অধ্যায় ২: শেখ পরিবার
বিন্দাসপূরের মুসলিম পাড়ার মধ্যখানে শেখ পরিবারের বাড়িটা একসময় ছিল পাড়ার সেরা বাড়ি। এখন সেটা আর সেরা নয় — কিন্তু এখনো সেটা আপন বাড়ি, যেটার দেয়ালে তিন প্রজন্মের হাতের ছাপ লেগে আছে। পাকা দেয়াল, মায়ার বাড়ী। সামনে একটা ছোট উঠোন — উঠোনে একটা আম গাছ, তার নিচে একটা কুয়া, কুয়ার পাশে একটা পাটাতন। উঠোনের এক কোণে একটা ফুলগাছের ঝাড় — গন্ধরাজ ফুল — গাছগুলো লায়লা লাগিয়েছিল বিয়ের পরের বছর। এখন বাগানটা বড় হয়েছে, বর্ষায় ফুল ফোটে, আর পুরো উঠোনে একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়ায়।
বাড়ির ভেতরে ঢুকলে একটা বড় ঘর — এটা একই সাথে বসার ঘর, খাওয়ার ঘর, আর রাতে শোওয়ার ঘর। ঘরের এক দেয়ালে একটা পুরোনো কাঠের আলমারি — তাতে কাপড়, কিছু বই, আর একটা পুরোনো রেডিও। অন্য দেয়ালে একটা পোস্টার — মক্কার কাবা শরীফ, সোনালি রঙে, যেটা রফিকুল শেখ হজ থেকে ফেরার পর ঝুলিয়েছিল। সেই পোস্টারের নিচে একটা ছোট তাকিয়া — সেটাতে রহিমা বেগম বসে তেলাওয়াত করেন। মেঝেতে মোটা কাপড়ের আসন — সেটাতে পরিবার বসে খায়, আর রাতে তার ওপর বিছানা পাতা হয়।
ঘরের এক কোণে একটা ছোট চুলা — গ্যাসের স্টোভ, তার ওপর একটা পুরোনো আলুমিনিয়ামের হাঁড়ি। এই চুলায় লায়লা রান্না করে।
আজ সকালে লায়লা রান্নাঘরে — অর্থাৎ ঘরের কোণে — দাঁড়িয়ে ভাত বাড়ছে। সে এখনো সকালের ঘুম থেকে পুরোপুরি জেগে ওঠেনি — চোখে একটা ভারী ভাব, চুল এখনো খোলা, কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। সে ভেতরের ঘরে একটা পুরোনো শাড়ি পরে আছে — সবুজ রঙের, সূক্ষ্ম ফুলের নকশা, যেটা অনেক ধোয়ায় এখন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ব্লাউজ নেই — শাড়ির আঁচল বুকের ওপর দিয়ে বাঁধা, কিন্তু ভেতরে কিছু নেই। ঘরে গরম, চুলার আগুনে ঘাম হচ্ছে, আর সেই ঘামে শাড়ির পাতলা কাপড় তার শরীরে চেপে বসেছে।
লায়লার শরীরটা একটা অদ্ভুত সৌন্দর্যের অধিকারী — যেটা এই গ্রামের প্রতিটা মর্দ, বিশেষ করে হিন্দুরা, লক্ষ্য করেছে, কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে বলে না। তার চামড়া ফর্সা — একটা অদ্ভুত ফর্সা, যেটা এই গ্রামের নারীদের মধ্যে কম দেখা যায়। শেখ পরিবারের আরবি-ফার্সি বংশপরিচয় তাদের চামড়ায় একটা উজ্জ্বলতা এনেছে — যেটা এই অঞ্চলের স্থানীয় বাঙালি মুসলিমদের মধ্যেও বিরল। লায়লার গায়ের রঙ গোলাপি-সাদা — যেন দুধের সাথে এক ফোঁটা রক্ত মেশানো হয়েছে। তার গাল গোলাকার, মসৃণ, তাতে কোনো দাগ নেই — শুধু চিবুকে একটা ছোট তিল, যেটা তার সৌন্দর্যকে আরও একটা বিশেষত্ব দেয়।
কিন্তু লায়লার শরীরের সবচেয়ে প্রকট দিকটা হলো তার বুক। তার স্তন বড় — খুব বড় — একটা গ্রাম্য মুসলিম নারীর শরীরে এত বড় স্তন থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু লায়লার ক্ষেত্রে সেটা একটা বিশেষ মাত্রায় পৌঁছেছে। তার স্তন দুটো ভারী, পূর্ণ, গোলাকার — যেগুলো শাড়ির পাতলা কাপড়ের নিচে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। স্তনের আকার এত বড় যে শাড়ির আঁচল সেগুলোকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না — বরং আঁচলের নিচে স্তনের উঁচু আকৃতি, তাদের ভারী গোলাকার আকার, আর মাঝে মাঝে স্তনবোঁটার একটা সূক্ষ্ম বিন্দু ফুটে ওঠে। লায়লা যখন হাঁড়ি নাড়ছে, তার শরীরের নড়াচড়ায় স্তন দুটো সামান্য দুলছে — একটা নরম, মাংসল দোলা, যেটা শাড়ির কাপড়ের ভেতর দিয়েও স্পষ্ট।
তার কোমর সরু — কিন্তু নিচে থেকে তার পাছা চওড়া, গোলাকার, মোটা। সালওয়ার বা শাড়ির নিচে তার পাছার এই আকৃতি একটা স্তূপাকার বক্ররেখা তৈরি করে — যেটা এই গ্রামের প্রতিটা মর্দ লক্ষ্য করে, কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে তাকায় না — কারণ লায়লা শেখ পরিবারের বউ, আর শেখ পরিবারের সাথে ঝামেলা করার সাহস এই পাড়ায় কারও নেই। কিন্তু চোখ তাকায় — লুকিয়ে, দূর থেকে, যখন লায়লা বাজারে যায়, যখন সে কুয়ার পাশে কাপড় কাচে, যখন সে ছাদে কাপড় শুকাতে দেয়।
লায়লা নিজে তার শরীর নিয়ে খুব সচেতন — সে জানে যে তার শরীর ভরাট, তার স্তন ভারী, তার পাছা চওড়া। সে বাইরে গেলে হিজাব পরে, শাড়ি আঁচল শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেয়, চোখ নিচু রাখে। কিন্তু ঘরে একা থাকলে সে আরাম করতে চায় — শাড়ি ঢিলা করে, ব্লাউজ না পরে, শরীরকে স্বাধীন রাখে। সে জানে না যে এই সকালের এই আরামের মুহূর্তে তার শরীর যে রূপ ধারণ করে, সেটা একটা অপরূপ দৃশ্য — যেটা যদি এই গ্রামের কোনো বেগানাহ, বেমাযহাবী মরদ দেখত, সে পাগল হয়ে যেত।
কারণ এই গ্রামের হিন্দু পুরুষরা — সহদেব মণ্ডল থেকে শুরু করে তার সবচেয়ে ছোট লোক পর্যন্ত — মুসলিম নারীদের একটা বিশেষ চোখে দেখে। তাদের কাছে মুসলিম নারীরা শুধু মানুষ নয় — তারা একটা কামনার প্রতীক, একটা নিষিদ্ধ স্বপ্ন, একটা অধিকার করতে চাওয়ার বস্তু। আর এর পেছনে একটা শারীরিক কারণ আছে — এই অঞ্চলের মুসলিম নারীদের গায়ের রঙ সাধারণত ফর্সা, তাদের শরীর মাংসল, স্তন বড়, পাছা চওড়া — যেটা এই গ্রামের হিন্দু নারীদের মধ্যে কম দেখা যায়। হিন্দু নারীরা সাধারণত পাতলা, শ্যামলা, স্তন ক্ষুদ্র। মুসলিম নারীদের আরবি-ফার্সি বংশপরিচয় তাদের শরীরে একটা ভিন্ন মাত্রা এনেছে — একটা নারীসুলভ পূর্ণতা, যেটা এই গ্রামের হিন্দু পুরুষদের কাছে একটা আকর্ষণের কেন্দ্র, একটা ঈর্ষার কারণ, আর একটা কামনার লক্ষ্য।
সহদেব মণ্ডল একবার রতনকে বলেছিল — "আমাদের মেয়েরা পাতলা, শুকনো। মুসলমানি মেয়েরা ফর্সা, মোটা, মাই বড়, পাছা চওড়া। ওই ফর্সা গায়ের রঙ আর বড় দুধ দেখলে যে কোনো লোকের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ধর্মে বলছে সব মানুষ সমান — কিন্তু চোখ কি সমান দেখে? চোখ দেখে ফর্সা গায়ে বড় মাই ঝুলছে — আর মন চায় সেটা নিজের করতে।"
রতন হেসে বলেছিল — "কাকা, তুমি তো দেবতা। কিন্তু কথা সত্যি — মুসলমানি মাগিদের শরীরে একটা জাদু আছে। ফর্সা গায়ে মাই দুইটা যেন পাকা পেঁপে — দুললে মন দুলে যায়। পাছা দেখলে হাত দিতে ইচ্ছা করে।"
সহদেব হেসেছিল — কিন্তু তার চোখে একটা গভীর কামনা ছিল, শুধু হাসি ছিল না। সে বলেছিল — "শুধু শরীর না রে — ওই পবিত্রতাটাও একটা জিনিস। মুসলমানি মেয়েরা হিজাব পরে, বুরকা লাগায়, নামাজ পড়ে, চোখ নিচু রাখে — সব পবিত্র, সব সতী। কিন্তু ভেতরে কী আছে কে জানে? আমি জানি — ভেতরে ওরা ওরকমই। শরীরে আগুন, গর্ভে তৃষ্ণা। পবিত্রতার আবরণে ওরা কামনা লুকায় — আর সেই কামনাকে আমি বের করে আনতে চাই।"
এই কথাগুলো লায়লা জানে না। সে জানে না যে তার শরীর, তার ফর্সা গায়ের রঙ, তার বড় স্তন, তার চওড়া পাছা — এই সবগুলো একটা অদৃশ্য শিকারের লক্ষ্যবস্তু হয়ে আছে। সে শুধু রান্না করছে, ভাত বাড়ছে, আর মাঝে মাঝে ছেলেমেয়ের কান্না শুনে মুখ ফেরাচ্ছে।
আতিকা এখন ঘরের মেঝেতে বসে খেলছে — একটা পুরোনো প্লাস্টিকের পুতুল নিয়ে, যেটার একটা হাত ভাঙা। সে তার পুতুলকে নাড়িয়ে বাড়িয়ে একা একা কথা বলছে — "তুই খাবি? ভাত খাবি? আম্মু দিবো।" তার গলাটা মিষ্টি, কিন্তু তোতলায়, তার কথা বলার ধরন এখনো অস্পষ্ট — কিছু শব্দ ঠিক হয়, কিছু নয়। সে তার মায়ের দিকে তাকায়, তারপর আবার পুতুল নিয়ে ব্যস্ত হয়।
রহিমা বেগম ঘরের কোণে তাকিয়ায় বসে তসবীহ জপছেন। তার চশমা পুরোনো, মোটা কাঁচের, চোখ দুটো ক্ষীণ — বয়সের ভারে দৃষ্টি কমে গেছে। তার মুখটা কুঁচকানো, কিন্তু তার মধ্যে একটা শান্ত সৌন্দর্য আছে — যেটা বয়সের সাথে আরও গভীর হয়েছে। তার গায়ের রঙ ফর্সা — তার ছেলে আর মেয়ের মতোই — কিন্তু বর্ষার রোদে তা এখন ব্রোঞ্জের আভা পেয়েছে। তার মাথায় সাদা চুল, সেটা তিনি একটা সাদা ওড়না দিয়ে ঢাকেন। তার হাতে একটা ছোট তসবিহ — সেটা তিনি মাঝে মাঝে গোনেন, আর ঠোঁটে নিঃশব্দে দরুদ পড়েন।
রহিমা বেগম বিধবা — রফিকুল শেখ ছয় বছর আগে মারা গেছেন, হার্ট অ্যাটাকে, মাঠে ধান কাটতে গিয়ে। তারপর থেকে তিনি একাই পরিবারটাকে টেনে নিয়েছেন — কায়েস তখন ছোট, নাজিয়া তখন স্কুলে। আম্মা তার স্বামীর স্মৃতি বুকে ধরে বেঁচে আছেন, তার বিশ্বাস ধরে রেখেছেন, তার ধৈর্য ধরে রেখেছেন। তিনি জানেন যে এই গ্রামে বিধবা মুসলিম নারী হিসেবে বেঁচে থাকা সহজ নয় — তিনি অর্ধশতাব্দী আগের দাঙ্গা দেখেছেন, তিনি পরিবার হারানোর কষ্ট জানেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন যে ধৈর্য আর বিশ্বাস সব পার করিয়ে দেয়।
আজ সকালে তসবিহ জপছেন, কিন্তু তার মন সেখানে নেই। তার মন জমি মামলায়। গতকাল সভায় তিনি যাননি — বয়সের ভারে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা তার পক্ষে কঠিন। কিন্তু কায়েস ফিরে এসে যা বলেছে, তাতে তার মনে একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সভায় সহদেব মণ্ডল কীভাবে বসেছিল, কীভাবে কথা বলেছিল, কীভাবে সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল — সেটা শুনে তিনি বুঝেছেন যে সহদেব শুধু একটা জমিদার নয়, সে একটা পরিকল্পিত শক্তি। আর তার পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু জমি নয়।
রহিমা বেগম জানেন না যে তার পরিবারের নারীদের ওপর কী বিপদ আসছে — কিন্তু তার মাতৃসুলভ ষষ্ঠীন্দ্রী কিছু একটা টের পাচ্ছে। তিনি কোরআন বন্ধ করে জানালার দিকে তাকান — বাইরে সকালের রোদ, উঠোনে মুরগি খুঁটছে, রাস্তায় কেউ একজন হাঁটছে। সাধারণ একটা সকাল — কিন্তু তাঁর বুকে একটা ধুকপুকানি আছে যেটা তিনি ব্যাখ্যা করতে পারেন না।
নাজিয়া এখন ঘরে নেই — সে কলেজে গেছে। কিন্তু তার ঘর — অর্থাৎ ঘরের এক কোণে তার একটা ছোট জায়গা — সেখানে তার বই, খাতা, একটা পুরোনো ব্যাগ। নাজিয়া পড়ে সমাজবিজ্ঞান — শহরের একটা সরকারি কলেজে, যেখানে সে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সে সপ্তাহে তিনদিন কলেজে যায় — বাসে চড়ে, আধা ঘণ্টার পথ। কলেজে সে পড়াশোনায় ভালো, শিক্ষকরা তাকে পছন্দ করে, সে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, সে একটা সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। সে চায় সমাজকর্মী হতে — গ্রামে ফিরে এসে মুসলিম নারীদের নিয়ে কাজ করতে চায়, তাদের শিক্ষিত করতে চায়, তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে চায়।
নাজিয়ার শরীর তার বৌমার মতো নয়। সে পাতলা — স্লিম, লম্বা, সরু কোমর, লম্বা পা। কিন্তু তার শরীরে একটা তারুণ্যের দৃঢ়তা আছে — তার স্তন ছোট, কিন্তু উঁচু আর শক্ত, যেগুলো সালওয়ার কামিজের নিচে স্পষ্টভাবে দেখা যায় কারণ সে ব্রা পরে কিন্তু তার স্তনের আকৃতি এত উঁচু যে ব্রাও সেগুলোকে পুরোপুরি চেপে রাখতে পারে না। তার পাছা ছোট, কিন্তু গোলাকার, মজবুত — সালওয়ারের নিচে একটা স্পষ্ট বিন্দু তৈরি করে। তার গায়ের রঙ ফর্সা — তার বৌমার মতোই, কিন্তু তার ফর্সা আরও উজ্জ্বল, কারণ সে বেশি রোদে থাকে না, কলেজে থাকে, ঘরে পড়ে। তার চামড়া মসৃণ, একটা দুধের সাদা রঙ, যেটা রোদে একটু গোলাপি হয়ে যায়। তার মুখটা সুন্দর — শক্ত চোয়াল, বড় কালো চোখ, পাতলা ঠোঁট, আর একটা দৃঢ় থুতনি। সে হাঁটে একটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে — মাথা উঁচু, পিঠ সোজা, পা দ্রুত। এই গ্রামের মেয়েদের মধ্যে সে আলাদা — সে আধুনিক, সে সচেতন, সে প্রশ্ন করে।
আর সেটাই এই গ্রামের হিন্দু পুরুষদের আরও বেশি আকৃষ্ট করে। লায়লা হলো একটা নরম, পূর্ণ, মাতৃসুলভ নারী — যেটাকে দেখলে মর্দের মনে হয় এটাকে ভালোবেসে রাখা যায়, এটাকে ভোগ করা যায়, এটাকে নিজের করে রাখা যায়। কিন্তু নাজিয়া হলো একটা চ্যালেঞ্জ — সে আত্মবিশ্বাসী, সে সচেতন, সে প্রশ্ন করে। তাকে জয় করা কঠিন — আর সেটাই তাকে আরও কাম্য করে তোলে। সহদেব মণ্ডল একবার ভেবেছিল — এই মেয়েটাকে ভাঙতে পারলে, এই আত্মবিশ্বাসটাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারলে, এই ফর্সা শরীরটাকে নিজের অধীনে আনতে পারলে — সেটা একটা সত্যিকারের আসল বিজয় হবে। কারণ লায়লাকে নেওয়া সহজ — সে নরম, সে ভয় পায়, সে স্বামীর কথা শোনে। কিন্তু নাজিয়াকে নেওয়া কঠিন — সে লড়াই করবে, সে প্রতিরোধ করবে, সে চিৎকার করবে। আর সেই প্রতিরোধকে ভাঙার মজাই আলাদা।
কায়েস এখন মাঠে গেছে — সকালে ভাত খেয়ে বেরিয়েছে, ধান ক্ষেত দেখতে। জমি এখন তার নিয়ন্ত্রণে আছে — আদালতের রায় এখনো আসেনি, তাই সে চাষ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে জানে যে এই চাষ হয়তো শেষ চাষ — যদি আদালত সহদেবের পক্ষে রায় দেয়, তাহলে এই জমি আর তার নয়। এই ভয়টা তার মনে সবসময় থাকে — কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করে না। সে একটা গর্বিত মানুষ — তার বাবা তাকে শিখিয়েছিল যে মাটির সাথে সম্পর্ক হলো ঈমানের সম্পর্ক, সেটা ছাড়া যায় না। কায়েস সেই শিক্ষা মেনে চলে — কিন্তু তিনি জানেন না যে এই মাটির সাথে সম্পর্ক ছাড়ার চেয়েও বড় বিপদ আসছে — তার পরিবারের নারীদের ওপর।
দুপুরে কায়েস ফিরে আসে। তার শরীর ঘামে ভেজা, চামড়া রোদে পুড়ে গাঢ় হয়েছে — কিন্তু তার গায়ের রঙ মূলত ফর্সা, শেখ পরিবারের বংশপরিচয় অনুযায়ী, রোদে একটু ব্রোঞ্জ হয়েছে মাত্র। সে উঠোনে পা ধুয়ে ঘরে ঢোকে, লায়লা তাকে একটা গ্লাস পানি দেয়। কায়েস পানি খায়, তারপর পাটাতনে বসে বিশ্রাম করে।
লায়লা দুপুরের ভাত বাড়ে — ভাত, ডাল, একটু ভাজি। খাবার সাধারণ — কিন্তু পরিবারের সামর্থ্য এখন সেটাই। জমি মামলার খরচ, আইনজীবীর ফি, আদালতে যাতায়াত — সব মিলিয়ে পরিবারের সঞ্চয় কমে আসছে। লায়লা টের পাচ্ছে — বাজারে মাছ কিনতে পারে না, মাংস তো দূরের কথা, এমনি সাধারণ সবজিও এখন একটু একটু করে কমছে। সে কায়েসকে কিছু বলে না — সে জানে যে কায়েস নিজেই চাপে আছে, তাকে আর চাপ দিতে নেই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে চিন্তিত।
ভাত খাওয়ার পর আতিকা ঘুমিয়ে পড়ে — লায়লা তাকে কোলে নিয়ে দোলে, তারপর বিছানায় শুইয়ে দেয়। আতিকার ঘুম দেখলে মন ছুঁয়ে যায় — ছোট মুখটা একটু খোলা, নাক দিয়ে সরু শ্বাসের শব্দ, হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ। লায়লা তার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, তারপর উঠে আসে।
বিকেলে নাজিয়া কলেজ থেকে ফেরে। সে বাস থেকে নেমে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে হেঁটে আসছে — তার পিঠে ব্যাগ, মাথায় একটা ছোট ওড়না, সালওয়ার কামিজ — নীল রঙের, সাধারণ, কিন্তু তার শরীরে চেপে বসেছে। সে হাঁটছে — দ্রুত, আত্মবিশ্বাসী, মাথা উঁচু। তার সালওয়ার কামিজ তার শরীরের আকৃতি প্রকট করে — তার উঁচু স্তন, তার সরু কোমর, তার ছোট কিন্তু গোলাকার পাছা। তার ফর্সা গায়ের রঙ বিকেলের রোদে উজ্জ্বল — যেন একটা জ্বলন্ত মোমবাতি, যেটা এই গ্রামের ধূলি আর ধোঁয়ার মধ্যে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
গ্রামের চায়ের দোকানে কয়েকজন হিন্দু যুবক বসে আছে — রতনের লোক, সহদেবের দলের ছোট ছেলেরা। তারা নাজিয়াকে দেখে। একজন বলে — "ওই দ্যাখ — শেখের বেটী। কী ফর্সা, কী চামকী শরীর।"
আরেকজন যোগ দেয় — "ফর্সা তো বটেই, মাই দুইটা দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। ওড়না সরলে যেন দুইটা পাকা পেঁপে বাইরে আসবে।"
তৃতীয়জন হাসে — "পাছাটা দেখলে হাত দিতে ইচ্ছা করে। ছোট কিন্তু গোল — যেন আঁটি। সালওয়ারের নিচে দুলছে দেখলি?"
প্রথমজন বলে — "সহদেব কাকা কি এটাকে চায়?"
আরেকজন ফিসফিস করে বলে — "কাকা তো সব মুসলমান মাগী দেখলেই ধোন হাতায়। কিন্তু এইটাকে খাস করে চায় — কারণ এটা পাকা না, কাঁচা। কাঁচা ফল কামড়ে চুষে খাওয়ার মজাই আলাদা।"
তারা হাসে — একটা নোংরা, কামুক হাসি, যেটা চায়ের দোকানের ধূলি আর ধোঁয়ায় মিশে যায়। নাজিয়া এই কথা শুনতে পায় না — সে দূরে, রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটছে। কিন্তু সে টের পায় — একটা অস্বস্তি, লোভী চোখের তাকানো, যেটা সে মাঝে মাঝে অনুভব করে যখন গ্রামের হিন্দু পুরুষদের পাশ দিয়ে যায়। সে জানে না সেটা কী — কিন্তু সে তার ওড়না শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেয়, পা দ্রুত করে, আর বাড়ির দিকে চলে আসে।
নাজিয়া বাড়িতে ঢোকে। লায়লা রান্নাঘরে — এখন বিকেলের চা বানাচ্ছে। নাজিয়া তার ব্যাগ নামিয়ে রাখে, ওড়না খুলে একটা চেয়ারে রাখে। তার চুল খোলা — লম্বা, কালো, চকচকে, যেটা তার কোমর পর্যন্ত নেমে আছে। তার কামিজ ঘামে একটু ভেজা — কাঁধের কাছে গোলাপি দাগ। সে একটা গ্লাস পানি নিয়ে খায়, তারপর লায়লার পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে মুখ ডোবায়।
"কী রে ভাবী, কী করছিস?" নাজিয়া বলে।
লায়লা হাসে — "চা বানাচ্ছি। তোর ভাই আসবে এক্ষুনি। তোর কলেজ কেমন গেল?"
নাজিয়া বলে — "ভালো। আজ ক্লাসে একটা বিতর্ক হলো — নারীর অধিকার নিয়ে। আমি বললাম গ্রামের মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে, তাদের অধিকার দিতে হবে। স্যার বললেন আমি ঠিক বলেছি।"
লায়লা মুচকি হাসে — "তুই তো ছোটোবেলায় ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করতি, এখন করিস বিতর্ক। কিন্তু গ্রামে কথা বললে কি কেউ শোনে? এই গ্রামে মেয়েদের কথা কে শোনে?"
নাজিয়া বলে — "তাই তো শোনাতে হবে। আমি শোনাব।"
লায়লা তার ননদের দিকে তাকায় — একটা মায়া আর একটা উদ্বেগ মিশ্রিত দৃষ্টিতে। সে জানে নাজিয়া সাহসী, কিন্তু সে জানে এই গ্রামে সাহসী মেয়েদের কী হয়। সে বলে — "সাবধানে থাকিস তো। এই গ্রামে মেয়েদের সাহস দেখালে কিন্তু মেয়েদেরই কষ্ট হয়।"
নাজিয়া বলে — "কষ্ট হলে হবে। কিন্তু চুপ থাকলে তো কিছু বদলাবে না।"
লায়লা কিছু বলতে চায়, কিন্তু থামে। সে জানে নাজিয়া তার মত ছাড়বে না — সে তার বোনের মতো, ছোট থেকে একসাথে বড় হয়েছে, লায়লা বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে এসেছে তখন নাজিয়া ছোট ছিল, এখন সে বড় হয়েছে, তার নিজের মত আছে। লায়লা তাকে ভালোবাসে, কিন্তু চিন্তাও করে।
কায়েস বিকেলে ফিরে আসে। সে পাটাতনে বসে চা খায়, তারপর পরিবার নিয়ে বসে। আজ একটা আলোচনা হবে — জমি মামলা নিয়ে। রহিমা বেগম তসবিহ বন্ধ করে তাদের সাথে বসেন। আতিকা এখনো ঘুমোচ্ছে।
কায়েস বলে — "আজ আদালতে তারিখ ছিল। উকিল বললো মামলাটা এখন জটিল হয়েছে। সহদেবের কাগজপত্র শক্তিশালী — জমিদারি নথে তার নাম আছে, সেটা সরানো কঠিন। আমাদের দখলস্বত্বের দলিল আছে, কিন্তু সহদেব বলছে সেটা জাল।"
লায়লা জিজ্ঞেস করে — "তাহলে কী হবে? জমিটা কি চলে যাবে?"
কায়েস বলে — "যাবে না। আমি লড়ব। তিন প্রজন্মের জমি — এটা ছাড়া যায় না। উকিল বলছে উচ্চ আদালতে যেতে হবে। টাকা লাগবে — কিন্তু আমি জোগাড় করব।"
নাজিয়া বলে — "ভাই, টাকা কোথায় পাবে? আমাদের কাছে তো কিছু নেই। আমার কলেজের ফি এখনো দেওয়া হয়নি — দুই মাস বাকি।"
কায়েস বলে — "কলেজের ফি আমি দেব। জমি বাঁচানো জরুরি।"
নাজিয়া রাগ করে বলে — "আর আমার পড়াশোনা? আমি কি পড়ব না? জমি বাঁচাতে গিয়ে আমার জীবন কি থামবে?"
কায়েস বলে — "থামবে না। একটু দেরি হবে — কিন্তু থামবে না।"
লায়লা মাঝে পড়ে — "নাজিয়া, তোর ভাই ঠিক বলছে। জমি না থাকলে আমরা কী খাব? পড়াশোনা পরে হবে — আগে পেটের ভাত জোগাড় করতে হবে।"
নাজিয়া বলে — "ভাবী, তুই তো সবসময় ভাইয়ের পক্ষে কথা বলিস। কিন্তু আমি কি কিছু বললে ভুল বলি?"
রহিমা বেগম চুপ করে ছিলেন — এখন মুখ খোলেন। তার গলা নরম, কিন্তু দৃঢ় — "নাজিয়া, তোর ভাই পরিবারের জন্য লড়ছে। তুই তার সাথে ঝগড় করিস না। জমি খোদার দেওয়া — খোদা রক্ষা করবেন। তুই পড়াশোনা কর — তোর সময় আসবে।"
নাজিয়া চুপ করে যায় — কিন্তু তার মুখে একটা অসন্তোষ থেকে যায়। সে জানে আম্মা ভালো বলছেন, কিন্তু তার মন মানে না। সে চায় লড়তে — কিন্তু সে চায় তার নিজের জীবনও এগিয়ে যাক।
কায়েস আবার বলে — "সহদেব মণ্ডল একটা চালাক লোক। সে শুধু আদালতে লড়ছে না — সে অন্যভাবেও চাপ দিচ্ছে। গত সপ্তাহে সে আমার নাম শ্রমিক সমবায় থেকে বাদ দিয়েছে। এখন আমি আর সমবায়ের কাজ পাই না। অন্য মুসলিম দোকানের সাথে যারা আমাদের ব্যবসা করে, তাদেরও সহদেব হুমকি দিয়েছে।"
লায়লা চমকে ওঠে — "কী হুমকি?"
কায়েস বলে — "যারা আমাদের সাথে ব্যবসা করবে, তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দেবে। বলেছে — শেখ পরিবারের সাথে কেউ মিশবে না, মিশলে পরিণতি ভালো হবে না।"
লায়লার মুখ ফ্যাকাশে হয় — তার চোখে একটা ভয় ফুটে ওঠে। সে বলে — "এটা তো খারাপ লক্ষণ। সহদেব কি আমাদের শেষ করে দিতে চায়?"
কায়েস বলে — "শেষ করতে চায় না — ভয় দেখাতে চায়। সে চায় আমি ভয় পেয়ে জমি ছেড়ে দিই। কিন্তু আমি ছাড়ব না।"
নাজিয়া বলে — "ভাই, তুই একা লড়বি কেন? গ্রামে অন্য মুসলিম আছে — তাদের সাথে কথা বল। মিলেমিশে লড়লে সহদেব পারবে না।"
কায়েস মাথা নাড়ে — "অন্য মুসলিমরা ভয় পায়। সহদেবের পেশিশক্তি আছে, রতন আছে। কেউ আমার পক্ষে দাঁড়াতে চায় না — সবাই ভয়ে চুপ করে আছে।"
লায়লা বলে — "আমি তো অন্য মুসলিম বৌদের কাছে শুনেছি — সহদেব শুধু জমি নিয়ে না, মেয়েদের নিয়েও নাক ডাকায়। গ্রামের মুসলিম বৌদের ওপর চোখ রাখে। কেউ কেউ বলে — সে মুসলিম মেয়েদের দিকে খারাপ চোখে তাকায়।"
ঘরে একটা নীরবতা নেমে আসে। কায়েস একটু থাকে, তারপর বলে — "সেটা আমি জানি না। তবে সহদেব যে খারাপ লোক, সেটা আমি জানি। কিন্তু আমি ভয় পাই না — খোদা আমাদের দেখবেন।"
রহিমা বেগম বলেন — "খোদা দেখবেন ঠিকই — কিন্তু আমাদেরও সাবধানে থাকতে হবে। কায়েস, তুই মেয়েদের দিকে খেয়াল রাখ। নাজিয়া কলেজে যায় — সাবধানে থাক। লায়লা বাজারে যায় — সাবধানে থাক। এই গ্রামে মুসলিম মেয়েদের চলাফেরা সহজ নয়।"
নাজিয়া বলে — "আম্মা, আমি তো সাবধানে থাকি। কিন্তু আমি কি ভয়ে ঘরে বন্দি থাকব? আমি তো পড়তে যাব, কাজ করতে যাব। যদি সহদেব খারাপ কিছু ভাবে, আমি লড়ব।"
আম্মা বলেন — "লড়াই করতে হবে — কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে। শক্তি দিয়ে নয়। সহদেবের শক্তি আছে — আমাদের নেই। আমাদের অস্ত্র হলো ধৈর্য আর বিশ্বাস।"
নাজিয়া মুখ ফিরিয়ে নেয় — সে আম্মার কথা মানে না, কিন্তু কিছু বলে না। সে উঠে তার বই খুলে বসে — কিন্তু তার মন বইয়ে নেই। তার মন জমিতে, সহদেবে, আর একটা অস্বস্তিতে — যেটা সে প্রকাশ করতে পারে না, কিন্তু যেটা তাকে কাঁড়ি কাঁড়ি করে খাচ্ছে।
লায়লা চুপচাপ বসে থাকে। তার মনে একটা ভয় — একটা গভীর, অজানা ভয়, যেটা সে শব্দে প্রকাশ করতে পারে না। সে অন্য মুসলিম বৌদের কাছে কিছু কথা শুনেছে — সহদেবের ব্যাপারে, তার চোখের ব্যাপারে, তার নারীদের প্রতি আসক্তির ব্যাপারে। কেউ কেউ বলেছে যে সহদেব কিছু মুসলিম নারীর সাথে খারাপ কিছু করেছে — কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে বলে না, ফিসফিস করে বলে, আর কেউ বিশ্বাস করে না। লায়লা এই কথাগুলো কায়েসকে বলে না — সে জানে কায়েস রেগে যাবে, বলবে এসব গুজব। কিন্তু লায়লার মনে হয় — এসব গুজব নয়। এসব সত্যি।
সে তার শাড়ির আঁচল টেনে বুকে জড়িয়ে নেয় — একটা অচেতন অভ্যাস, যেটা সে করে যখন অস্বস্তিতে থাকে। তার বুকের ভেতর স্তন দুটো ভারী — একটা ভারী উপস্থিতি, যেটা সে সবসময় অনুভব করে, কিন্তু এখন সেটা তাকে একটা অন্যরকম অস্বস্তি দেয়। তার মনে হয় — তার শরীরটা একটা বোঝা, একটা লক্ষ্যবস্তু, একটা কামনার প্রতীক — যেটা সে চায় না, কিন্তু যেটা সে এড়াতে পারে না।
সে উঠে আতিকার কাছে যায় — মেয়েটা এখন জেগে উঠেছে, কান্না শুরু করেছে। লায়লা তাকে কোলে তোলে, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, মুখে একটা লালনা গান গায় — "ঘুমাও ঘুমাও সোনামণি, ঘুমাও ঘুমাও রাজকন্যা..." আতিকা ধীরে ধীরে শান্ত হয়, তার ছোট হাত মায়ের বুকে চেপে ধরে। লায়লা তাকে দুধ খাওয়ায় — একটা প্রাকৃতিক, মাতৃসুলভ কাজ, যেটা সে আর কারও সামনে করে না, কিন্তু ঘরে একা থাকলে করে। আতিকা তার মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দুধ খায়, আর লায়লা তার মেয়ের মাথায় হাত রেখে থাকে — একটা মা, একটা বউ, একটা গ্রাম্য মুসলিম নারী — যে তার পরিবারকে ভালোবাসে, তার ঈমানকে ধরে রাখে, আর ভয় করে — একটা অজানা, অদৃশ্য ভয়, যেটা তার বুকে বাসা বাঁধছে।
সন্ধ্যা নামে। আজান ভেসে আসে — মাগরিবের নামাজ। কায়েস অজু করে নামাজে যায়, রহিমা বেগম ঘরেই নামাজ পড়েন। লায়লা আতিকাকে শুইয়ে দিয়ে নিজেও অজু করে নামাজ পড়ে। নাজিয়া পড়ে — কিন্তু আজ তার মন নামাজে নেই। সে সিজদায় যায়, মাথা মাটিতে রাখে, কিন্তু তার মনে জমি, সহদেব, আর একটা প্রশ্ন — কেন এই গ্রামে মুসলিম হিসেবে বাঁচতে এত কঠিন? কেন তাকে ভয় করতে হবে? কেন তার বৌমাকে ভয় করতে হবে? কেন তার আম্মাকে ভয় করতে হবে?
সে দুআ করে — "খোদা, আমাদের রক্ষা করো। আমাদের জমি রক্ষা করো। আমাদের পরিবার রক্ষা করো। আমাদের ইজ্জত রক্ষা করো।"
কিন্তু সে জানে না যে তার দুআ কি খোদার কাছে পৌঁছাবে, নাকি বাতাসে মিশে যাবে — যে বাতাসে সহদেব মণ্ডলের নিঃশ্বাসও মিশে আছে, তার কামনা, তার পরিকল্পনা, তার নিষ্ঠুর তৃষ্ণা — যেটা শেখ পরিবারের দিকে এগিয়ে আসছে, ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, যেন একটা ছায়া যেটা দিন দিন বড় হচ্ছে।
রাতে খাওয়ার পর পরিবার বিছানায় যায়। কায়েস আর লায়লা এক বিছানায়, নাজিয়া আর আতিকা আরেক বিছানায়, আম্মা একা একটা ছোট তাকিয়ায়। ঘর অন্ধকার — শুধু জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ ডাকছে, দূরে কোনো শেয়াল ডাকছে।
কায়েস ফিসফিস করে বলে — "লায়লা, তুই কি চিন্তা করছিস?"
লায়লা চুপ করে থাকে। তারপর বলে — "হ্যাঁ। সহদেবের ব্যাপারে। কায়েস, আমি কিছু কথা শুনেছি — সহদেব নাকি মুসলিম মেয়েদের দিকে খারাপ চোখে তাকায়। কেউ কেউ বলে সে..."
কায়েস বলে — "গুজব। এসব গুজব ছড়ায় যাতে মুসলিমরা ভয় পায়। সহদেব চায় আমরা ভয় পেয়ে জমি ছেড়ে দিই। এসব কথায় কান দিস না।"
লায়লা বলে — "কিন্তু যদি সত্যি হয়? যদি সে সত্যিই..."
কায়েস তার হাত ধরে — "সত্যি হলেও আমি আছি। তোকে কিছু হতে দেব না। নাজিয়াকে কিছু হতে দেব না। আমি তোদের রক্ষা করব।"
লায়লা চুপ করে যায়। সে কায়েসের হাত চেপে ধরে, তার শরীর তার শরীরের সাথে মিশে যায়। সে জানে কায়েস তাকে ভালোবাসে, তাকে রক্ষা করতে চায়। কিন্তু সে জানে যে কায়েস সহদেবের সত্যিকারের ক্ষমতা বোঝে না — সে সহদেবকে একটা সাধারণ জমিদার মনে করে, কিন্তু সহদেব সেটা নয়। সহদেব একটা শিকারি — যে তার শিকারের জন্য অপেক্ষা করছে, ধৈর্য ধরে, পরিকল্পনা করে। আর তার শিকার শুধু জমি নয় — তার শিকার লায়লার শরীর, নাজিয়ার শরীর, তাদের গর্ভ, তাদের ইজ্জত।
কিন্তু লায়লা এই কথা বলতে পারে না — কারণ সে জানে কায়েস শুনবে না, বলবে গুজব, বলবে ভয় দেখাচ্ছিস। সে চুপ করে থাকে, তার ভয় বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে, আর কায়েসের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে।
কিন্তু ঘুম আসে না। তার চোখ খোলা থাকে, অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে। তার মনে সহদেবের চোখ — সেই ছোট, তীক্ষ্ণ, কালো চোখ, যেটা গতকাল সভায় তার দিকে তাকিয়েছিল — সেটা তার মনে আছে, যেটা সে তখন টের পায়নি, কিন্তু এখন টের পাচ্ছে। সেই চোখ তাকে দেখছে — তার শরীর দেখছে, তার বুক দেখছে, তার পাছা দেখছে — একটা নৃশংস, ক্ষুধার্ত চোখ, যেটা তাকে খাবে।
লায়লা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখ বন্ধ করে, আর নিজেকে বলে — "খোদা, আমাদের রক্ষা করো।"
বাইরে রাত গভীর হয়। বিন্দাসপূর ঘুমিয়ে পড়ে — কিন্তু ঘুমের নিচে একটা জাগরণ আছে, একটা পরিকল্পনা আছে, একটা ছায়া আছে — যেটা দিন দিন বড় হচ্ছে, আর তার নাম সহদেব মণ্ডল।