নিষিদ্ধ প্রেম পর্ব ১৫:নিজের সঙ্গে যুদ্ধ

nishiddh prem prb 15nijer sngge yuddh

বিবাহিত সঙ্গীতার নিঃসঙ্গ জীবনে অয়নের আগমন বদলে দেয় সবকিছু। যত্ন, আকর্ষণ, নিষিদ্ধ প্রেম আর সমাজের বাঁধা পেরিয়ে শুরু হয় মুক্তির এক আবেগঘন যাত্রা।

লেখক: Arko

ক্যাটাগরি: বৌদির সাথে যৌনতা

প্রকাশের সময়:27 Jun 2026

সকালটা অয়নের জন্য শুরু হলো এক ফোনকল দিয়ে।

ঘুম তখনও পুরো ভাঙেনি। জানালার বাইরে আলো উঠেছে, কিন্তু ঘরে এখনও ভোরের নরম ছায়া। শরীর এখন প্রায় ভালো, তবু জ্বরের পরের দুর্বলতা কোথাও একটা থেকে গেছে।

ফোনটা বালিশের পাশে কাঁপছিল।

স্ক্রিনে লেখা— বাবা।

অয়ন এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।

তারপর ফোন ধরল।

“হ্যালো, বাবা?”

ওপাশ থেকে বাবার গলা ভেসে এল। গ্রাম্য সরলতা, ক্লান্তি, আর মমতার মিশ্রণ।

“ঘুম থেকে উঠেছিস?”

“হ্যাঁ, এই উঠলাম।”

“শরীর কেমন এখন? সূর্য বলল, তোর জ্বর হয়েছিল।”

অয়ন একটু থামল।

সূর্য বাবাকে জানিয়েছে। PG-এর কথাও নিশ্চয়ই বলেছে।

“এখন ভালো আছি বাবা।”

“ভালো করে ওষুধ খাস। শহরের জল-বাতাসে প্রথমে শরীর খারাপ করতেই পারে। সঙ্গীতা মা তোকে দেখছে তো?”

অয়নের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।

সঙ্গীতা মা।

বাবা সহজে বলল। স্নেহের নাম হিসেবে। সম্পর্কের নিরাপদ ভাষা হিসেবে। কিন্তু অয়নের কাছে শব্দটা আজ অস্বস্তিকরভাবে কেঁপে উঠল।

“হ্যাঁ,” সে আস্তে বলল, “দেখছে।”

ওপাশে বাবা নিশ্চিন্ত গলায় বলল,

“ও মেয়ে খুব ভালো। তোকে নিয়ে ভাবছি না। তবে একটা কথা—শুধু আদর পেলে চলবে না। পড়াশোনায় মন দিতে হবে।”

অয়ন চুপ করে রইল।

বাবা বলেই চলল,

“তোকে আমরা অনেক আশা নিয়ে পাঠিয়েছি রে। তুই তো জানিস, আমাদের গ্রামের বাড়ির অবস্থা। আমি সবসময় তোকে বলেছি—তুই শুধু নিজের জন্য পড়বি না। তোর পড়া মানে আমাদের সবার স্বপ্ন।”

অয়নের গলা শুকিয়ে গেল।

“জানি বাবা।”

“জানিস বলেই বলছি। শহরে গিয়ে মন যেন অন্যদিকে না যায়। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, অনেক distraction থাকবে। কিন্তু তোকে নিজের রাস্তা ভুললে চলবে না।”

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

distraction.

শব্দটা তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধল।

সঙ্গীতা কি distraction?

না।

সে জানে, সঙ্গীতা তার জীবনের সবচেয়ে সত্যি অনুভূতি হয়ে উঠছে।

কিন্তু সত্যি হলেও কি সবকিছু সঠিক হয়?

বাবা আবার বলল,

“সূর্য বলল, একটা PG দেখেছিস। জায়গা ভালো হলে দেখে নে। নিজের মতো থাকতে শিখবি। মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হয়।”

অয়ন ধীরে বলল,

“হ্যাঁ।”

“সঙ্গীতা মা যত্ন করছে, ঠিক আছে। কিন্তু বেশি নির্ভর করিস না। বৌদি মানুষ, সংসার আছে। তুই ছাত্র। ছাত্রের কাজ পড়া।”

অয়ন আর কথা বলতে পারল না।

এই কথাগুলোতে কোনো কঠোরতা নেই। বাবা তাকে আঘাত করতে চাইছে না। বরং তার ভালোর জন্যই বলছে।

তাই কথাগুলো আরও বেশি আঘাত করল।

কারণ যে সত্যি ভালোবাসা থেকে বলা হয়, তাকে অস্বীকার করা কঠিন।

বাবা বলল,

“কী রে, চুপ করে আছিস কেন?”

“কিছু না বাবা।”

“মন খারাপ?”

“না।”

“আমি তোকে ভয় দেখাচ্ছি না। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি—তুই বড় হবি। তোর ওপর অনেকের ভরসা। আমি গরিব মানুষ, কিন্তু তোকে নিয়ে গর্ব আছে। সেই গর্ব যেন কোনোদিন মাথা নিচু না করে।”

অয়নের চোখ ভিজে উঠল।

“করব না বাবা।”

“ভালো। পড়। শরীর দেখে চল। আর সঙ্গীতা মাকে বলিস, তোকে এত কষ্ট করে দেখছে—আমি কৃতজ্ঞ।”

অয়ন ঠোঁট কামড়ে ধরল।

“বলব।”

ফোন কেটে গেল।

ঘর নিঃশব্দ।

অয়ন ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ।

তার মনে হচ্ছিল, একদিকে বাবার গলা, গ্রামের বাড়ির উঠোন, মায়ের অপেক্ষা, বাবার পুরনো সাইকেল, পড়ানোর টেবিল, কেরোসিন বাতির নিচে পড়ার রাত।

অন্যদিকে সঙ্গীতার চায়ের কাপ, ডিমের ঝোল, ব্যান্ডেজ লাগানো আঙুল, ডায়েরির পাতা, আর সেই কথা—

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, অয়ন। খুব বেশি। এই জন্যই ভয় পাই।”

দুই দিকই সত্যি।

তবু একজন মানুষ কি একসঙ্গে দুই সত্যির দিকে হাঁটতে পারে?

সেই সকালেই অয়ন নিজের ভেতরে একটা সিদ্ধান্ত নিল।

আজ সে সঙ্গীতার কাছ থেকে দূরে থাকবে।

রাগ করে নয়। অভিমান করে নয়। নিজেকে পরীক্ষা করার জন্য।

সে দেখতে চাইল—সঙ্গীতাকে না ভেবে থাকা যায় কি না।

চা এল আগের মতো।

কিন্তু আজ সঙ্গীতা দরজার বাইরে নয়, ভেতরে ঢুকল। হাতে কাপ। মুখে স্বাভাবিক শান্তি।

“চা।”

অয়ন বই খুলে বসেছিল। চোখ তুলল না।

“রেখে দাও।”

সঙ্গীতা একটু থামল।

গতকাল পর্যন্ত যে অয়ন তার পায়ের শব্দ শুনে মুখ তুলত, আজ সে তাকাচ্ছে না।

“শরীর কেমন?”

“ভালো।”

“ওষুধ খেয়েছ?”

“খাব।”

“খাব মানে? এখন খাও।”

“খেয়ে নেব।”

সঙ্গীতা কাপটা টেবিলে রাখল। তার চোখ অয়নের মুখে। সে বুঝল, কিছু বদলেছে।

“বাবার ফোন এসেছিল?”

অয়ন এবার তাকাল।

“হ্যাঁ।”

“কি বললেন?”

“পড়তে বললেন।”

“আর?”

“PG নিয়ে কথা বললেন।”

সঙ্গীতার মুখে খুব সামান্য পরিবর্তন হলো। সে দ্রুত সেটা সামলে নিল।

“তা ভালো। বাবার সঙ্গে কথা বলা দরকার ছিল।”

অয়ন শান্ত গলায় বলল,

“হ্যাঁ। দরকার ছিল।”

সঙ্গীতা বুঝল, কথার ভেতরে আরেকটা কথা আছে।

“তুমি ঠিক আছ?”

অয়ন বইয়ের পাতা উল্টাল।

“হ্যাঁ।”

মিথ্যে।

দুজনেই বুঝল।

কিন্তু আজ অয়ন সেই মিথ্যেটাকে সত্যির মতো ব্যবহার করল।

সঙ্গীতা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল,

“চা ঠান্ডা কোরো না।”

অয়ন বলল,

“হ্যাঁ।”

সে তাকাল না।

সঙ্গীতা বেরিয়ে গেল।

দরজার বাইরে এসে সে একবার থামল। ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করল। কিন্তু তাকাল না।

তার মনে হলো, আজ অয়ন দূরে যাচ্ছে।

আর এই দূরত্ব তার তৈরি নয়।

এই দূরত্ব অয়নের নিজের ভেতর থেকে আসছে।

এটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখাল।

সারা সকাল অয়ন বইয়ের সামনে বসে থাকল।

আজ সে সত্যিই পড়তে চাইল।

বাবার কথা মনে রেখে। নিজের দায়িত্ব মনে রেখে। গ্রামের সেই মানুষগুলো মনে রেখে, যারা বলেছিল— “অয়ন শহরে পড়তে গেছে।” “ও একদিন বড় হবে।” “ওর বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে।”

সে অঙ্কের খাতা খুলল। সূত্র লিখল। আবার কেটে দিল। বাংলা বই খুলল। একটা paragraph পড়ল। কিছুই মনে রইল না।

মনে শুধু একটা প্রশ্ন—

সে কি ভুল পথে যাচ্ছে?

সঙ্গীতার প্রতি তার অনুভূতি কি ভালোবাসা, নাকি দুর্বলতা?

সে কি একজন বিবাহিত নারীর নিঃসঙ্গতার পাশে দাঁড়াতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে?

নাকি ঠিক উল্টো—সে প্রথমবার এমন একজন মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, যাকে সত্যিই কেউ দেখেনি?

কোনটা দায়িত্ব?

বাবার স্বপ্ন?

নাকি সঙ্গীতার চোখের জল?

কোনটা পাপ?

একজন মানুষের দিকে টান অনুভব করা?

নাকি তাকে একা অপমানিত হতে দেখে চুপ থাকা?

অয়ন মাথা চেপে ধরল।

নিজের ভেতরের আদালতে সে নিজেই বিচারক, নিজেই আসামি।

আর কোনো রায় বেরোচ্ছে না।

দুপুরে খেতে বসার সময় সঙ্গীতা বুঝল, অয়ন ইচ্ছে করে কম কথা বলছে।

সে প্লেটে ভাত দিল। ডাল দিল। অয়নের পছন্দের আলুভাজা পাশে রাখল।

অয়ন শুধু বলল,

“ধন্যবাদ।”

এই “ধন্যবাদ” শব্দটা সঙ্গীতার ভালো লাগল না।

ধন্যবাদে দূরত্ব থাকে।

ঘরের মানুষ ধন্যবাদ দেয় না, চোখে বলে। হাত বাড়িয়ে বলে। অভ্যাসে বলে।

সে শান্ত গলায় বলল,

“এত formal হচ্ছ কেন?”

অয়ন বলল,

“হওয়া উচিত।”

“কার কাছে?”

“সবাইয়ের কাছে।”

“আমার কাছেও?”

অয়ন চুপ করে ভাত মাখতে লাগল।

সঙ্গীতা বুঝল—হ্যাঁ, তার কাছেও।

সে আর কথা বলল না।

খাওয়ার টেবিলে অদ্ভুত নীরবতা। সূর্য নেই। তবু যেন তার বলা কথাগুলো আছে। PG আছে। বাবার ফোন আছে। ভবিষ্যৎ আছে।

সঙ্গীতা নিজের প্লেটে ভাত নিল না।

অয়ন খেয়াল করল।

কিন্তু আজ সে বলল না—“তুমি খাবে না?”

সে ইচ্ছে করেই বলল না।

নিজেকে শক্ত করার জন্য।

কিন্তু না বলার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর কেমন ব্যথা হলো।

যে যত্ন করতে চায়, সে যত্ন না করলে নিজেই আহত হয়।

সঙ্গীতা চুপচাপ উঠে গেল।

তার চোখে কোনো জল নেই। কিন্তু অয়ন দেখল—তার আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে আছে। সে নিজের শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে আছে।

অয়ন চোখ নামিয়ে ফেলল।

নিজেকে বলল— “এটাই ভালো। এভাবেই দূরত্ব তৈরি হয়।”

কিন্তু ভেতর থেকে আরেকটা গলা বলল— “না। এভাবে মানুষকে আঘাত দেওয়া হয়।”

বিকেলে অয়ন বাবাকে আবার ফোন করতে চাইল।

ফোন হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।

কি বলবে?

“বাবা, আমি গ্রামে ফিরে আসতে চাই?”

কেন?

জ্বর? PG? পড়ার চাপ? না কি সেই বাড়িতে থাকা কঠিন, যেখানে এক বিবাহিত নারীর চোখ তাকে ঘুমোতে দেয় না?

সে কি বাবাকে সত্যি বলতে পারবে?

না।

কিছু সত্যি বাবার কানে দিলে বাবার মুখের গর্ব ভেঙে যাবে।

অয়ন ফোন রাখল।

তারপর ব্যাগ বের করল।

খুব ধীরে।

কেউ যেন না শুনতে পায়।

ব্যাগের ভেতর দুটো জামা ভাঁজ করে রাখল। একটা বই। কিছু কাগজ। কলম। বাবার দেওয়া পুরনো fountain pen। গ্রামের মাটির গন্ধ যেন এখনও পেনটার গায়ে আছে।

সে ভাবল—কয়েকদিনের জন্য গ্রামে ফিরে গেলে?

বলে দেবে শরীর ঠিক নেই। একটু বিশ্রাম দরকার। বাবাও হয়তো খুশি হবে। মা খাওয়াবে। গ্রামের বাতাস। পরিচিত রাস্তা। দূরে থাকবে সঙ্গীতা। দূরে থাকলেই সব শান্ত হবে।

হবে?

সে থেমে গেল।

ব্যাগের পাশে টেবিলে রাখা সঙ্গীতার ছোট কাগজটা চোখে পড়ল—

“আজ একটা লাইন লিখেছি। তোমাকে দেখাচ্ছি না। কিন্তু জানাচ্ছি, লিখেছি।”

অয়ন কাগজটা হাতে নিল।

এই কাগজ কি ছেড়ে যাওয়া যায়?

সে চোখ বন্ধ করল।

যে নারী বহুদিন পর নিজের জন্য একটা লাইন লিখেছে, তাকে সে কি ঠিক সেই সময় ছেড়ে চলে যেতে পারে?

না গেলে কি সে ভুল করবে?

গেলে কি সে কাপুরুষ হবে?

উত্তর নেই।

সে কাগজটা বইয়ের ভেতর রেখে ব্যাগের চেন বন্ধ করল না।

ব্যাগ খোলা রইল।

যেমন তার সিদ্ধান্তও।

সন্ধ্যার দিকে সঙ্গীতা চা নিয়ে এল।

দরজা খোলা ছিল।

সে ভেতরে ঢুকতেই ব্যাগটা দেখতে পেল।

খোলা ব্যাগ। ভাঁজ করা জামা। বই।

তার শরীর যেন এক মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল।

“তুমি কোথাও যাচ্ছ?”

অয়ন চমকে তাকাল।

তারপর চোখ সরিয়ে বলল,

“ভাবছিলাম।”

“কোথায়?”

“গ্রামে।”

সঙ্গীতা কাপটা টেবিলে রাখল। কাপের শব্দ একটু বেশি জোরে হলো।

“কেন?”

অয়ন বলল,

“শরীর ঠিক হয়নি পুরো। কয়েকদিন গেলে ভালো হয়।”

সঙ্গীতা স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।

“শরীর?”

“হ্যাঁ।”

“শুধু শরীর?”

অয়ন উত্তর দিল না।

সঙ্গীতা ধীরে দরজার পাশে দাঁড়াল। ঘরে ঢুকল না আর। যেন ব্যাগের কাছাকাছি গেলে সে নিজেকে সামলাতে পারবে না।

“বাবার ফোনের জন্য?”

অয়ন মাথা তুলল।

সঙ্গীতা বুঝে গেছে।

“বাবা ভুল বলেননি,” অয়ন বলল।

“আমি বলছি না ভুল বলেছেন।”

“আমার পড়া আছে। ভবিষ্যৎ আছে। পরিবার আছে।”

“জানি।”

“আমি এখানে… বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছি।”

শব্দটা বলতেই অয়নের নিজের বুক কেঁপে উঠল।

বিভ্রান্ত?

সে কি সত্যিই বিভ্রান্ত?

সঙ্গীতা খুব আস্তে বলল,

“আমি তোমার বিভ্রান্তি?”

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

“না।”

“তাহলে?”

“তুমি আমার ভিতরের সবকিছু নাড়িয়ে দিচ্ছ।”

সঙ্গীতা চুপ করে গেল।

এই কথার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।

অয়ন বলল,

“আমি পড়তে বসি—তোমার কথা মনে পড়ে। বাবার কথা শুনি—গ্লানি হয়। তোমাকে কাঁদতে দেখি—রাগ হয়। তোমার যত্ন পাই—দূরে যেতে পারি না। আবার কাছে থাকলে মনে হয়, আমি ভুল করছি।”

তার গলা ভারী হয়ে উঠল।

“আমি বুঝতে পারছি না, সঙ্গীতা।”

নামটা বেরিয়ে গেল।

সঙ্গীতা বাধা দিল না।

আজ সে বলল না—“ডেকো না।”

কারণ এই মুহূর্তে নামের চেয়ে বড় ব্যথা সামনে দাঁড়িয়ে।

সে ধীরে বলল,

“তুমি যদি যেতে চাও, আমি আটকাব না।”

অয়ন তাকাল।

এই কথাটাই সে সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছিল।

আটকাবে না।

মানে কি সে চায় অয়ন যাক?

নাকি এতটাই ভালোবাসে যে আটকে নিজের স্বার্থ দেখাতে চায় না?

সঙ্গীতা বলল,

“তোমার বাবার কথা ঠিক। তোমার ভবিষ্যৎ আছে। তোমার স্বপ্ন আছে। আমার জন্য তোমার পথ নষ্ট হওয়া উচিত নয়।”

অয়ন বলল,

“তুমি আবার একই কথা বলছ।”

“কারণ কথাটা মিথ্যে নয়।”

“আর তুমি?”

“আমি…”

সে থেমে গেল।

তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।

“আমি অভ্যস্ত।”

অয়ন হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

“এই কথাটা আর বলো না।”

সঙ্গীতা চমকে গেল।

অয়নের চোখে রাগ নেই। আছে যন্ত্রণা।

“তুমি অভ্যস্ত—এই কথা বলে তুমি নিজের ওপর অত্যাচারকে স্বাভাবিক করে দিচ্ছ।”

সঙ্গীতা কিছু বলতে পারল না।

অয়ন ব্যাগের দিকে তাকাল।

“আমি ভেবেছিলাম, চলে গেলে সব সহজ হবে।”

“হবে?”

“জানি না।”

“তবু যেতে চাইছ?”

অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খুব নিচু গলায় বলল,

“পালাতে চাইছি।”

সঙ্গীতার বুক কেঁপে উঠল।

এই স্বীকারোক্তি তার চোখ ভিজিয়ে দিল।

“আমার থেকে?”

অয়ন তাকাল।

“নিজের থেকে।”

ঘর নীরব।

বাইরে সন্ধ্যার আলো ফিকে হয়ে আসছে।

সঙ্গীতা ধীরে বিছানার পাশে বসে পড়ল। ব্যাগটা তাদের মাঝখানে। যেন যাওয়া আর থাকা, দায়িত্ব আর অনুভূতি, ভবিষ্যৎ আর বর্তমান—সব ওই খোলা ব্যাগের ভেতর রাখা।

সে বলল,

“পালিয়ে গেলে কি মানুষ নিজেকে ফেলে যেতে পারে?”

অয়ন উত্তর দিল না।

সঙ্গীতা বলল,

“আমি চাই না তুমি আমার জন্য আটকে থাকো। কিন্তু তুমি যদি শুধু পালানোর জন্য যাও… তাহলে তুমিও শান্তি পাবে না, আমিও না।”

অয়ন তাকাল তার দিকে।

“তুমি শান্তি পাবে না?”

প্রশ্নটা খুব নরম।

সঙ্গীতা বুঝল, সে সীমার কিনারায় দাঁড়িয়ে।

সে বলল,

“যে মানুষের পায়ের শব্দ চিনে ফেলেছি, সে হঠাৎ না থাকলে ঘর চুপ করে যাবে।”

অয়নের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

এটা confession নয়।

তবু confession-এর খুব কাছে।

সে আস্তে বলল,

“তাহলে বলো, থাকি।”

সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল।

কথাটা বলতে কত সহজ হওয়া উচিত ছিল।

“থাকো।”

একটা শব্দ।

কিন্তু সেই এক শব্দের ভেতর কত নিষেধ, কত ভয়, কত সম্পর্ক, কত সমাজ।

সে বলতে পারল না।

অয়ন তার চুপ থাকা বুঝল।

ব্যথা পেল।

তবু আজ সে সঙ্গীতাকে দোষ দিল না।

কারণ সে জানে, এই নারী তার জীবনে কোনো সহজ জায়গা থেকে কথা বলে না। প্রতিটি শব্দের আগে তাকে সমাজ, স্বামী, বয়স, অপমান, ভবিষ্যৎ—সবকিছুর সঙ্গে লড়তে হয়।

সঙ্গীতা ধীরে বলল,

“আমি বলতে পারি না।”

অয়ন মাথা নেড়ে বলল,

“জানি।”

“তবু…”

“তবু?”

সঙ্গীতা অনেক কষ্টে বলল,

“যেও না… শুধু পালানোর জন্য।”

অয়ন স্থির হয়ে গেল।

এই প্রথম সে সঙ্গীতার মুখে “যেও না”-র কাছাকাছি কিছু শুনল।

শব্দটা পুরো নয়।

অধিকারী নয়।

নিরাপদও নয়।

তবু ছিল।

অয়ন ধীরে ব্যাগের দিকে তাকাল।

তারপর ব্যাগ থেকে জামাগুলো বের করে আবার আলমারিতে রাখল।

একটা। দুটো। বইটা। কলমটা।

সঙ্গীতা চুপ করে দেখছিল।

তার চোখে জল জমেছে, কিন্তু সে কাঁদছে না।

অয়ন ব্যাগটা খালি করে টেবিলের পাশে রাখল।

“আমি এখনই যাচ্ছি না।”

সঙ্গীতা যেন নিঃশ্বাস নিল অনেকক্ষণ পরে।

“কিন্তু…”

অয়ন বলল,

“কিন্তু আমি পালাব না। যদি যাই, নিজের সিদ্ধান্তে যাব। ভয় পেয়ে নয়।”

সঙ্গীতা মাথা নিচু করল।

“এটাই ঠিক।”

“তুমি খুশি?”

সঙ্গীতা উত্তর দিল না।

অয়ন বলল,

“চুপ থাকলে বুঝব?”

সঙ্গীতা খুব আস্তে বলল,

“আজ বুঝে নাও।”

অয়নের ঠোঁটে খুব ক্ষীণ হাসি ফুটল।

কিন্তু সেই হাসির ভেতরে জল ছিল।

রাত নামল।

সূর্য ফিরল দেরিতে। ক্লান্ত, বিরক্ত, ফোনে ব্যস্ত। খাওয়ার সময় বলল,

“বাবার সঙ্গে কথা বলেছিস?”

অয়ন বলল,

“হ্যাঁ।”

“কি বলল?”

“পড়তে বলল।”

“PG?”

“কথা হয়েছে। তবে এখনই shift করছি না।”

সূর্য তাকাল।

“কেন?”

“Admission আর coaching schedule final হোক। তারপর সিদ্ধান্ত নেব।”

সূর্য একটু ভাবল।

“ঠিক আছে। তবে বেশি delay নয়।”

অয়ন মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যাঁ।”

সঙ্গীতা চুপচাপ ভাত দিচ্ছিল। তার হাত এবার কাঁপল না। কিন্তু অয়ন দেখল, তার মুখে খুব সামান্য নরমতা ফিরে এসেছে।

খুব সামান্য।

যেন ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে আলো ঢোকে।

রাতে অয়ন বারান্দায় গেল না।

সে ঘরের আলো নিভিয়ে অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসে রইল। তারপর খাতা খুলল।

আজ অনেকদিন পর তার মনে হলো, লিখতে হবে। না লিখলে ভিতরের যুদ্ধ তাকে ঘুমোতে দেবে না।

সে লিখল—

“আজ বাবার গলা আমাকে মাটির দিকে টানল। সঙ্গীতার নীরবতা আমাকে আগুনের দিকে। আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে বুঝলাম— দুটোই সত্যি। তাই পালালে কোনো সত্যিই বাঁচবে না।”

সে থামল।

তারপর লিখল—

“আমি পালালে হয়তো ভুল কমবে। কিন্তু তাকে একা রেখে গেলে— আমি নিজের চোখেই ছোট হয়ে যাব।”

কলম থেমে গেল।

এই লাইনটা লিখেই অয়ন বুঝল, সিদ্ধান্ত পুরো হয়নি, কিন্তু দিক ঠিক হয়েছে।

সে সঙ্গীতাকে চাইছে—এটা সত্যি।

কিন্তু তাকে পেতে নয়, আগে তাকে ভাঙা থেকে বাঁচাতে চাইছে—এটাও সত্যি।

আর নিজের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়ে নয়, নিজের ভবিষ্যৎকে শক্ত করেই যদি কোনোদিন তার পাশে দাঁড়াতে হয়—তবে সেই শক্তি এখন থেকেই গড়তে হবে।

সে বই খুলল।

প্রথমবার সেই দিন সত্যিই পড়তে বসার চেষ্টা করল।

কারণ আজ সে বুঝল—পড়াশোনা সঙ্গীতা থেকে দূরে যাওয়ার পথ নয়।

পড়াশোনা হয়তো একদিন তার পাশে দাঁড়ানোর শক্তি।

---

রাতের অন্য পাশে সঙ্গীতা নিজের ঘরে বসে ছিল।

সূর্য ঘুমিয়ে পড়েছে। ফোন বালিশের পাশে। মুখে ক্লান্তি। ঘরে নীরবতা।

সঙ্গীতা আলমারির ভেতর থেকে নিজের নীল ডায়েরিটা বের করল।

আজ লিখবে কি না ভাবছিল।

তারপর লিখল—

“আজ সে যেতে পারত। আমি আটকাইনি। তবু পুরোপুরি যেতে বলতেও পারিনি। আমি কি স্বার্থপর?”

কলম থামল।

সে অনেকক্ষণ কাগজের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর আবার লিখল—

“আমি তাকে বাঁচাতে চাই। কিন্তু সে না থাকলে আমার ভেতরের যে অংশটা আবার বাঁচতে শুরু করেছে, সেটা কি আবার মরে যাবে?”

তার হাত কাঁপল।

এই প্রশ্নের উত্তর নেই।

সে ডায়েরি বন্ধ করল।

বালিশের পাশে রাখল।

তারপর হঠাৎ মনে হলো, দরজার ওপাশে অয়ন আছে। যায়নি।

এই জানা মাত্রই তার বুকের ভেতর একটা নরম উষ্ণতা ছড়িয়ে গেল।

সে চোখ বন্ধ করল।

“ধন্যবাদ,” সে খুব আস্তে বলল।

কার উদ্দেশে?

অয়নের? নিজের? নাকি সেই অদৃশ্য সাহসের, যা তাকে “যেও না” বলতে না দিলেও “শুধু পালানোর জন্য যেও না” বলতে দিয়েছিল?

সে জানে না।

রাত গভীর হলে অয়ন জল খেতে বেরোল।

করিডোর অন্ধকার। শুধু রান্নাঘরের ছোট আলো জ্বলছে। সে গ্লাসে জল নিল।

ফিরতে গিয়ে দেখল, সঙ্গীতার ঘরের দরজা পুরো বন্ধ নয়। সামান্য ফাঁক।

ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই।

অয়ন দাঁড়াল না। তাকাল না। শুধু নিজের ঘরে ফিরতে গেল।

ঠিক তখন খুব নিচু গলায় সঙ্গীতার ডাক এল—

“অয়ন।”

সে থেমে গেল।

দরজার ফাঁক থেকে সঙ্গীতার মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু গলা।

“হ্যাঁ?”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর সঙ্গীতা বলল,

“পড়বে তো?”

অয়ন বুঝল, এই প্রশ্নের ভেতরে শুধু পড়াশোনার কথা নেই।

এতে বাবার স্বপ্ন আছে। তার ভবিষ্যৎ আছে। সঙ্গীতার ভয় আছে। আর এক অদ্ভুত প্রার্থনা— “নিজেকে হারিও না।”

অয়ন খুব শান্ত গলায় বলল,

“পড়ব।”

সঙ্গীতা বলল,

“আমার জন্য নয়।”

অয়ন উত্তর দিল,

“নিজের জন্য। তারপর… যাদের জন্য দরকার, তাদের জন্য।”

সঙ্গীতা কিছু বলল না।

অয়নও না।

কিছুক্ষণ পরে দরজার ফাঁক একটু বন্ধ হলো।

পুরো নয়।

আবার সামান্য খোলা রইল।

অয়ন নিজের ঘরে ফিরে এল।

আজ দরজা বন্ধ হলো না।

দূরত্বও না।

শুধু যুদ্ধ শুরু হলো—নিজের সঙ্গে, দায়িত্বের সঙ্গে, অনুভূতির সঙ্গে।

আর সেই যুদ্ধের মাঝখানে দুজনেই প্রথমবার বুঝল—

পালানো সহজ।

থেকে নিজেকে সামলানো কঠিন।

কিন্তু হয়তো সত্যিকারের ভালোবাসা শুরু হয় ঠিক সেখানেই, যেখানে মানুষ পালায় না—নিজেকে বদলাতে দাঁড়ায়। চলবে আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: Ko-fi) ব্যবহার করে সাপোর্ট নেওয়া বা দেওয়া বেশ জটিল। তবুও অনেক পাঠক বন্ধু আমাকে আর্থিকভাবে কিছুটা সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যাতে আমি লেখালেখির এই যাত্রাটি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সচল রাখতে পারি।আপনারা যারা স্বেচ্ছায় আমাকে কিছুটা সাপোর্ট করতে চান বা 'কফি ট্রিট' দিতে চান, তারা আমার টেলিগ্রামে (Telegram) একটি মেসেজ দিতে পারেন। সেখানে আমি আমার বিকাশ বা নগদ নম্বরটি শেয়ার করব। আমার টেলিগ্রাম আইডি: @sexstorylover24 একটি বিষয় নিশ্চিত করছি: এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে কোনো প্রকার জোর করা হচ্ছে না। গল্প আগের মতোই নিয়মিত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আপনাদের এই ছোট ছোট ভালোবাসা আমাকে আগামীর পর্বগুলো আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।

এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। যদি কোনো মতামত থাকে জানাতে ভুলবেন না। আমাকে ইমেইল করতে পারেন [email protected] অথবা টেলিগ্রাম এ এসএমএস দিতে পারেন @sexstorylover24 এই নামে। আপনাদের এসএমএস এ আমি উৎসাহ পাই। তাই আমাকে বেশি বেশি করে উৎসাহ দিবেন এই আশা করি।