অরুণের শর্ত শুনে মনীষা থ মেরে গেছিল। অরুণের ঘর থেকে বেরিয়ে ফের ব্যালকনিতে এসে ভেজা কাপড় জামা গুলো মেলতে লাগলো। মন ছিল একেবারে অন্যমনস্ক।
পরীকে পড়তে বসিয়ে রবি নিজের ঘর থেকে বেরোলো। আন্দাজ করতে পেরেছিল কিছু একটা হয়েছে মনীষা ও অরুণের মধ্যে। সে তখন মনীষাকে খুঁজতে লাগলো। দেখলো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে।
পিছনে এসে রবি দাঁড়ালো, "কি হয়েছে?"
রবির আওয়াজ শুনে মনীষা আঁখির জল মুছলো। এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে রবিকে দেখা মাত্রই তাকে জড়িয়ে ধরলো মনীষা। চোখ দিয়ে বিনা মেঘে অঝোরে বৃষ্টি নামছিল। সেই বৃষ্টিতে দেহ মন সব ভিজে যাচ্ছিল। নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। বড় একা হয়ে পড়েছিল যে। তাই সে একটি ছায়া খুঁজছিল। যা সে পেল রবিকে আলিঙ্গন করে, ওকে জড়িয়ে ধরে।
"কি হয়েছে মনীষা? কাঁদছো কেন?", রবিও মনীষাকে আঁকড়ে ধরে মাথায় আদর করে হাত বোলাতে বোলাতে জিজ্ঞেস করলো।
"আমি আর বাঁচতে চাইনা রবি! এই দ্বন্দ্ব নিয়ে আর পারছিনা থাকতে। হাঁফিয়ে উঠেছি জীবনের পরীক্ষা দিতে দিতে", কাঁদতে কাঁদতে মনীষা বলে উঠলো।
রবি বোঝানোর মতো করে নরম গলায় বললো, "এরকম বললে চলে? আমি যে মনীষাকে চিনি সে তো এত সহজে হেরে যাওয়ার মেয়ে নয়। সি ইস আ ফাইটার।.. তুমি কত ঝড় ঝাপটা সামলেছো। বাড়ির অমতে গিয়ে পালিয়ে অরুণকে বিয়ে করেছো, ওর সাথে গুছিয়ে সংসার করেছো। পরীকে জন্ম দিয়ে মা হয়েছো। অরুণের এই কঠিন সময়ে আদর্শ স্ত্রী হয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়েছ, এখনো রয়েছো। তাছাড়া তোমার সব লড়াইয়ে আমি তো ছিলাম তোমার পাশে, এখনো আছি, আজীবন থাকবো। তুমি ভয় পাচ্ছ কেন?"
- "সত্যি? সত্যিই তুমি এভাবেই আমার পাশে থাকবে? যেকোনো পরিস্থিতিতেই?"
- "তোমায় আগেও এই কথা দিয়েছি, এখনো দিচ্ছি। দরকার পড়লে আমার কাছ থেকে লিখিয়ে নাও তুমি, আমার এই কথার কোনো নড়চড় হবে না।"
- "কিন্তু অরুণ যে আবার আমাকে আরেকটা অগ্নিপরীক্ষার দিকে ঠেলে দিচ্ছে! এখন আমি কি করি?"
- "ও কি আবার কোনো নতুন শর্ত দিয়েছে তোমাকে?"
- "হ্যাঁ...."
- "আমি ঠিক আন্দাজ করেছিলাম। যখন অরুণের ঘর থেকে তোমাদের আওয়াজ ভেসে আসছিল আমার কানে, তখুনি বুঝেছি কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। তাই তো পরীকে পড়তে বসিয়ে তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে ব্যালকনিতে এলাম। বলো, ওই পাগলটা নতুন কি বায়না ধরেছে?"
মনীষা চুপ করে রইলো। কিছু বলতে পারছিল না লজ্জায়। ফের রবি জিজ্ঞেস করলো মনীষাকে। এভাবে দু-তিনবার জোর করায় মনীষা অবশেষে নিজের মুখ খুললো।
"অরুণ চায়.....", মনীষা হেসিটেট করছিল বলতে।
রবি খানিকটা জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "হ্যাঁ, কি চায় বলো?...."
"ও চায় আমি তোমার সন্তানের মা হই", এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলেই মনীষা তৎক্ষণাৎ হাত দিয়ে মুখ ঢাকলো লজ্জায়।
রবির কাছে এই কথাটা খুব একটা আনএক্সপেক্টেড ছিলনা। যে অরুণ তাকে মনীষার দিকে ঠেলে দেয় যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতে, তার কাছ থেকে এরকম আবদারই প্রত্যাশিত। তবে রবি তখন মনীষাকে এর জবাবে কি বলবে সেটা ভেবে পাচ্ছিল না। সে তো মনীষার প্রতি আকৃষ্টই। কিন্তু মনীষা? সে তো এখনো অন্ধকারেই রয়েছে, জানেই না কি চায় নিজে? ক্রমাগত মনের সাথে যুদ্ধ করে চলেছে মেয়েটা।
অনেক ভেবে চিন্তে রবি বললো, "হুমমঃ!.. বুঝলাম।.."
"কি বুঝলে?", মনীষা জিজ্ঞেস করলো।
- "এই যে, অরুণ ডেসপারেট হয়ে উঠেছে আমাদের-কে এক করতে। তাই এক হওয়ার প্রমাণ সে দেখে যেতে চায়, তোমায় আমার দ্বারা গর্ভবতী করে। যতই আমি বলিনা কেন তোমার আর পরীর সব দায়িত্ব আমি সারাজীবন নেব, ওর মনে একটা সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। ভাবছে, তোমার কাছ থেকে স্বামী হিসেবে কোনো সাড়া না পেয়ে যদি আমি সব ছেড়ে চলে যাই! তাই ও চাইছে আমাকে তোমার একটি সন্তানের বায়োলজিক্যাল বাবা বানিয়ে সারাজীবনের জন্য বেঁধে রাখতে।.."
"আচ্ছা, অরুণের এই আশংকার মধ্যে কি খানিকটা হলেও সত্যতার ছোঁয়া আছে? আমি যদি কোনোদিনও তোমার কাছে নিজেকে সমর্পণ না করি তাহলে তুমি কি.....?", বলেই মনীষা থেমে গেল।
- "তুমি কি আমায় এই চিনেছো? আই এম ম্যান অফ মাই ওয়ার্ডস। অরুণ যখন আমাদের বিয়ে দিল তখুনি আমি অরুণকে কথা দিয়েছিলাম যে তার স্ত্রী ও কন্যাকে আমি সবসময়ে নিজের জান দিয়ে আগলে রাখবো। তখন কিন্তু আমি তোমার কাছ থেকে স্বামী হিসেবে কোনো আশা রেখে এই কথা দিইনি। হ্যাঁ, পুরুষ হিসেবে আমার কখনো কখনো তোমায় দেখে সাময়িক উত্তেজনা হতে পারে, কারণ তুমি অত্যন্ত লাস্যময়ী সুন্দরী এক নারী। কিন্তু তাও দেখো, আমি ঠিক নিজেকে সামলে রাখবো। কখনোই আমাদের এই সম্পর্কের সীমা লঙ্ঘন করবো না।"
"এসব কি তুমি শুধুই বন্ধুত্বের খাতিরে করছো? নাকি ....?" , আবার মাঝপথে মনীষা থেমে গেল। আসলে খুব হেসিটেট ফীল করছিল এসব ইন ডেপ্থ প্রশ্ন রবিকে করতে। তবে মনীষার এই অসম্পূর্ণ প্রশ্ন গুলো ক্র্যাক করতে রবির বেশি সময় লাগছিল না। সে খুব বুদ্ধিমান ছেলে।
রবি এর কোনো উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে বললো, "তোমার কি মনে হয় মনীষা?"
"জানিনা", মনীষা নিচু স্বরে বললো।
- "আমিও ঠিক জানিনা। তবে হ্যাঁ, সত্যি বলতে তোমার প্রতি আমার এক্সপেকটেশন অল্প হলেও জন্মেছে।"
- "কিই!"
- "আমি তোমার কাছে কিছু লুকোতে চাইনা। সবসময়ে চেষ্টা করি তোমার কাছে জলের মতো ট্রান্সপারেন্ট থাকার। আমি তোমায় জোর করছি না। শুধু এইটুকু বলে রাখলাম যে, সত্যিই আমার মনে তোমায় নিয়ে এখন কিছুটা হলেও প্রত্যাশার উদয় ঘটেছে।"
- "কি ধরণের?"
রবি মাথা নিচু করে রইলো।
- "বলো রবি, কি ধরণের এক্সপেকটেশন জন্মেছে তোমার মনে আমার প্রতি?"
- "যে চাহিদা একজন স্বামীর থাকে তার স্ত্রীয়ের প্রতি.. বেশ কিছুদিন একসাথে এক ঘরে থাকতে থাকতে সেটা হওয়াটাই স্বাভাবিক নয় কি?.. প্লিস রাগ করোনা। আমি তোমায় কিছু করার জন্য না এখন জোর করছি না ভবিষ্যতে করবো। তোমার অনুমতি ছাড়া তোমাকে স্পর্শ পর্যন্ত করবো না। আজকে যখন এই নিয়ে কথা উঠলোই, যখন আবার অরুণ এধরণের ইচ্ছা প্রকাশ করলোই, তখন মনে হলো আমার মনোভাবটা তোমার কাছে স্পষ্ট করে দেওয়াটাই শ্রেয়। বাকি যা কিছু সব নির্ভর করছে তোমার একান্ত ইচ্ছের উপর। তুমি যা চাইবে সেটাই হবে। যা বলবে সেটাই শেষ কথা। তোমার সকল সিদ্ধান্ত আমি মাথা পেতে নেব।"
গভীর চিন্তায় মগ্ন হল মনীষা। রবিকে আপাতত সেখান থেকে যেতে বললো। একটু একা থাকতে চায় সে। একান্তে ভাবতে চায় সবকিছু নিয়ে। মনীষার কথা মেনে রবি নিজের ঘরে ফিরে গেল যেখানে পরী পড়াশুনো করছিল।
একা মনীষা ব্যালকনিতে ভিজে কাপড় জামা গুলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে যাওয়া দুই পুরুষের বলা কথা গুলো মন মস্তিষ্কে বারে বারে রিওয়াইন্ড করে চিন্তনে বিশ্লেষণ করছিল।
এই ভিজে কাপড় গুলো হয়তো আজকে আর শুকোবে না। মেঘ ঘনিয়ে এসছে। আকাশ কালো। ডাক ডাক গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ হচ্ছে, বজ্রপাতের আগে যেরকম হয়। এই বিবরণ কি পরিবেশের আবহাওয়ার কথা নাকি মনীষার মনের আবহাওয়ার?....
সেদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর মনীষা অরুণের ঘরে গেল ওর সাথে শেষবারের মতো বোঝাপড়া সারতে। অন্তিম বারের মতো বোঝাতে, এবং জিজ্ঞেস করতেও যে অরুণ তাকে যা করার আদেশ দিয়েছে, সেটা ভেবেচিন্তেই তো? এরপর ফেরার কোনো পথ থাকবে না। শরীরের সাথে সাথে মনটাও চিরকালের মতো অরুণের থেকে রবির কাছে চলে যাবে। কারণ প্রেমহীন যৌনতা হল পতিতাবৃত্তির লক্ষণ। মনীষা আর যাই হোক বারবিলাসিনী নয়।
- "অরুণ, তুমি দুপুরে যে শর্তটা দিয়েছো, সেটা নিয়ে একবারও ভেবে দেখেছো? এর পরিণাম কতোটা মারাত্মক হতে পারে! তুমি সহ্য করতে পারবে যদি আমি রবিকে ভালোবাসতে শুরু করি?"
- "আমি কেবল তোমার গর্ভে ওর সন্তানধারণ করতে বলেছি.."
- "কিন্তু আমি তো কোনো যন্ত্র নই যে তুমি ইন্সট্রাক্শন দিলে আর আমি চোখ বুজে সেটা ফলো করতে শুরু করবো! রক্ত মাংসের মানুষ আমি, জন্ম মৃত্যু সংসার সবই অকৃত্রিম আমার। তাই হৃদয়ের অনুপস্থিতিতে কেবলমাত্র সন্তান প্রসবের তাড়নায় কারোর সাথে জোরপূর্বক মিলন আমার পক্ষে অসম্ভব।"
- "তুমি কি রবিকে ভালোবাসতে চাইছো? তারই অনুমতি চাই তোমার?"
- "ভালোবাসা কারোর ইচ্ছা মতো হয়না, মানুষ এমনিই ভালোবেসে ফেলে। তার জন্য অনুমতিরও প্রয়োজন নেই। আমি তোমাকে সাবধান করতে এসেছি, তুমি যদি আমার আর রবির মিলন মনে প্রাণে দেখতে চাও, তাহলে সেই মিলনের ফলস্বরূপ শুধু নতুন জীবনের সৃষ্টি হবেনা, তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই জ্বলজ্যান্ত মানুষটাও সেই মিলনসঙ্গীর হয়ে যাবে।"
- "তুমি তো ফিরতে চাইলে না আমার কাছে।.."
- "আমি তোমার থেকে শারীরিক বিচ্ছেদের অনুমতি চেয়েছিলাম, অন্তরের নয়। কিন্তু তুমি এমন একটা শর্ত দিয়ে বসলে যে জীবিত থাকতেই তোমাকে আমায় ভুলে যেতে হবে।"
- "নতুন কেউ এলে বুঝি পুরোনো-কে ভুলে যেতে হয়?"
- "তা নয়। আমি চিন্তিত তোমার অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যকুলতা দেখে। কখনো আমায় আঁকড়ে ধরছো, তো পরক্ষণেই অন্য পুরুষের সন্তানের মা হতে বলছো। আমি এই দোলাচলের অংশীদার হতে রাজি নই। রবিকে যদি এক্ষুনি আমার শরীর দিতে হয়, তাহলে মনটাও দিতে হবে, তোমায় সম্পূর্ণ ভাবে ভুলে গিয়ে। তার জন্য কি তুমি প্রস্তুত?"
- "আমি তো বলেছিলাম আমার কাছে ফিরে আসতে.... ফিরতে চাইলে না বলেই তো...."
- "হ্যাঁ, ঠিক! দুপুরে তুমি প্রথমে আমায় নিজের কাছে ফেরাতে চাইলে। আমি কেন ফিরতে পারবো না সেটা তোমায় বুঝিয়েও বললাম। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে আমি এক্ষুনি রবির হয়ে যাব! তাও আবার তুমি জীবিত থাকতে! সেটা কখনো সম্ভব? একসাথে না থাকলেও আমি তোমাকে ভালোবাসি অরুণ, সারাজীবন তুমি আমার প্রথম ভালোবাসার পুরুষ হয়েই থাকবে। আমার মন থেকে কেউ তোমায় মুছতে পারবে না।.."
- "তবে?"
- "তবে আমি অপারগ। এখনকার এই পিকিউলিয়ার পরিস্থিতিতে আমার পক্ষে আগের মতো করে তোমার কাছে পূর্ণাঙ্গ রূপে ফিরে আসা সম্ভব নয়। সেটা তোমাকে বোঝানোরও চেষ্টা করেছি। তাও তুমি আমায় ভুল বুঝে অভিমান করে আমার উপর এরকম অদ্ভুত শর্ত আরোপ করলে, কেন?"
- "আমি তোমার উপর কোনো অভিমান করিনি। যা বলেছি ভেবে চিন্তেই বলেছি। তুমি যদি পুরোপুরি আমার না হতে পারো, তাহলে রবির হয়ে যাও। তুমি ঠিকই বলেছো। শরীর থাকবে রবির কাছে, আর মন আমার কাছে, এটা হয়না। এভাবে দোটানার মধ্যে নিজেকে আর রেখো না। আসলে রবির কাছ থেকে যখন শুনলাম পরশু রাতে তুমি রবিকে আমার জন্য প্রত্যাখ্যান করেছো, তখন মনটা হঠাৎ করে খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। ইচ্ছে হল আবার তোমাকে ফিরে পেতে। তাই আজ শেষ চেষ্টা করেছি, তোমার উপর অহেতুক জোর খাটিয়ে। কিন্তু যখন বুঝলাম তুমি পূর্ণভাবে আমার কাছে ফিরে আসতে পারবে না, তখন রবিই পাক সবটা। এভাবে আর আমাদের দুজনের মধ্যে পেন্ডুলামের মতো ঝুলে থেকো না, তাতে তোমারই মানসিক অশান্তি বাড়বে বৈ কমবে না।"
পরী তখনো ঘুমোয়নি। সরল মনে হঠাৎ তার মা-কে জিজ্ঞেস করে বসলো, "মা, আজকে কি তুমি আমাদের সাথে শোবে?"
মেয়ের দিকে মনীষা করুণ চোখে তাকিয়ে জবাব দিল, "নাহঃ সোনা, আজ তা হওয়ার নয়। হয়তো আর কোনোদিনই তা হবে না। তোমার বাবা-ই ফেরার সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে।"
- "কোথায় বন্ধ করেছে? তুমি কি stupid! ওই তো ঘরের দরজা খোলা রয়েছে, ওখান দিয়েই তো তুমি ঘরের মধ্যে ঢুকে এলে।"
চাপা কান্নার ঝলকানিতে মনীষার গলা ভারী হয়ে উঠলো। মেয়ের এই সরল কথা গুলোর কি জবাব দেবে তা বুঝে পাচ্ছিলো না। পরীর কাছে গিয়ে আদর করে বললো, "হ্যাঁ সোনা, তুমি ঠিকই বলেছো। তোমার মা খুব stupid একটা মেয়ে। নাহলে তোমার মা এরকম সিচুয়েশনে কখনো পড়ে নাকি? আসলে তোমার মা সবসময়ে অন্যের ইচ্ছেটা-কেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসছে। গুড গার্ল হয়ে সব কথা মেনে নিয়েছে। তাই তোমার মা এত কষ্ট পাচ্ছে।"
এই বলে মনীষা কেঁদে ফেললো। ছোট্ট পরী নিজের মায়ের চোখের জল মুছতে মুছতে বললো, "মা, তুমি তো বলো সবসময়ে গুড গার্ল হয়ে থাকতে। সবার কথা মেনে চলতে। তাহলে তুমি গুড গার্ল হয়েও এত কাঁদছো কেন? গুড গার্ল হওয়াটা কি খারাপ?"
মনীষা নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, "নাহঃ সোনা, গুড গার্ল হওয়াটা একদমই খারাপ নয়। আসলে তোমার মায়ের সমস্যাটা অন্য জায়গায়।.. তুমি তো এখন খুব ছোট তাই এসব তুমি বুঝবে না। কে জানে, অনিচ্ছাকৃত ভাবে হলেও এ সকল অনৈতিক কার্য সাধনের দরুন পরবর্তীতে হয়তো তুমিই আমায় দোষারোপ করবে, ঘৃণা জন্মাবে আমার প্রতি। তা যদি হয়ও তবু বিশ্বাস করি যে একদিন না একদিন ঠিক তুমি আমার অবস্থাটা বুঝবে। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, তোমার জীবনটা যেন আমার মতো চক্রব্যূহে ঘেরা না হয়।"
কথাগুলো সে পরীকে বলছিল ঠিকই, কিন্তু শোনাচ্ছিল অরুণকে। নতমস্তক অবস্থায় চুপ করে দাঁড়িয়েছিল অরুণ। বেচারি শিশুটি বুঝলোই না ওর মা ঠিক কোন অশনি সংকেতের আভাস দিল? শুধু এইটুকু বুঝলো যে আজকেও তার মা রবি আংকেলের সাথে শোবে, রবি আংকেল-কে "ঘুম পাড়ানোর জন্য"।
পরীর ঘরের দরজা তার মায়ের জন্য খোলা থাকলেও তার "Stupid মা" তার সাথে ঘুমোতে আসতে পারবে না। বাবা এক অদৃশ্য "নো এন্ট্রি" বোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে তার মায়ের সামনে।
বেশ কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে একটা অদ্ভুত নিঃস্তব্ধতা ছেয়ে রইলো। পরী মনমরা হয়ে শুয়ে পড়েছিল, কিন্তু ঘুমোয়নি। মনীষা আশা করছিল একবার, অন্তত একবার অরুণ তাকে আটকানোর চেষ্টা করবে। নিজের ভুলটা বুঝে নিয়ে আদেশ করবে মনীষাকে এই পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে। মনীষা চাতক পাখির মতো অরুণের দিকে চেয়ে রইলো, একটা শেষ আশা নিয়ে।
মনীষা বারংবার অরুণকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো যে সে কি সত্যি চায় তার জীবিত অবস্থায় মনীষা অন্য এক পুরুষের সাথে স্ত্রী-সুলভ আচরণ করুক? যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হোক?.. কিন্তু অরুণের কাছ থেকে আর কোনো মৌখিক প্রতিক্রিয়া না পেয়ে মনীষা ধরে নিতে বাধ্য হলো, "মৌনং সম্মতি লক্ষনম্"।.. অরুণ চায় মনীষার মনটাও রবির হয়ে যাক, সারাজীবনের মতো।
সে খুব ক্ষুব্ধ হলো অরুণের প্রতি। যাকে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো সেই অরুণ আজ মৌনভাবে মেনে নিচ্ছিলো তার অন্য কারোর হয়ে যাওয়াটা। তাই সে রাগের মাথায় তক্ষুনি অরুণের সামনে রবিকে ডাকলো। মনীষার ডাক শুনে রবি তৎক্ষণাৎ হাজির।
মনীষা ইচ্ছে করে অরুণের সামনে রবিকে জড়িয়ে ধরে বললো, "চলো রবি, ঘরে চলো। সারাদিন অনেক ধকল গ্যাছে তোমার। ইউ ডিজার্ভ বেস্ট রিফ্রেশমেন্ট।.. আজকের রাতটা তোমার জীবনের সেরা রাত হতে চলেছে। কথা দিচ্ছি, তোমাকে আজ আমি ঘুমোতেই দেব না।"
দাঁতে দাঁত চেপে জোর করে এই কথা গুলো রবিকে সে বললো। রাগে তার বোধ বুদ্ধি সব লোপ পেয়েছিল। খেয়াল ছিলনা তার ছোট্ট মেয়েও সেখানে উপস্থিত, এবং সবটা শুয়ে শুয়ে দেখছে। পরীর সামনেই পরীর মা রবি আংকেলের হাত শক্ত করে চেপে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। পেছন থেকে পরী বিছানায় উঠে বসে ডাকলো, "মা.... তুমি কোথায় যাচ্ছ?"
মেয়ের ডাক শুনে একবারের জন্য মনীষার পা থমকে গেল। একবার পিছন ফিরে মেয়ের দিকে তাকালো, বললো, "সোনা, আমি রবি আংকেলের সাথে একটা জরুরি কাজ করতে যাচ্ছি। কাজটা তোমার বাবা-ই আমায় করতে দিয়েছে। তাই আজ সারারাত রবি আংকেলের সাথে আমি ব্যস্ত থাকবো। তুমি লক্ষ্মী মেয়ের মতো শুয়ে পড়ো, কেমন। কাল সকালে আবার দেখা হবে। আমি আসি....।"
এই বলে মনীষা আর পেছন ফিরে তাকালো না। তার চোখ দিয়ে দু' ফোঁটা জল বেরিয়ে এল তবুও সে নিজের পা-কে থামালো না। রবির হাত ধরে সটান ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। একবারের জন্যও আর অরুণের দিকে তাকিয়ে নিজের মনকে দুর্বল করলো না।
এভাবেই মনীষা অরুণের ঘর তথা জীবন ছেড়ে রবির সাথে নতুন ঘর ও জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল, তাই আর পিছন ফিরে মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই।