যাদবপুরে অয়নের প্রথম দিনটা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে।
কিন্তু তার ভেতরে সেটা সাধারণ ছিল না।
সকালবেলা সঙ্গীতা চা নিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছিল। ভেতরে ঢোকেনি। পর্ব ১৯-এর সেই দূরত্বের নিয়ম এখনও বাতাসে ঝুলে আছে। কিন্তু চায়ের কাপ এসেছে। ওষুধের কথা নেই, কারণ অয়ন এখন সুস্থ। কিন্তু চায়ের পাশে একটা ছোট্ট কাগজ—
“আজ প্রথম দিন। সময়মতো খেয়ে নিও।”
নাম নেই।
বাড়তি কথা নেই।
তবু অয়ন কাগজটা হাতে নিয়ে বুঝল, দূরত্ব মানে যত্নের মৃত্যু নয়।
সে দরজা খুলে বাইরে তাকাল।
সঙ্গীতা রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। চুল বাঁধা, শাড়ির আঁচল কাঁধে, মুখে স্বাভাবিকতার কঠিন মুখোশ।
অয়ন ডাকল না।
কারণ সে কথা দিয়েছে— সঙ্গীতা না চাইলে সে এক পা এগোবে না।
তবু কাগজটা বইয়ের ভেতর রাখল।
যে বইয়ে সঙ্গীতার আগের কাগজগুলো আছে।
কিছু মানুষ ঘরে থাকে না। কাগজের ভাঁজে থাকে।
নাস্তার টেবিলে সূর্য তাড়াহুড়ো করছিল।
“আজ orientation, তাই তো?” সে চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল।
অয়ন বলল,
“হ্যাঁ। Department-এ যেতে বলেছে।”
“ভালো করে দেখে শিখে নে। যাদবপুরে অনেক ধরনের লোক পাস। সব বন্ধুত্ব করা যাবে না।”
সঙ্গীতা প্লেটে টোস্ট রাখছিল। হাত একবার থেমে গেল।
সূর্য বলল,
“আমি serious বলছি। শহুরে ছেলেমেয়েরা অনেক free। পড়ার জায়গায় পড়া করবি। অত adda, politics, প্রেম-টেমে জড়াবি না।”
“প্রেম-টেম” শব্দটা টেবিলের ওপর পড়ে রইল।
অয়ন চোখ নামিয়ে নিল।
সঙ্গীতা দ্রুত অন্যদিকে তাকাল।
সূর্য কিছু বুঝল না।
সে বলল,
“আর হ্যাঁ, নতুন friends হলে distance রাখিস। নিজের লক্ষ্য clear রাখবি।”
অয়ন শান্ত গলায় বলল,
“রাখব।”
সূর্য সন্তুষ্ট হল।
“Good.”
সঙ্গীতা চুপচাপ অয়নের দিকে টিফিন বাড়িয়ে দিল।
“এটা রাখো।”
অয়ন অবাক হলো।
“টিফিন?”
“প্রথম দিন। কখন কোথায় খাবে জানো না।”
সূর্য হেসে বলল,
“দেখলি? PG-তে গেলে এই luxury থাকবে না।”
অয়ন টিফিনটা হাতে নিল।
সে সঙ্গীতার দিকে তাকায়নি। তাকালে চোখে কিছু বেরিয়ে যেত।
শুধু বলল,
“ধন্যবাদ।”
সঙ্গীতা উত্তর দিল না।
কিন্তু তার আঙুলের ডগা অল্প কেঁপে উঠল।
“ধন্যবাদ” শব্দটা আজও তার ভালো লাগল না।
তবু আজ সে কিছু বলল না।
কারণ distance-এর নিয়মে অনেক শব্দই অনুবাদ বদলে ফেলে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে অয়ন যখন রাস্তায় দাঁড়াল, সকাল তখন পুরো জেগে গেছে।
বাসের হর্ন, অটোর ডাক, রাস্তার চায়ের দোকান, ফুটপাথের ভিজে দাগ, বাতাসে ধোঁয়া আর কাঁচা রোদের মিশ্র গন্ধ—কলকাতা তাকে নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে।
আজ তার হাতে বইয়ের ব্যাগ। ভেতরে সঙ্গীতার কাগজ। আর টিফিন।
একজন ছাত্রের প্রথম দিন।
এটা সেই জীবনের শুরু, যার জন্য বাবা তাকে পাঠিয়েছেন। যে জীবনের জন্য সে routine বানিয়েছে। যে জীবনের জন্য তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।
তবু বাসে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছিল—সে যেন দুই জীবনের মাঝখানে যাচ্ছে।
একদিকে যাদবপুর।
নতুন class, নতুন বন্ধু, নতুন identity.
অন্যদিকে বেহালার সেই ফ্ল্যাট।
রান্নাঘরের গন্ধ, গোলাপগাছ, বারান্দার অন্ধকার, ভেজা ডায়েরি, আর সেই কণ্ঠ—
“এই কথা শুনতে আমার ভয় লাগছিল… কিন্তু না শুনলেও মরতাম।”
অয়ন চোখ বন্ধ করল।
আজ তাকে পড়তে হবে। আজ তাকে নতুন জীবনে ঢুকতে হবে। আজ তাকে নিজের মনকে সোজা রাখতে হবে।
কিন্তু মন কি কখনো সোজা পথে হাঁটে?
যাদবপুরের গেট পেরিয়ে অয়নের মনে হলো, সে অন্য এক শহরে ঢুকে পড়েছে।
ক্যাম্পাসে অদ্ভুত এক স্বাধীনতার গন্ধ।
গাছের সারি, দেয়ালে পোস্টার, কোথাও ছাত্রছাত্রীদের দল, কেউ হাসছে, কেউ তর্ক করছে, কেউ গিটার নিয়ে বসে, কেউ চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে। পুরনো ভবনের দেয়ালে সময় জমে আছে, কিন্তু বাতাসে নতুন মানুষের শব্দ।
অয়ন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
গ্রামের ছেলে হিসেবে সে বহুদিন কলকাতাকে দূর থেকে ভেবেছে। কিন্তু এই ক্যাম্পাস যেন শহরের ভেতর আরেক স্বাধীন পৃথিবী।
তার বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি উঠল।
ভয় না।
সম্ভবত উত্তেজনা।
সে নিজেকে বলল—
“এখানেই শুরু। এখান থেকেই দাঁড়ানো।”
Department-এর সামনে অনেক নতুন ছাত্রছাত্রী জমেছে। কেউ পরিচিতদের সঙ্গে এসেছে, কেউ একা। অয়ন একা দাঁড়িয়ে নোটিস বোর্ড দেখছিল।
ঠিক তখন পাশে এক মেয়ে এসে দাঁড়াল।
“Excuse me, এটা কি first year orientation-এর list?”
অয়ন তাকাল।
মেয়েটির বয়স অয়নের কাছাকাছি। চোখে আত্মবিশ্বাস, মুখে সহজ হাসি, চুল খোলা নয়—আলগা করে বাঁধা। কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ, হাতে একটা নোটবুক। কথা বলার ভঙ্গিতে শহুরে স্বচ্ছন্দ্য, কিন্তু অহংকার নেই।
অয়ন বলল,
“হ্যাঁ, মনে হয়।”
মেয়েটি বোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার নাম আছে?”
“হ্যাঁ।”
“কোনটা?”
অয়ন একটু থামল।
“অয়ন সেন।”
মেয়েটি তালিকায় নাম খুঁজে পেল।
“এই তো। আমারও আছে। রিয়া মুখার্জি।”
সে নিজের নাম দেখিয়ে হাসল।
“মানে আমরা classmate.”
অয়ন ভদ্রভাবে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
রিয়া কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তুমি খুব serious?”
অয়ন একটু অবাক।
“মানে?”
“এই প্রথম দেখা, আর তুমি এমন মুখ করে দাঁড়িয়ে আছ যেন viva দিতে এসেছ।”
অয়ন অপ্রস্তুত হয়ে হালকা হাসল।
“প্রথম দিন। তাই।”
“প্রথম দিন বলে হাসা নিষেধ?”
অয়ন এবার সত্যিই একটু হাসল।
রিয়া বলল,
“এই তো। মানুষ দেখা গেল।”
অয়ন কিছু বলল না।
কিন্তু তার মনে হঠাৎ সঙ্গীতার কথা এল।
“তুমি খুব অদ্ভুত।”
সঙ্গীতাও একদিন বলেছিল।
অয়ন চোখ সরিয়ে নিল।
রিয়া সেটা খেয়াল করল।
“কী হলো?”
“কিছু না।”
“তুমি খুব তাড়াতাড়ি কোথাও হারিয়ে যাও।”
অয়ন তাকাল।
“চেনো নাকি আমাকে?”
“না। কিন্তু চোখ দেখে বোঝা যায়।”
অয়নের বুকের ভেতর যেন সামান্য ধাক্কা লাগল।
চোখ।
আবার সেই শব্দ।
সে উত্তর দিল না।
রিয়া হাসল।
“চলো, সবাই ঢুকছে।”
Orientation খুব বড় কিছু ছিল না।
শিক্ষকরা কথা বললেন। Department-এর নিয়ম, library card, attendance, syllabus, internal exam, seminar—সব একে একে ব্যাখ্যা হলো। অয়ন মন দিয়ে শুনছিল। খাতায় লিখছিল। তার হাতের লেখা পরিষ্কার। সে সত্যিই চেষ্টা করছে।
রিয়া তার পাশে বসেছিল।
প্রথমে কাকতালীয়ভাবে। পরে সে নিজেই চেয়ার টেনে বসেছে।
“তোমার notes খুব সুন্দর,” সে ফিসফিস করে বলল।
অয়ন মাথা না তুলে বলল,
“শোনার জন্য লিখছি।”
“আমিও শুনছি। কিন্তু এত সুন্দর লিখতে পারি না।”
অয়ন কিছু বলল না।
রিয়া একটু ঝুঁকে বলল,
“তুমি কি স্কুলে topper ছিলে?”
“না।”
“মিথ্যে।”
“কেন?”
“কারণ topper-রা এমনই বলে।”
অয়ন হালকা হাসল।
“তুমি?”
“আমি topper না, smart survivor.”
“মানে?”
“যতটা পড়লে নম্বর আসে, ততটা পড়ি। বাকিটা জীবন।”
অয়ন এবার তাকাল।
রিয়া চোখ টিপল না, নাটকীয় কিছু করল না। শুধু আত্মবিশ্বাসী হাসি।
“Relax, অয়ন। College শুধু বই না।”
অয়নের ভেতরে বাবার গলা ভেসে উঠল— “ছাত্রের কাজ পড়া।”
তারপর সঙ্গীতার গলা— “পড়বে তো?”
সে খাতা বন্ধ করে বলল,
“বই ছাড়া মানুষ দাঁড়াতে পারে না।”
রিয়া একটু চুপ করল।
তারপর বলল,
“কিন্তু শুধু বই নিয়েও বাঁচা যায় না।”
অয়ন তার দিকে তাকাল।
কথাটা অন্য কেউ বললে হয়তো সাধারণ লাগত। কিন্তু এই লাইন তার ভেতরে কোথাও গিয়ে লাগল।
সে মনে মনে ভাবল—সঙ্গীতাও এখন লিখতে শুরু করেছে। তার ডায়েরি। তার নিজের জন্য বাঁচা।
শুধু বই নয়। শুধু সংসার নয়। শুধু দায়িত্ব নয়।
মানুষকে বাঁচতে আরও কিছু লাগে।
---
Orientation শেষে সবাই বাইরে বেরোল।
কেউ canteen-এ যাচ্ছে, কেউ library খুঁজছে, কেউ seniors-এর সঙ্গে কথা বলছে। ক্যাম্পাসে দুপুরের আলো নরম হয়ে এসেছে।
রিয়া বলল,
“চলো canteen-এ। First day tea compulsory.”
অয়ন বলল,
“আমার টিফিন আছে।”
“ওহ! খুব disciplined.”
“না। বাড়ি থেকে দিয়েছে।”
“কে? মা?”
প্রশ্নটা সাধারণ।
কিন্তু অয়ন থেমে গেল।
মা নয়।
কী বলবে?
বৌদি? দাদার স্ত্রী? সঙ্গীতা?
সে বলল,
“বাড়ির মানুষ।”
রিয়া খেয়াল করল, অয়ন উত্তরটা সাবধানে দিল।
“বাড়ির মানুষ মানে?”
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
“যে খেতে ভুলতে দেয় না।”
রিয়া কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
“Lucky তুমি।”
অয়ন মনে মনে বলল— হ্যাঁ, lucky. আর সেই lucky-ই বিপদ।
সে বলল,
“চলো। চা খেতে পারি।”
“টিফিন?”
“খাব।”
“Canteen-এ বসে খাও। আমি judge করব না।”
অয়ন হেসে ফেলল।
রিয়া যেন সেই হাসিটা দেখে একটু বেশি সময় তাকিয়ে রইল।
“তুমি হাসলে অন্যরকম লাগো।”
অয়ন অপ্রস্তুত হলো।
“মানে?”
“মানে এতক্ষণ যে serious literature hero mood ছিল, সেটা ভাঙে।”
“আমি literature hero নই।”
“দেখা যাবে।”
অয়ন আর উত্তর দিল না।
ক্যান্টিনে ভিড় ছিল।
চায়ের কাপ, সিঙাড়া, টেবিলে হাত ঠুকে তর্ক, হাসি, চেঁচামেচি—সব মিলে এক জীবন্ত বিশৃঙ্খলা। অয়ন প্রথমে একটু অস্বস্তি পেল। এত মানুষ, এত শব্দ—তার অভ্যস্ত নয়।
রিয়া বলল,
“চিন্তা করো না। প্রথমে সবাই ভয় পায়। পরে এটাই ঘর লাগে।”
ঘর।
শব্দটা আবার আঘাত করল।
অয়ন জানালার পাশে একটা টেবিলে বসে টিফিন খুলল। ভেতরে লুচি নয়, পরোটা নয়—হালকা ভাতের মতো নরম পোলাও, সামান্য আলুভাজা, আর ছোট্ট ডিমের টুকরো। খুব যত্ন করে রাখা।
রিয়া তাকিয়ে বলল,
“বাহ। তোমার বাড়ির মানুষ সত্যিই serious.”
অয়ন টিফিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সঙ্গীতার হাতের গন্ধ যেন উঠল।
তার মনে হলো, যাদবপুরের এত ভিড়ের মাঝেও সে যেন বেহালার রান্নাঘরে ফিরে গেছে।
রিয়া বলল,
“খাচ্ছ না কেন?”
অয়ন চমকে উঠল।
“হ্যাঁ, খাচ্ছি।”
সে খেতে শুরু করল।
রিয়া নিজের চা নিয়ে বসে ছিল। মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাচ্ছিল।
“তুমি কোথা থেকে?” রিয়া জিজ্ঞেস করল।
“বর্ধমান।”
“ওহ। আমি কলকাতারই। গড়িয়া।”
“হুম।”
“তুমি খুব কম কথা বলো।”
“সবাই বলে।”
“কে কে?”
অয়ন হাসল না এবার।
“অনেকেই।”
“তোমার girlfriend আছে?”
প্রশ্নটা এত হঠাৎ এল যে অয়ন কাশল।
রিয়া হেসে ফেলল।
“Sorry. First day-তেই too personal?”
অয়ন জল খেল।
“হ্যাঁ, একটু।”
“উত্তর না দিলেও চলবে।”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“না।”
রিয়া কৌতূহলী চোখে তাকাল।
“না মানে নেই?”
“না মানে এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।”
রিয়া হাসল না এবার।
সে একটু মন দিয়ে তাকাল।
“তুমি complicated?”
অয়ন খুব আস্তে বলল,
“হতে চাই না।”
“কিন্তু?”
“কিছু মানুষ নিজের ইচ্ছে ছাড়াই complicated হয়ে যায়।”
রিয়া চুপ করে গেল।
তারপর বলল,
“Interesting.”
অয়ন বলল,
“আমি interesting নই।”
“এই কথাটাই interesting.”
অয়ন টিফিন বন্ধ করল।
“তুমি সবকিছু নিয়ে এত কথা বলো?”
“হ্যাঁ। মানুষ না বললে বোঝা যায় না।”
অয়ন মনে মনে বলল— সব মানুষ না বললেও বোঝা যায়। সঙ্গীতার মতো মানুষ তো না বলেই অনেক কিছু বলে।
রিয়া বলল,
“কাল library card-এর জন্য যাবি?”
“হ্যাঁ।”
“একসঙ্গে যাবি?”
অয়ন থামল।
প্রথম দিন। নতুন classmate. সাধারণ প্রস্তাব। তাতে কোনো ভুল নেই।
তবু তার মনে হলো, যেন সে কোনো অদৃশ্য সীমার সামনে দাঁড়িয়ে।
সে বলল,
“দেখা যাবে।”
রিয়া মাথা কাত করল।
“এত সাবধান কেন?”
অয়ন সরাসরি তাকাল।
“শিখেছি।”
“কার কাছ থেকে?”
অয়ন উত্তর দিল না।
রিয়া হাসল।
“ঠিক আছে। একদিন বলবে।”
অয়ন মনে মনে বলল— না, সব কথা বলা যায় না।
বিকেল নাগাদ campus থেকে বেরোতে বেরোতে অয়নের মাথা ভরে গেছে।
নতুন class, নতুন নাম, নতুন মুখ, রিয়ার কথা, teachers, syllabus, library, canteen—সব মিলিয়ে দিনটা সত্যিই বড় ছিল।
তবু আশ্চর্য, এত নতুনের মাঝেও সঙ্গীতা পুরো দিন কোথাও যায়নি।
সে ছিল।
টিফিনে। কাগজে। চোখে। প্রশ্নের উত্তরে। চুপ থাকার মধ্যে।
বাসে ফেরার সময় অয়ন জানালার পাশে বসে ছিল। শহর পিছিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় আলো জ্বলছিল একে একে। তার phone-এ নতুন class group তৈরি হয়েছে। সবাই message দিচ্ছে।
রিয়া লিখেছে—
“Reached?”
অয়ন একটু তাকিয়ে রইল।
উত্তর দেবে?
না দিলে rude হবে।
সে লিখল—
“এখনও পথে।”
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে reply করল—
“First day survived. Tomorrow library mission?”
অয়ন কিছুক্ষণ ভেবে লিখল—
“দেখা যাবে।”
রিয়া লিখল—
“তুমি সবকিছুর উত্তর ‘দেখা যাবে’ দাও?”
অয়ন অল্প হাসল।
লিখল—
“না। কিছু জিনিসের উত্তর দিই না।”
রিয়া reply করল—
“Challenge accepted.”
অয়ন আর উত্তর দিল না।
সে phone বন্ধ করে ব্যাগে রাখল।
কেন যেন মনে হলো, নতুন জীবনের দরজা খুলেছে। কিন্তু সেই দরজার ওপাশেও সঙ্গীতার ছায়া দাঁড়িয়ে।
বাড়ি ফিরতেই দরজা খুলল সঙ্গীতা।
তার মুখে স্বাভাবিকতা। কিন্তু চোখে অপেক্ষা লুকোনো যায়নি।
“এসেছ?”
“হ্যাঁ।”
“খেয়েছিলে?”
অয়ন ব্যাগ নামাল।
“টিফিন খেয়েছি।”
সঙ্গীতার মুখে খুব সামান্য স্বস্তি এল।
“সব?”
“সব।”
“মিথ্যে বলছ না তো?”
অয়ন মৃদু হাসল।
“টিফিন বক্স দেখাতে পারি।”
সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে বলল,
“দরকার নেই। বিশ্বাস করলাম।”
এই “বিশ্বাস করলাম” শুনে অয়নের বুক কেঁপে উঠল।
পর্ব ১৯-এর দূরত্ব এখনও আছে। কিন্তু দূরত্বের ভেতরেও বিশ্বাস থাকে।
সঙ্গীতা বলল,
“দিন কেমন গেল?”
অয়ন বলল,
“ভালো।”
“শুধু ভালো?”
“বড়।”
“মানে?”
“অনেক মানুষ। অনেক শব্দ। অনেক নতুন জিনিস।”
সঙ্গীতা ধীরে হাসল।
“ভয় পেয়েছিলে?”
“প্রথমে।”
“তারপর?”
“তারপর মনে হলো, এটাই দরকার ছিল।”
সঙ্গীতা মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ। তোমার দরকার।”
অয়ন তার দিকে তাকাল।
“তুমি এত নিশ্চিত?”
সঙ্গীতা চোখ সরিয়ে বলল,
“যে মানুষ দাঁড়াতে চায়, তার ভিড়ের মধ্যে হাঁটা শেখা দরকার।”
অয়ন চুপ করে গেল।
এই নারী নিজে এক ঘরের ভেতর আটকে থেকেও তাকে ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে বলছে।
এটাই ভালোবাসা কি না, সে জানে না।
তবে খুব গভীর কিছু।
রাতে সূর্য দেরি করে ফিরল।
খাবার টেবিলে সে অয়নের campus-এর গল্প শুনল খানিকটা। practical প্রশ্ন করল—class কতক্ষণ, teachers কেমন, syllabus, library, attendance.
“বন্ধু-টন্ধু হলো?” সূর্য জিজ্ঞেস করল।
অয়ন বলল,
“কিছুজনের সঙ্গে কথা হয়েছে।”
সূর্য বলল,
“ভালো। কিন্তু বেশি ঘোরাঘুরি না।”
সঙ্গীতা ভাত দিচ্ছিল। সে খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
“প্রথম দিন বন্ধুত্ব হওয়া স্বাভাবিক।”
সূর্য তাকাল।
“আমি কি বললাম অস্বাভাবিক?”
“না।”
“আমি শুধু বলছি, পড়াশোনা যেন নষ্ট না হয়।”
অয়ন বলল,
“হবে না।”
সূর্য বলল,
“মেয়েদের সঙ্গে বেশি mix করিস না। পরে ঝামেলা।”
কথাটা অয়নকে অস্বস্তিতে ফেলল।
সঙ্গীতার হাত থেমে গেল।
রিয়া। নতুন classmate. সাধারণ আলাপ।
কিন্তু এই কথার সঙ্গে যেন বাতাসে অন্য কিছু এসে মিশল।
অয়ন শান্ত গলায় বলল,
“সবাই classmate.”
সূর্য হাসল।
“হ্যাঁ, শুরুতে সবাই classmate-ই থাকে।”
সঙ্গীতা কোনো কথা বলল না।
অয়নও না।
কিন্তু এই ছোট্ট কথোপকথন রাতের খাবারের ওপর অদ্ভুত ছায়া ফেলল।
খাওয়ার পর অয়ন নিজের ঘরে গেল।
সঙ্গীতা রান্নাঘরে বাসন ধুচ্ছিল। তার মন অদ্ভুত।
আজ সে অয়নের মুখে campus-এর আলো দেখেছে। নতুন জীবনের উত্তেজনা দেখেছে। সেটা দেখে তার ভালো লাগার কথা। লেগেছেও।
তবু কোথাও একটা খালি ব্যথা।
যাদবপুর মানে অয়নের নতুন পৃথিবী।
সেই পৃথিবীতে সে নেই।
সেখানে অয়নের পাশে থাকবে নতুন মানুষ। নতুন বন্ধুরা। হয়তো নতুন মেয়েরাও। তার বয়সী, তার মতো পড়াশোনা করা, হাসিখুশি, স্বাধীন।
সঙ্গীতা নিজের হাতের দিকে তাকাল—বাসনের ফেনা, আঙুলে জলের দাগ, শাড়ির আঁচলে ভেজা ছাপ।
তার মনে হলো, সে যেন অন্য যুগের মানুষ।
অয়নের জীবনের সঙ্গে তার মিল কোথায়?
সে কি অয়নের জীবনের একটা ভুল বাঁক?
নাকি অয়ন একদিন এই নতুন ভিড়ের মধ্যে ঢুকে বুঝবে—সঙ্গীতা শুধু একা ঘরের আবেগ ছিল?
এই চিন্তাতেই তার বুকের ভেতর কেমন ব্যথা হলো।
সে নিজেকে ধমকাল—
“ভালোই তো। এটাই হওয়া উচিত। ওর বয়সী মানুষের সঙ্গে ওর জীবন হোক।”
কিন্তু এই “উচিত” শব্দটা যতবার আসে, মন ততবার বিদ্রোহ করে।
রাত সাড়ে দশটার দিকে অয়ন দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল।
সঙ্গীতা তখন রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে বেরোচ্ছে।
“একটা কথা বলব?”
সঙ্গীতা থামল।
“দূরত্বের নিয়ম ভাঙবে?”
অয়ন একটু চুপ করে বলল,
“নিয়ম মেনে বলব।”
সঙ্গীতা তাকাল।
“বল।”
অয়ন ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করল।
“ধন্যবাদ।”
সঙ্গীতা বলল,
“আবার formal?”
“না। আজ দরকার ছিল।”
“কেন?”
“আজ campus-এর ভিড়ে এটা খুলে মনে হয়েছিল, আমি একা যাইনি।”
সঙ্গীতার বুক কেঁপে উঠল।
সে টিফিন বক্সটা নিল।
“টিফিনে মানুষ যায়?”
“যার হাতের গন্ধ থাকে, সে যায়।”
সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে ফেলল।
“অয়ন…”
“আমি জানি। এক পা না।”
অয়ন দ্রুত বলল। যেন নিজেকে থামাচ্ছে।
“তাই শুধু টিফিন ফেরত দিলাম।”
সঙ্গীতা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কী আশ্চর্য—এই ছেলেটা তার নিজের কথা এত গুরুত্ব দিয়ে মানে যে, সেই মানাটাই তাকে আরও অস্থির করে দেয়।
সে খুব আস্তে বলল,
“Campus-এ ভালো লাগল?”
“হ্যাঁ।”
“ভালো।”
“তুমি সত্যি খুশি?”
সঙ্গীতা একটু থামল।
“হ্যাঁ।”
“পুরো?”
এই প্রশ্নে সে কেঁপে উঠল।
“সব কথা জিজ্ঞেস করতে নেই।”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
সে চলে যেতে যাচ্ছিল।
সঙ্গীতা হঠাৎ বলল,
“নতুন বন্ধু হলো?”
অয়ন থামল।
“হ্যাঁ। কিছুজন।”
“মেয়েও?”
প্রশ্নটা বেরিয়ে গেল।
বলেই সঙ্গীতা নিজের মুখ শক্ত করল।
অয়ন তার দিকে তাকাল।
প্রশ্নটা সাধারণ হতে পারত। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো প্রশ্ন আর শুধু সাধারণ থাকে না।
“হ্যাঁ,” অয়ন বলল। “Classmate.”
সঙ্গীতা মাথা নাড়ল।
“ভালো।”
অয়ন বলল,
“তুমি এটা শুনে কষ্ট পেলে?”
সঙ্গীতা দ্রুত বলল,
“না।”
অয়ন চুপ করে তাকিয়ে রইল।
সঙ্গীতা চোখ সরিয়ে বলল,
“তোমার বয়সী মানুষদের সঙ্গে মিশবে। এটাই স্বাভাবিক।”
“স্বাভাবিক সবসময় সহজ?”
সঙ্গীতা বলল না কিছু।
অয়ন আর এগোল না।
“আমি ঘরে যাচ্ছি,” সে বলল।
“হ্যাঁ।”
অয়ন চলে গেল।
সঙ্গীতা টিফিন বক্স হাতে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বুকের মধ্যে অদ্ভুত অস্বস্তি।
সে নিজেকে বলল— “এটা ভালো। এটা ঠিক। এটা ওর জীবন।”
তবু হাতের টিফিন বক্সটা আজ অকারণে ভারী লাগছিল।
অয়ন ঘরে ফিরে phone দেখল।
Class group-এ অনেক message.
তার মধ্যে রিয়ার ব্যক্তিগত message—
“কাল library-এর সামনে ১১টায় থাকব। তুমি এলে ভালো লাগবে। আর হ্যাঁ, আজ তোমার সঙ্গে কথা বলে ভালো লেগেছে।”
অয়ন message-টার দিকে তাকিয়ে রইল।
ভদ্র, সাধারণ, বন্ধুসুলভ।
তবু এর ভেতরে একটা আগ্রহ আছে, সেটা বোঝা যায়।
সে উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে।
তার মনে পড়ল সঙ্গীতার প্রশ্ন—
“মেয়েও?”
তারপর নিজের উত্তর—
“Classmate.”
সে phone রেখে দিল।
অন্যদিকে রান্নাঘরে সঙ্গীতা টিফিন বক্স ধুচ্ছিল।
ঠিক তখন অয়নের phone আবার টেবিলে কেঁপে উঠল। দরজা আধখোলা ছিল। আলো জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে শুধু নামটা দেখা গেল—
**Riya**
সঙ্গীতা করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল।
তার চোখ অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ক্রিনে পড়ল।
Riya.
একটা ছোট্ট নাম।
একটা নতুন পৃথিবী।
একটা সম্ভাব্য দূরত্ব।
তার হাতের টিফিন বক্সের ঢাকনা ধাতব শব্দ করে মেঝেতে পড়ে গেল।
অয়ন ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
“কী হলো?”
সঙ্গীতা দ্রুত ঢাকনাটা তুলল।
“কিছু না।”
“হাত কেটেছে?”
“না।”
“নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
অয়ন তার চোখের দিকে তাকাল।
সঙ্গীতা চোখ সরিয়ে নিল।
“ঘুমাও। কাল তোমার library আছে।”
অয়ন থেমে গেল।
সে বুঝল—সঙ্গীতা নামটা দেখেছে।
কিন্তু কিছু বলল না।
কারণ সে কথা দিয়েছে—এক পা নয়।
তবু এই নীরবতার মধ্যে এক নতুন শব্দ জন্ম নিল।
রিয়া।
রাতের শেষে অয়ন খাতা খুলে লিখল—
“আজ নতুন জীবন শুরু হলো। নতুন মুখ, নতুন ক্লাস, নতুন বন্ধুত্ব। তবু ভিড়ের মাঝেও যে মুখ বারবার ফিরে আসে, তাকে কি দূরত্ব দিয়ে সরানো যায়?”
সে কলম থামাল।
তারপর লিখল—
“রিয়া ভালো। সহজ। আমার বয়সী। আমার পৃথিবীর অংশ হতে পারে। সঙ্গীতা অসম্ভব। কঠিন। বিপজ্জনক। তবু আমার ভেতর সবচেয়ে নীরব জায়গাটায় সে-ই আছে।”
অন্যদিকে সঙ্গীতা ডায়েরি খুলল।
অনেকক্ষণ কিছু লিখল না।
তারপর লিখল—
“আজ তার নতুন পৃথিবীর দরজা খুলল। আমি খুশি। হওয়া উচিত। তবু একটি নাম স্ক্রিনে জ্বলতেই কেন আমার বুকের ভেতর শব্দ হলো?”
সে থামল।
তারপর আরও লিখল—
“আমি তাকে এক পা এগোতে মানা করেছি। কিন্তু যদি অন্য কেউ তার পাশে হাঁটতে শুরু করে?”
কলম থেমে গেল।
এই প্রশ্নের উত্তর সে লিখল না।
কারণ উত্তর লিখলে সে নিজের মুখোমুখি হয়ে যাবে।
ভোরের আগে বাড়ি নিস্তব্ধ।
যাদবপুরের নতুন দিন অপেক্ষা করছে। রিয়া অপেক্ষা করছে library-এর সামনে। অয়ন নিজের routine-এর পাশে নতুন একটি অনিশ্চয়তা নিয়ে ঘুমোতে গেল। সঙ্গীতা ডায়েরি বালিশের নিচে রেখে চোখ বন্ধ করল।
দূরত্বের নিয়ম ছিল—অয়ন এক পা এগোবে না।
কিন্তু জীবন সবসময় নিয়ম মেনে চলে না।
কখনো কখনো তৃতীয় কারও আগমনই দুজন মানুষের লুকোনো সত্যিকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়।
আর সেই আয়নায় সেদিন প্রথমবার সঙ্গীতা নিজের চোখে দেখল—
ভালোবাসাকে অস্বীকার করা যায়।
কিন্তু ঈর্ষাকে?
খুব কঠিন। চলবে আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: Ko-fi) ব্যবহার করে সাপোর্ট নেওয়া বা দেওয়া বেশ জটিল। তবুও অনেক পাঠক বন্ধু আমাকে আর্থিকভাবে কিছুটা সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যাতে আমি লেখালেখির এই যাত্রাটি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সচল রাখতে পারি।আপনারা যারা স্বেচ্ছায় আমাকে কিছুটা সাপোর্ট করতে চান বা 'কফি ট্রিট' দিতে চান, তারা আমার টেলিগ্রামে (Telegram) একটি মেসেজ দিতে পারেন। সেখানে আমি আমার বিকাশ বা নগদ নম্বরটি শেয়ার করব। আমার টেলিগ্রাম আইডি: @sexstorylover24 একটি বিষয় নিশ্চিত করছি: এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে কোনো প্রকার জোর করা হচ্ছে না। গল্প আগের মতোই নিয়মিত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আপনাদের এই ছোট ছোট ভালোবাসা আমাকে আগামীর পর্বগুলো আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। যদি কোনো মতামত থাকে জানাতে ভুলবেন না। আমাকে ইমেইল করতে পারেন [email protected] অথবা টেলিগ্রাম এ এসএমএস দিতে পারেন @sexstorylover24 এই নামে। আপনাদের এসএমএস এ আমি উৎসাহ পাই। তাই আমাকে বেশি বেশি করে উৎসাহ দিবেন এই আশা করি।