ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামী পর্ব ৭

Cancer Affected Husband 7

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: অরুণ রবি ও মনীষা - ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামীর আত্মত্যাগের গল্প

প্রকাশের সময়:28 Mar 2026

আগের পর্ব: ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামী পর্ব ৬

পরের দিন সকাল হল। রবি ও মনীষার একসাথে ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভেঙে তারা একে অপরকে নিজেদের অতীব নিকটবস্থায় পেল। কিছুক্ষণ তারা ওইভাবেই রইলো, হয়তো ঘোর কাটেনি তখনো। তারপর তারা একে অপরের আঁটোসাঁটো বন্ধন হতে নিজেদের মুক্ত করলো। রাতে ঘুমের মধ্যে পরস্পরকে এমনভাবে জাপটে ধরেছিল যেন একে অপরকে ছাড়া বাঁচা দায়। রবির জীবনে কেউ নেই। মনীষাও জানে খুব শীঘ্রই সে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারাতে চলেছে। সে এখন মানসিকভাবে প্রস্তুত এই ভবিতব্য মেনে নিতে।

আজকে অরুণ বরং কিছুটা আগে উঠে পড়েছিল, বা বলা ভালো আজ রবি ও মনীষার ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়েছিল। অনেকদিন পর ওদের ভালো ঘুম হয়েছে একে অপরের সংস্পর্শে এসে। অরুণ ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে মনীষার ঘরের দরজা এখনো বন্ধ। খানিকটা অবাকই হয় সে। মনীষার তো উঠতে কখনো দেরি হয়না। রবিও বা কি করছে এতক্ষণ ধরে? ওরও কি এখনো ঘুম ভাঙেনি? ব্যাপারটা ভারি অদ্ভুত তো! 

অরুণ তখন কি করবে ভেবে না পেয়ে ডাইনিং রুমের সোফায় বসে সকাল সকাল টিভি চালিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর মনীষা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। দেখলো অরুণ সোফায় বসে টিভি দেখছে।

- "ওহঃ, তুমি উঠে গেছ!.. সরি, আজকে একটু দেরি হয়ে গেল। দাঁড়াও তোমার খাবার বানিয়ে আনছি।"

- "নাঃ নাঃ মনীষা, ঠিক আছে। তোমাকে অত তাড়াহুড়ো করতে হবে না। তুমি নিশ্চিন্তে আগে ফ্রেশ হও, তারপর ধীরে সুস্থে খাবার বানিয়ো। আচ্ছা রবি কোথায়? ও এখনো ওঠেনি?"

"উঠেছে, ঘরেই আছে..", বলে মনীষা আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো। তার এখন ফ্রেশ হওয়ার সময় নেই। অরুণ যাই বলুক, সে জানে সে আজ দেরি করেই উঠেছে। তাই তাকে আগে রান্নাঘরে ব্রেকফাস্ট বানানোর কাজটা সারতে হবে। নিজের দিকে নজর দেওয়ার সময় নেই।

মনীষা কেন তার নির্দেশ না শুনে ওয়াশরুমের বদলে রান্নাঘরে গেল তা নিয়ে অরুণ একদমই ভাবায়িত হলনা। এরকম ছোটখাটো অবাধ্যতা সংসারের প্রয়োজনে আকছার মনীষা করে থাকে। সংসারটা তার, সে অরুণের চেয়ে ভালো বোঝে পরিস্থিতি অনুযায়ী কোন কাজটা আগে প্রাধান্য দিতে হবে, কোনটা পরে।

অরুণের মনে তখন মনীষা ও রবির বিয়েটা নিয়ে হাজার চিন্তা ভিড় করছিল। নাহঃ! সে সন্দেহ করছিলনা ওদের। সে তার স্ত্রী ও বন্ধুর উপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখে। তবুও মনের ঈশান কোণে কিছু প্রশ্নের উদয় ঘটছে। দুজনেরই আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হল? যদি তা নাও হয়, যদি আগেই রবি উঠে গিয়ে থাকে তাহলে ওই বা এতক্ষণ বেরোয়নি কেন?

ভাবতে না ভাবতেই অরুণ দেখলো রবি মনীষার ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। অরুণকে দেখা মাত্রই রবি ওকে "গুড মর্নিং" বললো। অরুণও প্রত্যুত্তরে একই শুভেচ্ছা জানালো। তারপর রবি অরুণের সামনে দিয়েই রান্নাঘরে প্রবেশ করলো যেখানে মনীষা বাড়ির সকলের জন্য খাবার তৈরি করছিল। সে মনীষাকে রান্নাঘরে টুকিটাকি হেল্প করতে লাগলো। মাঝে মাঝে দুজনের মধ্যে দু-চারটে স্বাভাবিক কথা হচ্ছিল।

কিন্তু এই স্বাভাবিক জিনিসটা অরুণের দেখতে ভালো লাগছিল না। অরুণের হালকা হালকা জেলাস ফীল হতে শুরু করলো। সুস্থ থাকতেও সে কখনোই মনীষাকে সংসারের কাজে হেল্প করেনি, যা আজকাল-কার দিনে যেকোনো কোঅপারেটিভ হাসব্যান্ড করে থাকে। মনীষা যে ছোট ছোট সাহায্য গুলো অরুণের কাছ থেকে কোনোদিন পায়নি, যেটা নিয়ে মনীষা কখনো অভিযোগও করেনি কিন্তু এক্সপেক্ট করতো, সে সব আজ রবি ওকে প্রোভাইড করছে। যেটা রবির প্রতি অরুণের মনে জেলাসি এবং মনীষার মনে সম্মান বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

অরুণের এসব দেখে নিজেকে খুব হেল্পলেস মনে হতে লাগলো। এরকম নিরামিষ সহযোগিতা দেখে সে কিছু বলতেও পারছিল না, আবার এসব দেখে হজমও করতে পাচ্ছে না। রবির মনে মনীষাকে নিয়ে তখন কোনো পাপ বা দুরভিসন্ধি ছিলনা, তাই অরুণের সামনেই সে খুব সহজভাবে মনীষার সাথে মিশতে পারছিল। মনীষাও তালে তাল দিয়ে রবির সাথে ভালোমতো আচরণ করছিল। কোনো দেখনদারি নয়, নিখাদ নিরামিষ মেলামেশা। তাই মাঝে মাঝে হাসি খুনসুটিও হচ্ছিল ওদের মধ্যে, যা আবার অরুণের চোখে অসহ্য হয়ে উঠছিল।

এই তো কয়েকদিন আগে সে নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে দুজনের চার হাত এক করেছিল। সে তো এটাই দেখতে চেয়েছিল যে মনীষা রবির সাথে স্বাভাবিক ভাবে মেলা মেশা করছে। কারণ তার মৃত্যুর পর মনীষাকে তো রবির সাথেই থাকতে হবে। তাহলে আজ কেন এত কষ্ট হচ্ছে? এর উত্তর হল, এক্সপেকটেশন। যখন রবির মুখ থেকে অরুণ শুনলো মনীষা রবিকে দৃপ্ত ও আপোষহীন ভাবে বহিস্কার করেছে শুধু মাত্র তার প্রথম স্বামী অরুণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার জন্য, তখন যেন অরুণ নতুন করে আবার মনীষার প্রেমে পড়ে গেল। সে মনীষাকে নিয়ে নতুন করে আশা বাঁধতে শুরু করলো।

যে অরুণ জীবনের সব মায়া ত্যাগ করে উঠেছিল, সেই অরুণই এখন "আনন্দ সিনেমার রাজেশ খান্নার" মতো নিজের জীবনের শেষ কয়েকটা মুহূর্ত প্রাণবন্তভাবে বাঁচতে চাইছে, তার মনীষার সাথে। বলতে চাইছে, "জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে বাবুমশাই, লাম্বি নেহি..", যার অর্থ জীবন আকাশের মতো সীমাহীন বড় হওয়া উচিত, সমুদ্রের মতো দীর্ঘ ও গভীর নাহলেও চলবে।

অরুণের নিজের উপর গর্ববোধ হতে শুরু হয়েছিল, মনীষার মতো সুন্দরী মেয়ের মনে নিজের একাধিপত্য স্থাপনের কারণে। রবি তার চেয়ে দেখতে তুলনামূলকভাবে সুন্দর হতে পারে, অর্থনৈতিক দিকে দিয়ে ধনী হতে পারে, হয়তো সবদিক দিয়েই অরুণের চেয়ে হাজার গুন সেরা ও সফল মানুষ সে, কিন্তু অরুণের ভালোবাসার সামনে সবকিছু ফেল।

অরুণের এই গর্বই যে কখন অহংকারের রূপ নিল সেটা সে ধরতে পারেনি। সে ধরেই নিয়েছে, যাই হয়ে যাক না কেন, সে নিজে যাই স্বেচ্ছাচারিতা করুক না কেন মনীষা তার ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষকে মন দেওয়া তো দূরের কথা, চোখ তুলে তাকাবে না পর্যন্ত। কিন্তু তার এই ওভার-কনফিডেন্সের কারণে সব সমীকরণ ওলটপালট হতে শুরু করেনি তো?

ঘরের বাইরে থেকে অরুণ ও রবির মধ্যেকার সব কথা মনীষার শুনে নেওয়া, রবি ও মনীষার মধ্যে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটে যাওয়া, মনীষার মনে রবির জন্য হঠাৎ সম্মান বেড়ে যাওয়া, এক নতুন সম্পর্ক বা সমীকরণের জন্ম দিতে চলেছে কিনা সেটা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে।... 

অরুণের আর ভালো লাগছিল না ডাইনিং রুমে বসে বসে ওদের সংসার ধর্ম পালনের সাক্ষী হতে। নিজেকে বাড়তি এবং বড্ড বেশি তৃতীয় ব্যক্তি মনে হচ্ছিল। সে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। পরীকে ঘুম থেকে তুলতে লাগলো। রোজ এই কাজটা মনীষা করে থাকে আজ না হয় সে করলো। এমনিতে এখন মনীষার কাজে রবি অনেক নাক গলাচ্ছে তাহলে সে-ই বা কেন পিছিয়ে থাকবে? রবিকে মনে মনে অরুণ শেষমেশ নিজের প্রতিযোগী এবং প্রতিপক্ষ মানতে শুরু করে দেবে সেটা কল্পনাতীত ছিল।

অরুণ পরীকে ঘুম থেকে তুললো। ততক্ষণে মনীষা খাবার রেডি করে নিয়ে এসছে অরুণের ঘরে। সে অরুণকে খাবার দিল। তারপর চুপচাপ পরীকে নিয়ে চলে গেল ওর মুখ হাত ধোয়াতে।

..মনীষা ফিরেও তাকালো না! এত তাড়া ওর? আমি কি ওর জীবনে এখন বোঝা হয়েগেছি?.. - অরুণের এটা ভেবে খুব খারাপ লাগলো।

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর রবি পরীকে নিয়ে খেলছিল। মনীষা ও রবি শুধু রাতের বেলা একসাথে থাকে। বাকি সময়টা তাদের মধ্যে একটা অঘোষিত লাইন অফ কন্ট্রোল রেখা বজায় থাকে, যার নাম অরুণ রায়। মনীষা ওয়াশিং মেশিন থেকে কাচা কাপড় জামা গুলো তুলে ব্যালকনিতে মেল ছিল। অরুণ সকাল থেকে সুযোগ খুঁজছিল মনীষাকে একা পাওয়ার। সেই সুযোগটা তখন সে পেয়ে যায়।

অরুণ ব্যালকনিতে গিয়ে পেছন থেকে মনীষার হাতটা চেপে ধরলো। মনীষা চমকে উঠলো। পিছন ফিরে দেখে, অরুণ। ওকে টেনে নিয়ে গেল নিজের ঘরে।

- "অরুণ, কি করছো কি? ছাড়ো আমার হাতটা! আমাকে এভাবে টানতে টানতে কেন নিয়ে এলে? ব্যালকনিতে এত ভেজা জামা কাপড় পড়ে রয়েছে, সেগুলো মেলতে হবে তো.."

- "ওসব পরে করবে, আগে তুমি আমার কথা শোনো।"

অরুণকে খুব ডেসপারেট দেখাচ্ছিল।

- "কি কথা?"

"আমি তোমাকে চাই ......", এই বলে অরুণ মনীষাকে জড়িয়ে ধরতে গেল। মনীষা হতচকিত হল! সে সঙ্গে সঙ্গে অরুণের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বললো, "তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? এসব কি করছো তুমি?"

- "কেন মনীষা? তুমি এরকম করছো কেন? আমি তোমার স্বামী, সত্যিকারের স্বামী!"

- "তাই? তাহলে তোমার মতে আমার নকল স্বামী কে? রবি?"

- "হ্যাঁ, রবিই। ও একটা সাজানো স্বামী, আমিই তোমার জীবনের আসল পুরুষ।"

অরুণের কথা শুনে তিতিবিরক্ত হয়ে মনীষা বললো, "তুমি কি ভাবো আমায়? খেলনার পুতুল? যখন চাইবে দূরে ঠেলে দেবে, যখন চাইবে কাছে টেনে নেবে?"

- "নাহঃ মনীষা, আমি সেরকম ভাবিনা। আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভালোবাসি বলেই তোমার আবার বিয়ে দিয়েছিলাম, তোমার সুখের কথা ভেবে। আজ যখন বুঝতে পারছি তুমি সুখে নেই, রবিকে তুমি মেনে নিতে পারছো না, তখন তাই তোমাকে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতে চাইছি।"

- "একটা সত্যি কথা বলবে অরুণ?"

- "একটা নয় হাজারটা বলবো তোমার জন্য। বলো কি জানতে চাও?...."

- "তুমি আর কত পরীক্ষা নেবে আমার? যখন তুমি আমায় ডিভোর্স দিয়ে বাধ্য করালে রবিকে বিয়ে করতে তখনো তুমি একবারও আমার কথা শোনোনি। নিজের সিদ্ধান্ত শুধু আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছিলে। আজকেও তুমি আমার মতামত জানার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা করছো না। দেখে আমি অবাক হচ্ছি!"

- "আমি তো জানি এখন তোমার কি মত। তুমি রবির সাথে থাকতে চাওনা। তাই তো?.. আমি সেদিন ভুল ছিলাম, আজ তো আমি ঠিক।"

- "সেদিনের মতো আজকেও তুমি ভুল অরুণ।...."

- "মানে?"

- "মানে সেদিন আমি তোমাকে ছেড়ে রবিকে বিয়ে করতে চাইনি, কিন্তু তুমি আমার কোনো কথা শোনোনি। আর আজ যখন আমি আমার এই পোড়া কপালটা-কে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি তুমি আবার আমাকে এক অগ্নিপরীক্ষার সামনে ঠেলে দিচ্ছ।.."

- "সেই অগ্নিপরীক্ষাটা যাতে আর না দিতে হয় তাই জন্যই তো আবার তোমায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।"

- "তুমি ভুল বুঝছো অরুণ। অগ্নিপরীক্ষাটা আমায় রবিকে দিতে হচ্ছেনা, তোমাকে দিতে হচ্ছে, বারে বারে। তুমিই নিচ্ছ আমার অগ্নিপরীক্ষা।.."

- "তোমার কথার মানে তো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না মনীষা! তুমি এক্সাক্টলি কি মিন করতে চাইছো? প্লিস খুলে বলো।"

- "দেখো অরুণ, তুমি আর আমি দুজনেই এই কঠিন সত্যটা এখন জানি যে তুমি আর কয়েকদিনের অতিথি মাত্র। তারপর? তোমার যাওয়ার পর আমার কি হবে? সর্বোপরি আমাদের মেয়েটার কি হবে? আজ যদি আমি রবিকে ছেড়ে আবার তোমার কাছে ফিরে আসি, তাহলে রবির উপর দিয়ে কি যাবে? ও কি ভাববে? তুমি চলে যাওয়ার পর তখন তো রবি অভিমান করে আমার ও পরীর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেই পারে। রবি আমার থেকে কিছু এক্সপেক্ট করেনা, কিন্তু আমি বুঝি ও আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। ভালো না বাসলে শুধুমাত্র তোমার সাথে ওর বন্ধুত্বের টানে নিজের জীবনের এত বড়ো স্যাক্রিফাইস ও করতো না, সেটা মেয়ে হয়ে আমি ভালোই বুঝতে পারি।"

- "কিসের স্যাক্রিফাইস? কি স্যাক্রিফাইস করেছে ও তোমার জন্য?"

- "ওর চাহিদা। হ্যাঁ অরুণ, আমি ঠিক বলছি। ওর সাথে বিয়ের পর থেকে আমি এখনো অবধি ওকে শুধু রিফিউস করে এসছি। ও তাও সবকিছু মেনে নিয়েছে। তোমার কথায় যখন পরশু রাতে ও আমায় স্পর্শ করতে এসছিল, তখন আমি ওকে যা নয় তাই বলে অপমান করেছি, সেটাও ও মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছে।"

"মনীষা! তুমি তাহলে জানো যে আমিই ...... " , অরুণের কথা আটকে গেল। সে বুঝতে পেরেছিল মনীষার কাছে সে ধরা পড়েছে।

মনীষাও তখন দৃপ্ত কণ্ঠে বললো, "হ্যাঁ আমি জানি অরুণ, যে এই ঘৃণ্য কাজের জন্য রবিকে প্রশ্রয় তুমিই দিয়েছিলে। কাল সকালে তোমার খাবার নিয়ে আসার সময় ঘরের বাইরে থেকে তোমাদের সব কথা আমি শুনেছি। আমি মিছি মিছি রবিকে ভুল বুঝেছিলাম। আসল কলকাঠিটা তো তুমিই নেড়েছিলে। তাই নয় কি মিস্টার অরুণ রায়?"

মনীষার সামনে অরুণ ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগলো। লিট্রিয়ালি পায়ে পড়ে কাকুতি মিনতি করছিল। অরুণের অসুস্থতার কথা ভেবে মনীষা আগে তাকে কিছুটা স্বাভাবিক হতে বললো। এই অবস্থায় এখন আর অরুণের উপর মনীষার রাগ বা অভিমান কোনোটাই হয়না। এই জন্য নয় যে অরুণের প্রতি তার ভালোবাসার ঘাটতি পড়েছে, রবি সেখানে ভাগ বসিয়েছে। নাহঃ! সেরকম কিছু নয়।

আসলে মনীষা এখন আগের থেকে অনেক বেশি কঠিন। শক্ত মনে মেনে নিয়েছে নিজের ভবিতব্যটা-কে। একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখতে চায়না। শুধু করুণা হচ্ছিল অরুণকে দেখে।

তবুও মনীষা নিক্ষেপ করলো বাক্যবাণ অরুণের দিকে, "এরপরও তুমি আশা করো আমি তোমার কাছে আবার ফিরে আসবো? কোন মুখে বলো সেই কথা, মিস্টার রায়!"

- "আমার মাথার ঠিক ছিলনা, বিশ্বাস করো। আমি তাই রবিকে এধরণের আলটপকা উপদেশ দিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু যা বলেছিলাম বা ভেবেছিলাম তা শুধু তোমার ভালো চেয়ে।.."

- "এখনো তাহলে সেটাই চাও। আমাকে ভালো থাকতে দাও ........... (কিছুটা থেমে) রবির সাথে।"

মনীষা নিজের কথার মাঝখানে একটা লম্বা বিরতি নিয়ে রবির নামটা বললো। তা শুনে অরুণের পায়ের নিচ থেকে জমি সরে গেল, মাথার উপরে পড়লো বাজ। মনীষাকে নিয়ে তার সকল অহংকার টুকরো টুকরো আকারে দর্পচূর্ণ হয়ে গেল।

অরুণ এর উত্তরে কি বলবে বুঝে পাচ্ছিল না। অরুণের এই করুণ অবস্থা দেখে মনীষা অরুণকে বোঝানোর চেষ্টা করলো তার কথার অন্তর্নিহিত অর্থ।

- "দেখো অরুণ, আমি অনেক ভেবেছি। ভাবার পর এই সিদ্ধান্তে এসছি। তুমিই ঠিক ছিলে। সত্যিই তো, তোমার অবর্তমানে আমাদের কি হবে? আমার মতো অবলা নারীকে তো সমাজ চিলে শকুনের মতো ছিঁড়ে খাবে। আমার, বিশেষ করে আমার মেয়ের তো একটা শেল্টার দরকার। সে তার পিতার অবর্তমানে পিতৃ পরিচয়টা নিয়ে হয়তো বাঁচতে পারবে, কিন্তু পিতৃসম ভরসা কোথা থেকে পাবে? যেখানে তার মা নিজেও একজন আশ্রয়হীন মহিলা হয়ে পড়বে, যার নিজস্ব কোনো চাকরি-বাকরি নেই, বাড়ির লোকেদের সাথে সুসম্পর্ক নেই। সেরূপ অবস্থায় আমি আমার মেয়েকে নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠবো?"

"কিন্তু রবি তো বলেছে, সেই আশ্রয়টা সে এমনিতেও প্রদান করবে!", ভগ্ন হৃদয়ে ভঙ্গুর গলায় কোনোমতে আওয়াজ বার করে বলে উঠলো অরুণ।

- "আমি জানি। কিন্তু কি বলোতো, প্রতিটা মানুষের একটা ধৈর্যের সীমা থাকে। সেটা পেরিয়ে গেলে মানুষটা একটা বাঁধ ভাঙা নদীর মতো হয়ে যায়। তখন সে নিজের সাথে সাথে সবাইকে ডুবিয়ে নিয়ে চলে যায়। আমি রবিকে বলেছি ঠিকই যে আমি অনুমতি না দিলে রবি যেন আমাকে স্পর্শ না করে। ও কথাও দিয়েছে করবে না স্পর্শ। কিন্তু আমিই বা কতদিন ওকে অনুমতি না দিয়ে থাকতে পারবো বলো তো? আমার কাছ থেকে বারংবার প্রত্যাখ্যান পেতে পেতে ও যদি হাঁফিয়ে ওঠে? ওর যদি এই সম্পর্কটা-তে দমবন্ধ হয়ে আসে? চায় মুক্ত হতে? তখন? আমি তো ওকে এই ধরণের অন্যায় শর্ত দিয়ে বেঁধে রাখতে পারবো না। তুমিই বলো না ওর কি দোষ? ও কেন বৈবাহিক সম্পর্কের সবধরণের সুখ থেকে বঞ্চিত হবে? ছেলে হিসেবে ও যথেষ্ট যোগ্য যেকোনো মেয়ের ভালোবাসা পাওয়ার। তাহলে তাকে কেন আমি বঞ্চিত করে রাখবো, তুমি বলতে পারো অরুণ? একবার বিষয়টা ম্যাচিউরড্লি ভাবে ভেবে দেখো।"

মনীষার কথা শুনে অরুণ বিছানায় বসে পড়লো, তারপর ওকে জিজ্ঞেস করলো, "তাহলে তুমি কি চাও মনীষা?"

মনীষা তখন অরুণের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, "লক্ষীটি সোনা, আমায় প্লিস তুমি ভুল বুঝোনা। এবার আমিই তোমাকে বলছি একটু বাস্তব দিকটা ভেবে দেখতে। আমি যদি ওকে ছেড়ে এখন তোমার কাছে আসি, ও অপমানিত বোধ করবে না? মুখে হয়তো কিছু বলবে না কিন্তু ওর মনে তো একটা দাগ কেটে যাবে সারাজীবনের জন্য! আমি না মানলেও সে যে আমাকে নিজের স্ত্রী মানতে শুরু করে দিয়েছে। আর তুমি চলে যাওয়ার পর আমাকে তো আমার মেয়েকে নিয়ে ওর সাথেই থাকতে হবে। আর যে অন্য কোনো উপায় নেই। তাছাড়া ও তো কোনো ফেলনা নয়। আমাদের দিক থেকে যখন গোটা সমাজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল তখন ওই আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এবার আমাদেরও উচিত ওকে ওর প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দেওয়ার।"

- "প্রাপ্য! কি প্রাপ্য?"

- "তুমি যে তোমার এই সবচেয়ে প্রিয় উপহারটা মানে আমাকে তুমি ওর হাতে সঁপে দিয়েছো তা তুমি আর ফিরিয়ে নিয়ো না ওর থেকে। দোহাই তোমার। করো না ওকে ওর প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। না পেলে যে ওর খুব কষ্ট হবে।.."

- "আর আমার কষ্টটা? সেটার কি হবে?"

- "তোমার কষ্টটা লাঘবের জন্য আমাকে কি প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে?.. সেটা বলো।"

"আমার সাথে থাকতে হবে", মনীষার হাতটা চেপে ধরলো অরুণ।

- "বাচ্চা ছেলের মতো জেদ করেনা। তুমি তোমার পুতুলটা তোমার বন্ধুকে দিয়ে দিয়েছো। কাউকে দেওয়া জিনিস কি কখনো ফিরিয়ে নিতে আছে সোনা?"

অরুণ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর সে যা বললো তার প্রভাব মনীষার উপর হিরোশিমা নাগাসাকি পরমাণু বিস্ফোরণের থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর ছিল।

অরুণ বললো, "বেশ, ঠিক আছে। আমি তোমার কথা মেনে নিলাম। আমি আর এই পুতুলটা রবির থেকে ফিরিয়ে নেব না। বদলে আমার একটা শর্ত আছে?"

- "কি শর্ত?.."

- "আমি দেখতে চাই রবি এই পুতুলটার কতটা যত্ন নিতে পারে। কতটা ভালোবাসতে পারে আমার মনীষাকে, সেটা নিজের চোখে দেখে সাক্ষী থাকতে চাই।"

- "মানে?"

- "মানে তোমাকে যদি রবির কাছে সমর্পিত হতেই হয়, তাহলে সেটা আজ থেকেই হতে হবে। আমি মারা যাওয়ার আগে তোমাকে রবির সন্তানের মা হতে হবে। তাহলে কেউ তোমার চরিত্রে দাগ লাগাতে পারবে না। সবাই ভাববে সন্তানটা আমার। মারা যাওয়ার আগে আমি আরো একবার বাবা হয়েছি। তোমার আর রবির বিয়েটা তো আমি অনেক গোপনে দিয়েছি। তাই বাইরের জগতে সবাই জানে তুমি এখনো আমারই পুতুল, মানে স্ত্রী। ইভেন আমাদের মেয়েটাও তাই জানে। আর মেয়েটা এটাও জানবে যে তার ভাই বা বোন যেই আসুক না কেন সেটা তার নিজের, সৎ ভাই বোন নয়। নাহলে বড় হয়ে অনেক কমপ্লিকেশন সৃষ্টি হবে দুই সিবলিং-এর মধ্যে। এদিকে রবিও সারাজীবন তোমার প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে কারণ তুমি ওর এক সন্তানের মা হবে। তাই সে চাইলেও নিজের দায়িত্বটা-কে কোনোদিন ঝেড়ে ফেলতে পারবে না।"

অরুণের হয়েছিল এখন বিনাশ কালে বিপরীত বুদ্ধি। অরুণের কথা শুনে মনীষা পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! এদিকে অরুণের অকাট্য যুক্তির সামনে সে কিছু বলতেও পারছে না। কারণ টেকনিক্যালি অরুণ যা যা বলছিল তা সবই যুক্তিসম্মত। কিন্তু মনীষা যে এখুনি এইসবের জন্য তৈরি নয়। তবুও ফের একবার সে অরুণের কাছে হার স্বীকার করলো। চাপে পড়ে বলতে বাধ্য হল যে সে অরুণের এই প্রস্তাবটা ভেবে দেখবে। কিন্তু মনীষার কাছে হাতে এখন অনেক কম সময়। সিদ্ধান্ত তাকে আজ রাতের মধ্যেই নিতে হবে।