ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা নরম আলোয় ঘরটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। দূরের মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছিল, আর উঠোনের গাছগুলো রাতের শিশিরে ভিজে ছিল।
আজ বাবা বাড়ি ফিরবেন।
কথাটা মনে পড়তেই ঘুমের রেশ কেটে গেল। গত কয়েক দিন ধরে যে আশঙ্কাটা আমাদের বাড়ির প্রতিটি ঘরে নীরবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, আজ তার মুখোমুখি হওয়ার দিন।
আমি বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গেলাম। নিচে রান্নাঘরে আম্মুর নড়াচড়ার শব্দ পাচ্ছিলাম। এত সকালে তিনি উঠে পড়েছেন। আজকের দিনটা যে তাঁর কাছেও সাধারণ কোনো দিন নয়, সেটা বুঝতে আমার অসুবিধা হলো না।
কিছুক্ষণ পর নিচে নেমে দেখি, আম্মু রান্নাঘরের পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের পানি বসিয়েছেন। আমাকে দেখে বললেন, “ঘুম ভেঙে গেছে?”
“এমনিতেই উঠে পড়লাম।”
তিনি মাথা নেড়ে আবার কাজে মন দিলেন।
গত রাতের কথাগুলো মনে পড়ছিল। বাবাকে নিয়ে তাঁর ভয়, দীর্ঘদিনের অভিমান, আর নিজের বদলে যাওয়া জীবনটাকে আবার নতুন করে সামলানোর আশঙ্কা। অথচ এখন তাঁর মুখে সেই কথাগুলোর কোনো ছাপ নেই। তিনি যেন নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছেন, আজ যা-ই ঘটুক, তাঁকে স্বাভাবিক থাকতে হবে।
আমি চুপচাপ তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“চা খাবি?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“খাব।” [[image_1]]
তিনি কাপ এগিয়ে দিলেন। আমাদের আঙুল মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে গেল। খুবই সাধারণ একটা ঘটনা। অথচ দুজনেই যেন একসঙ্গে একটু থমকে গেলাম।
আম্মু প্রথমে চোখ সরিয়ে নিলেন।
আমি তাঁর হাতটা ধরে নিলাম। আঙুলের স্পর্শটা এখন আর সাধারণ নয়। তাঁর শরীরটা একটু নড়ে গেল। আমি চুপ করে তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে তাঁর কানের কাছে ফিসফিস করলাম, “মা এই স্নিগ্ধ সকালে… একটু সময় নেই?”
তিনি থমকে গেলেন। চোখে ভয় আর আকুতির মিশ্রণ। কিন্তু তাঁর শ্বাসটা আরও গভীর হয়ে গেল। “এখানে? এত সকালে?”
“বেলকনির দিকে চলে যাব। কেউ দেখবে না। অপরাজিতা আর লতানো গাছের কারণে কিছুই দেখা যায় না.”
[[image_2]] আম্মু বেলকনিতে এসে দেয়ালে গা এলিয়ে দাড়ালো। আমি তাঁকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম। তাঁর ব্লাউজটা হালকা করে খুলে ফেললাম। তাঁর শরীরটা এখনো গত রাতের মতোই উত্তপ্ত। আমি তাঁর দুই হাত তাঁর স্তনের উপর রাখলাম। চিবুক মারলাম। নিপল দুটো মুখে নিয়ে চুষতে শুরু করলাম। জিভ দিয়ে নিপল ঘুরালাম। দাঁত দিয়ে হালকা কামড়ালাম। তাঁর হাত আমার হাতে চেপে ধরলেন। “তুহিন… এখানে… আস্তে…” কিন্তু তাঁর শরীরটা আমার কাছে নরম হয়ে গেল।
আমি তাঁকে বেলকনির দিকে ঠেলে দিলাম। লতানো গাছে ঘিরে থাকায় বাইরে থেকে কেউ দেখতে পাবে না। আম্মুর বুকের উপর দিয়ে হাত বুলিয়ে তাঁর ক্লিটিসে আঙুল রাখলাম। ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে দিলাম। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “আহহহ… …” আমি তাঁর সায়া নিচে নামিয়ে দিলাম। তাঁর যৌনী ভিজে আছে। আমি দুই আঙুল ঢুকিয়ে ম্যাসেজ করতে লাগলাম। তাঁর পা কাঁপছে। আমি তাঁের স্তন দুটো পিছন থেকে চেপে ধরে চিবুক মারলাম। নিপল টেনে ধরে কামড়ালাম। “আম্মু… আজ তোমাকে আমার মতো করে নেব…”
তিনি পায়ের আঙুল টেনে ধরলেন। শরীরটা আমার কাছে নরম হয়ে গেল। “আহহহহ… …” আমি তাঁর যৌনীতে আঙুল ঢুকিয়ে ঘুরাতে লাগলাম। দ্রুত। তাঁর হাত আমার হাত ধরে আছে। চাপা আওয়াজে তাঁর নিঃশ্বাস পালাচ্ছে। আমি তাঁর কানে ফিসফিস করলাম, “আজ থেকে বাবা আসার পর আমরা দূরত্ব রাখব… কিন্তু ভেতরে তো কাছে পাওয়ার আগুন জ্বলবে…” তিনি হালকা চিৎকার করে উঠলেন। শুধু শরীরটা আমার হাতে শিথিল হয়ে গেল। যৌনীটা চেপে ধরছে আমার লিঙ্গকে। আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরে শেষ করালাম। তিনি কাঁপতে কাঁপতে আমার বুকে মাথা গুঁজে ধরলেন।
তারপর তিনি বললেন, “যা, তৈরি হয়ে নে। তোর বাবাকে আনতে যেতে হবে.” কথাটা বলার সময় তাঁর গলায় এমন একটা স্বাভাবিক দৃঢ়তা ছিল, যেন গত কয়েক দিনের সব অস্থিরতা তিনি দরজার বাইরে রেখে এসেছেন।
আমি কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। জানতাম, সবকিছু এত সহজে মুছে যায় না। কিছু স্মৃতি মানুষকে চুপ করিয়ে দেয়, কিছু প্রশ্নের উত্তর না থাকলেও সেগুলো মনের মধ্যে থেকে যায়।
কিন্তু আজ সেসব প্রশ্ন করার দিন নয়।
আজ বাবা ফিরছেন।
সকাল আটটার দিকে আম্মু নিজের ঘর থেকে বের হলেন।
আমি তখন বসার ঘরে বসে ফোন দেখছিলাম। তাঁকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য তাকিয়ে রইলাম।
সেই পরিচিত রূপ, পরিপাটি শাড়ি, মাথায় ওড়না, কপালে ছোট্ট টিপ, হাতে ঘড়ি আর মুখে সংযত হাসি। গত কয়েক সপ্তাহে তাঁর মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো দেখেছিলাম, সেগুলোর কোনো চিহ্ন যেন এখন আর চোখে পড়ছিল না।
তিনি দাদির ঘরে গিয়ে সালাম করলেন। তারপর বাবার জন্য তৈরি করা খাবারের তালিকা আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একবার দেখে নিলেন।
দাদি খুশি হয়ে বললেন, “বউমা, আজ তোকে দেখে মনটা ভরে গিল। কত দিন পর ছেলেটা বাড়ি আসছে!”
আম্মু মৃদু হেসে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। অনেক দিন পর সবাই একসঙ্গে হব।”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি হলো।
তিনি কি সত্যিই আগের জীবনে ফিরে যেতে চাইছেন? নাকি সবাইকে আশ্বস্ত করার জন্য কথাগুলো বলছেন?
আমি উত্তর জানতাম না।
আম্মু ঘুরে আমার দিকে তাকালেন।
“তুহিন, গাড়ির ব্যবস্থা হয়েছে?”
“হ্যাঁ। মামাকে বলেছি, আমরা সময়মতো বের হব.”
“বেশ। তাহলে আর দেরি করিস না.”
আমাদের চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য মিলল। তাঁর মুখে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। কিন্তু দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার আগে তিনি যেন কিছু বলতে চেয়েও বললেন না।
আমিও কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
কিছু দূরত্ব প্রয়োজনের কারণে তৈরি হয়। আবার কখনো সেই দূরত্বই মানুষের কাছে সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বাবাকে আনতে বের হওয়ার আগে দাদি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়লেন। আম্মু তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি গাড়ির দরজা খুলে অপেক্ষা করছিলাম।
আম্মু গাড়িতে ওঠার আগে একবার বাড়িটার দিকে তাকালেন।
এই বাড়িতেই তাঁর দীর্ঘ অপেক্ষার দিনগুলো কেটেছে। এই বাড়িতেই তিনি নিজের মতো করে বাঁচার একটা ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। আর আজ সেই বাড়িতেই ফিরছেন তাঁর স্বামী—একজন মানুষ, যাঁর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ইতিহাস অনেক পুরোনো, অথচ বর্তমানটা যেন নতুন করে অচেনা হয়ে উঠেছে।
“কী হলো? দাঁড়িয়ে আছিস কেন?” আম্মু জিজ্ঞেস করলেন।
আমি চমকে উঠলাম।
“কিছু না। চলো।”
তিনি গাড়িতে উঠে বসলেন।
গাড়ি চলতে শুরু করল। রাস্তার দুই পাশে দোকানপাট খুলছিল, চায়ের দোকানে লোকজন জমতে শুরু করেছে, আর সকালের রোদ ধীরে ধীরে শহরটাকে জাগিয়ে তুলছে।
দাদি বাবার কথা বলতে লাগলেন। তিনি কী কী খাবার পছন্দ করেন, দেশে ফিরে প্রথমে কোথায় যেতে চাইবেন, কত দিন পর আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হবে সবকিছু নিয়েই তাঁর উৎসাহের শেষ নেই।
আম্মু মন দিয়ে শুনছিলেন। মাঝে মাঝে উত্তর দিচ্ছিলেন।
আমি সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
হঠাৎ রিয়ারভিউ মিররে আম্মুর চোখের সঙ্গে আমার চোখ মিলে গেল। তিনি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে জানালার বাইরে মুখ ফেরালেন।
সেই দৃষ্টিতে কী ছিল, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারলাম না।
হয়তো ভয়। হয়তো অনিশ্চয়তা। হয়তো এমন কিছু স্মৃতি, যেগুলো তিনি আজকের দিনের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চাইছিলেন।
আমি আর তাকালাম না।
কারণ আজ থেকে আমাদের দুজনের সামনে একটি নতুন বাস্তবতা দাঁড়াতে চলেছে। সেই বাস্তবতায় একই বাড়িতে থেকেও অনেক কথা বলা যাবে না, অনেক অনুভূতির ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না।
আর সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের প্রত্যেককে নিজের আচরণের দায়িত্ব নিতে হবে।
বিমানবন্দরের বাইরে পৌঁছে গাড়ি থামল।
দাদি প্রায় অধীর হয়ে উঠলেন। বারবার ফোনের স্ক্রিন দেখছিলেন, কখন বাবা বের হবেন জানতে চাইছিলেন।
আম্মু তাঁর ব্যাগটা ঠিক করে নিলেন। তারপর মাথার ওড়নাটা আরেকটু গুছিয়ে দিলেন।
[[image_3]] “তুহিন,” তিনি আস্তে বললেন।
“হ্যাঁ?”
“তোর বাবা অনেক দিন পর ফিরছে। ওর সঙ্গে ভালোবাবে কথা বলিস। এত দিন দূরে ছিল, অনেক কিছুই হয়তো বদলে গেছে.”
আমি তাঁর দিকে তাকালাম।
“তুমি চিন্তা কোরো না.”
তিনি মৃদু হাসলেন।
“আমি চেষ্টা করছি, বাবা।”
এই প্রথম সেদিন তাঁর কণ্ঠে এমন একটা ক্লান্তি শুনলাম, যা কোনো সাজানো হাসি দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে রাখা যায় না।
ঠিক তখনই আগমনপথের দরজা দিয়ে কয়েকজন যাত্রী বেরিয়ে এলেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে দেখে দাদি হঠাৎ বলে উঠলেন, “ওই যে! আশফাত!”
বাবা।
কাঁধে ব্যাগ, হাতে ছোট একটা স্যুটকেস। মুখে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, কিন্তু আমাদের দেখে তাঁর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
দাদি প্রায় ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। বাবা মাকে সালাম করে বুকে টেনে নিলেন। তারপর আমার দিকে এগিয়ে এলেন।
“কী রে, তুহিন! কত বড় হয়ে গেছিস!”
আমি হাসলাম।
“কেমন আছ, বাবা?”
“এখন তোকে দেখে আরও ভালো লাগছে.”
তিনি আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর আম্মুর দিকে তাকালেন।
কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশের শব্দগুলো যেন একটু দূরে সরে গেল।
“কেমন আছ?” বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
আম্মু মাথা নিচু করে মৃদু হাসলেন।
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?”
“ভালো। তোমাদের খুব মনে পড়ত.”
আম্মু বললেন, “চলো, বাড়ি যাই। অনেক পথ এসেছ.”
কথাগুলো ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। একজন স্বামী বহুদিন পর বাড়ি ফিরেছেন, স্ত্রী তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছিস, ছেলে পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
বাইরে থেকে দেখলে এই পরিবারে কোনো অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাওয়া যেত না।
কিন্তু গাড়িতে ফেরার পর বাবা যখন আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাকে একটু ক্লান্ত লাগছে,” তখন আম্মু হেসে উত্তর দিলেন, “বাড়ি গেলে বিশ্রাম নিতে পারবে.”
তিনি নিজের ক্লান্তির কথা বললেন না। গত কয়েক সপ্তাহের পরিবর্তনের কথাও বললেন না।
আর আমি সামনের সিটে বসে বুঝতে পারলাম, আজ থেকে আমাদের বাড়িতে শুধু একজন মানুষ ফিরে আসছেন না।
ফিরে আসছে পুরোনো প্রত্যাশা, পুরোনো অভিমান, অনেক দিনের জমে থাকা প্রশ্ন।
সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর কী হবে, তা কেউ জানে না।
শুধু জানি, বাড়ি পৌঁছানোর পর থেকে আমাদের প্রত্যেককে নতুন করে শিখতে হবে একই ছাদের নিচে থেকেও কীভাবে এমন সব সত্যের মুখোমুখি হতে হয়, যেগুলো এত দিন নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল।
বাড়ির গেট খুলতেই দাদি আনন্দে বলে উঠলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, কত দিন পর আমাদের বাড়িটা আবার পূর্ণ হলো!”
বাবা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকালেন। বাড়ির দেয়াল, উঠোনের গাছ, বারান্দার পুরোনো চেয়ার সবকিছু যেন তাঁর কাছে পরিচিত অথচ কিছুটা বদলে যাওয়া। তিনি ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললেন, “বাড়িটাকে খুব মিস করেছি.”
আম্মু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাথায় পরিপাটি করে ওড়না দেওয়া, মুখে মৃদু হাসি।
“আগে ভেতরে এসো। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছ.”
বাবা তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
“তুমি তো একটুও বদলাওনি.”
কথাটা শুনে আম্মু একটু থামলেন। তারপর বললেন, “মানুষ কি আর এত সহজে বদলায়?”
বাবা কথাটার মধ্যে অন্য কোনো অর্থ খুঁজলেন না। ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন।
কিন্তু আমি আম্মুর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, কথাটা বলার সময় তাঁর চোখে ক্ষণিকের জন্য অন্য রকম একটা ছায়া নেমে এসেছিল।
বসার ঘরে ঢুকেই বাবা দাদির সঙ্গে গল্প শুরু করলেন। বিদেশে কাজের চাপ, যাত্রাপথের ক্লান্তি, পরিচিত মানুষদের খবর—সবকিছু নিয়ে কথা হচ্ছিল। দাদি বারবার বলছিলেন, এবার যেন বাবা আর এত দীর্ঘ সময়ের জন্য দূরে না যান।
আম্মু রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
আমি কয়েকবার তাঁকে সাহায্য করতে যাওয়ার কথা ভেবেও গেলাম না। এই মুহূর্তে আমাদের দুজনের মধ্যে স্বাভাবিক দূরত্ব বজায় রাখাটাই জরুরি মনে হচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর আম্মু আমাকে ডেকে বললেন, “তুহিন, তোর বাবার ব্যাগটা ঘরে রেখে আয়। আর ওর প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বের করে দিস.”
“আচ্ছা.”
বাবার ঘরে ঢুকে ব্যাগটা বিছানার পাশে রাখলাম। ঘরটা কয়েক দিন আগেই পরিষ্কার করা হয়েছিল। নতুন বিছানার চাদর, পর্দা, টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস—সবকিছুতেই আম্মুর যত্নের ছাপ ছিল।
বাবা ঘরে এসে চারদিকে তাকিয়ে বললেন, “তোর মা সবকিছু আগের মতোই রেখেছে দেখছি.”
আমি উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ, মা অনেক কিছু গুছিয়েছে.”
বাবা সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন।
“তোর মা সংসারটা খুব ভালো সামলেছে। আমি দূরে থেকেও কখনো বাড়ির চিন্তা করতে হয়নি.”
আমি চুপ করে রইলাম।
বাবার কথায় কৃতজ্ঞতা ছিল, বিশ্বাস ছিল। তিনি সত্যিই মনে করতেন, দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরিবারকে নিরাপদে রেখেছেন। তাঁর কাছে সংসারের হিসাবটা হয়তো ঠিকই ছিল।
কিন্তু একই সংসারের ভেতরে যে কিছু অনুভূতির হিসাব অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে, সেটা তিনি জানতেন কি না, বুঝতে পারলাম না।
দুপুরের খাবারের সময় আম্মু বাবার পছন্দের কয়েকটি পদ রান্না করেছিলেন। বাবা খেতে বসে বেশ খুশি হলেন।
“এই স্বাদটা অনেক দিন পাইনি,” তিনি বললেন।
দাদি হেসে উত্তর দিলেন, “তোর বউ তোকে খাওয়ানোর জন্য সকাল থেকে ব্যস্ত!”
আম্মু মাথা নিচু করে হাসলেন।
“এত দিন পর বাড়ি এসেছে। একটু ভালো খাবার তো খেতেই হবে.”
বাবা তাঁর প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি বসো না আমার পাশে.”
আম্মু বসে পড়লেন।
আমি টেবিলের অন্য পাশে বসে তাঁদের কথাবার্তা শুনছিলাম। বাবা মাঝেমধ্যে আম্মুকে বিদেশের কিছু গল্প বলছিলেন। কোথায় গিয়েছিলেন, কাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, এবার কী কী করার পরিকল্পনা আছে সবই বলছিলেন আগ্রহ নিয়ে।
আম্মু মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। কখনো প্রশ্ন করছিলেন, কখনো হাসছিলেন।
তবু একটা অদ্ভুত বিষয় আমার চোখে পড়ল।
বাবা যখন আম্মুর দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলেন, তিনি স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিচ্ছিলেন; কিন্তু মাঝেমধ্যে তাঁর দৃষ্টি যেন কথার মাঝখানেই অন্য কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিল।
একবার বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “কী ভাবছ?”
আম্মু সঙ্গে সঙ্গে তাকালেন।
“কিছু না। তোমার কথাই শুনছি.”
“ক্লান্ত লাগছে তোমাকে.”
“সকালে একটু তাড়াতাড়ি উঠেছি.”
বাবা আর প্রশ্ন করলেন না।
কিন্তু আমি জানতাম, মানুষের ক্লান্তির সব কারণ ঘুমের অভাব নয়।
বিকেলে বাবা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। দাদি আত্মীয়দের ফোন করে তাঁর ফিরে আসার খবর দিচ্ছিলেন। বাড়ির অন্য ঘরগুলোও ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল।
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, এমন সময় আম্মু এসে পাশে দাঁড়ালেন।
“তোর বাবা কেমন আছে বলে মনে হলো?”
“ভালোই। অনেক খুশি।”
“হুম.”
তিনি রেলিংয়ের ওপর হাত রেখে উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি ঠিক আছ তো?”
আম্মু আমার দিকে তাকালেন। কয়েক মুহূর্ত কিছু বললেন না।
তারপর শান্ত গলায় বললেন, “আমি ঠিক থাকার চেষ্টা করছি.”
“কোনো সমস্যা হলে”
“তুহিন.”
তাঁর কণ্ঠে কোমলতা ছিল, কিন্তু কথাটা থামিয়ে দেওয়ার মতো দৃঢ়তাও ছিল।
“সব সমস্যার সমাধান তোর দায়িত্ব নয়। কথাটা মনে রাখিস.”
আমি মাথা নিচু করলাম।
তিনি আবার বললেন, “তুই আমার ছেলে। তোর পড়াশোনা আছে, ভবিষ্যৎ আছে। বড়দের সম্পর্কের জটিলতা যেন তোর জীবনটাকে গ্রাস না করে.”
কথাগুলো শুনে আমার ভেতরে একটা অস্বস্তি তৈরি হলো। কারণ তিনি ঠিক কোন ভয় থেকে কথাগুলো বলছেন, তা আমি বুঝতে পারছিলাম।
“আমি বুঝেছি,” আস্তে বললাম।
আম্মু আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর হাত সরিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললেন, “চল, তোর বাবার জন্য চা বানাই.”
আমরা পাশাপাশি রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেলাম।
বাইরে থেকে আমাদের মধ্যে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হতো। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, এই স্বাভাবিকতার আড়ালে কতগুলো কঠিন সত্য একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
সন্ধ্যার পর বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করলেন। কেউ বাবাকে জড়িয়ে ধরলেন, কেউ বিদেশের গল্প শুনতে চাইলেন, কেউ আবার আম্মুর রান্নার প্রশংসা করলেন।
আম্মু সবার সঙ্গে আগের মতোই সংযত ও আন্তরিক আচরণ করলেন। দাদির পাশে বসে অতিগিদের আপ্যায়ন করলেন, প্রয়োজনীয় কথা বললেন, মাঝে মাঝে হেসেও উঠলেন।
বাবা তাঁকে দেখে একবার বললেন, “তোমাকে আজ বেশ হাসিখুশি লাগছে.”
আম্মু উত্তর দিলেন, “সবাই এত দিন পর তোমাকে পেয়েছে। ভালো লাগবে না?”
বাবা সন্তুষ্ট হয়ে হাসলেন।
আমি একটু দূরে বসে ছিলাম। কথাগুলো শুনে মনে হলো, আমরা সবাই যেন নিজেদের জন্য আলাদা আলাদা মুখোশ বেছে নিয়েছি। বাবার মুখে ফিরে আসার আনন্দ, দাদির মুখে পরিবারের পূর্ণতা, আম্মুর মুখে স্বাভাবিকতার হাসি, আর আমার মুখে এমন এক নির্লিপ্ততা যার আড়ালে আমি নিজেই নিজের অনুভূতিগুলো গুছিয়ে নিতে পারছিলাম না।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিগিরা চলে গেলেন।
বাবা বসার ঘরে বসে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন।
“তুহিন, পড়াশোনা কেমন চলছে?”
আমি তাঁর পাশে বসলাম।
“ভালো.”
“ভবিষ্যতে কী করার ইচ্ছা?”
আমরা বেশ কিছুক্ষণ পড়াশোনা, চাকরি আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বললাম। বাবা মন দিয়ে শুনলেন। মাঝেমধ্যে পরামর্শ দিলেন, কিছু বিষয়ে উৎসাহও দিলেন।
একসময় তিনি বললেন, “জানিস, এত দিন দূরে থেকে একটা জিনিস বুঝেছি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো খুব জরুরি। টাকা রোজগার করতে গিয়ে অনেক সময় আসল জিনিসগুলো চোখ এড়িয়ে যায়.”
আমি তাঁর দিকে তাকালাম।
কথাটা তিনি খুব সহজভাবে বলেছিলেন। হয়তো নিজের জীবন নিয়েই ভাবছিলেন।
“এবার কিছুদিন তোমাদের সঙ্গে থাকব,” তিনি বললেন। “সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে যাব। তোর মাকেও একটু সময় দেওয়া দরকার.”
আমি কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না।
বাবার কথায় আন্তরিকতা ছিল। তিনি যে পরিবারের সঙ্গে নতুন করে সময় কাটাতে চান, সেটা স্পষ্ট।
কিন্তু মানুষ যখন ফিরে এসে পুরোনো সম্পর্কগুলো নতুন করে গড়ে তুলতে চায়, তখন কি শুধু ইচ্ছা থাকলেই সবকিছু সম্ভব হয়?
আমি জানতাম না।
রাত প্রায় এগারোটা।
নিজের ঘরে যাওয়ার আগে করিডোরে আম্মুর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। হাতে একটা গ্লাস, সম্ভবত পানি দিতে গিয়েছিলেন।
আমাকে দেখে থামলেন।
“ঘুমাতে যাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ। তুমি?”
“আমিও যাব.”
কয়েক মুহূর্ত আমরা নীরব থাকলাম।
তারপর আম্মু বললেন, “আজকের দিনটা ভালোবাবেই কেটে গেল, তাই না?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“হ্যাঁ.”
তিনি হালকা হাসলেন।
“এভাবেই সবকিছু শান্ত থাকুক.”
কথাটা বলেই তিনি নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
আমি করিডোরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাবা ফিরে এসেছেন। বাড়ি আবার পরিচিত ছন্দে চলতে শুরু করেছে। সকালের চা, দুপুরের খাবার, সন্ধ্যার অতিগিরা, রাতের কথাবার্তা, সবকিছুই যেন আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে।
তবু আমি বুঝতে পারছিলাম, স্বাভাবিক দেখানো আর সত্যিই স্বাভাবিক হয়ে ওঠা এক জিনিস নয়।
সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারলাম না।
বাবার হাসিমুখ মনে পড়ছিল। আম্মুর সংযত আচরণ মনে পড়ছিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাঁর বলা কথাটাও বারবার ফিরে আসছিল। বড়দের সম্পর্কের জটিলতা যেন আমার জীবনটাকে গ্রাস না করে।
হয়তো এটাই ছিল আমাদের সবার জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
একই ছাদের নিচে থেকে নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নেওয়া, অতীতের ভুলের মুখোমুখি হওয়া, আর এমন একটা ভবিষ্যৎ তৈরি করা যেখানে কাউকে আর নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে হবে না।
বাইরে তখন রাত আরও গভীর হয়েছে।
বাবার ঘরের আলো নিভে গেল। আম্মুর ঘর থেকেও আর কোনো শব্দ আসছিল না।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
আগামীকাল থেকে জীবন আবার চলবে।
কিন্তু সেই জীবনে কী কী বদলাবে, আর কোন সত্যগুলো একদিন আর গোপন রাখা যাবে না সেই উত্তর তখনো অজানা।