সকালে সঙ্গীতা ঘুম থেকে উঠল খুব ভারী মাথা নিয়ে। রাতের শেষ প্রহরে কখন ঘুম এসেছে, সে জানে না। শুধু মনে আছে, বারান্দার আধো অন্ধকার, হাতে অয়নের দেওয়া কবিতার বই, আর সেই কথাটা— “আজ ডাকলে আমি হয়তো থামাতে পারব না।” কথাটা বলার পর নিজের কাছেই যেন অপরিচিত লেগেছিল তাকে। সে কি সত্যিই এটা বলেছিল? সে কি সত্যিই অয়নের সামনে এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল? সঙ্গীতা বিছানায় উঠে বসে কিছুক্ষণ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তর্জনীতে ছোট্ট ব্যান্ডেজ। গোলাপের কাঁটা। অয়নের আঙুল। তার ফুঁ দেওয়া। তারপর কবিতার বই। সবকিছু এত ছোট, এত সামান্য—তবু কেন এত বড় হয়ে উঠছে? ঘরের অন্য পাশে সূর্য তখনও ঘুমোচ্ছে। রাত অনেক দেরিতে ফিরেছিল। ফিরেই ক্লান্ত মুখে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো কথা নেই। শুধু শরীরের উপস্থিতি আছে, মানুষের উপস্থিতি নেই। সঙ্গীতা বিছানা থেকে নামল। আজ তাকে খুব স্বাভাবিক থাকতে হবে। গতকাল সকালে সে অয়নকে বলেছিল—“বৌদি বলো।” রাতে সে নিজেই বলেছে—“আজ নাম ধরে ডাকবে না।” কিন্তু এইভাবে কতদিন? দূরত্ব মুখে বললেই কি তৈরি হয়? যে মানুষ মনের ভেতরে ঢুকে যায়, তাকে ঘরের অন্য পাশে দাঁড় করিয়ে রাখলে কি সত্যিই দূরত্ব হয়? সঙ্গীতা জানে না। কিন্তু একটা জিনিস জানে—অয়নকে সে বিপদে ফেলতে পারে না। অয়ন উনিশ বছরের ছেলে। সামনে পুরো জীবন। পড়াশোনা, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, নিজের পরিচয়। আর সে? সে বিবাহিত নারী। অন্য একজনের স্ত্রী। ভাঙা সংসারের মধ্যে আটকে থাকা এক মানুষ। তার ভাঙা জীবনের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে অয়নের জীবন ভেঙে যাক—এটা সে হতে দিতে পারে না। সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল। আজ একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে নিজের বুকই আগে কেটে যাবে।
রান্নাঘরে চা বসাতে বসাতে সে অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল। এই শান্তি সত্যিকারের নয়। এই শান্তি যুদ্ধের আগে সৈনিকের মুখের মতো। ভেতরে ভয় আছে, কাঁপুনি আছে, কিন্তু বাইরে কণ্ঠ স্থির রাখতে হয়। অয়ন আজ দরজার কাছে এল না। সঙ্গীতা বুঝল, সেও হয়তো গত রাতের পর নিজেকে সামলাতে চাইছে। অথবা সে আহত। অথবা দুটোই। সে চায়ের কাপ ট্রেতে রাখল। অয়নের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “চা রেখে যাচ্ছি।” ভেতর থেকে অয়নের গলা এল, “ভিতরে আসবে না?” সঙ্গীতা থেমে গেল। এই ছোট্ট প্রশ্নেই কত দরজা খুলে যায়। সে বলল, “তুমি পড়ো। আমার কাজ আছে।” অয়ন দরজা খুলে দাঁড়াল। চোখে ঘুমের ছাপ নেই। বরং রাত জাগার দাগ আছে। সে সঙ্গীতার মুখের দিকে তাকাল, যেন জানতে চাইছে—গত রাত সত্যিই ঘটেছিল তো? সঙ্গীতা চোখ সরিয়ে কাপটা টেবিলে রাখতে গেল। অয়ন ধীরে বলল, “হাতটা কেমন?” সঙ্গীতা নিজের ব্যান্ডেজ করা আঙুলের দিকে তাকাল। “ভালো।” “ওষুধ লাগিয়েছ?” “সকালে লাগাব।” “আমি লাগিয়ে দিই?” সঙ্গীতার বুক কেঁপে উঠল। “না। দরকার নেই।” “দরকার নেই—না, তুমি চাইছ না?” সঙ্গীতা এবার তাকাল। অয়নের গলায় অভিযোগ নেই। আছে কষ্ট। সে খুব শান্তভাবে বলল, “সবসময় চাইলে সব করা যায় না, অয়ন।” অয়ন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। “তাহলে না চাইলেও কি সব দূরে সরানো যায়?” সঙ্গীতা উত্তর দিল না। সে ট্রে হাতে ঘুরে দাঁড়াল। দরজার বাইরে এসে থামল এক মুহূর্ত। মনে হলো, ফিরে গিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে—“আমি দূরে সরাচ্ছি না, বাঁচাচ্ছি।” কিন্তু সে কিছু বলল না। কারণ কিছু কথা বললে মানুষ আরও কাছে চলে আসে। আর আজ তার কাজই হলো দূরত্ব বানানো।
দুপুরে সূর্য ঘুম থেকে দেরিতে উঠল। রবিবার বলে অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই। কিন্তু তার হাতে ফোন আছে, চোখে অস্থিরতা। মাঝে মাঝে বারান্দায় গিয়ে কথা বলছে, আবার ফিরে এসে বলছে—“অফিসের call।” সঙ্গীতা কোনো প্রশ্ন করল না। অয়ন টেবিলে বসে বই খুলে রেখেছে। কিন্তু পড়ছে না। সূর্য সেটা দেখে বলল, “কী রে, পড়াশোনা হচ্ছে তো?” অয়ন মাথা তুলল। “হ্যাঁ দাদা।” সূর্য চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, “শুধু বই কিনলেই হবে না কিন্তু। serious হতে হবে। Kolkata distraction-এর জায়গা। বুঝলি?” অয়ন শান্ত গলায় বলল, “বুঝেছি।” সূর্য এবার সঙ্গীতার দিকে তাকাল। “শোনো, একটা কথা ভাবছিলাম।” সঙ্গীতা থামল। “কী?” “অয়নের coaching শুরু হলে তো ওকে রোজ যাতায়াত করতে হবে। আমাদের এখান থেকে সব জায়গা সুবিধে হবে কি না জানি না। হয়তো ভালো কোনো PG বা hostel দেখলে খারাপ হয় না।” অয়নের হাত বইয়ের ওপর থেমে গেল। সঙ্গীতার বুকের ভেতর যেন কেউ ধাক্কা দিল। কথাটা সে আশা করেনি। তবু অদ্ভুতভাবে মনে হলো—এই তো সুযোগ। যে দূরত্ব সে নিজে তৈরি করতে পারছিল না, সূর্য অজান্তেই তার দরজা খুলে দিল। সূর্য বলল, “মানে, ও এখন বড় হচ্ছে। নিজের মতো থাকলে discipline হবে। আর এখানে তো সঙ্গীতারও ঝামেলা বাড়ছে। খাওয়া, কাপড়, সব দেখাশোনা।” অয়ন চুপ। সঙ্গীতা চুপ। কয়েক মুহূর্ত পর সঙ্গীতা খুব ধীরে বলল, “হ্যাঁ। ভাবা যেতে পারে।” অয়ন মুখ তুলল। তার চোখে অবিশ্বাস। “তুমি সত্যিই তাই ভাবছ?” প্রশ্নটা সরাসরি সঙ্গীতার দিকে। সূর্য হেসে বলল, “ওরে, এত অবাক হচ্ছিস কেন? তোর ভালোর জন্যই বলছি।” অয়ন সূর্যের দিকে তাকাল না। তার চোখ সঙ্গীতার মুখে আটকে। সঙ্গীতা চোখ সরিয়ে নিল। “পড়াশোনার সুবিধে হলে বাইরে থাকা খারাপ না।” কথাটা বলতেই তার নিজের গলা যেন শুকিয়ে গেল। অয়ন আস্তে বলল, “তোমার সুবিধে হবে?” এইবার সূর্য একটু বিরক্ত হলো। “এত emotional প্রশ্ন করার কী আছে? practical হতে শিখ। সবসময় কারও ওপর নির্ভর করলে চলবে না।” অয়ন চুপ করে গেল। সঙ্গীতা টের পেল, কথাটা অয়নের গায়ে নয়, তার নিজের বুকেই এসে লাগছে। সে শুধু বলল, “চা দেব?” সূর্য বলল, “দাও।” অয়ন বলল না কিছু। সেই না-বলা কথার শব্দ ঘর ভরিয়ে দিল।
বিকেলটা অস্বস্তিতে কাটল। সূর্য বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা বলে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে বলল, “PG-এর ব্যাপারটা দেখে নিও। অয়নের বাবার সঙ্গেও কথা বলতে হবে।” দরজা বন্ধ হতেই সঙ্গীতা যেন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অয়ন নিজের ঘর থেকে বেরোল না। সঙ্গীতা রান্নাঘরে গেল, কাপড় গুছাল, টেবিল মুছল—অকারণ কাজ করতে লাগল। কাজ করলে মানুষ নিজের ভিতরের শব্দ কম শুনতে পায়। কিন্তু আজ কোনো কাজই তাকে বাঁচাতে পারছিল না। শেষে সে অয়নের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা আধখোলা। অয়ন টেবিলে বসে আছে। বই খোলা, কিন্তু চোখ পৃষ্ঠায় নেই। সঙ্গীতা নরম গলায় বলল, “অয়ন।” অয়ন তাকাল না। “হুঁ।” “রাগ করেছ?” অয়ন হেসে ফেলল খুব সামান্য। সেই হাসিতে আনন্দ নেই। “রাগ করার অধিকার আছে?” সঙ্গীতা চুপ। অয়ন এবার তাকাল। “তুমি চাও আমি চলে যাই?” সঙ্গীতার বুকের ভেতর ব্যথা উঠল। “আমি চাই তুমি পড়াশোনায় মন দাও।” “ওটা উত্তর না।” “উত্তর সবসময় সহজ হয় না।” “তাহলে কঠিন উত্তর দাও।” সঙ্গীতা ঘরে ঢুকল না। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। যেন ঘরে ঢুকলেই দূরত্ব ভেঙে যাবে। “তোমার সামনে বড় জীবন পড়ে আছে, অয়ন।” অয়ন ধীরে উঠে দাঁড়াল। “এই কথাটা শুনলেই বুঝি মানুষ দূরে যায়?” “সবসময় না। কিন্তু কখনো কখনো যেতে হয়।” “কার জন্য?” “নিজের জন্য।” “না। তুমি নিজের জন্য বলছ না।” সঙ্গীতা তাকাল। অয়ন এক পা এগিয়ে এল। “তুমি আমার জন্য বলছ।” সঙ্গীতার চোখ কেঁপে উঠল। অয়ন আরও বলল, “তুমি ভাবছ, আমি এখানে থাকলে আমার ক্ষতি হবে।” সঙ্গীতা উত্তর দিল না। অয়ন বলল, “তুমি ভাবছ, তোমার জীবনের দুঃখের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আমি আমার ভবিষ্যৎ নষ্ট করব।” সঙ্গীতার চোখ ভিজে উঠল। সে খুব নিচু গলায় বলল, “আমি চাই না তোমার জীবন আমার জন্য কঠিন হয়ে যাক।” অয়নের মুখ নরম হয়ে এল। তবু ব্যথা রইল। “আর তুমি ভেবেছ, দূরে পাঠালে সহজ হবে?” “হয়তো।” “তোমার?” সঙ্গীতা চুপ। “আমার?” চুপ। অয়ন বলল, “দূরত্ব সবসময় মানুষকে বাঁচায় না, সঙ্গীতা। কখনো কখনো অর্ধেক মেরে রাখে।” সঙ্গীতা কেঁপে উঠল। আবার নাম। সে ধীরে বলল, “নাম ধরে ডাকো না।” অয়ন বলল, “তুমি চাইলে ডাকব না। কিন্তু না ডাকলেই কি নাম মুছে যাবে?” সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। “তুমি বুঝছ না।” “বুঝছি।” “না, বুঝছ না। তুমি শুধু অনুভূতি বুঝছ। আমি ভয় বুঝছি। সমাজ বুঝছি। সম্পর্কের নাম বুঝছি। তোমার বয়স বুঝছি। তোমার ভবিষ্যৎ বুঝছি।” অয়ন স্থির গলায় বলল, “তুমি আমার অনুভূতিকে বয়স দিয়ে মাপছ।” সঙ্গীতার চোখে জল চলে এল। “কারণ তোমার বয়স কম।” অয়ন থেমে গেল। সঙ্গীতা এবার সেই কথাটা বলল, যা এতদিন বুকের ভেতর ঘুরছিল। “তুমি অনেক ছোট, অয়ন।” ঘর নিঃশব্দ। বাইরে পাখির ডাকও যেন থেমে গেল। অয়ন ধীরে বলল, “তাই?” সঙ্গীতা কষ্ট করে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। তুমি অনেক ছোট। তোমার সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে। তুমি পড়বে, বড় হবে, চাকরি করবে, নিজের মতো কাউকে ভালোবাসবে, সংসার করবে। আর আমি…” তার গলা আটকে গেল। “আমি কারও স্ত্রী।” অয়ন চোখ নামাল না। “কারও স্ত্রী হলেই কি নিজের মন থাকে না?” “থাকে। কিন্তু সব মনকে জায়গা দেওয়া যায় না।” “আর ভালোবাসা?” সঙ্গীতা যেন শব্দটা শুনে শিউরে উঠল। “ও শব্দটা ব্যবহার কোরো না।” “কেন?” “কারণ সেটা বললে সবকিছু আরও সত্যি হয়ে যাবে।” অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “মিথ্যে বললে কি অসত্য হয়ে যাবে?” সঙ্গীতা উত্তর দিতে পারল না।
ঘরটা ছোট হয়ে আসছিল। দুজনের নিঃশ্বাস, না-বলা কথা, বয়সের ফারাক, সম্পর্কের নিষেধ—সব মিলে বাতাস ভারী। সঙ্গীতা দরজার কাঠে হাত রাখল। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। অয়ন খুব নরম গলায় বলল, “তুমি কি আমাকে ভয় পাও?” সঙ্গীতা বলল, “না।” “তাহলে?” সঙ্গীতা তার দিকে তাকাল। “নিজেকে।” অয়ন চুপ। সঙ্গীতা বলল, “তোমার কাছে দাঁড়ালে মনে হয়, আমি যা হতে পারিনি, তা আবার হতে পারি। যে মেয়েটা কলেজে বই কিনতে যেত, কবিতা পড়ত, বৃষ্টিতে ভিজত, নাম শুনে কেঁপে উঠত—সে মরে যায়নি। সে শুধু চাপা পড়ে আছে।” অয়নের চোখ ভিজে উঠল। “তাহলে তাকে বাঁচতে দাও।” সঙ্গীতা মৃদু হেসে ফেলল। সেই হাসিতে কান্না মেশা। “বাঁচতে দিলে কারও না কারও জীবন ভেঙে যাবে।” “এখন তো তুমি ভাঙছ।” “আমি ভাঙতে শিখে গেছি।” “আমি দেখেও চুপ থাকতে শিখিনি।” সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে বলল, “শিখে নাও।” অয়ন মাথা নাড়ল। “পারব না।” “পারতেই হবে।” “কেন?” “কারণ আমি তোমাকে আমার মতো ভাঙা দেখতে চাই না।” অয়নের গলা ভারী হয়ে উঠল। “তুমি ভাবছ, আমি তোমার পাশে দাঁড়ালে ভেঙে যাব। কিন্তু তুমি দূরে গেলে আমি যে ভাঙব, সেটা ভাবছ না।” সঙ্গীতা আর চোখের জল আটকাতে পারল না। “তুমি বুঝতে চাইছ না, অয়ন। এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।” “সব সত্যির নাম থাকে না।” “সমাজ নাম চায়।” “আমার দরকার নেই।” “তোমার আজ দরকার নেই। কাল লাগবে। যখন মানুষ প্রশ্ন করবে, যখন তোমার বাবা জানবে, যখন সূর্য জানবে, যখন সবাই বলবে তুমি ভুল করেছ—তখন?” অয়ন স্থির গলায় বলল, “ভুল করলে শাস্তি নেব।” “তুমি জানো না শাস্তি কী।” সঙ্গীতা এবার একটু কঠিন হলো। “মানুষ শুধু কথা বলে না, অয়ন। মানুষ কেটে দেয়। চরিত্র কেটে দেয়, সম্মান কেটে দেয়, ভবিষ্যৎ কেটে দেয়। একজন বিবাহিত নারীর দিকে তাকালে শুধু প্রেমের গল্প হয় না—অভিযোগ হয়, কলঙ্ক হয়, পাপ হয়।” অয়ন চুপ করে শুনল। তারপর ধীরে বলল, “তুমি কী ভাবো?” সঙ্গীতা থেমে গেল। “আমি?” “হ্যাঁ। তুমি কি আমাকে পাপ ভাবো?” প্রশ্নটা সঙ্গীতার বুক চিরে ঢুকে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, “না।” “তাহলে?” সঙ্গীতা কাঁপা গলায় বলল, “আমি তোমাকে মুক্ত রাখতে চাই।” অয়ন এক পা এগোল। “আর তুমি?” “আমি অভ্যস্ত।” “বন্দি থাকতে?” সঙ্গীতা উত্তর দিল না। অয়ন বলল, “তুমি আমাকে মুক্ত রাখতে গিয়ে নিজেকে আরও বন্দি করে দিচ্ছ।” সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল। এই ছেলেটা কেন এত কঠিন কথা বলে? কেন তার ভেতরের তালা এত সহজে খুলে ফেলে?
সন্ধ্যা নেমে এলো ধীরে ধীরে। ঘরের আলো জ্বলছে। বাইরে মেঘ জমছে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। সঙ্গীতা বলল, “আমি চা করি।” অয়ন বলল, “এখন চা দরকার নেই।” “আমার দরকার আছে।” অয়ন আর কিছু বলল না। সঙ্গীতা রান্নাঘরে গেল। চা বসাল। হাত কাঁপছিল। আজ চা বানানোও কঠিন লাগছিল। দুধ, চিনি, পাতা—সব ঠিক আছে, তবু কিছু যেন ঠিক নেই। অয়ন রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। “আমি কি সত্যিই চলে যাব?” সঙ্গীতা চামচ নাড়তে নাড়তে বলল, “হয়তো তোমার ভালো হবে।” “তুমি আমাকে যেতে বলছ?” “আমি তোমাকে বাঁচতে বলছি।” “তুমি ছাড়া?” সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল। এই কথাটা উত্তরহীন। চা ফুটে উঠছিল। সে তাড়াতাড়ি আঁচ কমাতে গেল, কিন্তু অসাবধানে গরম কাপে হাত লেগে গেল। “আহ্!” অয়ন দ্রুত এগিয়ে এল। “কী হলো?” “কিছু না।” “হাত দেখাও।” “না, ঠিক আছে।” অয়ন তার হাত ধরে ফেলল। সঙ্গীতা থেমে গেল। এই হাত—গতকাল ব্যান্ডেজ করা আঙুল, আজ গরম কাপে ছোঁয়া। যেন শরীরও বারবার অজুহাত খুঁজছে অয়নের যত্নের কাছে পৌঁছোনোর। অয়ন তার হাতের ওপর জল ঢালল। তারপর খুব ধীরে বলল, “নিজেকে এভাবে পোড়ালে কেউ বাঁচে না।” সঙ্গীতা তাকাল। “আমি নিজেকে পোড়াচ্ছি?” “হ্যাঁ।” “তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে।” “আমি আগুন নই।” সঙ্গীতা খুব আস্তে বলল, “তুমি আগুন না। কিন্তু তোমার কাছে এলে আমার ভিতরে আগুন লাগে।” কথাটা বেরিয়ে যেতেই দুজনেই স্থির। রান্নাঘরের ছোট্ট জায়গা। গরম চায়ের গন্ধ। বাইরে মেঘ। অয়নের হাতে সঙ্গীতার হাত। দুজনের চোখে এমন এক টান, যেটাকে আর পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। অয়ন হাত ছাড়ল না। আবার শক্তও করল না। শুধু নরম গলায় বলল, “তাহলে কেন পালাচ্ছ?” সঙ্গীতার চোখ ভিজে উঠল। “কারণ আগুন আলোও দেয়, পোড়ায়ও।” অয়ন বলল, “আমি তোমাকে পোড়াতে চাই না।” “কিন্তু আমি নিজেই পুড়ে যাচ্ছি।” নীরবতা। চায়ের পাতিলের শব্দ ধীরে ধীরে থেমে এল। সঙ্গীতা নিজের হাত আস্তে টেনে নিল। “চা ঠান্ডা হয়ে যাবে।” অয়ন এবার তাকে যেতে দিল।
রাতে খাওয়া হলো খুব কম কথায়। সূর্য বাড়ি ফিরল না। শুধু মেসেজ করল— “Dinner out. Don’t wait.” সঙ্গীতা মেসেজটা পড়ে ফোন নামিয়ে রাখল। অয়ন দেখল, সে আর অবাক হয় না। অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই অভ্যাসটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। খাওয়ার পর সঙ্গীতা বলল, “তোমার বাবাকে কাল ফোন করো।” অয়ন বুঝল, কথা আবার সেই জায়গায় ফিরছে। “কেন?” “PG-এর ব্যাপারে কথা বলতে।” “তুমি এখনও চাইছ?” “হ্যাঁ।” অয়ন মাথা নিচু করল। তারপর বলল, “আমি কথা বলব। কিন্তু একটা কথা আগে তুমি বলো।” “কী?” “আমি চলে গেলে তুমি ভালো থাকবে?” সঙ্গীতা সঙ্গে সঙ্গে বলল না। এই দেরিই উত্তর। অয়ন মৃদু হাসল। “দেখলে? তুমি মিথ্যে বলতে পারছ না।” সঙ্গীতা শক্ত গলায় বলল, “মানুষ ভালো না থেকেও বাঁচে।” “আমি চাই না তুমি শুধু বাঁচো।” “তোমার চাওয়া সবসময় হবে না।” “তোমার?” সঙ্গীতা চুপ। অয়ন এবার ধীরে বলল, “তুমি কী চাও?” প্রশ্নটা ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। সঙ্গীতা যেন ভয় পেল। “এ প্রশ্ন কোরো না।” “কেন?” “কারণ উত্তরটা বলা যাবে না।” “তাহলে মনে মনে বলো।” সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে রইল। তার আঙুল টেবিলের ধারে কাঁপছিল। অয়ন বুঝল—সে উত্তর জানে। শুধু উচ্চারণ করতে পারে না।
রাত অনেক পরে সঙ্গীতা বারান্দায় এল না। অয়ন অপেক্ষা করেছিল। গোলাপগাছের পাশে দাঁড়িয়ে। ফুলটা আজ পুরো ফুটেছে। বৃষ্টির গন্ধে পাপড়ি আরও গাঢ় লাল। অয়ন হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গেল না। কাঁটা আছে। আজ সে জানে—ফুলের কাছে যেতে গেলে শুধু সৌন্দর্য নয়, রক্তও আসে। এক ঘণ্টা কেটে গেল। সঙ্গীতা এল না। অয়ন নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরল। ঠিক তখনই সঙ্গীতার ঘরের দরজা খুব আস্তে খুলল। সে বেরিয়ে এল। কিন্তু বারান্দায় এল না। নিজের দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। অয়ন তাকাল। সঙ্গীতা খুব নিচু গলায় বলল, “আজ বারান্দায় দাঁড়িও না।” অয়ন বলল, “কেন?” “কারণ আমি আসতে চাইব।” অয়নের বুক ধক করে উঠল। সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে বলল, “আর আজ আমি আসলে দূরে থাকতে পারব না।” অয়ন এক পা এগোতে চাইল, কিন্তু থেমে গেল। “তাহলে?” “তাই বলছি—দাঁড়িও না।” “তুমি আমাকে দূরে পাঠাচ্ছ?” “নিজেকেও।” “সেটা কি সম্ভব?” সঙ্গীতা মাথা নাড়ল না, বললও না। শুধু বলল, “কাল তোমার বাবাকে ফোন করো।” অয়নের গলা ভারী। “আর তুমি?” “আমি অভ্যাস করব।” “কিসের?” “তোমাকে না দেখেও দিন কাটানোর।” অয়ন চোখ বন্ধ করল। “আমি পারব না।” সঙ্গীতা খুব আস্তে বলল, “পারতেই হবে।” “তুমি বললেই?” “না। সময় বলবে।” “সময় যদি না বলে?” সঙ্গীতা এবার তার দিকে তাকাল। চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে কঠিন সিদ্ধান্ত। “তাহলে সমাজ বলবে।” অয়ন বলল, “আর মন?” সঙ্গীতা উত্তর দিল না। তারপর ধীরে বলল, “ঘুমোতে যাও, অয়ন।” “সঙ্গীতা…” নামটা বেরোতেই সঙ্গীতা কেঁপে উঠল। সে চোখ বন্ধ করল। “ডেকো না।” অয়ন আরেক পা এগোয়নি। সঙ্গীতা দরজার ভেতরে ফিরে যেতে লাগল। অয়ন শেষবার বলল, “বয়স কম বলে কি অনুভূতি মিথ্যে হয়ে যায়?” সঙ্গীতা থেমে গেল। তার পিঠ অয়নের দিকে। চুল কাঁধ ছুঁয়ে আছে। হাত দরজার পাশে। প্রশ্নটা তার শরীরের ভেতর দিয়ে কাঁপন তুলে গেল। বয়স। সম্পর্ক। সমাজ। পাপ। ভবিষ্যৎ। সব শব্দ একদিকে। আর অয়নের প্রশ্ন অন্যদিকে। সঙ্গীতা খুব ধীরে ঘুরে তাকাল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল। অয়ন আবার বলল না কিছু। কারণ সে জানে—এই প্রশ্নের উত্তর সঙ্গীতা দিলে, সব বদলে যাবে। কয়েক মুহূর্ত পরে সঙ্গীতা দরজার ভেতরে চলে গেল। দরজা পুরো বন্ধ করল না। আধখোলা রইল। অয়ন বারান্দায় ফিরে গেল না। তবু তার মনে হলো, আজ দূরত্ব তৈরি হলো না। বরং দূরত্বের সিদ্ধান্তই তাদের আরও কাছাকাছি এনে ফেলল। বাইরে গোলাপের পাপড়িতে বৃষ্টির ফোঁটা জমে ছিল। ফুল ফুটেছে। কাঁটাও আছে। আর দুজন মানুষ বুঝে গেছে— কিছু অনুভূতি থেকে পালাতে গেলে, মানুষ সেই অনুভূতির কাছেই আরও বেশি ফিরে আসে।
চলবে আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: Ko-fi) ব্যবহার করে সাপোর্ট নেওয়া বা দেওয়া বেশ জটিল। তবুও অনেক পাঠক বন্ধু আমাকে আর্থিকভাবে কিছুটা সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যাতে আমি লেখালেখির এই যাত্রাটি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সচল রাখতে পারি।আপনারা যারা স্বেচ্ছায় আমাকে কিছুটা সাপোর্ট করতে চান বা 'কফি ট্রিট' দিতে চান, তারা আমার টেলিগ্রামে (Telegram) একটি মেসেজ দিতে পারেন। সেখানে আমি আমার বিকাশ বা নগদ নম্বরটি শেয়ার করব। আমার টেলিগ্রাম আইডি: @sexstorylover24 একটি বিষয় নিশ্চিত করছি: এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে কোনো প্রকার জোর করা হচ্ছে না। গল্প আগের মতোই নিয়মিত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আপনাদের এই ছোট ছোট ভালোবাসা আমাকে আগামীর পর্বগুলো আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। যদি কোনো মতামত থাকে জানাতে ভুলবেন না। আমাকে ইমেইল করতে পারেন al3807596@gmail.com অথবা টেলিগ্রাম এ এসএমএস দিতে পারেন @sexstorylover24 এই নামে। আপনাদের এসএমএস এ আমি উৎসাহ পাই। তাই আমাকে বেশি বেশি করে উৎসাহ দিবেন এই আশা করি।