ইন্দ্রাণী (পর্ব -৭)

Indrani 7

লেখক: Subha007

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

প্রকাশের সময়:17 Aug 2026

ইন্দ্রাণী কাঁদতে কাঁদতেই বললো, “বাপির ব্রেনে টিউমার আছে। অনেকদিন আগেই ধরা পড়েছে। কিন্তু পয়সার অভাবে ভালো করে চিকিৎসা করতে পারছিলাম না। কিন্তু আজ বিকেলেই হঠাৎ অবস্থা খুব খারাপ হতে শুরু করলো বাপির। তাই বাপিকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। এখন ডাক্তার বলছে তাড়াতাড়ি একটা অপারেশন করাতে হবে বাপিকে। এদিকে আমার কাছে তো অপারেশন করানোর মতো এতো টাকা নেই! কিন্তু অপারেশন না করলে বাপিকে মনে হয় বাঁচাতে পারবো না। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।” ইন্দ্রাণী কান্নায় ভেঙে পড়লো এবার।

আমি ফোনের মধ্যেই ব্যস্ত হয়ে বললাম, “তোমায় কিচ্ছু চিন্তা করতে হবে না ইন্দ্রাণী। আমি এখনি আসছি, আমি থাকতে তোমার বাপির কিচ্ছু হবে না। যা করার সব ব্যবস্থা করবো আমি। তুমি কোথায় আছো শুধু বলো এটুকু।

ইন্দ্রাণী মনে হয় একটা আশার আলো পেলো আমার কথা শুনে। ইন্দ্রাণী কান্না ভেজা গলাতেই বললো, “সিটি হাসপাতাল।”

আমি দৃঢ় গলায় ইন্দ্রাণীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, “ঠিক আছে, তুমি আর একটু অপেক্ষা করো ইন্দ্রাণী। আমি এখনই আসছি ওখানে। তোমার বাবাকে অনেক ভালো হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা করাবো আমি।

ফোনটা কেটেই আমি লতিকা দিকে বললাম, “আজ তোমার বাড়ি যেতে একটু দেরি হবে লতিকা দি। আমাকে এখনই হাসপাতাল যেতে হবে। অবশ্য শ্রীপর্ণাকে আমি বলে দিচ্ছি, ও আটটার মধ্যেই চলে আসবে বাড়িতে। তুমি প্লীজ ততক্ষণ বুবাইকে একটু দেখে রাখো। শ্রীপর্না এসে গেলে তবেই বাড়ি যেও তুমি।

লতিকা দি সম্মতি জানালো আমার কথায়। আমি তখন এক মুহূর্তও দেরি করলাম না। ছুটে বাইরে বেরিয়ে আসলাম আমি। তারপর সঙ্গে সঙ্গে আমার পার্সোনাল গাড়ি বের করে ছুটলাম সিটি হসপিটালের দিকে। মাঝে ড্রাইভ করতে করতেই শ্রীপর্ণাকে ফোন করে সবটা বললাম আমি। শ্রীপর্ণা বললো, “ঠিক আছে, তুমি যাও। আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসছি আজকে। বাড়িতে আমিই সামলে নেবো বাকিটা।” আমিও নিশ্চিন্ত মনে ড্রাইভ করতে লাগলাম শ্রীপর্ণার কথা শুনে।

হাসপাতালে পৌঁছেই প্রথমে ইন্দ্রাণীকে খুঁজতে লাগলাম আমি। বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হলো না আমায়, কেবিনেই বসে ছিল ইন্দ্রাণী। পাশেই একজন মাঝবয়স্কা ভদ্রমহিলা। বুঝলাম, ওটাই ওর মা। আমাকে দেখেই ইন্দ্রাণী ছুটে এলো আমার দিকে। আমি বললাম, “তোমার বাপি কি অবস্থায় আছে?”

ইন্দ্রাণী জলভরা চোখে বললো, “বাপিকে এখন জেনারেল বেডে রেখেছে। টাকা দিলে তবে অপারেশন শুরু হবে।"

আমি ইন্দ্রাণীর হাত শক্ত করে ধরে বললাম, “এখানে টাকা দিতে হবে না, তোমার বাপিকে এখানে রাখবো না। বরং এর থেকে ভালো কোনো জায়গায় অপারেশন করানো ভালো হবে ওনার জন্য। তুমি এসো, এখনই তোমার বাপিকে ডিসচার্জ করতে হবে।"

ইন্দ্রাণী আমার কথার ওপর কোনো কথা বললো না। আমরা তখনই কাউন্টারে গিয়ে ওর বাপিকে ডিসচার্জ করিয়ে আনলাম। এর মধ্যেই ভালোই বিল হয়ে গেছিলো ওদের। আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পুরো বিল মিটিয়ে দিলাম। তারপর ওখান থেকেই একটা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ইন্দ্রাণীর বাবাকে তুলে দিয়ে ওর মাকে বললাম ওনার সাথে থাকতে। ইন্দ্রাণীর মাও যেন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছিলো। উনি আমার কথামত অ্যাম্বুলেন্সে উঠে পড়লেন। আমি ড্রাইভারকে বললাম, “মনিপাল এ চলো, আমি আসছি পেছনে।”

আমি আর ইন্দ্রাণী এবার আমার গাড়িতে করে অ্যাম্বুলেন্সের পেছন পেছন আসলাম। তারপর ওনাকে ভর্তি করালাম হাসপাতালে। যেহেতু মণিপাল মাল্টি স্পেশালিটি হসপিটাল তাই গোটা প্রসেসটাই খুব দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হলো। ডাক্তার চেকাপ করেই বললেন, এমনার্জেন্সি অপারেশন করতে হবে। ইন্দ্রাণী সঙ্গে সঙ্গে ফর্মে সই করে দিলো। ডাক্তারবাবুরা তখনই ওর বাবাকে অপারেশন থিয়েটারে অ্যাডমিট করে নিলেন। তবে ডাক্তারবাবু আমায় আলাদা করে বললেন, “অনেকটা দেরি করে ফেলেছেন আনতে। লাইফ রিস্ক আছে, তবে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।” বলে ডাক্তারবাবু ঢুকে গেলেন ভেতরে।

আমি ইন্দ্রাণীকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। মাসিমা মানে ইন্দ্রাণীর মা চিন্তিত মুখে ওয়েটিং রুমে বসে রইলেন। ইন্দ্রাণী আমাকে একা পেয়ে একটু ইতস্তত করে বললো, “এটা তো খুব বড়ো হাসপাতাল সমুদ্র দা। এখানে তো আরোও বেশি বিল হবে মনে হচ্ছে। আমার কাছে তো এই মুহূর্তে এতো টাকা নেই। আমি সামাল দেবো কীকরে এসব?”

আমি এবার ইন্দ্রাণীর দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বললাম, “তুমি এইসব ব্যাপারে কেন চিন্তা করছো ইন্দ্রাণী, আমি তো আছি তোমার সাথে! তোমার বাবার যত বিল হয় সব আমি দেবো। তোমায় এক টাকাও খরচ করতে হবে না।”

ইন্দ্রাণীর মানসিক অবস্থা ভীষন খারাপ ছিল। ইন্দ্রাণী হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না সমুদ্র দা। কিচ্ছু বুঝতে পারছি না কি করা উচিত। আমার বাপি বাঁচবে তো সমুদ্র দা? বাপির যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারবো না।” ইন্দ্রাণী ডুকরে কেঁদে উঠলো আমার বুকে মাথা রেখে।

আমিও তখন ইন্দ্রাণীকে নিজের বুকের মধ্যে চেপে জড়িয়ে ওর মাথার চুলে, পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, “কিচ্ছু হবে না তোমার বাপির, সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বাপিকে আমি কলকাতার সবথেকে ভালো হসপিটালে নিয়ে এসেছি। তোমার বাপি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপদ কাটিয়ে উঠবেন।”

ইন্দ্রাণী আমাকে আরও জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো সমানে। ইন্দ্রাণী যেন খেয়ালই করেনি যে ও আমায় এতটা দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরে রয়েছে। আসলে কোনো অসহায় মানুষ যখন জলে ভেসে যায় তখন সামনে একটা কাঠের গুঁড়ি পেলে সেটাকেও আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। সত্যি বলতে ওই মুহূর্তে আমারও তখন ইন্দ্রাণীর শরীরের প্রতি কোনো টান ছিল না, কিন্তু ইন্দ্রাণীকে আমি মন থেকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম তখন। তাই সত্যি সত্যিই ইন্দ্রাণীর প্রতি আমার সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছিলো ওই মুহূর্তে। আমার খালি মনে হচ্ছিলো, ইন্দ্রাণীর মতো এরকম মিষ্টি সুন্দরী একটা মেয়েকে কেন আমি নিজের বৌ হিসাবে পেলাম না। যদি আমি ওকে নিজের স্ত্রী রূপে পেতাম, তাহলে তো আমি রানীর মতো করে রাখতাম ওকে। আমি মনে মনে ভগবানকে প্রশ্ন করতে লাগলাম, “তিনি কি আমায় সুযোগ দেবেন ইন্দ্রাণীকে নিজের স্ত্রী হিসেবে রাখার?”

হঠাৎ ইন্দ্রাণী আমাকে ছেড়ে একটু দূরে সরে গেল আমার থেকে। ইন্দ্রাণী একটু লজ্জিত হয়ে বললো, “আমার মাথার আসলে ঠিক নেই সমুদ্র দা, তাই আমি একটু অসংযত হয়ে পড়েছিলাম এখন। আপনি প্লীজ কিছু মনে করবেন না আমার আচরণে।”

আমি দেখলাম, ইন্দ্রাণীর চোখে তখনও জল চিকচিক করছে। চোখ দিয়ে অনেকটা জল বেরিয়েছে ওর। এমনকি আমার জামাটাও ইন্দ্রাণীর চোখের জলে ভিজে গেছে অনেকটা। আমি তখনই আমার প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে ইন্দ্রাণীর চোখ দুটো মুছিয়ে দিলাম। তারপর ইন্দ্রাণীকে সান্ত্বনার সুরে বললাম, “তুমি এভাবে কেঁদো না ইন্দ্রাণী, সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার আচরনে আমি কিচ্ছু মনে করিনি। তুমি শক্ত হও।”

ইন্দ্রাণী তখন একটু সান্ত্বনা পেয়ে ওর পটলচেরা চোখ দুটো দিয়ে সোজাসুজি তাকালো আমার দিকে। উফফফ.. ইন্দ্রাণীর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার সমস্ত ক্লান্তি যেন দুর হয়ে গেল। কি ভীষন মায়া জড়ানো ইন্দ্রাণীর চোখ দুটোয়। আমি ইন্দ্রাণীকে বললাম, “এখানে বসে আর কাঁদতে হবে না তোমাকে। চলো আমরা ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসি।” ইন্দ্রাণী সম্মত হলো আমাকে কথায়। আমি, ইন্দ্রাণী আর ওর মা একসাথে গিয়ে বসলাম ওয়েটিং রুমে।

প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে টানা অপারেশন চললো। আমরা রীতিমতো টেনশনে। মাসিমা মানে ইন্দ্রাণীর মা চোখ বন্ধ করে ঠাকুরকে ডাকছেন ক্রমাগত। আমরাও তীব্র উৎকন্ঠায় ভুগছি। অবশেষে একসময় ডাক্তার বাবু আমাদের ডেকে পাঠালেন। উনি বললেন, “ও.টি সাকসেসফুল হয়েছে। হি ইস আউট ওফ ডেঞ্জার নাউ। তবে কয়েকদিন রেস্টে থাকতে হবে।”

চলবে... গল্পটা কেমন লাগছে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন...

ভালো লাগলে লাইক দেবেন আর আমার প্রোফাইলটা ফলো করবেন।।।

এরপর সমুদ্র কি পারবে ইন্দ্রাণীর মন জয় করতে?? জানতে হলে অবশ্যই পড়তে থাকুন আমার লেখা জনপ্রিয় সিরিজ "ইন্দ্রাণী"......