নিয়োগ পর্ব ২৫

Niyog 25

মাধবীকে রক্ষিতা বলায় সমরেশ প্রতিবাদ জানালো। জামাল তখন বললো সে জানেনা মাধবী সমরেশের কে হয়? রক্ষিতা না গার্ল ফ্রেন্ড না বান্ধবী, নাকি শুধুই বন্ধুর বউ?

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: নিয়োগ - এক অন্তঃসত্ত্বা জনিত পরকীয়া

প্রকাশের সময়:13 Nov 2025

আগের পর্ব: নিয়োগ পর্ব ২৪

মানিক কিছুক্ষণ ঝাঙ্কুটা-কে ভেতরে ঢুকিয়ে রেখে পড়ে রইলো মাধবীর উপরে। মাধবী কানে কানে বললো, "কমরেড, এবার তো যেতে হবে..."

মাধবীর এলোকেশী চুলের ঘন জঙ্গলে মুখ ডুবিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল সে। মুখটা তুলে মাধবীর দিকে তাকালো।

"যেতেই হবে??", করুণ স্বর শোনালো মানিকের ভোকাল কর্ড।

"তুমি যাবে না?", পাল্টা প্রশ্ন মাধবীর।

"হুমম!!"

মানিক ও মাধবীর সম্পর্কটা যেন অনেক বেশি গাঢ় হচ্ছিলো, সমরেশের তুলনায়। কারণ সমরেশের মতো মানিক নিজের মোহ-কে ভালোবাসার মোড়কে মুড়ে নিয়ে বারবার মাধবীকে জোর করছিল না তাকে ভালোবাসতে। তার ফান্ডা খুব পরিষ্কার ছিল, ধর তক্তা মার পেরেক! ফলে মানিকের জন্য মাধবীর মনে সংসার ও ব্যভিচার নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছিল না। মানিক তাদের সম্পর্কটা-কে আজীবন খাঁচায় বন্দি রাখার কোনো প্রয়াস দেখাচ্ছিল না।

মানিক আস্তে আস্তে নিজের ঝাঙ্কুটা-কে মাধবীর ভেতর থেকে বার করলো। হাত দিয়ে একটু ঝাঁকিয়ে বীর্যের শেষ বিন্দুটা ফেলে বিছানা ত্যাগ করলো। ডায়াবেটিসের রোগী ন্যাংটো অবস্থায় সবার আগে বাথরুমের দিকে পাড়ি জমালো। মাধবী চিৎ হয়ে উর্দ্ধপানে তাকিয়ে পড়ে রইলো।

বাথরুম থেকে ফিরে এসে মানিক এক এক করে জাঙ্গিয়া ও প্যান্টটা পড়ে নিল। মাধবী আস্তে আস্তে শরীরটা তুলে বসলো।

"দে, তোকে সায়াটা পড়িয়ে দিই, আয়...", বলে মানিক মেঝে থেকে সায়াটা শাড়ি থেকে আলাদা করে তুলে নিয়ে আনলো।

"বাবাঃ! মানিক মিত্তির আমাকে কাপড় পড়িয়ে দেবে??", অবাক হল মাধবী।

"শাড়ি তো পড়াতে পারবো না। তবে সায়া পরিয়ে দেব", বলে মানিক মাধবীর পা দুটো তুলে সায়া গুঁজতে শুরু করলো। ছোট ছেলেকে হাফ প্যান্ট পড়ানোর মতো সায়াটা জংঘা প্রদেশে নিয়ে এসে তারপর মাধবীকে একহাতে বিছানা থেকে একটু তুলে কোমর পর্যন্ত পরিয়ে দিল। ভালো করে সায়ার গিঁটটাও বেঁধে দিল।

ব্লাউজটা বিছানা থেকে আরেকটু দূরে টেবিলের তলায় গিয়ে পড়েছিল। সেখান থেকে নিয়ে এসে মানিক মাধবীকে তা পড়ালো। প্যান্টের পকেটে সেই এক গাছা সেফটিপিনের ছোট্ট প্যাকেট ছিল। সেটা বার করে সেখান থেকে কয়েকটা সেফটিপিন নিয়ে এক এক করে ব্লাউজের ছিঁড়ে যাওয়া হুক গুলোকে জোড়াতাপ্পি দিয়ে লাগালো।

ব্লাউজটা পরিয়ে দিয়ে মানিক একবার মাধবীর স্তনযুগলের দিকে তাকালো। হাত দিয়ে আলতো স্পর্শ করে বললো, "এবার শাড়িটা নিজে পড়ে নে। ওটা পড়াতে পারিনা।"

"এই বিষয়ে তোমরা সব পুরুষ মানুষেরা এক। প্রত্যেকে শাড়ি খুলতে জানে, পড়াতে জানেনা।.. হুহঃ!!.."

মিছি মিছি রাগ দেখিয়ে মাধবী বিছানা থেকে নেমে শাড়িটা পড়তে লাগলো। মানিক বিছানায় এসে বসে গালে হাত দিয়ে মাধবীর শাড়ি পড়া দেখছিল। মাধবী মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো, "কি দেখছো ওভাবে?"

"শাড়ি পড়ানো শিখছি। যদি ভবিষ্যতে কাজে আসে..."

মানিকের ইঙ্গিত ছিল পরিষ্কার। সে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায়। এ দেখাই শেষ দেখা নয়।

মাধবী কিছু বললো না। চুপচাপ শাড়িটা পড়ে নিল।

"চলো, এবার যেতে হবে।"

"ডিলের বিষয় তো কিছু বললেই না?? তাছাড়া যাবে কোথায়? কি বলবে সমরেশকে হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার কারণ?"

মাধবীর স্মরণে এলো যে এতকিছুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলোই তো সে বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছিল। কি জাদু করলো মানিক তার উপর? নাকি এটা তার সেই স্টকহোম সিনড্রোমের প্রভাব? তা যাই হোক না কেন, মানিক তাকে মনে করিয়ে দিয়ে উপকারই করলো, তা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই।

মাধবী তখন টেবিলের পাশে থাকা চেয়ারটা টেনে নিয়ে বিছানার কাছে আনলো। মানিকের সামনে মুখ করে সেই চেয়ারে বসলো, তাকে ডিলটা বোঝাতে। এছাড়া সান্যাল বাড়ি থেকে হঠাৎ উবে যাওয়ার কারণ হিসেবে নিজেও কি অজুহাত দেবে সমরেশকে, তা নিয়েও মানিকের সাথে সলা পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল তার।

------------------------------------------------

ওদিকে সমরেশ পার্ক সার্কাসে গিয়ে দেখে মানিকের অফিস বন্ধ। আশেপাশের দোকানদার-দের জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, দাদা আজকে এই মুখো হয়েই নিই। কিচ্ছু বুঝতে পারেনা সমরেশ, কোথায় তার মাধবী? মানিক চুপি চুপি বাড়িতে ঢুকে তাকে কিডন্যাপ করে নেয়নি তো? নিয়ে যাবেই বা কোথায়? এ শহরে উত্তর দক্ষিণ মিলিয়ে মানিকের যে ক'টা আস্তানা রয়েছে তারই কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই সমরেশের কাছে!

সমরেশ ভাবলো, মানিক তো প্রথমে তাকে হুমকিই দিয়েছিল, রাণীসমেত সমস্ত রাজ্যপাট চাই তার। তবে কি দলিলটা চুরি করে, মাধবীকে নিয়ে পগারপার হল সে??

তাহলে বিমলকে কি জবাব দেবে? হাজার হোক, বিমল মাধবীর স্বামী!.. এখন কি করবে? কোথায় খুঁজবে? ভাবতে ভাবতে কিরকম পাগল পাগল লাগছিল সমরেশের নিজেকে।

বিমলও নিজের অফিসে মন টেকাতে পারছিলনা। সকাল সকাল বউয়ের কাছ থেকে এক পরপুরুষের জন্য ঝাড় খেয়ে এসেছে। যদি গতকালের মতো আজকেও সান্যাল বাড়িতে সারপ্রাইস ভিসিট দিয়ে তাদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে তাহলে কপালে অশেষ দুঃখ নাচবে। সামাল দিতে পারবে তো সেই পরিস্থিতিটাকে? তারও কি ভালো লাগবে ফের একবার নিজের বউয়ের কোনো অন্তর্বাস সমরেশের বাড়ির কোনো আসবাবের নিচে থেকে খুঁজে পেলে? হয়তো লাগবে!!

সমরেশ আর মাধবীকে একসাথে কল্পনা করে এক অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করছে সে। এটা কেন হচ্ছে? সে তো পারভার্ট স্বামী নয়। বুকে পাথর রেখেই নিয়োজিত করেছিল নিজের স্ত্রীকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। তবু তার অবাধ্য মন কোনো যুক্তি না শুনে, চাইছে আরো একবার তার স্ত্রী ও বন্ধুকে অপ্রস্তুত করে তুলতে। তাতে যদি তার স্ত্রী আবার তাকে বকা দেয় তো দেবে! ছেড়ে তো কোথাও যাবেনা!.. এই ভেবে বিমল চেয়ার ছেড়ে উঠলো।

সরকারি চাকরি সুখের চাকরি। অফিসে আসা যাওয়ার সময়ের কোনো মা বাপ্ নেই। নিজের থেকে উর্দ্ধতন কর্তাদের মন যুগিয়ে চললেই হল। বিমল তা পারে। তাই স্যারের থেকে আর্লি লিভের অনুমতি পেতে বেশি সময় লাগলো না। সব কাজ তাড়াতাড়ি গুছিয়ে দিয়ে সেদিনের মতো তার অফিস সারা।

মানিকের মতোই ফোর্ডের লেটেস্ট মডেলের গাড়িটাতে বসে চাবি ঘোরালো। প্রমোশন পেয়েই পুরোনো ধ্যার-ধ্যারে অ্যাম্বাসাডরটা বিক্রি করে সদ্য কিনেছে গাড়িটা। কলকাতায় হাতে গোনা কয়েকজনের কাছেই আছে এই মডেলটা, তার মধ্যে একজন বিমল, একজন মানিক। দুজনের কাছেই দুর্লভ দুই ইম্পোর্টেড মডেল রয়েছে। ১) ফোর্ড এসকর্ট, ২) মাধবীলতা বসু মল্লিক।

বিমলের গন্তব্য ছিল সান্যাল বাড়ি, কিন্তু সান্যাল বাবুর নিজের?? সে কোথায় যাবে তার মাধবীকে খুঁজতে?

আশেপাশের দোকানদার-দের আবার ভালো করে জিজ্ঞেস করলো সমরেশ, যে মানিক এই সময়ে ঠিক কোথায় থাকতে পারে? ওর থাকার জায়গা গুলো কোথায়? কিন্তু কেউই তার সন্ধান দিতে পারলো না। কেউ কেউ সত্যিই জানতো না, তো কেউ আবার জেনেও না জানার ভান করলো মানিকের ত্রাসে। পাছে এই অজানা লোকটা যদি মানিকের শত্রুপক্ষের কেউ হয়ে থাকে, তাহলে মানিক রক্ষে রাখবে না সেই খোঁজ দাতার!

দূর থেকে একটা হাত কাটা গোল গলা ধূসর রঙা গেঞ্জি পরিহিত লোক দাঁড়িয়ে সমরেশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। মানিকের খোঁজ না পেয়ে যখন সমরেশ হতাশ হয়ে পিছন ফিরে হাঁটা দিলো তখুনি সেই লোকটা তার পিছু নিল। কিছুদূর এগোতেই সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পরে সমরেশকে বগলদাবা করে টেনে নিয়ে আনলো মসজিদের দক্ষিণ দেওয়ালের পিছনে। সূর্য তখন পশ্চিম দিকে ঢলছে। মসজিদে মাগরিবের নামাজ মাইকে পড়া হচ্ছে। সবার মন সেদিকে। সেই সুযোগে লোকটা সমরেশকে জিজ্ঞেস করলো, "কেস-টা কি দাদা?"

সমরেশ হতচকিত হয়েগেছিল, "কে আপনি??"

"আমি কে সেটা ছাড়ুন, আগে বলুন ওই মানিকের খোঁজ নিচ্ছিলেন কেন? কি দরকার আপনার ওর সাথে?"

সমরেশ খানিকটা ভয় পেয়ে বললো, "তা.. তা.. আমি আপনাকে বলতে যাব কেন?"

জামালকে দেখতে সত্যিই খুব ভয়ানক। বাম চোখের নিচ থেকে আড়াআড়ি ভাবে থুতনি অবধি একটা কাটা দাগ, অতীতের কোনো ছুরিকাঘাতের হবে। সেই চোখে আবার সুরমা দেওয়া, উস্কো খুস্কো চুল, হাতে এ কে ৪৭ দিলেই ওয়ান্টেড মনে হবে। এমন একটা ব্যক্তিত্বকে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

"না বললে যে মানিকের হদিশ পাবেন না।.."

"আপনি জানেন সে কোথায় আছে..."

"হুম.."

"বলুন না তাহলে প্লিস! আমার খুব দরকার ওকে", সমরেশ এবার খানিক কাকুতি মিনতি করতে লাগলো।

সমরেশের ছটফটানি দেখে জামাল মিঞা বললো, "সেটাই তো জানতে চাইছি, কিসের এত দরকার? খোলসা করে না বললে বলা যাবেনা ওর পজিশন।"

জামালের চাউনিটা বেশ আগ্রাসনে ভরপুর। এরকম রুক্ষ দেখতে লোককে বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু ঠেলার নাম বাবাজি। তবে ঠেলায় পড়লেও কতটা বিশ্বাস করে কতটুকু বলা উচিত? এ কি মানিকেরই লোক? গুপ্তচর? হাজারো দুশ্চিন্তার অনৈতিক মেলবন্ধন ঘটছিল তার মনের ভেতর। ভয়ে চোখে মুখে ইতস্তত ভাব ছিল স্পষ্ট।

"কি হল, মুখে কোনো কথা নেই কেন? বাঁড়া ঢুকেছে?.. অয়েই, ঝেড়ে কাশো তো, কি মতলবে আসা! না বললে নাঃ, এখানেই লোক ডেকে জ্যান্ত পুঁতে দেব", বলেই পকেট থেকে চাকুটা বার করলো জামাল।

তা দেখেই সমরেশের বিচি মাথায় উঠে গিয়ে গড়-গড় করে সত্যিটা উগলে দিল, "মানিক আমার প্রিয় মানুষটাকে নিয়ে কোথাও একটা চলে গ্যাছে। খুঁজে পাচ্ছিনা...."

"তা প্রিয় মানুষটা কে শুনি?", চাকুটা আবার ফোল্ড করে পকেটে ঢুকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।

-- এবার কি সে মাধবীর নামটা নেবে? -- মনে মনে ভাবলো।

"কানে কালা নাকি? এক কথা একবারে যায়না?"

কোনোমতে আমতা আমতা করে সমরেশ উত্তর দিল, "আমার স্ত্রী.."

"বাবাঃ, মানিক একেবারে রাবণের মতো স্ত্রী হরণ করে নিয়ে গ্যাছে! এলেম আছে মানতে হবে। তা বউ চুরি হল কি করে?"

না পারতে সমরেশকে সবটা খুলে বলতে হবে, তবে কিছুটা মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে। লোকটা মানিকের সাগরেদ কি না সেটা না জেনেও এই ঝুঁকিটা যখন নিতেই হবে তখন ঘটনায় মানিকের সাথে উপস্থিত চরিত্র দুটির সম্পর্কের সমীকরণ না হয় খানিক বদলেই ফেলা যাক।

তাই সমরেশের বিবরণে মাধবী হয়ে উঠলো তার স্ত্রী। মানিক তার বাড়িটাকে ফ্ল্যাট বানাতে চায়, তাই বেশ কয়েকদিন ধরে উত্যক্ত করছিল। আজ সে বাড়িতে এসে তার স্ত্রীকে দেখে, এবং কু-প্রস্তাব দিয়ে বসে। বলে বাড়ির বদলে সে তার স্ত্রীকে চায়। চাপে পরে তখন সমরেশ বাড়ির দলিল হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ আশ্চর্যরকম ভাবে মানিকের হৃদয় পরিবর্তন ঘটে। তখুনি খটকাটা লাগে, কিন্তু সমরেশ আর কথা বাড়ায় না, মানিকও চলে যায়। পরে বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখে বাড়ির দলিলসমেত স্ত্রী ফেরার।

"আচ্ছা, তোর স্ত্রী নিজের ইচ্ছেতে যাইনি তো? আগে থেকে কোনো সেটিং করা থাকতে পারে?"

"না না, এ কি বলছেন আপনি! সে সেরকম মেয়েই নয়। আমি নিশ্চিত ওকে কিডন্যাপই করা হয়েছে।"

"তাহলে পুলিশের কাছে যাচ্ছিস না কেন? ডাইরেক্ট ওর খোঁজ করতে এখানে চলে এলি! বেশি হিরোগিরি দেখাচ্ছিস? এখানকার ঠিকানাটা কোথা থেকে পেলি?"

"মানিক বাবু আগেও আমাকে এখানে তলব করেছিল, বাড়ির বিষয় কথা বলতে। তখন এসছিলাম। এখানে তো ওঁর প্রোমোটারির অফিস। তাই ভাবলাম এখানে যদি কোনো খবর পাওয়া যায়?.. পুলিশ কাছারি করতে চাইনা, নাহলে পাঁচ-কান হবে! সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে।.."

"মানিকের খবর যদি পেয়েও যাস, তাহলেই বা কি ছিঁড়ে নিবি? ও যদি তোর বউকে ফেরৎ না দিতে চায়, তুই পেরে উঠবি ওর সাথে?"

"আমি জানিনা।.. But still I have to confront him .. আপনি প্লিস ওর খোঁজটা আমায় দিন।.."

জামাল কিছুক্ষণ ভাবলো। ভেবে বললো, "আমার সাথে চল...."

"কোথায়?"

"আমার দোকানে।.."

"সেখানে গিয়ে কি করবো?"

"ফোন করবো একজনকে, সে হয়তো মানকে-র খোঁজ দিতে পারবে।.. তবে বউকে পেলে আমায় কি দিবি?"

"যা চাইবেন..", ব্যাকুলতায় ভরা মন নিয়ে বলে উঠলো সমরেশ।

"ঠিক আছে, সবকথা কি এখানে দাঁড়িয়ে বলা যায়.. চঃ! একটু আমার দোকানে গিয়ে চা বিস্কুট খেয়ে আসবি।"

"আমার ওসবের টাইম নেই। আমার বউয়ের সন্ধান আমার এখুনি চাই।"

"পেয়ে যাবি। একবার যখন এই জামাল মাকসুদ এর কাছে এসছিস, তখন তোকে খালি হাতে ফেরাবো না।"

সমরেশের কাছে কোনো উপায় ছিলনা। সে জামালকে অনুসরণ করে মসজিদের পাশ দিয়ে যেতে লাগলো। ততক্ষণে আজান শেষ হয়েছে। নামাজিরা এক এক করে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসছে। ফলে রাস্তায় ভিড়ভাট্টা সাময়িকভাবে একটু বাড়ছে। তারই মধ্যে যেতে যেতে জামাল আবার জিজ্ঞেস করলো, "তোর বাড়িটা কোথায়?"

"শোভাবাজারে।.."

"গঙ্গার দিকে?"

"হুম.."

"তাহলে তো প্রাইম লোকেশন। মানিক কেন আমি হলেও বাড়িটা চেয়ে বসতাম।"

"কিন্তু আমি দিতাম না। মানিক কেন আপনি হলেও না।"

"বাঃ বাঃ! মুখে তো ভালোই বুলি ফোটে। পেশীতে দম না থাকলেও বুকে আছে। নাহলে একা একা মানিকের সাথে পাঙ্গা নিতে চলে আসিস।.. বাহঃ, ভালোই। তোর মতো ভদ্র সাদামাটা অথচ বুক ভরা তেজ সম্পন্ন লোক আমার খুব কাজে আসতে পারে। আমার সাথে টাচে থাকবি, কেমন।"

সমরেশ কোনো উত্তর দিল না। তার এখন পাখির চোখ মাধবীকে সময়মতো ফিরে পাওয়া। দু চোখ ভরে আবার সেই সুন্দরীর মাধুর্য্য আহরণে উদগ্রীব তার মন।

বলতে বলতে জামালের দোকান চলে এল। বিভিন্ন গাড়ি মোটরসাইকেলের স্পেয়ার পার্টসের দোকান। উপরে ব্যানারে লেখা মুলতানি অটো পার্টস। জামাল মাকসুদের পূর্বপুরুষ অধুনা পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতান অঞ্চল থেকে আগত। তার তিনপুরুষের আগের প্রজন্ম মুলতান থেকে তৎকালীন সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের প্রাণকেন্দ্র তথা রাজধানী কলকতায় এসে বাস নেয়। তারপর থেকেই কলকাতার মাটি তাদের কাছে মুলতানি মিট্টির সমান।

সমরেশকে নিয়ে দোকানের মালিক ভেতরে প্রবেশ করলো। দোকানের কর্মচারীকে দু' কাপ চা আর বিস্কুট আনতে বললো। সমরেশ না করলেও সেই বারণ শোনা হলনা। সমরেশও তাই বেশি কথা বাড়ালো না।

সমরেশকে বসিয়ে ভেতরে গেল জামাল। একটা টেবিলের উপরে থাকা টেলিফোনটায় নম্বর ঘোরালো। হঠাৎ হেঁদুয়ার পার্টি অফিসের ফোনটা বাজলো। পকাই গিয়ে ধরলো, "হ্যালো"

ফোনের ওপার থেকে জিজ্ঞেস করা হল ঝন্টু আছে কিনা। পকাই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় আগে জিজ্ঞেস করলো কে ফোন করেছে, কেনই বা সে ঝন্টুকে চাইছে ইত্যাদি ইত্যাদি.. কিন্তু কোনো উত্তর পেল না সে। পকাইয়ের মুখ থেকে হঠাৎ ঝন্টু নিজের নাম শুনে টেলিফোনের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো কেসটা কি? পকাই বললো কে যেন তাকে চাইছে। কেন জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর দিচ্ছে না! পকাইয়ের কাছ থেকে ফোনের রিসিভারটা নিয়ে ঝন্টু নিজের কানে দিল, চোখের ইশারায় পকাইকে ওখান থেকে যেতে বললো।

"ঝন্টু বলছি.."

"মানকে কোথায়?", ওপার থেকে জিজ্ঞেস করা হল। গলার স্বরটা তার চেনা। যত না দেখা তার চেয়ে বেশি ফোনে চলে ডিল। হ্যাঁ ডিল! ঝন্টুও ডিল করে। যার সাথে, সেই ছিল ফোনের ওপারে। তাই নিজের পরিচয় দেওয়ার অপেক্ষা রাখেনা।

ঝন্টু আশপাশটা ভালো করে চোখ ঘুরিয়ে নিল। দেখলো দলের সবাই নিজ নিজের মধ্যেই ব্যস্ত। বুঁদোটা বাইরে চেয়ার পেতে একা বসে আছে। পকাইও তখন ফাঁকা পেয়ে মংলা, দিলু, শ্যামার সাথে ক্যারম বোর্ডে ঝন্টুর রেখে যাওয়া জায়গাটা নিল। তাই ফোনের রিসিভারের উপর ডান হাতটা চেপে, চাপা গলায় বললো, "খবর পেয়েছি দাদা কিছুক্ষণ আগেই একটা মেয়েকে নিয়ে বাবলি গেস্ট হাউসে উঠেছে। রিসেপশন থেকে আমার লোক ফোন করেছিল, ওকে নজর রাখতে বলেছি। শুনেছিলাম সন্ধ্যাবেলায় ধর্মতলায় যাওয়ার কথা, এখন কি করবে বুঝতে পারছি না। মেয়েমানুষের চক্কর শালা, সবকিছু কেঁচিয়ে দেয়।"

"হুম! আমার কাছে একটা লোক এসছে। বলা ভালো আমিই তাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে এসছি। ভবঘুরের মতো মানকের খোঁজ করছিল। চেপে ধরায় বলে তোদের মানিক দা নাকি ওর বউকে তুলে নিয়ে পালিয়েছে।...."

"লোকটা কি বছর চল্লিশের একটু ফর্সা, লম্বা সুদর্শন মার্কা??"

"হ্যাঁ।..."

"যাহঃ শালা! তার মানে বৌদির বর?"

"বৌদি..?? কে বৌদি??"

"তুই আগে বল, লোকটা কি বলছে?"

"লোকটার কথা হল যে মানকে নাকি তার বাড়িটা চায়। ভদ্দর লোক রাজি না হওয়ায় নাকি চুপি চুপি বিকেলে তার বাড়িতে ঢুকে বাড়ির দলিল সমেত বউটাকে তুলে নিয়ে গ্যাছে।"

"নাহঃ, এখানে তো অংকটা মিললো না। দাদা তো আজ দুপুর থেকে অফিসেই ছিল। মাঝখানে বার দুইয়েক বুঁদোর বাড়ি গেছিল। তাছাড়া এসব তোলাবাজির কাজ দাদা একা করার ক্ষমতা রাখলেও একা করেনা। আমাদের মধ্যে থেকে অন্তত কাউকে নেয় সাথে।.. বরং মেয়েটাই নিজে থেকে এসছে।"

"তার মানে আমি ঠিক ধরেছি, বউটাও মানকের সাথে জড়িয়ে গ্যাছে। আর এই ভোলাভালা বরটা ভাবছে কিডন্যাপ হয়েছে। শালা নিজেই নিজেকে কিডন্যাপ করিয়েছে।"

"হুম, ওর বউকে দেখেছি আমি। বউটাও পার্টি অফিসে বরের খোঁজ করছিল, জিজ্ঞেস করছিল এখানে এসেছে কিনা..??"

"তাই নাকি?"

"হ্যাঁ, হয়তো ধরা পরার ভয়ে।"

"খুব জটিল কেস বুঝলি ঝন্টু??"

"মালটা কোত্থ থেকে এসছে রে? তুই বললি মানিক দা নাকি ওর বাড়িটা চায়? আমি তো দাদার সাথেই সব জায়গায় বাড়ি নিয়ে ডিল করতে যাই, এটা কোন বাড়ির মালিক এসছে?"

"বললো শোভাবাজারে বাড়ি, গঙ্গার দিকে।.."

"তার মানে ওই সান্যাল বাড়ির মালিকটা। ওর বাড়ি তো আমি আগে গেছি দাদার সাথে। দাদা-কে খুব বেগ দিচ্ছে, শালা ছাড়ছেই না বাড়ি। কিন্তু বউদি ওর বউ কি করে হয়? যতটুকু জানি লোকটা তো বিধবা। চারিকুলে কেউ নেই তাও সাতরাজার ধন ভেবে বাড়িটাকে আগলে রেখেছে।.. খটকা লাগছে জামু, গুলিয়ে যাচ্ছে।"

"তাহলে এখন কি করা যায়?"

"দাঁড়া, মালটার নামটা আগে মনে করতে দে... কি যেন....?? ভুলে যাচ্ছি।.. দাঁড়া একটু....", বলে ঝন্টু ফোনের রিসিভারটা ক্ষনিকের জন্য কান থেকে নামিয়ে হাঁক দিয়ে দিলীপকে জিজ্ঞেস করলো, "এই দিলু... ওই সান্যাল বাড়ির মালিকের নামটা কি যেন?"

দিলুর চোখ ছিল তখন রানীর দিকে, ক্যারম বোর্ডের। স্ট্রাইকারে আঙ্গুল ছোঁয়ানো রয়েছে, রানীকে পকেটস্থ করার উদ্দেশ্যে। লক্ষ্য থেকে চোখ না সরিয়েই বললো, "সমরেশ সান্যাল। ভাগ্যবান মাল। বউ কয়েকবছর আগেই টপকে গ্যাছে।"

"নতুন বিয়েও তো করেনি, তাই না?", ঝন্টু জিজ্ঞেস করলো।

"না করেনি। তুমি কি পাত্রী দেখছো ওর জন্য? তোমার ওই বৌদির সাথে বিয়া দেবা ওর?"

"চুপ কর তো! তুই তোর রানীর দিকে নজর দে। অন্যেরটা দেখতে হবে না।"

"আমি তো সেটাই করছিলাম গুরু।.. তুমিই তো...."

"আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুই খ্যাল...." বলে রিসিভারটা ফের কানে তুলে নিয়ে চাপা গলায় বললো, "তুই ঠিক বলেছিস, সত্যিই একটা গুপী কেস আছে বুঝলি। মালটার তো বউই নেই, কিডন্যাপ হবে কোথা থেকে? কিন্তু বৌদির সাথে যে সান্যাল বাড়ির একটা যোগ আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। তবে বউদি আসলে কার বউ?... মাথায় সিঁদুর না থাকলেও হাতে তো শাখা পলা দিব্যি দেখতে পেয়েছি।.. ওই মহিলাকে দেখে যতই ভদ্দর বাড়ির বউ লাগুক না কেন, মালটা পাক্কা ছিনাল আছে বুঝলি।.. প্রথমে খানিকটা খটকা লাগলেও এখন আমি সিওর, ওই মাগিটাই দাদার সাথে বাবলি হাউসে উঠেছে রঙ্গলীলা করতে।.. বিকেলে পচার দোকান থেকে আমি দাঁড়িয়ে বৌদিকে ৫ নম্বর ট্রামে উঠতে দেখেছিলাম, যেটা ধর্মতলা থেকে শ্যামবাজার যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর আবার পার্টি অফিসেই ফিরে এসে একটা অজানা অদেখা লোকের খোঁজ করছিল, তাকে নিজের স্বামীর পরিচয় দিয়ে।"

"নিজের স্বামীর খবর নিজেই রাখেনা?"

"সেটাই তো.. তারপর শ্যামল মানে আমাদের শ্যামাকে নিয়ে দাদার খোঁজ করতে বেরোলো। মাঝপথে দেখা হয়ে দাদার সাথে থেকে গেল, আর দাদা, বুঁদো আর শ্যামাকে ফেরৎ পাঠিয়ে দিল। ওরা ফিরে এসে বললো বউদি আর মানিক দা কাশি বোসে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তারপর দুজনেই হাওয়া। কিছুক্ষণ পর আমার লোক বাবলি থেকে ফোন করে জানালো দাদা নাকি ওখানে একটা মেয়েকে নিয়ে উঠেছে, কালো শাড়ি পরা। বৌদিও কালো শাড়ি পড়ে এসছিলো। তবুও শালা বিশ্বাস হচ্ছিল না, এত মিষ্টি দেখতে একটা মেয়ের কি দরকার পড়েছে যে দাদার মতো একটা ষাঁড়ের সাথে বাবলিতে গিয়ে উঠবে?.. তুই এক কাজ কর, লোকটার কাছ থেকে সব ডিটেইলস যান। সিওর হ, লোকটা সমরেশ সান্যাল কিনা? হলে ওর আর ওর সাজানো বউয়ের নাম ধাম ঠিকুজি কুষ্ঠি সব জিজ্ঞেস কর। করে জানা। কিন্তু লোকটাকে এক্ষুনি বাবলি হোটেলের কথা বলতে যাসনা।"

"ঠিক আছে, আমি পাঁচ মিনিট পর ফোন করছি", বলে জামাল ফোনটা রেখে আবার বাইরে এল। ততক্ষণে মুর্শিদ দু' কাপ চা আর দুটো বিস্কুট নিয়ে হাজির। জামাল তাকে সেগুলো টেবিলে রেখে ঘুরে আসতে বললো। জামালকে সালাম ঠুকে মুর্শিদ চলে গেল। সমরেশ বসে বসে কি একটা যেন ভেবেই চলেছিল। জামাল জিজ্ঞেস করলো, "আপনার নামটা কি?"

"হুঁহুঁ??"

"নাম.. নাম.. কি ?"

"সমরেশ.. সমরেশ সান্যাল।"

"বউটার নাম কি?"

"আঃআঃ...."

"অত রাখঢাক রাখলে চলবে না। বউকে চাই তো? তাহলে ডিটেইলস দিতে হবে। নাম, ছবি সব।"

"ছবি তো নেই!

"যাহঃ শালা! বউকে খুঁজতে এসেছেন, ছবি নিয়ে আসেননি??"

"আমার বিশ্বাস ও মানিকের কাছে আছে, তাই সোজা মানিককে খুঁজতেই এসছি। এবার কি জিজ্ঞেস করবেন মানিকের ছবি এনেছি কিনা?"

"আচ্ছা, ঠিক আছে। বউটার নামটা তো বল?"

"মাধবী ওরফে মাধবীলতা বসু মল্লিক।"

"সান্যালের বউ বসু মল্লিক কিভাবে হল?"

"না মানে, ও বিয়ের পরও নিজের বাপের বাড়ির টাইটেলটা ব্যবহার করে। এখন অনেকেই সেটা করে...."

"তাই?? আর যদি বলি তোর আসল বউ অনেকদিন আগেই মারা গ্যাছে!!"

সমরেশ আকাশ থেকে পড়লো। এইটুকু মুহূর্তে লোকটা কাকে ফোন করে এতকিছু খোঁজ নিয়ে নিল??

"কি রে, পিয়াঁজি পেয়েছিস? আমাকে কি তোর চার অক্ষরের বোকা মনে হয়?.. এবার বল কে এই মাধবীলতা যে তোর বউও নয় অথচ যার জন্য তুই এতদূর ছুটে এসছিস?? গার্লফ্রেন্ড নাকি? বল না হলে সত্যি সত্যিই নলি নামিয়ে দেব", বলে পকেট থেকে ফের ছুড়িটা বের করে দেখালো।

সমরেশের পালাবার কোনো জায়গা ছিলনা। এবার তাকে তাদের সম্পর্ক নিয়েও সত্যি কথাটা বলতে হবে, "মাধবী আমার বন্ধুর বউ.."

"সে তোর বাড়িতে কি করছিল?"

"এসেছিল একটা দরকারে। আমার বন্ধুই নিয়ে এসছিল তাকে। বলেছিল ঘরের কাজে হাত লাগিয়ে গুছিয়ে দিতে এসছে। একা থাকি তো তাই.. সন্ধ্যে নাগাদ বন্ধু আসবে তাকে নিতে। এখন যদি এসে দেখে তার স্ত্রী নিখোঁজ তখন আমার মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না..", বলে অসহায়ভাবে কেঁদে ফেললো সমরেশ।

"তোর মাধবীলতা কি কালো শাড়ি পরে এসছিল?"

সমরেশের মনে পড়লো করবী তার বিবরণে বলেছিল সে এক কালো শাড়ি পড়া মেয়েকে ছাদে কাপড় মেলতে দেখেছে। তাছাড়া দুপুরে মাধবী নিরুপমার আলমারি থেকে পছন্দ করে একটা কালো শাড়িই নামিয়েছিল, যা বিকেলের পর আর বাড়িতে কোথাও পড়ে থাকতে দেখা যায়নি। নিশ্চিত ভাবেই অন্তর্ধানের সময় মাধবী নিরুপমার সেই কালো শাড়িটাই পড়েছিল।

"কি হল, আবার কোন ভাবনায় হারিয়ে গেলি?"

"হ্যাঁ, হ্যাঁ, কালো শাড়ি পড়েছিল।"

"হুম, তাহলে এই ঝন্টুর সেই বৌদি!"

"কে ঝন্টু?"

"তুই চিনবি না। শুধু এইটুকু নিশ্চিন্তে থাক যে সে অন্তত কিডন্যাপ হয়নি। নিজের ইচ্ছেতেই মানিকের সাথে গ্যাছে।"

"কোথায় গ্যাছে?"

"সেটা এখন বলা যাবেনা", বলে সমরেশকে বসিয়ে রেখে আবার জামাল ভেতরে গেল। পড়ে রইলো চা-বিস্কুট। সমরেশও হাত লাগালো না তাতে। ফের ফোন লাগলো পার্টি অফিসে। ঝন্টু তখন ফোনের কাছেই ছিল, আর কেউকে সেখানে ঘেঁষতে দেয়নি। জানতো যে আবার কল আসবে। সেইমতো এলোও। একবার রিং বাজতেই ঝন্টু রিসিভারটা কানে নিল, "জানতে পারলি কিছু?"

"হুম। ঠিক বলেছিলিস, লোকটা শোভাবাজারের সমরেশ সান্যাল। তোর বৌদিকে নিজের বৌয়ের পরিচয় দিচ্ছিল। চেপে ধরতেই সব সত্যি বেরিয়ে এলো। যখন বললাম আমি জানি ও বিধবা, তখন স্বীকার করলো যে ওই মেয়েটা ওর বন্ধুর বউ, নাম মাধবীলতা বসু মল্লিক ওরফে মাধবী। পরনে কালো শাড়ি পড়া। বন্ধুই বউকে রেখে গেছিল বাড়ির কাজে সাহায্য করতে.. এখন দেখে পাখি হাওয়া। বন্ধু নাকি সন্ধ্যে নাগাদ আসবে বউকে নিতে, তার আগে লোকটা চায় পাখি যেন ফের নিজে থেকে খাঁচায় ফিরে আসে.."

"ওহঃ, তা বৌদির নাম মাধবীলতা বসু মল্লিক, ওরফে মাধবী। বুঝলি জামাল এর মধ্যে আমি বাবলি হোটেলের রিসেপশনে ফোন করেছিলাম। খোঁজ লাগাতে বলেছি। ওরা একটা বেয়ারাকে পাঠাচ্ছে, দাদার কোনো স্ন্যাকস, খাবার কিছু লাগবে কিনা সেটা জানার অছিলায়। প্রথমে রাজি হচ্ছিল না, কারণ দাদা যখন ঘরে থাকে তখন নাকি কোনো ডিস্টার্বেন্স পছন্দ করেনা।.. একটু টাইট দিতেই রাজি হল রুম সার্ভিসের নামে বেয়ারা পাঠাতে। দেখি, এসে কি খবর দেয়।"

"তাহলে এখন কি করবো?"

"তুই এক কাজ কর, লোকটাকে বল বাড়ি ফিরে যেতে। বলবি খবর নেওয়া হয়েগেছে, ঠিক সময় মেয়েটা চলে যাবে। বেশি দুশ্চিন্তা না করতে।"

"এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেবো? কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা যায়না? লোকটার আর কিছু থাক বা না থাক, আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার সাহস আছে, বলা ভালো দুঃসাহস আছে। নাহলে বন্ধুর বউ কিডন্যাপ হয়েছে এটা ভেবেই মানিকের মতো লোকের সাথে মোকাবিলা করতে একা চলে আসে? তাও আবার পার্ক সার্কাসে!!"

"না.. তুই যেটা ভাবছিস সেটা ওকে দিয়ে হবেনা। ওই কাজটা ভাই তোকেই নিজের হাতে করতে হবে। যতই বল, সমরেশ লোকটাকে আমি দেখেছি, অতটাও সাহসী নয়, গোবেচারাই। ওর দ্বারা না কিছু হবে, না ওর কাছ থেকে আর বেশি কিছু জানা যাবে। ওই মালটা-কে আটকে রেখে লাভ নেই বুঝলি।"

"ওকে বস্!"

জামাল বাইরে এসে সমরেশকে সুখবর দিল। মাধবীর সন্ধান মিলেছে শুনেই সে আনন্দে আত্মহারা। সঙ্গে সঙ্গে জানতে চাইলো তার বর্তমান অবস্থান! সে কোথায়??

জামাল তাকে তিষ্ঠতে বলে জানালো তার বন্ধু-পত্নী ঠিক তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। লোকজনের সাথে কথা হয়েগেছে। কোনো চিন্তা নেই। সমরেশ এখন টেনশন ফ্রি হয়ে বাড়ি রওনা দিতে পারে। কিন্তু সমরেশকে আস্বস্ত দেখাচ্ছিল না। সে বারবার পুরো বিষয়টা জানতে চাইছিল তখন জামাল তাকে এক ধমক দিয়ে হুমকি দিল দশ মিনিটের মধ্যে যেন সে এই আমির আলী অ্যাভিনিউ ছেড়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের দিকে রওনা দেয়। নাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে। সে জানে মাধবী সমরেশের বউ নয়, কোনো রক্ষিতা হবে হয়তো। শুনেছে তার বউ তো মারা গ্যাছে, সে তো বিধবা।

মাধবীকে রক্ষিতা বলায় সমরেশ প্রতিবাদ জানালো। জামাল তখন বললো সে জানেনা মাধবী সমরেশের কে হয়? রক্ষিতা না গার্ল ফ্রেন্ড না বান্ধবী, নাকি শুধুই বন্ধুর বউ? কিন্তু এটা জানে যে ওই মেয়েটা তার বউ নয়। সেটাই অনেক গোপনীয়তাকে বাজারে নগ্ন করে দেয়। তাই ভালো চাইলে চুপচাপ জামাল যা বলছে তা মেনে সমরেশ বিদায় নিক।

এই কয়েক মিনিটের ব্যবধানে জামাল তার সম্পর্কে এত কিছু জেনে ফেলায় সমরেশ হতবাক তো হয়েইছে, সাথে আস্বস্ত হয়েছে যে মাধবীর খোঁজ নিতে সে ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছে। যখন বলছে ঠিক সময়ে তাকে পাঠিয়ে দেবে, তার মানে শতকরা সত্তর ভাগ নিশ্চিত হওয়াই যায়। কিন্তু বাকি তিরিশ ভাগ? লোকটা কি মানিকেরই দলের? হলেই বা কি, তার তো মাধবীকে ফিরে পাওয়া নিয়ে কথা। কিন্তু কখন আসবে মাধবী? কারণ বিমল তো যেকোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে। তারা কি বিমলের সম্পর্কেও জানে?

আরো কিছুটা সাহস মনে জুগিয়ে সমরেশ বললো, "সবই যখন কোনোভাবে জানতে পেরেছেন তখন এটাও তো জানেন যে মাধবী বিবাহিতা। তার স্বামী আছে। সে আমার কাছে কিছু সময়ের জন্য এসেছিল, তার স্বামী দায়িত্ব দিয়ে তাকে আমার কাছে রেখে গ্যাছে। সে বা মানিক কোথায় আছে আমি আর জানতে চাইনা। তবে সময়মতো ও ফিরে না এলে, আমি ওর স্বামীকে কি জবাব দেব?"

জামাল ভেবে বললো, "পঁচিশ হাজার টাকা ফেল, যখন চাইবি তখন পাঠিয়ে দেব।"

"পঁচিশ হাজার? অত টাকা কোথা থেকে পাবো?"

"ল্যাওড়া, অত বড় বাড়ির মালিক তুমি। ফ্ল্যাট হলে তোমারই পোয়া বারো। এখন একটু মাল ফেলতে কষ্ট হচ্ছে?"

"কিন্তু এত টাকা তো নিয়ে আসিনি।"

"ঠিক আছে, যা এনেছিস সেটাই অ্যাডভান্স কর। বাকিটা পরে দিয়ে দিবি। কোনো চালাকি করবি না, তোর বাড়ি চিনতে আমার দু' মিনিটও সময় লাগবে না। টাকা দেওয়া নিয়ে বেশি পেয়াঁজি করলে বাড়িতে গিয়ে গলায় পা দিয়ে টাকা আদায় করে আনবো।"

"পঁচিশ হাজার একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। আমার শুধু বাড়িটাই সম্বল। চাকরি খুঁইয়েছি অনেক আগে। এখন আমি বেকার। ফিক্সড ডিপোজিটের ইন্টারেস্টে একার সংসার চলে। অত টাকা পাবো কোথায়?"

"দেখ, আমি শ্যামবাজারের রাস্তার ধারে বিকিকিনি করা কোনো হকার নই, যে আমার সাথে দরাদরি করবি। আমার এক কথা। .... ঠিক আছে তোর ফাইনানশিয়াল কন্ডিশন দেখে ডিল পাক্কা করছি দশ হাজারে। তার থেকে একটা টাকাও কম হবেনা। দে এবার অ্যাডভান্স ছাড় বানচোঁদ!"

সমরেশকে রাজি হতেই হল। ফেরার গাড়ি ভাড়ার টাকাটা রেখে সবটা জামালের হাতে তুলে দিল। প্রায় দু' হাজার। বাকি রইলো আট হাজার। জামাল জিজ্ঞেস করলো পাখিকে কখন খাঁচায় ঢোকাতে হবে? সমরেশ বুঝতে পারলো এখানে বক্তা, তার প্রেমিকাকে পাখি হিসেবে এবং তার বাসস্থানকে খাঁচা হিসেবে তুলনা করে তার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়েছে।

সমরেশ উত্তর দিল, "এখুনি"

জবাবে জামাল বললো এটা বেতার অফিস নয়, যা বলবে তাই সরাসরি সম্প্রচারিত হয়ে যাবে! একটা রিজনেবল টাইম বলতে হবে। সমরেশ বললো সাতটা। জামাল রাজি হল তাতে।

মেইন রাস্তা থেকে ট্যাক্সি ধরে শোভাবাজার। অনেকটা টাকা গচ্চা গেল, তবে নিশ্চিন্ত থাকা গেল যে মাধবী ফিরবে। সময়মতোই ফিরবে। জামাল ঝন্টুকে ফোন করে সব ইনপুট দিল। ওদিক থেকে ঝন্টুও বললো যে বেয়ারা গেছিল ওদের রুমের কাছে। দাদা তখন মাধবী নামের মেয়েটার সাথে ফস্টিনস্টি করতে ব্যস্ত। তাই ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে বাইরে থেকেই বিদায় করেছে। জামাল আর ঝন্টু সেই নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগলো। কার গাছের ফল, কে ফলায়, আর শেষে কে খায়??

ওদিকে বিমলও গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। আজকে রাস্তায় খুব জ্যাম। ধর্মতলায় কিসের একটা বিক্ষোভ হচ্ছে। সেই কারণে বাস, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার সব আটকা পড়ে গ্যাছে। সমরেশ অন্য রুট দিয়ে আসছিল বলে জ্যাম পায়নি। তাই তুলনামূলকভাবে অনেক আগেই সমরেশের ভাড়া করা ট্যাক্সি পৌঁছে গেছিল বি কে পালে। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তালা খুলে বাড়িতে প্রবেশ করলো সমরেশ। বিমলের অনুপস্থিতি তাকে অনেকটাই চিন্তামুক্ত করেছিল। আশা করছিল এই অনুপস্থিতি আরেকটু দীর্ঘায়িত হবে। কারণ আসার পথে ড্রাইভার সাহেব বলছিলেন ধর্মতলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি আছে তাই এস এন ব্যানার্জি রোড থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ অবধি পুরো জ্যাম থাকবে। বিমলের অফিস মৌলালিতে। তাকে গাড়ি নিয়ে সেই এস এন ব্যানার্জি রোডের উপরেই আসতে হবে।

সমরেশের ট্যাক্সি জ্যাম এড়াতে এ জে সি বোস রোড হয়ে ভিক্টোরিয়ার পিছন দিয়ে রেড রোড ছাড়িয়ে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে গঙ্গাকে বাঁ দিকে রেখে অনেকটা ঘুরপথে আহিরীটোলা থেকে ডান হাতে নিয়ে একেবারে উল্টো দিক থেকে বি কে পালে পৌঁছেছিল।

বাবলি গেস্ট হাউসে তখন মাধবী মানিকের সাথে বসে কারোর একটা খুনের ছক কষছিল। সমরেশকে যেতে দিয়ে জামালও ঝন্টুর সাথে ফোনে ফোনে কোনো এক গোপন অভিসন্ধি আঁটছিল। আলোচনা করছিল যে মানিক আজ ধর্মতলায় পৌঁছবে কিনা? জামাল বললো সমরেশের সাথে নাকি তার ডিল হয়েছে মাধবীকে সাতটার মধ্যে শোভাবাজারের বাড়িতে পাঠাতে। বদলে দশ হাজার টাকা দেবে। ঝন্টু কাজটা করে দিলে পাঁচ হাজার তার। বাজে এখন ছ'টা, হাতে আছে এক ঘন্টা। বাবলি থেকে সান্যাল বাড়ির দূরত্ব বেশি নয়।

একদিকে শোভাবাজারে সান্যাল বাড়িতে বসে সমরেশ মাধবীর প্রতীক্ষা করছিল, অপরদিকে গিরিশ পার্কের বাবলি গেস্ট হাউসে চলছিল খুনের ষড়যন্ত্র। হেঁদুয়া পার্কের অফিস থেকে ঝন্টু বেরোলো মাধবী উদ্ধারে। আর পার্ক সার্কাস থেকে জামাল রওনা দিল ধর্মতলায়। সবার মাঝে ধর্মতলার কাছে জ্যামে আটকে রইলো বিমলের ফোর্ড এসকর্ট গাড়িটা। চতুর্দিক থেকে কলকাতা তখন জমজমাট, এক কাহিনীর উপসংহার টানতে বা হয়তো একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে।