(এই পর্ব আজকে আসত না কিন্তু আমার একজন খুব কাছের রিডার কাম ভাই আজকে বলল ২ টা পর্ব এপিসোড দিচ্ছি , আর সেই আমার সবচেয়ে বড় ডোনেশন দাতা, তাই তাকে জানাই মনের গভির থেকে ধন্যবাদ, আমার পাশে থাকার জন্য।) ভোরের আলো পুরোপুরি ঘরে ঢোকার আগেই সঙ্গীতার ঘুম ভাঙল। ঘুম? না, ঘুম বলা ঠিক হবে না। রাতভর সে প্রায় জেগেই ছিল। কখনো অয়নের কপালে ভেজা কাপড় দিয়েছে, কখনো থার্মোমিটার দেখেছে, কখনো গরম জল বদলেছে, কখনো শুধু চুপ করে বসে তার শ্বাস-প্রশ্বাস শুনেছে। শেষ রাতের দিকে অয়ন গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছিল। আর ঘুমের ভেতরেই তার আঙুল ধরে রেখেছিল সঙ্গীতার আঙুল। খুব শক্ত করে নয়। যেন অসুস্থ শরীরের অবচেতন ভরসা। সঙ্গীতা হাত ছাড়ায়নি। সে অনেকক্ষণ সেই আঙুলের দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, এ শুধু হাত ধরা নয়। এ যেন কেউ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বলছে— “যেও না।” আর সে যেতে পারছিল না। কিন্তু ভোরের আলো মানুষের ভুলগুলোকে স্পষ্ট করে দেয়। সঙ্গীতা ধীরে নিজের আঙুল ছাড়াতে গেল। অয়ন ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ল। তার ঠোঁট কাঁপল। “যেও না…” শব্দটা খুব অস্পষ্ট। হয়তো স্বপ্নে বলা। হয়তো জ্বরের ঘোরে। হয়তো কেবল শ্বাসের শব্দ। তবু সঙ্গীতার বুক কেঁপে উঠল। সে খুব নিচু গলায় বলল, “আমি আছি।” বলেই নিজেই ভয় পেল। কারণ সে জানে—সে থাকতে পারে না। এভাবে না। এই নামে না। এই ঘরে না। এই সম্পর্কের ভেতর তো নয়ই। সঙ্গীতা উঠে দাঁড়াল। অয়নের কপালে হাত রাখল। জ্বর কিছুটা কমেছে। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু আগের মতো জ্বলছে না। সে টেবিলের ওপর ওষুধ, জল, আর একটা ছোট কাগজ রেখে দিল। লিখল— “জ্বর কমেছে। ওষুধ খাবে। বাইরে যেও না।” কলম থামল। তার খুব ইচ্ছে করল শেষে লিখতে— “আমি আছি।” কিন্তু লিখল না। কারণ কিছু কথা কাগজে লিখলে সেগুলো মুছে ফেলা যায় না। সে দরজার দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই বাইরে main door খোলার শব্দ হলো। সঙ্গীতা জমে গেল। সূর্য।
সূর্য রাতের শেষে ফিরেছে। অথবা ভোরে। সঙ্গীতা বুঝতে পারল না। শুধু শুনল, দরজা খুলল, চাবির শব্দ, ব্যাগ রাখার শব্দ, তারপর সূর্যের কণ্ঠ— “সঙ্গীতা?” তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। এই মুহূর্তে সে অয়নের ঘরে। রাতভর। দরজা আধখোলা। কেউ যদি দেখে? ব্যাখ্যা আছে—অয়ন অসুস্থ ছিল। জ্বর। সে দেখাশোনা করেছে। কোনো ভুল নেই। তবু কিছু পরিস্থিতিতে সত্যিও সন্দেহের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে। সঙ্গীতা দ্রুত ট্রে হাতে নিল। যেন সে এখনই ঘরে ঢুকেছে, অথবা এখনই বেরোচ্ছে। সূর্য করিডোরে এসে দাঁড়াল। “তুমি এখানে?” সঙ্গীতা গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। “অয়নের জ্বর হয়েছিল রাতে।” সূর্য অয়নের ঘরের ভেতর তাকাল। অয়ন ঘুমোচ্ছে। টেবিলে ওষুধ। ভেজা কাপড়। গরম জলের গ্লাস। “জ্বর?” “হ্যাঁ। রাত থেকে।” “আমাকে ফোন করোনি কেন?” কথাটা শুনে সঙ্গীতার ভেতরে অদ্ভুত হাসি উঠতে চাইল। ফোন? কাকে? যে মানুষ নিজে বলেছিল—“Don’t wait”? যে বন্ধুর বাড়িতে থেকেছে? যে রাতে ফিরবে কি না তাও জানায়নি? কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু বলল, “তুমি বলেছিলে বন্ধুর জায়গায় থাকবে। বিরক্ত করতে চাইনি।” সূর্য মুখ বাঁকাল। “ডাক্তার দেখানোর দরকার হলে বলবে। আর এই জন্যই বলি—ছেলেকে PG-তে থাকলে ভালো। অসুখ-বিসুখ হলে responsibility বেশি হয়ে যায়।” সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল। একটা অসুস্থ ছেলের জ্বরেও সূর্য দায়িত্বের হিসেব দেখল। অয়নের মুখের দিকে একবার স্নেহভরে তাকাল না। তবু সঙ্গীতা কিছু বলল না। কারণ সে জানে, এখন কথা বাড়ালে সূর্য অন্যদিকে যাবে। প্রশ্ন করবে—রাতভর তুমি ছিলে? দরজা কেন আধখোলা? আমাকে জানাওনি কেন? সূর্য ক্লান্ত গলায় বলল, “আমি ফ্রেশ হয়ে ঘুমোব। আজ office from home করব।” সঙ্গীতার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। “আজ বাড়িতে থাকবে?” “হ্যাঁ। বৃষ্টি, শরীরও ভালো লাগছে না। কেন?” “না… কিছু না।” সূর্য চলে গেল নিজের ঘরের দিকে। সঙ্গীতা অয়নের ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে অয়ন ঘুমোচ্ছে। বাইরে সূর্য বাড়িতে থাকবে। আজ থেকে তাকে আরও সাবধানে থাকতে হবে। শুধু নিজের জন্য নয়। অয়নের জন্য।
অয়ন ঘুম ভাঙল প্রায় সকাল ন’টার দিকে। মাথা ভারী। শরীর দুর্বল। গলা শুকনো। কিছুক্ষণ সে বুঝতেই পারল না, রাতের কতটা সত্যি, কতটা স্বপ্ন। তার কপালে ঠান্ডা কাপড়ের স্মৃতি আছে। চুলে সঙ্গীতার আঙুলের ছোঁয়া আছে। ঘুমের ভেতর সে কারও হাত ধরে রেখেছিল—এইটুকু মনে আছে। সে ধীরে উঠে বসল। টেবিলে কাগজ। “জ্বর কমেছে। ওষুধ খাবে। বাইরে যেও না।” সঙ্গীতার লেখা। অয়ন কাগজটা হাতে নিল। চারটি ছোট বাক্য। কিন্তু প্রতিটি বাক্যের ভেতরে রাতভর জেগে থাকা একজন নারীর ক্লান্ত আঙুলের ছাপ আছে। সে কাগজের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর মায়া আর কষ্ট একসঙ্গে জমল। ঠিক তখন দরজার বাইরে সঙ্গীতার গলা এল। “ওষুধ খেয়েছ?” অয়ন দরজার দিকে তাকাল। সঙ্গীতা ভিতরে ঢুকল না। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। অয়ন বলল, “ভিতরে আসবে না?” সঙ্গীতা গলা নিচু রাখল। “সূর্য বাড়িতে আছে।” এই কথাটাই যথেষ্ট। অয়ন বুঝল। চার দিনের দূরত্ব ছিল ইচ্ছের। আজকের দূরত্ব বাধ্যতার। তবু কষ্ট হলো। “তুমি সারারাত ছিলে?” সঙ্গীতা চোখ সরিয়ে নিল। “জ্বর ছিল।” “শুধু জ্বর?” সঙ্গীতা দ্রুত বলল, “ওষুধ খেয়ে নাও। দুপুরে পাতলা খিচুড়ি দেব।” অয়ন তাকে দেখছিল। “তুমি ক্লান্ত।” “আমি ঠিক আছি।” “মিথ্যে।” সঙ্গীতা এবার তাকাল। “সব সত্যি সবসময় বলা যায় না।” অয়ন খুব আস্তে বলল, “তাহলে আমার নামও বলা যায় না?” সঙ্গীতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে করিডোরের দিকে তাকাল—সূর্য শুনছে কি না। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “আজ এসব বলো না।” “কোনদিন বলব?” “কোনোদিন না।” শব্দটা কঠিন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার গলায় কাঁপুনি ছিল। অয়ন সেটা শুনল। সঙ্গীতা চলে গেল। অয়নের হাতে কাগজটা কেঁপে উঠল। সে জানল—জ্বর কমেছে। কিন্তু অন্য এক জ্বালা শুরু হলো।
সেদিন সারাদিন সূর্য বাড়িতে ছিল। ঘর থেকে ল্যাপটপ খুলে কাজ করছে, মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলছে, বারান্দায় যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। তার উপস্থিতি পুরো বাড়ির বাতাস বদলে দিল। যে ঘরে অয়ন আর সঙ্গীতার মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে অদৃশ্য শব্দ যেত-আসত, সেখানে আজ প্রতিটি শব্দ যেন আটকে যাচ্ছিল। সঙ্গীতা অয়নের ঘরে সরাসরি ঢুকল না। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “জ্বর কত?” “কম।” “থার্মোমিটার দিয়ে দেখেছ?” “হ্যাঁ।” “কত?” “নিরানব্বই।” “দুপুরের ওষুধ খাবে।” “হ্যাঁ।” “খিচুড়ি রেখে যাচ্ছি।” “তুমি খেয়েছ?” সঙ্গীতা থেমে গেল। “খাব।” “মানে খাওনি।” “অয়ন, আজ কথা বাড়িও না।” অয়ন চুপ করে গেল। তারপর সঙ্গীতা ট্রে রেখে চলে গেল। অয়ন দরজা পর্যন্ত এসে দাঁড়াল। দেখল, সঙ্গীতা করিডোর দিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে। তার পায়ের শব্দেও আজ ভয়। অয়ন বুঝল, সঙ্গীতা শুধু দূরে যাচ্ছে না। সে পাহারা দিচ্ছে। নিজেকে। অয়নকে। তাদের দুজনের না-বলা সম্পর্ককে। আর এই পাহারা খুব নির্মম।
দুপুরে সূর্য খেতে বসে বলল, “অয়নের জ্বর কেমন?” সঙ্গীতা বলল, “কমেছে।” “ডাক্তার লাগবে?” “দেখি। না কমলে ডাকব।” সূর্য ভাত মাখতে মাখতে বলল, “এভাবে চলবে না কিন্তু। ওর বাবাকে ফোন করা দরকার। PG দেখার ব্যাপারটা serious করতে হবে।” সঙ্গীতার হাত থেমে গেল। “এখনই?” “হ্যাঁ। অসুস্থ হলে তো আরও বুঝছ—ওকে proper setup-এ থাকা উচিত। এখানে তো তুমি একা manage করছ।” সঙ্গীতা বলতে চাইল— “আমি manage করতে পারি।” “আমি রাতভর জেগেছি।” “আমি ভয় পাইনি।” “আমি ওকে একা ছাড়িনি।” কিন্তু কোনো কথা বলল না। কারণ এ কথা বললে সূর্য বুঝবে না—অথবা ভুল বুঝবে। সে শুধু বলল, “ওর জ্বরটা ভালো হোক, তারপর কথা বলো।” সূর্য হেসে বলল, “তুমি আবার emotional হয়ে পড়বে না তো?” সঙ্গীতা এবার চোখ তুলল। “একটা অসুস্থ মানুষের জন্য চিন্তা করলে সেটা emotional?” “আমি সেভাবে বলিনি।” “কীভাবে বলেছ?” সূর্য একটু বিরক্ত হলো। “তুমি আজকাল সবকিছু personal নিচ্ছ।” সঙ্গীতা চুপ। সূর্য আবার ফোন তুলে নিল। খাবার টেবিলে conversation শেষ। অন্য পাশে, অয়ন নিজের ঘর থেকে সব শুনছিল। তার জ্বর কমছিল। কিন্তু বুকের ব্যথা বাড়ছিল।
বিকেলে অয়ন একটু ভালো বোধ করল। শরীর দুর্বল, তবু মাথা পরিষ্কার। সে বই খুলল। পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পাতায় অক্ষরগুলো বসে থাকলেও মনে ঢুকছিল না। দরজার বাইরে সঙ্গীতার পায়ের শব্দ পেলেই তার বুক কেঁপে উঠছিল। কিন্তু সে ঢুকছিল না। একবার শুধু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “জল শেষ?” অয়ন বলল, “হ্যাঁ।” সে বোতল বদলে দিল। ভেতরে এল না। হাত এগিয়ে বোতল দিল। অয়ন নিতে গিয়ে ইচ্ছে করেই আঙুল ছোঁয়াল না। আজ সে সঙ্গীতাকে আর কঠিন করতে চায় না। সঙ্গীতা বোতল রেখে ফিরে যাচ্ছিল। অয়ন বলল, “রাতের কথা মনে আছে?” সঙ্গীতা থেমে গেল। পিঠ অয়নের দিকে। “কোন রাত?” “যে রাতে তুমি বলেছিলে—কারণ তুমি অসুস্থ।” সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল। “জ্বরের ঘোরে বলা কথা মনে রাখার দরকার নেই।” “ওটা আমি বলেছিলাম। তুমি উত্তর দাওনি।” “উত্তর ছিল না।” “নাকি ছিল, বলতে পারোনি?” সঙ্গীতা ঘুরে তাকাল। তার চোখে কষ্ট। “তুমি অসুস্থ। বিশ্রাম নাও।” “তুমি এভাবে কথা বন্ধ করে দিলে আমি আরও অসুস্থ হব।” সঙ্গীতার মুখ কেঁপে উঠল। “আমাকে এমন কথা বলো না।” “কেন?” “কারণ তখন মনে হয়… আমি থাকলে তুমি ভালো থাকবে।” “সেটা সত্যি।” “না, অয়ন। সেটা বিপদ।” “তোমার কাছে সব সত্যিই বিপদ হয়ে যাচ্ছে।” সঙ্গীতা আর দাঁড়াল না। চলে গেল। অয়ন বিছানায় বসে রইল। দুজনের মাঝখানে দরজা খোলা। তবু দূরত্ব আগের চেয়ে বেশি।
সন্ধ্যার পরে সূর্য একটা ফোন পেয়ে বারান্দায় গেল। গলা খুব নিচু। কিন্তু কয়েকটা শব্দ সঙ্গীতার কানে এল। “না, আজ বেরোতে পারব না… বাড়িতে আছি… কাল দেখি…” তারপর খুব হালকা হাসি। সঙ্গীতা রান্নাঘর থেকে তাকাল। অয়নও শুনল। সে বুঝল না কথার মানে, কিন্তু সঙ্গীতার মুখের পরিবর্তন দেখল। সন্দেহের প্রথম ছায়া অনেক সময় শব্দ দিয়ে আসে না, আসে স্বরের ভেতর দিয়ে। সূর্য ফিরে এসে বলল, “চা আছে?” সঙ্গীতা বলল, “করছি।” “কম চিনি দিও।” “জানি।” এই “জানি” শব্দটা খুব নির্লিপ্ত। সূর্য টের পেল না। অয়ন টের পেল। যে মানুষ অনেকদিন ধরে অবহেলা সহ্য করে, তার নির্লিপ্ততার ভেতরেই একদিন বিদ্রোহ জন্মায়।
রাতের খাবার তিনজন একসঙ্গে খেল। কিন্তু টেবিলে যেন তিনটি আলাদা দ্বীপ। সূর্য ফোন দেখছে। সঙ্গীতা পরিবেশন করছে। অয়ন চুপচাপ খাচ্ছে। অয়নের জ্বর পুরোপুরি কমেনি। তবু সে উঠেছে, কারণ ঘরে শুয়ে থাকলে সঙ্গীতার পায়ের শব্দ শুনে আরও কষ্ট হচ্ছিল। খাওয়ার শেষে সূর্য বলল, “কাল যদি জ্বর কমে, PG-এর জায়গাটা দেখে আসা যায়।” অয়নের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সঙ্গীতা বলল, “কালই?” “হ্যাঁ। আর delay করে লাভ কী?” অয়ন ধীরে বলল, “আমি এখনও পুরো সুস্থ না।” সূর্য বলল, “দেখতে যেতে কতক্ষণ লাগে? তোর ভালোর জন্যই তো।” সঙ্গীতা চুপ করে রইল। অয়ন তার দিকে তাকাল। একবার। দুবার। সে আশা করেছিল, সঙ্গীতা বলবে— “আরও দুদিন পর।” অথবা— “জ্বর ভালো হোক আগে।” কিন্তু সঙ্গীতা কিছু বলল না। কারণ সে বললে তার নিজের ভয় দুর্বল হয়ে যাবে। কারণ সে জানে, দূরে পাঠানো উচিত। কারণ সে জানে, দূরে পাঠাতে না পারলে একদিন নিজেকে আটকাতে পারবে না। অয়ন চামচ নামিয়ে রাখল। “আমি যাব।” সঙ্গীতা চোখ তুলল। অয়ন এবার শান্ত গলায় বলল, “যদি সবাই মনে করে এটাই ভালো, তাহলে দেখে আসব।” কথাটা খুব স্থির। কিন্তু সেই স্থিরতার ভেতরে যে ভাঙা শব্দ ছিল, সঙ্গীতা শুনল। সূর্য বলল, “Good. Practical হওয়া শিখছ।” অয়ন কোনো উত্তর দিল না। সঙ্গীতার বুকের ভেতর নিঃশব্দে কিছু ভেঙে গেল।
রাত গভীর হলো। সূর্য নিজের ঘরে ঘুমোতে গেল। আজ সে বাড়িতে। এই উপস্থিতিই সঙ্গীতাকে বারান্দা থেকে আটকে রাখল। অয়নও নিজের ঘরে। বৃষ্টি থেমেছে। আকাশ পরিষ্কার। বাইরে গোলাপগাছের পাপড়িতে জল জমে আছে। অয়ন বিছানায় শুয়ে থাকতে পারছিল না। শরীর দুর্বল হলেও মন অস্থির। সে উঠে বারান্দায় এল। রাতের বাতাস ঠান্ডা। গোলাপফুলটা ভিজে। কাঁটা অন্ধকারে দেখা যায় না, কিন্তু আছে। অয়ন রেলিংয়ে হাত রাখল। আজ সে খুব কথা বলতে চাইছিল না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে চেয়েছিল। সেই জায়গায়, যেখানে সঙ্গীতা কখনো পাশে দাঁড়াত। কয়েক মিনিট পর খুব আস্তে দরজা খোলার শব্দ হলো। সঙ্গীতা। সে বারান্দায় এল না। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। অয়ন ঘুরে তাকাল। দুজনের চোখ মিলল। কথা নেই। সূর্য ঘরে আছে। দেওয়াল পাতলা। রাত গভীর। নাম উচ্চারণ করাও বিপদ। তবু চোখের ভাষা আটকানো যায় না। অয়ন খুব আস্তে বলল, “কাল আমি PG দেখতে যাব।” সঙ্গীতা ঠোঁট চেপে ধরল। “ভালো।” শব্দটা বেরোল। কিন্তু চোখ বলল অন্য কথা। অয়ন হাসল না। “তুমি খুশি?” সঙ্গীতা উত্তর দিল না। “বলতে পারো না?” সে মাথা নিচু করল। “আমি চাই তুমি ভালো থাকো।” অয়ন বলল, “তুমি আবার একই কথা বলছ।” “কারণ অন্য কথা বলা যাবে না।” “তাহলে আজ কথা বলো না।” সঙ্গীতা তাকাল। অয়নের গলায় অভিমান নেই, ক্লান্তি আছে। “আমি শুধু দেখতে এসেছিলাম… জ্বর আছে কি না।” “দূর থেকে?” “হ্যাঁ।” “কাছে এলে ভয়?” সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল। “হ্যাঁ।” এই স্বীকারোক্তি অয়নকে নীরব করে দিল। সঙ্গীতা দরজার কাঠে হাত রাখল। তার মনে হলো, এক পা এগোলেই সে অয়নের কপালে হাত রাখবে। জ্বর দেখবে। চুল সরাবে। বলবে— “যেও না।” কিন্তু ঘরের ভেতরে সূর্য আছে। সমাজ আছে। বয়স আছে। সম্পর্কের নাম আছে। আর সে নিজে আছে—যে নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। অয়ন ধীরে বলল, “আমার জ্বর কমেছে।” সঙ্গীতা বলল, “জানি।” “কীভাবে?” “তোমার গলার স্বর শুনে।” অয়ন তাকিয়ে রইল। এই হলো সঙ্গীতা। দূরে দাঁড়িয়ে থেকেও কণ্ঠে জ্বর মাপতে পারে। অয়ন খুব আস্তে বলল, “তাহলে তুমি দূরে নও।” সঙ্গীতা কেঁপে উঠল। “অয়ন…” “চিৎকার করছি না। ভয় পেও না।” “আমি ভয় পাইনি।” “পেয়েছ।” “হ্যাঁ। পেয়েছি।” এক মুহূর্ত। সত্যি আবার বেরিয়ে এল। সঙ্গীতা চোখ মুছল না। কান্না আসেনি, কিন্তু চোখ ভিজে। “আমি ভেতরে যাচ্ছি।” “আমাকে আর কিছু বলবে না?” সঙ্গীতা দরজার ভেতরে এক পা দিল। তারপর থেমে গেল। পিঠ অয়নের দিকে। “নিজের খেয়াল রেখো।” অয়ন বলল, “তুমি রাখবে না?” সঙ্গীতা কোনো উত্তর দিল না। ধীরে দরজার ভেতরে চলে গেল। এইবার দরজা পুরো বন্ধ হয়ে গেল। অয়ন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বারান্দা খালি। গোলাপফুল ভিজে। রাত নীরব। আজ সে বুঝল—সঙ্গীতা দূরে যাচ্ছে না কারণ তার অনুভূতি কমে গেছে। সে দূরে যাচ্ছে কারণ অনুভূতি খুব বেশি হয়ে গেছে। আর এই সত্যিটাই সবচেয়ে কঠিন।
সঙ্গীতা ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করেই থেমে গেল। ঘরে সূর্য ঘুমোচ্ছে। বিছানার এক পাশে স্বামী। দরজার ওপারে অয়ন। মাঝখানে সে। তার বুকের ভেতর যেন কেউ মুঠো করে ধরে আছে। সে ধীরে বিছানার পাশে বসে পড়ল। আজ বারান্দায় সে কথা বলেনি। শুধু চলে এসেছে। কিন্তু তাতেই কি দূরত্ব তৈরি হলো? না। বরং চোখের সেই কয়েক মুহূর্তে অয়নের কষ্ট, অভিমান, জ্বরের দুর্বলতা, আর না-বলা প্রশ্ন—সব তার ভেতরে ঢুকে গেছে। সে জানে, কাল PG দেখতে গেলে একটা বাস্তব দরজা খুলবে। অয়ন সত্যিই চলে যেতে পারে। আর আজ প্রথমবার এই সম্ভাবনা তাকে শ্বাস নিতে দিচ্ছে না। সঙ্গীতা মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনে হলো, দূরত্বের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল। দূরত্বকে সত্যি হতে দেখা অনেক কঠিন। বাইরে বারান্দায় অয়ন একা দাঁড়িয়ে। ভেতরে সঙ্গীতা স্বামীর পাশে বসে। আর তাদের মাঝখানে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে একটা প্রশ্ন— যে সম্পর্কের নাম নেই, তাকে দূরে পাঠালেই কি সে শেষ হয়ে যায়? নাকি নামহীন সম্পর্কই সবচেয়ে বেশি থেকে যায়?
চলবে আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: Ko-fi) ব্যবহার করে সাপোর্ট নেওয়া বা দেওয়া বেশ জটিল। তবুও অনেক পাঠক বন্ধু আমাকে আর্থিকভাবে কিছুটা সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যাতে আমি লেখালেখির এই যাত্রাটি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সচল রাখতে পারি।আপনারা যারা স্বেচ্ছায় আমাকে কিছুটা সাপোর্ট করতে চান বা 'কফি ট্রিট' দিতে চান, তারা আমার টেলিগ্রামে (Telegram) একটি মেসেজ দিতে পারেন। সেখানে আমি আমার বিকাশ বা নগদ নম্বরটি শেয়ার করব। আমার টেলিগ্রাম আইডি: @sexstorylover24 একটি বিষয় নিশ্চিত করছি: এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে কোনো প্রকার জোর করা হচ্ছে না। গল্প আগের মতোই নিয়মিত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আপনাদের এই ছোট ছোট ভালোবাসা আমাকে আগামীর পর্বগুলো আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। যদি কোনো মতামত থাকে জানাতে ভুলবেন না। আমাকে ইমেইল করতে পারেন [email protected] অথবা টেলিগ্রাম এ এসএমএস দিতে পারেন @sexstorylover24 এই নামে। আপনাদের এসএমএস এ আমি উৎসাহ পাই। তাই আমাকে বেশি বেশি করে উৎসাহ দিবেন এই আশা করি।