পর্ব ২৬: মায়ার দেয়াল (ফ্যামিলি ড্রামা)

prb 26 mayar deyal phyamili drama

লেখক: Professor

ক্যাটাগরি: ফ্যান্টাসি

সিরিজ: মায়ার দেয়াল (ফ্যামেলি ড্রামা)

প্রকাশের সময়:19 Oct 2026

আগের পর্ব: পর্ব ২৫: মায়ার দেয়াল (ফ্যামিলি ড্রামা)

**পর্ব –২৬** :: **গভীর অন্ধকার ও প্রতিশোধের নিঃশব্দ পথ** © সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।

সকালের সোনালী রোদ কক্সবাজারের সমুদ্রের নীল জলরাশি চিরে হোটেলের ভারী কাঁচের জানালার পর্দা ভেদ করে যখন ভেতরের ঘরে এসে পড়ল, তখন সেই বিলাসবহুল স্যুইটটার পরিবেশ ছিল এক চরম স্থবিরতা আর অপরাধবোধের ভারী চাদরে ঢাকা। রাতের সেই বন্য, পৈশাচিক ও নরকীয় যৌনতার তাণ্ডবের পর পুরো ঘরজুড়ে তখন কেবল ক্লান্তির নিঃশ্বাস আর ছড়িয়ে থাকা মদের বোতলের গন্ধ।

রুমের সেই চওড়া বিছানার ওপর আয়ান, আয়শা আর আনন্যা তিনজন মানুষ যেন একাকার হয়ে জট পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তাদের কারো গায়েই কোনো শালীনতার বস্ত্র নেই; ঘামে ভেজা ফর্সা শরীরগুলো একে অপরের ওপর এলিয়ে আছে। রাতভর চলা সেই উগ্র ও নিষিদ্ধ মিলনের ক্লান্তিতে তাদের মুখগুলো কিছুটা ফ্যাকাশে, কিন্তু ঘুমের মধ্যেও তাদের ঠোঁটে লেগে রয়েছে সেই বিকৃত তৃপ্তির রেশ। বিছানার চাদরটা পুরোপুরি রক্ত, কামরস আর ঘামে ভিজে একাকার হয়ে আছে। ঠিক এই নিঃস্তব্ধ ও ভারী পরিবেশের মাঝেই মাস্টার বেডরুমের দরজাটা ক্যাঁচ করে একটু শব্দ করে খুলে গেল।

গত রাতে অতিরিক্ত অ্যালকোহলের প্রভাবে সবার আগে ঘুমাতে যাওয়া আশিক সাহেব ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন। তাঁর মাথাটা তখনো ঝিমঝিম করছে, মুখটা তেতো হয়ে আছে। তিনি গায়ের শার্টের বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে ড্রয়িং রুমের দিকে পা বাড়ালেন। লিভিং স্পেসের এই ছন্নছাড়া ও এলোমেলো অবস্থা দেখে আশিক সাহেবের ভ্রু কুঁচকে গেল। টেবিলে ছড়িয়ে থাকা খালি গ্লাস আর ফ্লোরের এদিক-ওদিক পড়ে থাকা জিনিসপত্র দেখে তিনি বুঝতে পারলেন রাতের নেশাটা বেশ ভালোই মাত্রা ছাড়িয়েছিল।

"আয়ান... আনন্যা? এখনও তোদের ঘুম ভাঙেনি?" আশিক সাহেব গলা কিছুটা উঁচু করে ডাকলেন। কিন্তু ঘর থেকে কোনো উত্তর এল না। একটু অস্বস্তি নিয়ে আশিক সাহেব ড্রয়িং রুম পেরিয়ে সোজা রুমের খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো ভাইবোন মিলে এক বিছানায় ঘুমিয়ে আছে, যেমনটা অনেক সময় ছোটবেলায় হয়ে থাকে।

কিন্তু দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে ভেতরের দিকে তাকাতেই আশিক সাহেবের পা দুটো যেন মাটির সাথে আঠার মতো আটকে গেল। তাঁর মুখের কথা গলায় আটকে গেল, হৃদপিণ্ডটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্পন্দন বন্ধ করে দিল।

সকালের সেই স্পষ্ট আলোয় তাঁর চোখের সামনে যা দৃশ্য ভেসে উঠল, তা মানুষের সমস্ত নৈতিকতা, সামাজিক সংস্কার এবং কল্পনারও বহু দূরে। বিছানার ওপর তাঁর নিজের বৈধ স্ত্রী আয়শা একদম নগ্ন ও অসাড় অবস্থায় তার ছেলে আয়ানের বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। আর ঠিক তাদের পাশেই নিজের মেয়ে আনন্যাও সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে আয়ানের অন্য হাতটি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাদের প্রত্যেকের শরীরের ভঙ্গি এবং চারপাশের দৃশ্য সাক্ষ্য দিচ্ছিল যে রাতের অন্ধকারে এই ঘরের চার দেওয়ালে ঠিক কত বড় এক ভয়ংকর, পৈশাচিক ও অবর্ণনীয় পাপের তাণ্ডব চলেছে।

আশিক সাহেবের সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। তাঁর মাথার ভেতর যেন একটা বজ্রপাত হলো। তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না—যে স্ত্রী তাঁর নিজের ঘরের শরিক, আর যে ছেলে-মেয়ে তাঁর নিজের রক্ত ও ছায়ায় বড় হয়েছে, তারা সবাই মিলে এক অদ্ভুত নরকের গোলকধাঁধায় নিজেদের চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে। আশিক সাহেবের গলা থেকে কোনো আওয়াজ বের হলো না, তিনি শুধু শূন্য দৃষ্টিতে সেই বীভৎস দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।

হাতে ধরা শার্টের বোতামগুলো আলগা হয়ে গেল। তাঁর পা দুটো কাঁপছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তিনি কিছু বলতে চাইলেন—চিৎকার করতে চাইলেন, গালি দিতে চাইলেন, ভেঙে পড়তে চাইলেন—কিন্তু কোনো শব্দই বেরোল না। শুধু বুকের ভিতরটা একটা অদ্ভুত, ঠান্ডা চাপে ভরে গেল।

বিছানার ওপর আয়শা ঘুমের ঘোরে একটু নড়ে উঠলেন। তাঁর হাতটা আয়ানের বুক বেয়ে নিচে নামল, ঘুমন্ত অবস্থাতেই ছেলের লিঙ্গ মুঠোয় নিলেন। আনন্যাও পাশ ফিরে ভাইয়ের বাহু আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সকালের আলোয় তাদের নগ্ন শরীর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—রাতের পাপের সমস্ত চিহ্ন এখন উন্মুক্ত। আশিক সাহেবের চোখের সামনে সবকিছু ঘুরতে শুরু করল। তিনি দরজার ফ্রেম ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেন। গলা থেকে অবশেষে একটা ভাঙা, শুকনো আওয়াজ বেরোল— “আয়শা…”

আশিকের মাথা ঘুরে গেল। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসছিল। তিনি কোনো রকমে নিজের পা দুটো নড়াতে পারলেন। দরজার ফ্রেম ছেড়ে দিয়ে হোঁচট খেতে খেতে আবার নিজের মাস্টার বেডরুমের দিকে হাঁটলেন। হাত দিয়ে দেয়াল ধরে কোনোভাবে বিছানায় গিয়ে লুটিয়ে পড়লেন।

বুকে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কানের পাশে শুধু একটা তীব্র বাজছে—নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ। চোখ বন্ধ করলেই সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে। আয়শার নগ্ন শরীর ছেলের বুকে এলিয়ে থাকা। আনন্যার পা ভাইয়ের রানের ওপর উঠে থাকা। তাদের মুখে সেই তৃপ্ত, নিষিদ্ধ ঘুমের ছাপ।

আশিকের ভিতরে প্রথমে এল রাগ। এমন রাগ যা তিনি জীবনে কখনো অনুভব করেননি। বুকের ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছিল। তারপর ক্রোধ। তারপর একটা ঠান্ডা, বিষাক্ত হিংসা। যে হিংসা শুধু অন্যের ওপর নয়—নিজের ওপরও। তিনি কীভাবে এত বড় অন্ধ ছিলেন? কীভাবে রাতভর ঘুমিয়েছিলেন যখন তার স্ত্রী আর সন্তানেরা এক বিছানায় একে অপরকে নষ্ট করছিল?

আশিকের মুঠি বালিশের ওপর চেপে গেল। নখ চামড়ায় বিঁধে গেল। মনে মনে একটা তীব্র বাসনা জাগল—তাদের শাস্তি দেওয়ার বাসনা। এমন শাস্তি যা এই জঘন্যতম পাপের সমান হবে। এমন কিছু যা এই সম্পর্ককে শুধু ভাঙবে না, পৃথিবী থেকে মুছে দেবে।

তিনি চোখ বুজে মাথা ঘোরাতে লাগলেন। মনে মনে হাজারো পথ ভেসে উঠতে লাগল। কীভাবে এই নিষিদ্ধ সম্পর্কের শেষটা আনবেন। কীভাবে আয়শা, আয়ান আর আনন্যার মধ্যে যে নরক জন্ম নিয়েছে, তাকে চিরতরে পুড়িয়ে ফেলবেন। প্রতিশোধের চিন্তাগুলো তার মাথার ভিতর সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরছিল। কোনোটাই যেন যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না। এত বড় বিশ্বাসঘাতকতার পর সাধারণ কোনো শাস্তি তুচ্ছ মনে হচ্ছিল।

ঘরে নিস্তব্ধতা। শুধু আশিকের ভারী শ্বাসকষ্টের শব্দ। বাইরে সমুদ্রের গর্জন দূর থেকে ভেসে আসছিল, কিন্তু তার কানে সেই শব্দ পৌঁছাচ্ছিল না। তার কানে শুধু একটা কথাই বাজছিল বারবার— এই পাপ এখানেই শেষ হতে হবে। আর এই সম্পর্ক পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারে না।

আশিক সাহেব বিছানায় শুয়ে চোখ খোললেন। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের ভিতর তখন আর শুধু রাগ নেই। সেখানে একটা ঠান্ডা, স্থির সংকল্প জন্ম নিচ্ছে।

তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এই নিষিদ্ধ সম্পর্ককে তিনি মুছে দেবেনই। তারপর তিনি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে যাওয়ার ভান করলেন গতকালের মতোই আর দেখতে চাইলে তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে কিভাবে সে ঘুম থেকে উঠলে তার সামনে কিভাবে চলাফেরা করে।

** সকালের সোনালী রোদ কক্সবাজারের হোটেলের কাঁচের জানালার পর্দা ভেদ করে যখন ঘরে এসে পড়ল সবার আগে ঘুম ভাঙল আয়শা বেগমের। চোখ মেলতেই রাতের সেই পৈশাচিক ও লজ্জাজনক বাস্তবতার স্মৃতি তাঁর মাথায় হুড়মুড় করে ভিড় করল। তিনি মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে আশিক সাহেবের ঘুম ভাঙলে তাদের পুরো পরিবারটার মানসম্মান চিরতরে ধুলোয় মিশে যাবে। আতঙ্কে ও তাড়াহুড়োয় আয়শা বিছানা থেকে দ্রুত লাফিয়ে উঠে বসলেন। তিনি দেখলেন আয়ান আর আনন্যা তখনো পাশাপাশি গভীর ঘুমে অচেতন।

"ওঠো আয়ান অনন্যা! তাড়াতাড়ি উঠে পর বলছি, ওঠ!" আয়শা নিচু কিন্তু অত্যন্ত জরুরি ও কাঁপাগলায় দুজনকে ধাক দিয়ে জাগিয়ে দিলেন। ঘুম জড়ানো চোখে আয়ান ও আনন্যা প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু আয়শার চোখে-মুখে চরম আতঙ্ক দেখে তারা এক ঝটকায় সব বুঝতে পারল। ঘরের ছন্নছাড়া অবস্থা, ছড়িয়ে থাকা নিজেদের বিবস্ত্র শরীর দেখে তাদের ঘুম নিমেষে উবে গেল।

"তাড়াতাড়ি কাপড় পরে নে! তোদের বাবা যেকোনো মুহূর্তে জেগে উঠতে পারে!" আয়শা নিজের শাড়িটা দ্রুত গায়ে জড়াতে জড়াতে ফিসফিস করে নির্দেশ দিলেন।

আয়ান আর আনন্যা কোনো কথা না বাড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের জামাকাপড় পরে ফেলল এবং রুমের সমস্ত এলোমেলো জিনিসপত্র যতটা সম্ভব দ্রুত গুছিয়ে ফেলল। ঠিক যখন তারা পরিবেশটা একটু স্বাভাবিক করে আনল, তখনই মাস্টার বেডরুমের ভেতর থেকে আশিক সাহেবের নড়াচড়ার শব্দ পাওয়া গেল।

আয়শা মুহূর্তের মধ্যে নিজের মুখের সমস্ত ভয় ও উদ্বেগ লুকিয়ে এক স্বাভাবিক ও শান্ত ভাব এনে ফেললেন। তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে মাস্টার বেডরুমের দরজাটা খুললেন। আশিক সাহেব তখন বিছানায় আলসে ভঙ্গিতে হাই তুলতে তুলতে সবেমাত্র চোখ মেলেছেন এমন ভাব করলেন।

আয়শা নরম ও হাসিমুখের গলায় ডেকে বললেন, "কত বেলা হলো, আর কত ঘুমোবে? ওঠো, চা দেবো নাকি বলো? আজ তো সকালে সমুদ্রের ধারে একটু হাঁটার কথা ছিল তারপর আবার আজকে বাড়ি ফিরতে হবে।"

আশিক সাহেব ভান করে আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় সোজা হয়ে বসে বললেন, "উফ, মাথাটা কাল রাতে একটু বেশিই ভারী হয়ে গেছিল। টেরই পাইনি কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।" আর যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাইরের দিক থেকে দেখলে মনে হবে এটি একটি সাধারণ ও সুখী পর্যটক পরিবার, যারা সকালে ঘুম থেকে জেগে নতুন দিনের পরিকল্পনা করছে—যেন রাতের সেই নরকীয় ও লজ্জিত অধ্যায়টি কখনো ঘটেইনি।

সকালের সেই আচ্ছন্ন হাওয়া আর সমুদ্রের পরিচিত নোনা গন্ধের মাঝে হোটেলের স্যুইটটা যেন হঠাৎ করেই অন্য এক পৃথিবীতে রূপ নিল। কয়েক মিনিট আগেও যেখানে রক্তের সমস্ত পবিত্রতা ধুলোয় মিশে এক পৈশাচিক নরক তৈরি হয়েছিল, এখন সেখানে সব কিছু একদম পরিষ্কার, পরিপাটি এবং অদ্ভুত শান্ত।

আশিক সাহেব বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলেন। তাঁর মুখমণ্ডল স্বাভাবিক, চোখে কোনো সংশয়ের বা সন্দেহের ছিটেফোঁটাও নেই। তিনি ড্রয়িং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন, যেখানে আয়শা ইতিমধ্যে হাতে করে গরম চায়ের কাপ নিয়ে হাজির হয়েছেন।

"চা টা আজ দারুন লাগলো," কাপে চুমুক দিয়ে মুচকি হেসে আশিক সাহেব বললেন, "কাল রাতে ওই বিচ-রেস্তোরাঁয় ডিনারের পর আর ঠিকমতো কিচ্ছু মনে নেই। মনে হয় একটু বেশিই ড্রিংক করে ফেলেছিলাম।"

আয়শা এক চিলতে মিষ্টি হাসি মুখে ফুটিয়ে তুলে ড্রয়িং রুমের সোফায় আশিক সাহেবের পাশেই বসলেন। তাঁর বুকের ভেতর তখনো হালকা একটা কাঁপুনি বইছে, কিন্তু বাইরে তিনি নিজেকে পাথরের মতো শক্ত ও স্বাভাবিক রাখলেন। তিনি আলতো করে আশিক সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, " আনন্যা আর আয়ানকেও দেখলাম কাল রাতে বেশ ভালোই জমিয়ে খেয়েছিল। সকালে তো উঠতেই চাচ্ছিল না।"

ঠিক তখনই গেস্ট রুমের দরজা হালকা শব্দ করে খুলে গেল। আয়ান আর আনন্যা বেরিয়ে এল। তাদের চোখেমুখে রাতের সেই বন্য নেশার বিন্দুমাত্র চিহ্নও নেই; বরং তারা নিজেদের বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। আয়ান একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর জিন্স পরে স্বাভাবিক গলায় বলল, "গুড মর্নিং, বাবা। আজ সকালের প্ল্যান কী? ব্রেকফাস্ট করতে কোথায় যাবো?"

আশিক সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন আর ভাবলেন সবাই কত স্বাভাবিক নাটক করে চলেছে তার সামনে! তিনিও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন, "গুড মর্নিং। আজ আর কোথাও হুটহাট দৌড়ঝাঁপ না করে চলো ওই সামুদ্রিক মাছের রেস্তোরাঁটায় ব্রেকফাস্ট সারি, তারপর বিচ ধরে একটু হাঁটাহাঁটি করব। তারপর আমাদের সবার বাড়ি ফেরা!"

আনন্যা আদেশের সুরেই বাবার কথায় সায় দিয়ে মায়ের দিকে এক নজর তাকিয়ে হালকা হাসল। মা-ছেলের সেই চোখের পলকের ইশারা বাইরে থেকে কেউ বোঝার উপায় ছিল না। চারজন মানুষ একসঙ্গে বাইরে যেয়ে ব্রেকফাস্ট করতে শুরু করল, যেন হাসিখুশি এক আদর্শ পরিবারের নিখুঁত ছুটি চলছে। বাইরের দুনিয়ার কাছে তারা এক সুখী ও আধুনিক পরিবার। কিন্তু সেই হাসিমুখ আর স্বাভাবিক কথার আবরণের নিচে চাপা পড়ে রইল এক গভীর, পৈশাচিক ও অবর্ণনীয় গোপন সত্য—যা সময়ের সাথে সাথে তাদের ভেতরের অস্তিত্বকে তিলে তিলে গিলে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।

আশিক সাহেব অত্যন্ত ধীর স্থির ও শান্ত মাথায় সবকিছু গোছাতে লাগলেন। রাতের সেই দুঃস্বপ্ন তাঁর মগজের প্রতিটি কোষে যেন স্থায়ীভাবে আটকে গেছে। তাঁর ভেতরের নীতিবোধ এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে—এই কলঙ্ক, এই পাপকে তিনি কোনোভাবেই নিজ গৃহে ঠাঁই দেবেন না। পৃথিবীর বুক থেকে এই নিষিদ্ধ সম্পর্কের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে ফেলতে হবে।

সমুদ্রের ধারের সেই রেস্তোরাঁয় টেবিল ঘিরে চারজন মানুষ বসে থাকলেও, অদৃশ্য এক বিষাক্ত বাষ্প পুরো পরিবেশটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। চামচ আর প্লেটের টুংটাং শব্দের মাঝে ভেসে আসছিল কৃত্রিম হাসি আর সাধারণ কথাবার্তা। কিন্তু আশিক সাহেবের হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক বরফশীতল স্থিরতা। তিনি খাবারের প্লেট থেকে চোখ তুলে একবার আয়শার দিকে, তারপর ছেলে-মেয়ের দিকে তাকালেন। সবাই কেমন সহজ, কেমন নির্ভাবনায় নাস্তা শেষ করছে। যেন কাল রাতের ঘটনাটা কোনো বিভীষিকা নয়, অতি সাধারণ এক স্বাভাবিকতা। তাদের এই স্বাভাবিকতাই আশিক সাহেবের রক্তের ভেতর জ্বালা ধরিয়ে দিল। তাঁর ভেতরের রাগকে তিনি রূপ দিলেন এক নিঃশব্দ, ঠাণ্ডা পরিকল্পনায়। কোনো চিৎকার নয়, কোনো রক্তাক্ত হট্টগোল নয়—এমন এক শাস্তি যা তাদের অনুশোচনার আগুনে তিলে তিলে পোড়াবে। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে তারা সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে এসে দাঁড়াল। রোদ এখন বেশ চড়া। সাগরের বিশাল ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে তীরের ওপর। আশিক সাহেব একটু পিছিয়ে এসে পকেট থেকে ফোনটা বের করলেন। ডায়াল করলেন তাঁদের পারিবারিক আইনজীবীর নম্বরে। "হ্যালো, আনোয়ার? আমি আশিক বলছি।" আশিক সাহেবের গলা পুরো শান্ত, কিন্তু স্বরে ছিল ইস্পাতের মতো কঠোরতা। "হ্যাঁ, আশিক সাহেব! বলুন, কক্সবাজার থেকে কবে ফিরছেন?" ওপাশ থেকে উত্তর এলো। "আজই ফিরছি। শোনো, জরুরি একটা কাজ আছে। আমার যা কিছু স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আছে—ফ্ল্যাট, ফ্যাক্টরির শেয়ার, ব্যাংক ব্যালেন্স, এমনকি গ্রামের জমি—সবকিছুর একটা ট্রাস্ট ডিড তৈরি করো। আমি আমার এবং আমার পরিবারের সব সদস্যকে ট্রাস্টি থেকে বাদ দিচ্ছি। পুরো সম্পত্তি একটি অনাথ আশ্রম আর দাতব্য ট্রাস্টে দান করা হবে। ডকুমেন্ট আজ সন্ধ্যার মধ্যেই রেডি চাই। আমি পাবনায় ফিরেই সই করব।" ওপাশ থেকে আইনজীবী আনোয়ারের বিস্ময়ভরা গলা শোনা গেল, "বলেন কী আশিক সাহেব! হুট করে এমন সিদ্ধান্ত? ভাবী বা বাচ্চাদের সাথে আলোচনা করেছেন?" "না। আর করার প্রয়োজনও নেই। তুমি কাগজ রেডি রাখো, আমি এসে সরাসরি তোমার চেম্বারে যাব।" ফোনটা পকেটে রেখে আশিক সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর ব্যবসার মূল ভিত্তি, সম্পত্তি আর অর্থের যে অহংকার আয়শা আর ছেলে-মেয়েকে এতদিন অন্ধ করে রেখেছিল, সেই ছায়া তিনি প্রথম আঘাতটা হানলেন। তিনি হেঁটে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের পাশে থামলেন। আয়শা সাগরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, বাতাসের সাথে শাড়ির আঁচল উড়ছিল। "বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেছে," আশিক সাহেব ধীরস্বরে বললেন। "চল, ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলি। আজ রাতের খাবার আমরা নিজেদের ঘরেই খাব।" আয়শা ঘুরেই এক চিলতে কৃত্রিম হাসি হেসে বললেন, "হ্যাঁ, চলো। কাল রাত থেকে মাথাটা ভারী, নিজের ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার।" কক্সবাজারের বিলাসবহুল হোটেলের রৌদ্রোজ্জ্বল ছুটির দিনগুলো ফুরিয়ে আসার পর পরিবারটির নিজ শহর পাবনায় ফেরার পালা শুরু হলো।

…. (চলবে) ……।।