…আগের পর্বের পর…
পরেরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই স্নান সেরে নেয় সৃজন। তৈরি হয়ে নেয় দেশের বাড়ী যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সৃষ্টি একটি বারের জন্যও বের হয়নি ওর রুম থেকে। গ্রামের উদ্দেশ্যে বেরোনোর আগে বোনের ঘরে যায় সৃজন।
সৃজন — আসছি রে বোন, তুই সাবধানে থাকিস।
সৃষ্টির বুকটা কেমন মুচড়ে ওঠে, ও সত্যিই বুঝতে পারে না যে কেন এমন লাগছে ওর। দু চোখের কোন ভিজে চকচক করে ওঠে। সৃজন এগিয়ে গিয়ে থুতুনি ধরে মুখ তুলে মুছে দেয় বোনের চোখ।
সৃজন — ধুর পাগলি, এইতো যাব আর আসব।
সৃষ্টি — (দাদার চোখের দিকে তাকিয়ে) আমার কথা তো আর শুনবি না, তাই বাঁধাও দেবনা আর। তবে জেনে রাখিস দাদা, তোর কিছু একটা হলে আমি সত্যিই বাঁচবনা রে।
বোনকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা স্নেহের চুম্বন এঁকে বেরিয়ে আসে সৃজন। ওরা তিনজন গিয়ে গাড়িতে ওঠে। সামনে রহমত কাকার পাশে সৃজন আর পিছনে বাবা মা। কলকাতা শহরের জ্যাম ঠেলে হাওড়া জেলার উদ্দেশ্যে এগোতে থাকে গাড়িটা।
ওদিকে কিলার কেষ্টো ওরফে ফাটাকেষ্টো ওর বিশাল ট্রাকটা নিয়ে রাস্তায় নেমেছে শিকারের আশায়।
সৃজনরা বেরিয়ে যেতেই কেমন যেন লাগে সৃষ্টির। মনটা যেন কু ডাকছে বারবার। মন খারাপের সময় গল্পের বই পড়লে মন ভালো হয়ে যায় সৃষ্টির। মন ভালো করতে সদ্য বইমেলা থেকে কেনা সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সোনালী অর্কিড’ বইটা বুক সেলফ থেকে বের করে পড়া শুরু করে। ২-৩ পৃষ্ঠা পড়তে না পড়তে দেখে যে ঠিক মন বাসাতে পারছে না ও। বিছানার এক কোনে ছুঁড়ে মারে বইটা। কেমন যেন একটা অস্থির অনুভূতি হচ্ছে ওর। কিচেনে ঢুকে এক মগ কফি বানায়। কফির মগটা নিয়ে ঘরে আসছে এমন সময়ে হঠাৎ পা পিছলে হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায় সিরামিকের কফি মগটা। গরম কফি ছড়িয়ে পড়ে পুরো মেঝেতে। সৃষ্টি যেন আৎকে ওঠে। কিচ্ছু ভালো লাগছেনা ওর। রিমোটটা নিয়ে টিভির সামনে বসে একটু। টিভি চালিয়ে সঙ্গীত বাংলা চ্যানেলটা খোলে। খুব ভালো ভালো বাংলা গান হয় এই চ্যানেলে সারাদিন। সেই সময় জিতের ‘সাথী’ সিনেমার“ জানিনা কোথায় আছো তুমি কত দূরে” গানটা বাজছিল। এইসব রোমান্টিক গান ওর অনেক ভালো লাগে৷ কিছুক্ষণ দেখতে দেখতেই সৃষ্টি বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করে যে, টিভির পর্দায় ও জিত আর প্রিয়াঙ্কার জায়গায় ওকে আর সৃজনকে দেখছে। নিজের কল্পনায় নিজের মনেই হেসে ওঠে সৃষ্টি।
এদিকে কলকাতা শহরের জ্যাম ঠেলে সৃজনদের গাড়িটা ততক্ষণে কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে পৌঁছে গেছে। একবার জাতীয় সড়কে উঠতে পারলেই আর বেশি সময় লাগবে না দেশের বাড়ি পৌঁছতে। গাড়ির ভেতরে সঞ্জয়বাবুর পছন্দ মতো মান্না দে'র গান চলছে।
“এই শহর ছেড়ে, আরো অনেক দূরে চলো কোথাও চলে যাই ওই আকাশটাকে শুধু চোখে রেখে মনটাকে কোথাও হারাই”
এক মনে সিটে হেলান দিয়ে গান শুনছে সৃজন আর ভাবছে সৃষ্টির কথা। চোখ বন্ধ করে কল্পনা করতে থাকে সেই জগৎটার যেখানে ও গতরাতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল সৃষ্টিকে। গভীর অরন্য, সবুজের সমারোহ চারদিকে। উঁচু নিচু গাছ, অসমতল টিলা গাছে গাছে রঙ বেরঙের ফুল। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত পরিবেশে মাঝে ছোট ছিমছাম একটা ঘর। সমস্ত চরাচরে মানুষ বলতে কেবল ওরা দুজন। এ যেন এক বিশাল কোনো সাম্রাজ্য যেই সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী যেন সৃষ্টি।
চোখ বন্ধ করে সৃজন দেখে ওদের সেই স্বপ্নের কুটীরের ভেতরে পুরু মখমলের বিছানা। গাঢ় সবুজ মখমলের চাদরের উপরে লাল লেহেঙ্গাতে সৃষ্টিকে মনে হচ্ছে যেন রূপকথার কোনো রানী। ধীর পায়ে সৃজন যায় সেই বিছানার কাছে৷ বিছানায় বসতেই ওর দিকে তাকিয়ে সৃষ্টি ওর সেই ভুবন ভোলানো মিষ্টি হাসি হাসে। হাত বাড়িয়ে ওকে বুকে টেনে নেয় সৃষ্টি। সৃষ্টির গা থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি সুবাস। সৃজন জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় বোনের।
সৃজন নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করে যে, ওর সুন্দরী বোনটা শুধুমাত্র ওর। শুধুমাত্র ওর-ই অধিকার আছে ওর বোনের শরীরটাকে ভোগ করার। এ শরীরটা কেউ ছোঁয়া তো দূরে থাক, যে খারাপ দৃষ্টিতে তাকাবে তার চোখ দুটি উপরে নেবে সৃজন। সৃষ্টি ওর জীবন। হঠাৎ চলন্ত গাড়িতে ব্রেক কষার এক তীব্র ঝাঁকুনিতে কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে সৃজন। দু চোখ খুলে ক্ষণিকের জন্য সামনে দেখতে পায় দৈত্যাকার ট্রাকটা আর তার পরেই সব অন্ধকার। চাপ চাপ অন্ধকার এর মাঝে একবার ভেসে ওঠে একটা মায়াবী মুখ, এ মুখটা ওর ভালোবাসার, ওর সুখের স্পন্দনের, ওর বোন সৃষ্টির মুখ। পরমূহুর্তেই যেন কোথায় হারিয়ে যায় সৃষ্টির মুখটা, আবারো অন্ধকার চারিদিক। মনে হয় যেন নিকষ কালো কোনো অন্ধকার গহ্বরের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে ও। আচ্ছা এর নামই কী মৃত্যু? তবে যে ও কথা দিয়েছিল সারা জীবন সৃষ্টির পাশে থাকবে?
পরপর কয়েকটা রোমান্টিক গান হওয়ার পরে বিজ্ঞাপন দেখানোর কারণে বিরক্ত হয়ে চ্যানেল পাল্টায় সৃষ্টি। চ্যানেল বদলাতে বদলাতে একটা খবরের চ্যানেলে আসতেই সৃষ্টি দেখে নীচে হেডলাইনের উপরে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে, “সাঁতরাগাছি উড়ালপুলে ট্রাক ও প্রাইভেট কারের মুখোমুখি সংঘর্ষ। ড্রাইভার সহ নিহত তিন, একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।”
খবরটা চোখে পড়তেই অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে সৃষ্টির মন। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে সৃজনের নম্বরে। ডায়াল করতেই কলার টিউনে গান বেজে ওঠে
“ভালোবাসা কেন এত অসহায়! বুকে প্রেম মনে আশা নিভে যায়! এই পথে, আজ আছি একসাথে কাল যদি মাঝ পথে; দূরে যেতে হয়...”
কলার টিউনে গানটা শুনে বুক ফেটে কান্না আসে সৃষ্টির। এটা একটা গান হল? কী কলার টিউন লাগিয়েছে এটা? বড্ড বার বেরেছে পাজিটার, আসুক না আজ শুধু। আচ্ছা করে বকে দেব আজ দুষ্টুটাকে। ২-৩ বার ফোন করার পরেও সৃজন ফোন ধরছে না দেখে বাবাকে ফোন করে। বাবাও তুলছে না ফোনটা!! হলটা কী? মায়ের নম্বরে কল করতেই দেখে ফোন সুইচ অফ। শেষমেষ রহমত কাকার নম্বরে ফোন করে, ওটাও বন্ধ পায় সৃষ্টি। টেনশন বারছে ওর। আজানা আশঙ্কাতে দুলে উঠছে ভেতরটা। টেনশনে রুমের ভেতরে পায়চারী শুরু করে ও। কী করবে ঠিক ভেবে উঠতে পারছে না। এমন সময়ে হঠাৎ দেখে ফোনটা বাজছে ওর। দৌড়ে গিয়ে ফোনটা হাতে নিতেই দেখে অপরিচিত নম্বর। কল রিসিভ করে সৃষ্টি-
— হ্যালো সৃষ্টি মুখার্জী বলছেন?
— হ্যাঁ বলছি, আপনি কে বলছেন?
— আমি পার্ক ক্লিনিক থেকে বলছি। গুরুতর একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, আপনাকে এক্ষুণি একবার আসতে হবে।
কথাটা শুনতেই হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায় সৃষ্টির। মনে হচ্ছিল যেন পায়ের নীচে থেকে মাটি সরে যাচ্ছে ওর। মাথাটা ঘুরে যায় ওর, পড়ে যেতে গিয়েও সোফার কোনটা আকড়ে ধরে কোনোরকমে নিজের পতন ঠেকায় সৃষ্টি। চারদিকটা কেমন অন্ধকার হয়ে আসে সৃষ্টির। তারপরেও তাড়াতাড়ি করে টি-শার্ট আর হট প্যান্টটা খুলে একটা জিন্স আর কুর্তি গায়ে দিয়ে হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। উবের বুক করে সোজা চলে যায় পার্ক ক্লিনিকে। মাত্র ১৫ মিনিটের পথ, কিন্তু আজ যেন অনন্ত সময় লাগছে। বার বার বাইরে তাকায় সৃষ্টি। নিজেকে কেমন নিঃস্ব আর অসহায় লাগছে ওর। ভেতর থেকে গুলিয়ে ওঠা কান্নাটাকে কোনোরকমে চাপা দিয়ে রেখেছে।
বারবার ফোন বের করে করে সময় দেখছে সৃষ্টি। ও জনে না সামনে কী অপেক্ষা করছে ওর জন্য, ভাবতেও চাইছে না এই মূহুর্তে, ভাবলেই কান্না পাচ্ছে শুধু। কিন্তু এখন ওকে কাঁদলে চলবে না, শক্ত হতে হবে। হাসপাতালের সামনে গাড়ি থেকে নেমে কোনোরকমে ভাড়াটা মিটিয়েই সৃষ্টি ঝড়ের বেগে ঢুকে পরে হাসপাতালে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পরে মেঝের উপর শোয়ানো লাশ ৩ টের উপর। মোটা তেরপল দিয়ে ঢাকা সারিবদ্ধ লাশগুলোর সামনে দৌড়ে যায় সৃষ্টি। এক ঝটকায় টেনে সরিয়ে দেয় তেরপলটা। বাবা, মা আর ড্রাইভার রহমত কাকার লাশ পাশাপাশি রাখা। বাবা মায়ের এই বিভৎস ক্ষতবিক্ষত চেহারা দেখে এতক্ষণ ধরে ভেতরে আটকে রাখা কান্নাটা এক লহমায় ছিটকে বেরিয়ে আসে। হুমুড়ি খেয়ে পরে সৃষ্টি বাবা মায়ের লাশের উপর। কেঁদে ওঠে হু হু করে। মনে হয় যেন একটা দমকা ঝড় এসে উড়িয়ে নিয়ে গেছে ওর মাথার উপরের ছাদটা। এতো নিরাশার মাঝেও সামান্য আশার আলো ওর জন্য সৃজন। ওর দাদা এখনো বেঁচে আছে। এমন সময়ে হাসপাতালে ঢোকে ওদের ম্যানেজার রবি হালদার।
সৃষ্টিকে দেখে এগিয়ে যায় শান্ত্বনা দিতে। সৃষ্টিকে ধরে দাঁড় করায়। কান্না থামানোর জন্য পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। এতো বিপদের মাঝে লোকটা শান্ত্বনা দিতে এসেছে যদিও, তার পরেও পিঠে হাত বোলানোতে যেন সারা শরীরটা ঘিনঘিন করে ওঠে সৃষ্টির। ছিটকে সরে যায় দূরে। রবি চোখ থেকে চশমাটা খুলে সৃষ্টিকে দেখিয়ে দেখিয়ে চোখ মুছতে থাকে আর বলে, “স্যার আমাকে কত আদর করতেন, নিজের ছেলের মতো দেখতেন সব সময়।” আর মনে মনে বলতে থাকে শালি রেন্ডি মাগি, বাপ মা মরলেও তেজ কমেনি এখনো। মাগির তেজ দেখানো বের করব আমি। এমন সময়ে এমার্জেন্সি থেকে ডাক্তারকে বের হতে দেখেই দৌড়ে যায় সৃষ্টি।
সৃষ্টি — ডক্টর আমার দাদার কি অবস্থা? মানে এক্সিডেন্টে যে রোগী বেঁচে আছে তার কথা বলছিলাম আর কি।
ডক্টর — দেখুন এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। এখনো জ্ঞান ফেরেনি, আগামী ২৪ ঘন্টায় যদি জ্ঞান না ফেরে তবে একটা অপারেশন করতে হবে। আর হ্যাঁ ওনার একটা পা মনে হয় স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে গেছে।
সৃষ্টি ওখানেই বসে পড়ে ধপ করে। কথা বলার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলেছে ও। সৃষ্টির অবস্থা দেখে রবি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। যদিও রবি ওর হয়েই কথা বলছে, তবুও রবির এই অতিরিক্ত সহানুভূতি সৃষ্টির মোটেও পছন্দ হয়না।
প্রায় ৩ ঘন্টা হয়ে গেল সৃষ্টি একই জায়গায় বসে আছে। রবির একাধিকবার বলা স্বত্ত্বেও সৃষ্টি বাড়ি গেল না। রবির এই তৎপরতার দেখে সৃষ্টির মনে সন্দেহ দানা পাকাতে শুরু করে। ওর আরো সন্দেহ হয় দাদা-বৌদির মৃত্যুর খবর পেয়েও ওর কাকা-কাকিমা এখনো হাসপাতালে আসেনি দেখে। অথচ ওদের দেশের বাড়ি থেকে কলকাতায় আসতে ২-২:৩০ ঘন্টার বেশি সময় লাগেনা। নিশ্চই ওর বাবা-মায়ের এক্সিডেন্টের পিছনে কোনো রহস্য আছে!
এমন সময় একজন নার্স দৌড়তে দৌড়তে এসে ডাক্তারকে এমার্জেন্সিতে নিয়ে যায়। সষ্টি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে এমার্জেন্সির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। খানিকক্ষণ পরে ডাক্তারবাবু এয়ার্জেন্সি থেকে বেরিয়ে আসেন। সৃষ্টি উৎসুক চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে থাকে। ডাক্তারবাবু সৃষ্টির কাঁধে হাত দিয়ে বলেন, “তোমার দাদার জ্ঞান ফিরেছে, কোনো ভয় নেই। তবে ওর একটা পায়ের হাড় পুরো গুঁড়ো হয়ে গেছে, সারাজীবনের জন্য ওকে এবার ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে হবে।” বলে নার্সকে নির্দেশ করলেন সৃষ্টিকে দাদার কাছে নিয়ে যেতে।
সৃষ্টিকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে নার্স চলে যায়। সৃষ্টিকে দেখেই হালকা হেসে ওঠে সৃজন। ওই অবস্থাতেই বোনকে চোখ মেরে মুচকি হেসে বলে, “কী ভেবেছিলিস? মরে যাব? বলেছিলাম না যে তোকে ছেড়ে কোথাও যাবনা।” চোখ মুছতে মুছতে দাদার পাশে গিয়ে বসে সৃষ্টি।
সৃজন — কিরে এই বোন কাঁদছিস কেন? ধুরর কিচ্ছু হয়নি আমার। দু একদিন থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, প্লিজ অন্তত এই কথাটা বলিস না যে স্বপ্নে দেখেছিলিস বলে আমি এক্সিডেন্ট করেছি। আচ্ছা, বাবা আর মায়ের কী অবস্থা? ওরা কোথায় রে? বাবা মায়ের আবার কোনো ফ্র্যাকচার ট্র্যাকচার হয়নি তো? হলে কিন্তু অনেক ভোগাবে। এই বয়সে ফ্র্যাকচার হলে সহজে ঠিক হয়না।
অনেক কষ্টে কান্না আটকে আলতো ভাবে দাদার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সৃষ্টি বলে, “ওরা ঠিক আছে দাদা।” সৃজন ওর দুই হাতে সৃষ্টির আরেকটা হাত আঁকড়ে ধরে। এমন সময়ে নার্স এসে ঢোকে। “হয়েছে সময় শেষ, আর কথা বলা যাবেনা এখন।” সৃষ্টি দেখে নার্সের মুখটা কেমন থমথমে হয়ে আছে। একটু আগের সেই হাসিখুশি ভাবটা আর নেই।
সৃষ্টি বেরোতেই পিছন পিছন বেরিয়ে আসে নার্সও। ভয়ার্ত চোখে বারবার তাকাতে থাকে আশেপাশে। নার্সকে বারবার আশেপাশে তাকাতে দেখে সৃষ্টি বলে, “কী হল কিছু বলবেন?” নার্সটা সৃষ্টির কাছে এগিয়ে আসে। তারপর ফিসফিস করে বলে, “বাঁচতে চাইলে দাদাকে নিয়ে পালাও।” নার্সের কথায় হতভম্ব হয়ে যায় সৃষ্টি। অবাক হয়ে বলে, “মানে?”
নার্স — মানে টানে বুঝিনা বোন, তবে তোমরা অনেক বিপদে আছো। অনেক ষড়যন্ত্র রচিত হয়েছে তোমাদের ঘিরে। তোমার দাদাকে আজ রাতেই ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে বিষ দেওয়ার জন্য ৫ লাখ টাকা অফার করা হয়েছে আমাকে। হাবভাবে এটাও বুঝিয়েছে চাইলে টাকার অঙ্ক বাড়তেও পারে। ৫ লাখ টাকা, বুঝতে পারছ তুমি? একজন নার্স সারা বছরেও এই পরিমান টাকা ইনকাম করতে পারেনা। যদিও আমি না করেছি, তবে এই হাসপাতালে নার্স আমি একাই নই। সবাই যে এত বড় একটা সুযোগ ছেড়ে দেবে তাও ভাবার কোনো কারন নেই। এই যে আমি ওদের না করে দিয়েছি, জানিনা তার জন্য আমার কপালে কী দুর্ভোগ আছে। হয় তো আমাকে চাকরি থেকেই বরখাস্ত করে দেবে ওরা। শুনেছি এর পিছনে রাজনৈতিক মদতও আছে। ওরা অনেক শক্তিশালি।
সৃষ্টির দুচোখে যেন ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। ভেবে পায়না ঠিক কি করবে ও।
নার্স — শোনো বোন, আমি আজ রাতেই তোমাদের পালাবার ব্যাবস্থা করে দেব। দাদাকে নিয়ে চলে যাও নাহলে সত্যিই বিপদে পড়বে।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সৃষ্টি। ও পালাবে৷ এসব বিষয় সম্পত্তি দিয়ে কী করবে, যদি সৃজনই না থাকে ওর জীবনে?
রাত তখন প্রায় ৩ টে। সারা হাসপাতাল প্রায় ঘুমন্ত। রোগীর সঙ্গে আসা আত্মীয় স্বজনরা বেশিরভাগ ফিরে গেছে, আর যারা আছে তারাও সব ঘুমিয়ে কাদা। রবিকে কোথাও দেখতে পেল না সৃষ্টি। হয়তো ভেবেছে মাথার উপর কেউ নেই, একা একটা মেয়ে আর কী করবে! তাছাড়া আজ রাতেই তো সৃজনের খেলা শেষ, সুতরাং শেষ সময়টা থাকুক দাদার কাছে, নিজের চোখে দেখুক দাদা মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়তে। তাই নিশ্চিন্ত মনে বাড়িতে গিয়ে ঘুমোচ্ছে। এমার্জেন্সি রুমটার সামনে সৃষ্টি অপেক্ষা করছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এমন সময়ে নার্স দিদি একটা হুইলচেয়ারে করে বের করে আনে সৃজনকে। ও তখন হুইলচেয়ারেই ঘুমোচ্ছে।
নার্স দিদি — এসো আমার সঙ্গে।
হুইল চেয়ার ঠেলে সিকিউরিটা গার্ড, পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে একটা গোপন রাস্তা দিয়ে সৃজনকে বের করে আনে ওরা। মেন গেট পার করে রাস্তায় চলে আসে ওরা।
নার্স দিদি — এই নরপিশাচদের নাগাল দূরে কোথাও চলে যাও বোন। বেঁচে থাকো তোমরা।
নার্সদিদির প্রতি যে কৃতজ্ঞতা বোধ করে সৃষ্টি তা ভাষায় প্রকাশ করবার ক্ষমতা নেই ওর। শুধু নার্সদিদিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে সৃষ্টি, তারপর বলে…
সৃষ্টি — আপনি আজ যা করলেন আমাদের জন্য, জীবনে ভুলব না আমরা। কিন্তু আমাদের জন্য আপনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিলেন কেন?
নার্স দিদি — ধরে নাও আমি তোমাদের বড় দিদি। ছোট ভাই-বোনের জন্য এইটুকু না হয় করলাম। আর সময় নষ্ট কোরোনা, জলদি পালাও। ওরা জানতে পারলে খুব বিপদে পড়ে যাবে। বলেই চোখ মুছতে মুছতে চলে যায় নার্স।
এই বিশাল শহরে মাঝরাতে সৃষ্টি একা। কোথায় যাবে ও? কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবে নিজেদের? এতটা অসহায় বোধ জীবনে কোনোদিন করেনি ও। বেরোনোর সময় কি ঘুনাক্ষরেও টের পেয়েছিল যে আর কখনো ফেরা হবেনা আলিপুরের ওই প্রিয় বাড়িটায়? হ্যান্ডব্যাগের চেনটা খুলে দেখে ভেতরে প্রায় হাজার পাঁচেক টাকা আর কিছু খুচরো পয়সা আছে। এই কটা টাকায় কী হবে! কতদিন আর চলবে!
এর মধ্যে ঘুম ভেঙ্গে গেছে সৃজনের। বারবার অবাক চোখে তাকাচ্ছে চারপাশে। কি ব্যাপার‚ স্বপ্ন দেখেছে নাকি ও?
সৃজন — (পিছনে মাথা ঘুরিয়ে) এই সৃষ্টি কী হয়েছে? আমরা এখন রাস্তায় কেন? মা বাবাই বা কোথায়? কাঁদছিস কেন তুই? কথা বল।
দাদাকে কী বলবে ভেবে পায়না সৃষ্টি। সারাদিনের আটকে রাখা কান্না যেন বাঁধন হারা স্রোতের মতো ছিটকে বেরিয়ে আসে ওর ভেতর থেকে। দাদাকে জড়িয়ে ধরে এই মধ্যরাতে মাঝরাস্তায় হুহু করে কেঁদে ফেলে সৃষ্টি।
এই ব্যাস্ত শহরে হুশ হুশ শব্দ তুলে এই মাঝরাতেও একের পর এক গাড়ি পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে ওদের অথচ ওদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না কেউ। কেউ জানলও না যে, একটা ষড়যন্ত্রের জালে কীভাবে ভেঙে খান খান হয়ে গেল একটা পরিবার। শুধু রাস্তার কিছু কুকুর অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। অবলা জীবগুলোর কাছে এটা এক অভিনব দৃশ্য। মাঝ রাস্তায় এত রাতে কখনো কোনো সুন্দরী মেয়েকে হুহু করে কাঁদতে দেখেনি ওরা।
…ক্রমশ…