সকালটা শুরু হলো অদ্ভুত শান্তিতে।
এই শান্তি আগের মতো ফাঁকা নয়। আগের মতো নিঃশব্দ চাপাও নয়। যেন রাতভর নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর অয়ন ভোরে উঠে বুঝেছে—সব প্রশ্নের উত্তর আজই দরকার নেই। কিছু উত্তর পেতে হলে আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়।
তার টেবিলে বই খোলা।
গতরাতে যে খাতায় লিখেছিল—
“আমি পালালে হয়তো ভুল কমবে। কিন্তু তাকে একা রেখে গেলে— আমি নিজের চোখেই ছোট হয়ে যাব।”
সেই খাতাটা এখনও খোলা আছে।
অয়ন অনেকক্ষণ সেই লাইন দুটো দেখে রইল।
রাতের অন্ধকারে লেখা কথাগুলো ভোরের আলোয় কখনো কখনো শিশুসুলভ লাগে। কিন্তু আজ তা লাগল না। বরং আরও সত্যি লাগল।
সে বুঝল—সঙ্গীতার পাশে দাঁড়ানোর মানে শুধু তার চোখের জল মুছে দেওয়া নয়। শুধু চায়ের কাপের আঙুল ছোঁয়া নয়। শুধু নিষিদ্ধ টানের আগুনে জ্বলে ওঠা নয়।
সঙ্গীতার পাশে দাঁড়াতে হলে নিজেকেও দাঁড়াতে হবে।
পড়াশোনায়, নিজের চরিত্রে, নিজের সিদ্ধান্তে।
নইলে তার সব অনুভূতি একদিন শুধু দুর্বলতার গল্প হয়ে যাবে।
অয়ন খাতা বন্ধ করল।
তারপর আলমারি থেকে সব বই বের করল। টেবিল পরিষ্কার করল। বিষয় অনুযায়ী বই সাজাল। খাতা আলাদা করল। একটা সাদা পাতায় বড় করে লিখল—
**আজ থেকে পালানো বন্ধ।**
তার নিচে লিখল—
১. সকাল ৭টা – গণিত ২. সকাল ৯টা – ইংরেজি ৩. দুপুর – বিশ্রাম + পুনরাবৃত্তি ৪. বিকেল – বাংলা/সাহিত্য ৫. রাত – নিজের লেখা, কিন্তু পড়া শেষ হলে
লিখতে লিখতে সে থামল।
শেষ লাইনে “নিজের লেখা” লিখল কেন?
হয়তো সঙ্গীতার ডায়েরির কথা মনে পড়েছে।
হয়তো সে বুঝেছে, শুধু পড়া দিয়ে মানুষ বাঁচে না। ভিতরের কথাকেও কোথাও জায়গা দিতে হয়।
ঠিক তখন দরজার বাইরে পায়ের শব্দ।
অয়ন জানল—সঙ্গীতা।
পায়ের শব্দ চিনতে এখন আর ভুল হয় না।
সঙ্গীতা আজ চা নিয়ে দরজার কাছে এসে থামল।
ভেতর থেকে কাগজ-কলমের শব্দ পাচ্ছিল। গতকাল রাতে অয়নের মুখে যে দ্বিধা, যে পালানোর ভয় দেখেছিল—আজ সে সেটা আছে কি না বুঝতে চাইছিল।
দরজা আধখোলা।
সে আস্তে বলল,
“চা রাখব?”
অয়ন মাথা না তুলে বলল,
“ভিতরে এসো।”
সঙ্গীতার বুক কেঁপে উঠল।
ভিতরে এসো।
এই দুই শব্দ এখন আর সাধারণ নয়। এ যেন এক জায়গা দেওয়া। এক ধরনের বিশ্বাস।
সে ঘরে ঢুকল।
টেবিল দেখে থেমে গেল।
বইগুলো সাজানো। খাতা খোলা। সাদা পাতায় লেখা routine. আর সবচেয়ে ওপরে লেখা—
**আজ থেকে পালানো বন্ধ।**
সঙ্গীতা চায়ের কাপ টেবিলে রাখতে গিয়ে স্থির হয়ে গেল।
“এটা কী?”
অয়ন একটু অপ্রস্তুত হাসল।
“Routine।”
“উপরে যা লিখেছ?”
অয়ন তাকাল।
“নিজেকে মনে করানোর জন্য।”
সঙ্গীতা কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
গতকাল সে দেখেছিল খোলা ব্যাগ। যাওয়ার প্রস্তুতি। পালানোর ভয়।
আজ দেখছে বই সাজানো। routine. দাঁড়ানোর চেষ্টা।
তার বুকের ভেতর এমন এক নরম উষ্ণতা উঠল, যা সে লুকোতে চাইল।
“ভালো,” সে বলল।
শব্দটা ছোট।
কিন্তু অয়ন বুঝল, সঙ্গীতা শুধু routine-এর প্রশংসা করছে না। সে স্বস্তি পেয়েছে।
অয়ন বলল,
“আজ থেকে ঠিকমতো পড়ব।”
“আমার জন্য?”
প্রশ্নটা অজান্তেই বেরিয়ে গেল।
অয়ন চুপ করে তাকাল।
সঙ্গীতা যেন নিজেই কথাটা বলে অস্বস্তি পেল। দ্রুত বলল,
“মানে… তোমার বাবার কথা, তোমার future…”
অয়ন ধীরে বলল,
“নিজের জন্য পড়ব। বাবার জন্য পড়ব। আর…”
সে থেমে গেল।
সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল।
“আর?”
অয়ন খুব শান্ত গলায় বলল,
“যদি কোনোদিন কারও পাশে দাঁড়াতে হয়, যেন মাথা নিচু করে দাঁড়াতে না হয়—তার জন্য।”
সঙ্গীতার বুক কেঁপে উঠল।
কথাটা সরাসরি নয়।
তবু সে বুঝল।
এই ছেলেটা আজ নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে পালাবে না। আবার অন্ধ আবেগেও ভাসবে না। সে নিজেকে শক্ত করবে।
এই শক্ত হওয়াই তাকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
কারণ দুর্বল টানকে অস্বীকার করা যায়। কিন্তু দায়িত্ববান ভালোবাসাকে?
সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে বলল,
“তুমি পারবে।”
অয়ন মৃদু হাসল।
“তুমি এত নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
সঙ্গীতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“কারণ তুমি পালাতে গিয়েও পুরো পালাওনি।”
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তুমিও আটকাওনি।”
“আটকানোর অধিকার ছিল না।”
“তবু বলেছিলে—শুধু পালানোর জন্য যেও না।”
সঙ্গীতা চোখ তুলল।
দুজনের চোখে একসঙ্গে গত রাতের দরজার ফাঁক ফিরে এল।
“সেটুকুই বলতে পেরেছিলাম,” সঙ্গীতা বলল।
অয়ন বলল,
“সেটুকুই যথেষ্ট ছিল।”
নীরবতা।
চায়ের ধোঁয়া উঠছে।
রোদ জানালা দিয়ে টেবিলে পড়ছে।
কাগজের ওপর ছায়া পড়েছে— “আজ থেকে পালানো বন্ধ।”
সঙ্গীতা আস্তে বলল,
“চা ঠান্ডা হবে।”
অয়ন কাপ তুলল।
“তুমি খেয়েছ?”
সঙ্গীতা একটু থামল।
“না।”
অয়ন দ্বিতীয় কাপের দিকে তাকাল। ট্রেতে আরেকটা কাপ নেই।
“তোমার জন্য বানাওনি?”
“নিজের জন্য পরে করব।”
অয়ন কাগজ থেকে চোখ না সরিয়ে বলল,
“Routine-এ একটা line যোগ করো।”
সঙ্গীতা অবাক।
“কী?”
অয়ন পেন্সিল তুলে কাগজের পাশে লিখল—
**সঙ্গীতা দুপুরে ঠিকমতো খাবে।**
সঙ্গীতা হতবাক।
“এটা তোমার routine?”
“আমার মন যেন পড়ায় থাকে, তার জন্য দরকার।”
“মানে?”
“তুমি না খেলে আমি পড়তে পারব না।”
সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল।
তার গলায় কথা আটকে গেল।
সে মৃদু কড়া গলায় বলল,
“এভাবে দায় চাপিও না।”
“দায় না। সত্যি।”
সঙ্গীতা পেন্সিলটা তুলে লাইনটার পাশে ছোট্ট করে লিখল—
"চেষ্টা করব।"
অয়ন দেখল।
তার মুখে এমন এক হাসি ফুটল, যা সঙ্গীতার চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য করল।
এই ছোট্ট “চেষ্টা করব” যেন সম্পর্কের নতুন শব্দ।
দুপুরটা অয়নের সত্যিই পড়ায় কেটে গেল।
প্রথমে গণিত। তারপর ইংরেজি। মাঝে মাঝে মন অন্যদিকে যাচ্ছিল, কিন্তু সে নিজেকে টেনে ফিরিয়ে আনছিল। বাবার গলা মনে পড়ছিল। গ্রামের মাটির গন্ধ। মায়ের মুখ। তারপর সঙ্গীতার কাগজ—“আজ একটা লাইন লিখেছি।”
সব মিলিয়ে আজ তার পড়ার টেবিল যুদ্ধক্ষেত্র নয়, আশ্রয় হয়ে উঠছিল।
সঙ্গীতা রান্নাঘর থেকে দুবার এসে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছে। ঢোকেনি। শুধু দেখেছে, অয়ন সত্যিই পড়ছে।
তার ভেতরে অদ্ভুত গর্ব হচ্ছিল।
এই গর্বটা কী ধরনের?
বৌদির? একজন যত্নশীল মানুষের? নাকি এমন এক নারীর, যে দেখছে কেউ তার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করছে না, বরং আরও শক্ত করছে?
সে জানে না।
তবে ভালো লাগছিল।
খুব।
দুপুরে খাবার সময় সে সত্যিই নিজের প্লেটে ভাত নিল।
খুব বেশি না, সামান্য।
কিন্তু নিল।
অয়ন খেতে বসে দেখে ফেলল।
কিছু বলল না।
শুধু তার দিকে তাকিয়ে খুব সামান্য হাসল।
সঙ্গীতা গম্ভীর মুখে বলল,
“Routine follow করছি।”
অয়ন বলল,
“Good student।”
সঙ্গীতা চোখ বড় করল।
“আমি student?”
“আজ থেকে।”
“আর তুমি?”
“আমি teacher?”
“না,” সঙ্গীতা বলল, “তুমি খুব বেশি কথা বলা ছাত্র।”
অয়ন হেসে ফেলল।
সঙ্গীতাও।
এই ছোট্ট হাসি দুপুরের ঘর ভরিয়ে দিল।
কতদিন পরে ঘরটা এমনভাবে হেসে উঠল?
সঙ্গীতা নিজেই জানে না।
খাওয়ার পর অয়ন নিজের প্লেট তুলতে গেল।
সঙ্গীতা বলল,
“রেখে দাও।”
“Routine-এ নেই?”
“কী?”
“অয়ন নিজের প্লেট নিজে ধোবে।”
সঙ্গীতা একটু ভেবে বলল,
“থাকলে খারাপ না।”
অয়ন প্লেট নিয়ে রান্নাঘরে গেল।
সঙ্গীতা তার পাশে দাঁড়িয়ে।
“সাবধানে। ভাঙলে কিন্তু—”
“বকবে?”
“হ্যাঁ।”
“ভালো।”
“বকুনি ভালো?”
“তোমার বকুনি সংসারের শব্দের মতো লাগে।”
সঙ্গীতা স্থির হয়ে গেল।
অয়ন বুঝল, কথাটা একটু বেশি সত্যি হয়ে গেছে।
সে চুপ করে প্লেট ধুতে লাগল।
সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, এই দৃশ্যটাই তার অদ্ভুত লাগে—একজন যুবক, যে তাকে অবলম্বন ভাবছে, আবার তার সামনে নিজেকে ছোটও করছে না। সাহায্য করছে, কিন্তু দখল করতে চাইছে না। কাছে আসছে, কিন্তু তাড়াহুড়ো করছে না।
এই ধৈর্যই তাকে সবচেয়ে বেশি ভেঙে দেয়।
হঠাৎ সঙ্গীতার হাত থেকে একটা চামচ পড়ে গেল।
অয়ন হাত বাড়িয়ে তুলতে গেল। সঙ্গীতাও একই সঙ্গে ঝুঁকল।
দুজনের হাত কাছাকাছি এসে থামল।
চামচ মেঝেতে।
দুজনের চোখে নীরব হাসি আর অস্বস্তি।
অয়ন এবার হাত সরিয়ে নিল।
“তুমি তো বলেছিলে, সব না-সরানো মানে সম্মতি নয়।”
সঙ্গীতা তার দিকে তাকাল।
সে বুঝল, অয়ন মনে রেখেছে।
সবকিছু।
তার প্রতিটি সীমা। প্রতিটি ভয়। প্রতিটি সাবধানতা।
এই মনে রাখা কি ভালোবাসার অন্য নাম?
সঙ্গীতা চামচটা তুলে সিঙ্কে রাখল।
“তুমি খুব dangerous।”
অয়ন মৃদু বলল,
“কারণ আমি মনে রাখি?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তুমি আরও বেশি dangerous।”
“আমি কেন?”
“কারণ তুমি না বলেও অনেক কিছু বলে ফেলো।”
সঙ্গীতা আর উত্তর দিল না।
রান্নাঘরের জানালা দিয়ে আলো আসছিল।
দুজনেই কাজের অজুহাতে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
কাজ শেষ হয়ে গেছে।
তবু কেউ আগে বেরোল না।
বিকেলে অয়ন পড়তে বসেছিল।
সঙ্গীতা নিজের ঘরে diary খুলে বসেছিল।
গতকালের লাইনের নিচে আজ কী লিখবে, ভাবছিল।
কলম হাতে নিয়েও কিছু আসছিল না। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল অয়নের routine.
“আজ থেকে পালানো বন্ধ।”
সে ধীরে লিখল—
“আজ সে পালানো বন্ধ করল। আমি কি পারব?”
তারপর থামল।
কিসের থেকে পালানো?
নিজের অনুভূতি থেকে? অপমান থেকে? ভয় থেকে? স্বামী-সংসারের চুপ করে থাকা থেকে? নাকি সেই নারী থেকে, যে একদিন শিক্ষিকা হতে চাইত?
সে আবার লিখল—
“আজ আমি দুপুরে ভাত খেয়েছি। শুধু পেটের জন্য নয়। কারণ কেউ বলেছে, আমি না খেলে তার মন পড়ায় বসে না।”
লাইনটা লিখে সে হেসে ফেলল।
নিজের ওপরই অবাক লাগল।
এত ছোট জিনিসও কি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে?
হ্যাঁ।
সম্ভবত পারে।
সন্ধ্যার দিকে সূর্য ফোন করল।
“আজ ফিরতে দেরি হবে। client call আছে।”
সঙ্গীতা বলল,
“আচ্ছা।”
“অয়নের বাবা ফোন করেছিল?”
“জানি না। অয়নকে জিজ্ঞেস করো।”
“ওকে বলো PG-এর ব্যাপার যেন মাথায় রাখে।”
“বলব।”
লাইন কেটে গেল।
সঙ্গীতা ফোন নামিয়ে রাখল।
আগে এই ফোনের পর তার মন খারাপ হতো। আজও হলো। কিন্তু পুরোটা দখল করতে পারল না।
কারণ আজ ঘরের অন্য পাশে অয়ন পড়ছে।
এটা শুধু উপস্থিতি নয়।
এটা একধরনের নীরব প্রতিশ্রুতি— সে পালায়নি।
সঙ্গীতা রান্নাঘরে গেল।
চা বসাল।
এইবার দুই কাপ।
ট্রেতে দুটো কাপ রেখে অয়নের ঘরে গেল।
অয়ন মাথা তুলে তাকাল।
“দুই কাপ?”
“আমি student. Teacher-এর সঙ্গে tea break।”
অয়ন হেসে ফেলল।
“আমি কখন teacher হলাম?”
“তুমি routine বানিয়েছ।”
“তাহলে তুমি homework করেছ?”
সঙ্গীতা চোখ সরিয়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
অয়ন চমকে উঠল।
“লিখেছ?”
“হ্যাঁ।”
“দেখাবে?”
“না।”
“কিন্তু বলবে?”
“না।”
“তাহলে জানালে কেন?”
সঙ্গীতা কাপ হাতে বসে বলল,
“কারণ তুমি জানতে চেয়েছিলে আমি শুরু করেছি কি না।”
অয়ন নরম হয়ে গেল।
“তুমি শুরু করেছ?”
সঙ্গীতা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
দুজন চুপ করে চা খেল।
এই চা আগের চায়ের মতো নয়। এতে লুকোনো ভয় আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে নতুন সাহস।
অয়ন বলল,
“তুমি চাইলে একদিন আবার পড়াশোনা শুরু করতে পারো।”
সঙ্গীতা কাপ নামিয়ে রাখল।
“কথায় সহজ।”
“কাজেও শুরুটা ছোট হতে পারে।”
“কীভাবে?”
“প্রথমে বই পড়ো। তারপর লিখো। তারপর চাইলে online course, পরীক্ষা, training—যা সম্ভব।”
সঙ্গীতা অবিশ্বাসে তাকাল।
“আমার বয়স, সংসার, সবকিছু—”
“আমি বলছি না কালই জীবন বদলে ফেলো। শুধু একটা জানালা খুলে রাখো।”
সঙ্গীতা জানালার দিকে তাকাল।
আজকাল জানালার কথা বারবার ফিরে আসে।
“আর যদি কেউ বলে, এসব বয়স পেরিয়ে গেছে?”
অয়ন বলল,
“তাহলে বলবে—আমি এখনও পুরো মরিনি।”
সঙ্গীতা স্থির হয়ে গেল।
এই লাইনটা সে নিজের ডায়েরিতে লিখেছিল। অয়ন জানে না। তবু যেন তার না-পড়া ডায়েরির উত্তর দিয়ে দিল।
সে খুব আস্তে বলল,
“তুমি কখনও কখনও আমার না-বলা কথাও শুনে ফেলো।”
অয়ন বলল,
“হয়তো খুব মন দিয়ে শুনি বলে।”
সঙ্গীতার চোখ নরম হয়ে এল।
“সবাই এত মন দিয়ে শুনলে পৃথিবী অন্যরকম হতো।”
“সবাই না শুনলেও একজন শুনলেই কি কিছু বদলায় না?”
সঙ্গীতা উত্তর দিল না।
কিন্তু তার মুখে যে আলো ফুটল, সেটা অয়ন দেখল।
আজ সেই আলো খুব ছোট।
কিন্তু একদম সত্যি।
রাত নামার আগে অয়ন আবার পড়তে বসে গেল।
সঙ্গীতা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“আজ অনেক পড়েছ।”
“Routine শেষ হয়নি।”
“শরীর?”
“ভালো।”
“জেদ করছ?”
“হ্যাঁ।”
“কার সঙ্গে?”
অয়ন পাতা থেকে চোখ না তুলে বলল,
“নিজের সঙ্গে।”
সঙ্গীতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
“জিতবে?”
অয়ন এবার তাকাল।
“একদিনে না। কিন্তু পালাব না।”
সঙ্গীতা চুপ করে গেল।
এই উত্তর তার খুব ভালো লাগল।
কিন্তু সে বলল না।
শুধু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকে পড়তে দেখল।
অয়নের মুখে মনোযোগ। হাতের পাশে কলম। কপালে হালকা ভাঁজ। জানালার আলো এসে তার গালে পড়েছে।
এই ছেলেটাই গতকাল ব্যাগ গুছিয়েছিল পালানোর জন্য।
আজ একই মানুষ বই খুলে বসেছে নিজের সঙ্গে লড়াই করতে।
সঙ্গীতার বুকের ভেতরে গর্ব, মায়া, আর এক বিপজ্জনক টান একসঙ্গে জমল।
সে ধীরে বলল,
“অয়ন।”
অয়ন তাকাল।
“হ্যাঁ?”
সঙ্গীতা একটু থেমে বলল,
“তুমি যদি কোনোদিন সত্যিই বড় হও…”
“যদি?”
“হবে। আমি জানি।”
অয়নের চোখ নরম হলো।
সঙ্গীতা বলল,
“তাহলে আজকের দিনটা ভুলে যেও না।”
“কেন?”
“কারণ আজ তুমি পালাওনি।”
অয়ন তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“আর তুমি?”
সঙ্গীতা বুঝল না।
“আমি?”
“তুমিও তো আজ নিজের জন্য খেয়েছ। লিখেছ। চা খেতে বসেছ। তুমি-ও পালাওনি।”
সঙ্গীতার চোখ ভিজে উঠল।
সে কিছু বলল না।
শুধু খুব ধীরে মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ।
আজ সে-ও পালায়নি।
রাতে সূর্য ফিরল বেশ দেরিতে।
খাওয়া টেবিলে তেমন কথা হলো না। সূর্য ক্লান্ত। ফোনে মগ্ন। অয়ন শান্ত। সঙ্গীতা স্থির।
কিন্তু আজ অয়নের নীরবতা আগের মতো আহত নয়।
আজ তার নীরবতায় একধরনের কাজ শুরু হয়েছে।
সূর্য বলল,
“পড়াশোনা কেমন চলছে?”
অয়ন বলল,
“ভালো।”
“PG নিয়ে ভেবেছ?”
“ভেবেছি। আপাতত এখান থেকেই পড়ব। schedule final হলে সিদ্ধান্ত নেব।”
সূর্য একটু বিরক্ত হলেও তেমন কিছু বলল না।
“দেখিস যেন সময় নষ্ট না হয়।”
অয়ন শান্ত গলায় বলল,
“হবে না।”
এই “হবে না” শুনে সঙ্গীতা চোখ তুলল।
তার গলায় আজ অদ্ভুত দৃঢ়তা।
এ দৃঢ়তা আবেগের না। সিদ্ধান্তের।
খাওয়া শেষে অয়ন নিজের প্লেট নিজে তুলে রান্নাঘরে গেল। সূর্য দেখল, কিছু বলল না। সঙ্গীতা দেখল, মনে মনে হেসে ফেলল।
একটা সংসারের ভেতর বড় বদল কখনো কখনো প্লেট ধোয়ার মতো ছোট কাজ দিয়েই শুরু হয়।
রাত গভীর হলে অয়ন নিজের ঘরে পড়ছিল।
শেষ subject শেষ করল প্রায় বারোটার সময়। routine পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিন্তু অনেকটাই হয়েছে।
সে খাতায় টিক চিহ্ন দিল।
গণিত—হয়েছে। ইংরেজি—হয়েছে। বাংলা—অর্ধেক। নিজের লেখা—হবে।
সে কলম তুলে লিখল—
“আজ আমি জানলাম, ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে তা মানুষকে পড়া থেকে সরায় না; বরং মানুষকে এমন করে দাঁড় করায়, যাতে সে একদিন মাথা তুলে বলতে পারে—আমি পালাইনি।”
তারপর থামল।
“ভালোবাসা”—শব্দটা সে লিখে ফেলেছে।
প্রথমবার।
সে অনেকক্ষণ শব্দটার দিকে তাকিয়ে রইল।
মুছবে?
না।
সে মুছল না।
কারণ খাতার পাতা সমাজ নয়। খাতার পাতা বিচার করে না।
তবু শব্দটা দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।
ভালোবাসা।
সে কি সত্যিই?
হ্যাঁ।
সম্ভবত।
না, শুধু সম্ভবত নয়।
সে চোখ বন্ধ করল।
সঙ্গীতার মুখ ভেসে উঠল। হাসি নয়। কান্না নয়। আজ দুপুরে ভাত নেওয়ার দৃশ্য। diary লিখেছে বলার লজ্জা। “আমি student”—এই ছোট্ট দুষ্টুমি। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলা—“আজ তুমি পালাওনি।”
অয়ন বুঝল, সে শুধু তাকে পেতে চায় না।
সে চায় সঙ্গীতা বাঁচুক।
হাসুক।
লিখুক।
নিজের জন্য খাক।
কেউ তাকে অভাব বললে সে মাথা তুলে বলতে পারুক—“আমি অভাব নই।”
যে অনুভূতি অন্য মানুষের ভেতরের আলো জ্বালাতে চায়, তাকে আর শুধু আকর্ষণ বলা যায় না।
অয়ন খাতার ওপর হাত রাখল।
শব্দটা রইল।
**ভালোবাসা।**
সেই রাতেই সঙ্গীতা নিজের ডায়েরিতে লিখছিল।
আজ তার হাত এত কাঁপছিল না।
সে লিখল—
“আজ আমরা দুজনেই পালাইনি। সে বই খুলেছে। আমি ডায়েরি খুলেছি। সে routine লিখেছে। আমি ভাত খেয়েছি। হয়তো এভাবেই মানুষ বাঁচতে শেখে—একসঙ্গে নয়, তবু একে অন্যের জন্য।”
লিখে সে থামল।
তারপর আরও লিখল—
“আজ সে বলল, দাঁড়াবে। আমি জানি না, কোন সম্পর্কের নামে দাঁড়াবে। কিন্তু জানি, সে দাঁড়ালে আমার ভিতরের মৃত মেয়েটা একটু নড়ে ওঠে।”
সঙ্গীতা কলম নামাল।
ঘরের অন্য পাশে সূর্য ঘুমোচ্ছে।
তার স্বামী।
এই বাস্তবতা বদলায়নি।
তবু তার ডায়েরির পাতায় আজ অন্য এক বাস্তবতা জন্ম নিচ্ছে।
যেখানে সে শুধু কারও স্ত্রী নয়। শুধু সন্তানহীন দাগ নয়। শুধু রান্নাঘরের ক্লান্ত হাত নয়।
সে লিখতে পারে। সে খেতে পারে। সে বিশ্বাস করতে পারে। সে ভয় পেতে পারে। সে বাঁচতে চাইতে পারে।
এই চাওয়াটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
তবু আজ সে সেটা মুছে ফেলল না।
রাত প্রায় একটা।
বাড়ি নিস্তব্ধ।
অয়ন জল খেতে বেরোল। রান্নাঘরের আলো নিভে। করিডোর অন্ধকার। বাইরে বারান্দায় গোলাপগাছটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে।
সে বারান্দায় গেল না।
ফিরে আসার সময় দরজার নিচে একটা কাগজ দেখতে পেল।
তার নিজের দরজার নিচে।
হৃদস্পন্দন একটু দ্রুত হলো।
সে কাগজটা তুলে খুলল।
সঙ্গীতার লেখা—
“আজ routine-এর প্রথম দিন। ভেঙো না। আমি-ও চেষ্টা করব।”
অয়ন কাগজটা অনেকক্ষণ হাতে ধরে রইল।
তারপর খুব আস্তে দরজার দিকে তাকাল। ওপাশে সঙ্গীতার ঘর। দরজা বন্ধ। আলো নিভে।
কিন্তু আজ অয়ন জানল—দরজা বন্ধ থাকলেও সব পথ বন্ধ নয়।
সে নিজের খাতায় কাগজটা রেখে দিল।
আর নিচে লিখল—
“আমরা কেউ পালাব না।”
ভোরের আগে অয়ন ঘুমোতে গেল।
ঘুমের আগে তার মনে হলো, আজ তাদের সম্পর্কের আরেকটা রূপ জন্ম নিল।
এটা শুধু নিষিদ্ধ টান নয়। শুধু দুঃখ ভাগ করা নয়। শুধু আঙুলের স্পর্শ নয়। শুধু একা রাতের বারান্দাও নয়।
এটা একে অন্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।
কেউ কাউকে নিজের করে নেওয়ার কথা বলছে না। কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। কেউ সম্পর্কের নাম উচ্চারণ করছে না।
তবু তারা দুজনেই যেন নিঃশব্দে বলেছে—
“তুমি বাঁচো। আমি-ও বাঁচার চেষ্টা করি।”
বাইরে ভোরের আগে অন্ধকার একটু নরম হলো।
গোলাপফুলের পাপড়ি নিঃশব্দে ভেজা বাতাসে কাঁপল।
আর একই বাড়ির দুই ঘরে দুজন মানুষ আলাদা শুয়ে থেকেও বুঝল—
পালানো বন্ধ হয়েছে।
এবার শুরু দাঁড়ানোর।