এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ১১

A Little Open Sky 11

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: নন্দিনী ও জাহাঙ্গীরের গল্প - এক মুঠো খোলা আকাশ

প্রকাশের সময়:30 Oct 2026

আগের পর্ব: এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ১০

ওই যে তরু দাঁড়িয়ে আছে পথের বাঁকে একা, সন্ধ্যে হলেই হেঁটে বেড়ায় নিজের চোখেই দেখা..

[[image_1]]

বিকেল থেকেই আবহাওয়া গুমোট হয়ে আছে। একটুও বাতাস দেয়নি প্রকৃতি। সাধারণত এরূপ থমথমে পরিবেশ ঝড়ের পূর্বাভাস হিসেবে গণ্য হয়। নন্দিনীর জীবনেও কি কোনো ঝড় অপেক্ষা করছে? উত্তর সময় দেবে।.. আপাতত নন্দিনী গরমের ঠেলায় স্কুলের লবিতে একটা চেয়ার পেতে বসে ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে। অবসর সময়ে আর কিই বা করবে? কেউ তো নেই।

রাতে নন্দিনীর শোয়ার ব্যবস্থা করতে রিকশায় করে টেবিল ফ্যান, গদি, তোশক, চাদর, বালিশ ইত্যাদি নিয়ে এসেছে রিংকু। ম্যাডামকে আগলানোর জন্য তাকে রেখে জাহাঙ্গীর কিছুক্ষণের জন্য বাড়ি গেছে। রিংকু ম্যাডামের জন্য ফাঁকা ক্লাস রুমটায় রাতের শোয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

নন্দিনীর জন্য যে রুমটা ধার্য করা হয়েছে সেখানে তার আর সুস্মিতার থাকার কথা ছিল। কিন্তু সুস্মিতা তো স্বাধীন পাখি, তাকে কি আর নন্দিনীর মতো খাঁচায় বন্দী করে রাখা যায়! বাইকে চড়ে উড়ে গ্যাছে প্রেমিকের সাথে। এখন নন্দিনীকে একাই থাকতে হবে সেই রুমে। ভাগ্যিস রিংকু ঘরে টেবিল ফ্যান সেট করে দিচ্ছে। নাহলে এই গরমে ওই একটা সিলিং ফ্যান দিয়ে কাজ চলতো না। এতই আস্তে ঘোরে যে রীতিমতো ব্লেডের আবর্তন হাতে গোনা যায়। এমন আদিম জামানার ফ্যান দিয়ে নন্দিনীর শরীরের গরম মিটতো না।

ম্যাডামের শোয়ার ঘর গুছিয়ে দিয়ে রিংকু বেরোনোর তোড়জোড় করছিল। নন্দিনী উপলব্ধি করলো রিংকুর বিদায়ের পর গোটা স্কুলে শুধু সে আর জাহাঙ্গীর থাকবে, আর কেউ না! এটা ভেবেই কেন জানি তার হৃদস্পন্দন ঊর্ধ্বগামী হল। পুলিশগুলোও তো অনেক দূরে ছাউনি পেতে রয়েছে। ডাকলেও সাড়া পাওয়া যাবেনা।

এমনিতেও গ্রামের পুলিশ রাতের বেলা ডিউটি করার নামে রঙিন জল পেটে ঢেলে হয় মাতলামো করে নাহলে উল্টে পড়ে থাকে। তাদের সাহায্য চাইলেও পাওয়া যাবেনা এই ব্যাপারে নন্দিনী নিশ্চিত। তবে শুধু জাহাঙ্গীরের সাথে এই এত বড় বিল্ডিং-এ রাত কাটানোটা কি ঠিক হবে? তাই সে ভাবলো একবার রিংকুকে বলে দেখা যাক, যদি সেও থেকে যায় তাহলে মন্দ হবে না!

"রিংকু, তুমি কি এখন বাড়ি যাচ্ছ?"

"না দিদিমণি। একটু পরে বেরোবো।"

"তা এখানকার কাজ সব শেষ তোমার?"

"হ দিদিমণি! আপনার ঘরটা সুন্দর করে গুছাইয়া দিয়েসি। কোনো অসুবিধা হবেক নাই। আর কোনো দরকার পড়লে ভাইজান তো আছেনই..."

"তা তোমার বাড়ি কি কাছেই?"

"হ তো। স্বরূপদাহ বাজারের কাসে। ওইখান থাইক্যা তো সব নিয়া আইলাম। রমেন দার বাড়িও সেইক্ষাণে।...."

"রমেন দা মানে এই স্কুলের যিনি পিয়ন? দুপুরে যিনি সবাইকে লাঞ্চ সার্ভ করলেন?"

"হঃ হঃ, সেই।.... চিন্তা কইরবেন না, রাতের খাবারও চলে আসতিসে। জাহাঙ্গীর ভাইজান গ্যাসেন আপনার জন্য খাবার আইনতে।"

"জাহাঙ্গীর সেই কারণে বাড়ি গেল?"

"হঃ। উনি বললেন যতক্ষণ না আসতেছেন ততক্ষন যেন আমি এইখ্যান থাইক্যা না নড়ি। আপনাকে পাহাড়া দিতে বলে গ্যাসেন। তাই যাব যাব কইরাও যাইতে পারতাসিনা।" [[image_2]]

"বাঃ বাঃ! জাহাঙ্গীর লোকটা এতটা কেয়ারিং?", মনে মনে নন্দিনী ভাবলো। একটা হালকা মুগ্ধতা জন্মালো। আবার পরক্ষণে তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নন্দিনী রিংকুকে প্রস্তাব দিল স্কুলে থেকে যাওয়ার।

"তা তুমি এখানেই তো আজ থেকে যেতে পারো!"

নন্দিনী ম্যাডামের দেওয়া প্রস্তাব শুনে রিংকু কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। আমতা আমতা করে বললো, "দিদিমণি, বাড়িতে ফুলমণি অপেক্ষা করসে। ওকে কিসু বইল্যা আসিনি জে। আপনার সিন্তা কি, ভাইজান তো থাইকবে আপনার লগে আজঃ.."

"হ্যাঁ, তো তুমিও থেকে যাও, অসুবিধা কি তাতে?"

"বইল্যাম না আপনারে, ফুলমণি আমার পথ চেঁয়ে রয়েসে। ওকে একা ফেইল্যা রয়ে যাই কি কইরা?"

"ফুলমণিটা কে? যাকে তুমি এত মানো!"

"হামার বউ হয় গো!"

"বউ!"

"হ দিদিমণি! কাল ভোট দিতা আইলে আপনার সাথে আলাপ করাবো।"

"তা তোমাদের বুঝি এই সবে বিয়ে হয়েছে? তাই এত বউ পাগল হয়ে উঠেছো? একদণ্ড ওকে ছাড়া থাকা দায়!... বুঝি বুঝি, সব বুঝি। প্রথম প্রথম এসব হয়। সব স্বামীরাই প্রথম দিকে নিজের বউকে চোখে হারায়। ..পরে আস্তে আস্তে বিয়ের সব রং ফিকে হয়ে যায়।"

এই কথা বলে নন্দিনী কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল। অনিকেতের সাথে তার দাম্পত্য জীবনের ছন্দপতনের কথা ভেবে চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল বেরিয়ে এল। সেও রিংকুর মতো প্রথমদিকে এতটাই বউ পাগল ছিল।

"কি হইলো দিদিমণি, আপনি কি কাঁদসেন?"

নন্দিনী নিজের গালের উপর একবার হাত ঘুরিয়ে চোখের জলটা মুছে রিংকুর থেকে আড়াল করে বললো, "না না.. কই... তা তুমি বললে না তো বিয়ে কবে হল?"

"তা... না না কইরা দস বসর.."

"দশ বছর? তুমি তো আমার থেকেও ছোট!"

"হামাদের এইখ্যানে বিহা যলদি হয়া যায়। মাধ্যমিক দিতে না দিত্তে পড়াসুনা লাটে তুইল্যা সংসারের হাল ধইরতে হইলো। তারপর বাড়ি থাইক্যা বিহা দিয়া দিল পাশের বিথারি গেরামের চাঁদ সর্দারের মাইয়্যা ফুলমণি সর্দারের সাথে! সেই থেইক্যা আমি আর ফুলমণি রয়েসি সুখে সংসার বাইধ্যা।"

"তোমাদের কোনো সন্তান নেই?"

"হ, আসে তো। তিনটা। রানি, নন্টে, ফটিক। এক মিয়্যা, দুই ছিলা।"

"মেয়ের নামটা খুব গুছিয়ে রেখেছো তো, রানি।"

"হ, রাইখবো না! উঃ আমার পত্থম সন্তান। মিয়্যা হইসে তো কি, উঃ আমার সবচে আদুরের। তাই আমি আমার নামের পত্থম অক্ষরের সাথে মিলিয়া বেটিটার নাম রাইখ্যাসি। র তে রিংকু, র তে রানি। উঃ কে আমি অনেক বড় কইরবু, মানুষের মতো মানুষ কইরবু। লেখাপইড়া শিখিয়া আপনার মতো দিদিমণি কইরবো। সত্যিই আপনাকে দেইখ্যা মনে বড় ভক্তি আসে। দেবীর মতো আপনি। ফুলমণিটারে বলি তুইও লেইখ্যা পড়া ফের শুরু কর। জুগ পাল্টাইসে, এখন ছিলা মিয়্যা সব সমান। সরকার কি একটা প্রকল্প বাইর করিসে য্যানো, বড় দের লেখা পইড়ার জন্য...."

"উল্লাস স্কিম?"

"হ হ, ঠিক। ওই প্রকল্পে তো বড়রাও পইড়তে পারে সুনেসি!"

[[image_3]] রিংকু ঠিকই বলেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন সাক্ষরতা অভিযান প্রকল্প হল উল্লাস স্কিম! এই প্রকল্পে পনেরো বছরের ঊর্ধ্বে মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের নতুন করে পড়াশুনা শুরুর সহায়তা প্রদান করা হয়। নন্দিনীর স্কুলেও এই স্কিম নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। নন্দিনী সমেত আরো কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে সরকারি আবেদন এসছে তারা যেন ভলিন্টিয়ারিলি এই স্কিমের সাথে যুক্ত হন, এবং গ্রামে গঞ্জে গিয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে আসেন। বিষয়টা এখনও প্রধান শিক্ষকের বিবেচনার অধীনে রয়েছে, ইমপ্লিমেন্ট করেননি তিনি।

এই স্কিমটা তার স্কুল কর্তৃক ইমপ্লিমেন্ট করা হবে কিনা তা জানা নেই তবে রিংকুর তার বউকে এই স্কিমের আন্ডারে পড়ানোর তাগিদ দেখে নন্দিনীর সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। অনেক অভিজাত পরিবারে শিক্ষার আলো পৌঁছলেও স্ত্রী জাতিকে সমান অধিকার ও সম্মান দেওয়ার বোধটা এখনো পুরোপুরি পৌঁছয়নি। উদাহরণ তার নিজের শশুড়বাড়িই। অথচ সুদূর বর্ডার সীমান্তে এই অজ গাঁয়ে এক রিকশাচালক নারী শিক্ষা ও অধিকারের মর্ম বুঝতে পেরেছে।

নন্দিনী ভাবলো কোনোদিনও যদি উল্লাস স্কিম ইমপ্লিমেন্ট করতে বা অন্য কোনো শিক্ষা-সম্বন্ধিত রাজ্যস্তরে প্রকল্পের অধীনে তাকে ফের হাকিমপুর গ্রামে আসতে হয়, তাহলে সে আবার আসবে। অন্য কোনো তাগিদে নাহলেও, এই রিংকুর স্ত্রী ফুলমণির মতো মেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে সে নিশ্চই আসতে চাইবে বারবার ফিরে।

রিংকুর সরলতা ও স্ত্রীয়ের প্রতি ভালোবাসা দেখে নন্দিনী এতটাই প্রভাবিত হয়ে পড়েছিল যে সে আর রিংকুকে জোর করলো না স্কুলে থেকে যেতে। শুধু নির্দেশ দিল কাল যেন সস্ত্রীক তাড়াতাড়ি চলে আসে ভোটটা দিতে। সাথে স্বরূপদাহ বাজারের যত বাসিন্দা রয়েছে তাদেরকেও যেন দায়িত্ব নিয়ে রিংকু ভোট দেওয়াতে নিয়ে আসে। প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে সে চায় এইবারের হাকিমপুর গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচনে যেন হাইয়েস্ট ভোটার টার্নআউট হয়।

নন্দিনী রিংকুকে তক্ষুনি ছুটি দিয়ে দিতে চাইছিল কিন্তু সে বললো যতক্ষণ না ভাইজান আসছেন, সে তার দিদিমণিকে একা ফেলে যাবেনা।.. বলতে না বলতেই স্কুল চত্বরে জাহাঙ্গীর রুবেল হাসানের পুনরায় আগমন ঘটলো। গ্রামের সামান্য এক ভূগোলের টিচার হয়েও দাপট এমন যেন সে-ই পঞ্চায়েত ও গ্রামের প্রধান!

জাহাঙ্গীর নামক এই লোকটা নন্দিনীর কাছে রহস্যের একটা খাদান। দেখা যাক পরবর্তীতে ওই খাদান হতে কোনো রহস্যময় খনিজ পদার্থ বেরিয়ে আসে কিনা!...