বৃষ্টির পরের সকাল সবসময় একটু অন্যরকম হয়।
শহর যেন রাতের সব কান্না ধুয়ে ফেলে ভোরে নতুন মুখে দাঁড়ায়। রাস্তার ধারে জমে থাকা জল, পাতার ডগায় ফোঁটা, বারান্দার রেলিংয়ে ভেজা দাগ—সবকিছু যেন মনে করিয়ে দেয়, রাতের ঝড় শেষ হলেও তার চিহ্ন থাকে।
অয়ন খুব ভোরে উঠে বসেছিল।
ঘুম ঠিকমতো হয়নি। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। টেবিলে বই খোলা, কিন্তু সে পড়েনি। খাতায় গত রাতের লেখা এখনও সামনে—
“আমি তাকে চাই। কিন্তু তার আগে চাই, সে নিজেকে চাইতে শিখুক।”
এই লাইনটার নিচে সে আর কিছু লিখতে পারেনি।
কারণ এই লাইনটার পর আর কোনো শব্দ সহজ নয়।
চাওয়া।
এতদিন সে নিজেকে বুঝিয়েছে—এটা যত্ন। এটা মায়া। এটা সঙ্গীতার একাকিত্ব বুঝে পাশে দাঁড়ানো। এটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব রাগ। এটা তার ডায়েরি বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছে।
সব সত্যি।
কিন্তু সব সত্যির নিচে আরেকটা সত্যি ছিল।
যে সত্যিকে সে খাতায় লিখেছে—ভালোবাসা।
এখন সেই শব্দ খাতার পাতা থেকে উঠতে চাইছে।
মুখে।
আর মুখে এলে কোনো শব্দ আর আগের মতো থাকে না।
অয়ন জানালার দিকে তাকাল।
বারান্দায় গোলাপগাছ ভেজা। একটা পাপড়িতে জল আটকে আছে। পড়ে যাচ্ছে না। ঝুলে আছে।
যেন কোনো কথা।
যা বলা হয়নি, কিন্তু আটকে আছে।
সকালে সঙ্গীতা চা নিয়ে এল।
আজ তার মুখে ক্লান্তি। চোখে ঘুমের অভাব। তবু অদ্ভুত শান্ত। গত রাতের বৃষ্টিতে ভেজা চুল এখন শুকিয়ে গেছে, কিন্তু যেন কোনো অদৃশ্য ভেজা ভাব এখনও তার চারপাশে আছে।
সে কাপটা টেবিলে রাখল।
“চা।”
অয়ন তাকাল।
“ঘুমাওনি?”
সঙ্গীতা মৃদু হাসল।
“তুমিও না।”
“দেখা যাচ্ছে?”
“তোমার চোখে সব দেখা যায়।”
কথাটা বলেই সঙ্গীতা থেমে গেল।
অয়নও।
গত রাতের লাইন যেন ফের ফিরে এল—
“আমাকে এভাবে দেখো না।”
আজও সেই দৃষ্টি আছে। কিন্তু আজ তা আরও নরম। আরও সাবধান।
অয়ন কাপ হাতে নিল।
“ডায়েরি শুকিয়েছে?”
সঙ্গীতা কাঁধ নামিয়ে বলল,
“পাতায় দাগ আছে।”
“সব দাগ খারাপ না।”
“জানি।”
এই “জানি” কথাটুকু আজ ভিন্ন ছিল। যেন সে সত্যিই মানছে।
সঙ্গীতা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের আঁচলের ভাঁজ থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল।
অয়ন তাকাল।
“এটা?”
সঙ্গীতা কাগজটা টেবিলে রাখল।
“কাল রাতে লিখেছিলাম।”
অয়নের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
“আমাকে দেখাবে?”
“হ্যাঁ।”
কথাটা খুব ছোট, কিন্তু অয়নের কাছে যেন দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ।
সে কাগজটা হাতে নিল না সঙ্গে সঙ্গে।
“তুমি নিশ্চিত?”
সঙ্গীতা মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
“আমি না পড়লেও হবে।”
“না। আজ পড়ো।”
অয়ন খুব ধীরে কাগজটা খুলল।
সঙ্গীতার হাতের লেখা। সামান্য কালি ছড়িয়ে গেছে। বৃষ্টির দাগ। তবু পড়া যায়।
“আজ বৃষ্টিতে আমি ডায়েরি ভিজিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। সে বাঁচিয়ে রাখল। শুধু ডায়েরি নয়—আমার লিখতে চাওয়া মানুষটাকেও।
সে আমাকে এমনভাবে দেখে, যেন আমি এখনও শেষ হয়ে যাইনি। এই দেখাটাই আমার সবচেয়ে বড় ভয়।
আজ আমি তাকে বলেছি—আমাকে এভাবে দেখো না। কিন্তু সত্যিটা হলো— ওই দৃষ্টিটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।”
অয়ন পড়া শেষ করে স্থির হয়ে রইল।
ঘর নিঃশব্দ।
বাইরে ভেজা সকাল। ভেতরে দুজন মানুষের শ্বাস।
সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে। যেন নিজের বুকের গোপন কক্ষ খুলে দিয়ে এখন বিচার অপেক্ষা করছে।
অয়ন কাগজটা খুব যত্ন করে টেবিলে রাখল।
তারপর বলল,
“তুমি এটা আমাকে কেন দেখালে?”
সঙ্গীতা উত্তর দিল না।
কয়েক সেকেন্ড পরে বলল,
“কারণ লুকিয়ে রাখলে মিথ্যে হয়ে যেত।”
“কী?”
“যে আমি বাঁচতে চাইছি।”
অয়নের গলা শুকিয়ে গেল।
সঙ্গীতা বলল,
“আর… যে তুমি সেটা দেখেছ।”
অয়ন তাকিয়ে রইল।
এই মুহূর্তে তার ভেতরে যে শব্দটা উঠছে, সে জানে সেটাকে আর আটকে রাখা যাবে না। কিন্তু বললে কী হবে?
সঙ্গীতার জীবন জটিল।
সে বিবাহিত। সে আহত। সে ভয় পায়। সে তাকে বিশ্বাস করে। আর বিশ্বাসের সামনে ভুল শব্দ বলা মানে সবকিছু ভেঙে দেওয়া।
অয়ন নিজেকে সামলাল।
“তুমি লিখবে,” সে বলল।
সঙ্গীতা একটু তাকাল।
“শুধু এটা বলবে?”
অয়ন থেমে গেল।
সঙ্গীতার চোখে আজ অদ্ভুত প্রশ্ন। যেন সে নিজেও ভয় পাচ্ছে, তবু অপেক্ষা করছে। যেন সে চায় না শুনতে, তবু না শুনলেও থাকবে না।
অয়ন বলল,
“আমি আর কী বলব?”
সঙ্গীতা ধীরে বলল,
“যা বললে সব বদলে যাবে।”
অয়নের বুকের ভেতর শব্দ হলো।
সে বুঝল—সঙ্গীতা জানে।
শুধু সে শুনতে চায় কি না, সেটা এখনও জানে না।
ঠিক তখন বাইরে সূর্যের গলা শোনা গেল।
“সঙ্গীতা, চা?”
দুজনেই চমকে উঠল।
বাস্তবতা আবার দরজায় এসে দাঁড়াল।
সঙ্গীতা দ্রুত কাগজটা তুলে নিতে গেল।
অয়ন কাগজটা হাতে নিয়ে বলল,
“আমি রাখব?”
সঙ্গীতা থেমে গেল।
“কেন?”
“কারণ তুমি আজ আমাকে তোমার একটা সত্যি দিলে।”
“এটা রেখে দিলে বিপদ।”
“তাহলে ফিরিয়ে দেব।”
সঙ্গীতা কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর কাগজটা তার হাত থেকে নেয়নি।
“লুকিয়ে রেখো।”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“রক্ষা করব।”
সঙ্গীতা চোখ নামাল।
তারপর চলে গেল।
অয়ন কাগজটা নিজের বইয়ের ভেতর রাখল।
কিন্তু আজ বইয়ের পাতাও কাঁপছে।
সারা দিন অয়ন পড়ার চেষ্টা করল।
পারলও কিছুটা। কিন্তু মন পুরোপুরি বসেনি। কারণ আজ তার ভেতরে একটা বাক্য হাঁটছিল—
“যা বললে সব বদলে যাবে।”
সঙ্গীতা কি তাকে অনুমতি দিল?
না।
সঙ্গীতা কি তাকে থামাল?
তাও না।
সে শুধু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল—ওই দরজার ওপারে আগুন আছে।
অয়ন নিজেকে বারবার বলল—
আজ না। এখন না। তার জীবনে আরও বিপদ বাড়িও না।
কিন্তু মানুষ সবসময় নিজের সিদ্ধান্তের মালিক থাকে না। কখনো কখনো কোনো সত্যি এতদিন আটকে থাকে যে, একসময় তা নিজেই দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।
দুপুরে খাওয়ার সময় সঙ্গীতা খুব স্বাভাবিক ছিল।
অতিরিক্ত স্বাভাবিক।
সে ভাত দিল। ডাল দিল। অয়নের প্লেটে আলুভাজা রাখল। নিজের প্লেটেও ভাত নিল—routine অনুযায়ী।
অয়ন তাকাল।
“আজও follow করছ?”
সঙ্গীতা বলল,
“student যদি homework না করে, teacher বকবে।”
“আমি বকব না।”
“জানি।”
“তবু?”
“কারণ এখন নিজেরও খিদে পায়।”
কথাটা শুনে অয়ন থেমে গেল।
এটা ছোট্ট জয়।
কিন্তু অয়ন জানে, কোনো মানুষ যখন বহুদিন পর নিজের খিদে চিনতে শেখে, সেটা পুনর্জন্মের শুরু।
সে বলল,
“ভালো।”
সঙ্গীতা তাকাল।
“শুধু ভালো?”
“খুব ভালো।”
সঙ্গীতার মুখে অল্প হাসি ফুটল।
এই হাসিই অয়নের সব প্রতিরোধ দুর্বল করে দেয়।
সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
বিকেলে আকাশ আবার মেঘ করল।
কিন্তু বৃষ্টি এল না।
শুধু ভারী বাতাস। জানালার কাঁচে ধূসর আলো। শহর যেন অপেক্ষা করছে।
সূর্য অফিসে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় বলে গেছে, ফিরতে দেরি হবে। সঙ্গীতা শুধু মাথা নেড়েছে। আর কোনো প্রশ্ন করেনি।
অয়ন বিকেলে পড়া শেষ করে খাতা বন্ধ করল।
আজ routine পুরো হয়নি।
সে খাতার ওপর হাত রেখে বসে রইল।
বইয়ের ভেতর সঙ্গীতার কাগজ। সে বারবার সেটা বের করতে চাইছে। আবার নিজেকে থামাচ্ছে।
কাগজ না পড়েও লাইনগুলো মুখস্থ হয়ে গেছে।
“ওই দৃষ্টিটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।”
কেউ যদি তোমার দৃষ্টিতে বাঁচতে চায়, তুমি কি শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকবে?
না কি বলবে—কেন সেই দৃষ্টি আছে?
এই প্রশ্নই তাকে তাড়া করছিল।
সন্ধ্যার পর সঙ্গীতা অয়নের দরজায় এল।
হাতে চা নেই।
শুধু দাঁড়িয়ে।
অয়ন তাকাল।
“কিছু বলবে?”
সঙ্গীতা একটু থেমে বলল,
“কাগজটা… রেখেছ?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায়?”
“বইয়ের ভেতর।”
“কোন বই?”
অয়ন বইটা দেখাল।
বাংলা কবিতার বই।
সঙ্গীতা মৃদু হাসল।
“উপযুক্ত জায়গা।”
অয়ন বলল,
“তোমার লেখা কবিতার কাছেই থাকা উচিত।”
“ওটা কবিতা না।”
“তাহলে?”
“ভয়।”
অয়ন খুব ধীরে বলল,
“ভয়ও কখনো কবিতা হয়ে যায়।”
সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল।
আজ তার চোখে অদ্ভুত শান্ত ঝড়।
“তুমি আজ সারাদিন চুপ ছিলে।”
“পড়ছিলাম।”
“মিথ্যে।”
অয়ন চুপ।
সঙ্গীতা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমি কিছু আটকাচ্ছ।”
অয়ন চোখ নামাল।
“তুমি-ও তো।”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে?”
“আমার আটকানো দরকার।”
“আমারও।”
সঙ্গীতা খুব আস্তে বলল,
“সব আটকানো কি ভালো?”
অয়ন বুকের ভেতর কাঁপুনি অনুভব করল।
এই প্রশ্নটা সঙ্গীতা বলছে, না তার নিজের ভিতর?
সে উঠে দাঁড়াল।
“তুমি এখন এসব বলো না।”
সঙ্গীতা অবাক।
“আমি?”
“হ্যাঁ। তুমি বললে আমি নিজেকে সামলাতে পারব না।”
সঙ্গীতার নিঃশ্বাস থেমে গেল।
ঘরের বাতাস ঘন হয়ে উঠল।
অয়ন বুঝল, সে সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে।
সে ধীরে বলল,
“আমি দুঃখিত।”
সঙ্গীতা বলল,
“কেন?”
“কারণ তোমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছি।”
“তুমি ভয় দেখাও না।”
“তাহলে?”
সঙ্গীতা উত্তর দিল না।
দরজার ফ্রেমে তার হাত। আঙুল সামান্য কাঁপছে।
অয়ন বলল,
“গতকাল তুমি বলেছিলে—আমাকে এভাবে দেখো না।”
“হ্যাঁ।”
“আজ তুমি নিজে এসে দাঁড়িয়েছ।”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল।
“জানি না।”
অয়ন খুব নরম গলায় বলল,
“জানো।”
সঙ্গীতা চোখ খুলল।
“তাহলে তুমি বলো।”
এই কথাটাই ছিল catalyst.
অয়ন অনুভব করল, বুকের ভেতর এতদিন ধরে আটকে থাকা শব্দটি আর ফিরে যাবে না।
সে এক পা এগোল না।
দরজার ভেতরে দাঁড়িয়ে রইল। সঙ্গীতা দরজার বাইরে।
মাঝখানে শুধু দরজার কাঠ।
এই দূরত্বটাই নিরাপদ। এই দূরত্বটাই অসম্ভব।
অয়ন ধীরে বলল,
“আমি অনেকদিন ধরে অন্য নাম দিচ্ছিলাম।”
সঙ্গীতা স্থির।
“যত্ন বলেছি। মায়া বলেছি। দায়িত্ব বলেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাগ বলেছি। তোমাকে বাঁচাতে চাই বলেছি। তোমার ডায়েরি, তোমার লেখা, তোমার খাওয়া—সবকিছুকে আলাদা আলাদা নাম দিয়েছি।”
তার গলা কাঁপছিল, কিন্তু শব্দ স্পষ্ট।
“কিন্তু সব নামের নিচে একটা নাম ছিল।”
সঙ্গীতার হাত দরজার ফ্রেমে আরও শক্ত হলো।
অয়ন বলল,
“আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, সঙ্গীতা।”
নীরবতা।
বাইরে মেঘের গর্জন নেই। বৃষ্টি নেই। তবু ঘরের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল।
তার মুখে ভয়। অবিশ্বাস। আঘাত। স্বস্তি। আর এমন এক ব্যথা, যার নাম সে নিজেও জানে না।
অয়ন দ্রুত বলল,
“শোনো—আমি কিছু চাইছি না। কোনো অধিকার চাইছি না। তোমাকে কোনো উত্তর দিতে হবে না। তোমার জীবনে ঝড় তুলতে চাই না। আমি জানি তুমি কারও স্ত্রী। জানি সমাজ আছে। জানি আমি ছোট। জানি এটা বলা উচিত ছিল না।”
তার চোখ ভিজে উঠল।
“তবু মিথ্যে বলতে পারছিলাম না। তুমি যখন বললে, আমার দৃষ্টি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখে… তখন আমি বুঝলাম, আমি তোমার সামনে অর্ধেক সত্যি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সেটা অন্যায়।”
সঙ্গীতা এখনও চুপ।
অয়ন বলল,
“তাই বললাম। শুধু জানার জন্য। দাবি করার জন্য নয়।”
দুজনের মাঝে দরজা।
দরজার ওপাশে সঙ্গীতা যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
অয়ন মাথা নিচু করল।
“তুমি চাইলে আমি আর কখনো এই কথা বলব না।”
এইবার সঙ্গীতার ঠোঁট কাঁপল।
খুব ধীরে সে বলল,
“এই কথা শুনতে আমার ভয় লাগছিল…”
অয়ন চোখ তুলল।
সঙ্গীতার চোখে জল জমেছে।
সে বাকিটা বলতে পারছিল না।
অয়ন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করল।
সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করে বলল,
“কিন্তু না শুনলেও মরতাম।”
অয়ন স্থির হয়ে গেল।
এই উত্তর প্রেমের সরাসরি স্বীকারোক্তি নয়।
তবু এর ভেতরে এমন সত্যি ছিল, যা কোনো “আমি-ও” কথার চেয়ে গভীর।
সঙ্গীতা কাঁপা গলায় বলল,
“তুমি জানো না, এই কথা আমার জন্য কত ভয়ংকর।”
অয়ন বলল,
“জানি।”
“না, জানো না।”
সে চোখ খুলল।
“আমি প্রতিদিন নিজেকে বলেছি—এটা মায়া। এটা বয়সের ভুল। এটা তোমার কৃতজ্ঞতা। এটা আমার একাকিত্ব। এটা দুর্বলতা। এটা ভুল বোঝা। আমি প্রতিদিন নিজেকে নতুন নতুন নাম দিয়েছি। যেন আসল নামটা বলতে না হয়।”
অয়নের গলা ভারী হলো।
“সঙ্গীতা…”
সে হাত তুলল।
“না। আজ আমাকে বলতে দাও।”
অয়ন চুপ।
সঙ্গীতা বলল,
“তুমি যখন আমাকে নাম ধরে ডাকলে, আমি ভয় পেয়েছিলাম। যখন বললে আমি শরীর নই, আমি ভয় পেয়েছিলাম। যখন আমার হাতের ওপর হাত রাখলে আর আমি সরালাম না, আমি ভয় পেয়েছিলাম। যখন তুমি বললে আমি অভাব নই, আমি ভয় পেয়েছিলাম। যখন তুমি পালাতে যাচ্ছিলে, আমি ভয় পেয়েছিলাম। যখন গেলে না—আরও ভয় পেয়েছিলাম।”
তার চোখ দিয়ে এবার জল গড়াল।
“কারণ তুমি থাকলে আমি নিজেকে আটকাতে পারি না।”
অয়ন এক পা এগোতে চাইলো।
থেমে গেল।
সঙ্গীতা সেটা দেখল।
এই থেমে যাওয়াও তাকে কাঁদিয়ে দিল।
“দেখছ? তুমি এগোও না। এই জন্যই ভয় পাই। তুমি যদি শুধু আগুন হতে, আমি নিজেকে বাঁচাতে পারতাম। কিন্তু তুমি আগুনের পাশে জলও রাখো।”
অয়ন খুব আস্তে বলল,
“আমি তোমাকে পোড়াতে চাই না।”
“তবু পুড়ছি।”
“আমি দূরে থাকব?”
সঙ্গীতা চমকে তাকাল।
“না।”
শব্দটা বেরিয়ে গেল।
দুজনেই শুনল।
এই “না” এত পরিষ্কার ছিল যে সঙ্গীতা নিজেই ভয় পেল।
সে দ্রুত বলল,
“মানে… এখন না। এই মুহূর্তে না। আমি জানি না।”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
“তুমি এত সহজে ‘ঠিক আছে’ বলো কীভাবে?”
“কারণ তোমার কঠিন হওয়াটা আমি দেখি।”
সঙ্গীতা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। দরজার ফ্রেমে হাত রেখে মাথা নিচু করল।
অয়ন খুব নরম গলায় বলল,
“আজ কোনো সিদ্ধান্ত লাগবে না।”
সঙ্গীতা ফিসফিস করল,
“না।”
“কোনো প্রতিশ্রুতি লাগবে না।”
“না।”
“কোনো উত্তরও না।”
সঙ্গীতা তাকাল।
“তাহলে কী লাগবে?”
অয়ন বলল,
“শুধু মিথ্যে না বললেই হবে।”
এই কথায় সঙ্গীতা ভেঙে পড়ল না। বরং স্থির হলো।
কারণ সে বহুদিন ধরে মিথ্যের ভেতর বেঁচেছে।
“আমি আজ মিথ্যে বলব না,” সে বলল।
অয়ন চুপ করে রইল।
সঙ্গীতা খুব ধীরে বলল,
“আমি তোমাকে ভয় পাই। কারণ তুমি আমার কাছে সত্যি হয়ে উঠছ।”
অয়ন চোখ বন্ধ করল।
এই বাক্য তার বুকের ভেতর এমনভাবে ঢুকল, যেন কেউ বহুদিনের অন্ধকারে প্রদীপ রাখল।
হঠাৎ বাইরে দরজার লক ঘোরার শব্দ।
সূর্য।
দুজনেই চমকে উঠল।
সঙ্গীতা দ্রুত সরে দাঁড়াল। চোখ মুছল। মুখ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
অয়ন পিছিয়ে গেল নিজের ঘরের ভেতর।
দরজা পুরো বন্ধ করল না—আধখোলা রাখল। যেন কিছুই হয়নি।
সূর্য ভেতরে ঢুকে বলল,
“কী অন্ধকার! আলো জ্বালাওনি কেন?”
সঙ্গীতা দ্রুত drawing room-এর আলো জ্বালাল।
“খেয়েছ?” সে জিজ্ঞেস করল।
সূর্য ব্যাগ নামিয়ে বলল,
“না। খেতে দাও। খুব tired।”
তার গলা সাধারণ।
তার কাছে এই বাড়ি আগের মতোই। একজন স্ত্রী। একজন ছোট ভাই। একটা dinner। কিছু practical কথা।
সে জানে না, তার ফেরার ঠিক আগে এই বাড়ির বাতাস বদলে গেছে।
সঙ্গীতা রান্নাঘরে গেল।
অয়ন দরজার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল।
তার বুক এখনও ধকধক করছে।
সে শুনল, সঙ্গীতা স্বাভাবিক গলায় বলছে—
“ভাত গরম করছি।”
এই স্বাভাবিকতা তাকে ব্যথা দিল।
কারণ এখন সে জানে, এই স্বাভাবিকতার নিচে কী ঝড়।
রাতের খাবার টেবিলে তিনজন।
সূর্য খাচ্ছে। মাঝে মাঝে অফিসের কথা বলছে। PG-এর কথা তুলল না আজ। ফোনে দুবার message এল। সে দেখল, উত্তর দিল, আবার খেতে লাগল।
সঙ্গীতা ভাত দিচ্ছে।
অয়ন শান্ত।
কিন্তু আজ তাদের নীরবতা অন্যরকম।
এটা লুকোনো দোষের নীরবতা নয়। এটা উচ্চারিত সত্যির পরের নীরবতা।
সঙ্গীতা অয়নের প্লেটে ডাল দিতে গিয়ে এক মুহূর্ত থামল।
অয়ন তাকাল না।
কারণ তাকালে সব প্রকাশ পেয়ে যাবে।
তবু সঙ্গীতা জানল—সে শুনছে।
অয়ন জানল—সে কাঁপছে।
সূর্য কিছুই জানল না।
এই না-জানাই যেন ঘরের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ।
রাত অনেক পরে সূর্য ঘুমিয়ে পড়ল।
অয়ন নিজের ঘরে বসে আছে।
আজ তার পড়া হয়নি। routine ভেঙেছে। কিন্তু সে নিজেকে দোষ দিল না।
কিছু দিন routine-এর বাইরেও জীবন ঘটে।
তার বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি আর ভয় পাশাপাশি বসে আছে।
সে বলেছে।
শেষ পর্যন্ত বলেছে।
“আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, সঙ্গীতা।”
শব্দটা এখন ঘরের দেয়ালে লেগে আছে। টেবিলের ওপর। বইয়ের পাতায়। শ্বাসে।
সে খাতা খুলল।
লিখল—
“আজ শব্দটা মুখে এল। আমি ভেবেছিলাম বললে সব ভেঙে যাবে। কিন্তু সব ভাঙেনি। বরং যে মিথ্যে ছিল, তা ভাঙল।”
তারপর সে থামল।
সঙ্গীতার উত্তর মনে পড়ল—
“এই কথা শুনতে আমার ভয় লাগছিল… কিন্তু না শুনলেও মরতাম।”
অয়ন চোখ বন্ধ করল।
এমন উত্তর মানুষকে আনন্দ দেয় না শুধু। ভয়ও দেয়। কারণ এখন সে জানে—সে একা নয়।
আর দুজনের সত্যি একা সত্যির চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক।
সে আবার লিখল—
“সে আমাকে ভালোবাসে কি না, আজও বলেনি। তবু আজ সে বলেছে—আমার সত্যি না শুনলে সে বাঁচত না। এটাই কি ভালোবাসার আগে শেষ দরজা?”
কলম থেমে গেল।
অয়ন বইয়ের ভেতর থেকে সঙ্গীতার কাগজটা বের করল। তার পাশে আজ নিজের খাতার একটা ছেঁড়া পাতায় লিখল—
“আমি বলেছি। দাবি করিনি। অপেক্ষা করব না—কারণ অপেক্ষা দাবি হয়ে যায়। শুধু সত্যিটা মিথ্যে করব না।”
সে পাতাটা ভাঁজ করল।
দরজার কাছে গেল।
এক মুহূর্ত দ্বিধা।
দেবে?
না?
শেষে দরজার নিচ দিয়ে কাগজটা সরিয়ে দিল না।
সে ফিরে এল।
আজ তাকে আর কিছু পাঠানো উচিত নয়।
সঙ্গীতার ওপর আরও ভার চাপানো নয়।
আজ শুধু বলা যথেষ্ট।
সঙ্গীতা নিজের ঘরে বসে ছিল।
ডায়েরি খোলা। কলম হাতে। কিন্তু হাত কাঁপছে।
আজ সে কী লিখবে?
“সে আমাকে ভালোবাসে”?
এই লাইন লিখতে গিয়েও তার বুক কেঁপে উঠল।
অয়নের মুখ। দরজার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা। কোনো দাবি নেই। কোনো স্পর্শ নেই। শুধু সত্যি।
সে লিখল—
“আজ সে বলল, সে আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে।”
লাইনটা লিখে সে থেমে গেল।
কাগজ ঝাপসা হয়ে উঠল।
তারপর লিখল—
“আমি শুনতে ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ শুনলে আর নিজেকে মিথ্যে বলা যাবে না। কিন্তু না শুনলেও মরতাম। কারণ তার নীরবতাও আমাকে প্রতিদিন একই কথা শুনিয়ে দিচ্ছিল।”
তার চোখ দিয়ে জল পড়ল।
সে মুছল না।
আজ কান্না লুকোনোর দরকার নেই। অন্তত ডায়েরির সামনে নয়।
সে আবার লিখল—
“আমি কি তাকে ভালোবাসি?”
কলম থেমে গেল।
এই প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারল না।
কারণ উত্তর লিখলে পৃথিবী বদলে যাবে।
তবু উত্তর না লিখেও কি পৃথিবী আগের মতো থাকে?
সে নিচে লিখল—
“আমি আজ উত্তর লিখলাম না। কিন্তু আমার হাত কাঁপছে—এটাই উত্তর হতে পারে।”
ডায়েরি বন্ধ করল না।
খোলা রাখল।
যেন নিজের কাছেও আর পুরো দরজা বন্ধ করতে চাইছে না।
রাত প্রায় দুটো।
ঘর নিস্তব্ধ।
অয়ন দরজা খুলে বাইরে এল না। সঙ্গীতাও না।
আজ বারান্দার দরকার নেই।
কারণ আজ তাদের মধ্যে যে কথা হয়েছে, সেটা বারান্দার অন্ধকারের চেয়েও গভীর।
তবু দুজনেই জানত, একই বাড়ির দুই ঘরে তারা জেগে আছে।
অয়ন বইয়ের ওপর হাত রেখে বসে আছে।
সঙ্গীতা ডায়েরির ওপর হাত রেখে বসে আছে।
দুজনেই আলাদা।
দুজনেই খুব কাছে।
একটা শব্দ আজ তাদের ভেতর দিয়ে হাঁটছে—
ভালোবাসা।
কেউ তাকে আশীর্বাদ বলছে না। কেউ তাকে অধিকার বলছে না। কেউ তাকে সহজ বলছে না।
কিন্তু কেউ আর তাকে মিথ্যে বলতেও পারছে না।
ভোরের একটু আগে সঙ্গীতা ডায়েরি বন্ধ করল।
তারপর ধীরে উঠে দরজার কাছে গেল।
দরজা খুলল না।
শুধু ভেতর থেকে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল।
ওপাশে করিডোর।
আর করিডোরের ওপাশে অয়নের ঘর।
সে খুব নিচু গলায় বলল,
“অয়ন…”
শব্দটা এত আস্তে যে বাইরে কেউ শুনতে পাবে না।
তবু যেন নিজের হৃদয় শুনল।
ওই একই সময়ে অয়ন নিজের ঘরে চোখ বন্ধ করে বসে ছিল। তার মনে হলো, কেউ ডাকল।
সে দরজার দিকে তাকাল।
নিশ্চয়ই কল্পনা।
তবু সে খুব আস্তে বলল,
“আমি আছি।”
দুজনেই একে অন্যের শব্দ শুনল কি না জানা গেল না।
কিন্তু ওই মুহূর্তে একই বাড়ির অন্ধকারে দুজন মানুষের ভেতরে একই কথা জন্ম নিল—
আজ আর ফেরার পথ আগের মতো নেই।
কারণ ভালোবাসা একবার মুখে এলে, নীরবতাও আর আগের মতো নীরব থাকে না।