পরদিন সকালটা আগের দিনের মতো ভারী ছিল না।
PG-এর কথা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিন্তু আপাতত থেমে গেছে। সূর্য বলেছে, অয়নের বাবার সঙ্গে কথা বলে তারপর সিদ্ধান্ত নেবে। এই “তারপর” শব্দটাই ঘরের বাতাসে সামান্য সময় এনে দিয়েছে।
সময়।
যেটুকু মানুষ কখনো চায়, কখনো ভয় পায়।
অয়ন সকাল থেকে পড়ার টেবিলে বসেছিল। শরীর এখন অনেকটাই ভালো। জ্বর নেই, মাথা পরিষ্কার। তবু বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা নরম চাপা ব্যথা। গতকাল ব্যাগের ওপর সঙ্গীতার হাত, তার ওপর নিজের হাত—বারবার মনে পড়ছিল।
সন্ধ্যার চায়ের কাপের স্পর্শও।
দুবারই সঙ্গীতা হাত সরায়নি।
এই না-সরানোকে অয়ন কোনো অধিকার ভাবেনি। সে জানে, সঙ্গীতার চারপাশে ভয় আছে, সম্পর্কের নাম আছে, সূর্য আছে, সমাজ আছে। তবু সে এটাও জানে—কিছু সত্যি আছে, যা মুখে না বললেও শরীরের ছোট্ট থেমে যাওয়ায় ধরা পড়ে।
সে বই খুলে পড়ার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু পাতার অক্ষরগুলো আজও পুরোপুরি মন নিতে পারছিল না।
দরজার বাইরে সঙ্গীতার পায়ের শব্দ হলেই তার চোখ উঠছিল।
আজ সঙ্গীতা চা নিয়ে ঘরে ঢুকল।
চার দিন পর।
অয়ন তাকিয়ে রইল।
সঙ্গীতা যেন স্বাভাবিকভাবে ঢুকেছে, এমন ভঙ্গিতে কাপটা টেবিলে রাখল।
“চা।”
অয়ন বলল,
“আজ দরজার বাইরে রাখলে না?”
সঙ্গীতা চোখ তুলল না।
“তোমার জ্বর নেই। তাই ভেতরে এলাম।”
অয়ন মৃদু হাসল।
“জ্বর না থাকলে দূরত্ব কমে?”
সঙ্গীতা কাপের পাশে ওষুধের পাতা সরিয়ে রাখছিল। হাত থেমে গেল।
“কথা বাড়িও না।”
“আমি তো শুধু জিজ্ঞেস করলাম।”
“সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না।”
অয়ন বলল,
“তুমি প্রায়ই এ কথা বলো।”
সঙ্গীতা একটু তাকাল।
“কারণ তুমি প্রায়ই এমন প্রশ্ন করো, যার উত্তর দিলে বিপদ।”
অয়ন আর কথা বাড়াল না।
তবু তার চোখে একটা শান্ত আনন্দ ছিল। বহুদিন পর সঙ্গীতা তার ঘরে এসেছে। খুব সাধারণভাবে। যেন চা রাখা ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু মানুষ কখনো কখনো সাধারণ কাজের মধ্যেই নিজের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত ভেঙে ফেলে।
সঙ্গীতা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলল,
“দুপুরে হালকা খাবে। পুরোপুরি শক্তি ফেরেনি।”
অয়ন বলল,
“তুমি খাওয়ালে খাব।”
সঙ্গীতা দরজার কাছে থেমে গেল।
এক মুহূর্ত।
তারপর বলল,
“নিজে খেতে শিখো।”
“শিখব। কিন্তু আজ?”
সঙ্গীতা পিছন ফিরে তাকাল না।
“দেখা যাবে।”
সে চলে গেল।
অয়ন কাপ হাতে তুলে নিল।
চায়ের গন্ধে যেন আবার ঘর একটু বাড়ি হয়ে উঠল।
---
দুপুরের আগে সূর্য অফিসে বেরিয়ে গেল।
যাওয়ার সময় ফোনে কথা বলতে বলতে জুতো পরছিল।
“হ্যাঁ, today I’ll be late… না না, evening meeting আছে…”
তার গলায় আগের মতোই তাড়াহুড়ো, বিরক্তি, ব্যস্ততা। সঙ্গীতা শুধু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
সূর্য বেরোনোর আগে বলল,
“অয়নের ওষুধ-টষুধ দেখো। আর বাবাকে ফোন করতে বলো। PG-এর ব্যাপার ঝুলিয়ে রাখলে চলবে না।”
সঙ্গীতা মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা।”
সূর্য চলে গেল।
দরজা বন্ধ হলো।
ঘরটা এক মুহূর্তে অন্যরকম হয়ে গেল।
যেন কেউ কঠিন শব্দের একটা ভার নামিয়ে রেখে গেছে, আর দরজা বন্ধ হতেই ঘর নিঃশ্বাস নিতে পারল।
সঙ্গীতা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ঘুরে রান্নাঘরে গেল।
আজ দুপুরে সে খুব সাধারণ রান্না করছিল—পাতলা ডাল, আলুভাজা, একটু ডিমের ঝোল। অয়নের জন্য। নিজের জন্যও হয়তো। কিন্তু সে নিজেকে বলল, অয়ন জ্বর থেকে উঠেছে, তাই।
নিজের মনের সত্যিকে মানুষ কত নামে ডাকে।
দায়িত্ব। অভ্যাস। মানুষিকতা। সহানুভূতি। যত্ন।
কখনো শুধু ভালোবাসা বলার সাহস পায় না।
---
অয়ন দুপুরে নিজে থেকেই রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।
“সাহায্য করব?”
সঙ্গীতা চমকে তাকাল।
“তুমি আবার রান্নাঘরে কেন?”
“তুমি তো বলেছিলে নতুন মানুষও কাজ করতে পারে।”
“জ্বর থেকে উঠেছ।”
“হ্যাঁ। মরিনি।”
সঙ্গীতা চোখ বড় করল।
“এমন কথা বলো না।”
অয়ন একটু হেসে বলল,
“তাহলে কী বলব?”
“চুপ করে বসে থাকো।”
“সেটা পারি না।”
“জানি।”
এই “জানি”-র ভেতরে অদ্ভুত নরমতা ছিল। অয়ন সেটা শুনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
সঙ্গীতা কড়াইতে আলুভাজা নেড়ে দিচ্ছিল। তেলে ফোড়নের শব্দ, রান্নাঘরে গরম গন্ধ, জানালা দিয়ে আসা দুপুরের আলো—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা খুব ঘরোয়া। অথচ এই ঘরোয়া মুহূর্তের ভেতরেই তাদের সম্পর্কের বিপদ সবচেয়ে বেশি। কারণ মানুষ আকস্মিক ঝড়ে যত না ভাঙে, তার চেয়েও বেশি ভাঙে নরম অভ্যাসে।
অয়ন বলল,
“তোমার কলেজে কী পড়তে ভালো লাগত?”
সঙ্গীতা প্রশ্নটা আশা করেনি।
“হঠাৎ?”
“এমনিই। College Street-এ তুমি বলেছিলে অনেক বই কিনতে আসতে। তারপর আর বলোনি।”
সঙ্গীতা একটু চুপ করে রইল।
“বাংলা সাহিত্য ভালো লাগত।”
“শুধু ভালো লাগত, না খুব ভালো লাগত?”
সঙ্গীতা আলুভাজা নামিয়ে রাখল।
“খুব।”
“তারপর?”
“তারপর বিয়ে হয়ে গেল।”
কথাটা খুব ছোট।
কিন্তু তার ভেতরে কতটা বন্ধ দরজা আছে, অয়ন শুনতে পেল।
সে বলল,
“পড়াশোনা চালাওনি?”
সঙ্গীতা হালকা হাসল।
“বিয়ের পর সব চালানো যায় না।”
“কে বলেছে?”
“যারা বিয়ে ঠিক করে, যারা সংসার শেখায়, যারা বলে মেয়েদের বেশি পড়াশোনা করে লাভ কী—শেষে তো ঘরই সামলাতে হবে।”
অয়ন চুপ।
সঙ্গীতা নিজেই অবাক হলো—সে এত কথা বলছে কেন?
সম্ভবত কারণ অয়ন প্রশ্ন করছে বিচার করার জন্য নয়। জানতে চাওয়ার জন্য।
এই দুইয়ের পার্থক্য অনেক বড়।
অয়ন বলল,
“তুমি কী হতে চাইতে?”
সঙ্গীতা এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
“শিক্ষিকা।”
অয়ন তাকিয়ে রইল।
সঙ্গীতা যেন নিজের মুখে নিজের পুরনো স্বপ্ন শুনে অস্বস্তি পেল। দ্রুত বলল,
“মানে ছোটবেলায় সবাই কিছু না কিছু বলতে ভালোবাসে—doctor, teacher, singer…”
“তুমি সত্যিই হতে চাইতে।”
সঙ্গীতা চোখ নামাল।
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ আমার মনে হতো, বইয়ের ভেতর যে পৃথিবী আছে, সেটা কাউকে দেখাতে পারলে ভালো লাগবে।”
অয়নের মুখে ধীরে এক আলো ফুটল।
“তুমি এখনও পারো।”
সঙ্গীতা হেসে ফেলল। কিন্তু হাসিটা অবিশ্বাসের।
“এই বয়সে?”
“এই বয়সে মানে?”
“বিয়ের এত বছর পর, সংসারের এত কাজের মধ্যে…”
“স্বপ্নের expiry date থাকে?”
সঙ্গীতা তাকাল তার দিকে।
এই ছেলেটা সত্যিই বিপজ্জনক।
সে বড় বড় কথা বলে না, কিন্তু ছোট প্রশ্নে মানুষের জীবন খুলে দেয়।
“সব স্বপ্ন ফিরে আসে না, অয়ন।”
“সব না। কিছু আসে। যদি দরজা পুরোপুরি বন্ধ না করা হয়।”
“আমার দরজা বন্ধ।”
“তাহলে জানালা খুলে শুরু করো।”
সঙ্গীতা চুপ করে গেল।
রান্নাঘরের জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছিল। সত্যিই।
অয়ন সেটা দেখল। সঙ্গীতা-ও দেখল।
দুজনেই কিছু বলল না।
কখনো কখনো কোনো দৃশ্য কথার উত্তর হয়ে দাঁড়ায়।
---
খাওয়ার সময় দুজনই ডাইনিং টেবিলে বসেছিল।
সূর্য নেই।
এই অনুপস্থিতিই যেন এক ধরনের নীরব স্বাধীনতা। কিন্তু সেই স্বাধীনতাও পুরো নয়। কারণ সূর্য না থাকলেও তার নাম, সম্পর্ক, অধিকার—সব ঘরে রয়ে গেছে।
সঙ্গীতা অয়নের প্লেটে ভাত দিল।
“কম নাও। শরীর পুরো সেরে ওঠেনি।”
অয়ন বলল,
“তুমি আজ নিজের প্লেটেও ভাত নাও।”
সঙ্গীতা একটু অবাক।
“আমি নেব।”
“নাও।”
“তুমি আমাকে খাওয়াচ্ছ?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ তুমি অন্যদের খাওয়াতে খাওয়াতে নিজে খেতে ভুলে যাও।”
সঙ্গীতার চোখ একটু নরম হলো।
সে নিজের প্লেটে ভাত নিল।
অয়ন বলল,
“আর একটু।”
“তুমি খুব জেদি।”
“শিখেছি।”
“কার কাছ থেকে?”
“তোমার কাছ থেকে।”
সঙ্গীতা হেসে ফেলল।
অনেকদিন পর এমন হাসি। চাপা নয়, সাজানো নয়, খুব সামান্য, কিন্তু সত্যি।
অয়ন তাকিয়ে রইল।
সঙ্গীতা সেটা টের পেয়ে বলল,
“এভাবে তাকিও না।”
“কীভাবে?”
“যেন আমি…”
সে থেমে গেল।
“যেন তুমি কী?”
সঙ্গীতা চামচ নামিয়ে রাখল।
“যেন আমি শুধু এই বাড়ির কাজের মানুষ নই।”
অয়ন খুব শান্ত গলায় বলল,
“তুমি তা নও।”
সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে বলল,
“জানি না।”
“আমি জানি।”
এই “আমি জানি” কথাটুকু সঙ্গীতার ভেতরে অদ্ভুতভাবে বাজল।
কেউ এত নিশ্চিতভাবে কোনোদিন তাকে তার নিজের মূল্য বলেনি।
সে খুব আস্তে বলল,
“তোমার সামনে আমি ভালো আছি বলে অভিনয় করতে পারি না।”
অয়ন থেমে গেল।
এই ছিল সেই কথা, যা বহুদিন ধরে তাদের মধ্যে ঘুরছিল। আজ প্রথমবার সঙ্গীতা নিজেই বলল।
অয়ন খুব নরম স্বরে বলল,
“তাহলে করো না।”
সঙ্গীতা তাকাল।
অয়ন বলল,
“আমার সামনে ভেঙে পড়লেও তুমি ছোট হবে না।”
সঙ্গীতার চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু সে কাঁদল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
“আমি ভয় পাই।”
“জানি।”
“নিজেকে।”
“তাও জানি।”
“তোমাকে বিশ্বাস করি বলেই ভয় পাই।”
অয়ন চুপ করে গেল।
সঙ্গীতা যেন নিজের কথায় নিজেই থমকে গেল। তারপর ধীরে বলল,
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, অয়ন। খুব বেশি। এই জন্যই ভয় পাই।”
অয়নের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
বিশ্বাস।
ভালোবাসার আগের সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দ।
কারণ যে মানুষকে বিশ্বাস করা যায়, তার সামনে মানুষ নিজের সবচেয়ে অরক্ষিত অংশ খুলে দেয়।
অয়ন আস্তে বলল,
“আমি তোমার বিশ্বাস ভাঙব না।”
সঙ্গীতা চোখ নামাল।
“ভাঙলে আমি বাঁচব না।”
কথাটা খুব নিচু গলায় বলা। প্রায় ফিসফিস। কিন্তু অয়নের শরীরের ভেতর দিয়ে কাঁপুনি গেল।
সে ধীরে বলল,
“তাহলে আমাকেও বাঁচতে হবে সাবধানে।”
সঙ্গীতা সামান্য হাসল।
“তোমার মধ্যে যতটা আগুন, সাবধানে থাকা কঠিন হবে।”
অয়ন বলল,
“তুমি জল দেবে?”
“আমি নিজেই জ্বলছি।”
নীরবতা।
খাওয়ার টেবিল, দুপুরের আলো, অর্ধেক খাওয়া ভাত, দুটি মানুষ—সব হঠাৎ থেমে গেল।
এই কথাগুলোকে কেউ শুনলে কী নাম দিত?
ভুল? পাপ? দুর্বলতা? না কি সত্যি?
সঙ্গীতা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
“খাও। ভাত ঠান্ডা হচ্ছে।”
অয়নও আর কথা বলল না।
কিন্তু দুজনেই জানল—আজ আরেকটা দরজা খুলল।
এবার স্পর্শে নয়।
বিশ্বাসে।
---
দুপুরের পর সঙ্গীতা নিজের ঘরে গেল।
আলমারির ওপরের তাকে একটা পুরনো বাক্স আছে। বহুদিন খোলা হয়নি। বিয়ের সময়ের কিছু শাড়ি, কয়েকটা পুরনো ছবি, আর কিছু কাগজপত্র। সে চেয়ার টেনে দাঁড়াল, বাক্সটা নামাতে গেল।
বাক্সটা ভারী।
সে সামলাতে পারল না। বাক্সটা একটু হেলে গেল।
ঠিক তখন অয়ন দরজার কাছে এসে পড়েছিল।
“সাবধান!”
সে দ্রুত এগিয়ে এসে বাক্সটা ধরে ফেলল।
সঙ্গীতা চমকে গেল।
“তুমি?”
“তোমার ঘরের দরজা খোলা ছিল। শব্দ পেলাম।”
অয়ন বাক্সটা নামিয়ে বিছানার ওপর রাখল।
সঙ্গীতা একটু অপ্রস্তুত।
“আমি নিজেই পারতাম।”
“জানি।”
দুজনেই এই শব্দে থেমে গেল।
“জানি”—তারপরও সাহায্য।
এই এখন তাদের মধ্যে আলাদা এক ভাষা হয়ে গেছে।
অয়ন বলল,
“খুলবে?”
সঙ্গীতা বাক্সের দিকে তাকাল।
“জানি না।”
“খুলতে ভয় লাগছে?”
“পুরনো জিনিস খুললে পুরনো মানুষ বেরিয়ে আসে।”
“হয়তো সেই মানুষটাই দরকার।”
সঙ্গীতা তার দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে বাক্স খুলল।
ভেতরে হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ, কয়েকটা পুরনো college ID-এর ফটোকপি, শুকনো বুকমার্ক, একটা নীল diary, আর পাতলা কিছু কবিতার কাগজ।
অয়ন কিছু বলল না।
সঙ্গীতা নীল diary-টা হাতে নিল।
তার আঙুল কেঁপে উঠল।
“এটা আমি লিখতাম।”
অয়নের চোখ উজ্জ্বল হলো।
“তুমি লিখতে?”
“না, মানে… দু-একটা লাইন। কিছু না।”
“পড়বে?”
সঙ্গীতা দ্রুত মাথা নাড়ল।
“না।”
“কেন?”
“লজ্জা লাগছে।”
“আমার সামনে?”
সঙ্গীতা চুপ করে রইল।
অয়ন বলল,
“তোমার সামনে আমি কত দুর্বল কথা বলে ফেলি। তুমি একটা পুরনো লাইন পড়তে পারবে না?”
সঙ্গীতা মৃদু হাসল।
“তুমি সবসময় ফাঁদ পেতে কথা বলো।”
“তুমি সবসময় ধরা দাও না।”
“আজ?”
“আজ চেষ্টা করো।”
সঙ্গীতা diary খুলল।
পাতাগুলো হলুদ। কিছু জায়গায় কালি ফিকে। কোথাও কোথাও অর্ধেক লেখা। এক জায়গায় থেমে থাকা একটা কবিতা—
সে খুব আস্তে পড়ল,
“যে জানালায় আলো আসে না, সেখানে দাঁড়িয়ে থেকো না— একদিন দেখবে, তোমার ছায়াও তোমাকে ভুলে গেছে।”
পড়তে পড়তেই তার গলা থেমে গেল।
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“এটা তুমি লিখেছ?”
সঙ্গীতা মাথা নাড়ল।
“কলেজে।”
“তখনই তুমি এত একা ছিলে?”
সঙ্গীতা হেসে ফেলল খুব ক্ষীণভাবে।
“তখন একা ছিলাম না। শুধু ভয় পেতাম, একদিন হব।”
অয়ন ধীরে বলল,
“হয়েছ?”
সঙ্গীতা ডায়েরির পাতায় চোখ রেখে বলল,
“হ্যাঁ।”
“এখন?”
সে উত্তর দিল না।
অয়ন আর চাপ দিল না।
কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষ নিজে জানলেও উচ্চারণ করতে ভয় পায়।
সঙ্গীতা diary বন্ধ করতে যাচ্ছিল।
অয়ন বলল,
“আর লিখবে?”
“এখন?”
“হ্যাঁ।”
“কি লিখব?”
“আজকের দুপুর।”
“আজকের দুপুরে কী আছে?”
অয়ন বলল,
“একজন মানুষ বহুদিন পর নিজের পুরনো বাক্স খুলেছে। এটা কি কম?”
সঙ্গীতা ডায়েরির ওপর হাত রাখল।
“আমি লিখতে ভুলে গেছি।”
“হাত ভুলে গেলে আবার শেখে।”
“মন?”
“মনও।”
সঙ্গীতা তাকাল।
অয়ন খুব ধীরে বলল,
“তুমি বলেছিলে, কোনোদিন শুধু নিজের জন্য বাঁচোনি। তাহলে ছোট করে শুরু করো। আজ একটা লাইন লিখো। শুধু নিজের জন্য।”
সঙ্গীতার চোখে জল এল।
“আমি যদি লিখি?”
“আমি পড়ব না। তুমি চাইলে তবেই।”
“সত্যি?”
“সত্যি।”
“তুমি জানতে চাইবে না?”
অয়ন একটু হাসল।
“জানতে চাইব। কিন্তু জোর করব না।”
সঙ্গীতা diary-র ওপর হাত বুলিয়ে বলল,
“এই জন্যই তোমাকে বিশ্বাস করি।”
অয়ন নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
এই কথার উত্তর দিতে নেই।
শুধু গ্রহণ করতে হয়।
---
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো।
সূর্য ফোন করল—আজ ফিরতে দেরি হবে। সঙ্গীতা শুধু “আচ্ছা” বলল। কোনো প্রশ্ন করল না।
তারপর সে চুপচাপ নিজের ঘরে বসে diary খুলল।
অনেকক্ষণ কলম হাতে স্থির।
প্রথমে কিছু লিখতে পারছিল না। হাত যেন সত্যিই ভুলে গেছে।
তারপর ধীরে লিখল—
“আজ কেউ বলল, আমার স্বপ্নের মেয়াদ শেষ হয়নি।”
কলম থামল।
তারপর আরেকটা লাইন—
“আজ কেউ আমার মুখোশ দেখে থামেনি, মুখোশের নিচের মানুষটাকে ডাকল।”
সে লাইন দুটো পড়ে চুপ করে বসে রইল।
বুকের ভেতর কেমন হালকা লাগছিল।
বহুদিন পর সে নিজের জন্য কিছু লিখল।
কাউকে দেখানোর জন্য নয়। সংসারের হিসেবের জন্য নয়। অভিযোগের উত্তর দেওয়ার জন্য নয়।
শুধু নিজের জন্য।
এই ছোট্ট কাজটাই তাকে অদ্ভুতভাবে কাঁপিয়ে দিল।
---
রাতে অয়ন বারান্দায় যায়নি।
সঙ্গীতাও না।
তবু দুজনের মধ্যে আজ দূরত্ব কম লাগছিল।
কারণ সব কাছাকাছি আসা শরীর দিয়ে হয় না। কখনো একজনের পুরনো ডায়েরির পাতা খুলে যায়, আর অন্যজন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে পাহারা দেয়—সেখানেও কাছাকাছি আসে মানুষ।
রাত অনেক হলে সঙ্গীতা চুপচাপ অয়নের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
ভেতরে আলো জ্বলছে।
সে নক করল না।
শুধু দরজার নিচ দিয়ে ভাঁজ করা একটা কাগজ ঢুকিয়ে দিল।
তারপর দ্রুত চলে গেল।
অয়ন শব্দ পেয়ে দরজার দিকে তাকাল। কাগজটা তুলে নিল।
খুলল।
সঙ্গীতার হাতের লেখা—
“আজ একটা লাইন লিখেছি। তোমাকে দেখাচ্ছি না। কিন্তু জানাচ্ছি, লিখেছি।”
অয়ন কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তার মুখে খুব ধীরে হাসি ফুটল।
এই হাসি আনন্দের। তবু চোখ ভিজে উঠল।
সে কাগজের নিচে নিজের কলম দিয়ে শুধু লিখল—
“এটাই শুরু।”
তারপর কাগজটা ভাঁজ করে নিজের বইয়ের ভেতর রেখে দিল।
---
সঙ্গীতা নিজের ঘরে ফিরে বিছানার পাশে বসে ছিল।
তার বুক ধকধক করছে। যেন কোনো বড় অপরাধ করেছে। অথচ সে শুধু লিখেছে—একটা লাইন।
কিন্তু এই লাইনটাই অনেক বড়।
কারণ এতদিন সে শুধু অন্যদের জন্য বেঁচেছে। আজ প্রথমবার নিজের ভেতরের মানুষটাকে একটু জায়গা দিয়েছে।
অয়ন তাকে কিছু দাবি করেনি। কিছু চায়নি। শুধু বলেছে—শুরু করো।
এই “শুরু” শব্দটা তার ভেতরে আলো জ্বালাচ্ছিল।
সূর্য এখনও ফেরেনি।
ঘর নীরব।
সঙ্গীতা diary খুলে আবার লিখল—
“আমি জানি না, এই পথ কোথায় যাবে। কিন্তু আজ প্রথমবার মনে হলো, আমি পুরোপুরি মৃত নই।”
লিখে সে কলম নামিয়ে রাখল।
তার হাত কাঁপছিল।
ভয় আছে। লজ্জা আছে। নিষেধ আছে। কিন্তু তার ভেতরে আজ আরেকটা জিনিসও আছে।
নিজেকে ফিরে পাওয়ার ক্ষুদ্র সাহস।
---
অয়ন নিজের ঘরে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।
কিন্তু ঘুম এল না।
তার বুকের কাছে বই। বইয়ের ভেতরে সঙ্গীতার কাগজ।
“আজ একটা লাইন লিখেছি…”
এইটুকুই।
তবু অয়নের মনে হলো, সে যেন আজ সঙ্গীতাকে ছুঁয়েছে—শরীর নয়, তার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নকে।
সে চোখ বন্ধ করল।
মনে পড়ল দুপুরের কথা—
“তোমার সামনে আমি ভালো আছি বলে অভিনয় করতে পারি না।”
“তাহলে করো না।”
এই দুই বাক্যের ভেতরেই কি তাদের সম্পর্কের নতুন নাম আছে?
হয়তো।
কিন্তু সেই নাম উচ্চারণ করার সময় এখনও আসেনি।
বাইরে রাত গভীর।
গোলাপফুলটা অন্ধকারে নিশ্চুপ।
আর একই বাড়ির দুই ঘরে দুজন মানুষ আলাদা শুয়ে থেকেও জানল—
আজ তারা একে অন্যের আরও কাছে এসেছে।
কোনো স্পর্শে নয়।
কোনো নিষিদ্ধ উচ্চারণে নয়।
একটা বিশ্বাসে।
একটা ডায়েরির পাতায়।
একটা ছোট্ট বাক্যে—
“এটাই শুরু।”
চলবে আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: Ko-fi) ব্যবহার করে সাপোর্ট নেওয়া বা দেওয়া বেশ জটিল। তবুও অনেক পাঠক বন্ধু আমাকে আর্থিকভাবে কিছুটা সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যাতে আমি লেখালেখির এই যাত্রাটি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সচল রাখতে পারি।আপনারা যারা স্বেচ্ছায় আমাকে কিছুটা সাপোর্ট করতে চান বা 'কফি ট্রিট' দিতে চান, তারা আমার টেলিগ্রামে (Telegram) একটি মেসেজ দিতে পারেন। সেখানে আমি আমার বিকাশ বা নগদ নম্বরটি শেয়ার করব। আমার টেলিগ্রাম আইডি: @sexstorylover24 একটি বিষয় নিশ্চিত করছি: এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে কোনো প্রকার জোর করা হচ্ছে না। গল্প আগের মতোই নিয়মিত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আপনাদের এই ছোট ছোট ভালোবাসা আমাকে আগামীর পর্বগুলো আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। যদি কোনো মতামত থাকে জানাতে ভুলবেন না। আমাকে ইমেইল করতে পারেন [email protected] অথবা টেলিগ্রাম এ এসএমএস দিতে পারেন @sexstorylover24 এই নামে। আপনাদের এসএমএস এ আমি উৎসাহ পাই। তাই আমাকে বেশি বেশি করে উৎসাহ দিবেন এই আশা করি।