নিষিদ্ধ প্রেম পর্ব ১৭ : আমাকে এভাবে দেখো না

nishiddh prem prb 17 amake ebhabe dekho na

লেখক: Arko

ক্যাটাগরি: বৌদির সাথে যৌনতা

সিরিজ: নিষিদ্ধ প্রেম

প্রকাশের সময়:29 Jun 2026

আগের পর্ব: নিষিদ্ধ প্রেমপর্ব ১৬ : পালানো নয়, দাঁড়ানো

দুই দিন ধরে অয়ন নিজের routine মেনে চলার চেষ্টা করছিল।

পুরোপুরি পারছিল না। তবু চেষ্টা করছিল।

সকালে উঠে পড়া। সময়মতো চা। দুপুরে খাওয়া। বিকেলে আবার বই। রাতে নিজের লেখা। মাঝে মাঝে মন সরে যায়, সঙ্গীতার পায়ের শব্দে বুক কেঁপে ওঠে, বারান্দার দিকে চোখ চলে যায়—তবু সে নিজেকে ফিরিয়ে আনে।

কারণ সে এখন জানে—পালিয়ে নয়, দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

সঙ্গীতাও বদলাচ্ছিল।

খুব ধীরে। খুব ছোট ছোটভাবে।

সে এখন দুপুরে নিজের প্লেটে ভাত নেয়। অয়ন দেখে, কিন্তু কিছু বলে না। শুধু চোখে হালকা হাসি থাকে। সঙ্গীতা সেই হাসি দেখেও গম্ভীর মুখ করে থাকে, যেন routine follow করা তার নিজের decision, অয়নের কথায় নয়।

কিন্তু সত্যিটা দুজনেই জানে।

রাতে সঙ্গীতা ডায়েরি খুলছে।

প্রতিদিন না। কিন্তু খুলছে।

কখনো একটা লাইন। কখনো দুটো। কখনো শুধু তারিখ লিখে ফাঁকা রেখে দেয়।

তবু সেটাও লেখা।

কারণ যে মানুষ নিজের ভেতরের দরজার সামনে দাঁড়াতে শুরু করেছে, সে একদিন দরজাটা খুলবেই।

অয়ন জানে না সে কী লিখছে। সঙ্গীতা দেখায় না। অয়ন জোর করে না।

এই না-জোর করাটাই সঙ্গীতার কাছে অদ্ভুত আশ্রয় হয়ে উঠছিল।

যে পৃথিবী তাকে সবসময় ব্যাখ্যা দিতে বলেছে, সেখানে অয়ন তাকে না-বলা থাকার অধিকার দিয়েছে।

সেদিন বিকেল থেকেই আকাশ কালো হয়ে ছিল।

কলকাতার বর্ষা অনেক সময় মানুষের মনের মতো—সকাল থেকে চুপ করে জমে থাকে, তারপর সন্ধে নামতেই হঠাৎ ভেঙে পড়ে।

সঙ্গীতা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা করছিল। অয়ন ঘরে পড়ছে। সূর্য আজ বাড়ি ফিরবে বলেছিল একটু তাড়াতাড়ি। সঙ্গীতা সেটা শুনে কোনো অনুভূতি প্রকাশ করেনি।

আগে সূর্য তাড়াতাড়ি ফিরবে শুনলে তার ভেতরে সামান্য আশার মতো কিছু জাগত। হয়তো আজ কথা হবে। হয়তো আজ একটু সময় দেবে। হয়তো আজ জিজ্ঞেস করবে—“দিন কেমন গেল?”

এখন আর সে আশা করে না।

মানুষ একদিনে আশা ছাড়ে না। অসংখ্য ছোট অবহেলার পরে আশা নিজেই চুপ করে যায়।

সূর্য সত্যিই সন্ধ্যার আগেই ফিরল।

জুতো খুলতে খুলতে বলল,

“চা আছে?”

সঙ্গীতা বলল,

“করছি।”

“কম চিনি।”

“জানি।”

এই “জানি” এখন বহু বছরের সংসারের ক্লান্ত শব্দ।

অয়ন নিজের ঘর থেকে সূর্যের গলা শুনল। বইয়ের ওপর চোখ রেখেই রইল। সে ঠিক করেছে—আজ কোনো কথায় নিজেকে distract করবে না।

কিন্তু ঘরের বাইরে মানুষ যখন আঘাত করে, শব্দ দরজা মানে না।

চা নিয়ে সঙ্গীতা drawing room-এ গেল।

সূর্য সোফায় বসে ফোন দেখছিল। টেবিলে ব্যাগ, পাশে অফিসের কাগজ। চা রেখে সঙ্গীতা ফিরে যেতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন সূর্যের চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা নীল ডায়েরির দিকে।

সঙ্গীতা দুপুরে লিখে রেখে ভুলে সেখানে রেখেছিল।

সূর্য ডায়েরিটা হাতে নিল।

“এটা কী?”

সঙ্গীতা থেমে গেল।

তার বুক কেঁপে উঠল।

“ওটা… আমার।”

“ডায়েরি?”

“হ্যাঁ।”

সূর্য পাতাগুলো উল্টাতে যাচ্ছিল। সঙ্গীতা দ্রুত এগিয়ে এল।

“না, এটা personal।”

সূর্য ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“Personal? আমার কাছেও?”

সঙ্গীতা চুপ করে গেল।

এই “আমার কাছেও?” কথাটা অদ্ভুত। কারণ এতদিন তার মন, অপমান, কান্না—কিছুই সূর্যের জানার দরকার হয়নি। কিন্তু একটি ডায়েরি দেখলেই সে নিজের অধিকার মনে করল।

সূর্য ডায়েরিটা টেবিলে রেখে হালকা হাসল।

“নতুন শখ?”

সঙ্গীতা শান্ত থাকার চেষ্টা করল।

“পুরনো।”

“ও। কবিতা-টবিতা?”

সে কথাটা এমনভাবে বলল, যেন এগুলো শিশুদের খেলা।

সঙ্গীতা বলল,

“কিছু লিখি। নিজের জন্য।”

সূর্য চায়ের কাপ তুলে বলল,

“নিজের জন্য? এখন আবার নিজের জন্য কী?”

সঙ্গীতার মুখ শুকিয়ে গেল।

সূর্য বলল,

“দেখো, আমি কিছু বলছি না। কিন্তু এসব আবেগে বেশি ডুবে থেকো না। তুমি এমনিতেই একটু বেশি emotional. তারপর আবার এসব লিখলে মাথায় আরও আজেবাজে চিন্তা আসে।”

“আজেবাজে?”

“মানে… অত ভাবার কী আছে? সংসার করো, নিজের মতো থাকো। life এত complicated করার দরকার নেই।”

সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল।

এই মানুষটাই তার জীবন complicated করেছে কিনা, সে কি কখনো জানে?

সূর্য আবার বলল,

“আর অয়নের সামনে এসব নিয়ে বসো না। ওর পড়ার সময়। ছেলেটা already একটু sensitive. তোমার emotional mood ওর ওপরও effect করতে পারে।”

এইবার সঙ্গীতার বুকের মধ্যে সরাসরি আঘাত লাগল।

অয়ন।

তার ডায়েরি। তার লেখা। তার নিজের জন্য বাঁচার ছোট্ট চেষ্টা।

সবকিছুকেই সূর্য “emotional mood” বলে হালকা করে দিল।

সে খুব আস্তে বলল,

“আমি ওর পড়া নষ্ট করছি?”

সূর্য বিরক্ত মুখে বলল,

“আমি কি তাই বললাম? তুমি সব উল্টো শোনো। আমি শুধু বলছি, একটু practical হও।”

Practical.

এই শব্দটা সূর্যের মুখে শুনলেই সঙ্গীতার মনে হয়, কেউ তার গলার কাছে অদৃশ্য দড়ি বেঁধে টানছে।

প্র্যাক্টিকাল হও মানে— কাঁদবে না। চাইবে না। লিখবে না। নিজের ব্যথা নিয়ে কথা বলবে না। অপমানকে সংসারের অংশ মনে করবে।

সে ডায়েরিটা টেবিল থেকে তুলে নিল।

“আমি রাখছি।”

সূর্য চা খেতে খেতে বলল,

“রাগ করলে আবার?”

“না।”

“তোমার এই ‘না’ বলার ভঙ্গিটাই সবচেয়ে বিরক্তিকর।”

সঙ্গীতা থামল না।

ডায়েরিটা নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

অয়ন নিজের ঘর থেকে সব শুনছিল।

কলম তার হাতে ছিল, কিন্তু লেখা থেমে গেছে।

তার ভেতরে আবার আগুন উঠল। কিন্তু সে উঠে গেল না।

কারণ সে জানে—প্রতিটি যুদ্ধ তার নয়। আর সঙ্গীতাকে রক্ষা করতে হলে কখনো কখনো নিজের রাগকে দরজার এপারে আটকে রাখতে হয়।

তবু আজ তার বুকের ভেতর একটা লাইন জ্বলে উঠল—

যে মানুষ একজন নারীর নিজের জন্য লেখা পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না, সে তাকে স্ত্রী বলে কীভাবে?

রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হলো।

প্রথমে হালকা।

তারপর হঠাৎ ঝড়ো।

জানালায় বৃষ্টির ধাক্কা, দূরে বজ্রপাত, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো ঘর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কলকাতার আকাশ যেন দিনের সব জমে থাকা কথা একসাথে বলে ফেলছে।

ডিনার খুব নীরবে হলো।

সূর্য খাবার শেষে বলল,

“আজ একটু কাজ আছে। Disturb করো না।”

তারপর নিজের ঘরে গিয়ে ল্যাপটপ খুলল।

সঙ্গীতা কোনো উত্তর দিল না।

অয়নও খুব কম কথা বলল। সে দেখল, সঙ্গীতা খাচ্ছে, কিন্তু স্বাদ পাচ্ছে না। তার চোখের নিচে ছায়া। মুখ শান্ত। অতিরিক্ত শান্ত।

এই শান্তি সে চেনে।

এটা কান্নার আগের শান্তি নয়।

এটা কান্না আটকে রাখার পরের শান্তি।

খাওয়া শেষে সঙ্গীতা বাসন গুছিয়ে রান্নাঘরে গেল। অয়ন উঠতে যাচ্ছিল সাহায্য করতে, কিন্তু সূর্যের ঘরের দরজা আধখোলা দেখে থেমে গেল।

আজ বাড়িতে সূর্য আছে।

আজ প্রতিটি পা মাপতে হবে।

রাত দশটার দিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।

পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকারে ডুবে গেল।

বাইরে বজ্রপাত। কয়েক সেকেন্ড পর গর্জন। বৃষ্টির শব্দ আরও জোরে শোনা যাচ্ছে। ঘরের ভেতর অন্ধকারে জিনিসপত্রের আকার অস্পষ্ট।

সূর্য নিজের ঘর থেকে বিরক্ত গলায় বলল,

“ইনভার্টার চলছে না?”

সঙ্গীতা বলল,

“দেখছি।”

সে টর্চ খুঁজতে রান্নাঘরে গেল। ইনভার্টারের switch দেখে বুঝল, battery কম। কিছু light আসবে, কিন্তু সব নয়।

একটু পরে করিডোরে হালকা আলো জ্বলল। ঘরগুলো অন্ধকারই রইল।

সূর্য বলল,

“আমি phone hotspot দিয়ে কাজ করছি। কেউ বিরক্ত কোরো না।”

সঙ্গীতা উত্তর দিল না।

সে নিজের ঘরে এসে ডায়েরি হাতে নিল। অন্ধকারে পাতাগুলো ঠিকমতো দেখা যায় না। তবু সে খুলল।

আজ লিখবে ভেবেছিল।

কিন্তু কলম ধরতেই সূর্যের কথা মনে পড়ল—

“এসব আবেগে বেশি ডুবে থেকো না।” “অয়নের সামনে এসব নিয়ে বসো না।” “তোমার emotional mood…”

সঙ্গীতার হাত কেঁপে উঠল।

ডায়েরি বন্ধ করে দিল সে।

তার মনে হলো, সে যেন আবার সেই পুরনো বাক্সে আটকে যাচ্ছে। যে বাক্স খুলতে অয়ন বলেছিল। যে বাক্স থেকে সে নিজের পুরনো স্বপ্ন বের করতে শুরু করেছিল। আজ সূর্যের কয়েকটা কথায় সেই ঢাকনাটা আবার বন্ধ হয়ে আসছে।

শ্বাস নিতে কষ্ট লাগছিল।

সে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

বৃষ্টির শব্দ তাকে ডাকছিল।

সঙ্গীতা বারান্দায় এল।

বাতাসে বৃষ্টির ছাঁট ঢুকছে। দূরের আলো ঝাপসা। শহর অন্ধকারে ভেজা। গাছের পাতা উলটে যাচ্ছে। রেলিং ভিজে। গোলাপগাছ বৃষ্টিতে ঝুঁকে পড়েছে।

সঙ্গীতা রেলিং ধরে দাঁড়াল।

তার হাতে ডায়েরি।

বৃষ্টির ছাঁট এসে ডায়েরির মলাট ভিজিয়ে দিচ্ছে। সে সরাল না।

তার মনে হচ্ছিল, এই ডায়েরি যদি ভিজে যায়, কালি ছড়িয়ে যায়, তবু ক্ষতি কী? যে কথাগুলো কেউ গুরুত্ব দেয় না, সেগুলো মুছে গেলেও কি পৃথিবীর কিছু বদলাবে?

বজ্রপাত হলো।

এক মুহূর্তের জন্য আকাশ সাদা আলোয় ভরে গেল।

সেই আলোয় অয়ন নিজের ঘর থেকে সঙ্গীতাকে দেখল।

সে পড়ছিল। সত্যিই পড়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বৃষ্টির শব্দে মন বারবার সরে যাচ্ছিল। তারপর দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল—সঙ্গীতা বারান্দায়।

ভিজছে।

হাতে ডায়েরি।

তার শরীরের ভঙ্গিতে এমন এক নিঃসঙ্গতা, যা দূর থেকেও অয়নের বুক কাঁপিয়ে দিল।

সে উঠে দাঁড়াল।

এক মুহূর্ত দ্বিধা।

সূর্য বাড়িতে। রাত। বৃষ্টি। অন্ধকার। সীমা।

সব মনে পড়ল।

তবু সে দরজা খুলে বারান্দায় গেল।

কারণ কিছু মুহূর্তে না যাওয়া নিজেই অপরাধ হয়ে যায়।

সঙ্গীতা অয়নের পায়ের শব্দ শুনেও ঘুরল না।

অয়ন খুব ধীরে বলল,

“ভিজে যাচ্ছ।”

সঙ্গীতা বলল,

“হোক।”

তার গলা অদ্ভুত। শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভাঙা।

অয়ন পাশে দাঁড়াল। খুব কাছে নয়। এতটা দূরে, যাতে কেউ দেখলে প্রশ্ন না করে। কিন্তু এতটা কাছে, যাতে তার উপস্থিতি বোঝা যায়।

“ডায়েরিটাও ভিজছে,” অয়ন বলল।

সঙ্গীতা মলাটের দিকে তাকাল।

“লেখাগুলো মুছে গেলে ক্ষতি কী?”

অয়নের বুকের ভেতর ব্যথা হলো।

“ক্ষতি আছে।”

“কার?”

“তোমার।”

সঙ্গীতা মৃদু হাসল।

“আমার লেখা কারও দরকার নেই।”

অয়ন খুব শান্ত গলায় বলল,

“আমার দরকার আছে।”

বৃষ্টি আরও জোরে পড়ল।

সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল।

এই কথাটা সে আগেও শুনেছে— “আমার দরকার আছে।”

তখন সে কেঁদেছিল।

আজ কাঁদছে না।

কিন্তু আজ তার শ্বাস কাঁপছে।

অয়ন বলল,

“ওর কথায় লিখবে না?”

সঙ্গীতা এবার ধীরে তার দিকে তাকাল।

“তুমি শুনেছ?”

“হ্যাঁ।”

“সব?”

“যতটা দরকার ছিল।”

সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে ফেলল।

“খুব লজ্জা লাগে।”

“আবার?”

“হ্যাঁ। আমার প্রতিটা ছোট জিনিস তোমার সামনে অপমানিত হয়ে যায়।”

অয়ন নরম গলায় বলল,

“অপমানিত হয় না। আরও সত্যি হয়ে ওঠে।”

সঙ্গীতা কেঁপে উঠল।

“তুমি সবকিছু এত সুন্দর করে বলো কেন? এতে ব্যথা কমে না। বরং বেশি লাগে।”

“কেন?”

“কারণ তখন মনে হয়, কেউ সত্যিই বুঝছে।”

অয়ন চুপ।

বৃষ্টির ছাঁট তাদের দুজনকেই ভিজিয়ে দিচ্ছে। সঙ্গীতার চুলের পাশে জল জমছে। তার গালে বৃষ্টির ফোঁটা নাকি চোখের জল—বুঝে ওঠা কঠিন।

অয়ন বলল,

“তুমি আজ লিখবে।”

সঙ্গীতা তাকাল।

“আদেশ?”

“অনুরোধ।”

“কী লিখব?”

“যা মুছে ফেলতে চাইছিলে।”

সঙ্গীতা ডায়েরির মলাট শক্ত করে ধরল।

“আমি পারব না।”

“পারবে।”

“সবসময় তুমি এত নিশ্চিত থাকো কীভাবে?”

“কারণ তুমি ভাবার চেয়ে বেশি শক্ত।”

সঙ্গীতা হঠাৎ তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।

“আমি শক্ত নই, অয়ন। আমি ক্লান্ত।”

“জানি।”

“আমি ভালো নেই।”

“জানি।”

“আমি ভয় পাই।”

“জানি।”

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি বলেই ভয় পাই।”

“জানি।”

“আমি তোমার দিকে তাকাতে ভয় পাই।”

অয়ন চুপ।

এইবার সঙ্গীতার নিঃশ্বাস সত্যিই কেঁপে উঠল।

সে যেন এতক্ষণ ধরে নিজের ভেতর আটকে রাখা সত্যিগুলো একে একে বৃষ্টির মধ্যে ছুড়ে দিচ্ছিল।

অয়ন তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

কোনো দাবি নেই। কোনো কথা নেই। শুধু সেই গভীর দৃষ্টি, যা সঙ্গীতার মুখোশ ভেদ করে ভেতরের মানুষটাকে দেখে ফেলে।

সঙ্গীতা সেই দৃষ্টি সহ্য করতে পারল না।

তার গলা কেঁপে উঠল।

“আমাকে এভাবে দেখো না।”

অয়ন খুব আস্তে বলল,

“কীভাবে?”

সঙ্গীতা চোখ সরিয়ে নিল।

“যেন আমি এখনও বেঁচে আছি।”

অয়ন নিঃশ্বাস আটকে গেল।

বৃষ্টি পড়ছিল।

শহর যেন থেমে গেল।

সঙ্গীতা আবার বলল,

“আমাকে এভাবে দেখো না, অয়ন। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি না।”

অয়ন এক পা এগোল না।

সে জানত, এই মুহূর্তে এক পা এগোনো মানে সঙ্গীতাকে আরও বিপদে ফেলা। তার সব কাঁপুনি, সব বিশ্বাস, সব ভয়কে নিজের দিকে টেনে নেওয়া।

তাই সে দাঁড়িয়ে রইল।

শুধু বলল,

“তাহলে চোখ বন্ধ করো। কিন্তু লিখবে।”

সঙ্গীতা তাকাল।

এই উত্তর সে আশা করেনি।

অয়ন বলল,

“আমি তোমাকে ভাঙতে দেখছি না। আমি তোমাকে ফিরে আসতে দেখছি।”

সঙ্গীতার চোখে এবার জল এল।

বৃষ্টির সঙ্গে মিশে গেল।

সে ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল না। বরং অয়নের দিকে একটু বাড়িয়ে দিল।

“ভিজে গেছে।”

অয়ন হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা নিল।

তাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল।

বৃষ্টির ঠান্ডা। আঙুলের উষ্ণতা। কাঁপা নিঃশ্বাস।

এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই থেমে গেল।

অয়ন ডায়েরিটা নিজের শার্টের ভেতর নয়, শুধু শরীরের কাছে এনে বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচাল।

“শুকিয়ে যাবে।”

সঙ্গীতা খুব আস্তে বলল,

“সবকিছু শুকোয়?”

অয়ন বলল,

“না। কিছু দাগ থাকে।”

“তাহলে?”

“দাগ থাকলে বোঝা যায়, একদিন বৃষ্টি হয়েছিল।”

সঙ্গীতা আর হাসতে পারল না। কাঁদলও না। শুধু তাকিয়ে রইল।

বজ্রপাতের আলো আবার এক মুহূর্তের জন্য তাদের মুখ আলোকিত করল।

অয়নের চোখে সে দেখল— মায়া। রাগ। বিশ্বাস। ধৈর্য। আর এক গভীর আগুন, যা তাকে জ্বালাতে নয়, আলোকিত করতে চায়।

সেই আগুনই তাকে ভয় দেখায়।

ভেতর থেকে সূর্যের গলা এল,

“সঙ্গীতা? টর্চটা কোথায়?”

দুজনেই চমকে উঠল।

বাস্তবতা ফিরে এল।

সঙ্গীতা দ্রুত পেছনে সরে গেল।

অয়ন ডায়েরিটা তার হাতে দিল।

এইবার আঙুল ছোঁয়নি।

সঙ্গীতা ডায়েরি নিল।

“ভিতরে যাও,” সে ফিসফিস করে বলল।

“তুমি?”

“আমি আসছি।”

“ভিজছ।”

“আমি আসছি।”

ভেতর থেকে আবার সূর্যের গলা—

“শুনছ? টর্চটা?”

সঙ্গীতা নিজের মুখ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।

“হ্যাঁ, আসছি।”

অয়ন নিজের ঘরের দিকে ফিরল।

দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকাল।

সঙ্গীতা এখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে। হাতে ডায়েরি। চুল ভেজা। মুখে বৃষ্টির জল। চোখে সেই ভাঙা আলো।

সে আবার বলল না কিছু।

কারণ আজ সে জানে—কিছু মুহূর্ত কথায় নষ্ট হয়।

সঙ্গীতা ঘরে গিয়ে টর্চ দিল।

সূর্য বিরক্ত মুখে বলল,

“এতক্ষণ কোথায় ছিলে?”

“বারান্দায়।”

“এই বৃষ্টিতে?”

“হ্যাঁ।”

“তোমার এসব নাটকীয়তা আমি বুঝি না।”

সঙ্গীতা তাকাল না।

আগে হয়তো এই কথায় তার বুক ভেঙে যেত। আজ লাগল। কিন্তু পুরো ভাঙল না।

কারণ বারান্দায় কেউ তাকে বলেছে— “আমি তোমাকে ফিরে আসতে দেখছি।”

সে শুধু বলল,

“টর্চটা নাও।”

সূর্য টর্চ নিয়ে আবার ঘরে চলে গেল।

সঙ্গীতা নিজের ঘরে এসে দরজা ভেজাল। পুরো বন্ধ করল না।

ডায়েরিটা খুলল।

পাতার এক কোণে জল লেগে কালি একটু ছড়িয়ে গেছে। তবু সব লেখা মুছে যায়নি।

সে টেবিলে বসে অনেকক্ষণ কলম হাতে রইল।

তারপর লিখল—

“আজ বৃষ্টিতে আমি ডায়েরি ভিজিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। সে বাঁচিয়ে রাখল। শুধু ডায়েরি নয়—আমার লিখতে চাওয়া মানুষটাকেও।”

কলম থামল।

তারপর লিখল—

“সে আমাকে এমনভাবে দেখে, যেন আমি এখনও শেষ হয়ে যাইনি। এই দেখাটাই আমার সবচেয়ে বড় ভয়।”

তার হাত কাঁপছিল।

শেষে সে লিখল—

“আজ আমি তাকে বলেছি—আমাকে এভাবে দেখো না। কিন্তু সত্যিটা হলো— ওই দৃষ্টিটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।”

সঙ্গীতা কলম নামিয়ে রাখল।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।

তার বুকের ভেতরও।

তবু আজ বৃষ্টি সব ধুয়ে নিয়ে যায়নি।

কিছু রেখে গেছে।

অয়ন নিজের ঘরে ফিরে দরজা ভেজাল।

হাত এখনও ভিজে। বুকের কাছে বৃষ্টির ঠান্ডা। আঙুলে সঙ্গীতার ডায়েরির মলাটের স্পর্শ।

সে টেবিলে বসে বই খুলল।

কিন্তু আজ পড়া হলো না।

কিছু রাত পড়ার জন্য নয়। কিছু রাত শুধু নিজের ভিতরের সত্যি চিনে নেওয়ার জন্য।

সে খাতা খুলল।

লিখল—

“আজ সে বলল, আমাকে এভাবে দেখো না। আমি বুঝলাম, দৃষ্টি কখনো কখনো স্পর্শের থেকেও বেশি বিপজ্জনক।”

সে থামল।

বাইরে বৃষ্টি।

ভেতরে সঙ্গীতার কাঁপা গলা—

“যেন আমি এখনও বেঁচে আছি।”

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

তার বুকের ভেতর ব্যথা হলো।

কেউ যদি নিজেকে এতদিন মৃত মনে করে, তাহলে তাকে বাঁচতে বলাও কি পাপ?

সে আবার লিখল—

“আমি তাকে চাই। কিন্তু তার আগে চাই, সে নিজেকে চাইতে শিখুক।”

কলম থেমে গেল।

এই লাইনটার দিকে তাকিয়ে অয়ন বুঝল—আজ তার ভালোবাসা আরও এক ধাপ বদলাল।

এটা শুধু তাকে কাছে টানার আগুন নয়।

এটা তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা।

তবু আগুন আছে।

সে অস্বীকার করতে পারল না।

বারান্দার সেই বৃষ্টিভেজা মুখ, কাঁপা নিঃশ্বাস, ডায়েরি বাড়িয়ে দেওয়া হাত, “আমাকে এভাবে দেখো না”—সব তার শরীরের ভেতর অস্থির ঢেউ তুলছিল।

কিন্তু সে আজও এগোয়নি।

নিজেকে থামিয়েছে।

কারণ সঙ্গীতা তাকে বিশ্বাস করে।

আর সে জানে—বিশ্বাস ভাঙা পাপের চেয়েও বড় অপরাধ।

রাত আরও গভীর হলো।

বিদ্যুৎ ফিরে এল প্রায় একটার দিকে।

ঘরে হালকা আলো জ্বলতেই অয়ন দেখল, দরজার নিচে কিছু নেই।

কোনো কাগজ না।

আজ সঙ্গীতা কিছু পাঠায়নি।

তবু সে জানে, আজ সে লিখেছে।

কারণ বারান্দার সেই চোখ মিথ্যে বলে না।

অন্যদিকে সঙ্গীতা ডায়েরি বন্ধ করে বালিশের পাশে রাখল।

সূর্য ঘুমোচ্ছে। বাইরে বৃষ্টি কমেছে। ঘরের ভেতরে ভেজা গন্ধ।

সে চোখ বন্ধ করল।

অয়নের দৃষ্টি আবার ফিরে এল।

যে দৃষ্টি তাকে নগ্ন করে না—মুখোশহীন করে।

যে দৃষ্টি দাবি করে না—ডাকে।

যে দৃষ্টি তাকে বলে— “তুমি এখনও শেষ হয়ে যাওনি।”

সঙ্গীতা জানে, এই দৃষ্টি থেকে পালানো কঠিন হবে।

আর আজ প্রথমবার সে ভয় পেলেও মনে মনে স্বীকার করল—

সে পালাতে চায় না।

ভোরের আগে বৃষ্টি থামল।

বারান্দার রেলিং ভিজে। গোলাপগাছ নুয়ে আছে, কিন্তু ভাঙেনি। ডায়েরির পাতার মতোই তার পাপড়িতে জল জমে আছে।

অয়ন ঘুমোতে যাওয়ার আগে জানালার ফাঁক দিয়ে গোলাপটার দিকে তাকাল।

সঙ্গীতা নিজের ঘরে ডায়েরির ওপর হাত রেখে ঘুমের কাছে হার মানল।

একই রাত।

দুই ঘর।

একটা ভেজা ডায়েরি।

একটা বাক্য—

“আমাকে এভাবে দেখো না।”

আর এক সত্যি, যা দুজনেই আলাদা আলাদাভাবে বুঝল—

দেখা কখনো কখনো স্পর্শের শুরু নয়।

দেখা কখনো কখনো পুনর্জন্মের শুরু।