প্রেমের কাহিনী, সিজন ২ — এপিসোড ৮

Premer Kahini, Season 2 — Episode 8

অবশেষে রবি হালদারের মুখোমুখি হয় সূর্য। কী হল শেষ পর্যন্ত? ও কি পারল মি-বাবার উপর হ‌ওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে? জানতে হলে পড়ুন সিরিজটির অন্তিম পর্ব

লেখক: Chodon Kumar

ক্যাটাগরি: ভাই বোনের প্রেম

সিরিজ: প্রেমের কাহিনী, সিজন ২

প্রকাশের সময়:21 Jul 2026

আগের পর্ব: প্রেমের কাহিনী, সিজন ২ — এপিসোড ৭

১০ মেঘা – ওখানে কেন গিয়েছিলে তুমি?

কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে সূর্য।

মেঘা – কী হল বলো।

দ্বিধা ঝেড়ে চোখ তুলে তাকায় সূর্য। ওর রক্তজবার মতো লাল চোখ দুটো দেখে ভয় পেয়ে যায় মেঘা।

সূর্য – শুনতে চাও, না! শুনতে চাও তুমি? হাঃ হাঃ হাঃ শুনলে ঘেন্নায় আমার সঙ্গে বসতে চাইবে না তুমি। এই যে আমার পাশে বসে আছো না তুমি, তাতেও লজ্জা পাবে যে কেন বসে ছিলে।

মেঘা – কি এমন কথা যে আমি ঘেন্না করব?

সূর্য – হাঃ হাঃ হাঃ তুমি জানো আমি… আমি একটা জারজ সন্তান! আই অ্যাম আ ব্লাডি বাস্টার্ড। শুধু তাই না, আমি একটা ঘৃণ্য অজাচারের ফসল মেঘা হাঃ হাঃ হাঃ।

মেঘা – সূর্য!

সূর্য – হ্যাঁ মেঘা। আমার বাবা মায়ের সম্পর্ক কি জানো? তারা দুজন আপন ভাই বোন। হাঃ হাঃ হাঃ ঘেন্না হচ্ছে না? ভাবছ ছিঃ এই ছেলেটা আমার বন্ধু ছিলো! তোমাকে দোষ দিইনা মেঘা। ঘেন্না করাই স্বাভাবিক।

মেঘা – সূর্য! বলে ওর কাঁধে হাত রাখতে যায়।

সূর্য – (ছিটকে সরে গিয়ে) না মেঘা! আমি অপবিত্র, কলঙ্কিত। ছুঁয়ো না আমাকে।

মেঘা – পাগলের মতো কথা বলো না সূর্য। (সূর্যকে কাছে টেনে) বাবা মা কে ভুল বুঝছ কেন তুমি?

সূর্য – ভুল! আমি ভুল বুঝছি? না মেঘা,তুমি ভুল ভাবছ। আমি নিজের কানে শুনেছি।

মেঘা – তুমি ভুল শুনেছ তা তো বলিনি আমি, বলেছি ভুল ভেবেছ।

সূর্য – কি ভুল ভাবলাম?

মেঘা – সূর্য তুমি তো আমাকে বলেছো যে তোমার মা কতটা কষ্ট করে সংসার চালান। তোমার বাবার সেবা করেন। তুমিতো বলেছ যে তাদের ভালোবাসা শ্রদ্ধা করবার মতো! সামান্য একটা কথায় কি তা ভুল হয়ে যাবে?

সূর্য – সামান্য! এটাকে তুমি সামান্য বলছ। এই সমাজে অজাচার কি চোখে দেখা হয় তুমি জানো!

মেঘা – (ঘৃণায় মুখ বেঁকিয়ে) সমাজ! কোন সমাজের কথা তুমি বলছো সূর্য? তোমার বাবা মা যখন সব হারিয়ে নিস্ব অবস্থায় বস্তিতে আশ্রয় নিল তখন কী করেছে এই সমাজ? তোমরা যখন কষ্ট কিরে দিন যাপন করেছ কোথায় ছিল এই সমাজ! হতে পারে তোমার বাবা মা ভাইবোন। তবুও তো তাদের মধ্যে ভালোবাসা আছে।

সূর্য – মেঘা!

মেঘা – হ্যাঁ সূর্য। তোমার বাবা বা মা কেউতো জোরপূর্বক কিছু করেনি, আস্তে আস্তে একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে। তাদের দুর্ভাগ্য যে তারা ভাই বোন! তুমি এই সম্পর্কের আড়ালে গিয়ে তাদেরকে দুজন মানুষ হিসেবে ভাবো। আমার তো মনে হয়না তারা কোনো অন্যায় করেছে।

অবাক চোখে মেঘার দিকে তাকায় সূর্য।

মেঘা – হ্যাঁ সূর্য। তাদেরকে এভাবে ভুল বুঝো না প্লিজ। আর হ্যাঁ, ওই যে বললে না যে আমি তোমাকে ঘৃণা করব! আমার তো আরো মনে হয় আমার কথা শুনলে আমাকেই আরো ঘৃণা করবে তুমি।

সূর্য – মানে!

মেঘা – মানে! সূর্য, তুমি কি জানো যে আমার আসল বাবা কে সেটাই আমি জানি না। রবি হালদার আমাকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু আমি আদৌ‌ ওর‌ই সন্তান কিনা সেটা আমার মা‌ও জানেনা। অবাক হচ্ছ তাইনা? হ‌ওয়ার‌ই কথা। ছোট থেকেই দেখে আসছি অবাধ যৌনতা চলে আমাদের বাড়িতে। এমন একটা পরিবেশে বড় হয়েছি তুমি ভাবতে পারো সূর্য! আমার মা-বাবা, দাদু-দিদিমা সবাই অবাধ যৌনমিলন করত। এমনকি বাবার বন্ধু-বান্ধবরাও এসে সেই যৌনাচারে অংশগ্রহণ করতে। সূর্য, তোমার বাবা মায়ের মধ্যে যে ভালোবাসা ছিল তার ছিটেফোঁটাও ছিলনা এদের মধ্যে। কেবল দেহভোগের তাড়নায় পশুর মতো আচরণ করত এরা। বলতে বলতে ঘৃণায় বেঁকে ওঠে মেঘার সুন্দর মুখটা।

সূর্য – থাক মেঘা…

মেঘা – (সূর্যকে থামিয়ে দিয়ে) না সূর্য, থামালে হবে না। আজকে সব কিছু শুনতেই হবে তোমাকে। তবে কি জানো ভালো হতে চেয়েছিল আমার মা! কিন্তু পারেনি বাবার জন্য। ওই লোকটা ভালো হতে দেয়নি মাকে। এমনকি আমি বড় হতেই তার লালসার নজর পড়ে আমার উপরেও। শালাকে আমার বাবা বলতেও ঘেন্না হয়।

সূর্য – কী বলছ!

মেঘা – হ্যাঁ সূর্য। ছোট থেকেই বাবা নানান ছলে গায়ে হাত দিত আমার। ১২-১৩ বছর বয়স হ‌ওয়ার পর ওটা আরো বেরে গেল। তখন না বুঝলেও এখন বুঝি যে মা কেন ওই সময়টাতে আগলে রাখতো আমায়। কিন্তু এতে করে বাবার সব রাগ গিয়ে পড়ে মায়ের উপর। সীমাহীন শারীরিক আর মানসিক অত্যাচারে ভেঙে পরে মা। এক সময় অত্যাচার সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

মেঘার দুচোখের কোন চিকচিক করছে জলে। সূর্য আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে মেঘার। নিজেকে সামলে নিয়ে আবারো বলতে শুরু করে মেঘা–

মেঘা – মায়ের মৃত্যুর শোক সামলাতে না পেরে কিছুদিনের মধ্যে দিদাও মারা গেল। আর চিরদিনের মতো বদলে গেল আমার দাদু। যে দাদু রবি হালদারের অবাধ যৌনতায় সঙ্গ দিত, নিজের মেয়ে আর ব‌উকে রবি আর তার বন্ধুদের সামনে বেশ্যাগিরি করতেও বাঁধা দিতনা, সেই দাদু আশ্রয় খুঁজে নেয় কোনার একটা ঘরে। সারাক্ষণ ওই ঘরটাতেই সেচ্ছাবন্দী থাকেন তিনি। কথা বলেনা কারোর সাথে। একদম একা হয়ে গেলাম আমি। নিজের অজান্তেই একটা হাত বাড়িয়ে মেঘাকে নিজের দিকে টেনে নেয় সূর্য। আকাশটাও তখন ছেয়ে গেছে কালো রঙের মেঘে। বৃষ্টি নামবে যে কোনো সময়।

মেঘা – ওই বয়সে আমি একা কি আর করতে পারতাম বলো? ১৫ বছর বয়সে আমি প্রথম ধর্ষণের স্বীকার হই তাও নিজের বাবা নামক জানোয়ারটার কাছে। শুধু তাই নয়, তারপরে বেশ কয়েকবার রবি হালদার আর তার সাগরেদদের ভোগের স্বীকার হ‌ই আমি। যার ফলে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে আমি গর্ভবতী পর্যন্ত হয়ে যাই। রবি হালদারের অনেক কুকর্মের সঙ্গী পার্ক ক্লিনিকের এক ডাক্তার আমার অ্যাবরেশন করে সে যাত্রায় আমাকে লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। যার জন্য সেবছর আমি মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতে পারিনি। কি সূর্য এবারে ঘৃনা হচ্ছে আমার ওপর তাইনা?

তখন অশ্রুধারা গড়িয়ে নামছে মেঘার দুগাল বেয়ে। হাত বাড়িয়ে সেই জল মুছে দিলো সূর্য।

সূর্য – না মেঘা, আরো আপন মনে হচ্ছে তোমাকে।

মেঘা – সূর্য!

সূর্য – হ্যা মেঘা।

মেঘা – জানো আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি? সেদিন থেকে, যেদিন তুমি আমার হাতে চেকের পাতাটা গুঁজে দিয়ে এসেছিলে। কিন্তু তারপরে আর তোমাকে মনের কথাটা বলতে পারিনি কারন আমি এক ধর্ষিতা মেয়ে।

সূর্য – না মেঘা, আমার কাছে তুমি পবিত্র। বাগানে ফুটে থাকা গোলাপের মতোই পবিত্র তুমি।

সূর্যর কথায় কান্নার ঢল নামে মেঘার দুচোখে। সূর্যকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে হাউমাউ করে। বাঁধা দেয়না সূর্য‌ও। কাঁদুক মেয়েটা। কাঁদলে মন অনেক হালকা হয়। কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে মেঘার শরীর। সূর্য হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মেঘার পিঠে। এমন সময় কেঁদে ওঠে আকাশ‌ও। ঝমঝম করে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেয় দুজনকে। অনেক দিন হল যেন কাঁদতেও ভুলে গেছে মেঘা। আজ কাঁদছে মন ভরে।

মেঘা – (কাঁদতে কাঁদতে) জানো সূর্য, অনেক বার ভেবেছি আত্মহত্যার কথা, কিন্তু পারিনি। ভেবেছি কী হবে জীবন দিয়ে? আমার মাও তো ওই পথ বেছে নিয়েছিল, সমাধান তো হয়নি। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছি আমার না, বরং ওই লোকটার কোনো অধিকার নেই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার। একদিন না একদিন আমার হাতে মরবে আমার বাবা নামের ওই জঘন্য পশুটা।

একটানা হয়ে চলেছে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে একসঙ্গে ভিজছে সূর্য আর মেঘা। এই বৃষ্টি যেন ধুয়ে মুছে দিচ্ছে ওদের দুজনের মাঝের সমস্ত দূরত্ব। সূর্য যখন বাড়ি ফেরে তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। ভেজা কাপড়ে ছেলেকে ফিরতে দেখেই রেগে যায় সৃষ্টি।

সৃষ্টি – এত বড় হয়ে গেছিস তবুও কান্ডজ্ঞান হল না! একটা অসুখ না বাঁধালেই নয়? আচ্ছা হয়েছেটা কি তোর বলতো? সকালে ওইভাবে বেরিয়ে গেলি, এখন বাড়ি ফিরে মুখ হাঁড়ি করে আছিস?

সূর্য – আসলে তোমাদের সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

সৃষ্টি – যা বলার পরে বলিস। এখন আগে কাপড় ছাড়। ঠান্ডা লেগে যাবে তো।

সূর্য – না, আগে শোনো।

সৃষ্টি – বল কি বলবি।

সূর্য – (মাথা নীচু করে) কালকে মাঝরাতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেছিল, তোমাদের সব কথা শুনে ফেলেছি। তোমাদের আসল সম্পর্কটা জেনে গেছি।

আঁৎকে ওঠে সৃষ্টি সৃজন দুজনেই। কাঁপা কাঁপা গলায় সূর্যকে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারেনা সৃষ্টি। নীরবতা নেমে আসে ঘরের ভেতরে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরে সৃজনও। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নেয় সৃষ্টি। এই ভয়টাই ওর ছিল। ও জানতো একদিন না একদিন ছেলের মুখোমুখি হতেই হবে। মাথা তোলে সৃষ্টি।

সৃষ্টি – সূর্য শোন বাবা…

‌সূর্য – (হাত তুলে মাকে বাঁধা দিয়ে) আমি জানি মা, তোমায় কিছু বলতে হবেনা। আমার কোনো অভিযোগ নেই তোমাদের প্রতি। বরং আমি গর্ব অনুভব করি তোমাদের ভালোবাসা দেখে।

সূর্যের কথায় ঘরের পরিবেশটা অনেকটা হালকা হয়ে আসে। সূর্য এরপর ওর বাবা মায়ের কাছে আবারও সবকিছু বিস্তারিতভাবে শুনতে চায় কারা তাদের আজকের এই অবস্থার জন্য দায়ী। সৃজন আর সৃষ্টি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করে ওদের ভালোবাসার কথা, সুখী সংসারের কথা, ডুয়ার্সে ঘুরতে যাওয়ার কথা, যেখানে ঘুরতে যাওয়ার পরেই রবি হালদার আর ওদের কাকা ধনঞ্জয় মুখার্জী ওদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল। কীভাবে রবি হালদার ওদের বাবা-মাকে মেরেছে, কীভাবে সৃজনকে বিষ ইনজেক্ট করে মারতে চেয়েছিল। সব শোনার পরে চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে সূর্যর।

সূর্য – তোমাদের কথা শুনে আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে। আচ্ছা, আলিপুরের যে বাড়িটার কথা তোমরা বলছ, সেটা কি পেন রোডে?

‌সৃজন – হ্যাঁ, কিন্তু তুই জানলি কী করে?

‌সূর্য – ঠিকানাটা বলো তো?

সৃজন ঠিকানা বলল। ঠিকানা শুনে লাফিয়ে ওঠে সূর্য। আচ্ছা তোমাদের বাড়ির সামনে অনেকটা জুড়ে সবুজ ঘাস, মাঝখান দিয়ে নুড়ি বিছানো রাস্তা তাইনা? রাস্তার একধারে শ্বেত পাথরের গোল টেবিল আরেক পাশে ফোয়ারা। ছেলের মুখে নিখুঁত বর্ননা শুনে আশ্চর্য হয়ে যায় সৃজন আর সৃষ্টি। দুজনেই একসঙ্গে বলে, “তুই কীভাবে জানলি?”

সূর্য – আমার নিয়তিই আমাকে চিনিয়েছে। তোমরা দুজনেই শুনে রাখো ওই রবি নামক শয়তানের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে, আমার হাতেই বিনাশ হবে ওর পাপের।

সৃষ্টি – (ছেলের কথায় ভয় পেয়ে) না না বাবা, ওর অনেক ক্ষমতা। আমরা চাইনা ওসব বিষয় সম্পত্তি। তুই ভালো থাক বাবা।

সূর্য – তুমি কিচ্ছু চিন্তা করোনো মা। আমি তোমাদের উপর হ‌ওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নেব‌ই। ওই জানোয়ারটা আমার ভালোবাসার মানুষটার‌ও অনেক ক্ষতি করেছে।

এদিকে…

রবি হালদার জেনে গেছে যে মেঘা বস্তির একটা ছেলের সঙ্গে ইদানীং খুব মেলামেশা করছে। খোঁজ নিয়ে জেনেছে পঞ্চাননতলার কাছে একটা বস্তিতে থাকে ছেলেটা। ছেলেটার চোখ ওর খুব পরিচিত। আর ছেলেটা বলেছে ও নাকি ওর মায়ের চোখ পেয়েছে। রবি বস্তিতে লোক পাঠিয়েছে ছেলেটার মা বাবার খোঁজ করতে। সৃষ্টি যখন স্কুলে যাচ্ছিল ও জানতেও পারল না যে ওর অজান্তেই কেউ একজন স্মার্টফোনে ওর ছবি তুলল।

ছবিটা যখন রবির হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করা হল, রবি তখন সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে আয়েশ করে ডানহিলে টান দিচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ আসার টুং শব্দ হতেই মেসেজটা ওপেন করে ও। মেসেজ ওপেন করতেই লাফিয়ে দাঁড়িয়ে যায় ও। সিগারেটের ধোঁয়া ফুসফুসে আঁটকে খুকখুক করে কেশে ওঠে। দু চোখ বড় বড় করে তাকায় স্ক্রিনের দিকে। সৃষ্টি! এত বছর বাদে খুঁজে পেয়েছে। এত বছরের অপেক্ষা ওর সার্থক হয়েছে।

হোয়াটসঅ্যাপে কিছু নির্দেশনা দিয়ে সিগারেটে ঘন ঘন টান দিতে দিতে ঘরময় পায়চারী শুরু করে রবি হালদার। উত্তেজনায় দুচোখ চকচক করছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে কপালে। কপালের ঘাম মুছে আসন্ন উত্তেজনায় ছটফট শুরু করলো রবি। আর কিছুক্ষণ, তারপরেই সৃষ্টিকে ভোগ করবে ও। পায়চারী করতে করতে দৃশ্যটা কল্পনা করে শিহরিত হয়ে ওঠে বারবার। সৃষ্টি তখন সবে স্কুলে ঢুকেছে। অফিস-রুমে বসে হাজিরা খাতাটাতে সই করতেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো একটা লোক।

লোকটা – আপনাদের মধ্যে সৃষ্টি মুখার্জী কে?

সৃষ্টি – আমি সৃষ্টি মুখার্জী, কেন কী হয়েছে?

লোকটা – আপনি সূর্যর মা তো?

সৃষ্টি – হ্যাঁ।

লোকটা – এক্ষুনি একবার আমার সঙ্গে চলুন। সূর্যর এক্সিডেন্ট হয়েছে, অবস্থা সিরিয়াস।

মুহুর্তে যেন দুচোখে আঁধার ঘনিয়ে আসে সৃষ্টির। তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে আসে লোকটার সঙ্গে। তারপরেই মনে পরে সৃজনের কথা।

সৃষ্টি – ওর বাবাকে একবার জানাতে হবে।

লোকটা – সমস্যা নেই, আমার গাড়ি আছে, আপনি বরং ওনাকেও সঙ্গে নিয়ে নিন।

সৃষ্টি এক ছুটে বাড়ি গিয়ে সৃজনকে জানাতেই সৃজন‌ও হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসে সৃষ্টির সঙ্গে। হাসপাতালে যাওয়ার নাম করে ওদের দুজনকেই তুলে নেয় গাড়িতে। ছেলের চিন্তায় এতোটাই বিভোর ওরা যে, আশপাশে একটিবার‌ও তাকায় না, এমনকি সূর্যকে ফোন করা কথাও মাথায় আসেনা ওদের। বেশ খানিকক্ষণ চলার পরে গাড়িটা থামতেই দ্রুত নেমে আসে বাইরে। একি! কোথায় হাসপাতাল! এতো ওদের‌ই আলিপুরের বাড়িটা। ২০ বছরেও বদল হয়নি একটুও। ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরো দুজন ষন্ডামার্কা লোক এসে ওদেরকে ঘিরে ধরে। দুজনের হাতেই ওদের দিকে তাক করে রাখা রিভলবার।

লোকটা – কোনোরকম চালাকির চেষ্টা করবেন না। সোজা ভেতরে ঢুকুন।

সৃষ্টি – (রাগে চেচিয়ে উঠে) হচ্ছেটা কী! আমার ছেলে কোথায়?

লোকটা – কথা কম। বাঁচাতে চাইলে যা বলছি করুন।

বলেই সৃজনের পিঠে রিভলবারের খোঁচা মারে। পড়তে পড়তেও কোনরকমে ক্র্যাচ দিয়ে পতন ঠেকায় সৃজন। সৃজনের একটা হাত ধরে সৃষ্টি। অসহায়ের মতো দুজন মিলে এগিয়ে যায় বাড়ির ভিতরে। ভিতরে ঢুকতেই চোখ পড়ে রবি হালদারের উপর।

রবি – ওয়েলকাম ওয়েলকাম! অবশেষে ২০ বছরের আক্ষেপ ঘুচলো আমার।

সৃজন – (রাগে দাঁতে দাঁত ঘষে) শালা শুয়োরের বাচ্ছা, তোকে আমি জ্যান্ত কবর দেব।

রবি – চোপ। আওয়াজ নীচে। আমি জোরে কথা একদম পছন্দ করিনা।

ততক্ষণে রবির হাতেও চলে এসেছে ওর নিজের রিভলবার। ষন্ডামার্কা লোকদুটো বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। হাতের অস্ত্র সামনে দিকে বাড়িয়ে ধরে আরেক হাত বাড়িয়ে হ্যাঁচকা টানে সৃষ্টিকে টেনে নেয় কাছে। সৃজন উঠে দাঁড়াতে গেলে অস্ত্র দেখিয়ে ধমক দিয়ে বসিয়ে দেয় রবি। এক হাতে জড়িয়ে ধরে সৃষ্টিকে। সৃষ্টি ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতেই ক্ষেপে ওঠে রবি হালদার। “খানকি মাগি আজ পেয়েছি তোকে। শালি সেদিন পালিয়েছিলি আমার হাত থেকে, আজ দেখি কোন শালা তোকে আমার হাত থেকে বাঁচায়!” বলেই শাড়ির আঁচলটা টেনে ফেলে দেয়। শাড়ির আঁচল ফেলে দিতেই লাল ব্লাউজে ঢাকা সৃষ্টির বড় বড় দুধ দুটো যেন উপচে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

সেদিকে তাকিয়ে উলস শব্দ করে জিভ দিয়ে একবার লালা টানে রবি। এরপরে রবির আরেক টানে ব্লাউজের দুটো বোতাম ছিঁড়ে যায়। বোতাম ছেঁড়া ব্লাউজ ঠেলে বেড়িয়ে আসে সৃষ্টির দুধ দুটো। দুধের বোঁটার চারপাশের গোল খয়েরি অংশের অনেকটা দেখা যায়। রাগে দুহাত মুঠো পাকিয়ে ধরে সৃজন। কিন্তু অকেজো পা টার জন্য অসহায়ের মতো চেয়ে থাকা ছাড়া কিছু করতে পারেনা।

এদিকে আজ কলেজে যায়নি মেঘা। নীচে চেঁচামেচি শুনে রুম থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায় সিড়ির কাছে। ড্রইংরুমে চোখ পড়তেই আঁৎকে ওঠে। সূর্যর মা-বাবা! সূর্যর ফোনে অনেকবার ছবি দেখেছে ও। ওনারা এখানে কেন? আর বাবা-ই বা কেন বন্দুক তাক করে আছে ওনাদের দিকে? কোনো কিছু না বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি ফোন করে সূর্যকে।

মেঘা – হ্যালো সূর্য!

সূর্য – মেঘা, কী হয়েছে? তোমার গলাটা এমন লাগছে কেন?

মেঘা – সূর্য আমি কিছু বুঝতে পারছি না! আমার বাবা তোমার বাবা মাকে ধরে এনেছে।

সূর্য – শিট! ড্যাম ইট, আমি আসছি এখনি।

মেঘা – আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

সূর্য – পরে সব বুঝিয়ে বলব। শুধু জেনে রাখো তোমার বাবা একটা খুনি এবং আমার বাবা মায়ের এই অবস্থার জন্য তোমার বাবাই দায়ী। তোমাদের ওই বাড়িটা আসলে আমাদের বাড়ি। আমি আসছি এখনি।

ফোন রেখেই দ্রুত আলিপুরে পৌঁছে যায় সূর্য। প্রধান ফটকে সেই ষন্ডামার্কা লোক দুটো দাঁড়িয়েছিল। সূর্যর সঙ্গে দুজনের একটা জবরদস্ত ফাইট হয়। যত‌ই ষন্ডামার্কা চেহারা হোক না কেন, সূর্যর সঙ্গে ওরা পারবে কী করে? সূর্য যে রীতিমতো মার্শাল আর্টে পারদর্শী। ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্ট পেয়েছে ও। দুটো আপার কাটে লোক দুটোকে ফ্ল্যাট করে দিয়ে দ্রুত বাড়ির ভিতরে গিয়ে দরজা ভেঙ্গে ড্রয়িংরুমে রুমে ঢুকে “রবি হালদার” বলে একটা চিৎকার করে।

সূর্য ঘরে ঢুকতেই রবি হালদার প্রথমটায় থতমত খেয়ে গেলেও পরক্ষণেই বন্দুকটা তাক করে সূর্যর দিকে। ততক্ষণে মেঘাও নেমে এসেছে একতলায়।

সূর্য – (গর্জন করে) আমার মাকে ছেড়ে দে শয়তান। নাহলে…

রবি – নাহলে কী করবি তুই? আমার হাতে এটা কী দেখছিস তো? একটা গুলিতেই তোকে আর তোর বাপকে শেষ করে দেব। ২০ বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি আমি তোর মায়ের নধর দেহটা ভোগ করার জন্য। সেদিন তো আমার হাত থেকে বেঁচে পালিয়ে গিয়েছিল, আজ আর কোনো ছাড়াছাড়ির সিন নেই।

সূর্য হঠাৎ একটা লাফ দিয়ে রবি হালদারের সামনে গিয়ে পড়ে এবং একহাতে রবির রিভলবার ধরা হাতটা শক্ত করে ধরে ঘরের সিলিংয়ের দিকে তুলে ধরে। আকস্মিক এই আক্রমণে রবি টাল সামলাতে পারেনা। রবির হাত থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে সৃষ্টি। আঁচলে বুকটা ঢেকে দৌড়ে এসে সৃজনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। তারপর শুরু হয়ে যায় সূর্য আর রবির হাতাহাতি। রবির হাতে একটা রদ্দা মেরে বন্দুক ফেলে দেয় সূর্য। রদ্দা মারা যায়গাটা চেপে ধরে বসে পড়ে রবি হালদার। সূর্য রবির কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর কলার ধরে তুলতে যেতেই রবি সূর্যর তলপেটে কষে একটা ঘুষি মারে। কঁকিয়ে উঠে মেঝেতে পড়ে যায় সূর্য। এইবার সূর্যকে বাগে পেয়ে যায় রবি। পিছনদিক থেকে সূর্যের গলা পেঁচিয়ে ধরে শাসাতে থাকে সৃজন আর সৃষ্টিকে। সূর্যর দমবন্ধ হয়ে আসতে থাকে প্রায়। এতক্ষণে মেঘা কথা বলে ওঠে।

মেঘা – ছিঃ বাবা ছিঃ। তুমি একটা নীচ, ইতর আমার তো ভাবতেই ঘেন্না হচ্ছে যে আমি তোমার মেয়ে!

রবি – এই চুপ কর। কে বলেছে তুই আমার মেয়ে, আমি তোর বাবা ন‌ই। তোর মা ছিল একটা বারোভাতারী রেন্ডি। কার চোদনে তুই তোর মায়ে পেটে এসেছিলিস সেটা তোর মাও জানতো না।

মেঘা – বাবা!

রবি – আমি বলেছি না, আমি তোর বাবা ন‌ই। তুই একটা রেন্ডির মেয়ে…

হঠাৎ যেন কথা বন্ধ হয়ে যায় রবি হালদারের। হিক করে হেঁচকি তুলে সূর্যর গলায় পেঁচিয়ে ধরা হাতটা শিথিল হয়ে যায়। সবার সামনে পা দুটো ভাঁজ হয়ে আসছে রবির। মাথাটা পিছন দিকে ঘুরিয়ে হিঁচ…ক…হ বলে সবার সামনে মুখ থুবড়ে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ে। সবাই দেখতে পায় রক্তাক্ত একটা বঁটি হাতে দাঁড়িয়ে আছে ধনঞ্জয় মুখার্জী। সূর্য খকখক করে কাশতে কাশতে সরে আসে মা-বাবার কাছে।

রবি হালদার পড়ে যেতেই ধনঞ্জয় মুখার্জী ধারালো বঁটিটা দিয়ে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে দেহটা। মাংসের মধ্যে কোপ পরার থ্যাপ থ্যাপ আওয়াজ তার সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণ রক্ত ছিটকে এসে ভরে যায় ধনঞ্জয় মুখার্জীর মুখ। উপর্যুপরি অনেক্ষণ কুপিয়ে উঠে দাঁড়ায় ধনঞ্জয় মুখার্জী। শীতল কন্ঠে বলে, “যাক জীবনে অন্তত একটা হলেও ভালা কাজ করলাম।” তারপরেই কেঁদে ওঠে হুহু করে।

“শালা জানোয়ারের বাচ্ছা আমার সংসারটা তছনছ করে দিয়েছে। এই কুত্তার বাচ্ছার কথায় আমার দেবদূতের মতো দাদার সঙ্গে বেইমানি করছি আমি। আমার মেয়েটার জীবনটা নিজের হাতে নষ্ট করেছি।” তারপর সৃজন সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে, তোরা হলি আমার রক্ত, ক্ষমা চাওয়ার কোনো অধিকার নেই আমার আর তোদের কাছে। শুধু ভগবানের কাছে প্রার্থনা কর আমি যেন আমার পাপের উপযুক্ত শাস্তি পাই।”

পরেরদিন বাংলার সমস্ত পত্র পত্রিকার প্রথম পাতার হেডলাইন হয়– “পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে খুন বিশিষ্ট শিল্পপতি রবি হালদার। খুনের দায় স্বীকার শ্বশুরের। গ্রেফতার শ্বশুর ধনঞ্জয় মুখার্জী।”

কয়েকদিনের মধ্যেই বস্তি ছেড়ে আলিপুরের নিজেদের বাড়িতে এসে ওঠে সৃজন আর সৃষ্টি। মাসখানেকের মধ্যে বিয়ে হয় মেঘা আর সূর্য। এদিকে আদালতে রবি হালদার হত্যাসহ দাদা ও বৌদিকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা এবং সম্পত্তি আত্মসাতের কথা স্বীকার করে নেয় ধনঞ্জয় মুখার্জী। আদালত ফাঁসির হুকুম দেয় ধনঞ্জয় মুখার্জীর। সৃজন-সৃষ্টি ছেলে আর ছেলের বৌমাকে হানিমুনে যেতে বললে ওরা ওদেরকেও সঙ্গে যেতে বলে। শেষমেশ চারজন একসঙ্গে আবার ওরা সেই ডুয়ার্সেই যায়। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সমস্ত ঘটনার। ওরা গিয়ে ওঠে চাপড়ামারির সেই নিসর্গ রিসর্টেই।

সৃজনের মনে হয় যেন সব কিছু আগের মতোই আছে। সেই এক‌ই রকম রিসর্টের রুমগুলো, ব্যালকনিতে দাঁড়ালে দেখা যায় নদীর ওপারে চাপড়ামারির ঘন জঙ্গল, আর এপারে রিসর্টের বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষে ঢেউ খেলানো চা বাগান, চা বাগানের মাঝে লাগানো ছায়াবৃক্ষগুলোতে দোল খাচ্ছে চেনা অচেনা নানান জাতের পাখি। সবকিছুই সেই আগের মতোই আছে, শুধু ওদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে মূল্যবান কুড়িটা বছর।

আজ রাতে রিসর্টের ছাদে বারবিকিউ পার্টি করবে ওরা। রিসর্টের বাকি গেস্টদেরকেও আমন্ত্রণ করেছে ওরা এই খুশির মূহুর্তটাকে ভাগ করে নেওয়ার জন্য। আগের বারে যেখানে প্রসূনরা ৭ জন পার্টি করেছিল সেখানেই বারিবিকিউয়ের আগুন জ্বালে ওরা। অনেকদিন পরে গিটার হাতে নিয়েছে সৃজন। রাত বাড়ছে, হাজার বছরের পুরোনো রাত সেই রাতের গভীরতার সঙ্গে ঝঙ্কার তুলেছে সৃজনের গিটার। আজ বাবা মাকে খুব মনে পড়ছে ওর। সৃজন গান ধরেছে….

“বাড়িয়ে দাও তোমার হাত আমি আবার তোমার আঙুল ধরতে চাই,

বাড়িয়ে দাও তোমার হাত আমি আবার তোমার পাশেই হাঁটতে চাই,

বাড়িয়ে দাও তোমার হাত, তোমার হাত।”

সৃজনের গানে বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে সৃষ্টিরও। নিজের অজান্তেই গাল বেয়ে গড়াতে থাকে অশ্রুধারা।

অন্যদিকে… ধনঞ্জয় মুখার্জীর ফাঁসি কার্যকর করা হবে আজ রাতেই। সে জন্য ভালো করে স্নান করানো হলো তাকে। পুলিশ এসে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল ফাঁসির মঞ্চে। জল্লাদ এসে কালো কাপড়টা মুখে পড়িয়ে গলায় দড়ির ফাঁস পড়িয়ে দিলো। জল্লাদ আস্তে আস্তে গিয়ে দাঁড়ালো লিভারের কাছে। লিভারটা টেনে দিলেই পায়ের নীচের পাটাতন সরে গিয়ে ঝুলে পড়বে ধনঞ্জয় মুখার্জীর দেহ। জল্লাদ লিভারের হাতলটা ধরে ঠায় তাকিয়ে আছে জেলারের হাতে ধরা সাদা রুমালটার দিকে। জেলার একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নিজের হাতঘড়িটার দিকে। রুমালটা জেলারের হাত থেকে ঝুপ করে মাটিতে পড়ামাত্র টেনে দিতে হবে লিভারটা।

……………………HAPPY ENDING……………………