পর্ব ৩য় অবয়বের নিষিদ্ধ ভূগোল
রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ৩৫০-এর ইঞ্জিনের ভরাট গুমগুম শব্দটা যখন সাইনবোর্ডের ধারের সেই ভাঙাচোরা চায়ের দোকানের সামনে এসে থামল, তখন চারপাশের বাতাসে কেবল ভোরের কাঁচা রোদের গন্ধ। মোর্শেদ তার গ্লাভস পরা হাত দিয়ে চাবিটা ঘুরিয়ে বাইকটা বন্ধ করল। ইঞ্জিনের শব্দটা এক ঝটকায় থেমে যেতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে বাইক থেকে পুরোপুরি নামল না, কেবল স্ট্যান্ডটা নামিয়ে বাইকের ওপর একপাশে কাত হয়ে আয়েশ করে বসল। সামনে ছোট টিনের ছাপড়া ঘর, উপরে প্লাস্টিকের তেরপল টাঙানো। ভেতরে কেরোসিনের চুলার ওপর ধোঁয়া ওঠা বড় একটা অ্যালুমিনিয়ামের কেতলি। মোর্শেদ হেলমেটের ভাইজারটা উপরে তুলে গম্ভীর গলায় ডাকল, “মামা, এক প্যাকেট মার্লবরো রেড দেন। আর এক কাপ কড়া লিকারের চা, চিনি ছাড়া।” দোকানের মালিক বৃদ্ধ লোকটা তখনও ঠিকমতো চোখ মেলতে পারেনি। আধশোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে মোর্শেদের বাইকের গ্লসি কালো বডি আর ইঞ্জিনের ক্রোম ফিনিশিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটু ভ্যাবাচ্যকা খেয়ে গেল। তারপর হাত দিয়ে কপাল ঘষতে ঘষতে বলল, “মামা, লিকার তো মাত্র বসাইলাম। আগের লিকার বাসি হইয়া গেছে, ফালাইয়া দিছি। নতুনটা হইতে মিনিট দশেক সময় লাগব।” মোর্শেদ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ঘড়ির দিকে তাকাল। সকাল ৬টা বেজে ৩০ মিনিট। সে বাইকের ফুয়েল ট্যাংকের ওপর ডান হাতটা রেখে নির্লিপ্তভাবে বলল, “অসুবিধা নাই। আমার তাড়াহুড়ো নেই। আপনি আপনার মতো সময় নিয়ে বানান।” এই এলাকাটা দিনের বেলা থাকে মানুষের নরকগুলজার। হাজার হাজার মানুষের চিৎকার, রিকশার বেল আর বাসের তীব্র হর্নে বাতাস সবসময় ভারী হয়ে থাকে। কিন্তু এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। ঢাকার এই প্রবেশপথ বা সাইনবোর্ড এলাকাটা এখন যেন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। রাস্তাটা একদম ফাঁকা নয়, তবে খুব একটা ব্যস্তও নয়। মাঝে মাঝে দুই-একটা দূরপাল্লার নাইট কোচ ধুলো উড়িয়ে সপাটে বেরিয়ে যাচ্ছে, তাদের হেডলাইটের হলুদ আলো তখনো মোর্শেদের চোখে এসে বিঁধছে। দুই-একটা প্রাইভেট কারের চাকা পিচঢালা রাস্তার ওপর যে সরু শব্দ তুলছে, তা কান পাতলে শোনা যায়। ভোরের ঠান্ডা বাতাসটা এখন বেশ প্রবল। কোনো বাধা ছাড়াই সেটা মোর্শেদের খোলা মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে, আর সেই ছোঁয়াটা এক ধরণের আদিম প্রশান্তি দিচ্ছে। মোর্শেদ বুঝতে পারল, তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী শরীরের চামড়া এই বাতাসের চুমু বা স্পর্শে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই নির্জন হাইওয়ে, ধুলোর গন্ধ আর ভোরের এই নীলচে আলো—এটাই এখন তার একমাত্র সত্যিকারের জগত। সে সিগারেটটা বের করল। এক প্যাকেট মার্লবরো থেকে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরে দিয়াশলাই জ্বালানোর আগমুহূর্তে সে আশপাশটা আবার দেখে নিল। রাস্তার ধারের ঘাসগুলোর ওপর শিশির জমে আছে, যা দূর থেকে হীরের টুকরোর মতো চিকচিক করছে। দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা ঘষতেই একটা কমলা রঙের অগ্নিশিখা অন্ধকার আর স্নিগ্ধতার বুক চিরে জেগে উঠল। মোর্শেদ দীর্ঘ একটা টান দিল। তামাকের কড়া স্বাদ আর ধোঁয়া তার ফুসফুসে প্রবেশ করতেই তার অস্থির স্নায়ুগুলো শিথিল হতে শুরু করল। সে তার ল্যাপটপ আর বনানীর দশতলার আভিজাত্য থেকে অনেক দূরে এখন একাকী এক যাত্রী। বাইকের মেটালিক বডিটা তার উরুর নিচে বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে। মোর্শেদ ভাবল, মানুষ যখন গতির নেশায় ছুটে চলে, তখন সে নিজের অনেক কিছু পেছনে ফেলে আসে। কিন্তু যখন কোথাও থামে, তখন সেই ফেলে আসা স্মৃতিগুলো আবার ছায়ার মতো তাকে ঘিরে ধরে। আকাশের এক কোণে সূর্যটা লাল আভা ছড়াতে শুরু করেছে। কুয়াশার পাতলা চাদরটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, আর উন্মোচিত হচ্ছে হাইওয়ের সেই দীর্ঘ কালো ফিতেটা, যা তাকে হয়তো এক অজানা গন্তব্যের দিকে ডাকছে। চাওয়ালা তখন চিনি ছাড়া লিকারের কাপটা হাতে নিয়ে দোকানের বাইরে এল। কাপ থেকে বের হওয়া গরম ধোঁয়া মোর্শেদের হাতের সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। মোর্শেদ চায়ে একটা চুমুক দিল। কড়া তেতো লিকারটা তার জিভে এক ধরণের ঝাঁঝালো অনুভূতি তৈরি করল। সে দূরে দিগন্তের দিকে তাকাল, যেখানে আকাশ আর রাস্তা এক হয়ে গেছে। আজ তার এই বাইকের ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে পৃথিবীর আর কোনো কোলাহল মিলবে না। সে শুধুই একজন রাইডার, যার গন্তব্য হয়তো কোনো মানচিত্রে নেই, আছে কেবল তার অবচেতন মনের গভীর কোনো অতৃপ্তিতে। সিগারেটের শেষ অংশটা সে রাস্তার ধারে ছুড়ে ফেলল। আগুনের সেই টুকরোটা বাতাসের তোড়ে নিভে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ জ্বলে রইল। মোর্শেদ আবার চায়ে চুমুক দিয়ে ভাবল, এই পথটাই তার আসল বাড়ি। এখানে কোনো পিছুটান নেই, কোনো জটিল সমীকরণ নেই, আছে শুধু সে আর তার নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ ছায়া। কড়া লিকারের সেই তেতো স্বাদটা জিভ দিয়ে তালুতে ঠেকিয়ে সে কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে রইল সামনের ধূসর হাইওয়ের দিকে। এই সাতসকালে গন্তব্যহীনভাবে সে এখানে কেন এসে থামল, সেটা নিজের কাছেও পরিষ্কার নয়। তার অবচেতন মন কি তাকে কোনো কিছুর টানে এখানে নিয়ে এসেছে? সে কি আরও সামনে এগিয়ে যাবে? দাউদকান্দি পেরিয়ে কুমিল্লার দিকে কি একবার ঘুরে আসবে? নাকি এই চায়ের দোকানের তেরপলের নিচেই আরও কিছুক্ষণ বসে থাকবে? তার ভেতরের চিরচেনা সেই দোলাচলটা আবার শুরু হলো। হাইওয়ের এই মুক্ত বাতাস তাকে টানছে, আবার মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপ তাকে বলছে আরও কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতে। এই নিঃসঙ্গতার মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত স্বাধীনতা আছে, যা তাকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে বাধ্য করে। ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই হাত চলে গেল জ্যাকেটের পকেটে। সেখান থেকে আইফোনটা বের করে স্ক্রিনটা আনলক করল সে। অভ্যাসবশতই তার আঙুল চলে গেল মেসেঞ্জার আইকনে। সামিনার ইনবক্সটা খুলতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। নামের পাশে সবুজ বাতিটা নেই। সে স্ক্রল করে ওপরে তাকাতেই দেখল— ‘এক্টিভ ৬ আওয়ারস এগো’। মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মানে কাল রাতে তাদের সেই তীব্র কথোপকথন শেষে অফলাইনে যাওয়ার পর সামিনা আর অনলাইনে আসেনি। সামিনার কি তাকে মনে নেই? নাকি সামিনা তাকে ইচ্ছে করেই এই অপেক্ষার যন্ত্রণায় ফেলে রেখেছে? ঢাকার জ্যামের মতো সামিনাও যেন এক এক সময় তার জীবনের সবটুকু গতি স্তব্ধ করে দেয়। মোর্শেদ ফোনটা বাইকের ট্যাংকের ওপর রেখে আবার সিগারেটে টান দিল। ধোঁয়াগুলো বাতাসের সাথে লড়ে লড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নিজের হাতের তালুর দিকে। ৪৫ বছর—সংখ্যাটা অনেক বড় শোনায়। এই বয়সে এসে তার পরিচিত অনেক বন্ধুই আজ মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে, কেউ কেউ চশমার পুরু কাঁচের আড়ালে নিজেদের যৌবনকে চিরতরে কবর দিয়ে ফেলেছে। তারা এখন রিটায়ারমেন্ট আর সন্তানদের স্কুল-কলেজ নিয়ে চিন্তিত। নিজেকে তারা স্বেচ্ছায় ‘বুড়ো’ বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু মোর্শেদ কি সে দলে? সে নিজের ছয় ফুট দুই ইঞ্চির পেটানো শরীরটার দিকে তাকাল। রাইডিং জ্যাকেটের নিচে তার সুঠাম চওড়া কাঁধ আর মজবুত পেশিগুলো এখনও পঁচিশ বছরের তরুণের মতো টানটান। এই শরীরটাকে সে নিজের ইকোসিস্টেমের মতো করেই পরম যত্নে গড়ে তুলেছে। দিনের পর দিন জিমের ঘাম আর হাইওয়ের ধুলোবালি তাকে দিয়েছে এক ইস্পাতকঠিন অবয়ব। পার্থক্য শুধু সামান্য কিছু জায়গায়। সে বাইকের রিয়ার ভিউ মিররে নিজের মুখটা একবার দেখার চেষ্টা করল। হেলমেট খোলা অবস্থায় অবাধ্য চুলগুলো এখন অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে। কপালের দুই কোণ থেকে চুলগুলো একটু পেছনে হটেছে, আর কানের পাশের চুলগুলোতে রুপোলি পাক ধরেছে। কাঁচাপাকা সেই দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে মোর্শেদ বুঝতে পারল, তার এই কাঠিন্য কেবলই অভিজ্ঞতার দান। এই মুখটা রোদ চেনে, এই মুখটা বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপ্টা চেনে। হাইওয়ের ধুলো তার ত্বকের লোমকূপে মিশে গিয়ে তাকে এক ধরণের অমসৃণ আভিজাত্য দিয়েছে। হ্যাঁ, বয়সটা তার চেহারায় কথা বলে, কিন্তু তার রক্তে নয়। তার ভেতরের সেই আদিম ক্ষুধা, গতির প্রতি সেই তীব্র আসক্তি—এগুলো আজও সেই পঁচিশের উত্তাপ নিয়েই বেঁচে আছে। হয়তো সেই কারণেই সামিনার মতো এক রহস্যময়ী নারীর শব্দগুলো তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করতে পেরেছে। সে জানে, এই পোক্ত শরীর আর অভিজ্ঞ মনের মিশেলটাই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। চায়ের কাপটা এখন প্রায় খালি। সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা সে পিষে ফেলল জুতো দিয়ে। ফোনটা আবার হাতে নিয়ে সামিনার সেই ‘লাস্ট এক্টিভ’ সময়টার দিকে তাকাল। ছয় ঘণ্টা আগের সেই সামিনা কি এখন তার নিজের ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে? নাকি এখনও সে ঘুমের রাজ্যে সেই ‘নীল জ্যামিতি’র নকশা বুনছে? চায়ের কাপের একদম নিচে জমে থাকা শেষ ঠান্ডা লিকারটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে মোর্শেদ একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল। চায়ের সেই তেতো স্বাদটা যেন তার মনের অস্থিরতার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। মেটিওর-এর সিটে হেলান দিয়ে সে আকাশের নীলচে আভার দিকে তাকিয়ে থাকল, কিন্তু তার চোখের সামনে ভাসতে লাগল কাল রাতের সেই নিকষ অন্ধকার ঘরের দৃশ্য। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে মোর্শেদ জীবনটাকে অনেক কাছ থেকে দেখেছে। তার জীবনে নারীসঙ্গ কোনো নতুন বিষয় নয়। ডিভোর্সের পরের এই পাঁচ বছরে কত নারী তার এই বনানীর ফ্ল্যাটে এসেছে, কতজনের সাথে সে নিছক শরীরের প্রয়োজনে রাত কাটিয়েছে, তার হিসেব সে রাখেনি। অভিজ্ঞ মোর্শেদ জানে নারীর শরীরের ঘ্রাণ কেমন হয়, জানে কামনার চূড়ায় পৌঁছে কীভাবে নিস্তেজ হতে হয়। কিন্তু সামিনা? সামিনা যেন এক সম্পূর্ণ অন্যরকম গোলকধাঁধা। মোর্শেদ নিজের মনেই একটা বাঁকা হাসি হাসল। যার গলার আওয়াজ সে শোনেনি, যার মুখটা পর্যন্ত সে ভালো করে দেখেনি, সেই এক ছায়ামানবী তাকে এভাবে শাসন করছে? সামিনার কোনো অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে, নাকি সে মোর্শেদের একাকীত্বের ইকোসিস্টেম থেকে জন্ম নেওয়া কোনো এক মায়া? কাল রাতের সেই উত্তেজনার কথা মনে পড়তেই মোর্শেদের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে ভাবল, একজন পঁয়তাল্লিশ বছরের পোক্ত মানুষ, যার শরীর আর মন অভিজ্ঞতায় ঠাসা, সে কেন একজন সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণের মতো আচরণ করছে? কাল রাতে যখন মেসেঞ্জারের নীল আলোয় সামিনার শব্দগুলো তার ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠছিল, তখন মোর্শেদের মনে হচ্ছিল সে যেন পঁচিশ বছর আগে তার প্রথম প্রেমের উত্তেজনায় কাঁপছে। সামিনার শব্দগুলো ছিল ভীষণ তীক্ষ্ণ, অনেকটা কামুক ফিসফিসানির মতো। সে যখন বলেছিল, "মিস্টার রাইডার, আপনি কি জানেন নীল জ্যামিতি আসলে কী? এটা শরীরের সেই বাঁক, যা কোনো স্কেল দিয়ে মাপা যায় না।"—তখন মোর্শেদের মনে হয়েছিল তার এসি ১৬ ডিগ্রিতে থাকা ঘরটা হঠাৎ করেই অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠেছে। মোর্শেদ কাল রাতে একাই ছিল সেই বিশাল ফ্ল্যাটে। বাইরের বারান্দায় অন্ধকার, আর ভেতরে কেবল তার ফোনের আলো। সামিনার কল্পনা যেন ফোনের আলোয় প্রোজেক্টরের মত তার মস্তিষ্কে ভেসে উঠতে চাইছিল। তার অভিজ্ঞ মন যেন সামিনার সেই ছায়াশরীরকে অনুভব করতে চাইছিল। উত্তেজনাটা ছিল অবর্ণনীয়। সে অনুভব করছিল তার পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠছে, হৃদস্পন্দন যেন মেটিওর-এর ইঞ্জিনের গর্জনের চেয়েও তীব্র হয়ে বাজছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে যেখানে আবেগগুলো স্তিমিত হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে সামিনা তার ভেতরে কামনার এক আদিম দাবানল জ্বেলে দিয়েছে। মোর্শেদ নিজের অবচেতন মনেই সামিনার সেই অদৃশ্য শরীরটাকে কল্পনা করতে শুরু করেছিল। সামিনার শাড়ির আঁচলটা অবাধ্যভাবে খসে পড়ছে, আর তার নিচে উন্মোচিত হচ্ছে সেই রহস্যময় 'নিষিদ্ধ ভূগোল'। সেই নিঃসঙ্গ রাতে, মোর্শেদ একাই সেই উত্তেজনার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল। কোনো স্পর্শ ছাড়াই, কেবল শব্দের জাদুতে সে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল এক অলীক কামনার কাছে। যখন সব শেষ হলো, যখন সে নিস্তেজ হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল, তখন এক ধরণের অপরাধবোধ নয়, বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। সে ভাবল, এটা কি সামিনার জাদু? নাকি নিছকই তার দীর্ঘদিনের জমানো একাকীত্বের এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ? সামিনা তাকে একাই উত্তেজিত করে তোলে, আবার একাই তাকে নিস্তেজ হতে বাধ্য করে। এই যে একতরফা এক মরণখেলা, এতে মোর্শেদ যেন এক অসহায় পুতুল। সে চায় সামিনাকে রক্ত-মাংসের শরীরে অনুভব করতে। সে চায় তার সেই 'নীল জ্যামিতি'র প্রতিটি রেখাকে নিজের হাতের তালুতে মানচিত্রের মতো পড়ে নিতে। চায়ের দোকানের সেই শব্দগুলো—কেতলির টগবগানি, দূরে বাসের হর্ন—সবই যেন এখন মোর্শেদের কাছে ফিকে মনে হচ্ছে। তার মনের ভেতরে কেবল কাল রাতের সেই কামুক আলাপগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সামিনা কি জানে, সে মোর্শেদের মতো এক শক্ত মানুষকে কতটা দুর্বল করে ফেলেছে? সামিনা কি জানে, তার একেকটা মেসেজ মোর্শেদের অভিজ্ঞ রক্তে কতটা প্রলয় ঘটিয়ে দেয়? মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার হাতের শিরাগুলো ফুটে উঠেছে। এই শরীরটা, যা হাজার মাইল রাইড করেও ক্লান্ত হয় না, তা আজ একজন নারীর অদেখা অবয়বের কাছে নতজানু। সে আবার ভাবল, আজ সকালে কি সামিনা সত্যিই আয়নার সামনে দাঁড়াবে? সে কি তার সেই নিষিদ্ধ ভূগোলের একটা নকশা তাকে পাঠাবে? মোর্শেদের কামনার এই আগুন এখন আর কেবল মনের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। এটা তার পেশিতে, তার রক্তে, তার নিঃশ্বাসে ছড়িয়ে পড়েছে। সে জানে, এই হাইওয়ে তাকে আজ কোনো শান্ত গন্তব্যে নিয়ে যাবে না। যতক্ষণ না সে সামিনার সেই ছবির দেখা পাচ্ছে, ততক্ষণ তার এই অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাবে। সে কোনো আনারি কিশোর নয়, অথচ সামিনার প্রতিটি শব্দ তাকে নতুন করে জন্মানোর স্বাদ দিচ্ছে। সে আবার সিগারেট ধরাল। ধোঁয়াগুলো কুয়াশার সাথে মিশে গিয়ে এক বিমূর্ত রূপ নিল। মোর্শেদ বিড়বিড় করে নিজেকেই নিজে বলল, "আমি কি হারছি? নাকি এটাই শুরু?" মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলবারের ওপর দুই হাত রেখে সোজা হয়ে বসল। চারপাশটা এখনো সেই মায়াবী কুয়াশার চাদরে ঢাকা। হাইওয়ের এই নিঃসঙ্গতা যেন তাকে এক অদ্ভুত নেশায় পেয়ে বসেছে। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। এবার আর কোনো টেক্সট নয়, বরং নিজের এই মুহূর্তের একটা প্রতিচ্ছবি সে সামিনাকে পাঠাতে চায়। সে ফোনটাকে এমনভাবে সেট করল যাতে হাইওয়ের সেই দীর্ঘ ধূসর পথ আর তার বাইকের সামনের অংশটা ফ্রেমের ভেতর চলে আসে। মোর্শেদ নিজে বাইকের সিটের ওপর একটু উঁচু হয়ে আধশোয়া ভঙ্গিতে বসল। তার ডান হাতটা শক্তভাবে ধরে আছে মেটিওর-এর সেই ক্রোম ফিনিশিংয়ের হ্যান্ডেলবার। সেই হ্যান্ডেল ধরা হাতের আঙুলের ভাঁজে ধরা আছে একটা আধখাওয়া জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের অগ্রভাগ থেকে পাতলা নীলচে ধোঁয়ার একটা রেখা ভোরের বাতাসে কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যাচ্ছে দিগন্তবিস্তৃত সেই হাইওয়ে, যা কুয়াশার ভেতর দিয়ে ক্রমে অস্পষ্ট হতে হতে কোথাও যেন এক অসীম শূন্যতায় হারিয়ে গেছে। আকাশের রংটা ধোঁয়াটে ধূসর, যেন কোনো বিষণ্ণ শিল্পীর ক্যানভাস। মোর্শেদ কয়েকটা ছবি তুলল। একটা ছবিতে তার হাতের পেশিগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, আর হাতের রোমগুলো ভোরের শিশিরে ভিজে একটু চিকচিক করছে। সবচেয়ে নিখুঁত ছবিটা বেছে নিয়ে সে সামিনার ইনবক্সে গেল। ছবির নিচে ছোট করে লিখল— “গুড মর্নিং। এই ধূসর সকালে আপনার 'নীল জ্যামিতি'র রঙ কি একটু ছড়ানো যাবে? আমি পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে আছি।” সে সেন্ড বাটনে চাপ দিল। মেসেঞ্জারের সেই চিরচেনা শব্দটা হলো, কিন্তু ছবির নিচে যে গোল চিহ্নটা থাকে, সেটা ভরাট হলো না। কেবল একটা ফাঁপা টিক চিহ্ন (Single Tick) দেখা গেল। মোর্শেদ স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। না, মেসেজটা ডেলিভারড হয়নি। তার মানে সামিনা এখনো অনলাইন হয়নি। ছয় ঘণ্টা আগে সেই যে সে তার মায়াবী জগত নিয়ে আড়ালে চলে গেছে, এখনো ফেরেনি। সামিনার ফোনটা হয়তো এখন তার মাথার কাছে কোনো টেবিলের ওপর নির্জীব পড়ে আছে, কিংবা সে হয়তো এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মোর্শেদের বুকের ভেতর একটা সূক্ষ্ম হাহাকার খেলে গেল। এই যে এত আয়োজন, পঁয়তাল্লিশ বছরের এক অভিজ্ঞ পুরুষের এই যে কিশোরের মতো আকুলতা—সবই যেন একতরফা। সে জানে সামিনা অনলাইনে এলে তবেই এই ছবির সার্থকতা। অথচ এই মুহূর্তে হাইওয়ের এই ঠান্ডা বাতাস আর জ্বলন্ত সিগারেটের উত্তাপটুকু শেয়ার করার মতো কেউ নেই। সে ফোনটা আবার বাইকের ট্যাংকের ওপর রাখল। সামনের রাস্তাটা এখন আরও বেশি রহস্যময় মনে হচ্ছে। সামিনা কি ইচ্ছে করেই দেরি করছে? নাকি সে মোর্শেদকে এই প্রতীক্ষার আগুনে পুড়িয়ে আরও বেশি পরিপক্ক করে নিতে চায়? মোর্শেদ সিগারেটে শেষ একটা লম্বা টান দিয়ে সেটা রাস্তার পাশে ছুড়ে মারল। আগুনের ফুলকিটা কিছুক্ষণ জ্বলল, তারপর শিশিরভেজা ঘাসের ওপর নিভে গেল। সে জানে, যতক্ষণ না সামিনার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠছে, ততক্ষণ মোর্শেদের এই হাইওয়ে রাইডও যেন অসম্পূর্ণ। সে নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকল, ভোরের সেই ধূসর একাকীত্বের ভেতর সামিনার এক চিলতে উপস্থিতির জন্য। মোর্শেদ বাইকের চাবি অন করল। মেটিওর-এর ৩৫০ সিসির ইঞ্জিনটা একবার গর্জে উঠে ধকধক ছন্দে স্থির হলো। হাইওয়ের সেই ধূসর সকালটা এখন ধীরে ধীরে উজ্জ্বল রোদে রূপ নিচ্ছে। মোর্শেদের মনে হলো, এই স্থবির হয়ে বসে থাকা তার জন্য নয়। সে গ্লাভস জোড়া পরে নিল, হেলমেটের ভাইজার নামিয়ে দিয়ে ক্লাচ রিলিজ করল। বাইকটা সামনের অনন্ত পথের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঢাকার কোলাহল পেছনে ফেলে সে এগিয়ে চলল দাউদকান্দির দিকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শীতের ভোরের সেই আমেজ উবে গিয়ে মাথার ওপর কড়া রোদ চড়তে শুরু করেছে। জ্যাকেটের ভেতর দিয়ে রোদের তেজ এখন পিঠে বিঁধছে। সাধারণ সময়ে মোর্শেদ এই রাইডটা দারুণ উপভোগ করত। হাইওয়ের বাতাস যখন তার বুক চিরে বেরিয়ে যায়, তখন সে এক ধরণের আদিম স্বাধীনতা অনুভব করে। কিন্তু আজ সেই স্বাধীনতা যেন কোথাও একটা শেকলে আটকে আছে। সে যতবারই বাইকের গতি বাড়াচ্ছে, ততবারই তার মন অবচেতনভাবে বাম পকেটের দিকে চলে যাচ্ছে—যেখানে ফোনটা সাইলেন্ট মুডে রাখা। প্রতিটা সিগন্যালে, প্রতিটা বাঁকে তার মনে হচ্ছে—এই বুঝি ফোনটা কেঁপে উঠল! এই বুঝি সামিনার থেকে একটা মেসেজ এলো! দাউদকান্দি ব্রিজের ওপর দিয়ে যখন সে বাইক নিয়ে যাচ্ছে, নিচে মেঘনা নদীর শান্ত নীল জল রোদে চিকচিক করছে। মোর্শেদ এক মুহূর্তের জন্য বাইকের গতি কমাল। এই বিশাল জলরাশি, এই আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশ—সবই আজ সামিনার অদেখা অবয়বের কাছে ম্লান মনে হচ্ছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ মোর্শেদ নিজের ওপর বিরক্ত বোধ করল। সে তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। কত নারী তার জীবনে এসেছে, কতবার সে শরীর আর মনের আদান-প্রদান করেছে—কিন্তু কোনো এক ছায়ামানবীর জন্য এমন স্থবির আকুলতা তার পুরুষালি অহংকারে একটু হলেও আঘাত দিচ্ছে। বেলা দুইটা। রোদের তেজ এখন চরমে। হাইওয়ের পিচ থেকে তাপের হল্কা বের হচ্ছে, যা হেলমেটের ভেতরেও মোর্শেদকে ঘেমে নেয়ে একাকার করে ফেলছে। সে দাউদকান্দির একটা মোড় থেকে বাইকটা ঘোরাল। আর না, সামনে গিয়ে লাভ নেই। তার শরীর এখন ক্লান্ত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত তার মন। সামিনা এখনো অফলাইন। সেই যে কাল রাতে সে একটা রহস্যের চাদর বিছিয়ে দিয়ে চলে গেল, তারপর থেকে আর কোনো চিহ্ন নেই। ফেরার পথটা মোর্শেদের কাছে বড্ড দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর মনে হতে লাগল। যে রাইডিং তাকে মুক্তি দিত, আজ সেই রাইডিং যেন তাকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলেছে। হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে যখন সে বনানীর দিকে ঢুকছে, তখন শহরের জ্যাম আর মানুষের চিৎকার তার বিরক্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। অবশেষে বনানীর সেই পরিচিত ফ্ল্যাটের পার্কিংয়ে সে বাইকটা থামাল। মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপ তখনো তার উরুর নিচে অনুভূত হচ্ছে, ঠিক যেমন তার মনের ভেতর সামিনাকে নিয়ে জমানো উত্তাপটুকু। সে হেলমেটটা খুলে বাইকের ওপর রাখল। আয়নায় নিজের মুখটা দেখল—ধুলো আর রোদে মুখটা কালচে হয়ে গেছে, চোখের কোণে এক রাশ ক্লান্তি। লিফটে করে দশতলায় ওঠার সময় সে আবার ফোনটা বের করল। ডাটা কানেকশন অন আছে, কিন্তু নোটিফিকেশন প্যানেলটা একদম খালি। সামিনা এখনো আসেনি। সামিনা তাকে কোনো ছবি পাঠায়নি। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই এসির সেই কৃত্রিম ঠান্ডা বাতাস তাকে অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু এই আভিজাত্য, এই বিশাল ফ্ল্যাট—সবই এখন তার কাছে একটা খাঁচা মনে হচ্ছে। জ্যাকেটটা সোফার ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে বারান্দার দিকে তাকাল। দুপুরের কড়া রোদ জানালার কাঁচ চিরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছে। মোর্শেদ এক গ্লাস বরফ মেশানো জল নিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। তার মনে এক ধরণের তিতকুটে হতাশা দানা বাঁধছে। সে কি সামিনার কাছে কেবল একটা খেলার পুতুল? নাকি সামিনা তাকে এভাবেই অভুক্ত রেখে তার তৃষ্ণাকে আরও তীব্র করতে চায়? পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে এই ধরণের ভার্চুয়াল বিরহ তাকে যেন এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ফেলে দিচ্ছে। সে চোখ বন্ধ করল। সামিনা তাকে ছবি দেয়নি, কিন্তু তার মনের ক্যানভাসে সামিনা এখন হাজারো রঙে আঁকা এক নিষিদ্ধ মানচিত্র। যে মানচিত্রের প্রতিটি পাহাড়ি বাঁক আর গভীর উপত্যকা সে আজ স্পর্শ করতে চেয়েছিল, কিন্তু দিনশেষে সে ফিরে এসেছে একরাশ ক্লান্তি আর শূন্যতা নিয়ে। মোর্শেদ বিড়বিড় করে বলল, “সামিনা, আপনি কি সত্যিই আছেন? নাকি আপনি কেবল আমার এই একাকীত্বের ইকোসিস্টেমের একটা অসুখ?” সোফার কোণে পিঠ ঠেকিয়ে রাখা মোর্শেদের চোখের পাতা কখন যে ভারী হয়ে এসেছিল, সে নিজেও টের পায়নি। রোদে পোড়া শরীরের ক্লান্তি আর সামিনার দিক থেকে আসা নীরবতার একরাশ হতাশা তাকে এক গভীর, অসাড় ঘুমের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই ঘুম স্থায়ী হলো না। হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা হঠাৎ দীর্ঘ একটা কেঁপে উঠতেই মোর্শেদ চমকে জেগে উঠল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল—এটা কি শুধুই মনের ভুল, নাকি আসলেও কোনো সংকেত? ধড়ফড় করে উঠে বসে সে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ঘরের ভেতর বিকেলের শেষ বিচ্ছুরিত আলো এসে পড়েছে। স্ক্রিনে ভেসে থাকা মেসেঞ্জারের লোগোটা দেখে তার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সামিনা জাহান: "বিকেলের তপ্ত রোদে আপনার হাইওয়ের ছবিটা কিন্তু বেশ মায়াবী ছিল, মিস্টার রাইডার! বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত ওই সিগারেটটা... দারুণ সিনেমাটিক।" মোর্শেদ ঘড়ির দিকে তাকাল। সন্ধ্যা ৬টা বেজে ১০ মিনিট। সেই ভোরে পাঠানো ছবির উত্তর এল সন্ধ্যায়! মোর্শেদের শরীরের ভেতর এক ধরণের তিতকুটে অভিমান দানা বাঁধল। সে দ্রুত টাইপ করল— মোর্শেদ: "ছবিটা সিনেমার মতো লাগলেও এর পেছনের মানুষটা কিন্তু রক্ত-মাংসের। আপনার উত্তরের অপেক্ষায় হাইওয়েতে পুড়ে বিকেলে আধমরা হয়ে ঘরে ফিরেছি। আপনি কি তবে সত্যিই মায়া? ইচ্ছে হলে দেখা দেন, ইচ্ছে না হলে অদৃশ্য হয়ে যান?" কয়েক সেকেন্ড পরেই ওপাশে ‘টাইপিং...’ স্ট্যাটাসটা দেখা গেল। মোর্শেদ অধীর আগ্রহে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা: "উফ্, মিস্টার রাইডার তো দেখছি বেশ অভিমানী! আসলে আজ বাচ্চাদের নিয়ে রঙের সমুদ্রে এমনভাবে ডুবে ছিলাম যে ফোনের কথা মনেই ছিল না। স্কুলের ছোট ছোট দস্যুগুলো আজ আমাকে এক মুহূর্ত নিশ্বাস নিতে দেয়নি।" মোর্শেদ: "বাচ্চাদের রঙ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন ভালো কথা, কিন্তু আমার জগতটা যে আপনি আজ ভোরেই বর্ণহীন ধূসর করে রেখে গিয়েছিলেন, সে খবর কি রাখেন? আপনি তো কথা দিয়েছিলেন আজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়াবেন। আমার জন্য সেই ‘নীল জ্যামিতি’র একটা নকশা পাঠাবেন।" সামিনা: (একটা হাসির ইমোজি পাঠিয়ে) "আপনার ধৈর্য তো একদমই কম! আমি তো বলিনি পাঠাব না। কিন্তু ব্যস্ততার মাঝে তাড়াহুড়ো করে কি আর ওই জ্যামিতি মেলালে চলে? শিল্পীর জন্য মেজাজটা তো আগে তৈরি হতে হয়।" মোর্শেদ: "শিল্পী না হয় মেজাজ তৈরি করুক, কিন্তু এই রাইডারের ইঞ্জিন যে অতিরিক্ত গরম হয়ে আছে। এই যে দুপুরে রোদ আর ধুলোর মধ্যে মাইলকে মাইল ছুটলাম, এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি যে আমি একা। মনে হচ্ছিল আপনি বুঝি ফোনের ওপাশ থেকে আমাকে দেখছেন। অথচ দিনশেষে বনানীর এই ঠান্ডা ঘরে আমি এখন ভীষণ একা।" সামিনা: "একা কেন হবেন? আপনার মেটিওর তো আছে। আচ্ছা সত্যি করে বলুন তো, আপনি কি সত্যিই আমাকে মিস করছিলেন, নাকি আমার ছবিটাকে?" মোর্শেদ সোফায় একটু আরাম করে বসল। সামিনার এই কথার প্যাঁচ তাকে আবার সেই চেনা ঘোরটার মধ্যে টেনে নিচ্ছে। সে উত্তর দিল— মোর্শেদ: "ছবি তো কেবল একটা অবয়ব, সামিনা। আমি আসলে সেই রহস্যটাকে মিস করছিলাম, যা আমাকে পঁচিশ বছরের তরুণের মতো অস্থির করে তোলে। আপনি জানেন না, ৪৫ বছর বয়সে এসে এই চঞ্চলতা কতটা যন্ত্রণার, আবার কতটা আনন্দের।" সামিনা: "যন্ত্রণার আনন্দই তো আসল নেশা। ঠিক আছে, অনেক তো অভিমান হলো। এখন একটু ফ্রেশ হয়ে নিন। আপনার এই পোড়া মুখ আর ক্লান্ত চোখের ছবি দেখলে তো আমার ছবি তোলার অনুপ্রেরণাটাই মরে যাবে!" মোর্শেদ: "অর্থাৎ, আপনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে রাতেই সেই মহেন্দ্রক্ষণ আসছে?" সামিনা: "ইঙ্গিত নয়, সম্ভাবনা। তবে শর্ত একটাই—মেজাজ বিগড়ে দেবেন না। এখন যান, এক কাপ কড়া কফি খেয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিন।" মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে একটা জয়ের হাসি ফুটে উঠল। অভিমানটুকু মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে ফোনটা রেখে ব্যালকনির দিকে তাকাল। সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে বনানীর আকাশে, কিন্তু মোর্শেদের ভেতরে এখন এক তীব্র প্রত্যাশার আলো জ্বলছে। রাত দশটা গড়িয়ে এগারোটার ঘরে কাঁটা। বনানীর ফ্ল্যাটে এখন পিনপতন নীরবতা। মোর্শেদ ডিনার শেষ করে হাতে এক গ্লাস অন দ্য রক্স হুইস্কি নিয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারে বসল। আজ আর সিগারেট নয়, বরং দামী একটা সিগার ধরিয়েছে সে। নীলচে ধোঁয়াগুলো রাতের অন্ধকারে সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। ফোনটা টেবিলের ওপর রাখা। ঠিক তখনই স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। সামিনার মেসেজ। সামিনা: "কী করছেন মিস্টার রাইডার? ডিনার হয়েছে?" মোর্শেদ সিগারটা অ্যাশট্রেতে রেখে দ্রুত টাইপ করল— মোর্শেদ: "ডিনার তো অনেক আগেই শেষ। এখন কেবল আপনার অপেক্ষা করছি। আপনি কি জানেন, এই অপেক্ষাটা এখন আমার নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে?" সামিনা: "ওহ্! আপনি তো দেখি বেশ সিরিয়াস। আমি এই মাত্র সব কাজ সেরে, ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে ঘুমাতে আসলাম। সারাদিনের ওই দস্যি বাচ্চাগুলোর ধুলোবালি ঝেড়ে এখন বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিতেই মনে পড়ল—এক চঞ্চল রাইডার বোধহয় আমার জন্য এখনো জেগে আছে।" মোর্শেদের চোখের সামনে ভেসে উঠল দৃশ্যটা। সামিনা বিছানায় শুয়ে, তার শরীরের প্রতিটি রেখা যেন রাতের অন্ধকারে এক বিমূর্ত আল্পনা। মোর্শেদ ভাবতে চাইল, সামিনা এখন ঠিক কী পোশাকে আছে? তার পরনে কি নীল রঙের কোনো পাতলা সুতির স্লিভলেস কামিজ, নাকি ঘিয়া রঙের ঢিলেঢালা একটা নাইটি? কাপড়ের মসৃণতা কি সামিনার গায়ের তপ্ত ত্বকের সাথে মিশে গিয়ে এক ধরণের ঘর্ষণ তৈরি করছে? সামিনার সেই অবাধ্য চুলগুলো নিয়ে মোর্শেদের কৌতূহল সবচেয়ে বেশি। সে কি ঘুমানোর আগে তার একরাশ ঘন কালো চুলগুলোকে আলতো করে একটা হাতখোঁপা করে বেঁধে নিয়েছে? নাকি দীর্ঘ দিনের অভ্যাস মতো সেগুলোকে একদম অবাধে বালিশের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছে? মোর্শেদের মনে হলো, সামিনার চুলগুলো নিশ্চয়ই অবাধ্য; কোনো বাঁধনই বোধহয় সেগুলোকে আটকে রাখতে পারে না। বালিশের সাদা কভারে ছড়িয়ে থাকা সেই কালো চুলের ঢেউগুলো যেন এক অন্ধকার সমুদ্র। সামিনার সেই 'ফ্রেশ' হয়ে ওঠার মুহূর্তটা কল্পনা করতেই মোর্শেদের বুকটা আবার ভারী হয়ে উঠল। কোনো দামী পারফিউম নয়, বরং খুব সাধারণ কোনো সাবানের স্নিগ্ধ সুবাস আর সদ্য ধোয়া ভেজা চুলের সোঁদা ঘ্রাণ যেন মোবাইল স্ক্রিন চিরে সরাসরি মোর্শেদের নাকে এসে ধাক্কা দিল। সেই ঘ্রাণে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল এক আদিম এবং বিশুদ্ধ আকর্ষণ। মোর্শেদ চোখ বন্ধ করে সেই অদৃশ্য ঘ্রাণটুকু নিজের ফুসফুসে টেনে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করল। মোর্শেদ: "ঘুমাতে আসলেন? একা? নাকি আপনার ওই রঙের জগত আর তুলিগুলোকেও পাশে নিয়ে শুয়েছেন?" সামিনা: "তুলিরা তো ড্রয়িং রুমে। বিছানায় এখন কেবল আমি আর আমার একাকীত্ব। ঠিক আপনার ওই দশতলার ফ্ল্যাটের মতো।" মোর্শেদ: "আমার একাকীত্ব কিন্তু এখন আর আগের মতো নেই, সামিনা। সেখানে এখন আপনার শব্দেরা রাজত্ব করছে। কিন্তু শব্দ দিয়ে তো আর তৃষ্ণা মেটে না। আমি এখনো সেই প্রতিশ্রুত ছবিটার অপেক্ষায় আছি। সকাল গেল, দুপুর গেল, বিকেলও ফুরোলো। এবার কি সেই 'নীল জ্যামিতি'র পর্দা উঠবে না?" সামিনা: (একটু সময় নিয়ে) "আপনি বড্ড অধৈর্য। একটা ছবি দিলেই কি সব তৃষ্ণা মিটে যাবে? নাকি তখন নতুন কোনো বায়না শুরু হবে?" মোর্শেদ: "মানুষের কামনার কি শেষ আছে? তবে আপনার ওই অদেখা রূপটা এখন আমার কাছে এক নিষিদ্ধ ভূগোলের মতো। আমি জানতে চাই, ওই শব্দের আড়ালে যে নারী লুকিয়ে আছে, সে দেখতে ঠিক কতটা কামুক। আপনি বলেছিলেন আয়নার সামনে দাঁড়াবেন। দাঁড়িয়েছিলেন কি?" সামিনা: "দাঁড়িয়েছিলাম। আয়নায় নিজেকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম—একজন পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ মানুষ, যিনি হাইওয়ে দাপিয়ে বেড়ান, তিনি কি আমার এই সাধারণ অবয়ব সহ্য করতে পারবেন? নাকি পুড়ে ছারখার হয়ে যাবেন?" মোর্শেদ: "পুড়ে যেতেই তো চাইছি। আপনি কি জানেন না, আগুনের ধর্মই হলো পুড়িয়ে ছাই করা? আমি সেই দহনের অপেক্ষায় আছি। সামিনা, দয়া করে আর রহস্য বাড়াবেন না। আমাকে আজকারের আপনাকে দেখতে দিন। কোনো পুরনো ছবি নয়, ঠিক এই মুহূর্তে আপনি যেমন আছেন—বালিশে মাথা রেখে কিংবা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে—তেমন একটা ছবি পাঠান।" মোর্শেদের গলার স্বর যেন মেসেজের হরফেও ফুটে উঠছে। তার শরীর এখন টানটান উত্তেজনায় কাঁপছে। হুইস্কির গ্লাসটা হাতে নিয়েও সে চুমুক দিতে ভুলে গেছে। সামিনার ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসছে না কয়েক মিনিট হলো। ‘সিন’ হয়ে আছে কিন্তু কোনো টাইপিং স্ট্যাটাস নেই। মোর্শেদ বুঝতে পারছে, ওপাশে সামিনা হয়তো নিজেকে প্রস্তুত করছে, অথবা মোর্শেদের এই আকুলতা উপভোগ করছে। মোর্শেদ আবার লিখল: "চুপ করে আছেন কেন? আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? নাকি আমাকে পাগল করে দেওয়াই আপনার লক্ষ্য?" সামিনা: "ভয় আপনাকে নয়, নিজেকে পাচ্ছি। আচ্ছা, যদি ছবিটা এমন হয় যা দেখে আপনার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়, তার দায় কি আপনি নেবেন?" মোর্শেদ: "ঘুম তো আপনি কাল রাতেই কেড়ে নিয়েছেন। এখন শুধু সেই বিনিদ্র রাতটাকে সার্থক করে দিন। পাঠান সামিনা... আমি আপনার প্রতিটি রেখাকে জুম করে দেখতে চাই।" মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রইল। তার বুকের ধুকপুকানি এখন মেটিওর-এর আইডল ইঞ্জিনের শব্দের চেয়েও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে তাদের কথোপকথন এক নতুন স্তরে পৌঁছাল। সামিনার প্রতিটি মেসেজ যেন মোর্শেদের বনানীর সেই নিরিবিলি ফ্ল্যাটের দেয়ালগুলোতে কামনার প্রতিধ্বনি তুলছিল। মোর্শেদ বুঝতে পারছিল, সামিনা আজ তাকে খুব সহজেই মুক্তি দেবে না। অবশেষে, ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটা ছুঁইছুঁই, সামিনা লিখল— সামিনা: "মিস্টার রাইডার, আপনি কি প্রস্তুত? আমি কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি। তবে মনে রাখবেন, কল্পনা সবসময় বাস্তবের চেয়ে বেশি সুন্দর হয়। আমি কি আপনার সেই সুন্দর কল্পনাটা ভেঙে দেব?" মোর্শেদের গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে এল। সে হুইস্কির গ্লাসটা একপাশে সরিয়ে রেখে ফোনটা দুই হাতে শক্ত করে ধরল। সে লিখল— মোর্শেদ: "কল্পনা আর বাস্তবের লড়াইটা আজ হতে দিন সামিনা। আমি আপনার সেই জ্যামিতিক নকশায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাই। পাঠান... আমি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে পারছি না।" কয়েক সেকেন্ড পর, মেসেঞ্জারের সেই পরিচিত 'পপ' শব্দটা হলো। একটা ইমেজ ফাইল লোড হতে শুরু করল। মোর্শেদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সে দেখল নীল রঙের প্রোগ্রেস বারটা শেষ হয়ে ছবিটা পুরোপুরি ফুটে উঠল। ছবিটি ছিল বিস্ময়কর এবং একই সাথে অতৃপ্তিদায়ক। মোর্শেদ স্ক্রিনের ওপর আঙুল ছোঁয়াতেই ছবিটা পূর্ণ অবয়বে ফুটে উঠল। সামিনা যে ছবিটি পাঠিয়েছে, সেটি কোনো সাধারণ সেলফি নয়; বরং আড়াল আর প্রকাশের এক নিপুণ খেলা। ছবিতে সামিনা একটি বড় কাঠের টেবিলের ওপাশে বসে আছে। তার পরনে টকটকে মেরুন রঙের একটি সালোয়ার কামিজ। কামিজের গাঢ় রঙ সামিনার দুধে-আলতা গায়ের রঙের সাথে মিশে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। সামিনার চেহারাটা গোলগাল এবং ডাগর, যার মধ্যে এক ধরণের আভিজাত্য মেশানো সতেজতা আছে। তার ঠোঁটদুটো বেশ পুরু এবং মাংসল—মোর্শেদের মনে হলো সেই ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা রহস্যময় হাসিটা কোনো অভিজ্ঞ শিকারীর মতো তাকে বিদ্ধ করছে। সামিনার চুলগুলো মাথার পেছনে শক্ত করে খোঁপা করা। যার কারণে তার ঘাড়ের দুপাশ একদম উন্মুক্ত হয়ে আছে। সেই খোঁপার বাঁধন দেখা না গেলেও বোঝা যাচ্ছে। তবে ছবি দেখে এটা বোঝার উপায় নেই তার চুল ঠিক কতটা লম্বা বা ঘন, কিন্তু খোঁপার সেই ভার সামিনার মাথার পেছনের অংশে এক ধরণের গাম্ভীর্য যোগ করেছে। টেবিলের ওপর রাখা তার হাতদুটোর কব্জিতে কয়েকগাছি কাঁচের চুড়ি, যা স্তব্ধ ছবিতেও যেন রিনরিন শব্দ তুলছে। সামিনার এই 'বড়সড়' এবং ভরাট শরীরী গড়ন মোর্শেদের কল্পনাকে এক ধাক্কায় কয়েক ধাপ ওপরে নিয়ে গেল। যদিও টেবিলের ওপাশে বসে থাকার কারণে সামিনার শরীরের পূর্ণ অবয়ব বা সেই ‘নীল জ্যামিতি’র নিচের অংশটুকু একদমই আড়ালে রয়ে গেছে, কিন্তু টেবিলের ওপর উপচে পড়া তার বুকের উপরিভাগের উদ্ধত ভঙ্গি আর চওড়া কাঁধের বিভাস মোর্শেদকে বুঝিয়ে দিল—এই নারী কেবল শব্দের মায়া নয়, বরং এক আদিম এবং শক্তিশালী মোহিনী। মোর্শেদ ছবিটা জুম করল। সামিনার ফরসা ত্বকের ওপর মেরুন কামিজের প্রতিফলন এক ধরণের গোলাপি আভা তৈরি করেছে। তার সেই পুরু ঠোঁটের কারুকাজ আর গোলগাল চেহারার লাবণ্য মোর্শেদের ভেতর এক অবর্ণনীয় দহন তৈরি করল। সে ভাবল, এই টেবিলটা যদি না থাকত? এই লুকোচুরি যদি না থাকত? সে দ্রুত কাঁপাকাঁপা আঙুলে টাইপ করল— মোর্শেদ: "সামিনা, আপনি কি জানেন আপনি কতটা প্রলয়ংকরী? আপনার এই গোলগাল চেহারার আড়ালে যে কী পরিমাণ কামুকতা লুকিয়ে আছে, তা আপনার এই পুরু ঠোঁটদুটো চিৎকার করে বলছে। কিন্তু ওই টেবিলটা... ওটা কেন মাঝখানে রাখলেন? আপনি কি চান আমি আপনার শরীরের পূর্ণ মানচিত্রটা না দেখেই পাগল হয়ে যাই?" সামিনা: (একটা চোখের ইমোজি দিয়ে) "সবটুকু দেখতে চাইলে তো ধৈর্য হারালে চলবে না, মিস্টার রাইডার। টেবিলটা তো আসলে একটা পর্দা। এই গোলগাল চেহারার আড়ালে যে রহস্য আছে, তা উদ্ধার করা কি এতই সহজ? আপনি কি ভয় পাচ্ছেন, নাকি আরও গভীরে ডুব দিতে চাইছেন?" মোর্শেদ: "আমি ডুব দিতে চাই না সামিনা, আমি হারিয়ে যেতে চাই। আপনার এই মেরুন কামিজ আর ওই ভরাট শরীরের নেশা আমাকে হাইওয়ের গতির চেয়েও বেশি উন্মাদ করে দিচ্ছে। কিন্তু এই ছবিটা অসম্পূর্ণ। আমি আপনার সেই খোঁপা খুলে যাওয়া চুল আর টেবিলের আড়াল ছাড়া আপনাকে দেখতে চাই।" এই কথার পর কেমন যেন একটা হঠাৎ নিরবতা গ্রাস করল দুজনকেই। এই অস্বস্তিকর নিরবতা ভাঙাতে মোর্শেদ ভাবতে লাগল কি বলা যায় সামিনাকে? মোর্শেদ দ্রুত টাইপ করল— মোর্শেদ: "এই ছবিটা তো বাসি, সামিনা। এটা হয়তো মাস ছয়েক আগের কোনো সোনালী বিকেলের স্মৃতি। এতে আপনি আছেন, কিন্তু আপনার বর্তমানের সেই উত্তাপ নেই। আমি আজকের সামিনাকে দেখতে চেয়েছিলাম। যে সামিনা মাত্রই ফ্রেশ হয়ে বালিশে মাথা রেখেছেন।" সামিনা: (একটু সময় নিয়ে লিখল) "বাসি? আপনি কি তবে শিল্পের বয়স মাপেন, মিস্টার রাইডার? এই ছবিটাতে কি আপনি আমাকে খুঁজে পাননি?" মোর্শেদ: "আমি আপনাকে পেয়েছি, কিন্তু আপনার সেই 'নীল জ্যামিতি'কে পাইনি। আমি কাল্পনিক কোনো ছায়াশরীর চাই না, আমি চাই রক্ত-মাংসের বর্তমান। আমি জানতে চাই এই মুহূর্তে আপনার চুলের গন্ধ কেমন, আপনার পরনের সেই পাতলা সুতির কাপড়টা আপনার শরীরের সাথে কীভাবে যুদ্ধ করছে। এই ছবিটা আমাকে তৃষ্ণার্ত করেছে ঠিকই, কিন্তু তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি।" সামিনা ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর লিখল— সামিনা: "আপনি আসলেই একজন জেদী রাইডার। ঠিক আছে, আজকের মতো এই ছবিটা নিয়েই ঘুমোতে যান। আমি কথা দিচ্ছি—কাল সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে আমি আয়নার সামনে দাঁড়াব। একদম ফ্রেশ, ভোরের সেই প্রথম আলোয়। শুধু আপনার জন্য একটা ছবি তুলব। এবার কি খুশি?" মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, সামিনা তাকে আবার এক দীর্ঘ অপেক্ষার জালে জড়িয়ে দিল। কিন্তু এই অপেক্ষার মধ্যেই যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনা আছে। পরমুহূর্তেই মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। যদিও সরাসরি বর্তমানের কোনো ছবি সে পেল না, কিন্তু সামিনার এই নতিস্বীকার তার কাছে এক বিশাল জয় মনে হলো। কাল ভোরে সামিনা আয়নার সামনে দাঁড়াবে—শুধু তার জন্য। এই কল্পনাটুকু মোর্শেদের পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ শরীরে এক তীব্র শিহরণ জাগিয়ে তুলল। তার শিরদাঁড়া বেয়ে এক ধরণের অদ্ভুত উত্তাপ নেমে যাচ্ছে। কাল ভোরের সেই প্রথম আলোয় সামিনা যখন স্নান সেরে আয়নার সামনে দাঁড়াবে, তখন তার সেই ফরসা গোলগাল শরীরটার ওপর দিয়ে ভোরের নরম আলো কীভাবে খেলা করবে, সেটা ভেবেই মোর্শেদের ভেতরে কামনার এক অবাধ্য স্রোত বয়ে গেল। সে দ্রুত টাইপ করল— মোর্শেদ: "খুশি? আপনি জানেন না সামিনা, এই খুশির মাশুল আমার শরীর কীভাবে দিচ্ছে। কাল ভোরের ওই আলোর অপেক্ষায় আমার রাতটা এখন হাজার বছর লম্বা মনে হবে। ওই আয়নাটা খুব ভাগ্যবান, সে কাল সকালে আপনার ওই ভরাট শরীরের প্রতিটি বিভঙ্গ প্রথম দেখবে। আমার হিংসে হচ্ছে আয়নাটার ওপর।" সামিনা: "উফ্, আপনার কল্পনা তো দেখি হাইওয়ের গতির চেয়েও জোরে ছুটছে! আয়নাটার ওপর হিংসে করে লাভ নেই, শিল্পী তার সৃষ্টিকে আগে আয়নাতেই পরখ করে নেয়। তবে মনে রাখবেন, ভোরের আলো কিন্তু খুব স্বচ্ছ হয়, সেখানে কোনো কিছু আড়াল করা কঠিন।" মোর্শেদ: "আমি তো আড়াল চাই না সামিনা। আমি চাই উন্মোচন। আমি চাই আপনার ওই মেরুন কামিজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্যগুলো কাল ভোরে একে একে আমার ফোনে ধরা দিক। আপনার ওই পুরু ঠোঁটদুটো কাল সকালে কী বলবে? নাকি তারা কেবল ছবিতেই কথা বলবে?" সামিনা: "ঠোঁটদুটো কাল সকালে হয়তো একটু বেশিই নীরব থাকবে, মিস্টার রাইডার। কারণ তখন তারা আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবে। আচ্ছা, অনেক রাত হলো, এবার কিন্তু আমার ঘুমানো দরকার। কাল সকালে উঠতে হবে, বাচ্চাদের জগত ডাকছে আমাকে।" মোর্শেদ: "বাচ্চাদের জগত তো আছেই, কিন্তু এই রাইডারের জগতটা যে এখন আপনার ওই 'ভোরের ছবিতে' আটকে আছে। আচ্ছা সামিনা, কাল সকালে কি আপনার ওই খোঁপাটা খোলা থাকবে? আমি আপনার সেই চুলের অরণ্যে হারিয়ে যেতে চাই।" সামিনা: "সেটা কাল সকালেই দেখা যাবে। এখন আর কোনো প্রশ্ন নয়। এবার চোখ বন্ধ করুন আর কাল ভোরের স্বপ্ন দেখুন। শুভরাত্রি, আমার জেদী রাইডার।" মোর্শেদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। তার শরীর এখন এক ধরণের মিষ্টি যন্ত্রণায় অবশ হয়ে আসছে। সামিনা বিদায় নিলেও তার ঘ্রাণ আর তার ওই গোলগাল চেহারার লাবণ্য যেন ঘরের বাতাসে মিশে আছে। মোর্শেদ অনুভব করল, তার প্যান্টের বেল্টটা এখন বড্ড বেশি টাইট মনে হচ্ছে। সে ফোনটা হাতে নিয়ে টাইপ করল না, কেবল একটি জ্বলন্ত লাল রঙের 'চুমুর ইমোজি' পাঠিয়ে দিল। সামিনা মেসেজটা 'সিন' করল, কিন্তু আর কোনো উত্তর দিল না। মোর্শেদ বুঝল, খেলাটা এখন সামিনার কোর্টে। সে বারান্দার ইজি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। কাল ভোরের সেই প্রথম আলো আর সামিনার সেই প্রতিশ্রুত 'নিষিদ্ধ ভূগোল' দেখার নেশায় সে এখন বিভোর। সে হুইস্কির শেষ চুমুকটা দিয়ে ল্যাপটপ আর ফোনের আলো নিভিয়ে দিল। অন্ধকার ঘরে কেবল তার দ্রুত হতে থাকা নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কাল সকালটা কি আসলেও কোনো নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে? মোর্শেদ এখন কেবল সেই অপেক্ষার ইকোসিস্টেমে বন্দী। সামিনা অফলাইন হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মেসেঞ্জারের সেই সবুজ বিন্দুটা নিভে গেল, কিন্তু মোর্শেদের ভেতরের দাবানলটা তখন মাত্র ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। সে ফোনটা হাতে নিয়ে আবার সেই ছবিটাতে ফিরে গেল। অন্ধকার ঘরে ফোনের উজ্জ্বল আলোটা তার মুখে এসে পড়ছে, আর তার স্থির চোখ দুটো যেন সামিনার ওই ভরাট অবয়বটাকে গিলে খেতে চাইছে। সে ছবিটা জুম করল। সামিনার সেই গোলগাল ভরাট মুখটা—যাতে এক ধরণের আদিম সতেজতা আর আভিজাত্য মাখানো। মোর্শেদ তার আঙুল দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে সামিনার সেই পুরু, মাংসল ঠোঁটদুটো স্পর্শ করার চেষ্টা করল। সে কল্পনা করল, এই ঠোঁটদুটো যখন কথা বলে, তখন তারা কতটা প্রলয়ংকরী হয়ে ওঠে। সামিনার সেই ফরসা ত্বকের লাবণ্য তার চোখের মণি ছাপিয়ে সরাসরি মস্তিষ্কের কোষে গিয়ে আঘাত করছে। তার চোখ এবার স্থির হলো সামিনার সেই খোঁপা করা চুলের দিকে। যদিও ছবিতে চুলগুলো গোছানো, কিন্তু মোর্শেদের মনে হলো সে যেন ওই খোঁপার প্রতিটি ভাঁজ অনুভব করতে পারছে। সে ভাবতে লাগল, এই মুহূর্তেই যদি সে ওই খোঁপার বাঁধনটা আলগা করে দিত? সেই একরাশ কালো অবাধ্য চুল যখন সামিনার ওই চওড়া ফরসা কাঁধ আর ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়ত, তখন সামিনাকে দেখতে কেমন লাগত? মেরুন কামিজের সেই স্লিভলেস কাটিং দিয়ে বেরিয়ে আসা সামিনার ভরাট বাহু আর তার শরীরের সেই উদ্ধত বিভঙ্গগুলো মোর্শেদকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকতে দিচ্ছে না। টেবিলের আড়ালে থাকা সামিনার সেই ‘নিষিদ্ধ ভূগোল’ এখন মোর্শেদের কল্পনায় পূর্ণতা পাচ্ছে। সামিনার সেই বড়সড় ভরাট শরীর, তার কোমর আর নিতম্বের সেই জ্যামিতিক বাঁকগুলো সে নিজের মনের ক্যানভাসে আঁকতে শুরু করল। মোর্শেদ অনুভব করল, তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী পোক্ত শরীরটা এখন আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তার যৌনাঙ্গ প্রবল বিক্রমে জাগ্রত হয়ে উঠেছে, যা তার প্যান্টের কাপড়ের ভেতর দিয়ে এক ধরণের অসহ্য চাপ তৈরি করছে। ঘরের এসিটা সচল থাকলেও মোর্শেদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেমে সামিনা যেন এক মরণনেশা হয়ে ঢুকে পড়েছে। মোর্শেদ নিজের অজান্তেই তার প্যান্টের বোতামটা আলগা করে দিল। তার হাত চলে গেল সেই জাগ্রত কামনার ওপর। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসেও সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক সদ্য যৌবনে পা ফেলা তরুণের মতো। কোনো অভিজ্ঞ পুরুষের সংযম নয়, বরং এক আদিম আর ক্ষুধার্ত পশুর মতো সে হস্তমৈথুন করতে শুরু করল। তার চোখের সামনে কেবল সামিনার সেই গোলগাল মুখ, সেই পুরু ঠোঁট আর মেরুন কামিজের নিচে লুকিয়ে থাকা সেই রহস্যময় ভরাট শরীরের হাহাকার। প্রতিটি ঘর্ষণে সে যেন সামিনার সেই 'নীল জ্যামিতি'র আরও কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। অন্ধকার ঘরে কেবল মোর্শেদের দ্রুত আর ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। সে চোখ বন্ধ করল। এখন আর সে বনানীর ফ্ল্যাটে নেই; সে যেন সামিনার সেই অদেখা শরীরের প্রতিটি ভাঁজে হারিয়ে যাচ্ছে। উত্তেজনার পারদ যখন চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছাল, তখন মোর্শেদ এক তীব্র যন্ত্রণাদায়ক সুখে কুঁকড়ে গেল। নিস্তেজ হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দেওয়ার পর তার মনে হলো—সামিনা তাকে আজ সশরীরে না এসেও পুরোপুরি জয় করে নিয়েছে। মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপের চেয়েও তীব্র এক দহন তাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। সে নিঃশব্দে শুয়ে থাকল, ভোরের সেই প্রতিশ্রুত আলোর অপেক্ষায়, যখন সামিনা সত্যিই তার সবটুকু পর্দা সরিয়ে মোর্শেদের সামনে ধরা দেবে।