ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামী পর্ব ৬

Cancer Affected Husband 6

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: অরুণ রবি ও মনীষা - ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামীর আত্মত্যাগের গল্প

প্রকাশের সময়:26 Mar 2026

আগের পর্ব: ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামী পর্ব ৫

রবি কিন্তু মনীষার ঘরে ঢুকেছিল ওর সাথে রাত্রিযাপন করতে নয়, বালিশটা নিতে। আগের রাতের মতো সে আজকেও ঠিক করেছিল ডাইনিং রুমের সোফায় শোবে। তাই সে নিজের বালিশ নিতে এসেছিল। রবিকে চুপচাপ বালিশ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে মনীষা পিছন থেকে ডেকে রবিকে আটকালো, "দাঁড়াও রবি, কোথায় যাচ্ছ?"

- "আমি কাল যা করেছি, অন্যায় করেছি। তাই কালকের মতো আজকেও আমি ডাইনিং-এই শোবো।"

- "দেখো তুমি কোথায় শোবে সেটা তোমার মর্জি, কিন্তু যাওয়ার আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাও।.. তাছাড়া অরুণ হয়তো এখনো জেগে আছে। আমি চাইনা ওর সামনে কোনোরকমের কমপ্লিকেটেড সিচুয়েশন অ্যারাইভ হোক। তাই আপাতত এখানে এসে বসো।"

মনীষার কথা মতো রবি বালিশ নিয়ে এসে বিছানায় বসলো।

"বলো কি বলবে?", রবি জিজ্ঞাসা করলো।

"কাল তুমি অরুণের কথায় ওসব করেছিলে না?", সোজাসুজি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল মনীষা।

রবি তো হতবাক! মনীষা কি করে জানলো? সেই হঠকারিতায় জিজ্ঞেস করে বসলো, "তুমি কি করে জানলে?"

অর্থাৎ রবি না চাইতেও একপ্রকার স্বীকার করে নিল মনীষার সামনে, যে সে অরুণের কথায় এসব করেছিল কাল।

"সেটা বড় প্রশ্ন নয় রবি। আসল কথাটি হল, আমি যা বলছি সেটা সত্যি কিনা? কাল তুমি অরুণের কথায়-ই আমাকে স্পর্শ করেছিলে, তাই না? সত্যি করে বলো....", মনীষা বেশ দৃপ্ত কণ্ঠে রবির কাছে কৈফিয়ত চাইলো।

- "হুমমঃ!..... কিন্তু তুমি প্লিস অরুণকে ভুল বুঝোনা। ওর দিকটাও ভেবে দেখো।"

- "আমি তো ওর দিকটাই ভেবে দেখতে চাই রবি। আমি জানতে চাই, অরুণ তোমাকে কেন এরকম কাজ করতে বললো? ও তো এরকম ছিলনা! ভীষণ পোসেসিভ ছিল, ভালোবাসতো আমায়।"

- "এখনো বাসে.."

- "তাহলে ও তোমাকে দিয়ে এসব কেন করাতে চাইলো?"

- "আসলে অরুণ তোমাকে আমার সাথে সুখে দেখতে চায়। ও আমাদের দেখে বুঝতে পেরেছিল যে আমরা স্বামী স্ত্রী হিসেবে থাকলেও আমাদের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর মতো কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। সেটা নিয়েই ও কনসার্ন ছিল। অরুণ জানে ওর সময় সীমিত। তাই ও সবকিছুর মধুরেণ সমাপয়েৎ চায়। আমাদের নতুন সম্পর্কের শুভ পরিণতি প্রাপ্তির সাক্ষী থাকতে চায়। দাঁড়িয়ে থেকে দেখে যেতে চায় যে তুমি আমার সাথে একটা নতুন জীবনে প্রবেশ করেছো, তুমি আমাকে তোমার স্বামী হিসেবে সম্পূর্ণভাবে মেনে নিয়েছো।"

- "আমাদের এই চার দেয়ালের ঘরের মধ্যে কি হবে বা হতে পারে সেটা অরুণ বাইরে থেকে জানবে কি করে? ও কিভাবে সাক্ষী থাকতে চায়?"

- "শারীরিকভাবে হয়তো সে উপস্থিত থেকে আমাদের মিলন দেখতে পাবে না, আর দেখা উচিতও নয়, সেটা অরুণ জানে। তাই ও আজ সকালে আমাকে নিজের ঘরে ডেকেছিল এটা জানার জন্য যে কাল রাতে আমার আর তোমার মধ্যে কিছু ঘটেছে কিনা? অরুণ আমাকে বিশ্বাস করে, তাই আমি যা বলবো সেটাই ও সত্য বচন বলে মানবে। আর এইভাবেই ওর সাক্ষী থাকা হবে আমাদের মিলনের। সশরীরে সামনে থেকে না হলেও, একই বাড়িতে উপস্থিত থেকে সেটা অনুভব তো করতে পারবে, বিশেষ করে আমার মুখ থেকে শুনে। সেরকম কিছুই অরুণ ভেবে রেখেছিল।"

- "তা তুমি কি বললে?"

- "যা সত্যি সেটাই বলেছি, যে তুমি আমাকে নিজের ধারের কাছেও ঘেঁষতে দাওনি। তারপর অরুণকে আমি ভালোমতো শুনিয়েও দিয়েছি, সে যাতে আর এরকম উল্টোপাল্টা ধারণা নিজের মনে পোষণ করে না রাখে। মনীষা শুধু অরুণের ছিল, আর অরুণেরই থাকবে। রবি সেন কেউ না.."

- "এসব শুনে ও কি বললো?"

- "সেরকম কিছুই না।"

- "ও কি তোমাকে আবার আমার উপর একটা অ্যাটেম্পট নেওয়ার পরামর্শ দিল?"

- "নাহঃ। ওকে আমি যেভাবে শাসিয়ে দিয়েছি, আর ও চাইলেও এসব কথা বলার সাহস পাবে না। চিন্তা নেই তোমার।"

- "হয়তো চাপে পড়ে পিছিয়ে এসছে, নিজের কথা ফিরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু মনে মনে হয়তো এখনো সে এটাই চায়।"

- "ঠিক বলতে পারবো না। আমি ওর যতই ভালো বন্ধু হই না কেন, তুমি ওর স্ত্রী, তুমি ওর সাথে বেশ কয়েকটা বছর সংসার করে আসছো, ইউ নো হিম বেটার দ্যান মি।"

- "হুমম।.... আচ্ছা, কালকে কি শুধু বন্ধুর কথা রাখতেই তুমি এসব করেছিলে? তোমার নিজেরও কিছু ইচ্ছা জেগেছিল নিশ্চই?"

- "মিথ্যে বলবো না। সত্যি বলতে, হ্যাঁ আমারও বিয়ের পর এখন ইচ্ছা করে তোমায় ছুঁতে। অরুণের কথায় সাহসটা একটু বেড়ে গেছিল এই আর কি। আসলে আমিও তো একজন পুরুষ মানুষ। এই বয়সে আমারও তো কিছু শারীরিক চাহিদা থাকতে পারে। সেই সুপ্ত চাহিদার টানেই হয়তো এত বড় সাহস দেখিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, এরকম ভুল আর দ্বিতীয়বার হবেনা। আমি তোমাকে ততদিন সেইভাবে ছোঁবনা যতদিন না তুমি আমায় অনুমতি দেবে তোমার কাছে আসার।"

- "আর সেই অনুমতি যদি কোনোদিনও না পাও?"

- "যদি তুমি সারাজীবন আমার থেকে দূরে সরে থাকো, তাও আমি তোমার এই হাত ছাড়বো না।"

- "কেন? এই হাত ধরে রাখার কিসের এত দায় তোমার? আমি তো অন্য কারোর...."

- "তোমার সেই অন্য জন-টি আমার প্রিয় বন্ধু। তাকে যে আমি কথা দিয়েছি, তার অবর্তমানে তার পরিবারকে আগলে রাখবো।"

- "শুধু সেই কারণেই?"

- "অন্য কোনো কারণ কি আদেও তুমি আশা করো আমার থেকে?"

মনীষা চুপ করে রইলো। ঘরের মধ্যে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। মনীষাকে নিশ্চুপ দেখে রবি বুঝলো যে আজকের মতো মনীষার সকল কৌতূহল, জিজ্ঞাস্য, এবং কথা সব ফুরিয়েছে। তাই সে আবার নিজের বালিশ নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে লাগলো। অমনি মনীষা আবার রবিকে পিছন থেকে ডাকলো, "দাঁড়াও রবি। তোমাকে আজ কষ্ট করে বাইরে গিয়ে সোফায় শুতে হবে না। তুমি এখানেই ঘুমোও, মাঝখানে ডিসটেন্স রেখে, যেমনটা এতদিন করতে।"

মনীষার কথা শুনে রবির মনে হাজার মাইল বেগে এক দমকা হাওয়া বয়ে গেল। সে প্রচন্ড খুশি হলো এটা ভেবে যে সে আবার মনীষার হারানো বিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। এটা সকলে পারেনা। সবাই বলে বিশ্বাস হলো কাঁচের মতো, একবার ভাঙলে সেটা জোড়া লাগানো যায়না, দাগ থেকেই যায়। আজ ব্যতিক্রম হয়ে দেখালো রবি। তবে সন্দেহের কোনো দাগ কি আর অবশিষ্ট থাকবে? সে তো সত্যিই অপরাধী নয়। সেদিক থেকে বলতে গেলে অপরাধী কেউই নয়, অরুণও নয়। 

অরুণ আজকেও পরীকে ঘুম পাড়িয়ে নিজের বালিশে হেলান দিয়ে বই পড়ছিল। আজকে সে ঘুমের ওষুধ খায়নি। কারণ এখন আর অরুণের বিশেষ কোনো স্ট্রেস নেই। কারণ সংসার নিয়ে মনীষার দর্শন কি তার সম্পর্কে প্রায় স্পষ্ট ধারণা সে আজ রবির মাধ্যমে পেয়েছে। অগত্যা মনীষা তারই থাকবে। রবিও কথা দিয়েছে নিঃস্বার্থ ভাবে আজীবন তার পরিবারের পাশেই থাকবে। তাই সে রোজ রোজ ঘুমের ওষুধ খাওয়ার অভ্যাসটা এখন থেকে ত্যাগ করবে।

বই পড়তে পড়তে সে মনীষার কথাই ভাবছিল। চোখ ছিল বইয়ের পাতায়, মন ছিল মনীষার কাছে। ভাবছিল কি করে মনীষাকে এই মিথ্যে বিয়ে থেকে বের করে আনবে? মনীষা কবে এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে?

অরুণ এবার চাইছিল জীবনের শেষ কয়েকটা দিন সে মনীষাকে নিয়ে ভালোভাবে স্বামী স্ত্রীর মতো কাটাবে, আবার আগের মতো। কিন্তু সেটা যে এখন আর এত সহজ কার্য ছিলনা। মনীষা তার বিয়ে করা একমাত্র বউ হতে পারে, কিন্তু তার হাতের পুতুল নয়। যখন চাইলো ডিভোর্স দিয়ে অন্য কারোর সাথে বিয়ে করতে বাধ্য করালো, আবার যখন চাইলো সেই বিয়ে ভাঙিয়ে পুনরায় তাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনলো। এইভাবে সবকিছু নিজের মনমর্জি অনুযায়ী চলতে পারেনা। অরুণ ক্যান্সার আক্রান্ত একজন রোগী হতে পারে কিন্তু তাই বলে তার সব আবদার-কে শেষ ইচ্ছে বলে মেনে নেওয়া যায়না।

ওদিকে মনীষা ও রবি যথা নিয়মে একে অপরের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে শুয়ে পড়লো। গতরাতে রবির সোফায় ঠিকমতো ঘুম হয়নি, তার উপর সারাটা দিন তার কেটেছে অন্তর্দ্বন্দ্বে, নিজের মনের সাথে। অরুণের কথা মেনে তার মনীষার কাছে যাওয়া কি উচিত ছিল? সে তো মনীষার চোখে সেই জন্য এত ছোট হয়ে গেল! সারাটা দিন তার চিন্তায় চিন্তায় কেটেছে, কিভাবে সে মনীষাকে রাতে ফেস করবে এটা ভেবে।..

এইসবের জন্যে রবির শরীর ও মনের উপর অনেক ধকল গেছিল। তাই সে বিছানায় শুতেই ঘুমের দেশে পাড়ি দিল। কিন্তু অরুণের মতো মনীষারও আজ ঘুম আসছিল না। পার্থক্য ছিল শুধু এটাই যে অরুণ ভাবছিল মনীষার কথা আর মনীষা ভাবছিল রবির কথা। কি কথা?

রবি কিছুক্ষণ আগে যে কথা গুলো প্রতিশ্রুতির আকারে মনীষাকে বললো, সেই কথা। রবি কখনো মনীষা ও পরীকে ছেড়ে যাবে না। সবসময়ে তাদের পাশে থাকবে, তা মনীষা রবিকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করুক বা না করুক। এইসব কথা শুনলে কোন মেয়েরই না মন গলে? যদি সে দেখে কেউ নিঃস্বার্থ ভাবে তার পাশে রয়েছে, তাও আবার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে! বদলে কি মনীষার সত্যি কিছু দেওয়ার নেই? মনীষা সেটা নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করলো মনে মনে।

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সে অনুভব করলো রবির হাতটা তার পেটের উপর এসে পড়েছে। আসলে রবি আজ অকাতরে ঘুমোচ্ছে। তাই সে তাদের মাঝখানের সেই ডিসটেন্সটা মেইনটেইন করে রাখতে পারেনি। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে ছড়িয়ে শুতে গিয়ে সে অজান্তেই মনীষার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।

রবি ঘুমের মধ্যে মনীষাকে পাশবালিশ ভেবে জড়িয়ে ধরেছিল। মনীষার শরীর অবশ্য বালিশের থেকেও কোমল এবং আরামদায়ক, তাই রবি সেই মানুষরূপী কোলবালিশ-টি কে আরো শক্ত করে জাপটে ধরলো। মনীষা এখন রবির হস্ত বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আজকে মনীষা রবিকে আর ভুল বোঝেনি। সে বুঝেছে যে রবি ঘুমের ঘোরে তাকে কোলবালিশ ভেবে জড়িয়ে ধরেছে। রবির প্রতি হঠাৎ দয়ালু হয়ে ওঠা মনীষা তাকে জাগিয়ে তুলে তার ঘুম নষ্ট করতে চাইলো না। তাই সে রবির বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করারও চেষ্টা করলো না। উল্টে নিজের কমফোর্টের জন্য মনীষা নিজের হাতটা রবির পিঠে আলতো করে রেখে দিল।

এবার সত্যি সত্যিই তাদের দেখে মনে হচ্ছিল প্রকৃত স্বামী স্ত্রী, যারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রয়েছে। এরপর খুব তাড়াতাড়ি মনীষারও ঘুম পেয়ে গেল। সে ঘুমিয়ে পড়লো রবির হস্তযুগলের ঘেরাটোপে। রবির শরীরের তাপের সান্নিধ্যেই হয়তো মনীষার তাড়াতাড়ি ঘুম চলে এসছিল। মনীষা যে বহুদিন অরুণের আদুরে স্পর্শ পায়নি। আর অরুণ ছাড়া ওর জীবনে অন্য কোনো পুরুষও ছিলনা যে ওর শরীরে ভালোবাসাময় উত্তাপের সঞ্চার ঘটাবে, ওকে দিবা নিশি আরাম দেবে।

পাশের ঘরে অরুণেরও চোখ লেগে এল। সে বইটা পাশের টেবিলে রেখে দিয়ে মাথাটা বালিশে দিল। ঠিক করলো কালকে সে মনীষার সাথে কথা বলবে। তাকে আবার ফিরিয়ে আনবে নিজের কাছে। কিন্তু এখন যে অরুণের অজান্তেই তার মনীষা পাশের ঘরে রবিকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিল! নতুন বসন্তে নতুন পৌরুষে পরশ পাওয়ার পর সে কি আর অতীত ও প্রাক্তনের কাছে ফিরে যাবে? যতই সে নিষ্ঠাবতী নারী হোক না কেন!..