প্রেমের কাহিনী, সিজন ১ — এপিসোড ১৪

Premer Kahini Season 1 — Episode 14

সৃজন সৃষ্টি দুই ভাইবোন গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে চিরতরে হারিয়ে ফেলে ওদের মা বাবাকে। বেদখল হয়ে যায় ওদের সম্পত্তি। তারপর…

লেখক: Chodon Kumar

ক্যাটাগরি: ভাই বোনের প্রেম

সিরিজ: প্রেমের কাহিনী, সিজন ১

প্রকাশের সময়:16 Jul 2026

আগের পর্ব: প্রেমের কাহিনী, সিজন ১ — এপিসোড ১৩

…আগের পর্বের পর…

সৃজন আর সৃষ্টি যে কোনো বস্তিতে গিয়ে থাকতে পারে‚ এটা কল্পনাতেই আসবে না ওদের মাথায়। তাছাড়া বস্তির নিম্ন আয়ের মানুষগুলো সব সময় নিজেদের নিয়েই এত ব্যাস্ত থাকে যে‚ অন্যরা কে কী করল বা কে কোথায় গেল, কোথা থেকে এলো সে সব খোঁজ নেওয়ার কোনো সময় নেই ওদের কাছে। হ্যাঁ ওটাই আদর্শ জায়গা লুকিয়ে থাকার পক্ষে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেল ওরা। ট্যাক্সি ধরে যতক্ষণে ওরা বস্তিতে পৌঁছাল ততক্ষণে প্রায় সূর্য উঠে গেছে। বস্তিতে ঢুকতেই চোখে পরে এই কাক ডাকা ভোরেই কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়ে গেছে।

ওরা যখন ঢুকল তখন কেউ ওদের দিকে ফিরেও চাইল না, আবার কেউ কেউ কিছুটা কৌতুহলের চোখে তাকিয়ে পরক্ষণেই ব্যাস্ত হয়ে পড়ল নিজেদের কাজ নিয়ে। আরেকটু এগোতেই দেখে একটা কলের সামনে জলের জন্য লম্বা লাইন। সেই লাইনটার কাছে গিয়ে একটা মহিলাকে দেখে ডাক দেয় সৃষ্টি।

সৃষ্টি — এই যে শুনছেন?

মহিলা — আমাকে ডাকছ?

সৃষ্টি — হ্যাঁ আপনাকেই ডাকছিলাম। আসলে এখানে এসেছিলাম একটা ঘর ভাড়ার জন্য, কোনো ঘর কি ভাড়া পাওয়া যাবে? আমার একটা ঘরের খুব দরকার।

মহিলা — (সৃষ্টির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে) দেখে তো ভদ্দর ঘরের মেয়ে মনে হচ্ছে, তা এই বস্তিতে ঘর খুঁজছ যে বড়?

সৃষ্টি — আসলে আমি গ্রাম থেকে এসেছি। গ্রামের জমিজমা সংক্রান্ত ঝামেলায় আমার স্বামীকে খুন মেরে ফেলতে চেয়েছিল ওরা, সৃজনকে দেখিয়ে বলে। আমি কোনোরকমে ওকে নিয়ে পালিয়ে এসেছি।

“আহারে” বলে সমবেদনার চোখে তাকায় মহিলাটি ওদের দিকে। তারপর বলে, “ঘর একটা আছে বটে, এই আমার ঘরের পাশেই। তবে মালিক এখনো ঘুমোচ্ছে, মালিক উঠুক, বলছি মালিকে। তুমি ততক্ষণে আমার ঘরে বসো।”

বেলা বাড়তেই মহিলাটি একটা লোককে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। সৃষ্টিকে বলে ইনি ঘরের মালিক। সৃষ্টি উঠে দাড়িয়ে নমস্কার করে।নমস্কারের উত্তরে মালিক বলে, তোমাদের কষ্টের কথাতো সবই শুনলাম। ওই যে দেখছ, ওইটাই ঘর। মাসে ৩০০০ টাকা ভাড়া, এক মাসের ভাড়া অগ্রীম দিতে হবে।” সৃষ্টি ওর হ্যান্ডব্যাগটা খুলে ৩০০০ টাকা বের করে দেয়। সৃজন যেন বোবা হয়ে গেছে। একটা কথাও বলে না, শুধু চেয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে। মালিক থাকতেই ঘরের চাবি বুঝে নিয়ে ঘরে ঢোকে সৃষ্টি।

কেমন যেন একটা ভ্যাপসা গন্ধ ভেতরে। তাড়াতাড়ি করে ঘরের একমাত্র জানালাটাও খুলে দেয় সৃষ্টি ভ্যাপসা গন্ধ দূর করতে। ঘরের ভেতরে বিছানা হিসেবে একটা চৌকি পাতা রয়েছে। ঘরের সামনে একটা বারান্দা তার সামনে এক চিলতে উঠোন। ঘর ভাড়া, ট্যাক্সি ভাড়া সব মিটিয়ে সৃষ্টি গুনে দেখে ওর কাছে আর মাত্র ১৮০০ টাকা আছে। এই ১৮০০ টাকা দিয়েই আজ থেকে শুরু হল ওদের সংসার জীবন।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সৃষ্টি ভাবে কী অদ্ভুত মানুষের নিয়তি! আজ থেকে মাত্র এক সপ্তাহ আগে সৃজনের কাছে শুনেছিল চাবাগান শ্রমিকদের দৈনিক মজুরির কথা, শুনেছিল মাত্র ১০ ফুট বাই ১০ ফুট একটা ঘরে ওরা পরিবার নিয়ে থাকে। শুনে কী কষ্টটাই না পেয়েছিল সৃষ্টি মনে মনে। আর আজ দেখ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ওদের সংসার‌ও শুরু হচ্ছে এই ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের একটা টিনের ছাউনির ঘরে।

ঘর না হয় তবু ঠিক হল, কিন্তু খাবে কী? সৃজনকে ঘরের মধ্যে রেখে বেরিয়ে যায় সৃষ্টি। বস্তির ভেতরেই রেল লাইনের পাশে একটা বাজার আছে, সেখানে মাছ-মাংস থেকে আনাজপাতি সব‌ই মোটামুটি পাওয়া যায়। খাওয়ার চিন্তা তো মিটল, কিন্তু আর বাকি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কোথায় পাবে? আবার ওর কাছে তো টাকাও বেশি নেই। অবশ্য মোবাইলটা আছে। সৃষ্টির মনে পড়ে গত জন্মদিনে ওর বাবা ওকে একটা আইফোন গিফ্ট করেছিল, তা দেখে সে কি মন খারাপ সৃজনের, শেষমেশ সৃজনকেও একটা আইফোন গিফ্ট করে ওর জন্মদিনে। এক্সিডেন্টের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে সৃজনের আইফোনটা।

পুরোনো কথা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সৃষ্টির বুক থেকে। সেইসব দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। শেষমেষ সৃষ্টি গড়িয়াহাট মার্কেটে চলে যায়, ওখানে ওর মোবাইলটা আর কানের দুল মিলিয়ে বিক্রি করে পায় ২০ হাজার টাকার মতো। তা দিয়েই ঘরের চৌকির বিছানার জন্য একটা তোষক, একটা চাদর আর দুটো বালিশ কেনে সৃষ্টি। এছাড়াও ঘরের প্রয়োজনীয় হাঁড়ি, কড়া, থালা, বাসন, আয়না, চিরুনি, চাল, ডাল, তেল, নুন, মশলা ইত্যাদি জিনিসপত্র কিনতেই বেরিয়ে যায় ১৫ হাজার টাকার মতো। মার্কেট থেকে বেরোনোর সময়ে মনে পড়ে চান করে কী পড়বে, পরনের কাপড়টা ছাড়া তো এক্সট্রা কোনো কাপড়‌ও নেই। শেষমেষ ফুটপাথ থেকে সস্তায় সৃজনের জন্য দুটো ট্রাউজার, টি শার্ট এবং স্যান্ডো গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া আর ওর নিজের জন্য সস্তার প্রিন্টের দুটো সালোয়ার কামিজ এবং ব্রা, প্যান্টি কিনে ফিরে আসে সৃষ্টি।

ঘরে এসে চুপচাপ চৌকির উপরে তোষক ফেলে চাদর বিছিয়ে বিছানা করে ফেলে সৃষ্টি। কিনে আনা ছোট্ট মুখ দেখা আয়নাটা টাঙিয়ে দেয় ঘরের দেওয়ালে পোতা একটা পেরেকে। ঘর মোটামুটি গোছগাছ করে বেরিয়ে আসে সৃষ্টি। মনে পড়ে প্রায় ২৪ ঘন্টা ধরে না খেয়ে আছে ওরা। নতুন কেনা হাঁড়ি, কড়া নিয়ে সৃষ্টি এগিয়ে যায় উঠোনের মাটির উনুনের দিকে। মানিয়ে নিতে চায় নিজেকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে। আজ পর্যন্ত কখনো মাটির উনুনে রাঁধেনি সৃষ্টি। উনুন জ্বালাতে গেলে ধোঁয়ায় ভরে যায় চারপাশ। চোখে মুখে ধোঁয়া ঢুকে জল বেরিয়ে আসছে ওর চোখ দিয়ে, তার পরেও হাল ছাড়েনা সৃষ্টি।

ছোটবেলা থেকেই জেদি মেয়ে সৃষ্টি। কখনো হার মানতে শেখেনি, হার সে মানবেও না। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর উনুন জ্বালাতে সক্ষম হয় সৃষ্টি। উনুন ধরিয়ে হাঁড়িতে ভাত বসিয়ে দেয়। ভাতে দেয় ৩-৪ টে আলু। বারান্দায় হুইলচেয়ারটাতে বসে বসে বোনের কাজ দেখতে থাকে সৃজন। মা-বাবার মৃত্যুর কথা শোনার পর থেকে এখনো পর্যন্ত একটা বাক‌্য‌ও উচ্চারণ করেনি ও। ঘটনার আকস্মিকতায় যেন বোবা হয়ে গেছে একেবারে। ভাতটা ফুটে গেলে ভাত নামিয়ে তেল, নুন, পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে আলু চটকে নেয় সৃষ্টি। আপাতত আজকে দুপুরবেলা এই আলু সেদ্ধ ভাত‌ই খেতে হবে। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আলু সেদ্ধ মাখা একটা থালায় করে নিয়ে যায় সৃজনের কাছে।

সদ্য কিনে আনা প্লাস্টিকের টুলটা পেতে সৃষ্টি বসে পরে সৃজন এর সামনে। ভাত খায়িয়ে দিতে থাকে দাদাকে। সৃজন‌ও কোনো কথা না বলে চুপচাপ ভাত খেতে থাকে বোনের হাতে। সৃষ্টিও সৃজনকে খাওয়াতে খাওয়াতে মাঝে মাঝে দুই একবার গ্রাস তুলে নেয় নিজের মুখেও। জল গড়াতে থাকে ওর দু চোখের কোন বেয়ে। সৃজন কেবলই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

ওদিকে…

সকালে ঘুম ভেঙ্গে যায় চম্পা রানীর। ঘুম ভাঙ্গতেই ড্রইংরুমের মেঝেতে নিজেকে নগ্ন আবিষ্কার করে বিস্মিত হয়ে ওঠে। আস্তে আস্তে একে একে মনে পড়তে থাকে গতরাতের ঘটনা। তাকিয়ে দেখে তাকে প্রায় জড়িয়ে আছে রবি আর ফাটাকেষ্ট। নাভির নিচে দুজনের বাঁড়া নেতিয়ে ল্যাকপ্যাক করে ঝুলছে। ওইদিকে পুলিশ অফিসার, ডাক্তার আর পঞ্চায়েত প্রধান তিনজনে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। সবাই ল্যাংটো এবং সেইসঙ্গে প্রত্যেকের গা থেকে ঘাম আর প্রস্রাব মিশ্রিত একটা বিশ্রী দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। গতরাতের নির্লজ্জতার কথা মনে পড়তেই গলা শুকিয়ে আসে চম্পা রানীর। আস্তে আস্তে উঠে বসে।

উঠে বসতেই দেখে সকলের‌ই প্রায় ঘুম ভেঙ্গেছে, ধনঞ্জয় মুখার্জীও আস্তে আস্তে উঠে বসছে। সবাই চোখ পিটপিট করে দেখছে চম্পা রানী আর মিনিকে। মিনির ঘুম ভাঙ্গলেও ৫ জন নরপিশাচ মিলে অকথ্য ভাবে ওর দেহটাকে ভোগ করার কারণে ঠিক করে উঠে বসতে পারছে না। সারা দেহ জুড়ে অসহ্য ব্যাথা ওর। চম্পা রানী নাইটিটা টেনে নিয়ে নগ্ন দেহ ঢাকার চেষ্টা করে। চম্পা রানীর অবস্থা দেখে হাসতে থাকে সবাই। ওদেরকে ওভাবে হাসতে দেখে তড়িঘড়ি করে মিনিকে নিয়ে কোনোরকমে দোতলায় চলে যায়।

এরপর একে একে ফ্রেশ হয়ে কাপড় চোপড় পড়ে সবাইকে বিদায় করে মিনিকে বাড়িতে বিশ্রামের জন্য রেখে রবি, ডাক্তার, চম্পা রানী আর ধনঞ্জয় বেড়িয়ে পড়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। হাসপাতালের ডেস্কে গিয়েই শুনতে পায় চিড়িয়া উধাও। রাগে নিজের মাথার চুল ছেঁড়ার অবস্থা হয় রবির। মনে মনে বলে তার মানে ওই শালী মাগিটা, সবই জানতে পেরেছিল, আমাদের এখান থেকে সরিয়ে দিয়েই ভেগেছে দাদাকে নিয়ে। এত দিন ধরে সাজানো প্ল্যান ভেস্তে যাচ্ছে দেখে রাগে ফেটে পরে রবি। সৃষ্টি মাগি তোর রেহাই নেই আমার হাত থেকে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাস না কেন, পার পাবিনা তুই। মরিয়া হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে আসে ওরা। বাড়িতে ফিরে সম্ভাব্য সব জায়গাতেই খোঁজ নেয় রবি, কিন্তু কোথাও খোঁজ নেই সৃজন আর সৃষ্টির। ঠিক যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে দুই ভাইবোন।

এদিকে…

রাত নেমেছে ঘিঞ্জি বস্তিতে। রাত ১০ টা মানে এখানে অনেক রাত। বেশিরভাগ ঘরগুলোতেই বাতি নেভানো। মাঝে মাঝে কোনো কোনো ঘর থেকে ভেসে আসছে বাচ্চাদের চিৎকার চেচামেচি, কান্না, বড়দের নোংরা খিস্তি, গালাগালি। আস্তে আস্তে সেগুলোও সব থেমে আসছে। কোলাহল থেমে নিঝুম নিস্তব্ধতা নেমে আসছে চারপাশে। এখন কেবল মাঝে মাঝে রাস্তার কুকুরের ঘেউ ঘেউ ছাড়া অন্য কোনো আওয়াজ আসছে না। বালিশে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে আছে দুই ভাইবোন। সৃষ্টি উদাস চোখে তাকিয়ে আছে ঘরের টিনের চাল আর কড়ি-বর্গার দিকে। পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে ঘুমিয়ে পড়েছে সৃজন। ঘুমের ঘোরে কি নিষ্পাপ লাগছে ওকে দেখতে। এখানে এসে মাথা আর হাতের ব্যান্ডেজ খুলে ফেলেছে ও। পায়ের টা এখনো আছে। একরাশ অবাধ্য চুল এসে ছড়িয়ে আছে কপাল জুড়ে।

সৃষ্টি অপলক তাকিয়ে থাকে দাদার নিষ্পাপ মুখের দিকে। এক হাতে কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয় দাদার কপালে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চিৎ হয়ে শুয়ে ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে থাকে সৃষ্টি। সব কিছু কিনে এখন মাত্র হাজার চারেকের মতো টাকা আছে হাতে। এই দিয়ে না হয় কোনোভাবে কষ্ট করে এই মাসটা চলে যাবে, কিন্তু তারপর? কীভাবে চলবে? যে করেই হোক একটা না একটা কাজ জোটাতেই হবে। বস্তির কেউ ওদের আসল পরিচয় জানে না। সকলেই জানে যে ওরা স্বামী-স্ত্রী। দাদাকে সাবধান করতে হবে ও যেন আবার সবার সামনে বোন‌ বলে ডেকে না বসে! যদিও সৃজনের মুখে বোন ডাকটা শুনতেই বেশি ভালোবাসে সৃষ্টি তবে সবার সামনে তো আর ডাকা যাবেনা।

এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ঘুম নেমে আসে ওর দুচোখে। এসব বস্তি এলাকাগুলোতে যেমন রাত নেমে আসে তাড়াতাড়ি তেমনি সকালও হয় তাড়াতাড়ি। কাকভোরেই চারদিকের চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায় সৃষ্টির। সৃজনের দিকে তাকিয়ে দেখে এখনো ঘুমোচ্ছে ও। আস্তে করে সৃজনের ঘুম না ভাঙ্গিয়ে উঠে যায় সৃষ্টি। এত বড় বস্তিজুড়ে কল আছে মাত্র ১০ টা। বালতিটা নিয়ে কলতলায় যেতেই দেখে জলের জন্য লম্বা লাইন লেগে গেছে।

লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় ১৫ মিনিট পড়ে জল পায় সৃষ্টি। বালতি ভরা বয়ে আনতে অনেক কষ্ট হয় ওর। বাড়ি এসে দেখে সৃজনের‌ ঘুম ভেঙ্গে গেছে। বারান্দায় বালতিটা নামিয়ে রেখে ঘরে ঢোকে সৃষ্টি।

সৃষ্টি — কিরে দাদা? কখন উঠলি?

সৃজন — বেশ‌খানিক্ষণ হয়ে গেল। তুই কোথায় গিয়েছিলিস বোন?

সৃষ্টি — জল আনতে। চল হাতমুখ ধুবি।

সৃজনকে ধরে ধরে বাইরে নিয়ে আসে সৃষ্টি। হুইলচেয়ারে বসিয়ে যত্ন করে হাত মুখ ধুয়িয়ে দিতে দিতে বলে, “শোন দাদা এখানকার সবাই কিন্তু জানে যে আমরা স্বামী-স্ত্রী। কারোর সামনে যেন আবার আমাকে বোন বলে ডাকিসনা। সৃজন কোনো কথা বলেনা। হাতমুখ ধুয়ে সৃষ্টি সবে উনুনটা জ্বালিয়েছে এমন সময়ে কালকের সাহায্যকারী সেই মহিলাটা ওদের বাড়িতে আসে।

মহিলা — (সৃষ্টিকে উনুন ধরাতে দেখে) আহারে কী কষ্ট তোমাদের, সৃষ্টির নরম কোমল হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলে এই হাত কি উনুন জ্বালানোর হাত? দেখেই বোঝা যাচ্ছে বড়লোক বাপের বেটি তুমি।

সৃষ্টি কিছু কোনো কথা না বলে চুপচাপ নীচের দিকে তাকিয়ে থাকে। মহিলা আবার বলে…

মহিলা — তা এখানে যে এসেছো এবার খাবে কী? খাওয়া দাওয়ার আর একটা ব্যাবস্থা তো করতে হবে? সৃষ্টি যেন আশার আলো দেখতে পায়। মহিলার দুই হাত আঁকড়ে ধরে…

সৃষ্টি — বৌদি আমাকে একটা কাজ জুটিয়ে দেবেন! যে কোনো কাজ। একটা কাজের খুব দরকার আমার।

মহিলা — (কিছুক্ষণ ভেবে) তোমাকে তো যে সে কাজ দেওয়া যাবে না। যতটুকু শুনেছি তোমার কাছে, তুমি যথেষ্ট শিক্ষিতা মহিলা। দাঁড়াও, আমি স্থানীয় কাউন্সিলের বাড়িতে কাজ করি। কাউন্সিলার এই বস্তির পোলাপানদের জন্যে একটা স্কুল করেছে। তাকে বলে দেখি ওখানে তোমার জন্য কোনো কাজের ব্যাবস্থা করতে পারে কিনা।

সৃষ্টি — তাহলে তো বৌদি অনেক ভালো হয়।

মহিলা — চিন্তা কোরো না। কাউন্সিলরবাবু খুব ভালো মানুষ। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের মতো দুর্নীতিবাজ নয়।

সত্যিই কাউন্সিলর অনেক ভালো মানুষ। পরদিনই সেই মহিলাটি সৃষ্টিকে নিয়ে যায় কাউন্সিলারের বাড়িতে। কাউন্সিলর সব শুনে চাকরি দিতে রাজি হয় সৃষ্টিকে। বস্তির স্কুল, মাস গেলে ৯০০০ টাকা বেতন। সৃষ্টি তাতেই রাজি হয়ে যায়।

যাক একটা ভাবনা তো দূর হল। আগের কথা ভাবতে থাকে সৃষ্টি ওদের দুই ভাইবোনকে বাবা হাত খরচই দিত ১০০০০ হাজার টাকা করে। আর এখন এই ৯০০০ টাকার মধ্যে ৩০০০ টাকা বাড়ি ভাড়া দিয়ে বাকি ৬০০০ টাকায় পুরো মাস চালিয়ে নিতে হবে! বাড়ি ফিরে সৃজনকে চাকরির কথা জানায় সৃষ্টি। সৃজন কিছুই বলতে পারে না। কিই বা বলবে ও? অক্ষম পা নিয়ে কিই বা বলার আছে?

ওদিকে…

সৃষ্টিকে খুঁজে না পেয়ে পাগলা কুকুরের মতো ক্ষেপে গেছে রবি হালদার। একদম মাস্টার প্ল্যান ছিল ওর। ধনঞ্জয় মুখার্জীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে সঞ্জয়বাবুকে পরিবারসহ দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে, তারপর বিয়ে করবে সৃষ্টিকে। সৃষ্টিকে বিয়ে করে সব কিছুর একছত্র মালিক হবে ও। তখন ধনঞ্জয় মুখার্জীকে ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়া কোনো ব্যাপার ছিলোনা, কিন্তু এখন? ইচ্ছা করলে ধনঞ্জয় মুখার্জী‌কে যেকোনো সময় ল্যাং মেরে ফেলে দিতে পারে ওকে। না না এটা কিছুতেই হতে দেওয়া যায়না।

ডানহিল ঠোঁটে ঝুলিয়ে বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতে থাকে রবি। হ্যাঁ, একটা উপায় পেয়ে গেছে সে। সঞ্জয় মুখার্জীর অবর্তমানে এখন সব বিষয় সম্পত্তির মালিক ধনঞ্জয় মুখার্জী। আর ধনঞ্জয় মুখার্জীর একমাত্র উত্তরাধিকার হল মিনি মুখার্জী। হ্যাঁ মিনি, মিনিকে বিয়ে করবে ও। তাহলেই একমাত্র এই সম্পত্তি ওর মুঠো গলে বেরিয়ে যাবার চান্স পাবেনা। মিনিকে বিয়ের প্রস্তাব দিতেই এক কথায় রাজি হয়ে যায় ধনঞ্জয় মুখার্জী। তার কারন সে ঠিক‌ই বুঝেছে এত বিষয় সম্পত্তি একা হাতে সামাল দেওয়া তার কর্ম নয়। রবি যদি তার জামাই হয়, তাহলে শশুর জামাই মিলে একসঙ্গে এসব দেখাশোনা করা কোনো ব্যাপারই না। শুরু হয়ে যায় রবি হালদার আর মিনি মুখার্জীর বিয়ের তোড়জোড়।

সামনের অগ্রাহয়ণেই বিয়ের দিনক্ষণ পাকা হয়ে যায় রবি আর মিনির। কেনাকাটা নিয়ে ব্যাস্ত সময় পার করছে সবাই। সৃষ্টির ঘরটা নিজের জন্য দখল করেছে মিনি। আর আপাতত বিয়ের আগে পর্যন্ত সৃজনের ঘরেই থাকছে রবি। আর সঞ্জয়বাবুর বেডরুম এখন ধনঞ্জয় আর ওর স্ত্রীর দখলে।

…ক্রমশ…