দুঃস্বপ্ন — প্রথম পর্ব

Duhswapno

লেখক: Chodon Kumar

ক্যাটাগরি: ভাই বোনের প্রেম

সিরিজ: দুঃস্বপ্ন

প্রকাশের সময়:25 Jun 2026

“প্রথম অধ্যায়”

======

অনুচ্ছেদ ১: স্বপ্ন।

======

সবকিছুর শুরুটা হয়েছিল একটা দুঃস্বপ্ন দিয়ে...

সৃজন আবারও এক দুঃস্বপ্নের কবলে পড়ে ছটফট করতে লাগল। ১৩ বছর বয়স থেকেই সে এমন দুঃস্বপ্ন দেখে আসছে। বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বিশাল ২২ চাকার ডাম্পার তার বাবা-মায়ের SUV-কে সজোরে ধাক্কা দিল এবং এক সড়ক দুর্ঘটনায় তারা প্রাণ হারাল। তবে এবারের দুঃস্বপ্নটি ছিল আগেরগুলোর চেয়ে একেবারেই আলাদা। বহু বছর ধরেই সেই ডিজেল-চালিত ডাম্পারটি যেন সর্বত্র তার পিছু ধাওয়া করে আসছিল। সে কোনো গর্তে লাফিয়ে নামলে ওটা তাকে অনুসরণ করত, আবার কোনো দালানের চূড়ায় উঠলেও ওটা পিছু ছাড়ত না; মনে হত, সে যেখানেই যাক না কেন, ডাম্পারটি যেন তার পিছু পিছুই আসত। ডাম্পারটি যখন শেষমেশ তাকে ধরে ফেলত—ঠিক তাকে আঘাত করার আগ মুহূর্তে—তখনই তার ঘুম ভেঙে যেত।

তবে এই দুঃস্বপ্নটা‌ সেই ডাম্পার বা তার বাবা-মা কিংবা সম্প্রতি প্রয়াত দিদিমাকে নিয়ে ছিল না। এটা ছিল তার প্রিয় ছোট বোন—সৃষ্টিকে নিয়ে।

সৃষ্টি ছিল সৃজনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু, বোন এবং ইদানীংকালে তার আকাঙ্ক্ষার পাত্রী।

সৃজন জানত যে সে বোনকে ভালোবাসে, জানত যে এটা ঠিক নয়—তবুও সে নিজেকে আটকাতে পারছিল না। ওর বোন‌ই ছিল সেই একমাত্র মানুষ যার ওপর সে ভরসা করতে পারত। ওর বোন সেই নারী যে কখনোই ওর হৃদয় ভাঙত না, এবং একমাত্র সেই-ই বুঝতে পারত কেন সে বাইরের জগত থেকে নিজেকে এতটা গুটিয়ে রেখেছিল।

২১ বছর বয়সী সৃষ্টির উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি, কালো রঙের ঘন সিল্কি চুল, তীক্ষ্ণ বাদামী চোখ—যেন মাখনের ভেতর গরম ছুরি চালিয়ে দেওয়ার মতোই সরাসরি সৃজনের অন্তরাত্মা চিরে ফেলত। তার ওপর বাড়তি পাওনা ছিল সুপারমডেলের মতো আকর্ষণীয় শারীরিক গড়ন। সৃষ্টির ৩৪-২৪-৩৪ মাপের নধর গতরটা সৃজনের বুকে ভালোবাসা এবং কামের ঢেউ তুলত সবসময়। সৃজনের দৃষ্টিতে, সে ছিল তার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী নারী।

সৃজন বছরের পর বছর ধরে তার বোনের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, কিন্তু এই স্বপ্নটি তাকে উপলব্ধি করাল যে সে তাকে কতটা গভীরভাবে চেয়েছে,‌ বোনকে তার কতটা গভীরভাবে প্রয়োজন।

স্বপ্নটা বেশ সাধারণভাবেই শুরু হয়েছিল। সৃষ্টি কোনো একটা বিষয় নিয়ে উল্লাস করছিল আর আনন্দে লাফিয়ে উঠছিল। সৃজন স্পষ্টই বুঝতে পারছিল সে কতটা খুশি। সে সৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করল, কী নিয়ে সে এত উত্তেজিত।

তার উত্তরটা ছিল সহজ। “আমি IIT-তে দারুন অফার পেয়েছি পেয়েছি দাদা; অবশেষে আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে!”

স্বপ্নে সৃজন প্রথমে বোনের জন্য খুশি হলেও পরে গভীর বিষণ্ণতায় ডুবে যায়। সে জানত যে তার প্রিয় বোন তাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। সৃষ্টি দাদার চোখের ভাষা বুঝতে পারছিল এবং অনুভব করছিল যে সে এটা নিয়ে খুব ব্যথিত, তবুও সে নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল। সে দাদাকে বুঝিয়ে বলল যে, তার অভিমান বা মন খারাপের বিষয়টি আর সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়; এখন সে নিজের মতো করে জীবনটা নতুন করে সাজাতে চায়। সৃজন বোনকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে তাকে ছাড়া সে বাঁচবে না, কিন্তু তখনই সৃষ্টি তার তীক্ষ্ণ নীল চোখের দৃষ্টি সরাসরি সৃজনের চোখের ওপর নিবদ্ধ করে জানিয়ে দিল যে, সে আর কখনওই তার মুখ দেখতে চায় না। ঠিক সেই মুহূর্তেই সৃষ্টির সেই তীক্ষ্ণ নীল চোখজোড়া গাড়ির হেডলাইটে রূপান্তরিত হল—আর দেখা গেল, সেই ২২ চাকার বিশাল ডাম্পারটি আবারও সৃজনের পিছু ধাওয়া করেছে।

ভয়ে গা-ছমছমে এক অনুভূতি নিয়ে সৃজনের ঘুম ভাঙল। সেই স্বপ্নের অর্থ বা বিষয়বস্তু কী ছিল, তা বোঝার চেষ্টা করল না—বরং বুঝতেই চাইল না। তবে সে জানত, যত দ্রুত সম্ভব সৃষ্টির সঙ্গে তাকে কথা বলতেই হবে। সৃষ্টিকে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে হবে এবং আশা করতে হবে যে হয়তো বোনের মনেও তার প্রতি সামান্য হলেও একই রকম কোনো অনুভূতি রয়েছে।

সৃজন ঘড়ির দিকে তাকাল; তখন রাত ৩টে বেজে ১৫ মিনিট। সে জানত, এই মুহূর্তে বোনকে জাগিয়ে তোলাটা ঠিক হবে না। সে ভেবে দেখল, নিজের মনের আসল কথাগুলো বলে সে এমনিতেই সৃষ্টিকে বড়সড় একটা ধাক্কা দিতে চলেছে; তাই অন্তত এমন কিছু করতে হবে যাতে কথাগুলো শোনার পর সৃষ্টি তাকে আচ্ছা করে ধোলাই করার কথা না ভাবে।

সৃজন শুয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ ভাবল এবং বুঝল যে, এখন আর ঘুমের কোনো আশা নেই। অগত্যা সৃজন নীচে যাওয়ার জন্য বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

নীচে নেমে ড্র‌ইং রুমে এসে সৃজন টিভিটা চালু করল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল। সে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল সৃষ্টি নীচে নেমে আসছে।

সৃষ্টি তার দাদার দিকে তাকাল এবং সহজভাবে জিজ্ঞেস করল...

"আবার কি দুঃস্বপ্ন দেখলি, দাদা?"

সৃজন মাথা নাড়ল; সৃষ্টি তাকে অন্য সবার চেয়ে ভালো চেনে—ওরা সবসময়ই একে অপরের কাছে সবকিছুই প্রায় ভাগ করে নিত—কিন্তু কোনো এক কারণে, তার কাছে যে বড় গোপন কথাটি সে এতদিন লুকিয়ে রেখেছে, তা নিয়ে সৃজন এখন ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

দাদা যে নিজে থেকে কথা বলবে না, এটা দেখে সৃষ্টি কথা বলার দায়িত্বটা নিজের হাতে তুলে নিল।

“এবার কী ব্যাপার ছিল বাবু? ডাম্পার নাকি দিদিমা?”

সৃজন একটা গভীর শ্বাস নিয়ে উত্তর দিল..

“এবার কোনোটিই না।”

“তাহলে কী দাদা, বল আমাকে?”

সৃজন জানত যে এটাই সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত—হয় এসপার, নয় ওসপার। তাই সে বোনকে তার স্বপ্নের কথা বলতে শুরু করল; আর বরাবরের মতোই, সৃষ্টি শুধু শুনেই গেল—যতক্ষণ না দাদার কথা শেষ হল।

“ওওও দাদা, তুই তো জানিস আমি তোর সঙ্গে এমনটা করব না—তুই-ই তো আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু আর একমাত্র মানুষ যে আমাকে বোঝে। চাইলেও আমি তোকে ছেড়ে যেতে পারব না বাবু।”

এ কথা শুনে সৃজনের মনটা নিঃসন্দেহে কিছুটা হালকা হল, কিন্তু সে জানত—সুযোগ থাকতে থাকতেই মনের কথাটা তাকে বলতেই হবে যে সে সৃষ্টিকে কতটা ভালোবাসে এবং কতটা গভীরভাবে শ্রদ্ধা করে। সে তাকে কেবল বোনের মতো ভালোবাসে না; সে তাকে ভালোবাসে ঠিক সেই পুরুষের মতো, যে পঞ্চাশ বছর ধরে সংসার করার পরও নিজের স্ত্রীর চোখে হারায়।

তাই আবারও একটা গভীর শ্বাস নিয়ে, সৃজন নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করল যাতে সে সৃষ্টিকে নিজের মনের কথা খুলে বলতে পারে।

সৃষ্টি স্পষ্টই বুঝতে পারছিল যে তার দাদার মাথায় কিছু একটা চলছে; আর নিজের দাদাকে ভালোভাবেই চেনার সুবাদে সে আঁচ করতে পারছিল যে, সে যা-ই বলতে যাচ্ছে, তা মোটেও সুখকর কিছু হবেনা।

সৃষ্টি প্রায়ই ভাবত, কেন সে তার দাদার মতো কাউকে খুঁজে পায় না। তার দাদা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি স্বভাবের ও যত্নশীল মানুষ, অথচ সে ভীষণ লাজুক এবং বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা এক ব্যক্তি। ২৪ বছর বয়সী ঘন কালো চুলের অধিকারী সৃজন সুঠাম ও আকর্ষণীয় গড়নের—উচ্চতা ৬ ফুট ২ ইঞ্চি। সৃষ্টি জানত, জীবনে যা কিছু করার ইচ্ছা তার দাদার ছিল তা করার মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতা দাদার রয়েছে, শুধুমাত্র অতিরিক্ত লাজুক স্বভাবের কারণে পারেনি।

সৃষ্টির জানে, সৃজনের প্রেমিকা বলতে কিছু নেই। জীবনে মাত্র একবারই একটা 'ডেট'-এর অভিজ্ঞতা হয়েছিল এবং সেই ঘটনাটি সুখকর পরিণতি পায়নি। তার নিজেরও ডেটিং-এর অভিজ্ঞতা খুব একটা সমৃদ্ধ ছিল না—সে সবসময়ই তার ডেট-সঙ্গীদের সঙ্গে নিজের দাদার তুলনা করত, আর কেউই সেই মানদণ্ড ছুঁতে পারত না। সবকিছু যদি নিখুঁত হত, তবে সৃজন ওর দাদা নয় প্রেমিক হত। কিন্তু দাদাকে একথা বলে সৃষ্টি তাদের সম্পর্কটা নষ্ট করতে চায়নি।

অবশেষে সৃজন মুখ খুলল।

“সৃষ্টি, তোকে একটা জরুরি কথা বলার আছে। বেশ কিছুদিন ধরেই কথাটা আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। তাই কথাটা বলে ফেলা দরকার… প্লিজ কথাটা শুনে আমাকে ঘেন্না করিস না বোন।”

সৃষ্টি কান্নায় ভেঙে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কেন তা সে জানে না, তবে তার মনের গহীনে কোনো এক অনূভুতি তাকে প্রস্তুত হতে বলছিল। কারণ ওর পৃথিবীটা এবার ওলটপালট হতে চলেছে।

“সৃষ্টি, কথাটা কীভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না। মনে মনে অনেক কিছুই ভেবেছি, কিন্তু কোনোটিই আসলে ঠিক সেই কথাটি নয়, যেটা আমি বলতে চাইছি।”

সৃষ্টি চাইছিল দাদা যেন চটজলদি কথাটা বলে ফেলে; তার আর তর সইছিল না।

“দাদা, বলেই ফেল না... ব্যাপারটা কী?”

“সৃষ্টি, আমি তোকে ভালোবাসি।”

“আমিও তোকে ভালোবাসি বাবু।”

সৃজন জানত বোন এমন‌ই বলবে। এরপর‌ই সে আসল কথাটা বলার প্রস্তুতি নিল।

“সৃষ্টি, সোনা... আমি... আমি তোকে ওভাবে ভালোবাসি না... আমি তোকে ঠিক সেভাবেই ভালোবাসি যেভাবে বাবা মাকে ভালোবাসত, যেভাবে দেবদাস পার্বতীকে ভালোবাসত, রোমিও জুলিয়েটকে ভালোবাসত, শাহজাহান মমতাজকে ভালোবাসত... সৃষ্টি, আমি তোকে ভীষণ ভালোবাসি আর তোকে ছাড়া আমি আর বাঁচতে পারব না। আমি তোকে চাই, আমার তোকে প্রয়োজন; দয়া করে বল যে তুইও ঠিক একই রকম ভালোবাসিস আমাকে।”

শুধু 'হতবাক' বললে কম বলা হবে। সৃষ্টি আগে থেকেই কান্নার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল; তাই দাদার মুখে এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সে ছোট বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। ওর দাদাও ঠিক ওর মতোই অনুভব করছে জেনে সে খুশিই হয়েছিল, কিন্তু এ বিষয়ে কী করা উচিত—তা নিয়ে সে ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। তাই সে একবার দাদার দিকে, তারপর মেঝের দিকে তাকাল... আর এরপর নিজের মাথাটা একটু ঠান্ডা করার জন্য দৌড়ে দোতলায় নিজের ঘরে চলে গেল।

সৃজনের চোখে জল চলে এল। সে বুঝতে পারছিল যে সে সব কিছু গুলিয়ে ফেলেছে। একমাত্র যে মানুষটি তাকে বিশ্বাস করত ও তার খেয়াল রাখত... অথচ সেই সম্পর্কটাই সে নষ্ট করে বসল। সে একবার ভাবল আত্মহত্যা করবে, কিন্তু তা করলে সৃষ্টিকে একেবারে একা হয়ে যাবে... সেই মুহূর্তে আত্মহত্যাকে যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, সে জানত যে মনে-প্রাণে সৃষ্টি কখনোই তার মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে পারবে না। তাদের সম্পর্কটা যে খুব গভীর।

সৃজন বোনের সঙ্গে আবারও কথা বলার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিল; ঠিক করল সে বলবে যে, ‘আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম আর সে আসলে ঠিক কী বলছিলাম তা নিজেও জানি না...’ পরক্ষণেই ভাবল, ‘না, আমি মিথ্যা বললে ও ঠিকই ধরে ফেলে। ওসব বলে কোনো লাভ হবে না।’

সৃজন দোতলায় উঠল, এবং বোনের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ।দরজায় আলতো করে টোকা দিয়ে খোলার চেষ্টা করল… দরজা ভিতর থেকে বন্ধ!

‘এটা তো সুখবর নয়... বোন তো কখনোই দরজা বন্ধ করে না,’ সৃজন ভাবল।

“সৃষ্টি, দয়া করে আমার কথাটা শোন...”

“এখন যা দাদা, আমাকে একটু একা থাকতে দে..”

“সৃষ্টি, প্লিজ!”

“Just fucking go now দাদা!”

মুহূর্তের মধ্যেই সৃজন দুটো বিষয় বুঝতে পারল। প্রথমত, সে যে কেবল সৃষ্টিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে তাই নয়, খেপিয়েও তুলেছে। তার বোন কখনো ওর সামনে এই ধরনের অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেনি। এগুলো ওর রুচিতে বাঁধত। দ্বিতীয়ত, এই মুহূর্তে বোনের সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ নেই। সৃষ্টি যখন রেগে থাকে, তখন তার সঙ্গে কথা বলা আর দেয়ালের সঙ্গে কথা বলা—একই ব্যাপার। সৃষ্টি মাঝে মাঝে ভীষণ জেদি হয়ে ওঠে; আর মনে হচ্ছে, এখন ঠিক তেমনই একটা সময়।

পুরোপুরি হতাশ হয়ে সৃজন ঘুমাতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে জানত যে তার ঘুম আসবে না, কিন্তু আপাতত বোনকে আর বিরক্ত করার কোনো মানে হয় না।

সৃজন বিছানায় শুয়ে মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিল।

‘ও তো বলতেই পারত যে আমি শুধু বন্ধুত্ব আর বোনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি তোকে... তা না…?… সৃষ্টি নিশ্চয়ই এখন মনে মনে ওকে খিস্তি দিচ্ছে আর বাসা বদলের পরিকল্পনা করছে... তুই একটা আস্ত গাধা...’ মনে মনে নিজেকে বলল সৃজন।

অবশেষে সৃজন কিছুটা শান্ত হল; ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন তখন ভোর চারটে বেজে গেছে। সৃষ্টির সঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে সে চোখ বুজল এবং একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। মনের ওপর থেকে সেই ভারী বোঝাটা যেন সরে গিয়ে, বেশ স্বস্তিতেই ঘুমিয়ে পড়ল সৃজন।

ওদিকে সৃষ্টি তখনও জেগে ছিল। দাদার উপর চিৎকার করায় তার খারাপ লাগছিল ঠিকই, কিন্তু কী আর করা যাবে—তার একান্তে কিছুটা সময় কাটানো খুব জরুরি ছিল। অন্তত পাঁচ বছর ধরে সে দাদার প্রেমে পড়েছে... বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর দাদা তার প্রতি কী অসামান্য যত্নশীলই না ছিল! কাঁদলে চোখের জল মুছে দিত, নিজের হাতে খাইয়ে দিত, দাদা তার জন্য সাধ্যমতো সবকিছুই করেছে... অথচ আজ সেই দাদাই তাকে বলছে যে তার মনের অনুভূতিও ঠিক একই রকম। সেও সৃষ্টিকে ভালোবাসে, তার সঙ্গে একটা সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়... সৃষ্টি জানত, নিজের দাদার প্রেমে পড়াটা নৈতিকভাবে ভুল। তারা যদি সত্যিই কোনো সম্পর্কে জড়ায়, তবে সমাজ তাদের কখনোই ভালোভাবে নেবে না... এখন সে কী করবে? কী‌-ই বা করার আছে তার?

সে সিদ্ধান্ত নিল, এসব নিয়ে তার আর কোনো মাথাব্যথা নেই। সমাজ যদি এটা মেনে নিতে না পারে, তবে সমাজ গোল্লায় যাক। ‘আমি আমার দাদাকে ভালোবাসি... ব্যাস’ সে ভাবল।

সৃষ্টি জানে যে, তার বাবা-মা তার এই সিদ্ধান্তে সমর্থন জানাত। তারা ছিল অত্যন্ত স্নেহশীল; সবসময়ই চাইত তাদের সন্তানরা যেন সুখে থাকে। বাবা-মা যখন মারা যায়, তখন সৃজনের বয়স ছিল মাত্র ১৩ আর সৃষ্টির ১০ বছর। তখন থেকে দিদিমার কাছেই তারা মানুষ হয়েছে। যখন সৃষ্টি ১৮ বছরে পা দিল আর সৃজন ২১ বছরে তার পরেই ওদের দিদিমা মারা যায়। ফলে ওরা আবারও একা হয়ে পড়ে—একে অপরের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তাদের আর কোনো অবলম্বন ছিল না।

সৃষ্টি একটু বিশ্রাম নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছিল। অবশেষে সে তার মনটা হালকা করার জন্য গান শুনবে বলে তার আইপডটা নিতে নিজের ডেস্কের কাছে গেল এবং দেখল আইপডটা সেখানে নেই। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল... গতকাল রাতে আইপডটা সে তার দাদাকে দিয়েছিল।

“ধুর বাল,” সে একটু বেশি জোরেই বলল। তারপর ডেস্কে বসে কম্পিউটারটা চালু করল।

সৃষ্টি সৃজন আর নিজের কিছু ছবি দেখছিল... গত মাসে পিকনিকে তোলা কিছু ছবি দেখে সে কিছুটা উত্তেজিত না হয়ে পারল না... স্বীকার করতেই হবে যে দাদা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় এবং চেহারার দিক থেকে সে মোটেও হিরোর চেয়ে কম কিছু নয়। সৃষ্টি একবার গুদে অঙ্গুলি হেলনের কথা ভাবল, কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত নিল যে দাদাকে নিজের মনের আসল অনুভূতির কথা না জানিয়েই তাকে নিয়ে এমন কল্পনা করাটা ঠিক হবে না। ‘হয়তো আমার কামনার তাড়না মেটাতে দাদা আমাকে সাহায্য করতে পারবে...’ সৃষ্টি মনে মনে ভাবল। কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল এবং ঘুমিয়ে পড়ল; মনে মনে ভাবতে লাগল, প্রেমিক হিসেবে সৃজন আসলে কেমন হবে।

চলবে…