয়োজনীয় নেটগ্রুপে খুব দরকারী কিছু রেসপন্স/পোস্ট ছাড়া সোশাল মিডিয়াগুলোয় অ্যাকাউন্ট থাকলেও চরম অ-নেটিজেন প্রকৃতির, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার-পরিবেশে জন্ম-লালিত হওয়া, সর্বোপরি, মানুষের-সমাজের গূঢ় অবক্ষয়-অনৈতিকতা-অসাম্য-অন্যায্য-অন্যায়-অমানবিক-অসহনীয় মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যাগুলো যাঁকে ভাবায় ও তার সুরাহা/সমাধানকল্পে গভীর পঙ্কিলতায় গ্রথিত সমস্যা-রাক্ষসের সমূলে উচ্ছেদ-মুন্ডচ্ছেদনে শেষপর্যন্ত লড়েযাওয়ার চওড়া কলজেরাখা কিন্তু নিজের কোনও ব্যক্তিসমস্যায় প্রচন্ড অন্তর্মুখী, মুখে স্পিকটি নট গোছের যেন "কিচ্ছু হয় নি, আমি ঠিক আছি" ব্যানারঝোলানো, larger than life টাইপের সোমরাজের পিঠে হাত রাখলেন পেছনদিকথেকে হেঁটেআসা প্রিন্সিপাল, যিনিসহ কলেজের কিছু প্রাজ্ঞ অধ্যাপক-অধ্যাপিকা ঐ শিক্ষাঙ্গনে অধ্যয়নরত সেই বিরল বৈদুর্য্যমণির দ্যুতির আভাস তখন থেকেই পেতে শুরুকরে কর্মঠ, মিতবাক, অনুগত সোমরাজের পৃষ্ঠপোষক হয়েউঠেছিলেন যে রশ্মি ভবিষ্যতে আরও প্রখর-প্রকট-তীব্ররূপে ঠিকরে বেরিয়ে সুদূরবিদারী হয়ে সমকালীন মানবজীবনের অন্ধকার অংশগুলোয় আলোছড়াবে, এই বিশ্বাসে . .

এসো সোম, বলো কি ব্যাপার !? কোনও সমস্যা, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন !? ভেতরে গিয়ে বসবে তো ! আরে ভাই, এখনও যদি এতো সঙ্কোচ করো তাহলে চলে বলো !? ব্যস্ততার দিনগুলোয় না হয় অন্য কথা !

অবিকল সাদা-কালো বাংলা সিনেমা-যুগের পাহাড়ী সান্যাল মহাশয়-টাইপ বাচনভঙ্গিগত এবং mannerism-সমৃদ্ধ সংলাপ, নীতি-আদর্শথেকে এতটুকুও বিচ্যুত না হওয়া কিন্তু প্রচন্ড মিশুকে, বন্ধুভাবাপন্ন, ছাত্রমহল আর অধঃস্তন কলিগমাঝে, এমন কি সমাজেও ভীষণ জনপ্রিয়, সমাদৃত কলেজ-অধ্যক্ষ পার্থসারথীবাবু !

জলাশয়ের পারসংলগ্ন শ্যাওলা যে রঙের হয় সবুজবর্ণের ঠিক সেই শেডবিশিষ্ট পাঞ্জাবী, সাদা পাজামা, খদ্দরের হাতকাটা জ্যাকেট, পায়ে বেল্টওয়ালা কালো লেদার স্যু, চোখে club master মডেলের চশমা, চুলকাটার সময় হয়েযাওয়ায় বড়বড় চুলগুলোকে শ্যাম্প্যু-নারকেল তেলসহযোগে স্নানকরে পরিপাটিভাবে আঁচড়ানো, নির্দিষ্ট মাপেছাঁটা চাপদাড়ি গালে, নিয়মিত স্থানীয় ব্যায়ামের আখড়ায় যাওয়া মজবুত দেহের অধিকারী সোমরাজের স্মার্টওয়াচপরা, পাঞ্জাবীর হাতাগোটানো পুরুষালী দুইবাহুসমৃদ্ধ আন্দাজ়ে অধ্যক্ষের রুমে প্রবেশ ও টেলিফোনের ওপারেথাকা কলেজের অধ্যক্ষ-জায়ার (ব্যক্তিগত পরিচিতিসূত্রে বড় আদরের কন্যাসমা দেবারতি) সঙ্গে এতক্ষণের বিস্তারিত কথাবার্তা সেরেনিয়ে প্রিন্সিপালরুমের অন্দরে টেলিফোনের রিসিভারখানা রেখেদিয়ে মায়াভরা দু'চোখে ঘুরে তাকালো দেবারতি এবং এই প্রথম সোমরাজের সঙ্গে পারস্পরিক দৃষ্টিবিনিময় ঘটলো গেরুয়াবরণ স্ত্রীবস্ত্রধারিণীর . .

পার্থসারথীবাবু ৹ . . And please meet my daughter, my little princess today looking like a fully grown lady ! দেবারতি, আমার স্কুলের বন্ধু ও শহরের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী প্রসূনবাবুর তনয়া, ওকে আমি সেই এইটুকু বয়সথেকে চিনি ! তোমাদের সম্ভবত আলাপ নেই ! ও আমাদের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী, কেমিস্ট্রি অনার্সনিয়ে পড়ছে এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানের আজকের বিচিত্রানুষ্ঠানের জন্য সর্বান্তঃকরণে বিবেচিত 'থালি গার্ল' আর আজ, বিশিষ্ট অভ্যাগতদের তালিকায় যে দেবারতির পিতা ও কলেজ-কমিটির অন্যতম সদস্য এবং এই মহাবিদ্যালয়ের জন্য নানাপ্রকার আর্থিক অনুদান যোগাড়/রেফার করেদেওয়ার প্রধান মুখেদের একজন, উপস্থিত থাকছেন তা তো বলাই বাহুল্য ! And my dear Debarati, please meet Somraj, my child, the Philosophy Honours fellow, one of our finest and brightest, brilliant . .

সোমরাজ ৹ থাক না স্যর, আমার মতো একজন নিতান্তই সাধারণ, ছাপোষা ছাত্রের মধ্যে যে আপনারা . . বলছিলাম কি স্যর, আপনি এই ক্যাশ ভাউচারগুলোয় সই করেদিন, কিছু পেমেন্ট করতেহবে এবং Accounting Department এ জমাদেওয়ার জন্য documentation partটাও রেডি করেরাখি !

নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে এহেন সজাগ ও নিয়মনিষ্ঠ দর্শনের ছাত্র নিজের জীবন-দর্শন থেকে এতটুকুও চ্যুত না হয়ে দেবারতির 'হায়' বলে এগিয়েদেওয়া হাতে করমর্দন না করে সহাস্যমুখে আলাপচারিতার নমস্কার জানালো সোমরাজ যার এরূপ সাবেক আচরণ এবং হ্যাংলামো না করার প্রবৃত্তি দেবারতিকে impress করে আর অনুষ্ঠানমঞ্চে/ভোগপ্রসাদ পরিবেশনস্থলে যাওয়াআসার পথে বিভিন্ন কারণে/কিছুসময় কারণের অছিলায় দাঁড়িয়েথাকা স্মিত লাজুক হাসিমাখামুখে দাঁড়ানো দেবারতির সাথে বারংবার চোখাচোখি হতেথাকা ও স্টেজে উপস্থাপিত হয়েচলা সঙ্গীত-নৃত্য-কবিতা/আবৃত্তি/সংক্ষিপ্ত রচনাপাঠ-নাটক-গীতিনাটক-প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতাসহ বাগদেবীর আরাধনায় আমন্ত্রিত মুখ্য অতিথিদের বরণ করে নেওয়া-আপ্যায়ন-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুভসূচনা প্রভৃতির বিরতিলগ্নে যথোপযুক্ত বাগ্মী সোমরাজের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য/ঘোষণা/আংশিক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা মঞ্চের সামনে প্রথমের সারিতেবসে নিষ্পলক নয়নে, গালে-চিবুকেহাতদিয়ে বসে একদৃষ্টে সোমরাজের দিকে তাকিয়ে ভীষণ উপভোগ করছিল দেবারতি আর যথারীতি সোমরাজের নির্লিপ্ত থেকে রসায়ন-পাঠিকার সেই তীক্ষ্ণদৃষ্টিকে উপেক্ষাকরে বিশেষ আমল না দেওয়া যেন আরও বেশিকরে দেবারতিকে সোমরাজের প্রতি আকৃষ্ট, উৎসাহী করে তুললো যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটলো তখন, যখন যাবতীয় অনুষ্ঠানসমাধাহয়েযাওয়া দিনান্তে প্রায় ফাঁকাহয়েআসা কলেজ প্রেমিসেসে নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত ওয়াশরুমথেকে সারাদিনের ক্লান্তি কিছুটা ধুয়েমুছে ফ্রেশহয়ে বেরহওয়া, হেঁটেআসা দেবারতি, আধুনিক, ঝাঁচকচকে উপাদানসমৃদ্ধ বাথরুমমুখো তৎকালীন নির্জনপথে উল্টোদিকেযাওয়া সোমরাজকে একলাপেয়ে জড়িয়েধরে হঠাৎই গালে একখানা চুমুখেয়ে "আই লাভ ইউ" বলে বসলো এবং মহাবিদ্যালয়ের সেই সময়কার প্রায় নো ম্যান'স ল্যান্ড হয়েওঠা প্রেমনিবেদনভূমিতে বিপরীতপ্রান্তথেকে একাকিনীচলেআসতেথাকা দেবারতিকে লক্ষ্যকরে সজাগ থাকলেও এরকম ঘটনার জন্য একেবারেই অপ্রস্তুত সোমরাজ অবাকহয়ে দেবারতির পানেচেয়ে চুমুর আকস্মিকতার ঘোর না কাটা মস্তিষ্কে বিস্ময় প্রকাশকরলো -

মানে !? বড্ড অসভ্য তো তুমি !

দেবারতি ৹ আর তুই খুব দাম্ভিক, অহঙ্কারী, একরোখা ! . . . মানে হলো, আজথেকে তুই আমার বয়ফ্রেন্ড, আমি তোর গার্লফ্রেন্ড, কি, বুঝলি !? সভ্য পুরুষ কোথাকার ! হিঃ হিঃ . . . আমি সেই কখন থেকে সিগনাল দিয়ে যাচ্ছি আর উনি কি না "আপনি যে নাম্বারে ফোন করেছেন, সেটি এখন পরিষেবাসীমার বাইরে আছে" মার্কা লুক দিয়েযাচ্ছেন ! কেন, বান্ধবী রাগ করবে !? আমায় না হয় সতীন করে রেখেদিস তোর Gf এর ! . .

সোমরাজ ৹ পাগল যতসব ! সরস্বতীপূজো, ভ্যালেন্টাইন'স ডে এর আশেপাশে ফুটেওঠা ভালোবাসার চারাগাছেরা গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহে/মুষলধার ভারীবর্ষণে হয় শুকিয়েযায় নয়তো ধুয়েমুছে সাফ ! আর দূর্গাপূজোর সময়কালীন জন্মনেওয়া শারদীয় প্রেমেরা ডিসেম্বর-জানুয়ারীতে প্রবল শৈত্যপ্রবাহে লেপ-কম্বলের ভেতর সেঁধিয়ে শীতঘুমে চলেযায় ! তোমারটা কোন ক্যাটাগরির !? . . পার্থ স্যর বললেন, তোমায় যেন দেখতেপেলে বলেদিই যে, তোমার বাবা অপেক্ষা করছেন ! রাত হয়েছে, এখন যাও !

দেবারতি ৹ So unromantic ! Typical philosophy ঝাড়ছিস তো ! তোর হবে বুঝলি, লেগে থাক ! দর্শনে ফার্স্টক্লাস নিশ্চিত !

তারপর দেবারতি কলেজ থেকে বেরোনোর উদ্দেশ্যে ও সোমরাজ টয়লেটের অভিমুখে পা বাড়িয়ে কয়েক কদম যাওয়ার পর উভয়েই প্রায় একসঙ্গে একেঅপরেরদিকে ফিরেতাকালো আর নিয়তির কলমে রচনা শুরুহলো দুই নারী-পুরুষের সংস্পর্শ-সান্নিধ্য গাথার . .

কলেজের তরফথেকে আয়োজিত দোলপূর্ণিমায় শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবে দু'জনার উপস্থিতি এবং চোলাই-হাঁড়িয়া-গাঁজা সেবিত চার-পাঁচজন উন্মত্ত, অর্বাচীন, আসুরিক ক্ষিপ্রতার দামাল যুবকদের হাতথেকে যথাসময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে সোমরাজের একক পৌরুষ দেবারতির শ্লীলতারক্ষা করে যার কৃতজ্ঞতায়-আনুগত্যে এপর্যন্ত অদূরে দাঁড়িয়ে দর্শন-ছাত্রের বীরবিক্রম দেখতেথাকা দেবারতি দৌড়েগিয়ে, চারপাশে ছড়িয়েপড়েথাকা নারীশরীরলোভী শূম্ভ-নিশূম্ভদের রক্তাক্ত, আহত দেহগুলোর মাঝে রণপ্রতাপে দন্ডায়মান সোমরাজকে জড়িয়েধরলো, প্রচন্ডজোরে ধকধক করেচলা পুরুষবুকে মাথারেখে কেঁদে ফেললো, নিরাপদবোধে আশ্বস্ত হলো। সোমরাজও দেবারতির আবেগের উষ্ণতায় বিগলিত হলো আর রসায়ন-ছাত্রীকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দুই বাহুবন্ধনে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধকরলো। শুরু হলো অসম সামাজিক অবস্থানে বাসকরা দুই নর-নারীর ভালোবাসার সম্পর্কের যাত্রা যা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ময়দান, বাবুঘাট, মিলেনিয়াম/নিকো/ইকো পার্ক, ইডেন গার্ডেন'স, কফি হাউস, পার্ক স্ট্রিট, রবীন্দ্রসদন-নন্দন চত্বর, দক্ষিণেশ্বর-কালীঘাট মন্দির, দূর্গাপূজোয় একডালিয়া-ম্যাডক্স/কলেজ/সন্তোষমিত্র স্কোয়্যার-সুরুচি/দমদম তরুণ সঙ্ঘ-দেশপ্রিয়/মহঃ আলি/টালা পার্ক-চেতলা 'অগ্রণী'-তেলেঙ্গা/কর বাগান-শ্রীভূমি-বাগবাজার সার্বজনীন-আহিরীটোলা ইত্যাদি পূজোমন্ডপ, হাতিবাগান-গড়িয়াহাট-বড়বাজার, মহাকরণ এবং হাওড়া ময়দান মেট্রোস্টেশন এর মধ্যেকার গঙ্গার তলাদিয়ে সুরঙ্গমধ্যে পাতালরেলপথ, সাউথসিটি মল, গড়িয়াহাট সংলগ্ন গোলপার্ক-নিকটস্থ 'মৌচাক' মিষ্টির দোকান-কষা মাংসের জন্য বিখ্যাত শ্যামবাজারের 'গোলবাড়ি', স্টার থিয়েটার-জয়া-এলিট-প্রাচী-প্রিয়া সিনেমা প্রভৃতি বেশ কয়েকবছরধরে পরিক্রমা করেএসে পরস্পরকে নানারকম আন্তরিক প্রতিশ্রুতি দিয়েও একদিন পারিবারিক লোকজনের উপস্থিতিতে সোমরাজের গালে দেবারতির এক থাপ্পড়ে তিল তিল করে গড়েওঠা এতদিনের সোমরাজ-দেবারতির ঈশকনামার বইখানা ছিঁড়ে কুটিকুটি হয়েগেল যখন ছেলের ভালোবাসার কথা জানতেপেরে স্থানীয় ফ্যাক্টরির শ্রমিক সুপারভাইজার বাবা ও গৃহবধূ মা, বেসরকারী সংস্থায় সন্তানের যোগ্যতা-দক্ষতার নিরিখে বাজার অনুপাতে মোটামুটি ঠিকঠাক বেতনে চাকুরীরত সোমরাজের বিয়ের সম্বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে প্রসূনবাবুদের আগাম জানিয়েই দেবারতিদের প্রাসাদোপম অট্টালিকায় হাজির হন, যে গৃহে সোমরাজেরও এই প্রথম পদার্পণ। নিজেদের socio-economic-cultural status এর ধারেকাছে না থাকা এরকম একখানা পরিবারের সাথে আলাপচারিতায় বসে সময় এবং মেজাজ কোনওটাই নষ্টকরার পক্ষপাতী ছিলেন না দেবারতির বাবা তথাপি স্ত্রী-কন্যার অনুরোধ-জোরাজুরি-আব্দারে একধরনের অনিচ্ছাতে, দায়সারা মানসিকতায় গৃহকর্তার আসনগ্রহন কিন্তু দেবারতি ও তার মায়ের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও ধনকুবের প্রসূনবাবুর বারবার সোমরাজদের সামাজিক অবস্থাননিয়ে কটাক্ষ, সোমরাজ-পিতা সত্যেশ্বরবাবুর 'মামুলি' চাকরি সম্পর্কে তির্যকোক্তিসহ নানাবিধ অসাম্যের বাক্যবাণ দীর্ঘক্ষণ সহ্যকরার পর একসময় ধীরস্থির প্রকৃতির সত্যেশ্বরও অহমিকায় উদ্ধত প্রসূনের সঙ্গে তীব্র বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়লে দেবারতির বাবার জিহ্বা-নিঃসৃত ভাষার মান ততোধিক কদর্য হয়েওঠে এবং তিনি সোমরাজের পিতামহ এমনকি মায়ের কূল-শীল নিয়ে গালিগালাজ আরম্ভ করলে মেজাজ হারায় সোমরাজ ও প্রসূনবাবুর দিকে তেড়েযাওয়ার মুহূর্তে দেবারতির মা প্রিয়দর্শিনী দেবীর ক্ষমাচেয়েনিয়ে সোমরাজকে নিরস্ত করতেআসার মুহূর্তকালীন উত্তেজনা, দীর্ঘদেহী প্রসূনেরও এগিয়েএসে সোমরাজের জামার কলার টেনেধরা যা দেখে সোমরাজের মা শ্যামাঞ্জলি দেবীর ছুটেআসা আর দেবারতি-পিতার হাতের ঝাঁকুনিতে প্রায় ভূপতিত হতেহতে বেঁচেযাওয়া, সত্যেশ্বরবাবুর তাকে ধরেফেলায় এবং প্রথিতযশা স্বামীর এহেন দাঁতনখ বারহওয়া অসামাজিক, অনভিপ্রেত রাক্ষসরূপের কবলথেকে সোমরাজকে উদ্ধার করবার প্রয়াসরত প্রিয়দর্শিনী চলতেথাকা প্রচন্ড ধাক্কাধাক্কিতে ছিটকেগিয়ে মাথায় ভীষণ আঘাত পান যার জন্য অধিকাংশতঃ প্রসূনবাবুই দায়ী ও তা দেখে, গুরুত্ববুঝে একঝটকায় নিজেকে মুক্তকরেনিয়ে বান্ধবীর মায়ের উদ্দেশ্যে দৌড়েযাওয়া সোমরাজকে মায়ের যন্ত্রণাকাতরতায় দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্যহয়ে চড় মেরেবসে দেবারতি যে আচরণের প্রশংসাগেয়ে ঘৃতাহুতিদেয় প্রসূন আর এরও পরের ভয়ঙ্কর পরিণতি দৃশ্যগুলো আগাম আন্দাজ করেনিয়ে অভিজ্ঞ সত্যেশ্বর কাঙ্খিত সম্মানসহ হাসিমুখে, মাথাউঁচুকরে বিদায়নেওয়ার স্থানথেকে একরাশ অনাদর-অপমানমাখা বিষাদমুখে, নতশিরে স্ত্রী-পুত্রকে একপ্রকার টেনেনিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত বেরিয়েএসে হাঁফছেড়ে বাঁচলেন . .

তারপর দেবারতি-সোমরাজের মধ্যেকার যাবতীয় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় চিরবিচ্ছিন্ন, কথানেই, জীবনে একেঅন্যের প্রতি পিঠকরে দাঁড়িয়ে . . মেয়েকে সমগোত্রীয়/তদূর্ধ্ব সামাজিক-আর্থিক মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তিবিশিষ্ট বংশে পাত্রস্থ করবার প্রসূনবাবুর একের পর এক লাগাতার প্রচেষ্টায় দেবারতি-প্রিয়দর্শিনীর ক্রমাগত না-মঞ্জুরি . . প্রিয়তমা বা তার মায়ের সঙ্গে কোনওরকম ভবিষ্যৎ সংসর্গ না রাখার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া সোমরাজের (পিতা-মাতার কাছে), যে, সন্তানকে অনেককষ্টে মানুষকরেতোলা মা-বাবার প্রতি অসম্ভব শ্রদ্ধাশীল, দেবারতির বাড়িতে অপমানবিদ্ধহয়ে যাঁদের কালোহয়েযাওয়া মুখগুলোয় চোখ ছলছলহয়েওঠার ক্ষণগুলো সোমরাজের মনে আজীবনের জন্য গেঁথেযাওয়া যা তাঁরকাছে ভালোবাসার নারীর সাথে সম্পর্কের ভবিষ্যত হতেও মহার্ঘ্য . . অত্যন্ত স্নেহভাজন, সন্তানসম ছাত্র সোমরাজের সঙ্গে এখনও সমানে যোগাযোগরেখেচলা পার্থ স্যরের বাল্যবন্ধু প্রসূনকে ভয়ানক ভর্ৎসনা, যাবতীয় সম্পর্ক ত্যাগ ও বন্ধুরহয়ে সত্যেশ্বর-শ্যামাঞ্জলির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা, আন্তরিক দুঃখপ্রকাশ . . দেবারতি এবং তার মায়ের পক্ষথেকে সোমরাজ ও তার অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের ভীষণ চেষ্টা, ক্ষমাযাচনা শেষপর্যন্ত নিষ্ফলাই থেকেযাওয়া সত্যেশ্বরবাবুদের এই বদ্ধমূল পর্যবেক্ষণে যে সোমরাজ-দেবারতির সংসারজীবনকে প্রসূনের রক্তচক্ষু কিছুতেই সুখের হতেদেবে না, সবসময়ই বিশেষতঃ তাঁদের পুত্রের অনিষ্ট করার ফন্দিফিকির এঁটেচলবে হিংস্র, অর্থান্ধ ঐ কারবারী, তাই সোমরাজের সঙ্গে মেয়ের আর কোনও ভবিতব্য দেখতে না পেয়ে অগত্যা কন্যার বিবাহের জন্য পিতার ধনসম্পদের নিরিখে পাত্রবাছাই করেচলার প্রক্রিয়ার বিরোধিতাকরা একদিন বন্ধ করেদেওয়া প্রিয়দর্শিনীদেবীর যিনি দুহিতাকেও তৎকালীন বাস্তব জীবনচিত্রের সামনে দাঁড়করিয়ে সত্য উপলব্ধি করাতে শেখালেন, ফলতঃ প্রাথমিকভাবে অন্য কাউকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্তে অনড়থাকা দেবারতির বজ্রকঠিন যুক্তিগুলোর ক্রমশঃ শিথিলহয়েআসা সময়ের/পরিস্থিতির প্রকোপে এবং অবশেষে প্রসূনবাবুর বেছেনেওয়া একজন ধনী, শিক্ষিত, কলকাতার অবাঙালী ব্যবসায়ীপুত্রের গলায় মাল্যদান দেবারতির যাদের প্রশাসন পরিচালনায় যথেষ্ট প্রভাব কাজকরেথাকে ! এবং যথারীতি স্বামী চিরাগ এর সঙ্গে ঘরকন্না শুরুকরা, সন্তানধারণ, গৃহিণীর পারিবারিক দায়বদ্ধতায় লিপ্তহয়েপড়া, আর সোমরাজ-অধ্যায়ের ওপর ধীরে ধীরে বিস্মৃতির ধূলো জমতেথাকা . . বেসরকারী অফিসে চাকরি করতে করতেই UPSC র সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতিনিতেথাকা সোমরাজ প্রথম তিনবারের চেষ্টায় না পেরেউঠলেও চতুর্থ দফায় চওকা হাঁকিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যভেদকরে, দেশমাতৃকার সেবায় লব্ধ পদমর্যাদার সামাজিক যশ, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা সমস্তই তুলেদেওয়া বাবার হাতে, মায়ের শাড়ির আঁচলের ঝুলিতে, আজ তিনি IPS সোমরাজ . .

একাধিক খুনসহ যাবতীয় কুকর্মবিষয়ক বেশ কয়েকটা মামলা চলতেথাকা most wanted তকমাপাওয়া দুষ্কৃতী অমরজিৎ এর সাম্প্রতিকতম দুষ্কর্ম, শহরের বুকে এক প্রখ্যাত বারে মদ্যপ অবস্থায় একজন উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিকে নিজস্ব deal সম্পর্কিত আলোচনা চলাকালীন আকস্মিকই গুলিতে ঝাঁঝড়া করেদেয় নরপিশাচ প্রকৃতির, অসুরদেহধারী ঐ রাক্ষসের প্রতিচ্ছবি, যা থেকে উদ্ধার করবার দায়ভার নিতে অস্বীকারকরা অমরজিৎ এর তখনকার রাজপাট পরিচালনক্ষমতার উচ্চস্তরীয় অলিন্দে আসীন গডফাদারকে চাপে রাখতে স্থানীয় একজন অবাঙালী পরিবারের গৃহবধূ যে আর অন্যকেউ নয়, এককালীন সোমরাজ-প্রেয়সী দেবারতিকে অপহরণ ও মুক্তিপণহিসেবে অগাধ টাকার (তার বিশেষ সঙ্গী-সাথীদের আপাতত বিদেশযাত্রা আর গাঢাকা দেওয়ার আদর্শস্থানে নিরাপদ খাওয়া-থাকার জলদি ব্যবস্থাকরবার কারণে) হুমকি, মাশুল গুনতেথাকা চিরাগ-ফ্যামিলির উদ্দেশ্যে ঘোষণা করতেথাকে দলনেতা অমরজিৎ, নইলে ব্যবসাজগতে যথেষ্ট সুনামথাকা, অনেক প্রকল্পে অর্থবিনিয়োগকারী, এলিটক্লাসে ওঠাবসাকরা ঐ ব্যবসায়ী পরিবারের পুত্রবধূকে আর জীবিত ফেরতপাওয়া যাবে না এবং স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তি/ফ্যামিলি মেম্বারকে আটককরে দাবীকৃত অর্থ, আনুষঙ্গিক পরিষেবা-সহযোগিতা প্রদানের বদলে/দেওয়ার আড়ালে কোনওরকম পুলিশি ফাঁদপেতেরাখা-জাল বিছোনোর ঘুণাক্ষর সংবাদ অমরজিৎ এর দুর্ধর্ষ সাংগঠনিক খবরী-মারফৎ একবার কানে পৌঁছোলে অপহৃত শিখন্ডীর ধর-মুন্ডু তো আলাদা হয়ই, তারপর দাবি-দাওয়াথেকে মুখফিরিয়েনেওয়া অমরজিৎ-বাহিনীর চিরকালীন একটা অবিশ্বাস তৈরিহয়েযায় সেই বংশের প্রতি ফলতঃ পরবর্তী দিনগুলোয় ঐ স্বজনহারা মানুষগুলো আবারও অমরজিৎ-প্রকোপে পড়ে না ঠিকই কিন্তু উল্লেখিত হত্যাচিত্রয় যে নির্মম, সুদূর কল্পনারও অতীত নৃশংসতার ছবি সে এঁকে চলেযায়, তা দেখে বাকিজীবন শিউরে শিউরে ওঠার বিভীষিকা-স্মৃতি মননে বয়েনিয়ে বেড়ায় উপদ্রুত পরিবারের বেঁচেচলা সদস্যেরা, এতটাই হাড় হিমকরা আদিম অসুরকুল-সদৃশ, মনুষ্যত্বের ভাবলেশহীন, স্বমহিমায় দাপিয়েবেড়ানো, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের এহেন চন্ড-মুন্ডদের উন্মত্ত কার্যপ্রণালী, নিষ্ঠুরতা ! তাই সাধারণতঃ পুলিশ-প্রশাসনকে না জানিয়ে অমরজিৎ এর দৌরাত্ম্য হজম করেনিয়ে চুপিসারে তার ফরমান-নির্দেশিত চাহিদাপূরণে অগ্রসর হয় অপহরণ-কান্ডে ভুক্তভুগী ফ্যামিলিগুলো যা আজকের এই মোবাইল ইন্টারনেট, ডিজিটাল মিডিয়ার জমানায় পুরোপুরি চেপেরাখা সম্ভব নয়, এরকম high voltage case এ বা যে কোনও অমানবিক উৎপীড়নমূলক অত্যাচারদমনে সরকার স্বতঃপ্রণোদিতভাবে জড়িতহয়ে পদক্ষেপগ্রহন করবেনই এবং এক্ষেত্রেও ঐ রাবণ-বধের গুরুদায়িত্ব যাঁর কাঁধে সঁপেদেওয়া হলো তিনি যেন সাক্ষাৎ মা চন্ডীর আর এক রূপ . . অমরজিৎ এর রোমহর্ষক দস্যুবৃত্তির অমরগাথার অশ্বমেধের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন IPS শালিনী . .

এত বছরের বর্বরতা, খুন-জখম-রাহাজানি-লুঠতরাজের হিংস্রতায় গঠিত ত্রাসের সাম্রাজ্যের এক-একটা ঘাঁটি, অমরজিৎ এর বাছাইকরা দানবীয় মানসিকতাসম্পন্ন, ক্ষুরধার তেজেভরা মস্তিষ্কসমৃদ্ধ ও রাক্ষসবলে বলীয়ান, দুষ্কর্ম পরিচালনা-সমাপনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক-একজন সেনানীকে ধ্বংস করলেন তিনি এ অপারেশনের জন্য প্রস্তুত বিশেষ টাস্ক ফোর্সের অফিসার-জওয়ানদের সহায়তায়, যেন অসুরদলনীরূপে আবির্ভূতাহয়ে নররাক্ষুসে পিশাচ সেনাদলের ছড়িয়েছিটিয়েথাকা আধিপত্য-শাখাসমূহের মূলোচ্ছেদ করেফেললেন দিল্লীথেকে কলকাতায় ট্রান্সফারপাওয়া, অপরিসীম বৌদ্ধিক কুশলতারাখা কেন্দ্রসরকারী পুলিশ অফিসার শালিনী এবং অবশিষ্ট লোকলস্করনিয়ে কোনওক্রমে প্রাণেবেঁচে, পণবন্দী দেবারতিকে সঙ্গেকরে পালিয়ে আত্মগোপন করেরইলো দস্যুনায়ক আর খবর পেল যে, এই ফৌজদারী আক্রমণ সম্পূর্ণই সরকারী সিদ্ধান্তে ঘটেচলেছে, অপহৃত গৃহবধূর পরিবার জড়িত নেই। এরকমই দুষ্টের দমন ও বধূউদ্ধার অভিযানের ক্রমপর্যায়ের এক দফা লড়াইতে আকস্মিকই উক্ত টাস্ক ফোর্সের সেনা-অফিসারদের বড়সংখ্যায় প্রাণনাশ দুষ্কৃতী-বাহিনীর অতর্কিত হামলায় এবং প্রায় ভুঁইফোঁড় উত্থানের রূপনিয়ে ছলনাশ্রয়ে আচম্বিতে আছড়েপড়া যেন মহিষাসুর-পেশীর শক্তিধর অমরজিৎ এর প্রবল শারীরিক আঘাতে ছিটকেপড়ে শালিনী, রক্তাক্ত অবস্থায় গুরুতর জখমহয়ে সংজ্ঞাহীনতায় হাসপাতালে ভর্তিহয় . . চেতনা ফিরলে নিজেকে চিকিৎসালয়ের বেডে আবিষ্কারকরা বিধ্বস্ত শালিনী দু'-তিনদিন পর কিছুটা ধাতস্থ হলে উপস্থিত ডাক্তার-নার্সের নিষেধবাক্য অমান্যকরে সম্পূর্ণ ফিটনাহওয়া শরীরে পুনরায় অপারেশনে বের হওয়ার উপক্রম করলে পরিচর্যায় মোতায়েন সহকারীরা তাঁকে বাধাদেন, দেহ যুতসই, কর্মক্ষম অবস্থায় আসাপর্যন্ত ধৈর্যধরতে বলেন, সিনিয়ররাও ফোনে অনুরূপ উপদেশই দেন আর বিকল্প যথাযোগ্য আধিকারিকের তত্ত্বাবধানে অভিযান চালু থাকবেবলে আশ্বাস দেন কিন্তু বেশকিছু এজাতীয় অপারেশনের অভিজ্ঞতালব্ধ এবং চলতেথাকা সাম্প্রতিক অমরজিৎ-সংহার সংগ্রামের শেষের অধ্যায়ে পৌঁছোনোর আগেপর্যন্ত রীতিমতো আগুনঝরিয়ে এগিয়েচলা, দুষ্ট-মস্তিষ্ককে যেন scanকরে তাদের ভবিষ্যৎ-গতিবিধি প্রায় নির্ভুল পড়েফেলা অনেকটাই রপ্তকরেওঠা শালিনী জানতো যে, হয় ততদিনে দানাখেয়ে পাখী ফুড়ুৎ হয়েযাবে নয়তো পণবন্দিনী গৃহিণীর ভালোমন্দ কিছু একখানা করেফেলবে স্বাভাবিক মানুষের পর্যায়ে না পড়া, সাধারণতঃ কুখ্যাত ক্রিমিনালরা যেমন হয় অনেকাংশেই তাদের থেকে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি আলাদা ঐ উগ্রচন্ডা শয়তান যাকে যথোচিত স্টাডিকরে, বহু case history খুঁটিয়ে বিশ্লেষণকরে, criminal psychologistদের মূল্যবান পরামর্শগুলো মাথায় গেঁথেনিয়ে আসরে নেমেছিল শালিনী ও ছোটবেলাতেই অনাথ হয়েযাওয়া, সমাজের প্রান্তিক স্তরেরও বাইরে বেঁচেথাকা, আত্মীয়-পরিজনে ছুঁড়েফেলেদেওয়া, কারখানার ক্যান্টিনের দরজায়, গণিকালয়ের চৌকাঠে, হাট-বাজারের ডাস্টবিনের আশপাশে, গঙ্গার ঘাটে, শ্মশানে, রেললাইনের ধারে, জুয়ার ঠেকে, সমাজবিরোধীদের নেশার আড্ডায় শৈশব কেটেযাওয়ার পর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের/রাজ্যের জেলবন্দী দাগী আসামী, খুনী, ঠগবাজ, চোর, ডাকাত, লুঠেরা, ধর্ষক (বিভিন্নসময় নিজের হাজতবাসের দরুন) থেকে শুরুকরে প্রভাবশালী ও গরাদের বাইরে ঘুরেবেড়ানো দোর্দন্ডপ্রতাপ অপরাধী আর ক্ষমতার শীর্ষপদগুলোয় আসীন কিছু ব্যক্তিবর্গের সান্নিধ্যে কৈশোর-যৌবন অতিবাহিত করেফেলা, মানবিক মূল্যবোধ, সম্পর্কের গুরুত্ব এসবথেকে যোজন দূরত্বেথাকা অমরজিৎ এর জীবনদর্শন হয়ে ওঠে, ১) কাঙ্খিত বিষয় অর্জনের বিনিময়মূল্য না থাকলে শুধুই কেড়ে নিতেহয়, তার জন্য নির্দয়তার চূড়ান্ত, শেষতম বিন্দু পর্যন্ত যাওয়াযায়, তার জন্য যত রক্ত জলের মতো ঝরে ঝরুক, কুছ পরোয়া নেই, কারণ, চাইলে কেউ দেয় না সাধারণতঃ, ২) কোনও পিছুটান এবং শত্রুর শেষ না রাখা,৩) হয় লড়া, নয় মরা, ধরা না পড়া, ৪) নাস্তিকতা ও একমাত্র নিজেকেই ১০০% বিশ্বাসকরা, ৫) কৈশোর শেষহতেচলা, যুবতী, অবিবাহিতা নারী, বিবাহিতা গৃহস্থ/উপার্জনরতা মহিলাদেরকে অপহরণ করেনিয়ে সঙ্গেরাখলে উল্লেখ্য অর্থ, সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির জন্য প্রদত্ত চূড়ান্ত ধার্যসময় অতিক্রান্ত হয়েগেলে, ঘরের লক্ষী পুনরুদ্ধারে দাবীপূরণের উপঢৌকনের থালার তলায় যদি ফৌজদারী/আইনী মদতপুষ্ট বন্দুক-হাতকড়াও থেকেথাকতো তাহলে মাংসের স্বাদপাওয়া ক্ষুধার্ত, রক্তলোভী শ্বাপদকুল যেমন সীমিত খাদ্যবস্তুকে কাড়াকাড়িকরে টেনেছিঁড়ে টুকরোটুকরোকরে খায়, প্রথমে অমরজিৎ-পোষিত সমাজের বিভিন্ন স্তরথেকে উঠেআসা গুন্ডাবাহিনীর হাতে পণবন্দিনীর ঠিক যেন সেইরকম দশাই হতো তারপর তার ব্যবচ্ছিন্ন দেহাংশের সিলকরা পেটিসংগ্রহকরবার স্থানের ঠিকানালেখা কাগজের চিরকূট বা অবস্থাবুঝে কখনও সখনও খন্ড-বিখন্ড শরীরের টুকরোবোঝাই মোড়ককরা প্যাকেটটাই পৌঁছেযেত গণধর্ষিতা এবং নিহতের বাড়ির দরজায় . . প্রভৃতি অমরজিৎ-বৈশিষ্ট্য জেনেফেলে প্রতি পর্বে অত্যন্ত স্থিতধী, মাপা পদক্ষেপ ফেলেও শেষরক্ষা হলো না, অপারেশনে অনেকটা পথ এগিয়েযাওয়া, দুষ্কৃতী দলকর্তার সম্ভাব্য গতিপথ প্রায় সবটুকু আঁচকরতে পেরেওঠা শালিনীর পরিকল্পনা বানচাল হলো, যা ছকে এগিয়ে এযাবৎ আশাতীত সাফল্যও মিলেছে শুধু শেষ বলখানাই ফুলটস পড়েগেছে অমরজিৎ এর ব্যাটে . .

প্রথমার্ধের সমাধা . .

দ্বিতীয়ার্ধের সূচনা . .