।। আট ।।
চরম অনুভূতি। অনুভূতির গভীরতা বোঝাবার ভাষা আমার নেই। দেবিকা আর আমার শরীরে শুধুই তীব্র কামোত্তেজনা। দেহে দেহে সংযোগ ঘটছে, দুটি পাপড়ির ফাঁকে লিঙ্গ ক্রমাগত প্রবেশ করে চলেছে। পিচ্ছিল যোনিপথ দিয়ে লিঙ্গ চলাচল করতে করতে আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন অনন্তকাল ধরে ওর মধ্যে বিদ্ধ হয়ে থাকি। যে মেয়েটা কাঙালের মতো এতক্ষণ যৌনসুখ ভিক্ষা করছিল আমার কাছে। সেই এখন চরম সুখপ্রাপ্তির আবেশে আচ্ছন্ন। আমি ওকে উপভোগ করছি আর ভাবছি, আজ থেকে পুরোনো প্রেমিক বলে দেবিকার জীবনে কেউ নেই। ওগুলো অতীত। এই দেবই আজ থেকে ওর সাথে সহবাস করবে, ভালবাসা আর আদর দিয়ে রানী করে রাখবে এই সুন্দরীকে।
সুখের সর্বোচ্চ শিখরে দেবিকাকে পৌঁছে দিয়ে আমি ওর নরম মৃত্তিকায় এবার কামনার জারকরস উদগীরণ করে দিলাম। বীর্য তখন বৃষ্টিপাতের মতই ঝড়ে পড়ছে আর দুজনেরই অভ্যন্তরে সুখের লাভা গলে গলে পড়ছে। বীর্যপাতের একটু পরে দেবিকা বললো, "বড্ড তাড়াতাড়ি হয়ে গেল না দেব? নিজের কামনাকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে, আমিই তোমাকে জোর করলাম, আর তুমিও আমার ভেতরেই সব ঢেলে দিলে।"
আমাকে জড়িয়ে ধরে তারপরেও ও শুয়ে রইলো অনেকক্ষণ। বললাম, "তাতে কি হয়েছে দেবিকা? আসল সুখকে তো দুজনে উপভোগ করলাম, এরপরে তোমার জীবনে পুরোনো কোনো স্মৃতি আর কোনোদিনই তোমাকে কষ্ট দেবে না। তুমি শুধু আমার কথা চিন্তা করবে, আর আমিও দিবারাত্রি তাই করব।"
উঠে বসে একটু আপেক্ষের সুরে দেবিকা আমাকে বলল, "ওতো তাই করেছিল আমার সঙ্গে। কিন্তু....."
আমি বললাম, "কে সে?"
টালিগঞ্জের সেই পুরোনো প্রেমিকের কথা আবার তুলে দেবিকা বলল, "অসাবধানতাবশত ওর সঙ্গে বারবার যৌনকামনা মেটাকে গিয়ে, হঠাৎ একদিন অনুভব করলাম, আমি বোধহয় মা হতে চলেছি। পেটের ভেতরে থেকে একটা শিশু বড় হচ্ছে। একদিন সে বেরিয়ে এসে পৃথিবীর আলো দেখবে। যখন ডাক্তারকে দেখালাম, ডাক্তারও একই কথা বলল। আমি নাকি গর্ভবতী।"
একটু অবাক হয়ে দেবিকাকে বললাম, "তারপর?"
দেবিকা বলল, ডাক্তার আমাকে দেখার পর, ছুটে গেলাম ওর কাছে। ওকে বললাম, "এই কান্ডটা তুমি করেছো। প্রেমিকাকে অন্তঃসত্বা করে দিয়েছ, এবার তো আমাকে তোমায় বিয়ে করতেই হবে। নইলে এই বাচ্চাটাকে নিয়ে কোথায় যাব আমি? আমার এখন কেউ নেই। একমাত্র তুমি ছাড়া।"
দেবিকাকে বললাম, "দেবিকা, তুমি অন্তঃসত্বা হয়ে পড়েছিলে? তারপর? তোমার বাচ্চাটার কি হল?"
আবার সেই হতাশ মুখ। চোখমুখে দূঃখ কষ্টটা আর নেই, তবুও বলল, "আমার সঙ্গে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তার সম্বন্ধে আর কি বা তোমায় বলব? ও আমাকে কিছুই বুঝতে দিল না। বলল, তুমি তো আমার কাছেই আছো দেবিকা, তোমার আবার চিন্তা কিসের? ভুলবশত এমনটা হয়েছে। এতো হতেই পারে। তোমার আমার দুজনেরই যখন ভুল, তখন বাচ্চাটাকে জন্ম দেওয়াটাও তো আমাদের কর্তব্য। তবে বিয়েটা এখনই নয়। এরজন্য তোমাকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বাবা মায়ের অনুমতি নেওয়াটা দরকার।"
আমি বললাম, "তারপর?"
দেবিকা বলল, এতদিন ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে মেলামেশা করেছি, অন্তরঙ্গ হয়েছি। বিয়ে মানে সামাজিক একটা স্বীকৃতি, সেটাই যখন শুনলাম, পেতে দেরী হবে। আমি একটু অধৈর্য হয়ে পড়লাম। মনে হল, এ আমার কেমন প্রেমিক? যে স্ত্রী হিসেবে আমাকে গ্রহন করতে চায় না। মনে হল ও বুঝি ছল করছে আমার সঙ্গে। খেলতে চাইছে আমার জীবনটা নিয়ে। বাড়ীর লোককেও আমার ব্যাপারটা এখনও জানাতে চাইছে না। দিন কেটে যাচ্ছে, রাত কেটে যাচ্ছে। বাচ্চাটাও পেটের মধ্যে বড় হচ্ছে। অথচ বিয়ের কথা তুললেই ও যেন কেমন নির্লিপ্ত।
একদিন আমি খুব রেগে গেলাম। শুনেছিলাম, ওর বাবা মা নাকি আসানসোলে থাকে। ছেলে একবারও আমার কথা তাদেরকে বলেনি। আমি বললাম, "তুমি তোমার বাবা মাকে খবর দিচ্ছ না কেন? তাদেরকে জানাও। খবর দাও। একবার অন্তত তারা এসে দেখে যাক এই মেয়েটিকে। কেমন নিঃস্বার্থ ভাবে সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে তোমার কাছে পরে রয়েছে? তুমি যখন চাও না ওনারা সত্যি কথাটা জানুক, তাহলে বিয়ের কথাটা সেরে নিতেই বা তোমার আপত্তিটা কোথায়?"
আমাকে নিয়ে লিভ টুগেদার করছে আমার প্রেমিক। আমাকে সে বিয়ে করেনি। অথচ আমি অন্তঃসত্বা। নিজের বাবা মাকেও আমার কথা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। রাগ দেখে আমার মন ভোলানোর চেষ্টা করতে লাগল ও। আমাকে বলল, "ব্যস্ত হয়ো না ডার্লিং। বাবা মাকে খবর দিয়েছি, ওনারা সাতদিন পরেই এখানে আসবে। তারপরই তোমাকে বিয়ে করব আমি। সাতপাকে বাঁধা পড়ব বলে আমিও তো অপেক্ষা করে আছি বিয়ের জন্য। তুমি কি আমার ছটফটানি দেখেও সেটা বুঝতে পারছ না?"
একটু চুপ থেকে দেবিকা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বললো, "শয়তান লোকটাকে সেদিনও দেখে বুঝতে পারিনি, ওর মধ্যে কি অভিসন্ধি লুকিয়ে আছে। পারলে আমার এতবড় ক্ষতি আজ হত না।"
দেবিকাকে বললাম, "তারপরে কি তোমাদের বিয়ে হয়নি? ও কথা রাখেনি?"
দেবিকা আফশোস করে বলল, "মা বলেছিল, শাঁখা সিদুঁর পড়বি যখন নিজের মুখটা আয়নায় একবার দেখবি। মেয়েদের সত্যিকারের রূপ। সাধ ছিল বধূ বেশে নিজেকে দেখার। সে সাধ আর পূর্ণ হল কোই?"
এক এক করে পুরোনো সব কথা ও বলে দিলেও, দেবিকার বাচ্চাটার কথা ভীষন জানতে ইচ্ছে করছিল। ওকে বললাম, "কিন্তু তোমার বাচ্চাটার কি হল দেবিকা? শেষ পর্যন্ত ওকে কি জন্ম দিলে? পৃথিবীর আলো যাকে দেখাতে চাইছিলে, সে নিশ্চই তোমার কাছেই এখন। কিন্তু কোথায় সে? এখানে এসে তো তাকে একবারও দেখলাম না।"
ওর চোখের কোনে দেখলাম আবারও জল চিকচিক করছে। বাচ্চাটার কথা বলতে গিয়েও বলতে পারছে না। মনের ভেতরে জমানো দূঃখটা যেন এখনো কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে ওকে। একটা ফুলের মতো মুখ। অথচ এই ফুলটাকেই ছিঁড়ে তছনছ করে কে যেন বিষাদে ভরিয়ে দিয়েছে ওকে।
আমার কথার জবাব দিচ্ছিল না দেবিকা। ওকে বললাম, "কি হল দেবিকা? বাচ্চাটার কথা তুমি এখনো বললে না? কি হয়েছে বলো? শেষ পর্যন্ত বাচ্চাটা কি পৃথিবীর আলো দেখল? কি হল তার? বলো বলো....."
দেবিকার চোখদুটো দিয়ে একনাগাড়ে জল পড়তে দেখে মায়া হচ্ছিল। সুন্দরী এক যুবতী আমার সামনে অশ্রুসিক্ত নয়নে নিজের পুরোনো দূঃখ গুলোকে স্মরণ করছে। কিন্তু এবার যেন একেবারেই স্তব্ধ ও। মুখে কোনো কথা নেই। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে আমার দিকে।
অনেক্ষণ চুপ করে থেকে আমাকে ও বলল, "বাচ্চাটাকে আমি বাঁচাতে পারিনি দেব। ও আমার পেটের মধ্যেই..... আর ও আমাকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে....."
মনে হল আমিই বা ক ফোঁটা চোখের জল ওর জন্য ফেলতে পেরেছি, যে ওকে ভালোবাসবো? দেবিকার চোখে জল দেখে আমারও তখন চোখটা একটু চিকচিক করতে লাগল। আমার বুকের মধ্যে মুখ রেখে ও বলল, "এখনও ভাবি, মরে গেলেও বোধহয় শান্তি পাবো না কোনোদিন। একজনকে ভালোবেসে শেষ পর্যন্ত কি পেলাম? আমার জীবনটাকে এভাবে ছারখার করে দিল ও। দেখবে ওরও ভাল হবে না কোনদিন। জীবনে কোনদিন সুখী হতে পারবে না ওই শয়তান লোকটা।"
বুকের মধ্যে দেবিকাকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছি। কপালে চুমু খেয়ে বললাম, "আবার তুমি মরার কথা চিন্তা করছ? কেন তাহলে আমাকে এখানে নিয়ে এলে তুমি? মরতেই যদি চাও।"
বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরে আবার বললাম, "দেবিকা, আমার দেবিকা। তোমাকে ছাড়া আমিও বাঁচার কথা চিন্তা করতে পারি না আজ থেকে। তুমি আমি দুজনেই বাঁচব। নতুন করে বাঁচতে শেখাবো তোমাকে। আর যেদিন মরব, সেদিন দুজনে একসঙ্গেই মরব।"
দেবিকা মুখটা একটু তুলে বলল, "সত্যি বলছ? আমি মরলে তুমিও মরবে?"
বললাম, "সত্যিই তো বলছি। তোমাকে অত সহজে আমি আর মরতে দেবো না দেবিকা। আর যদি তোমাকে বাঁচাতেই না পারি। তাহলে জেনে রেখো, এই দেবও তোমার জন্য প্রাণটা দিয়ে দিতে রাজী থাকবে। আমার এই জীবনটা আজ থেকে শুধু তোমার জন্য, তুমি ছাড়া আমার জীবনের কোনো মূল্য নেই।"
।। নয় ।।
পোশাকটা গায়ে আবার যথারীতি চড়িয়ে নিয়ে দেবিকা বলল, "চলো তাহলে তোমাকে একটু এগিয়ে দিই। বাড়ী ফিরবে যখন, এসপ্ল্যানেড থেকে মেট্রো ঝরবে তো। স্টেশন অবধি তোমাকে একটু পৌঁছে দিয়ে, তারপর না হয় আমি আবার ফিরে আসবো এখানে।"
ওর সঙ্গ আমার ত্যাগ করতে ইচ্ছা করছিল না একেবারেই। দেবিকাকে বললাম, "কাল সকালে তাহলে আমাদের দেখা হচ্ছে আবার। তোমাকে কি টালিগঞ্জে পাবো? তুমি যাবে আবার?"
দেবিকা বললো, "নিশ্চয়ই যাব। রোজ তো যেতে পারি না এখন। তবে তোমার জন্য নিশ্চই আমি যাব।"
আমি জামা প্যান্ট পরে নিয়ে ওর সঙ্গে আবার হাত ধরাধরি করে বেরিয়ে আসলাম। পায়ে হেঁটে ধর্মতলায়। চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। এর মধ্যেই হাত ধরাধরি করে হাঁটছে কত কিশোর কিশোরী আর যুবক যুবতী।
কিন্তু এই ভীড়ে লোকে কেমন আলাদা রকম চোখে দেখছে আমাকে। দেবিকার মতো সুন্দরী যুবতীকে পাশে নিয়ে হাঁটছি, হয়তো সেই জন্যই। ওকে জড়িয়ে ধরছি, রাস্তার মধ্যেই আদর করছি। ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছি। আর আমার আচরণ দেখে বিস্মিত হয়ে যাচ্ছে সবাই। খুব কাছ থেকে কিছু লোক, আমাকে ওরকম করতে দেখে হাসতে হাসতে চলে গেল। ভাবছি, যে যা ভাবছে, ভাবুক, আজ আমার এতে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
দেবিকা বলল, "চলো তোমার নিচে একেবারে পাতাল অবধি যাই। তোমাকে মেট্রোয় তুলে দিয়ে, আমি আবার উঠে আসবো উপরে।"
সিঁড়ি দিয়ে পাতালের মধ্যে ঢুকে, আমি টিকিটের লাইনে দাঁড়ালাম। দেবিকাকে বললাম, "তোমার জন্যও একটা টিকিট কাটি। নইলে তো মেশিন আটকে দেবে। টিকিট ছাড়া ঢোকা যে অসম্ভব।"
তবু দেবিকা বলল, "কাটছো কাটো। কিন্তু আমার এখন টিকিট না হলেও চলে।"
ওর কথা শুনে একটু অবাক হলাম। তবুও টিকিট কাটলাম। দেবিকা অপেক্ষা করছে একটু পেছনে। কিন্তু কাউন্টার ছেড়ে বেরোবার পরেই লক্ষ্য করলাম, ও ওখানে আর দাঁড়িয়ে নেই। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে দেবিকা নেই। নিমেষের মধ্যে ভ্যানিস হয়ে গেছে, চোখের সামনে থেকে।
অবাক হলাম, এই তো ছিল কাছে। আবার তাহলে কোথায় গেল?
সন্ধেবেলা অফিস ফেরত নিত্যযাত্রীদের তাড়াহুড়োতে হুড়োহুড়ি। কিন্তু এর মধ্যেই দেবিকা আমার চোখের সামনে থেকে উধাও। মনটা ভীষন ব্যাকুল হয়ে পড়েছে। দেবিকা কোথায় হারিয়ে গেলো, ওকে খোঁজার জন্য আমি ছটফট করে এদিক ওদিক তখন দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছি।
দেবিকাকে হঠাৎই লক্ষ্য করলাম ও হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছে। একজন লম্বা ফর্সা পুরুষ টিকিট হাতে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে মেশিনটার দিকে। ট্রেন ধরবে বলে অন্যকয়েকজন যাত্রীদের মতো সেও পা বাড়িয়েছে ওই গেটের দিকে, আর দেবিকাও ঠিক যাচ্ছে ওর পেছনে পেছনে।
আমি চিৎকার করে উঠলাম, "দেবিকা, কোথায় যাচ্ছো তুমি? দেবিকা তুমি তো আমার কথার কোনো জবাব দিল না।"
অদ্ভূত ব্যাপার। লোকটা টিকিটটা মেশিনে ঢুকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। কিন্তু দেবিকা ওর পিছন পিছন প্রবেশ করল টিকিট ছাড়াই।
ট্রেন আসছে একটা দক্ষিণেশ্বর থেকে। লোকটা তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নামছে ট্রেনটা ধরবে বলে। দেবিকাও খুব দ্রুত পা চালিয়ে নামছে লোকটাকে পিছু পিছু ধাওয়া করে।
আমি অবাক হলাম। টিকিট মেশিনে ঢুকিয়ে আমিও দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করলাম। দেবিকা তখন তরতর করে নীচে নেমে অনেকটা এগিয়ে গেছে সামনে। দূর থেকে দেখলাম কবি সুভাষ যাওয়ার ডাউন মেট্রোটা তখন অনেকটাই এগিয়ে এসেছে সামনে। লোকটা প্ল্যাটফর্মের খুব ধারে চলে গেছে। দেবিকাও ঠিক ওর পেছনে। ট্রেন আরো সামনে আসামাত্রই, পেছন থেকে আচমকাই লোকটাকে ঠেলা মারল দেবিকা। লম্বা লোকটার শরীরটা ট্রেনের চাকার সামনে পরে গেল। সেই সঙ্গে দেবিকাও ঝাঁপ দিলো সামনে। মনে হল ট্রেনের তলায় কাটা পরে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল দুজনের দেহটা।
মেট্রো দাঁড়িয়ে পড়েছে একটু দূরে। ড্রাইভার ব্রেক কষেও মনে হয় বাঁচাতে পারেনি ওদের দুজনকে। আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু করে দিয়েছে অনেকে। এগিয়ে দেখছে অনেকে, কি হল শেষ পর্যন্ত ওদের দুজনের। আমি স্তম্ভিত। মর্মান্তিক একটা দৃশ্য দেখলাম চোখের সামনে। ভাবতেই পারছি না, দেবিকা এমন কাজটা করল কি করে?
প্রতিশোধের আগুনটা জ্বলতে দেখেছিলাম দেবিকার শরীরে। ও বলেছিল, যদি কোনোদিন ওর পুরোনো প্রেমিককে ও দেখতে পায়, তাহলে শোধ তুলবে। উশুল করে নেবে নিজের অপূরনীয় ক্ষতিটাকে। কিন্তু তা বলে কি এইভাবে? একজনকে হত্যা করে, নিজেকেও আত্মাহুতির বলি দিয়ে? কেন দেবিকা এভাবে শেষ করে দিল জীবনটাকে? আমি তো ওকে নিয়ে নতুন স্বপ্নই গড়তে চেয়েছিলাম। নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবার আগে দেবিকা একবারও কি আমার কথা চিন্তা করল না।
ভাবছি, আর শরীরটা তখন থরথর করে কাঁপছে আমার। শুনেছি, মেট্রোর লাইনে ঝাঁপ দিয়ে নাকি প্রাণহানির ঘটনা আকছার ঘটে। কিন্তু আজ যা চোখের সামনে দেখলাম, কেউ হয়তো জীবনে কল্পনাও করতে পারবে না।
আর একটু আগে থেকে যদি তৎপর হতাম, দুটো প্রাণকেই হয়তো আমি বাঁচাতে পারতাম।
।। দশ ।।
কর্তা ব্যক্তিরা এরপর সব একে একে এলেন। লাইন থেকে দেহ দুটো তোলার তোড়জোড় চলছে। একজন তার মধ্যে বললেন, দু মাস আগে একটি অল্পবয়সী মেয়ে ঝাঁপ দিয়েছিল লাইনে। আজ আবার একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ঘটল। তবে এবার মনে হয় কোনো একজন পুরুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সবাই তো তাই বলছে। সিসিটিভি ক্যামেরাতেও তাই ধরা পরেছে।
আমি খুব কাছেই ছিলাম, বললাম, "না না কি বলছেন, আমি দেখেছি, দুজনকে। একটি লোক আর তার পেছনে ছিল একটি মেয়ে। মেয়েটি পেছন থেকে ধাক্কা মেরেছে লোকটাকে। তারপর নিজেও প্রাণ দিয়েছে।"
ওরা বলল, "আপনি কাকে দেখেছেন? আমাদের ক্যামেরাতে তো সেরকম কোনো মেয়ের ছবি ধরা পরেনি। যে লোকটা পড়ে গেল ট্রেন আসার আগের মূহুর্তে। ওর পেছনে তো কোন মেয়ে ছিল না।"
আমি অবাক হলাম। কি বলছে এরা? আমি দেবিকাকে দেখলাম। ও এতক্ষণ আমার সঙ্গে ছিল। আমি ওর সঙ্গে যৌনসঙ্গম করলাম। আমাকে ও দূঃখের কাহিনী শোনালো। তারপরই এই ঘটনা। অথচ এরা বলছে কোনো মেয়ে ঝাঁপ দেয় নি? এর মানেটা তাহলে কি?
একজন তার মধ্যে একটু আমার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলার জন্য এগিয়ে এলেন। বললেন, "কি ব্যাপারটা কি বলুন তো? আপনি ঠিক কি দেখেছেন?"
ওনাকে সমস্ত ঘটনাটাই খুলে বললাম। উনি হেসে বললেন, "আপনি সুস্থ আছেন তো? কি যা তা বলছেন। একটি মেয়ে পেছন থেকে লোকটিকে ধাক্কা মেরেছে। আপনি বলছেন দেখেছেন। অথচ আর কেউ দেখেনি। এও কি হতে পারে নাকি?"
আমি চেঁচিয়ে বললাম, "কেন আমার কথা আপনারা বিশ্বাস করছেন না? আমি সত্যি দেখেছি। মেয়েটির সঙ্গে মহানায়ক উত্তমকুমার থেকে একসঙ্গে এসেছি। মেয়েটি আমার সঙ্গে এতক্ষণ ছিল। আমি ওর বাড়ী গেছি। ওর সঙ্গে কথা বলেছি। ওর সঙ্গে প্রেম ভালবাসা করেছি। শরীরে শরীর বিনিময় করেছি। একসাথে জীবন কাটাবো বলে চিরপ্রতিজ্ঞা করেছি। মেয়েটি ওর দূঃখের কাহিনী শুনিয়ে আমাকে ওর পুরোনো প্রেমিকের কথা বলেছে। যে ওর সঙ্গে প্রতারণা করেছে, ওর জীবনটাকে নষ্ট করেছে। তাকেই ও ধাক্কা মেরেছে পেছন থেকে। আমি সচক্ষে দেখেছি।"
আশে পাশের লোকজন ভীড় করে ফেলেছে আমার কথা শোনার জন্য। কেউ মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। কেউ বা করছে হাসাহাসি। ভাবছে কি পাগলের প্রলাপই একনাগাড়ে করে যাচ্ছে লোকটা।
আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি। আর ভাবছি দুটো দেহ যখন একসাথে ট্রেন লাইন থেকে তোলা হবে, তখনই বোধহয় ভুলটা এদের ভাঙবে।
লোকটির ছিন্ন ভিন্ন দেহটাকে কাপড়ে মুড়ে যখন ট্রেন লাইন থেকে তোলা হল, তখন সত্যি আমার কথা মিথ্যে প্রমাণিত হয়ে গেল। ওর দেহের সঙ্গে আর কোনো মৃতদেহ তখন ছিল না। কোনো মেয়ের দেহ পাওয়া যায়নি। দেবিকার শরীরটাকে খুঁজে পায়নি উদ্ধারকারী দল।
দেবিকা আমাকে কথায় কথায় বলেছিল, "ও আমাকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে......" তখন কথাটা ধরতে পারিনি। দেবিকা বলেছিল আমি মরেও শান্তি পাবো না। এই দুটো কথার মধ্যেই ও বোঝাতে চেয়েছিল, যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছো তুমি, সে আর ইহজগতে বেঁচে নেই। এই পাতালেই মৃত্যু ঘটেছে তার।
রেকর্ড বলছে, দুমাস আগে একটি সুন্দরী মেয়ের মৃত্যু হয় মহানায়ক উত্তমকুমার স্টেশনে। কিন্তু সেটি আত্মহত্যা না কি হত্যা? সে রহস্য ভেদ করতে পারেননি পুলিশ। কিন্তু পেরেছি আমি। দেবিকার আত্মাটা শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছিল এতদিন, মহানায়ক উত্তমকুমার থেকে এসপ্ল্যানেড স্টেশন পর্যন্ত। ওর আত্মার সঙ্গে যৌনমিলন করেছি আমি। ভাবতেও গায়ে কেমন কাঁটা দিচ্ছে। দেবিকা প্রতিশোধ নিয়েছে। আর ওর আত্মারও মুক্তি ঘটেছে চিরতরে।
……………সমাপ্ত……………