“প্রথম যে জিনিসটা আমাকে কন্ফ্যূজ়্ড করেছিল… তা হলো কনডম। জাললায় যে রাতে রক্ত মাখিয়ে দিলো… তারপরদিন রতন জানালা পরিস্কার করতে গিয়ে তানিয়ার জানালার নীচে কনডম পেলো…. আমাকে সেটা দেখলো. আমার সন্দেহ হলো তানিয়ার কোনো গোপন প্রেমিক আছে… সেরাতে আসে তানিয়ার ঘরে… আর তারা দুজনে মিলে কোনো সরযন্ত্র করছে… হয়তো হতে পারে সম্পত্তি সংক্রান্ত কোনো ব্যাপার. এই রকম প্রচুর ঘটে… তদন্তে কেউই সন্দেহের উর্ধে নয়। কিন্তু ভুলটা ভাংলো কনডমটা পরীক্ষা করার পর।
স্যরী তানিয়া… তোমাকে সন্দেহ করার জন্য…”
তানিয়ার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো… তারপরেই ফুটে উঠলো রাগ… আগুন ঝরা চোখে সে তাকলো রতনের দিকে।
হিমেল বলে চলল… “কনডমটা পরীক্ষা করে দেখলাম তার ভিতর আর টপেও রক্ত লেগে আছে। যদি কনডমটা আগে থেকেই কার্ণিসে পরে থাকতো… আর রক্তও তার উপর এসে পড়ত… তাহলে কনডম এর একদম ভিতর পর্যন্ত রক্ত ঢুকত না। আরও একটা ব্যাপার… কনডমটা ছিল ফাটা। এর একটাই মানে দাড়ায়… কনডমে রক্ত ভরে সেটা জানালায় ছুড়ে মারা হয়েছিল।
কিন্তু এই বাড়িতে কনডম কে কে ব্যবহার করে? নাকি কনডমটা কিনে আনা হয়েছিল? যদি কিনে আনা হতো… আমার কাজ সহজ হয়ে যেতো। কিন্তু যখন খোজ করে দেখলাম যে একমাত্র তানিয়া ছাড়া সবার ঘরেই কনডম আছে… আবার কন্ফ্যূজ়্ড হয়ে গেলাম….
কেয়া বিবাহিতো… তার ঘরে থাকতেই পারে… এ ছাড়াও আলাউদ্দিন সাহেবর ঘরে আছে তার গোপন অভিসারে যাবার জন্য… রতন আর টুসির কাছেও আছে… তাই না?”
দুজনে মুখ তুলে হিমেলের দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নিলো. হিমেল বলল… “লুকিয়ে লাভ নেই… তোমাদের গোপন অভিসারও আমি স্বচক্ষে দেখেছি।
আর রতন আরও কয়েকটা সূত্র দিয়েছিল। যেমন তার প্রমোটার মালিকএর এই বাড়ির উপর লোভ আছে। সে সায়মনকে বাড়ি বিক্রির অফারও দিয়েছিল। ও রাজী হয়নি। আমি প্রমোটরএর সঙ্গে দেখা করেছি… তিনি বললেন যে তিনি অফার দিয়েছিলেন… আর সায়মনও না করেননি… ভেবে দেখবে বলেছে… সেক্ষেত্রে তার ভয় দেখানোর কোনো যুক্তি যুক্ত কারণ নেই।
পরের সূত্রোটা ছিল… একটা ছেলেকে তানিয়া চর মেরেছিল… তার বাবাও প্রমোটার… সে বদলা নেবার জন্য প্লামবার দিয়ে পাইপে রক্তও ঢোকাতে পারে… বা ভয়ও দেখাতে পারে। সেখানেও আমি খবর নিয়েছি… সেই ছেলে এখন বিদেশে থাকে। পড়াশুনা করতে চলে গেছে বাইরে। সুতরাং এটাও টিকল না।
আস্তে আস্তে আমার সন্দেহ রতনের উপর বাড়তে লাগলো। রতন একটা কন্স্ট্রাকসান কোম্পানীতে লেবারএর কাজ করে। নিজেই বলেছে যে সে সর্ব ঘটের কাঠালি কলা… অর্থাত্ সব কাজই জানে। ইলেক্ট্রিকএর কাজ জানে.. প্লামবার এর কাজ করে দিতে পারে.. ইনফ্যাক্ট কিভাবে ট্যাপ থেকে রক্ত পড়ার পর আবার নরমাল ওয়াটার চলে আসতে পরে… যুক্তি দিয়ে সেই দেখিয়েছিল। বিল্ডিং তৈরীএর কাজ করে বলে সে অনায়সেই সানশেড বা কার্ণিসে উঠতে পারে।
রতনের আরএকটা সুবিধা হলো সে একটা গ্রিল কারখানায় কাজ করে। গয়নর দোকানে চুরির পর যখন সে আমাকে বলল যে ওই দোকানের গ্রিল তারাই লাগিয়েছিল… আমার কাছে সব পানির মতো পরিস্কার হয়ে গেলো।
যে গ্রিল লাগিয়েছে… সে গ্রিলটার দুর্বল জায়গা গুলো জানে.. কিংবা ইচ্ছে করেই দুর্বল করে রাখতে পারে… যাতে দরকারের সময় সহজেই কাটা যায়। আমার সন্দেহ একদম ফোকাস্ড হলো রতনের উপর। আমি তাকে আর চোখের আড়াল করলাম না। আর আমার সেই সন্দেহের অবসান ঘটলো… কালরাতে রতনকে পটী করতে যেতে দেখে। তখনি ১০০ ভাগ নিশ্চিন্ত হলাম… রতনই ভূত…এবং সেই চোর!”
কোন ফাঁকে কেয়া উঠে গিয়ে চা করে এনেছে… সবাই চা এর কাপ তুলে নিলো… চুমুক দিতে দিতে হিমেল বলল… “আমি অনেক ক্রিমিনাল দেখেছি… কিন্তু রতন তুমি অসাধারণ… তোমার বুদ্ধির তারীফ না করে পারছি না। সব ক্রিমিনালই চায় গোয়েন্দার নজর অন্যদিকে ঘোরাতে বা নিজেকে এসব এর বাইরে আছে এটা প্রমান করতে। কিন্তু তুমি প্রথম থেকেই একদম নীরভেজাল সত্যিটাকেই হাইলাইট করে চলেছিলে। এতটাই যুক্তি ছিল তোমার কথায় যে আমিও একসময় ভাবতে শুরু করেছিলাম যে.. পানির মতো পরিস্কার যখন… তখন এগুলো হবে না।
কিন্তু সব ক্রিমিনাল এরে একটা দোষ থাকে… তোমারও সেটা আছে… আর একটু বেশি মাত্রায় আছে… তুমি নিজেকে মাত্রতিরিক্ত বেশি বুদ্ধিমান ভাবো। তুমি যদি একটু কম চালাকি করতে.. হয়তো কাজটা করে আপাতত সরে পড়তে পারতে… পরে তোমাকে ঠিকই আমি খুজে বের করে আনতাম… সে তুমি যে চুলোতেই থাকতে… যাক সেটা পরের কথা…
কিন্তু তুমি মারাত্মক একটা ভুল করলে আমাকে বোকা ভেবে, রতন। ক্রিমিনালরা যতো চালাকঈ হোক.. গোয়েন্দার কাজ তার চালাকির উপর চালাকি করা। ভুল তুমি অনেক গুলোই করে ফেলেছ… প্রথম ভুল - কনডম দেখিয়ে তানিয়ার দিকে সন্দেহ ঘোরাতে চেস্টা করে। দ্বিতীয় ভুল.. সেদিন রাতে সদ্য গলাকাটা মুরগীর বুকে ছুড়া গেঁথে জানালা দিয়ে ছুড়ে মেরে। আরে ছুড়িটা যে গ্রিল কারখানায় তৈরী সেটা দেখতেই বোঝা যায়…
একটা ছুড়ি দোকান থেকেই তো কিনে নিতে পারতে? তার পরের ভুল নিজে ভূত দেখার গল্প বানিয়ে পর্দায় আগুন লাগিয়ে। ভেবে দেখো কতো বড়ো বোকামি করেছ। তুমি বলেছিলে তুমি জানালার কাঁচের ভিতর দিয়ে সেই ভৌতিক মুখটা দেখেছিলে.. তার মানে হলো… পর্দা সাইডে সরানো ছিল।
তারপর বললে সেই মুখ এগিয়ে এসে আগুন এর হল্কা ছুরে কাঁচ গলিয়ে দেয়… আর তাতেই আগুন লাগে. কিন্তু যেখানে কাঁচটা গলেছে… পর্দা সেখান থেকে অনেক দূরে ছিল… আগুন লাগা সস্ভব নয়. আর আমি পরীক্ষা করে দেখেছি… কাঁচ গলানোর জন্য অক্সী-এসেটাইলিন টর্চটা ভিতর থেকে জ্বালা হয়েছিল… ফুটোটার ভিতর দিকেই কালী পড়েছিল… বাইরের দিকে না।
আগুনটা তুমিই লাগিয়েছিলে… কিন্তু কেন লাগিয়েছিলে? আমাদের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে কিছু একটা করতে। কিন্তু তুমি আমাদের সামনেই ছিলে। অর্থাত্ তোমার একজন সহকারী আছে। কিন্তু কে সেই সহকারী?
যখনই বুঝলাম এই বাড়ির কেউ চুরিটার সঙ্গে যুক্ত… তখনই চিন্তা এলো… কিভাবে এই বাড়ি থেকে দোকানে পৌছানো আর ফেরা সম্বব? কারণ পাঁচিলটা ভিষণ উচু। আর বাইরে থেকে ঘুরে দোকানে যেতে গেলে বড়রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে হবে। সেটা খুবে রিস্কী। বিশেষ করে চুরিটা যখন ৩০ লাখ টাকার।
আমি পাচিলটা পরীক্ষা করে দেখলাম যে অনেক জায়গায় প্লাস্টার খুলে গেছে। দোকানটার ঠিক পিছনে পাচিল এর ইট এর খাজে খাজে আমি ছোট ছোট গোল গর্ত দেখতে পেলাম। আর রতনদের বাথরুমে ঢুকে পেলাম 8 ইঞ্চি করে কাটা লোহার রড। তখনই বুঝে গেলাম কিভাবে পাচিল ডিঙ্গানো সম্বব। ওই গর্তগুলোতে রডগুলো গুজে গুজে সহজেই সিরি বানিয়ে ফেলা যায়… আবার কাজ সেরে ওগুলো খুলে নিয়ে চিহ্ন মুছেও ফেলা যায়। এমনিতেই ভূতের ভয়েতে বাগানএর ওই অৎশে কেউ বিশেষ যায়না।
এবার আসি সেই বিভৎস আগুন ওগরোনও ভৌতিক মুখটার কথায়। ওটাই আমাকে সবচাইতে বেশি ভুগিয়েছে. আবার রতনের প্রসংশা না করে পারছি না। যেদিন রতনের হাত ভাংল… সেদিন আমি আর তিশা আবার ওই জায়গায় যাই… ঘটনার অনেক পরে। খুজতে খুজতে পেয়ে যাই সূত্র। কী পেয়েছিলাম জানেন? গলে যাওয়া লোহার টুকরো। গ্যাস-কাটার বা অক্সী-এসেটাইলিন টর্চ দিয়ে লোহা কাটলে যেমন গলে যাওয়া টুকরো পড়ে… ঠিক তেমনি. সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যাই রহস্যটা। রতন গ্রিল কারখানা থেকে একটা মোটা লোহার পাত কেটে মুখোশ বানিয়ে এনেছিল…
যার চোখ দুটোতে সম্ভবত সাইকেলের পিছনে যেমন লাল রিফ্লেক্টার লাগানো থাকে… তেমনে কিছু লাগানো. আর মুখের কাছে গর্ত করা। একটা পোর্টাবেল অক্সী-এসেটাইলিন টর্চ ওই মুখের কাছে জ্বেলে দেওয়া হতো। মুখের গর্তটা দিয়ে শিখা বেরিয়ে আসত…. আর তার আলোতে চোখে লাগানো রিফ্লেক্টার জ্বল জ্বল করে জ্বলে উঠে মুখোসটাকে বিভৎস করে তুলতো….
কিন্তু বেসিক্ষন একনাগারে অক্সী-এসেটাইলিন টর্চ জ্বালানোর ফলে মুখের গর্তের কাছে লোহা গলে গলে পড়ত একটু একটু করে। সেই টুকরোগুলোই পেয়েযাই আমি আর তিশা। নিজের সন্দেহ সত্যি কী না জানতে আমি রতনের গ্রিল কারখানায় যাই।
যখন শুনলাম যে কিছুদিন আগে তাদের একটা পোর্টাবেল টর্চ চুরি হয়েছে তক্ষনি ২-এ ২-এ ৪ হয়েযায়। আরও একটা খবর দিলেন কারখানার মালিক.. রতন দিন ১৫ আগেই কাজ ছেড়ে দিয়েছে। তাই তার কাজ সেরে আসতে আসতে রাত ১০টা বাজার গল্পটা মিথ্যা।
তাহলে সন্ধার পর রতন থাকতো কোথায়? আর সে যদি লুকিয়েই থাকবে তাহলে ভুতুরে কান্ড গুলো ঘটাতো কে? এর সহজ যুক্তি হলো… রতনের সহকারী আছে… কে হতে পরে সে? আলাউদ্দিন সাহেব? মমিন চাচা? টুসি? বাড়ির কেউ? নাকি বাইরের কেউ?
সবার উপর নজর রাখলাম আর যুক্তি দিয়ে চিন্তা করে বুঝলাম সহকারী নয়… সহকারিনী - টুসি..
রতন যখন সবার সামনে উপস্থিত থাকত ভূতের অভিনয় করতো টুসি.. এতে রতনের উপর সন্দেহ যেতোনা… আবার টুসি ভূতের ভয় পাবার এমন নাটক করতো যে সে যে ভূত সেজে এসব করতে পরে কেউ কল্পনায় করবে না..
রতন সন্ধে বেলা স্টোর রূমেই থাকতো সম্ভবত… তাতে ট্যূব লাইট নেভাতে সুবিধা হতো… তারপর টুসির ঘরে থাকাও সম্বব. কারণ মেয়ে বলে তার ঘরে বিশেষ কেউ ঢোকে না.
এভাবে ভৌতিক বাতাবরণ তৈরী করে রতন আর টুসি মিলে গয়নার দোকানে চুরিটা করে। আর চোরাই মাল নিয়ে সরে পড়ারও চেস্টা করে। অবস্য সঙ্গে আরও কেউ থাকতে পারে… সেটা পুলিশ বের করে নিতে পারবে”।
এবার কথা বললেন… ইনস্পেক্টার ফাহিম… গমগমে গলায় বললেন.. “কিন্তু হিমেল সাহেব… চুরির মালগুলো কোথায়? হিসেব মতো ১০ লাখ টাকার সোনার গয়না… আর ২০ লাখ টাকার রত্ন পাথর… সেগুলো গেলো কই?”
হিমেল বলল… “কাল রাতে রতনের সঙ্গে কোনো ব্যাগ ছিল না? সার্চ করেছিলেন?”
ইনস্পেক্টার বলল… “হ্যাঁ ছিল… কিন্তু শুধুই জামা কাপড়”
হিমেলের ভুরু কুচকে গেলো. বলল… “চলুন তো কয়েকটা জায়গা একটু খুজে দেখি…”
ইনস্পেক্টার লাফিয়ে উঠলেন… তারপর হংকার দিয়ে দুজন কনস্টেবেলকে ডাকলেন। তাদের জিম্মায় রতনকে রেখে হিমেল.. ইনস্পেক্টার আর তিশা প্রথমেই গেলো রতনদের বাথরূমে। সেখানে কিছুই পাওয়া গেলো না। তারপর স্টোর রূমে এসে খুজতে খুজতে পাওয়া গেলো মুখোশ টা… ঠিক যেমন হিমেল বর্ণনা দিয়েছিল… তেমন ই।
হিমেল বলল… “পোর্টবল অক্সী-এসেটাইলিন টর্চটাও পাওয়া যাবে খুজলে। আর ভালোকরে খুজতে সেটাও পাওয়া গেলো জঞ্জাল এর ভিতর লুকান… কিন্তু গয়না আর গেম্স পাওয়া গেলো না।
ফিরে আসার পর ইনস্পেক্টার বললেন… “হিমেল সাহেব, মাল পাচার হয়ে যায়নি তো?”
হিমেল ২ পাশে ঘাড় নারল… বলল “না… সে সুযোগ পায়নি রতন”
মিস্টার. ফাহিম বললেন… “তাহলে গেলো কই? এতগুলো টাকার জেম স্টোন!”
হিমেল বলল… “চোর যখন ধরেছি… তখন মালও পাওয়া যাবে। তারআগে রতনকে একটা প্রশ্ন করি? আচ্ছা রতন, কনডমএর এত বিবিধ ব্যবহার তুমি কোথায় শিখলে? আমরা তো একটা ব্যাবহারই জানতাম?”
তারপর ইনস্পেক্টার ফাহিম বললেন… “আপনার সঙ্গে লেডী কনস্টেবেল আছেন? থাকলে ডাকুন”
মিস্টার. ফাহিম মহিলা পুলিশ ডাকার পর হিমেল বলল… “টুসির ঘরটা সার্চ করূন তো… একটা কনডম মোরা বড় সরো পোটলা পাবেন… নিয়ে আসুন”
কনস্টেবেল টুসির ঘরে ঢুকে ১০ মিনিট এর ভিতরে পেয়ে গেলো পোটলাটা… বেশ বড়ো। একটা কনডম এর ভিতর আরেকটা কনডম ঢুকিয়ে তার ভিতর কিছু রাখা হয়েছে।
হিমেল বলল… “এই নিন আপনার সোনার গয়না… মিস্টার. ফাহিম”
ইনস্পেক্টার বাঘের মতো ঝাপিয়ে পড়ে কনডম ছিড়ে ফেললেন… তার ভিতর থেকে একটা প্লাস্টিক ব্যাগ এর মোড়ক বেরলো। ইনস্পেক্টার খুব আস্তে আস্তে যত্ন নিয়ে সেটা খুলতে লাগলেন… যেন তার প্রাণ ভোমরা মোড়কটার ভিতর রয়েছে। মোড়কটা খুলে ইনস্পেক্টার ধপাস্ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। এ কী… মিস্টার. ফাহিম? কোথায় সোনা? এ তো ভাঙ্গা চূড়া লোহার টুকরো?”
হিমেল হাঁসতে লাগলো হো হো করে… বলল… “জানি.. আমিই তো রেখেছি… কিন্তু চোরেরা জানে না ভিতরে কী আছে। তারা সোনার গয়নাই রেখেছিল। আর গয়না আছে ভেবেই সরিয়েও এনেছিল। সার্চ করে ওটা আনানো হলো এই কারণে… যাতে প্রমান হয় যে তারা ওটা নিজেদের কাছেই রেখেছিল চোরাই মাল ভেবে।
রতন আর টুসি চুরির পরে দুটো কনডম এর ভিতর ভরে ওটা লুকিয়ে রেখেছিল রতনদের বাতরূমের চৌবাচ্চার পানির নীচে। কালই আমি ওটার হদিস পাই”।
ইনস্পেক্টার বললেন… “কিন্তু গয়না? সেগুলো কোথায়?”
হিমেল বলল… “আমার কাছেই আছে… তিশা.. একটু উপরে যাও তো… আমার বেডএর নীচে সূটকেসটার পিছনে ঠিক ওই রকমে একটা কনডমে মোরা প্যাকেট পাবে নিয়ে এসো। স্যরী আলাউদ্দিন সাহেব.. আপনার ঘরের ড্যূপ্লিকেট চাবি দিয়ে ঢুকে কয়েকটা কনডম চুরি করেছিলাম কাল.. মাফ করবেন”।
তিশা উপরে গিয়ে প্যাকেটটা নিয়ে এলো… সেটা খুলতে… আলোতে কাঁচা হলুদ রংএর সোনার গয়না বেরিয়ে ঘর আলো করে দিলো. ইনস্পেক্টার আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন… “সাবাস হিমেল সাহেব… সাবাস!”
আর ঘরে অন্য যারা উপস্থিত ছিলেন তারাও বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে রইল। শুধু রতন আর টুসির মুখে কেউ যেন কালী ঢেলে দিলো.
এতক্ষণে কথা বলার সাহস খুজে পেলো রতন… সে চেঁচিয়ে বলল… “ধুর শুধু শুধু নাটক করে মিত্তা ওপোবাদ দিয়ে আমাদের আটকে রেখেছেন… এ সবই হিমেল সাহেবের বানানো গল্প। উনিই চুরিটা করেছেন… চোরাই মালতো পাওয়া গেছে ওনারই কাছে। উনি ঢাকা থেকে এসেছেন চুরি করার জন্যই… আর এইসব আজগুবি গল্প ফেঁদে আমাদের বিপদে ফেলছেন… ছেড়ে দিন আমাদের…” সে কনস্টেবেল দুজনের হাত থেকে মুক্তি পেতে জোরজড়ি করতে লাগলো।
চেয়ার থেকে উঠলো হিমেল… এগিয়ে গেলো রতনের কাছে… তারপর কোনো কথা না বলে ডান হাত তুলে সপাটে চর কসালো রতনের গালে। চরটা এতজোরে মারল যে তার প্রতিধ্বনী ঘরের সমস্ত শব্দকে থামিয়ে দিয়ে নিশ্চুপ করে দিলো।
প্রথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠে ভাঙ্গা হাতটা চেপে ধরে কাতরাতে লাগলো রতন… হিমেল হংকার দিয়ে উঠলো… “ন্যাকমো রাখো রতন… যথেষ্ট নাটক হয়েছে… আর না। কিছু হয়নি তোমার হাতে। আমি তোমার ডাক্তার এর সাথেও দেখা করেছিলাম… তিনি বললেন… তোমার কিছুই হয়নি… এমনকী একটা ব্যান্ড-এড লাগানোরও দরকার ছিলনা তোমার। আর থাপ্পরটা তোমাকে আমাকে চোর বলার জন্য মারিনি… মনে আছে, আমি তোমাকে প্রমিস করেছিলাম.. যে তোমার এই অবস্থা করেছে তাকে আমি ছাড়ব না… শাস্তি দেবই? তুমিই তোমার এর অবস্থা করেছ… তাই শাস্তি তোমারই প্রাপ্য। এ ছাড়াও সেদিন রাতে তানিয়াকেও প্রমিস করেছিলাম.. যারা তাকে বদনাম করছে… যারা ভয় দেখিয়ে জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছে… তাদের শাস্তি দেবো… সেই প্রমিসটাও রাখলাম”
ঘরে যেন বাজ় পড়লো এবার… এমনভাবে কথা বলে উঠলেন ইনস্পেক্টার… “ধুর ধুর এটা কোনো শাস্তি হলো… এতো জামাই আদর… আসল খাতিরতো হবে থানায় গিয়ে… তুমি যদি বুনো ভূত হও… আমি বাঘা ওঝা… তাছাড়া… দলে আর কে কে আছে… রত্ন পাথর গুলো কোথায় রেখেছ… সেটাও তো বের করতে হবে আমাকে? চলো চলো… আমার আর দেরি সইছে না যে.. হাতটা নিসপিস করছে সোনা মানিক!”
হিমেল বলল… “শুধু মানিক নয় ইনস্পেক্টার… মানিক-জোড় বলুন”
ইনস্পেক্টার টুসির দিকে তাকলো, বলল… “হ্যাঁ হ্যাঁ… ঠিক বলেছেন.. মানিক জোড়ই বটে”
হিমেল বলল… “না… ও তো সোনার টুকরো মেয়ে… ও মানিক না”.
মিস্টার. ফাহিম বললেন… “তাহলে জোড়া মানিক এর আর একজন কই?”
হিমেল মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো. বলল… “বলছি… তারআগে রতনকে তার বোকামির আরও দুটো উদাহরণ দি… যাতে জীবনে আর নিজেকে বেশি বুদ্ধিমান না ভাবে। রতন, এটা মনে রেখো… ভালো অভিনেতা হতে গেলে সবসময় ক্যারেক্টারে ঢুকে থাকতে হয়…. হাত ভাঙ্গা মানুষ এর অভিনয় যখন করবে… সবসময় মনে করবে তোমার হাতটা সত্যিই ভাঙ্গা। এমন কী রাতএর বেলা যদি পটীও পায়…. ওই ভাঙ্গা হাতে পানির বলতি ঝুলিয়ে হাটবে না। কালরাতে সেটাই করছিলে তুমি।
তোমার আর একটা বোকামির কথা বলি… তোমার সঙ্গে গ্রিল কারখানায় কাজ করত… নাম রাজু.. যার মুরগীর দোকানও রয়েছে.. তার কাছ থেকে রক্ত আনছিলে এটা বেশ বুদ্ধিমান এর মতই কাজ হচ্ছিল… কিন্তু চুরিটা করে ফেলার পরও আমাকে নিয়ে মস্করা করার লোভটা বোধ হয় সামলাতে না পেরে সেদিন জ্যান্ত মুরগি এনে নিজেই গলা কেটে.. বুকে হাতে বানানো ছুডি গেঁথে ছুড়ে মারলে তানিয়ার ঘরে… কিন্তু খেয়ালই করলেনা যে তোমার কোনুই এর কাছে মুরগীর রক্তের ছিঁটে লেগে গেছিল…
পরদিন দেখলাম রক্তের দাগটা নেই… অথচ বললে ব্যান্ডেজ চেংজ করনি… ইসস্শ তোমার কতোবড় একটা প্ল্যান… একটা তুছ্ছ মুরগি ভেসতে দিলো রতন! চুরি করার আগেই দামী মাল লুকিয়ে রাখার জন্য হাত ভাঙ্গার নাটক করে এত বড় ব্যান্ডেজটা বাঁধলে হাতে… কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না…. ইনস্পেক্টার… রতনের ব্যান্ডেজটা খুলুন তো কাউকে দিয়ে….”
ইনস্পেক্টার বললেন… “আমিই খুলছি”
হিমেল বলল… “সাবধানে খুলবেন.. এটা পৃথিবীর সবচাইতে দামী ব্যান্ডেজ… ২০ লাখ টাকা দাম”
ইনস্পেক্টার রতনের হাতটা ডাইনিং টেবিলএর উপর রেখে আস্তে আস্তে ব্যান্ডেজ খুলতে লাগলো. ঘরের ভিতর তখন পিন-ড্রপ নিস্তব্ধত।. সবার হৃদপিন্ড বোধহয় বীট করতেও ভুলে গেছে…. কয়েক পরত ব্যান্ডেজ খোলার পরে টেবিল এরউপর রত্ন বৃষ্টি শুরু হলো… হীরা… পান্না… চুনী… গোমেদ… পোখরাজ… বৃষ্টির মতো টুপ টাপ ঝরে পড়ছে… আর তাদের বিচিত্রও বর্ণ-ছটায় সবার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো।
পুরো ব্যান্ডেজটা খোলা হয়ে যেতেই হিমেল রত্নগুলো একজায়গায় জড়ো করে একটা রুমালে জড়িয়ে ইনস্পেক্টারএর হাতে তুলে দিলো।
ইনস্পেক্টার হিমেলকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন… বললেন “আপনাকে কিভাবে যে ধন্যবাদ দেবো মিস্টার. হিমেল… আপনি জানেন না… এই চুরিটার কিনারা করার জন্য উপর মহলথেকে কী যে চাপ আসছিল…. থ্যাঙ্ক ইউ… থ্যাঙ্ক ইউ ভেরী ভেরী মাচ হিমেল সাহেব”।
যখন তারা কথা বলছিল ঠিক তখনই লেডী কনস্টেবেল এর হাত ছড়িয়ে দৌড় দিলো টুসি… কনস্টেবেলও দৌড়ে দিয়ে তার চুলের মুঠি টেনে ধরে গালে এক থাপ্পর কসালো… ছিটকে মাটিতে পড়ে গোঙ্গাতে লাগলো সে… আকাশ বাতাস কাপিয়ে হেঁসে উঠলেন ইনস্পেক্টার… বললেন… “এ যে দেখছি নতুন একটা মুহবাড়া পেয়ে গেলাম… ” রতনে রতন চেনে… টুসি চেনে ঘুষি “…. নিজের রসিকতায় নিজেই দুলে দুলে হাসতে লাগলেন তিনি।
চুরির মাল.. রতন আর টুসিকে নিয়ে পুলিস জীপ বেরিয়ে যেতেই মমিন চাচা এগিয়ে এলেন হিমেলের কাছে… বললেন… “এ বাড়িতে আমার আর থাকার মতো মুখ নেই স্যার… আমি কোন মুখে আর সায়মন বাবার সামনে দাড়াবো?” তারপর কেয়ার দিকে ফিরে বলল… “আমাকে মাফ করে দিন..”
হিমেল তার কাঁধে হাত রাখলো… বলল… “আপনি কোথাও যাবেন না. একমাত্র আপনার উপরে ভরসা করে এই মেয়েদের রেখে যাচ্ছি আমি। আলাউদ্দিন সাহেব তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন… আপনিই এখন থেকে এদের অভিভাবক. সায়মন না ফেরা পর্যন্ত আপনাকেই এদের র্ক্ষা করতে হবে”
হাতের উল্টো পীঠ দিয়ে চোখ মুছে মমিন চাচা বললেন… “আমার জীবন থাকতে এনাদের কোনো ক্ষতি কেউ করতে পারবে না… কথা দিলাম”
হিমেল তার কাঁধ ঝাকিয়ে দিয়ে বলল… “জানি”
হিমেলকে আরও ২/১ দিন থেকে যাবার অনেক অনুরোধ করলো কেয়া… তানিয়া.. আর ফারিহা. তাদের বুঝিয়ে অনেক কস্টে ছুটি পেলো হিমেল। বাস স্টেশনে সবাই এসেছে হিমেল আর তিশাকে বিদায় জানাতে.. এমন কী আলাউদ্দিন সাহেবও।
বাস ছাড়ার ঠিক আগের মুহুর্তে তিশা তার ব্যাগ খুলে দুটো প্যাকেট বের করলো। সুন্দর করে রঙ্গিন কাগজে মোরা। তারপর একটা ফারিহা আর অন্যটা কেয়ার হাতে দিয়ে বলল… “বসস এর তরফ থেকে সামান্য উপহার আপনাদের জন্য”
ফারিহা আর কেয়া অবাক হয়ে চেয়ে রইলো প্যাকেট দুটোর দিকে… এমন কী হিমেলও…. আস্তে আস্তে বাস চালু হোল, বাসস্ট্যান্ড থেকে বেরিয়ে আসার পর হিমেল বলল… “কী দিলে বলতো? কই আমাকেতো বলোনি উপহারএর কথা?”
তিশা বলল… “ওদের দুজন এর ভিতর ঝগড়া হোক চাইনা আমি… সেদিন শপিংসেন্টার থেকে ৬টা নতুন জঙ্গিয়া কিনে এনেছি আপনার… তাই পুরানো ৬টা সমান ভাগে ভাগ করে ওদের উপহার দিলাম….”
হিমেল হাঁ হয়ে গেলো এটা শুনে… তারপর বলল… “ফাজ়িল মেয়ে….”
তিশা অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে খিক খিক করে হাঁসতে লাগলো……. !!!
(সমাপ্ত …)
বন্ধুরা কেমন লাগলো গল্পটা? আপনাদের ভালো লাগলে এরকম আরও গল্প পোস্ট করবো… তাই কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।