চার দিন কেটে গেল। বাইরে থেকে দেখলে এই চার দিনে কিছুই বদলায়নি। সকাল হয়, সূর্য অফিসে যায়, সঙ্গীতা রান্না করে, অয়ন পড়ে, দুপুর আসে, সন্ধ্যা নামে, রাত হয়। চায়ের কাপ টেবিলে আসে, খাবার সময়মতো সাজানো থাকে, অয়নের বইগুলো ধুলো জমার আগেই কেউ না কেউ মুছে রাখে। সবকিছু আগের মতো। শুধু আগের মতো নয়—দুজন মানুষের চোখ। সঙ্গীতা এখন আর অয়নের ঘরে ঢোকে না। চা দরজার পাশে রেখে যায়। “চা রেখেছি”—এইটুকু বলে চলে যায়। অয়ন দরজা খুলে তাকে দেখার আগেই তার পায়ের শব্দ দূরে সরে যায়। দুপুরে খাবার দেয়, কিন্তু বসে না। অয়ন জিজ্ঞেস করলে বলে, “আমার কাজ আছে।” রাতে বারান্দায় আসে না। গোলাপগাছের কাছে দাঁড়ায় না। কবিতার বই কোথায় রেখেছে, অয়ন জানে না। সেই বই নিয়ে কোনো কথা হয়নি। প্রথম দিন অয়ন ভেবেছিল, হয়তো সঙ্গীতা নিজেকে সামলাতে চাইছে। দ্বিতীয় দিন বুঝল, এটা সামলানো নয়—এটা সিদ্ধান্ত। তৃতীয় দিন থেকে তার বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা ব্যথা জমতে লাগল। কারণ দূরত্ব যদি রাগ থেকে আসে, মানুষ প্রতিবাদ করতে পারে। কিন্তু দূরত্ব যদি যত্নের ভেতর লুকিয়ে থাকে, মানুষ লড়বে কীভাবে? সঙ্গীতা দূরে যাচ্ছে— তবু অয়নের চা ঠিক সময়ে আসছে। সে বেশি রাত জেগে থাকলে পরদিন সকালে কাপের পাশে ছোট্ট কাগজে লেখা থাকে— “রাতে কম জাগবে।” সে দুপুরে কম খেলে রাতে ভাতের পাশে ডিমের ঝোল থাকে। সে মাথা ধরার কথা না বললেও তার টেবিলে balm রাখা থাকে। এমন দূরত্বকে ঘৃণা করা যায় না। এমন দূরত্ব শুধু কষ্ট দেয়।
সেদিন সকালেও একইভাবে চা রেখে যাচ্ছিল সঙ্গীতা। অয়ন দরজার পাশে বসেই ছিল। সে জানত, সঙ্গীতা আসবে, কাপ রাখবে, চলে যাবে। আজ সে চুপ করে থাকতে পারল না। দরজা খুলতেই সঙ্গীতা ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে। অয়ন বলল, “ভিতরে রেখে যাও।” সঙ্গীতা এক মুহূর্ত থামল। “দরজাতেই রাখছি। তুমি নিয়ে নাও।” “চার দিন হলো তুমি ভিতরে আসছ না।” সঙ্গীতা চোখ তুলল না। “তোমার পড়াশোনার সময় নষ্ট করতে চাই না।” অয়ন ধীরে হাসল। হাসিটা খুব ক্লান্ত। “তুমি কথা না বললে আমার পড়া ভালো হয়—এটা কে বলল?” “আমি বলছি।” “তুমি ঠিক জানো?” “জানার দরকার নেই। কিছু জিনিস করা দরকার।” অয়ন দরজার সামনে দাঁড়িয়েই রইল। “কী দরকার?” সঙ্গীতা এবার তাকাল। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। মুখে শান্তি, কিন্তু সেই শান্তির নিচে চাপা কাঁপুনি। “তোমার পড়া দরকার। তোমার ভবিষ্যৎ দরকার। তোমার নিজের জীবন দরকার।” অয়ন বলল, “আর তোমার?” সঙ্গীতা উত্তর দিল না। “তোমার জীবন দরকার নেই?” সঙ্গীতা কাপটা টেবিলে রেখে বলল, “আমার জীবন নিয়ে তোমার ভাবার দরকার নেই।” “কেন?” “কারণ তুমি ভাবতে শুরু করলে নিজেকে ভুলে যাবে।” অয়ন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। “তুমি কি সত্যিই আমাকে এত দুর্বল ভাবো?” সঙ্গীতা নরম গলায় বলল, “না। তাই তো ভয় পাই।” এই কথায় অয়ন থেমে গেল। সঙ্গীতা আর দাঁড়াল না। চলে গেল। অয়ন কাপ হাতে নিল। চা গরম। ঠিক যেমন সে পছন্দ করে—চিনি কম, দুধ মাঝারি, উপরে পাতার হালকা গন্ধ। সঙ্গীতা দূরে যাচ্ছে। কিন্তু চায়ের স্বাদে তার যত্ন আগের চেয়েও কাছে। অয়ন কাপ নামিয়ে রাখল। আজ চা খেতে ইচ্ছে করছিল না।
দুপুরে সূর্য খেতে বসে casually বলল, “আমি একটা PG-এর খোঁজ পেয়েছি।” অয়নের হাত থেমে গেল। সঙ্গীতা ডাল দিতে দিতে বলল, “কোথায়?” “যাদবপুরের দিকে। coaching আর university side-এ সুবিধে হবে। আমার এক colleague বলল, ভালো জায়গা। ছেলেপুলে থাকে, খাবারও দেয়।” অয়ন ঠান্ডা গলায় বলল, “এখনই কি দরকার?” সূর্য বলল, “এখনই দরকার না, কিন্তু আগে থেকে দেখা ভালো। তোর admission, coaching, সব শুরু হলে আর সময় পাবি না।” সঙ্গীতা চুপচাপ ভাত বাড়ছিল। অয়ন তার দিকে তাকাল। “তুমি কী বলো?” সূর্য হাসল। “আবার সঙ্গীতার permission? আরে, তোর নিজের ভবিষ্যৎ। এত depend করিস না।” অয়ন সূর্যের দিকে তাকাল না। সে শুধু সঙ্গীতার উত্তর শুনতে চাইল। সঙ্গীতা থেমে গেল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “দেখে রাখা খারাপ না।” অয়নের বুকের ভেতর কিছু ভেঙে পড়ল। “তুমি সত্যিই চাও আমি বাইরে থাকি?” সঙ্গীতা চোখ তুলল না। “চাই তুমি ভালো থাকো।” “এটা একই কথা নয়।” সূর্য বিরক্ত হয়ে বলল, “অয়ন, practical হও। এত নাটকীয় হওয়ার কিছু নেই। ছেলে মানুষ হয়ে একটু আলাদা থাকতে শিখতে হয়।” সঙ্গীতা চুপ। অয়ন ধীরে বলল, “হয়তো শিখব।” তারপর আর কিছু বলল না। খাবার শেষ না করেই উঠে গেল। সঙ্গীতা তার প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। ভাত প্রায় অর্ধেক পড়ে আছে। সূর্য বলল, “কী হলো ওর?” সঙ্গীতা খুব আস্তে বলল, “মন খারাপ হয়েছে।” সূর্য হেসে উঠল। “এই বয়সে একটু মন খারাপ হবেই। শহরে এসে বেশি attachment হলে চলে না।” সঙ্গীতার আঙুল শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু সে কিছু বলল না। কারণ কিছু কথা বলা মানে নিজের গোপন ব্যথাকে অন্যের সামনে খুলে দেওয়া। আর সে জানে, সূর্য সেই ব্যথা বুঝবে না।
বিকেলের দিকে আকাশ কালো হতে শুরু করল। কলকাতার বর্ষা এমনই—কখন যে রোদ থেকে মেঘ, মেঘ থেকে বৃষ্টি, কেউ বুঝে ওঠার আগেই শহরের রং বদলে যায়। অয়ন সারাদিন ঘরে ছিল। দুপুরের পর থেকে দরজা বন্ধ। বই খোলা, খাতা খোলা, কিন্তু লিখেছে খুব কম। সঙ্গীতা দুবার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। একবার জিজ্ঞেস করতে চেয়েছে— “খিদে পেয়েছে?” আরেকবার বলতে চেয়েছে— “রাগ করো না।” কিন্তু কোনো কথাই মুখে আনেনি। শেষে রান্নাঘরে গিয়ে ডিমের ঝোল গরম করল। অয়ন দুপুরে খায়নি। সে জানে, অয়ন ডিমের ঝোল পছন্দ করে। ছোট্ট বাটিতে তুলে রেখে দিল তার টেবিলের পাশে। দরজা নক করল। ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই। “অয়ন?” চুপ। সে দরজা একটু ঠেলে দেখল, খোলা। অয়ন টেবিলে মাথা রেখে বসে আছে। ঘুমিয়ে পড়েনি, শুধু চোখ বন্ধ। মুখে ক্লান্তি। সঙ্গীতা ভিতরে ঢুকবে কি না ভাবল। তার নিজের বানানো দূরত্ব দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে আটকাল। শেষে সে শুধু বাটিটা টেবিলে রেখে বলল, “খেয়ে নিও।” অয়ন চোখ খুলল। “তুমি এখনও মনে রাখো?” সঙ্গীতা থেমে গেল। “কী?” “আমি ডিমের ঝোল পছন্দ করি।” “এটা মনে রাখার মতো বড় কিছু না।” অয়ন ধীরে মাথা তুলল। “কিছু মানুষ বড় জিনিস ভুলে যায়। কেউ কেউ ছোট জিনিস মনে রাখে। কোনটা বেশি বড়, জানো?” সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল। অয়ন বলল, “যে মানুষ চলে যেতে বলে, সে যদি আমার প্রিয় খাবার মনে রাখে—তাহলে আমি বুঝব কোনটা সত্যি?” সঙ্গীতা কেঁপে উঠল। “অয়ন, আমাকে কঠিন কোরো না।” “তুমি তো নিজেই কঠিন হচ্ছ।” “আমি চেষ্টা করছি।” “কিসের?” “তোমাকে ঠিক জায়গায় রাখতে।” “আর তুমি?” সঙ্গীতা চোখ নামাল। “আমার ঠিক জায়গা অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে।” “কে নির্ধারণ করেছে?” “সমাজ। পরিবার। বিয়ে।” অয়ন ধীরে বলল, “তোমার মনকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল?” সঙ্গীতা উত্তর দিল না। এই ছেলেটা প্রশ্ন করতে জানে। এমন প্রশ্ন, যার উত্তর দিলে মানুষ নিজের তৈরি দেয়ালেই ফাটল দেখতে পায়। সে শুধু বলল, “খেয়ে নিও।” তারপর বেরিয়ে গেল। অয়ন বাটির দিকে তাকিয়ে রইল। ডিমের ঝোল থেকে ধোঁয়া উঠছে। দূরত্বেরও গন্ধ থাকে। আজ সেটা ডিমের ঝোলের মতো উষ্ণ।
সন্ধ্যা নামতে নামতে বৃষ্টি শুরু হলো। প্রথমে টুপটাপ। তারপর একসময় ঝমঝম। সঙ্গীতা কাপড় তুলতে বারান্দায় গেল। দেখল অয়নের ঘরের আলো জ্বলছে, কিন্তু জানালা বন্ধ। বারান্দাতেও সে নেই। চার দিন ধরে সে বারান্দায় যায় না। অয়নও কম যায়। যেন তারা দুজনই সেই জায়গাটাকে এড়িয়ে চলছে, যেখানে অনেক কথা বলা হয়ে গেছে। গোলাপফুলটা বৃষ্টিতে ভিজছে। সঙ্গীতা হাত বাড়িয়ে ফুলটা একটু সরাতে গেল, যাতে বেশি জল না লাগে। তারপর থেমে গেল। এই ফুল তাদের সাক্ষী। কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ওঠা, কাঁটা, রক্ত, ব্যান্ডেজ, বই—সব জানে। সে আস্তে বলল, “সবকিছু কি লুকিয়ে রাখা যায়?” বৃষ্টি উত্তর দিল না। ঠিক তখন ভেতর থেকে ফোন বেজে উঠল। সূর্য। “হ্যালো?” “আজ ফিরতে দেরি হবে। খুব বৃষ্টি। আমি হয়তো বন্ধুর জায়গায় থাকব।” সঙ্গীতা কিছুক্ষণ চুপ। “প্রতিদিনই দেরি হচ্ছে।” “আবার শুরু করলে?” “আমি শুধু বললাম।” “সঙ্গীতা, আমার কাজ থাকে। সবসময় explain করতে পারব না।” “বন্ধুর জায়গায় থাকবে?” “হ্যাঁ। আর প্রশ্ন আছে?” সঙ্গীতা ঠান্ডা গলায় বলল, “না।” লাইন কেটে গেল। সে ফোন নামিয়ে রাখল। তার মনে হলো, এই বাড়িতে সে একা নয়—অয়ন আছে। আর এই ভাবনাটাই তাকে ভয় দেখাল। কারণ যে শূন্যতা স্বামী রেখে যায়, তা যদি অন্য কেউ পূরণ করতে শুরু করে—তখন সম্পর্কের সব নাম কেঁপে ওঠে।
রাতের খাবারের সময় অয়ন বেরোল না। সঙ্গীতা দুবার ডাকল। “খেতে আসবে?” ভেতর থেকে উত্তর এল, “খিদে নেই।” সঙ্গীতা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। “দুপুরেও ঠিকমতো খাওনি।” “খাব না।” “এভাবে চলবে না।” “সবকিছু তো তোমার মতো চলতেই হবে, তাই না?” সঙ্গীতা চুপ। অয়নের গলায় অভিমান স্পষ্ট। সে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। অয়ন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। বাইরে বৃষ্টি। তার চুল একটু এলোমেলো, চোখ লালচে। মুখে সেই নীরব কষ্ট, যা মানুষ কাউকে দেখাতে চায় না, কিন্তু লুকিয়েও রাখতে পারে না। সঙ্গীতা বলল, “তুমি আমাকে শাস্তি দিচ্ছ?” অয়ন ঘুরে তাকাল। “আমি?” “খাচ্ছ না কেন?” “খিদে নেই।” “মিথ্যে।” “সবাই মিথ্যে বলে। আমি বললে সমস্যা?” সঙ্গীতা ধীরে দরজা বন্ধ করল। পুরো নয়, আধখোলা রেখে দিল। “অয়ন, এমন কোরো না।” “কী করছি?” “নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ।” অয়ন হেসে ফেলল। “এটা তোমার কথা?” “হ্যাঁ।” “তুমি নিজেকে কষ্ট দেবে, আমি দেখব। আমি কষ্ট পেলে তুমি বলবে—এমন কোরো না?” সঙ্গীতা উত্তর দিতে পারল না। অয়ন বলল, “তুমি আমাকে বাইরে পাঠাতে চাইছ। কথা কমাচ্ছ। চোখ এড়িয়ে যাচ্ছ। বারান্দায় আসছ না। কিন্তু আমার খাবার গরম করে দিচ্ছ, চা বানাচ্ছ, নোট রেখে যাচ্ছ, ডিমের ঝোল করে দিচ্ছ। তুমি আসলে কী চাইছ?” সঙ্গীতার চোখ ভিজে উঠল। “আমি চাই তুমি ভালো থাকো।” “আমি ভালো নেই।” কথাটা খুব সরল। কিন্তু সেই সরলতাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিল। সঙ্গীতা এক পা এগোল। “তাহলে কী করব আমি?” অয়ন ধীরে বলল, “সত্যি বলো।” “কোন সত্যি?” “তুমি কি চাও আমি চলে যাই?” সঙ্গীতা ঠোঁট কামড়ে ধরল। জানালার বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে। “চাই না।” শব্দটা খুব আস্তে বেরোল। কিন্তু অয়ন শুনল। তার চোখ বদলে গেল। সঙ্গীতা দ্রুত বলল, “কিন্তু চাই না বললেই থাকা যায় না।” “কেন?” “কারণ আমার চাওয়া ভুল।” অয়ন এগিয়ে এল না। শুধু তাকিয়ে রইল। “কার কাছে ভুল?” “সবাইয়ের কাছে।” “তোমার কাছে?” সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল। “আমার কাছে… সবচেয়ে ভয়ংকর।” “ভুল না ভয়ংকর?” সঙ্গীতা কেঁপে উঠল। “দুটোই।” অয়ন খুব নরম গলায় বলল, “আমি যদি বলি, আমি যেতে চাই না?” “তাহলে আমার আরও ভয় হবে।” “আমি যদি বলি, তুমি এড়িয়ে গেলে আমি আরও কাছে টের পাই তোমাকে?” সঙ্গীতা তাকাল। অয়ন বলল, “তোমার যত্ন তোমার কথার চেয়ে বেশি সত্যি।” সঙ্গীতা যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। “খেতে এসো।” “তুমি থাকবে?” “থাকব।” “একসঙ্গে?” সঙ্গীতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।”
ডাইনিং টেবিলে সেদিন তারা দুজন চুপচাপ খেতে বসেছিল। বাইরে বৃষ্টি। ভিতরে নরম আলো। সূর্য নেই। ফোন নেই। শুধু দুজন মানুষ, যারা দূরে থাকতে চায়, কিন্তু একসঙ্গে বসে ভাত খাচ্ছে। অয়ন খুব কম খেল। কিন্তু অন্তত খেল। সঙ্গীতা তার প্লেটে ডাল দিতে গিয়ে বলল, “আর একটু নাও।” অয়ন বলল, “তুমি বললে নেব।” “শিশু নাকি?” “আজ হতে পারি?” সঙ্গীতা তাকাল। কথাটা মজা করে বলা, তবু তার ভেতরে ক্লান্তি আছে। যেন অয়ন বলতে চাইছে—আজ এত শক্ত থাকতে ইচ্ছে করছে না। সঙ্গীতা নরম হয়ে গেল। “আর একটু নাও।” অয়ন নিল। খাওয়ার পর সঙ্গীতা প্লেট তুলতে গেল। অয়ন হাত বাড়াল। “আমি ধুই।” “না।” “আজ আমি ধোব।” “বৃষ্টিতে বাইরে যাওনি, তবু ঠান্ডা লাগছে তোমার গলায়।” অয়ন অবাক। “তুমি খেয়াল করেছ?” “হ্যাঁ।” “দূরত্ব থেকেও?” সঙ্গীতা উত্তর দিল না। সে শুধু বলল, “গরম জল খেয়ে নিও।” অয়ন শান্ত গলায় বলল, “তুমি দিলে খাব।” সঙ্গীতা এবার কিছু বলল না। সে রান্নাঘরে গিয়ে গরম জল করল। এই ছোট্ট কাজটাও আজ তাদের মধ্যে কথার বদলে দাঁড়াল।
রাত বাড়ল। বৃষ্টি থামল না। অয়ন নিজের ঘরে পড়তে বসেছিল। কিন্তু শরীরটা অদ্ভুত লাগছিল। গলা শুকনো, মাথা ভারী, চোখ জ্বলছে। হয়তো গত কয়েকদিনের ঘুম কম। হয়তো মনখারাপ। হয়তো বৃষ্টির ভেজা বাতাস। সে গরম জল খেয়েছিল, কিন্তু আরাম হয়নি। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। ঘর কেঁপে উঠল আলোয়। অয়ন বই বন্ধ করল। মাথাটা সত্যিই ভারী। সে উঠে দরজা বন্ধ করতে গেল, কিন্তু পা কেমন যেন দুলে উঠল। দরজার কাছে এসে হাত দিয়ে দেওয়াল ধরল। ঠিক তখন সঙ্গীতা রান্নাঘর থেকে ফিরছিল। অয়নের ঘরের দরজা আধখোলা দেখে সে অভ্যাসবশত তাকাল। দেখল—অয়ন দেওয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। “অয়ন?” অয়ন মুখ তুলল। “কিছু না।” সঙ্গীতা দ্রুত এগিয়ে এল। “তোমার মুখ এত গরম কেন?” “গরম না।” সে তার কথা শেষ করার আগেই সঙ্গীতা হাত বাড়িয়ে অয়নের কপালে হাত রাখল। এক মুহূর্ত। সঙ্গীতা স্থির হয়ে গেল। কপাল জ্বলছে। “তোমার জ্বর এসেছে।” অয়ন চোখ নামিয়ে বলল, “হয়তো একটু।” “একটু না। বেশ জ্বর।” তার গলায় ভয় মিশে গেল। গত চার দিনের সব দূরত্ব যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। “বিছানায় বসো।” “আমি পারব।” “চুপ করে বসো।” অয়ন আর তর্ক করল না। সঙ্গীতা তাকে ধরে বিছানায় বসাল। তার হাত অয়নের বাহুতে। অয়নের শরীর গরম। দুর্বল। সঙ্গীতার বুকের ভেতর ভয় জমতে লাগল। সে দ্রুত থার্মোমিটার আনল। জল আনল। ওষুধের বাক্স খুলল। অয়ন দুর্বল গলায় বলল, “এত চিন্তা করো না।” “চুপ।” “তুমি তো দূরে থাকতে বলেছিলে।” সঙ্গীতার হাত থেমে গেল। অয়ন চোখ আধখোলা রেখে তাকাল তার দিকে। “তাহলে এলে কেন?” ঘর নিঃশব্দ। বাইরে বৃষ্টি। সঙ্গীতার হাতে ভেজা কাপড়। অয়নের কপাল জ্বরে গরম। দুজনের মাঝখানে চার দিনের দূরত্ব, PG-এর কথা, বৌদি ডাক, না-ডাকা নাম—সব এসে দাঁড়াল। সঙ্গীতা উত্তর দিতে পারল না। সে শুধু ভেজা কাপড়টা অয়নের কপালে চেপে ধরল। তার আঙুল অয়নের চুল ছুঁয়ে গেল। অয়ন চোখ বন্ধ করল। সঙ্গীতা খুব আস্তে বলল, “কারণ তুমি অসুস্থ।” অয়ন মৃদু গলায় বলল, “শুধু তাই?” সঙ্গীতার বুক কেঁপে উঠল। সে উত্তর দিল না। অয়ন আবার বলল না কিছু। কিছু প্রশ্ন জ্বরের ঘোরেও খুব স্পষ্ট থাকে। আর কিছু উত্তর সুস্থ মানুষও বলতে পারে না।
রাত আরও গভীর হলো। সূর্য বাড়ি ফিরল না। সঙ্গীতা অয়নের ঘরেই বসে রইল। দরজা আধখোলা। বাইরে বৃষ্টির শব্দ। ভিতরে জ্বরের গরম নিঃশ্বাস। অয়ন ঘুমোতে পারছিল না। কখনো চোখ বন্ধ করছে, কখনো খুলছে। সঙ্গীতা বারবার কপালের কাপড় বদলাচ্ছে। তার হাতের স্পর্শে যত্ন আছে, ভয় আছে, আর আছে এমন এক টান, যা সে আর পুরোপুরি লুকোতে পারছে না। অয়ন আধো ঘুমে বলল, “যেও না।” সঙ্গীতার হাত থেমে গেল। “আমি আছি।” “দূরে যেও না।” সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল। এই কথাটুকু জ্বরের ঘোরে বলা। হয়তো অয়ন কাল মনে রাখবে না। কিন্তু সে মনে রাখবে। তার খুব বলতে ইচ্ছে করল— “যেতে চাই না।” কিন্তু মুখে আনল না। শুধু ধীরে অয়নের কপালের চুল সরিয়ে দিল। “ঘুমাও।” অয়ন খুব আস্তে বলল, “সঙ্গীতা…” নামটা শুনে তার বুকের ভেতর কাঁপন উঠল। আজ সে বাধা দিল না। না “বৌদি বলো”, না “ডেকো না।” শুধু নিঃশব্দে বসে রইল। অয়ন আবার ঘুমে ঢলে পড়ল। সঙ্গীতা তার দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটাকে দূরে পাঠাতে হবে—সে জানে। কিন্তু আজ তার জ্বরের গরম কপালে হাত রেখে সে প্রথমবার স্বীকার করল— দূরে পাঠানো মানে শুধু অয়নকে সরানো নয়। নিজের বুকের একটা অংশ ছিঁড়ে ফেলা।
ভোরের দিকে বৃষ্টি থামল। জ্বর একটু কমেছে। অয়ন গভীর ঘুমে। সঙ্গীতা এখনও বসে আছে। চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত। তবু তার হাত অয়নের কপালের কাছে। ঘরের জানালা দিয়ে ধূসর আলো ঢুকছে। টেবিলে অয়নের বই খোলা। পাশে গরম জলের গ্লাস। চায়ের কাপ শুকিয়ে গেছে। সঙ্গীতা ধীরে উঠে দাঁড়াতে গেল। ঠিক তখন অয়ন ঘুমের ভেতরেই তার আঙুল ধরে ফেলল। খুব শক্ত নয়। দুর্বল, অবচেতন স্পর্শ। কিন্তু সঙ্গীতার শরীর কেঁপে উঠল। সে হাত ছাড়াতে পারত। ছাড়াল না। একটু ঝুঁকে অয়নের মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই ঘুমন্ত মুখের ভেতর কত অসহায় বিশ্বাস আছে। এমন বিশ্বাস, যাকে ভাঙা পাপ। আবার ধরে রাখাও বিপদ। সঙ্গীতা খুব ধীরে ফিসফিস করে বলল, “আমি কী করব বলো, অয়ন?” অয়ন ঘুমিয়ে। উত্তর নেই। কিন্তু তার আঙুল সঙ্গীতার আঙুলে রয়ে গেল। বাইরে ভোর হলো। দূরে কোথাও একটা পাখি ডাকল। আর এই বাড়ির এক নীরব ঘরে, দূরত্বের সমস্ত সিদ্ধান্ত জ্বরের এক রাতেই দুর্বল হয়ে পড়ল।
চলবে আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: Ko-fi) ব্যবহার করে সাপোর্ট নেওয়া বা দেওয়া বেশ জটিল। তবুও অনেক পাঠক বন্ধু আমাকে আর্থিকভাবে কিছুটা সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যাতে আমি লেখালেখির এই যাত্রাটি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সচল রাখতে পারি।আপনারা যারা স্বেচ্ছায় আমাকে কিছুটা সাপোর্ট করতে চান বা 'কফি ট্রিট' দিতে চান, তারা আমার টেলিগ্রামে (Telegram) একটি মেসেজ দিতে পারেন। সেখানে আমি আমার বিকাশ বা নগদ নম্বরটি শেয়ার করব। আমার টেলিগ্রাম আইডি: @sexstorylover24 একটি বিষয় নিশ্চিত করছি: এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে কোনো প্রকার জোর করা হচ্ছে না। গল্প আগের মতোই নিয়মিত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আপনাদের এই ছোট ছোট ভালোবাসা আমাকে আগামীর পর্বগুলো আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। যদি কোনো মতামত থাকে জানাতে ভুলবেন না। আমাকে ইমেইল করতে পারেন [email protected] অথবা টেলিগ্রাম এ এসএমএস দিতে পারেন @sexstorylover24 এই নামে। আপনাদের এসএমএস এ আমি উৎসাহ পাই। তাই আমাকে বেশি বেশি করে উৎসাহ দিবেন এই আশা করি।