এদিকে মূল ভবনের অন্দরমহলে আর এক কাণ্ড চলছে। বৌভাতের দিন মূল আকর্ষণ যে ফুলশয্যার খাট, তা সাজানোর জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দুই দক্ষ ডেকোরেটর কর্মীকে। খুব নিপুণ হাতে তারা সাজাতে শুরু করলেন দর্শনা ও সৌরভের ফুলশয্যার সেই পবিত্র ঘরটি। দেখতে দেখতে প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চললো এই সুক্ষ্ম সাজসজ্জার কাজ। পুরো খাটটি মুড়ে ফেলা হলো তাজা সুবাসিত গোলাপ আর রজনীগন্ধার মালায়। বিছানার ওপর পাতা হলো একদম বরফ-সাদা ধবধবে পরিষ্কার এক সেট প্রিমিয়াম বেড কভার আর সেই সাদা চাদরের ওপর অত্যন্ত শৈল্পিক ভঙ্গিতে লাল ও গোলাপি গোলাপের পাঁপড়ি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হলো একটা মস্ত বড়ো ‘হার্ট’ চিহ্ন — যা তাদের সদ্য শুরু হওয়া ভালোবাসার গভীরতাকে জানান দিচ্ছিলো। ঘরের এককোণে থাকা আধুনিক ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের দুটো বড়ো ফুলদানিতে খাড়া করে সাজিয়ে রাখা হলো ধবধবে সাদা রজনীগন্ধার স্টিক। সমস্ত ফুলের সুগন্ধে গোটা ঘরটা এক মাদকতা ছড়ানো স্বর্গীয় আবেশে ভরে উঠলো।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সন্ধ্যা সাতটা বাজছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হলো দর্শনার ব্রাইডাল মেকআপ পর্ব। মেকআপ শেষ হওয়ার পর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে দর্শনা নিজেই যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর মেকআপ রুম থেকে তাকে সরাসরি নিয়ে আসা হলো সেই বিশাল রিসেপশন ভবনের মূল মঞ্চে। দর্শনা যখন ধীরে ধীরে হেঁটে মঞ্চের দিকে প্রবেশ করলো, তখন সেখানে উপস্থিত শত শত আমন্ত্রিত অতিথির চোখ এক লহমায় ছানাবড়া হয়ে গেল। বিয়ের দিন দর্শনাকে লাল বেনারসিতে যেমন অপূর্ব সুন্দর লাগছিল, আজ এই রিসেপশনের গ্ল্যামারাস লুকে তাকে তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি মোহময়ী ও আকর্ষণীয় লাগছে! এই সন্ধ্যার সাজ যেন তার সমস্ত সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
কী দারুণভাবেই না সাজানো হয়েছে দর্শনাকে! সেই নতুন রূপের নিখুঁত ও বিস্তারিত বর্ণনা না দিলেই নয়। আজকের এই জমকালো রিসেপশন পার্টির জন্য দর্শনা বেছে নিয়েছিল একটি নজরকাড়া রয়্যাল ব্লু কালারের হেভিলি এমব্রয়ডারি করা লেহেঙ্গা। ওই গভীর নীল রঙের পোশাকের ওপর রূপালী ও সোনালী জরির কাজ তার গায়ের ফর্সা রঙের সাথে এক অদ্ভুত রাজকীয় কন্ট্রাস্ট তৈরি করেছিল। তার কমলালেবুর কোয়ার মতো নরম ও সেক্সি গোলাপি ঠোঁট দুটিতে খুব যত্নের সাথে লাগানো ছিল ল্যাকমি কোম্পানির পিঙ্ক কালারের ম্যাট লিপস্টিক, আর তার ওপর প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল জবজবে করে চকচকে লিপগ্লস। যার কারণে দর্শনার সেই রসালো ঠোঁট দুটোকে দেখতে লাগছিল দারুণ আকর্ষণীয় ও চুম্বকীয়, যা যেকোনো পুরুষের বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য একাই যথেষ্ট। দর্শনার পটলচেরা টানা টানা মায়াবী চোখে খুব নিখুঁতভাবে টানা টানা করে লাগানো হয়েছিল ওয়াটারপ্রুফ আইলাইনার, গাঢ় কাজল এবং ঘন মাসকারা। চোখের পাতায় আর চোখের কোণে আজকের লেহেঙ্গার রঙের সাথে একদম পারফেক্টলি ম্যাচিং করে ব্যবহার করা হয়েছিল ব্লু কালারের স্পার্কলি আই শ্যাডো। এছাড়া দর্শনার চোখ দুটোকে আরও গভীর, রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য লাগানো হয়েছিল ঘন কৃত্রিম আই ল্যাশ। সব মিলিয়ে দর্শনার ওই টানা টানা চোখ দুটোর দিকে বেশিক্ষণ চোখ রাখা মুশকিল ছিল। দর্শনার গাল দুটোতে ছোঁয়া লেগেছিল হালকা পিঙ্ক কালারের ন্যাচারাল ব্লাশারের, যার ফলে তার ফর্সা ও নরম গাল দুটো আরও বেশি মিষ্টি ও লাজুক দেখাচ্ছিল। দর্শনার গোটা মুখটায় অত্যন্ত উচ্চমানের লিকুইড ফাউন্ডেশন এবং ট্রান্সলুসেন্ট ফেস পাউডার এমনভাবে ব্লেন্ড করা হয়েছিল, যা তার ত্বকে এনে দিয়েছিল এক অদ্ভুত কাঁচের মতো স্বচ্ছ দীপ্তি।
দর্শনার মাথাভরা ঘন, কালো, লম্বা ও সিল্কি চুলগুলো এতটাই নিখুঁতভাবে একটা বড়ো এবং সুন্দর ডিজাইনের চুলের কাঁটা দিয়ে বড়ো এক খোঁপার আকারে বাঁধা হয়েছিল, যা তার ঘাড়ের ও গলার নিখুঁত লাইনটিকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। এই চমৎকার হেয়ার স্টাইলের কারণে দর্শনাকে আরও বেশি লম্বা ও আকর্ষণীয় লাগছিল। দর্শনার সিঁথির ঠিক মাঝখানে চওড়া করে ভরা ছিল লাল গুঁড়ো সিঁদুর, যা তার বিবাহিত রূপের পবিত্রতা বাড়িয়ে দিয়েছিল শতগুণ। আর কপালে নিখুঁত করে লিকুইড সিঁদুর দিয়ে টানা ও গোল করে আঁকা হয়েছিল একটি ট্রেডিশনাল টিপ।
দর্শনার দুই হাতে কনুই পর্যন্ত পরা ছিল শাখা, পলা এবং তার সাথে নিখুঁতভাবে ম্যাচিং করা রয়্যাল ব্লু ও সোনালী কাঁচের চুড়ি। দর্শনার নরম ও সুন্দর হাত এবং পায়ের প্রতিটা নখ খুব যত্নের সাথে রয়্যাল ব্লু কালারের নেইলপলিশ দিয়ে অসাধারণ এক নেইল আর্ট করা হয়েছিল। দর্শনার পুরো শরীর থেকে ভেসে আসছিল এক মৃদু, মাতাল করা ও মোহময়ী পারফিউমের সুগন্ধ। দর্শনার গলায় ঝুলছিল ভারী সোনার নেকলেস, কানে বড়ো ও আকর্ষণীয় ঝুমকো, নাকে ছোট হীরের নাকছাবি এবং হাতে মানানসই সোনার বালা। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল দর্শনার দুই পায়ে পরা রূপোর ভারী ভারী নুপুর, যা সে যখনই সামান্য নড়াচড়া করছিল, এক জাদুকরী রুনুঝুনু শব্দ তুলছিল।
দর্শনার দুই হাতের তালুতে এবং কনুই পর্যন্ত অত্যন্ত নিখুঁত ও জটিল ডিজাইনে ফোটানো হয়েছিল গাঢ় রঙের মেহেন্দি। দর্শনার মাথার খোঁপার চারপাশে খুব যত্ন করে জড়ানো ছিল তাজা জুঁই ফুলের একটা লম্বা মালা, যেখান থেকে ভেসে আসছিল মিষ্টি ফুলের সুবাস। আর দর্শনার ফর্সা পা দুটিতে চমৎকারভাবে রাঙানো হয়েছিল লাল আলতা। দর্শনার মাথার চুলের একদম ডগা থেকে শুরু করে পায়ের নখ অবধি — পুরো শরীরটাই ছিল ব্যাপক সেক্সি, আবেদনময়ী ও সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতিমা! এমনিতেই দর্শনার মুখের সেই অবর্ণনীয় মিষ্টি শ্রী আর টকটকে ফর্সা গায়ের রং, তার ওপর এই চড়া অথচ রাজকীয় মেকআপ ও সাজগোজে তাকে দেখতে লাগছিল ঠিক যেন কোনো বিদেশের ম্যাগাজিন থেকে নেমে আসা এক আকর্ষণীয় বার্বি ডল! রয়্যাল ব্লু কালারের ওই লেহেঙ্গায় দর্শনাকে এতটাই মানিয়েছিল যে তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো স্বর্গের কোনো অপ্সরা বা পরী মর্ত্যে নেমে এসে এই রিসেপশন মঞ্চে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উপস্থিত অতিথিরা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন এই অনবদ্য রূপের দিকে, আর সৌরভের বুকটা গর্ব ও ভালোবাসায় বারবার ফুলে উঠছিল।
রিসেপশন ভবনের উজ্জ্বল আলো, হীরের মতো ঝিলমিল করা রয়্যাল ব্লু লেহেঙ্গার রোশনাই আর চারপাশের মানুষের কোলাহলে তখন এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সৌরভের বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা নিকট আত্মীয়দের মুখে মুখে তখন শুধুই একটি নাম — দর্শনা। এতো রূপসী, এতো নিখুঁত লাবণ্যময়ী মেয়ে যেন এই পুরো তল্লাটে আগে কখনও কেউ দেখেনি। সৌরভ এর এক সমবয়েসি বন্ধু বলছে, “সৌরভ লাকি ম্যান বটে, এমন অপ্সরীকে ঘরে এনেছে!” কেউ আবার ফিসফিস করে বলছেন, “যেন সাক্ষাৎ রানীমা দাঁড়িয়ে আছেন!” সকলের চোখের দৃষ্টি তখন কেবলই মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটকে রয়েছে দর্শনার ওপর। দর্শনার মুখের সেই মিষ্টি চাউনি, তার টকটকে ফর্সা গায়ের রঙে ওই নীল লেহেঙ্গার দীপ্তি আর তার চালচলনের আভিজাত্য উপস্থিত সমস্ত পুরুষের বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছিলো।
কিন্তু ওই বিপুল জনস্রোত, আলোকসজ্জা আর প্রশংসার ভিড়ের মধ্যে এমন একজন মানুষ উপস্থিত ছিল, যার চোখ দুটো দর্শনার ওপর পড়ার পর থেকে আর এক মুহূর্তের জন্যেও সরে নি। সে হলো শুভ। সৌরভদের বাড়ির ঠিক পাশের ছোট্ট বাড়িটায় তার বাসা। শুভর জীবনটা ছোট থেকেই বড়ো সংগ্রামের। একদম শিশুকালে বাবা মারা যাওয়ার পর, যখন সে সবেমাত্র মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করেছে, ঠিক তখনই তার মা-ও তাকে চিরতরে একা ফেলে পাড়ি দিয়েছিলেন পরলোকে। তারপর থেকে পড়ালেখার সমস্ত অধ্যায় চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে গেছে শুভর। পেটের টানে তাকে পা বাড়াতে হয়েছিল ভিনরাজ্যে। শুভর এক মামা থাকেন মুম্বাইতে; সেখানে বড়ো বড়ো আবাসন প্রকল্প বা হাই-রাইজ বিল্ডিং তৈরির কাজে বহু নির্মাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, আর সেই নির্মাণ জগতেই দিনমজুর হিসেবে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে জীবন কাটে শুভর।
চলবে... গল্পটা কেমন লাগছে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন...
ভালো লাগলে লাইক দেবেন আর আমার প্রোফাইলটা ফলো করবেন।।।
এরপর কি ঘটতে চলেছে দর্শনা আর সৌরভের ফুলশয্যার রাতে?? জানতে হলে অবশ্যই পড়তে থাকুন আমার লেখা জনপ্রিয় সিরিজ "দর্শনার গোপন ডায়েরি"..