হাইওয়ের নীল জ্যামিতি পর্ব ৪

haioer niil jyamiti prb 4

লেখক: BengaliLekhika

ক্যাটাগরি: ফ্যান্টাসি

সিরিজ: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি

প্রকাশের সময়:08 Mar 2026

আগের পর্ব: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি পর্ব ৩

পর্ব ৪র্থ ঘর্মাক্ত রোদে নিশির ডাক

ভোর সোয়া ছয়টা। বনানী ডিওএইচএসের আকাশটা এখন মরা মাছের চোখের মতো ফ্যাকাসে ধূসর। চারপাশের অভিজাত নিস্তব্ধতাকে চিরে মাঝে মাঝে দু-একটা কাকের ডাক শোনা যাচ্ছে। মোর্শেদ তার বারান্দার ইজি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছে। তার সামনে রাখা কাঁচের টি-টেবিলটা এখন একটা ছোটখাটো ধ্বংসস্তূপ। অ্যাশট্রেটা উপচে পড়ছে মার্লবরো রেডের ফিল্টারে। গত কয়েক ঘণ্টায় সে যে কতগুলো সিগারেট পুড়িয়েছে, তার হিসেব নেই। সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারেনি মোর্শেদ। পকেটে অঢেল অর্থ থাকলে একাকীত্ব কাটানোর নানা পথ খুলে যায়, মোর্শেদও তার ব্যতিক্রম নয়। দামী হুইস্কি থেকে শুরু করে রাইডিংয়ের নেশা—সবই সে পরখ করেছে। কিন্তু সামিনা নামের এই নারীটি তার জীবনে যে নতুন নেশার জন্ম দিয়েছে, তার তীব্রতা অন্য সব কিছুকে হার মানিয়ে দিচ্ছে। সামিনা যেন কোনো মানুষ নয়, বরং এক অদৃশ্য ড্রাগ, যা মোর্শেদের রক্তে মিশে গেছে। কাল সারা রাত সে আধোঘুমে, আধোজাগরণে সামিনার কথা ভেবেই পার করে দিয়েছে। ভোরের এই মিঠে রোদে মোর্শেদের শরীরটা তন্দ্রায় একটু এলিয়ে আসছিল, কিন্তু সামিনার নেশা তাকে বেশিক্ষণ ঝিমোতে দিল না। হঠাত্‍ ধড়ফড় করে উঠে বসল সে। ঘড়িতে এখন সকাল পৌনে সাতটা। সামিনা কথা দিয়েছিল, আজ স্কুলে যাওয়ার আগে সে মোর্শেদকে একটা ছবি পাঠাবে। এই প্রথম মোর্শেদ তাকে সশরীরে দেখবে—অন্তত ডিজিটাল পর্দায়। কিন্তু মেসেঞ্জার এখনো নিস্তব্ধ। মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল—সামিনা কি এখন উঠেছে? নাকি ও আরও ভোরে জাগে? ও তো বলেছিল ও আর্ট টিচার। মোর্শেদের কল্পনায় সামিনার একটা ধোঁয়াটে অবয়ব তৈরি হলো। যাত্রাবাড়ীর কোনো এক সাধারণ ফ্ল্যাটে সামিনা হয়তো এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়ির কুঁচি ঠিক করছে। অথবা হয়তো রান্নাঘরে কড়া করে চা বানাচ্ছে। মোর্শেদ নিজের মনেই হাসল। সে কখনও ভাবেনি পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে কোনো এক অদেখা নারীর দৈনন্দিন রুটিন নিয়ে সে কিশোরদের মতো ব্যাকুল হয়ে পড়বে। মিনিট পনেরো পার হয়ে গেল। ফোনের নোটিফিকেশন লাইটটা এখনো জ্বলে ওঠেনি। মোর্শেদের ভেতরে একটা চাপা অস্থিরতা কাজ করতে শুরু করল। সামিনা কি ইচ্ছা করেই দেরি করছে? নাকি সে মোর্শেদকে কেবল একলা রাতের কোনো মরীচিকা হিসেবেই রেখে দিতে চায়? মোর্শেদ ভাবল—"কয়টায় বের হয় সামিনা? ও কি বাসে যায়? যাত্রাবাড়ীর সেই জ্যামে আটকে থেকে ও কি এখন ঘামছে? নাকি ও আমাকে নিয়ে খেলছে?" সে মেসেঞ্জার ওপেন করল। সামিনা অনলাইনে নেই। লাস্ট সিন দেখাচ্ছে ভোর ৫টা ২০ মিনিট। তার মানে ও অনেক ভোরেই জেগেছে। মোর্শেদ টাইপিং বক্সে আঙুল রাখল, কিন্তু কিছু লিখল না। একজন অভিজ্ঞ পুরুষের মতো সে তার অস্থিরতাকে আড়াল করতে চায়। সে চায় না সামিনা বুঝুক যে বনানীর এই দামী ফ্ল্যাটে বসে একজন কোটিপতি রাইডার সামান্য একটা ছবির জন্য কতটা তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, মোর্শেদের ঝিমুনি তত কাটছে আর বাড়ছে তার আদিম ক্ষুধা। সামিনা ছবি না পাঠিয়ে তাকে এক ধরণের মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই প্রতীক্ষাটাই যেন একটা আলাদা নেশা। মোর্শেদের মনে হলো, সামিনা হয়তো এখন কোনো এক ব্যস্ত রাস্তায় রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে, আর মনে মনে মোর্শেদের এই অস্থিরতাকে উপভোগ করছে। সে উঠে দাঁড়াল। বারান্দার রেলিং ধরে বাইরের দিকে তাকাল। তার কালো রঙের রয়্যাল এনফিল্ডটা নিচে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মোর্শেদের মনে এক অদ্ভুত জেদ দানা বাঁধল। সামিনা ছবি দেয়নি তাতে কী? সামিনা তো বলেছিল সে কোন স্কুলে পড়ায়। মোর্শেদ কি পারবে না সেই ঘিঞ্জি যাত্রাবাড়ীর অলিগলিতে সামিনাকে খুঁজে বের করতে? মোর্শেদ বিড়বিড় করে বলল, "সামিনা, তুমি ছবি না পাঠিয়ে আমাকে ঘরছাড়া করার পথটাই বেছে নিলে।" বারান্দার রেলিংয়ে জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো রোদের স্পর্শে বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। মোর্শেদ তার আরামদায়ক ইজি চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। গত কয়েক ঘণ্টায় সে যে পরিমাণ নিকোটিন শরীরে ঢুকিয়েছে, তাতে মস্তিষ্কটা ঝিমঝিম করছে। সারা রাতের জেগে থাকা আর সামিনার ওই অদেখা রূপের কাল্পনিক ব্যবচ্ছেদ তাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। সে টলটলে পায়ে ঘরের ভেতর ফিরে এল। এসি-র ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঘরটা একটা হিমঘরের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। মোর্শেদ তার বিশাল কিং সাইজ বেডটায় ধপাস করে গা এলিয়ে দিল। সাদা ধবধবে সিল্কের চাদরটা তার শরীরের উত্তাপে কুঁচকে গেল। এই বিছানাটা কতদিন ধরে কেবল একজন মানুষেরই ভার বহন করে আসছে। একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেমে এই বিশাল খাটটা তার কাছে এক নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো। বালিশে মাথা রেখেই সে তার স্মার্টফোনটা হাতে নিল। সামিনার নেশাটা এখন তার রক্তে টগবগ করছে। সে চাইছিল সামিনা তাকে ছবি পাঠাবে, কিন্তু সামিনা নিরুত্তর। মোর্শেদের মনে এক অদ্ভুত জেদ চাপল। সে নিজেই নিজেকে মেলে ধরবে সামিনার কাছে। সে ফোনটা উঁচিয়ে ধরল। বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় নিজের একটা সেলফি তুলল সে। ছবিতে তার পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ চেহারায় রাতের জাগরণ আর কামনার একটা অস্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠেছে। হালকা কাঁচা-পাকা দাড়ি, চোখের নিচে কালচে ছায়া আর খোলা বুকের লোমের ওপর হিরের লকেটের মতো চিকচিক করছে ঘামের বিন্দু। ছবিটা সিলেক্ট করে সে সামিনার ইনবক্সে সেন্ড করল। ছবির সাথে সে লিখল— "এই হিমশীতল বিছানায় আমি একা, অথচ আমার শরীরে দাউদাউ করে জ্বলছে যাত্রাবাড়ীর কোনো এক অদেখা আগুনের আঁচ। আমার এই সুশৃঙ্খল একাকীত্ব আজ বড্ড অবাধ্য হতে চাইছে সামিনা। তুমি কি সত্যিই আসবে এই জ্যামিতি মেলাতে? শুভ সকাল, আমার কাল্পনিক মরণনেশা।" মেসেজটা পাঠিয়ে সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। কিন্তু না, মেসেজের পাশে থাকা সেই ছোট সার্কেলটা পূর্ণ হলো না। কেবল একটা সাদা টিক চিহ্ন পড়ে থাকল। অর্থাৎ সামিনা এখনো অনলাইনে আসেনি। মোর্শেদ বিড়বিড় করল, "এখনো ওঠেনি ও? নাকি ইচ্ছা করেই এড়িয়ে যাচ্ছে?" সে ভাবতে লাগল—সামিনা কি এখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে? ওর অগোছালো চুলে কি সকালের আলো এসে পড়েছে? নাকি ও এখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত হাতে সিঁদুর বা কাজলের প্রলেপ দিচ্ছে? মোর্শেদের মনের ভেতর সামিনার একটা কাল্পনিক শরীর বারবার যাতায়াত করছে। সে ভাবল, সামিনা কি মেসেজটা দেখে হাসবে? নাকি তার এই সরাসরি কামনামদির আহ্বানকে ঘৃণা করবে? মিনিট পাঁচেক পার হলো। দশ মিনিট। পনেরো মিনিট। ফোনের নীল আলোটা নিভে অন্ধকার হয়ে গেল, কিন্তু কোনো ফিরতি সংকেত এল না। মোর্শেদের ভেতরে এক ধরণের অবসাদ নেমে এল। অতিরিক্ত মদ্যপান আর নির্ঘুম রাতের ধকল এবার তার শরীর নিতে পারছে না। তার চোখের পাতা দুটো সীসার মতো ভারী হয়ে আসছে। সে ফোনটা বুকের ওপর রেখেই চোখ বুজল। তার অবচেতন মন এখনো সামিনার অপেক্ষায় সজাগ। সে ভাবল, সামিনা যখন অনলাইনে আসবে, তখন নিশ্চয়ই ফোনটা কেঁপে উঠবে। সেই কম্পনটাই হবে তার আজকের দিনের শ্রেষ্ঠ সুর। অপেক্ষার এই যন্ত্রণাদায়ক তৃপ্তি নিয়েই মোর্শেদ এক সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ঘুমের ভেতর সে দেখল, সে তার রয়্যাল এনফিল্ড নিয়ে একটা অন্তহীন হাইওয়ে দিয়ে ছুটছে। তার পেছনে সামিনা বসে আছে, যার হাত দুটো মোর্শেদের উদাম বুকের ওপর শক্ত করে রাখা। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর ইঞ্জিনের গর্জনের মাঝে সামিনা তার কানে ফিসফিস করে বলছে, "মানুষ চিনে নেওয়া বড্ড কঠিন, মোর্শেদ সাহেব।" বনানীর সেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে তখন সকালের কড়া রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু মোর্শেদ তখন এক অলীক প্রেমের ঘোরে আচ্ছন্ন। সামিনার সেই না আসা মেসেজ আর না দেখা ছবিটাই যেন তার ঘুমের ভেতর এক রহস্যময় ইকোসিস্টেম তৈরি করে ফেলেছে। বেলা এগারোটা বেজে কুড়ি মিনিট। বনানী ডিওএইচএসের আকাশচুম্বী আভিজাত্য চিরে রোদের তীব্র তীক্ষ্ণ ফালিগুলো ভারী পর্দার ফাঁক গলে মোর্শেদের শয়নকক্ষে হানা দিয়েছে। এসি-র কৃত্রিম হিমশীতল বাতাসের সাথে বাইরের তপ্ত দুপুরের এই লড়াইয়ে ঘরটা কেমন গুমোট হয়ে আছে। মোর্শেদ পাশ ফিরল। গভীর এক অবশ করা ঘুম থেকে টেনে তোলার এই চেষ্টা তার শরীরের প্রতিটি পেশি প্রত্যাখ্যান করছে। সে দুহাতে মুখ ঘষল, তারপর চোখ মুখ কুঁচকে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে পড়ে থাকল কতক্ষণ। চোখদুটো ভীষণ জ্বালা করছে। গত রাতের অতিরিক্ত মদ্যপান, উপর্যুপরি সিগারেটের ধোঁয়া আর ভোরের সেই তীব্র মানসিক উত্তেজনা—সব মিলে তার মগজের ভেতর এখন কেউ যেন হাতুড়ি পিটাচ্ছে। জানালার পর্দার পাশ দিয়ে আসা সূর্যের আলোটা তার চোখে বিঁধছে সূঁচের মতো। সে তাকাতে পারছে না। তবুও, শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সে উঠে বসল। একটা অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করছে। বিছানার পাশে পড়ে থাকা ফোনটার দিকে তাকাতেই তার হৃদস্পন্দন একটু বেড়ে গেল। সেই চেনা নেশা, সামিনার নেশা। মোর্শেদ হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল। আঙ্গুলের ছোঁয়ায় স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। কোনো নতুন নোটিফিকেশন নেই। সে দ্রুত মেসেঞ্জার ওপেন করল। না, কোনো ছবি আসেনি। ছবি তো দূরের কথা, মোর্শেদ ভোরে নিজের যে ছবি আর সেই কামনামদির মেসেজ পাঠিয়েছিল, সেটির পাশে থাকা সেই সাদা বৃত্তটি এখনো পূর্ণ হয়নি। অর্থাৎ সামিনা এখনো অনলাইনে আসেনি। মোর্শেদের মেসেজটি তার সার্ভারে পৌঁছালেও সামিনার হ্যান্ডসেটে পৌঁছায়নি। এক মুহূর্তের জন্য মোর্শেদের মনে হলো সময়টা থেমে গেছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের এই সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষটি, যার ইশারায় ঢাকার রিয়েল এস্টেট জগতের ছোটখাটো ভূমিকম্প হতে পারে, সে আজ একজন অদেখা স্কুল শিক্ষিকার মেসেজের অপেক্ষায় ভিখারির মতো বসে আছে। একরাশ চরম বিতৃষ্ণা আর অপমানের এক বিষাক্ত ঢেউ তার বুক চিরে নেমে গেল। নিজেকে নিজের কাছেই খুব ছোট মনে হতে লাগল তার। "সামিনা কি সত্যিই সাধারণ কোনো স্কুল শিক্ষিকা? নাকি সে আমাকে নিয়ে একটা মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলছে?"—মোর্শেদের মনে এই প্রশ্নটা তীরের মতো বিঁধল। তার মতো একজন মানুষের পাঠানো ছবি এবং এত খোলামেলা এক আহ্বানের কোনো উত্তর নেই, এমনকি রিসিভ পর্যন্ত করা হয়নি—এই অপমান মোর্শেদের দামী নীল রক্ত সহ্য করতে পারছে না। তার ইগোতে এক বিরাট ফাটল ধরেছে। তার মনে হলো, সামিনা হয়তো এই মুহূর্তে অন্য কারও সাথে হাসাহাসি করছে, অথবা মোর্শেদের এই অস্থিরতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নিজের প্রাত্যহিক কাজ সারছে। সে আর বিছানায় বসে থাকতে পারল না। ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মাথাটা ঘুরে উঠল একবার, কিন্তু সে তোয়াক্কা করল না। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা স্কচের বোতলটার দিকে হাত বাড়াল সে। গ্লাসে ঢালার সময়টুকুও যেন তার তর সইছে না। গরম হয়ে থাকা এক পেগ স্কচ সরাসরি গলার ভেতর চালান করে দিল সে। তীব্র তরলটা যখন তার খাদ্যনালী পুড়িয়ে পাকস্থলীতে নামল, তখন সে কিছুটা স্থির হলো। কিন্তু মনের ভেতর যে আগুন জ্বলছে, তা নেভানোর শক্তি এই অ্যালকোহলের নেই। স্নান করার কথা একবার মাথায় এলেও সে তা বাতিল করে দিল। শরীরের ঘাম আর রাতের বাসি গন্ধের সাথেই সে এক ধরণের আদিম তৃপ্তি পাচ্ছে। এই নোংরা একাকীত্বই এখন তার ভূষণ। আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। হাজারো দামী ব্র্যান্ডের জামাকাপড়ের ভিড়ে সে এমন কিছু খুঁজছে যা তাকে এই মুহূর্তের অস্থিরতা থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু কোনো নতুন পোশাক আজ তার চামড়াকে শান্তি দিতে পারছে না। মোর্শেদ আলমারি থেকে হাত সরিয়ে আনল। তার চোখ পড়ল ঘরের এক কোণে সোফার ওপর পড়ে থাকা কালকের সেই বাসি ডেনিম জিন্সটার ওপর। কাল সারা রাত যে অস্থিরতা সে যাপন করেছে, এই জিন্সটা তার সাক্ষী। সে ওটাই টেনে নিল। প্যান্টটা পরার সময় তার মনে হলো, সামিনার সাথে এই অদেখা যুদ্ধের ময়দানে নামতে হলে এই বাসি পোশাকটাই তার সঠিক বর্ম। আলমারির ওপরের তাক থেকে একটা ধবধবে সাদা ফুল হাতা শার্ট বের করে আনল সে। বাইরের তপ্ত রোদে নীল বা কালো রঙ মানেই শরীরের ভেতর উনুন জ্বালিয়ে রাখা। সাদা রঙটা তাকে কিছুটা হলেও শীতলতা দেবে— অন্ততঃ বাহ্যিকভাবে। শার্টের বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে মোর্শেদ আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। এরপর খুব ধীরলয়ে শার্টের হাতা দুটোকে কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করে নিল সে। আয়নার সামনে নিজের পেশিবহুল হাত দুটোর দিকে সে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সেও জিমের নিয়মিত ঘাম ঝরানো বৃথা যায়নি। তার শক্তিশালী হাতের শিরা-উপশিরাগুলো চামড়ার ওপর স্পষ্ট জেগে আছে— ঠিক যেন মানচিত্রের কোনো দুর্গম নদীপথ। এই শিরাগুলোর দিকে তাকালে এক ধরণের আদিম পৌরুষ অনুভূত হয়। তবে হাতের কব্জির কাছে দুই-একটা পাকা লোম রুপোলি সুতোর মতো উঁকি দিচ্ছে। মোর্শেদ হাসল— একটা বিষণ্ণ, বাঁকা হাসি। এই কয়েকটা পাকা লোমই তাকে জানান দিচ্ছে যে তার সময় ফুরিয়ে আসছে, অথচ তার তৃষ্ণা এখনো সতেজ। সে নিচে ঝুঁকে তার হাশপাপিজ-এর বাদামী কালারের চেলসি বুট জোড়া পায়ে গলিয়ে নিল। জুতোর ফিতের টান বা চামড়ার শক্ত বাঁধন তাকে যেন মাটির সাথে আরও দৃঢ়ভাবে গেঁথে দিল। না, সে সামিনাকে খুঁজতে বেরোচ্ছে না। সামিনার প্রতি তার যে অভিমান, সেই অভিমানকে প্রশ্রয় দিতেই সে ঘর ছাড়ছে। একজন স্বপ্রতিষ্ঠিত, সফল পুরুষকে এভাবে উপেক্ষিত রেখে সামিনা যে জয় পেয়েছে, মোর্শেদ সেই জয়ের স্বাদ তাকে এত সহজে নিতে দেবে না। সে আজ সামিনার ইনবক্সে কোনো নক করবে না, দেখবে না সে অনলাইনে এসেছে কি না। বরং সে আজ নিজের নিঃসঙ্গতাকে এই তপ্ত রাজপথে উড়িয়ে দেবে। মোর্শেদ যখন তার শয়নকক্ষ ছেড়ে গ্যারেজে এল, তখন চারপাশের বাতাস আগুনের হল্কার মতো তার শরীরে বিঁধছে। কভার সরিয়ে তার রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ৩৫০-এর ওপর যখন সে বসল, তখন সিটের চামড়াটা রোদে তেতে আছে। সে চাবিটা অন করল। ইঞ্জিনের প্রথম স্টার্টটা যখন হলো, সেই গুরুগম্ভীর 'থাম্প' শব্দটা বনানীর নিস্তব্ধতাকে চিরে খানখান করে দিল। ক্লাচ চেপে গিয়ার ফেলতেই মোর্শেদ অনুভব করল এক অদ্ভুত মুক্তি। সে বনানীর ভিআইপি রোডের মসৃণতা ছাড়িয়ে মূল শহরের দিকে নাক ঘোরাল। বাইরের রাস্তাটা তখন রোদে ফেটে চৌচির হওয়ার উপক্রম। পিচঢালা কালো রাস্তা থেকে আগুনের উত্তাপ উঠছে। মোর্শেদ তার হেলমেটের ভাইজারটা নামাল না। সরাসরি তপ্ত বাতাসটা চোখেমুখে লাগতে দিল। সে জানে না সে কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু তার মেটিওর আজ তাকে সেই সব রাস্তায় নিয়ে যাবে যেখানে একাকীত্ব আর গতির কোনো সীমানা নেই। সামিনার সেই অনুত্তরিত মেসেজটা এখন তার পকেটে থাকা ফোনের ভেতর ধিকধিক করে জ্বলছে, কিন্তু মোর্শেদ আজ নিজেকে জেতাবে। সে দেখাবে যে, সামিনা ছাড়াও তার একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেম স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাইকের এক্সিলারেটরটা একটু বেশিই মুচড়ে দিল সে। রোদে পুড়ে যেতে থাকা ঢাকার রাস্তায় মোর্শেদ আজ এক একাকী অভিমানী নাবিক, যে তার যান্ত্রিক ঘোড়ায় চড়ে নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পেতে চাইছে। বনানীর সুশৃঙ্খল আভিজাত্য পেছনে ফেলে মোর্শেদের রয়্যাল এনফিল্ড এখন তেজগাঁওয়ের জটলা ছাড়িয়ে কমলাপুরের দিকে ছুটছে। সে নিজেকে ভীষণভাবে ব্যস্ত রাখতে চায়। সামিনা নামের ওই অদৃশ্য মরণনেশা থেকে নিজেকে ছিঁড়ে বের করে আনার জন্য সে আজ বাইকের এক্সিলারেটরটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি মুচড়ে ধরেছে। বাতাসের তপ্ত ঝাপটা তার সাদা শার্টটাকে বুক চিরে ফুলিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তার মনের ভেতরের গুমোট তাতে একটুও কমছে না। যতটুকু সময় সে বাইক চালাচ্ছে, ততটুকু সময় সে অন্য কিছু ভাবতে চায়। কিন্তু মস্তিষ্ক তার অবাধ্য। ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে তাল মিলিয়ে তার মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে কাল রাতের সেই আধো-অন্ধকার কথোপকথন। সে কল্পনা করতে পারছে, সামিনা হয়তো এতক্ষণে তার সেই ছোট স্কুলটার কোনো এক ক্লাসরুমে বাচ্চাদের ড্রয়িং খাতা দেখছে। কাল রাতে সামিনা তাকে বলেছিল স্নিগ্ধ অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়ার কথা, আর আজ সকালে হয়তো সে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে খুব সাধারণ কোনো সাজে। মোর্শেদের চোখের সামনে ভাসে—সামিনা হয়তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে একটা কালো টিপ বসিয়েছে, কিংবা ঘাড়ের অবাধ্য চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে আটকে নেওয়ার সময় তার ফর্সা ঘাড়ের ওপর ভোরের আলো খেলা করেছে। এই ছবিগুলো মোর্শেদ বাস্তবে দেখেনি, কিন্তু না দেখার এই রহস্যই তাকে বেশি পোড়াচ্ছে। দুপুরের ঢাকা যেন এক নরককুণ্ড। পিচঢালা রাজপথগুলো জ্যামে আটকে গেছে। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা বাস আর রিকশার জটলা থেকে গরম হল্কা বেরোচ্ছে, যা মোর্শেদের সাদা শার্টের নিচে জমা হওয়া ঘামকে আরও চটচটে করে তুলছে। কিন্তু মোর্শেদের কোনো থামাথামি নেই। সে জ্যামের ফাঁক গলে, ফুটপাতের ধার ঘেঁষে অবলীলায় তার ভারী ৩৫০ সিসির দানবটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার গন্তব্য কমলাপুর রেল স্টেশনের পেছনের সেই ঘিঞ্জি বস্তি এলাকা। সেখানে একটা ভাঙাচোরা পুরোনো টং দোকান আছে— মোর্শেদের বন্ধুদের আড্ডার পুরোনো ঠেক। যখন তার পকেটে আজকের মতো এত প্রাচুর্য ছিল না, যখন জীবনের অর্থ ছিল স্রেফ বেঁচে থাকা, তখন সে এখানেই পড়ে থাকত। আজ নিজের এই সাজানো আভিজাত্য আর সামিনার দেওয়া 'ইগনোরেন্স' বা অবহেলা ভুলতে সে তার সেই পুরোনো বখে যাওয়া বন্ধুদের কাছে ফিরে যেতে চাইছে। যারা জীবনের কোনো গূঢ় মানে খোঁজে না, যারা স্রেফ ধোঁয়া আর আড্ডায় দিন পার করে দেয়। বাইক চালাতে চালাতেই মোর্শেদের হঠাৎ তীব্র নেশার তৃষ্ণা পেল। নেশার কথা মনে হতেই তার মাথায় এল গাঁজার সেই আদিম ঘ্রাণের কথা। কমলাপুরের ওই গলিতে গেলেই মিলবে সেই তীব্র ঘ্রাণ, যা সাময়িকভাবে মগজটাকে অবশ করে দেবে। একই সাথে তার মনে পড়ে গেল সামিনার কথা—সামিনাও তো এক ধরণের নেশা, যার কোনো কাটান নেই। নেশা আর সামিনা—দুটো শব্দ মোর্শেদের মগজে এখন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে অনুভব করল তার হাতের শিরাগুলো বাইকের হ্যান্ডেলবার চেপে ধরার কারণে আরও স্পষ্টভাবে জেগে উঠেছে। হাতের সেই পাকা লোমগুলো তপ্ত বাতাসে কাঁপছে, যা তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে সে এখন আর কোনো তরুণ নয়। তার এই বয়সের গাম্ভীর্য আজ একজন সাধারণ নারীর কাছে পরাজিত। এই পরাজয়বোধ তাকে আরও উম্মাদ করে তুলছে। রাস্তা এখন রোদে ফেটে চৌচির হওয়ার উপক্রম। পিচ থেকে ওঠা বাষ্পের আস্তরণ সামনের দৃশ্যপটকে কিছুটা ঝাপসা করে দিচ্ছে। মোর্শেদ তার বাইকের গতি আরও বাড়িয়ে দিল। সে নিজেকে এই জ্যাম, এই উত্তাপ আর এই অপমানের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে চায়। কমলাপুরের সেই ধুলোবালি মাখা গলিটা এখন তার কাছে এক ধরণের আশ্রয়স্থল। সেখানে গেলে হয়তো সামিনার এই অদৃশ্য মায়া থেকে সে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে। রয়্যাল এনফিল্ডের চাকাগুলো যখন কমলাপুরের এবড়োখেবড়ো রাস্তায় গিয়ে পড়ল, তখন মোর্শেদের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে সামিনাকে খুঁজতে বের হয়নি, সে বের হয়েছে নিজের অস্তিত্বের সেই পুরোনো শিকড় খুঁজতে—যেখানে কোনো আভিজাত্য নেই, কোনো অপমান নেই, আছে কেবল আদিম এক একাকীত্ব। কমলাপুরের সেই পরিচিত ঘিঞ্জি গলিটার মুখে যখন মোর্শেদ তার রয়্যাল এনফিল্ড নিয়ে এসে থামল, তখন ঘড়িতে বারোটা বেজে কুড়ি মিনিট। মাথার ওপর সূর্যটা এখন যেন আগুন ঢালছে। সাদা শার্টটা পিঠের সাথে লেপটে গেছে ঘামে, কিন্তু মোর্শেদের সেদিকে খেয়াল নেই। বাইকটা স্ট্যান্ড করে সে হেলমেটটা হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে রাখল। টং দোকানের সেই পুরনো কাঠের বেঞ্চিতে তাকাতেই মোর্শেদের চোখে পড়ল সেলিমকে। সেলিম ওর অনেক পুরনো বন্ধু, যার মৌচাক রুটে চলাচল করা হাইওয়ে বাসের একটা কোম্পানিতে ভালো শেয়ার আছে। গায়ে একটা ঢিলেঢালা হাফ হাতা শার্ট, চোখে সানগ্লাস কপালে তুলে সেলিম আয়েশ করে একটা সস্তা সিগারেট টানছে। মোর্শেদকে দেখেই সেলিম সিট ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠল। মোর্শেদ তখনও বাইক থেকে পুরোপুরি নামে নি, তার আগেই সেলিম ওর স্বভাবজাত ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠল, "আরে ওস্তাদ! কিরে হা*লার পুত, তুই মরস নাই অহনও? কোন চিপায় হারাইছিলি এত দিন?" সেলিমের এই অকথ্য গালিটা যেন মোর্শেদের আভিজাত্যের দেয়ালে একটা ধাক্কা দিল, কিন্তু এটা বিরক্তির নয়, বরং এক অদ্ভুত স্বস্তির। বনানীর সেই ফর্মাল ড্রয়িংরুমের সভ্যতার চেয়ে সেলিমের এই নোংরা গালিটাই এখন তার কানে মধুর লাগছে। মোর্শেদ একটা ম্লান হাসি দিয়ে বাইক থেকে নামল। তারপর পা টেনে সেলিমের পাশের বেঞ্চিটায় গিয়ে বসল। সেলিম হাসতে হাসতে বলল, "তোর দেখি হায়াত আছে রে কড়া। আইজকা সকালেই তোর কথা ভাবতেছিলাম।" মোর্শেদ পকেট থেকে লাইটার বের করে একটা সিগারেট ধরিয়ে শান্ত গলায় বলল, "ভাবলে তো আর হয় না, ফোন তো দিতে পারিস একটা। ভুলে তো গেছিস সব।" সেলিম এবার উল্টো রেগে গিয়ে ঝারি দেওয়ার সুরে বলল, "ওই মিয়া, তুই কি আমারে বলদ পাইছস? একটু আগেই তো তোরে ফোন দিলাম। তুই ধরস নাই। ভাবলাম রাইডার সাবে অহনও ঘুমায়, হুরমতি রাইতে কি আর তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙে?" মোর্শেদ কিছুটা অবাক হলো। সেলিমের ফোন আসার কথা তো নয়। সে বাইক চালানোর সময় ফোনের ভাইব্রেশন অনুভব করেনি, নাকি মনের ভেতরে সামিনার ওই নীরবতা তাকে এতই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে বাইরের কোনো সংকেত তার মস্তিষ্কে পৌঁছায়নি? মোর্শেদ বলল, "রাইডিং-এ ছিলাম তো, খেয়াল করি নাই মনে হয়।" বলতে বলতে সে তার ডেনিম জিন্সের টাইট পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ফোনটা হাতে নিতেই মোর্শেদের বুকের ভেতরটা আবার সেই পুরনো ছন্দে ধক করে উঠল। সেলিমের ফোন আসার চেয়েও বড় একটা আশঙ্কা তার মনে কাজ করছে— সামিনা কি অনলাইনে এসেছে? সে কি মেসেজটা সিন করেছে? সে ফোনের স্ক্রিনটা অন করল। দেখল সেলিমের একটা মিসড কল পড়ে আছে ঠিক দশ মিনিট আগে। কিন্তু তার চোখ চলে গেল মেসেঞ্জার নোটিফিকেশনের দিকে। সেখানে কোনো নতুন সংকেত নেই। সামিনার সেই সাদা টিক চিহ্নটা এখনো তেমনি অটল হয়ে আছে, যেন মোর্শেদকে উপহাস করছে। সেলিম পাশে বসে বকবক করেই যাচ্ছে, "কিরে, কারে খুঁজস ফোনের মইদ্যে? কোনো কচি মাল না কি? মুখ দেহি এক্কেবারে চুন হইয়া গেছে তোর!" মোর্শেদ সেলিমের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। চারপাশের বস্তির হট্টগোল, সেলিমের চড়া গলার আড্ডা আর এই দুপুরের অসহ্য গরম— সবকিছুই যেন ম্লান হয়ে গেল ওই একটা ছোট ডিজিটাল আইকনের নীরবতার কাছে। তার আভিজাত্য, তার পেশিবহুল হাত, তার দামি মেটিওর— সবকিছুই যেন এই মুহূর্তে অর্থহীন মনে হচ্ছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। তারপর সেলিমের দিকে তাকিয়ে বলল, "ধুর, বাদ দে। ওসব কিছু না। চা বল এক কাপ, কড়া লিকার।" কিন্তু মোর্শেদ জানে, সে যতবারই ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখছে, তার মন পড়ে আছে ওই পকেটের ভেতরেই। সামিনার নেশা তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছে, আর সে পুরনো বন্ধুদের আড্ডায় বসে সেই দহন আড়াল করার এক ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। পকেটের ভেতরে থাকা ফোনটা যেন আচমকা একটা বৈদ্যুতিক শক দিল মোর্শেদকে। সেলিম তখন আয়েশ করে একটা সস্তা সিগারেট ধরাচ্ছে আর মৌচাক রুটের বাসের চাকার হিসাব মেলাচ্ছে। কিন্তু মোর্শেদের পৃথিবীটা কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে মাত্রই ফোনটা চেক করে পকেটে রেখেছিল, কিন্তু তার অবচেতন মন বলছে—সে কিছু একটা ভুল দেখেছে। অথবা হয়তো, ইন্টারনেটের কোনো এক অদৃশ্য গলি বেয়ে এখন মাত্রই কিছু একটা এসে পৌঁছেছে তার কাছে। কি মনে হতেই সাথে সাথে মোর্শেদ আবার ফোনের লকটা অন করল। এবার তার চোখের পাতা কাঁপছে। না, সে ভুল দেখেনি। মেসেঞ্জারের আইকনের ওপর একটা ছোট্ট লাল বৃত্তে ‘৩’ লেখাটি জ্বলজ্বল করছে। সামিনা! সামিনা তাকে মেসেজ করেছে। এই তপ্ত দুপুরের আগুনের মাঝেও মোর্শেদের হৃদপিণ্ড একটা বিট মিস করে গেল। তার বুকের ভেতর যেন রয়্যাল এনফিল্ডের ইঞ্জিনের চেয়েও জোরে কোনো এক শব্দের প্রতিধ্বনি হচ্ছে। সামিনা মেসেজ করেছে! এই শব্দটা মোর্শেদের মস্তিষ্কে হাজার ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলে উঠল। তার অপমানের তিতকুটে স্বাদটা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সামিনা কি তাকে কোনো ছবি পাঠিয়েছে? সেই অদেখা শরীরের কোনো রহস্যময় জ্যামিতি কি এখন এই ডিজিটাল পর্দায় ভেসে উঠবে? সে দ্রুত কাঁপানো আঙুলে মেসেঞ্জার ওপেন করল। না, সামিনা কোনো ছবি পাঠায় নি। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মোর্শেদের দম বন্ধ হয়ে এল। সেখানে পরপর তিনটি মেসেজ ভেসে আছে। প্রথম মেসেজ: "মোর্শেদ?" দ্বিতীয় মেসেজ: "আপনি কি আছেন?" তৃতীয় মেসেজ: "নাকি খুব ব্যস্ত?" মেসেজগুলোর সময় দেখাচ্ছে 10 minutes ago. অর্থাৎ মোর্শেদ যখন তীব্র গতিতে বাইক চালাচ্ছিল তখনই এসেছে। কিন্তু সেই মেসেজগুলোর থেকেও বড় অবাক করা বিষয় হলো, তাদের কথোপকথনের ঠিক নিচে নীল রঙের অক্ষরে একটা ছোট তথ্য ভেসে আছে যা মোর্শেদকে পাথর করে দিল। একটি ‘মিসড কল’। মেসেজের রিপ্লাই না পেয়েই সামিনা তাকে ফোন করেছিল। কমলাপুরের সেই ধুলোবালি আর সেলিমের চড়া গলার আড্ডার মাঝে মোর্শেদ যেন এক ভিন্ন গ্রহে চলে গেল। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা ওই ‘মিসড কল’ শব্দটা তাকে চাবুকের মতো আঘাত করছে। তার সমস্ত আভিজাত্য, তার পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরুষালি গাম্ভীর্য এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেছে। যে সামিনা এতদিন কেবল শব্দের মায়াজালে তাকে নাচিয়েছে, যে সামিনা একটি সাধারণ ছবি পাঠাতেও কার্পণ্য করেছে—সে কি না সরাসরি কল করেছিল! ব্যাপারটার আকস্মিকতায় মোর্শেদ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মগজের ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ডানা ঝাপটাচ্ছে। কী দরকার হতে পারে? সামিনা কি কোনো বিপদে পড়ল? নাকি এই জ্যাম আর ধুলোবালির শহরে সেও মোর্শেদের মতো কোনো এক তীব্র একাকীত্বের শিকার হয়ে এই কলটা দিয়েছিল? মোর্শেদ নিজেকেই অপরাধী মনে করতে শুরু করল। কেন সে ওই অভিশপ্ত সকালে ঘুমাতে গেল? সে একবার ভাবল একটা মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করবে— “সামিনা, আপনি কি ঠিক আছেন?” কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, মেসেজের যুগ তো গত রাতেই শেষ হয়ে গেছে। সামিনা যখন কলের সাহস দেখিয়েছে, তখন মোর্শেদ কেন পিছিয়ে থাকবে? সে কি তবে এখন কল ব্যাক করবে? বনানীর সেই সুশৃঙ্খল রাইডারের হাত আজ কাঁপছে। কল বাটনটায় আঙুল ছোঁয়ানোর আগে সে একবার বুক ভরে শ্বাস নিল। সে ঠিক করল, যেহেতু সামিনা একবার কল দিয়েছে আর সে ধরতে পারেনি, তাই সৌজন্যের খাতিরে হলেও তার একটা কল ব্যাক করা উচিত। নিজেকে এই যুক্তি দিয়ে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল সে। ঠিক যখন সে কল দেওয়ার জন্য আঙুলটা স্ক্রিনের দিকে বাড়াল, তখনই তার হাতের ভেতর ফোনটা এক হিংস্র জানোয়ারের মতো ভাইব্রেট করে উঠল। মোর্শেদের হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনটা এখন আর কালো নেই, সেখানে জ্বলজ্বল করছে সামিনার সেই চেনা প্রোফাইল পিকচার। সামিনা ফোন করছে। আবারও! বনানীর কোনো দামী রেস্তোরাঁ নয়, কোনো নির্জন হাইওয়ে নয়—কমলাপুরের এক ঘিঞ্জি টং দোকানের সামনে, সেলিমের বাসের চাকার হিসেবের হট্টগোলের মাঝে মোর্শেদের কাছে এখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে দামী সংকেতটা বেজে চলেছে। সামিনার এই দ্বিতীয়বারের কল মোর্শেদকে এক অনস্বীকার্য সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল—সামিনা তাকে চাইছে। অন্তত এই মুহূর্তে, এই তপ্ত দুপুরে, সামিনা তার সাথে যুক্ত হতে চাইছে। মোর্শেদের চারপাশের শব্দগুলো যেন নিভে গেল। সেলিমের বকবকানি, রিকশার বেল, দূরে ট্রেনের বাঁশি—সবকিছু ম্লান হয়ে শুধু ওই ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দটাই তার কানে বাজতে লাগল। মোর্শেদ ফোনটা কানের কাছে তোলার আগে এক মুহূর্তের জন্য নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল স্ক্রিনে। তারপর কাঁপা হাতে সবুজ বাটনটা স্লাইড করল। কমলাপুরের সেই ধুলোবালি আর সেলিমের বাসের চাকার হিসাবের হট্টগোলের মাঝে মোর্শেদের পৃথিবীটা একটা ফোনের স্ক্রিনে এসে থমকে গেছে। ফোনের ভাইব্রেশনটা তার হাতের তালু ছাপিয়ে শিরদাঁড়া পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। মোর্শেদ ফোনটা কানে তুলল। তার গলার ভেতরটা হঠাত্‍ মরুভূমির মতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক অদ্ভুত জড়তা, যেন শব্দগুলো গলার ভেতরেই দলা পাকিয়ে আটকে আছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের এই আত্মবিশ্বাসী মানুষটি আজ কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব নিচু এবং খসখসে গলায় বলল, "হ্যালো।" ওপাশ থেকে যে উত্তরটি এল, সেটি শোনার জন্য মোর্শেদ প্রস্তুত ছিল না। এক লহমায় তার চারপাশের জগতটা নিঃশব্দ হয়ে গেল। "মোর্শেদ? আপনি কি ব্যস্ত? আপনাকে কল করে কি বিরক্ত করলাম?" প্রথমবারের মতো সামিনার গলা শুনতে পেল মোর্শেদ। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কণ্ঠের কারুকাজ। সামিনার গলা কোনো চঞ্চল কিশোরীর মতো নয়, আবার বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কোনো প্রৌঢ়ার মতো ফ্যাঁসফেঁসেও নয়। এমনকি কোনো গায়িকার মতো সুর করে বলা মাধুর্যও এতে নেই। এটা এক্কেবারে স্বাভাবিক, ভরাট এবং গভীর এক নারীর কণ্ঠস্বর। যে কণ্ঠে এক ধরণের কর্তৃত্ব আছে, আবার আছে এক রহস্যময় বিষাদ। এই ভরাট কণ্ঠস্বর মোর্শেদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করল। তার মনে হলো, এই স্বর যেন অনেক চেনা, অনেকদিন ধরে হারানো কোনো সুর। মোর্শেদের এক মুহূর্ত আগের সেই অপমানবোধ আর বিরক্তি কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তার ভেতরে সেই পুরোনো খেলোয়াড় সুলভ ফ্লার্ট করার প্রবণতাটা জেগে উঠল। সে একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে হালকা স্বরে বলল, "হ্যাঁ, ভীষণ ব্যস্ত। আপনার অপেক্ষায় ব্যস্ত। কাল থেকে তো ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করেই যাচ্ছি। আপনি তো ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিলেন।" মোর্শেদ ভেবেছিল তার এই মন্তব্যে সামিনা হয়তো একটু লজ্জিত হবে কিংবা কিছুটা কৌতুক করবে। কিন্তু সামিনা তার এই চতুর ফ্লার্ট করার চেষ্টাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। তার কণ্ঠে কোনো লঘুতা এল না। বরং এক ধরণের সিরিয়াস ভাব ফুটে উঠল। সামিনা কিছুটা থমকে গিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, "মোর্শেদ, আমাকে একটা হেল্প করতে পারবেন?" সামিনার গলায় হঠাত্‍ এই অসহায়ত্ব বা অনুরোধের সুর মোর্শেদকে চমকে দিল। তার সব ফ্লার্ট করার ইচ্ছে এক নিমেষে উধাও। বনানীর সেই উদ্ধত রাইডার এখন সচেতন হয়ে উঠল। সামিনার মতো একজন নারী, যে তাকে এতদিন অবজ্ঞার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছিল, সে আজ সরাসরি সাহায্য চাইছে? মোর্শেদ শক্ত হয়ে বসল। কমলাপুরের তপ্ত বাতাস আর সেলিমের হইচই তার কান পর্যন্ত আর পৌঁছাচ্ছে না। সে গম্ভীর গলায় বলল, "বলুন সামিনা। কী করতে হবে আমাকে?" সামিনা ওপাশ থেকে একটু চুপ করে থাকল। সেই নীরবতা মোর্শেদের বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাতে শুরু করল। সামিনা কী বলতে চায়? সে কি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছে? নাকি এই সাহায্যই হবে তাদের অদেখা দেয়ালটা ভেঙে ফেলার প্রথম সূত্র? মোর্শেদ তার রয়্যাল এনফিল্ডের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরল। সে বুঝতে পারছে, গল্পের মোড় এখন আর মেসেঞ্জারের চ্যাটিংয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটা বাস্তব জীবনের কোনো এক জটিল বাঁক নিতে যাচ্ছে। সামিনার সেই ভরাট কণ্ঠস্বর যখন মোর্শেদের কানে বাজল, তার ভেতরের সবটুকু আভিজাত্য আর গতরাতের জমানো অভিমান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সামিনার গলায় এক ধরণের চাপা উদ্বেগ, যা মোর্শেদকে মুহূর্তেই সতর্ক করে তুলল। সে আর এখন কোনো রাইডার নয়, কোনো কোটিপতি বাড়িওয়ালা নয়—সে এখন স্রেফ একজন পুরুষ, যে তার কাঙ্ক্ষিত নারীর ডাক শুনেছে। মোর্শেদ মেরুদণ্ড সোজা করে বসল, তার গলার স্বরে এখন গভীর মমতা আর দায়িত্ববোধ। সে বলল, "অবশ্যই সামিনা। কী হেল্প বলুন? আপনি কি ঠিক আছেন? কোনো বিপদ হয়েছে কি আপনার?" ওপাশ থেকে সামিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠস্বরে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এল তার। "না, আমি ঠিক আছি। শুনুন মোর্শেদ, আমার আজকে একটা খুব বড় কাজ আছে। আমাকে একটু টঙ্গি যেতে হবে এখনই। খুবই জরুরি দরকার। কিন্তু আমি কোনোভাবেই এই দুপুরের জ্যাম ঠেলে যাওয়ার মতো সাহস পাচ্ছি না। বাসে বা রিকশায় গেলে আমি সময়মতো পৌঁছাতে পারব না। আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন, প্লিজ?" টঙ্গি! কমলাপুর থেকে টঙ্গি—পুরো ঢাকা শহরটা যেন এক অগ্নিকুণ্ড পার হয়ে যাওয়ার মতো পথ। কিন্তু মোর্শেদের মাথায় তখন দূরত্বের কোনো হিসেব নেই। সামিনা তাকে চেয়েছে, সামিনা তার বাইকের সেই পেছনের সিটটার অধিকার চেয়েছে—এই উপলব্ধিতে মোর্শেদের রক্তে যেন বসন্তের হাওয়া খেলে গেল। মোর্শেদ কোনো দ্বিধা না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "আপনি এখন কোথায় আছেন?" সামিনা উত্তর দিল, "আমি আমার স্কুলের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। যাত্রাবাড়ীর যে গলিটার কথা বলেছিলাম, তার মুখেই।" মোর্শেদ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে তার বাইকের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে বলল, "আপনি আপনার লাইভ লোকেশনটা এখনই মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিন। আমি এক্ষুনি আসছি। যত জ্যামই থাকুক, আমাকে আটকাতে পারবে না। সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগবে সামিনা। আপনি শুধু ওখানেই থাকুন।" সামিনা ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতে চাইল, হয়তো কোনো কৃতজ্ঞতা, কিন্তু মোর্শেদ আর কথা বাড়াল না। সে ফোনের লাল বাটনটা চেপে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল। সে পাশে বসা সেলিমের দিকে একবারও তাকাল না। সেলিমের সেই বাসের চাকার হিসেব, বন্ধুদের আড্ডা আর গাঁজার ধোঁয়া—সব এখন মোর্শেদের কাছে মূল্যহীন। সে তার রয়্যাল এনফিল্ডের চাবিটা অন করল। সে পাশে বসা সেলিমের দিকে একবারও তাকাল না। সেলিমের সেই বাসের চাকার হিসেব, বন্ধুদের আড্ডা আর গাঁজার ধোঁয়া—সব এখন মোর্শেদের কাছে মূল্যহীন। সে তার রয়্যাল এনফিল্ডের চাবিটা অন করল। ইঞ্জিনের সেই গম্ভীর 'থাম্প' শব্দটা শোনার সাথে সাথেই সেলিম সজোরে একটা গালি দিয়ে উঠল। "ওই হারামি! কই যাস? আইলি মাত্র পাঁচ মিনিট, এর মইদ্যেই ফুড়ুত? চা টা তো চুলে দিছে মামা!" সেলিমের চোখেমুখে এক ধরণের বিরক্তমাখা বিস্ময়। মোর্শেদ হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে কেবল বলল, "একটু জরুরি কাজ পইড়া গেল রে সেলিম। যামু আর আসমু।" সেলিম দমবার পাত্র না। সে হাত নাড়িয়ে আপত্তি জানিয়ে বলল, "থো তোর জরুরি কাম! এই কড়া রৌদ্রে কোন পীরের দরগায় যাবি তুই? বইসা চা-টা খা।" মোর্শেদ সেলিমের আপত্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাইকের গিয়ারে চাপ দিল। কিন্তু বেরোনোর ঠিক আগমুহূর্তে তার নজর পড়ল সেলিমের মাথার কাছে বেঞ্চিতে রাখা অতিরিক্ত হেলমেটটার দিকে। মোর্শেদ চিরকাল একা রাইড করে অভ্যস্ত। তার মেটিওরের দুই পাশের স্যাডেল ব্যাগে দামী রাইডিং গিয়ার থাকলেও তার বাইকে কোনো 'পিলিয়ন হেলমেট' বা পেছনের যাত্রীর জন্য অতিরিক্ত হেলমেট নেই। অথচ আজ তার পেছনের সিটে একজন বসবে। সামিনা। তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই মোর্শেদ একটা ঝুঁকি নিল। সে বাইকটা আবার একটু নিউট্রাল করে সেলিমের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "তোর ওই হেলমেটটা একটু দে তো সেলিম।" সেলিম আকাশ থেকে পড়ল। সে উপহাসের সুরে দাঁত বের করে বলল, "আরে লর্ড সাবে কয় কি! তুই পিলিয়ন নিবি কবের থেইকা? তোর বাইকের পিছনের সিটে তো আজীবন ময়লা ছাড়া কিছু দেখলাম না। হঠাৎ কোন মালরে তুলবি?" মোর্শেদ সেলিমের হাত থেকে ওর সাধারণ মানের লাল রঙের হেলমেটটা একরকম কেড়ে নিল। তারপর নিজের দামী হেলমেটটা সিটের পেছনের হুকে ঝুলিয়ে এবং সেলিমের হেলমেটটা নিজের মাথায় গলাতে গলাতে মুচকি হাসল। পঁয়তাল্লিশ বছরের গম্ভীর মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে আজ এক অদ্ভুত চপলতা। সেলিম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। মোর্শেদ বাইকের ক্লাচ ছাড়তে ছাড়তে রসিকতা করে বলল, "আরে ভাই, দিনকাল ভালো না। টাকার খুব অভাব বুঝলি? তাই আজ থেকে 'পাঠাও' রাইড শুরু করলাম। পিলিয়ন না নিলে ইনকাম হবে কোত্থেকে?" সেলিম হো হো করে হেসে উঠল। "শালা ফকিরি রাইডার! তোরে দিয়া আর কিচ্ছু হইবো না!" সেলিমের অট্টহাসি আর কমলাপুরের ধুলোমাখা বাতাস পেছনে ফেলে মোর্শেদ তার বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল। তার পকেটে এখন সামিনার লাইভ লোকেশনটা ধিকধিক করছে। ঢাকার এই জ্যাম, এই উত্তাপ আর এই একাকীত্বের অবসান হতে আর মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্ব। মোর্শেদ জানে, এই যাত্রা আর যাই হোক, কোনো সাধারণ 'পাঠাও' রাইড হবে না। ১৫ মিনিট সময় চেয়েছিল মোর্শেদ, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা আর রয়্যাল এনফিল্ডের ৩৫০ সিসি ইঞ্জিনের সম্মিলিত শক্তিতে সে ঠিক ১৩ মিনিটের মাথায় যাত্রাবাড়ীর সেই নির্দিষ্ট গলিটার মুখে এসে পৌঁছাল। ঢাকার এই ভরদুপুরের জ্যাম আর আগুনের মতো তপ্ত বাতাস তাকে আটকাতে পারেনি। বাইকের চাকা যখন সামিনার পাঠানো লোকেশনের ঠিক ওপর এসে থামল, মোর্শেদের বুকের ভেতর তখন হাজারটা ড্রাম একসাথে বাজছে। সামনে একটা সাদামাটা দোতলা বিল্ডিং। দেওয়ালে শ্যাওলা আর লোনা ধরা দাগ, সাইনবোর্ডে লেখা 'কিশলয় আর্ট অ্যান্ড প্রাইভেট স্কুল'। কোনো আহামরি দৃশ্য নেই এখানে। রাস্তাটা কেমন একটা বিষণ্ণ ধূসর রোদে মাখা। আশেপাশের দোকানপাটগুলো দুপুরের তন্দ্রায় ঢুলছে। হয়তো বাচ্চাদের অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে, নয়তো এখনো ছুটির সময় হয়নি—পুরো এলাকাটাতে একটা ঝিমধরা নিস্তব্ধতা। মোর্শেদ হেলমেটের ভাইজারটা তুলল। ঘাম তার কপাল বেয়ে চোখের কোণে এসে বিঁধছে, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। এই ধুলোবালি আর জীর্ণতার মাঝেই মোর্শেদের চোখ দুটো হঠাত্ স্থির হয়ে গেল। রাস্তার ওপাশে, স্কুলের লোহার গেটটার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। মোর্শেদ তাকে আগে কখনও দেখেনি। সামিনা তাকে একটা সেলফি পাঠিয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনও দিন ভিডিও কলেও মুখ দেখায়নি। কিন্তু এই ধূসর রাস্তার ভিড় আর অযাচিত কোলাহলের মধ্যে মোর্শেদের চিনতে এক মুহূর্তও ভুল হলো না। সামিনার উপস্থিতির মধ্যেই এমন একটা কিছু আছে, যা মোর্শেদের চোখকে চুম্বকের মতো টেনে নিল। সামিনা যেন এই ভাঙাচোরা গলি আর তপ্ত দুপুরের মাঝে কোনো এক ভুল করে চলে আসা মানবী। মোর্শেদ বাইক থেকে নামল না, কেবল ডেনিম জিন্সের ওপর এক পা রেখে ভারসাম্য বজায় রেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সামিনা দাঁড়িয়ে আছে। মোর্শেদের কল্পনা আর বাস্তবের মাঝে যে ব্যবধান ছিল, তা এক লহমায় চুরমার হয়ে গেল। সামিনা মাঝারি উচ্চতার এক নারী, আন্দাজে পাঁচ ফুট তিন থেকে ছয়ের মধ্যে হবে। তবে তার শরীরের গঠন এতটাই ভরাট আর মাংসল যে তাকে দেখে মোর্শেদের ভেতরের পশুটো এক লহমায় জেগে উঠল। সামিনার শরীরে মেদের আধিক্য নেই, বরং আছে এক ধরণের নিটোল পূর্ণতা। যাকে বলে এক্কেবারে ‘ডবকা’ গঠন। সামিনা একটি সবুজ রঙের সুতির শাড়ি আর কালো রঙের হাফস্লিভ ব্লাউজ পরেছে। রোদ আর উত্তাপে তার ফর্সা গোলগাল মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে, যেন ফেটে রক্ত বের হবে। মোর্শেদ বিস্ময় আর আদিম লালসা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা তার কল্পনার চাইতেও অনেক বেশি লাস্যময়ী। সবুজ শাড়ির অবহেলার প্যাঁচেও তার ভরাট নিতম্বের বিশালতা আড়াল হয়নি। সামিনার পাছা যে বেশ চওড়া এবং ভারীর দিকে, তা সামনে থেকে দেখেও টের পাওয়া যাচ্ছে। শাড়ির কুঁচিগুলো সেখানে গিয়ে টানটান হয়ে আছে, যেন ভেতরের মাংসল গোলকগুলো অবাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মোর্শেদ মনে মনে কল্পনা করল, এই ভারী নিতম্বের ওপর দিয়ে শাড়ির কাপড় যখন ঘর্ষিত হয়, তখন নিশ্চয়ই এক ধরণের মাদকতা তৈরি হয়। মোর্শেদের চোখ এবার গেল সামিনার চুলে। কালো কুচকুচে চুলগুলোতে রাস্তার ধুলোর একটা হালকা আস্তরণ জমেছে। চুলগুলো মাথার ওপর একটা বিশাল খোঁপা করে বাঁধা। সেই খোঁপার আয়তন দেখেই মোর্শেদের বুকটা ধক করে উঠল। এত বিশাল খোঁপা সচরাচর দেখা যায় না। খোঁপাটি সামিনার ঘাড়ের ঠিক উপরে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে, যা দেখে বোঝা যায় সামিনার চুল যেমন লম্বা তেমনি ঘন। এই খোঁপাটি সামিনার চেহারায় একদিকে যেমন শিক্ষিকার গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে, অন্যদিকে তার উন্মুক্ত ঘাড় আর কানের পাশের ঘাম মোর্শেদকে এক নিষিদ্ধ আমন্ত্রন জানাচ্ছে। মোর্শেদ অনুভব করল, তার প্যান্টের ভেতরটা আবার টাইট হয়ে আসছে। প্রথম দর্শনেই সে সামিনার ওই উঁচু খোঁপা থেকে শুরু করে তার লালচে মুখ, আর ওই ঢেউ খেলানো হাইওয়ের মতো ভারী শরীরটার প্রেমে পড়ে গেল। এ প্রেম কোনো পবিত্র প্রেম নয়, এ হলো কামনায় মাখানো এক দগদগে তৃষ্ণা। সামিনার ওই বিশাল নিতম্ব আর ভরাট শরীরের প্রতিটি বাঁক মোর্শেদকে বুঝিয়ে দিল যে, আজকের এই যাত্রা স্রেফ টঙ্গি যাওয়ার যাত্রা নয়—এটা সামিনার শরীরের গহিন অরণ্যে প্রবেশের এক রাজকীয় সূচনা। মোর্শেদ হেলমেটটা হাতে নিয়ে এক হাত দিয়ে ঘাম মুছল। তার চোখ এখনো সামিনার নিতম্বের সেই ভারী ভাঁজগুলোর ওপর আটকে আছে। সে বুঝতে পারল, আজ এই তপ্ত দুপুরে সে শুধু এক নারীকেই উদ্ধার করতে আসেনি, সে এসেছে নিজের অবদমিত কামনার এক চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে। মোর্শেদ বাইকটা নিয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দ শুনে সামিনা মুখ তুলল। তার চোখে এক ধরণের দ্বিধা আর কৃতজ্ঞতার মিশ্রণ। সে জানত মোর্শেদ আসবে, কিন্তু বনানীর সেই আভিজাত্য ফেলে এই নরককুণ্ডে মোর্শেদ এত দ্রুত হাজির হবে, তা হয়তো সে ভাবেনি। মোর্শেদ বাইকটা সামিনার ঠিক সামনে এসে থামাল। দুজনের চোখের পলক এক হলো। এই প্রথম। ডিজিটাল পর্দার ওপারে থাকা ছায়াশরীরটি এখন তার থেকে মাত্র তিন হাত দূরে। সামিনার ভরাট শরীরের বাঁকগুলো রোদে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা মোর্শেদের গত রাতের সেই আদিম কল্পনাগুলোকে আবার উস্কে দিল। কিন্তু মোর্শেদ এখন সংযত। সে কেবল হেলমেটটা খুলে সামিনার দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা একটু ম্লান হাসল। সেই হাসিটা মোর্শেদের পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ হৃদয়ে একটা কামড় দিল। সামিনা খুব নিচু স্বরে বলল, "আপনি আসলেই চলে এলেন?" মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, "আমি কথা রাখলে এভাবেই রাখি সামিনা। এবার বলুন, টঙ্গি কতক্ষণে পৌঁছাতে হবে?" সামিনা মোর্শেদের পেশিবহুল হাতের শিরাগুলো আর তার সাদা শার্টের হাতা গোটানো রুদ্ররূপের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিল। তাদের চারপাশের ধূসর জগতটা যেন এক নিমেষে রঙিন হতে শুরু করল।