হাইওয়ের নীল জ্যামিতি পর্ব ২

haioer niil jyamiti prb 2

হাইওয়ের নীল জ্যামিতি। পর্ব ২
৩৮ বছরের সামিনা, ৪৫ এর মোর্শেদ। একটি মটরবাইক। বাংলাদেশের পথঘাট। অদম্য যৌনতা আর মনের হেলদোল। চলুন ঘুরে আসি অজানা থেকে।

লেখক: BengaliLekhika

ক্যাটাগরি: ফ্যান্টাসি

সিরিজ: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি

প্রকাশের সময়:06 Mar 2026

আগের পর্ব: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি

পর্ব ২ঃ শব্দের আড়ালে ছায়াশরীর

সকাল ১১টা বেজে দশ মিনিট। জানালার ভারী পর্দার ফাঁক গলে বনানীর তীব্র রোদ এসে পড়েছে মোর্শেদের বিছানায়। ঘুমের ভেতর থেকে অস্বস্তি নিয়ে সে পাশ ফিরল, কিন্তু রোদের তেজ তাকে আর ঘুমাতে দিল না। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে সাধারণত মানুষের ঘুম ভোরে ভেঙে যায়, কিন্তু মোর্শেদের এই অভ্যাস নেই। তার রাতগুলো শেষ হয় অনেক দেরিতে, তাই দিন শুরু হয় মধ্য-দুপুরে।

আড়মোড়া ভেঙে যখন সে উঠে বসল, তখন মাথাটা বেশ ভারী হয়ে আছে। গতরাতের সেই হুইস্কি আর আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপে কাটানো সময়গুলোর রেশ যেন এখনো শিরা-উপশিরায় মিশে আছে। সে আলস্যভরা পায়ে জানালার কাছে গিয়ে পর্দাটা সরিয়ে দিল। বাইরে বনানী ডিওএইচএসের সুশীতল নীরবতা। নিচে তার রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ৩৫০ কভার দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে। মোর্শেদ যান্ত্রিকভাবে ড্রয়ার থেকে মার্লবরোর প্যাকেট আর লাইটারটা বের করল। বাসি মুখে সিগারেটের প্রথম টানে যে ঝাঁঝালো ধোঁয়াটা ফুসফুসে ঢুকল, সেটাই যেন তাকে মনে করিয়ে দিল যে সে এখনো তার নিজের ইকোসিস্টেমে বেঁচে আছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাধারণত গভীর রাতের কোনো বিশেষ মুহূর্ত বা কথা মানুষকে সকালে তাড়না দেয়, কিন্তু মোর্শেদ এই মুহূর্তে বেশ নিস্পৃহ। কাল রাতে সামিনা নামের সেই রহস্যময়ী নারীর সাথে হওয়া দীর্ঘ কথোপকথন তার মাথায় এই মুহূর্তে তেমন কোনো ঢেউ তুলছে না। বরং সে খুব নির্লিপ্তভাবে তার আজকের দিনটার পরিকল্পনা করতে শুরু করল। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ডাইনিং টেবিলে বসতেই দেখল তার মামা-মামী হয়তো খেয়েদেয়ে নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন । টেবিলে ঢাকা দেওয়া আছে রুটি আর অমলেট। মোর্শেদ নির্বিকারভাবে নাস্তাটা শেষ করল।

নাস্তা শেষে এক মগ কড়া ব্ল্যাক কফি হাতে সে আবার নিজের ঘরে ফিরে এলো। কফির তিতকুটে স্বাদ জিভে লাগতেই হঠাৎ এক নিমেষে গতরাতের সেই শব্দগুলো তার মস্তিষ্কে ধাক্কা দিল— "মানুষ চিনে নেওয়া কঠিন"। এতক্ষণ যে স্মৃতিটাকে সে অবদমিত করে রেখেছিল, তা এক তীব্র টানে সামনে চলে এল। মোর্শেদ কফির মগটা টেবিলে রেখে দ্রুত ল্যাপটপটা খুলল। তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী হার্টবিটটা কেন যেন এই মুহূর্তে একটু অনিয়মিত হয়ে উঠছে।

সে সোজা চলে গেল মেসেঞ্জারে। অবচেতন মনে সে আশা করেছিল, হয়তো সামিনার কোনো একটা মেসেজ এসে পড়ে আছে। কিন্তু ইনবক্স একদম ফাঁকা । মোর্শেদ কিছুটা ইতস্তত করে কিবোর্ডে আঙুল রাখল। সে টাইপ করল: "শুভ সকাল। আপনার রঙ আর ক্যানভাসের জগত কি আজ খুব ব্যস্ত? নাকি বাচ্চারা আপনাকে খুব জ্বালাচ্ছে?"

মেসেজটা সেন্ড করার পর সে দেখল পাশে কেবল একটা ধূসর টিক চিহ্ন। অর্থাৎ মেসেজটা সামিনার ফোনে পৌঁছায়নি, সে অনলাইনে নেই। সামিনা বলেছিল সে এক মধ্যবিত্ত স্কুল শিক্ষিকা, হয়তো এই সময়ে সে যাত্রাবাড়ীর কোনো ঘিঞ্জি ক্লাসরুমে বাচ্চাদের আঁকাআঁকি শেখাচ্ছে।

বিরক্ত হয়ে মোর্শেদ ফেসবুকের সেই 'রাইডার্স গ্রুপ'-এ ঢুকল। তার সেই পাহাড়ি ছবির নিচে কমেন্টের সংখ্যা এখন কয়েকশ ছাড়িয়ে গেছে। সোহেল, রিয়াজরা আরও অনেক চটকদার কথা লিখেছে, তাকে 'লিভিং লিজেন্ড' বলে আকাশচুম্বী প্রশংসা করেছে। মোর্শেদ যান্ত্রিকভাবে কয়েকজনকে উত্তর দিল, কিন্তু কোনোভাবেই সে লেখায় মন বসাতে পারল না। তার চোখ বারবার খুঁজছে সেই আইডিটা—সামিনা জাহান।প্রোফাইল পিকচারে থাকা সেই অন্ধকার জানালার বৃষ্টিভেজা ছবিটা যেন এখন তার সামনে এক প্রকাণ্ড দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সে সামিনার ওয়ালে গিয়ে আবার স্ক্রল করতে লাগল। কাল রাতে দেখা সেই আর্টস আর ক্র্যাফটের ছবিগুলো ছাড়া আর কিছুই নতুন নেই। কোনো মানুষের মুখ নেই, কোনো ব্যক্তিগত তথ্য নেই। এক অদ্ভুত অস্থিরতা মোর্শেদকে গ্রাস করতে শুরু করল। বনানীর এই নিঃসঙ্গতা যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। কাল রাতে সে ছিল এই ইকোসিস্টেমের রাজা, আর আজ এক রহস্যময়ী নারীর নীরবতা তাকে এক সাধারণ দাসে পরিণত করেছে। সামিনার কোনো খোঁজ নেই, তার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে মোর্শেদের মনে সংশয় দানা বাঁধল।

সামিনার টাইমলাইনটা মোর্শেদ সারা দিনে অন্তত দশবার স্ক্রল করল। সেখানে রহস্যময়ী এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কিছু জলরঙের ছবি, অর্ধেক আঁকা এক জোড়া চোখ, আর একটা পুরনো ভাঙা জানালার ফ্রেম—ব্যস, এটুকুই। কোনো মানুষের মুখ নেই, কোনো ব্যক্তিগত আড্ডার ছবি নেই, এমনকি কোনো চেক-ইন পর্যন্ত নেই। এক অদ্ভুত অস্থিরতা মোর্শেদকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। সামিনা জাহান কি আদৌ কোনো রক্ত-মাংসের মানবী? নাকি কেউ তাকে নিয়ে কোনো সূক্ষ্ম কৌতুক করছে? এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে সে কি শেষ পর্যন্ত কোনো 'ক্যাটফিশ' বা ফেক আইডির ফাঁদে পা দিল? তার মতো একজন ঝানু রাইডার, যে পাহাড় আর সমতলের হাজার হাজার মাইল একাকী পাড়ি দিয়েছে, সে কি সামান্য কিছু শব্দের মায়াজালে আটকা পড়ে গেল?

নিজের ওপর একটা চাপা বিরক্তি নিয়ে মোর্শেদ ফেসবুকের রাইডার্স কমিউনিটি গ্রুপটাতে আবার ঢুকল। এবার সে কেবল সামিনার অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজতে চাইছে। সে সার্চ বক্সে গিয়ে সামিনার নাম লিখে গ্রুপটির ভেতরকার অ্যাক্টিভিটি চেক করতে শুরু করল। কিন্তু ফলাফল সেই শূন্য। সামিনা এই গ্রুপে কোনো পোস্ট দেয়নি, অন্য কারও ছবিতে কোনো কমেন্ট করেনি, এমনকি মোর্শেদের ছবির নিচে ওই একটা মন্তব্য ছাড়া আর কোথাও তার উপস্থিতির চিহ্ন নেই।

মোর্শেদ ভাবতে লাগল, রাইডার্স গ্রুপে সামিনার আসার উদ্দেশ্য কী হতে পারে? সে তো বাইকার নয়, ট্রাভেলারও নয়। একজন আর্ট টিচার, যার জগত তুলি আর ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ, সে কেন হঠাৎ এমন একটা উগ্র গতির নেশায় বুঁদ হওয়া মানুষের ভিড়ে এসে ভিড়ল? আর এসেই বা কেন সরাসরি মোর্শেদকেই বেছে নিল? সামিনা কি তাকে আগে থেকেই চেনে? নাকি সেও মোর্শেদের মতোই কোনো একাকীত্বের গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পথ চলতে চলতে এখানে এসে ঠেকেছে?

ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মোর্শেদের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। তার মনের ভেতর প্রশ্নের পাহাড় জমছে। সে নিজের মনেই ঠিক করে নিল, সামিনার সাথে যদি আবার কথা বলার সুযোগ হয়, তবে সবার আগে এই প্রশ্নটাই সে করবে—"সামিনা, এই অচেনা গতির দুনিয়ায় আপনার প্রবেশের কারণটা ঠিক কী ছিল?"

মেসেঞ্জারের সেই ধূসর টিক চিহ্নটা এখনো নীল হয়ে ওঠেনি। সামিনা এখনো অফলাইন। মোর্শেদ কফির মগের তলানিতে জমে থাকা ঠান্ডা তিতকুটে তরলটুকু এক চুমুকে শেষ করল। সামিনার এই রহস্যময় নীরবতা তাকে যতটা না বিচলিত করছে, তার চেয়ে বেশি করছে আকর্ষিত। সে বুঝতে পারছে, এই ছায়া শরীরী নারীর রহস্য ভেদ না করা পর্যন্ত তার রাতের ঘুম আর দুপুরের শান্তি—দুই-ই এখন থেকে অনিশ্চিত।

কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক ভাবে সিগারেট খাওয়ার পর হুট করে মোর্শেদ খেয়াল করল, তার সামিনাকে পাঠানো মেসেজটা রিসিভড হয়েছে। কিন্তু সামিনা সেটির রিপ্লাই করা তো পরের কথা, দেখেও নি। একটা চাপা রাগ আর অপমান বোধ মোর্শেদ কে গ্রাস করল। অনলাইনে এসে চলেও গেল, অথচ রিপ্লাই ও করল না? রাগতভাবেই বাইক এর চাবিটা হাতে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটের দরজার দিকে এগোলো মোর্শেদ। গতি ছাড়া আর কোনওভাবে এই আগুন নিভবে না।

সামিনার জীবনের ইকোসিস্টেম মোর্শেদের থেকে একদম আলাদা। এখানে বিলাসবহুল একাকীত্বের কোনো অবকাশ নেই, আছে মধ্যবিত্তের হিসেবী আর হাঁপিয়ে ওঠা ব্যস্ততা। সকাল সাড়ে ছয়টায় অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। ডিভোর্সি মেয়ে হিসেবে বাপের বাড়িতে থাকার কিছু অলিখিত নিয়ম আছে। সংসারে নিজের জায়গাটা অটুট রাখতে তাকে সারাক্ষণই এক ধরণের তটস্থ অবস্থায় থাকতে হয়। অসুস্থ মায়ের পথ্য তৈরি থেকে শুরু করে সকালের নাস্তা—সবটাই সামিনাকে করতে হয় স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার অনেক আগে।

সকালবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সামিনা যখন নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিল, তখন তার মাথায় গতরাতের কোনো স্মৃতিই সেভাবে ভিড় করেনি। বরং মনে মনে সে মিলিয়ে নিচ্ছিল দুপুরের টিফিনে কী নেবে আর আজ কোন ক্লাসে কী পড়াবে। তার জগতটা খুব সীমাবদ্ধ—স্কুলের ক্লাসরুম, ছাত্রছাত্রীদের শোরগোল আর বাড়ির কিছু নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। ড্রয়ার থেকে শাড়ি বের করে পরার সময় সে একবারও ফোনের দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না। তার ফোনটা এখন কেবলই যোগাযোগের একটা যন্ত্র, নেশা নয়। ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে সে যখন যাত্রাবাড়ীর জ্যাম আর ধুলোবালির মধ্যে দিয়ে স্কুলের পথে রওনা হলো, তখনো সে একবারের জন্যও ইন্টারনেট অন করেনি। সামিনা জানে, একবার অনলাইন হওয়া মানেই এক অদৃশ্য জগতের গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়া। আর সেই জগতে মোর্শেদের মতো মানুষেরা শব্দের মায়াজাল বিছিয়ে রাখে। সামিনা সেই মায়ায় এখনই পা দিতে চায় না।

স্কুলে পৌঁছানোর পর থেকেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। স্টাফ রুমে সহকর্মীদের সাথে টুকটাক কথা আর ক্লাসে ক্লাসে ঘুরে বেড়ানো। দুপুরের দিকে চতুর্থ শ্রেণির একটি আর্ট ক্লাস ছিল। সামিনা আজ ঠিক করেছিল বাচ্চাদের খুব সাধারণ কিছু আঁকা শেখাবে। ক্লাসরুমে ঢুকে সে চকের ডাস্টার হাতে ব্ল্যাকবোর্ডটা পরিষ্কার করল। আজ তার শেখানোর কথা ছিল একটি রিকশা।

বোর্ডে চক ঘষতে ঘষতে সামিনা হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। তার অবচেতন মনের গভীর কোনো কোণ থেকে গতরাতের সেই রাইডার মিস্টার মোর্শেদের গলার স্বর যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। বিশেষ করে মোর্শেদের সেই বাইকের বর্ণনা। চক চলতে লাগল অবাধ্যের মতো। সামিনা রিকশার চাকা আঁকতে গিয়ে খেয়ালই করল না যে সে হ্যান্ডেলের জায়গায় রিকশার পরিবর্তে একটু চওড়া, ক্রোম ফিনিশড ক্রুইজার বাইকের হ্যান্ডেল এঁকে ফেলছে।

রিকশার সেই চিরচেনা হুড বা বসার সিটের বদলে বোর্ডের ওপর ফুটে উঠল একটা ভারি ৩৫০ সিসির পেশিবহুল ইঞ্জিনের আদল। চকের সাদা রেখাগুলো যেন এক অদ্ভুত গতিময়তা খুঁজে পাচ্ছিল। সামিনা যখন মগ্ন হয়ে বাইকের ফুয়েল ট্যাঙ্কের কার্ভটা ফুটিয়ে তুলছে, ঠিক তখনই ক্লাস ক্যাপ্টেন রাফসান পেছন থেকে অবাক হয়ে বলে উঠল, "ম্যাম, এটা তো রিকশা হলো না! এটা তো একদম বাইকের মতো লাগছে। ঐ যে বড় বড় রাজকীয় বাইকগুলো থাকে না? ঠিক তেমন!"

সামিনার হাতের চকের টুকরোটা মেঝেতে পড়ে দু’টুকরো হয়ে গেল। সে থমকে দাঁড়িয়ে বোর্ডের দিকে তাকাল। নিজের অজান্তেই সে বোর্ডে এঁকে ফেলেছে একটি রয়্যাল এনফিল্ড—ঠিক মোর্শেদ যেমনটা বর্ণনা করেছিল। ক্লাসের বাচ্চারা সবাই হোহো করে হেসে উঠল। সামিনা যেন নিজের মনের এক গোপন চুরিতে হাতে-নাতে ধরা পড়ে গেছে। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত সঙ্কোচ আর লজ্জা খেলা করতে লাগল।

সে দ্রুত ডাস্টার দিয়ে ড্রয়িংটা মুছতে শুরু করল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে রইল এক চিলতে মিটিমিটি লাজুক হাসি। এই বয়সে এসে এমন বালখিল্য আচরণ সামিনা নিজেই নিজের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারছিল না। কেন একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের শখের বাহন তার মনের ক্যানভাসে এভাবে জায়গা দখল করে নিল? কেন সে আঁকতে গিয়ে রিকশার হাতলের বদলে হাইওয়ের সেই ক্রুইজার বাইকের গতিকে কল্পনা করে ফেলল?

বিকেলের দিকে যখন ক্লাস শেষ হলো, তখনও সামিনার ফোনের ডাটা অফ। সে জানে না বনানীর কোনো এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসে একজন মানুষ তার নীল ডটটার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে উঠছে। সে জানে না মোর্শেদ তার পুরো প্রোফাইল অন্তত দশবার তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলেছে। সামিনা চায় এই রহস্যটা আরও কিছুটা দীর্ঘ হোক। হাইওয়ের নীল জ্যামিতিতে যেমন বাঁক থাকে, তাদের এই সম্পর্কের বাঁকগুলোও যেন সেভাবেই লুকানো থাকে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে বাসের জানালা দিয়ে জ্যামের দিকে তাকিয়ে সামিনা আবার নিজের মনেই হাসল। রিকশা আঁকতে গিয়ে বাইক এঁকে ফেলার সেই ঘটনাটা তাকে এক বিচিত্র আনন্দ দিচ্ছে। সে ভাবছে, যদি কখনও মোর্শেদকে এই ঘটনাটা বলা হয়, সে কি হাসবে? নাকি সেও অবাক হয়ে ভাববে যে সামিনার মতো এক শান্ত স্বভাবের স্কুল শিক্ষিকাও তার গতির নেশায় কিছুটা হলেও আক্রান্ত হয়েছে?

বাসের ভিড় আর যাত্রাবাড়ীর ধোঁয়ার মাঝে সামিনা নিজেকে খুব নিরাপদ মনে করতে লাগল, যেন এই সাধারণ জীবনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে তার আসল স্বাধীনতা।

সন্ধ্যার আকাশটা আজ কেমন যেন ঘোলাটে, ঠিক মোর্শেদের মনের অবস্থার মতো। বনানীর আভিজাত্য ছেড়ে সে তার মেটিওর নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। নিকুঞ্জের রেললাইনের ধারে একটা ঘিঞ্জি, বস্তিমতো এলাকা—যেখানে নাগরিক সভ্যতার চাকচিক্য এসে থমকে দাঁড়ায়। এখানে একটা পুরনো ঝুপড়ি চায়ের দোকান আছে, যেটার মালিক খলিল। খলিলের এই টং দোকানটাই মোর্শেদের গোপন আস্তানা। রাইডার কমিউনিটির সেই ‘লিভিং লিজেন্ড’ এখানে স্রেফ একজন সাধারণ খদ্দের।

মোর্শেদ দোকানের এক কোণে রাখা নড়বড়ে বেঞ্চিতে বসল। সন্ধ্যার এই আলো-আঁধারিতে চারপাশের পরিবেশটা বড় বেশি অসংলগ্ন মনে হচ্ছে। সাধারণত এই সময় তার সাগরেদ বা পরিচিত ছোট ভাইয়েরা এসে ভিড় করে, কিন্তু আজ এখনো কেউ আসেনি। মোর্শেদের ভেতরটা আজ কেমন যেন হাহাকার করছে। গতরাতের সেই আলাপ আর আজকের সারাদিনের নীরবতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, আজ শুধু হুইস্কি বা মার্লবোরোর ধোঁয়ায় কাজ হবে না। তার স্নায়ুগুলো আজ আরও গাঢ় কিছু চাইছে।

খলিল নিঃশব্দে মোর্শেদের হাতে এক চিমটি কালো কুচকুচে গাঁজা আর একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে গেল। মোর্শেদ জানে, তার এই উচ্চবিত্ত ইকোসিস্টেমে সে একজন সফল মানুষ, কিন্তু এই ঝুপড়ির অন্ধকারে সে একজন পলাতক আসামি। নিজের একাকীত্ব থেকে পলাতক। সে নিপুণ হাতে সিগারেটটা থেকে তামাক বের করে গাঁজাটুকু ভরে নিল। আগুনের ছোঁয়ায় যখন প্রথম টানটা দিল, তখন চারপাশের শব্দগুলো যেন মন্থর হতে শুরু করল।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে মোর্শেদ একবারও ফোনের নেট অন করেনি। এক ধরণের ইগো কাজ করছিল তার ভেতর—সামিনা আগে মেসেজ না দিলে সেও করবে না। কিন্তু এখন তার এক বন্ধুকে জরুরি একটা ফোন করা দরকার, একাকিত্বে ভুগছে সে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল।

নেট অন করার সাথে সাথেই ফোনের নোটিফিকেশন বারটা যেন পাগল হয়ে উঠল। একের পর এক গ্রুপ মেসেজ আর ইমেইল। কিন্তু সেই সব কোলাহলের মাঝে ‘টুং’ করে একটা শব্দ কানে বাজল—মেসেঞ্জারের সেই পরিচিত টোন। মোর্শেদের হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর প্রচণ্ড বেগে ধকধক করতে শুরু করল।

বন্ধুকে ফোন করার কথা সে বেমালুম ভুলে গেল। কাঁপাকাঁপা আঙুলে সে ইনবক্সটা খুলল। দেখল, সামিনার সেই অন্ধকার জানালার প্রোফাইল পিকচারটার পাশে সবুজ বাতি জ্বলছে, আর নিচে একটা মেসেজ ঝিলিক দিচ্ছে। মোর্শেদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে একটা সাধারণ টেক্সট মেসেজ তাকে এভাবে তছনছ করে দেবে, তা সে কল্পনাও করেনি।

সে মেসেজটা ওপেন করল। সামিনা লিখেছে: “দুঃখিত মিস্টার রাইডার, আজ সারাদিন ক্যানভাস আর বাস্তবের রঙ মেলাতে গিয়ে ফোনের কথা মনেই ছিল না। আর আপনার সকালের মেসেজের উত্তর? আমার বাচ্চাদের নিয়ে আমি এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে আপনার ওই গতির জগতটা আমার কাছে আজ মরীচিকা মনে হচ্ছিল। তবে একটা মজার কান্ড হয়েছে আজ, শুনলে হয়তো আপনি হাসবেন।”

গাঁজার ধোঁয়া আর সামিনার শব্দের মায়া—দুটো মিলে মোর্শেদের চারপাশের বাতাসটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। নিকুঞ্জের এই নোংরা বস্তির কোণে বসে মোর্শেদের মনে হলো, সে যেন এক বিশাল নীল জ্যামিতির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রতিটি বাহু তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওই রহস্যময়ী নারীর দিকে। সে টাইপ করতে গিয়েও থেমে গেল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে। মোর্শেদ বুঝতে পারছে, সে আজ থেকে আর কেবল রাস্তার রাইডার নেই, সে এখন সামিনার শব্দের গোলকধাঁধায় পথ হারানো এক পথিক।

চায়ের দোকানের ঝাপসা আলোয় মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ওখানেই সামিনার ছায়া শরীরটা লুকিয়ে আছে। সে লিখল, “কী সেই মজার কাণ্ড? আমি কি শুনতে পারি?”

বাইরে তখন রাতের ঢাকা তার নিজস্ব রূপ ধারণ করছে, কিন্তু মোর্শেদের পৃথিবীটা এখন স্রেফ ওই কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিনে বন্দি।

নিকুঞ্জের সেই ঘিঞ্জি গলির ঝুপড়ি দোকানে তখন গাঁজার ধোঁয়া আর সস্তা চায়ের গন্ধ মিলেমিশে একাকার। মোর্শেদ তার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই ছোট কাঁচের আড়ালে অন্য কোনো গ্রহের সন্ধান পাওয়া যাবে। সামিনার টাইপ করা প্রতিটি শব্দ তার মগজে এক ধরণের ঝংকার তুলছে।

সামিনা লিখল, "শুনুন মিস্টার রাইডার, আজ স্কুলে বাচ্চাদের ড্রয়িং ক্লাসে আমি যা করেছি, সেটা আমার ৩৮ বছরের জীবনে এক বিরল ঘটনা। বাচ্চাদের রিকশা আঁকা শেখাতে গিয়ে আমি ব্ল্যাকবোর্ডে মস্ত বড় একখানা বাইক এঁকে ফেলেছি! রিকশার সেই নিরীহ হাতলের বদলে আপনার ওই ক্রুজার বাইকের সেই বাঁকানো হ্যান্ডেলবার আর ফুয়েল ট্যাঙ্ক কখন যে আমার চকের নিচে ফুটে উঠেছে, আমি নিজেও জানি না। ক্লাস ক্যাপ্টেন ধরিয়ে না দিলে আমি হয়তো ওটাকেই রিকশা বলে চালিয়ে দিতাম!"

মোর্শেদ শব্দ করে হেসে উঠল। নিকুঞ্জের এই অন্ধকার আস্তানায় তার এই হাসিটা বেশ বেমানান শোনাল। আশেপাশে দুই-একজন কৌতূহলী চোখে তাকাল, কিন্তু মোর্শেদের সেদিকে খেয়াল নেই। সে দ্রুত টাইপ করল, "বলেন কী! তার মানে আপনি কি অবচেতন মনে আমার মেটিওর-এর প্রেমে পড়ে গেলেন? নাকি রাইডারের?"

সামিনা উত্তর দিতে দেরি করল না, "উঁহু, প্রেমে পড়া সহজ নয়। তবে আপনার ওই গতির বর্ণনাগুলো বোধহয় আমার শিল্পী সত্তাকে একটু বেশিই নাড়া দিয়েছে। আমি বাইক আর রিকশার জ্যামিতি গুলিয়ে ফেলেছিলাম। আর আমার ছাত্ররা তো হেসেই খুন। তারা ভাবছে তাদের আর্ট টিচার বোধহয় এখন থেকে কোনো বাইক গ্যাং-এর মেম্বার হয়ে গেছে!"

মোর্শেদ একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। নেশাটা এখন তার রক্তে কথা বলছে। সে লিখল, "আচ্ছা সামিনা, আপনার এই যে বাইক নিয়ে এত কল্পনা, আপনি কি কখনো বাইক চালিয়েছেন? নাকি শুধুই ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ?"

সামিনা হেসেই খুন। স্ক্রিনে একের পর এক হাসির ইমোজি ভেসে উঠল। সে লিখল, "আমি? বাইক চালাব? মিস্টার মোর্শেদ, আমি সাইকেল চালাতেই হিমশিম খাই। তবে হ্যাঁ, বাইকের পেছনে বসতে আমার সব সময় খুব ভালো লাগে। যদিও সেভাবে কোনোদিন চড়া হয়নি। বড়জোর ওই কাজিনদের পেছনে বসে গলির মোড় পর্যন্ত যাওয়া। হাইওয়েতে বাতাসের ঝাপটা মুখে নিয়ে বাইকে চড়ার অভিজ্ঞতা আমার ডিকশনারিতে নেই।"

মোর্শেদ এবার একটু নড়েচড়ে বসল। সে সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইল না। সে লিখল, "অভিজ্ঞতা নেই বলেই তো সেটা তৈরি করার একটা রোমাঞ্চ থাকে। হাইওয়েতে যখন বাইক ১০০ কিমি গতিতে চলে, তখন পৃথিবীর সব চিন্তা ওই বাতাসের সাথে উড়ে যায়। শুধু থাকে সামনে অবারিত রাস্তা আর ইঞ্জিনের ছন্দ। আপনি তো শিল্পী, এই ছন্দটা আপনার চেনার কথা।"

কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর মোর্শেদ আবার লিখল, "একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে। আপনি বাইক চালান না, চেনেনও না—তাহলে এই রাইডার্স গ্রুপে আপনার মতো একজন শান্ত স্বভাবের আর্ট টিচার কী করতে এলেন? আপনি কি ভুল করে এই গতির দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছেন?"

সামিনা রিপ্লাই দিল, "আসলে কয়েকদিন আগে ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে একটা পাহাড়ি বনের ছবি আমার চোখে পড়ে। গভীর অরণ্যের মাঝ দিয়ে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে—ছবিটা এতই জীবন্ত ছিল যে আমি ভাবলাম হয়তো কোনো ট্রাভেল গ্রুপ। সেখানে ক্লিক করতেই এই রাইডার্স গ্রুপটা সামনে এল। অ্যাড হওয়ার পর দেখলাম এখানে মানুষেরা গতির চেয়েও বেশি সৌন্দর্যের উপাসনা করে। আপনার ওই নীল পাহাড়ের ছবিটা দেখেই মূলত আমি কমেন্ট করার সাহস পেয়েছিলাম।"

মোর্শেদ মৃদু হেসে লিখল, "তার মানে আপনি বনের টানে এসে বাইকের জালে আটকে গেলেন? তবে একটা কথা কবুল করি—আপনি আজ বোর্ডে বাইক এঁকেছেন, আর আমি আজ সারাদিন আমার বনানীর ঘরের জানালায় বসে আপনার ওই রহস্যময়ী ছায়া শরীরটা কল্পনা করেছি। আমি ভেবেছি, আপনি যখন স্কুলে বাচ্চাদের পড়ান, তখন আপনার কপালের ওই টিপটা কি ঘামে ভিজে যায়? নাকি আপনি খুব গম্ভীর হয়ে ক্লাসে বসে থাকেন?"

সামিনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল, "আপনি কি এখন আমার অবয়ব নিয়ে ফ্লার্ট করছেন, মিস্টার রাইডার? একজন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী মানুষের কল্পনা কি এতই প্রখর?"

মোর্শেদ লিখল, "পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সটা তো কেবল সংখ্যার জ্যামিতি। ভেতরে যে রাইডার আছে, সে তো এখনো অজানার সন্ধানে ঘর ছাড়ে। আমি কল্পনা করছি, আপনি যখন বাসে করে ফিরছেন, তখন জ্যামের ফাঁকে কোনো একটা বাইক পাশ দিয়ে চলে গেলে আপনি কি একবারের জন্যও ভাবেন—ওখানে মোর্শেদ থাকলেও থাকতে পারত?"

সামিনা উত্তর দিল, "হয়তো ভেবেছি। হয়তো আজ বোর্ডে ওই ক্রুজার বাইকটা আপনার অস্তিত্বের জানান দিতেই এসেছিল। আপনার শব্দগুলো খুব ধারালো, মোর্শেদ সাহেব। আপনি খুব সহজেই একজন নারীর মগজে ঢুকে পড়ার কায়দা জানেন।"

মোর্শেদ নেশাগ্রস্ত চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। নিকুঞ্জের অন্ধকার যেন এখন সামিনার নীল জ্যামিতিতে ঢেকে গেছে। সে লিখল, "মগজে তো ঢুকেছি, এবার হৃদপিণ্ড আর হাইওয়ের পালসটা মেলাতে চাই। কোনো একদিন কি আমার এই মেটিওরের পেছনের সিটটা আপনার জন্য বরাদ্দ হতে পারে? যেখানে কোনো ব্ল্যাকবোর্ড থাকবে না, থাকবে শুধু পিচঢালা রাস্তা আর নীল আকাশ?"

সামিনা সেই কথার কোনও উত্তর দিল না। এবার মোর্শেদ একটু ভয় পেয়ে গেল। বেশি সাহস করে ফেলেছে কি সে? কিছুক্ষণ পর খেয়াল করল, সামিনা অফলাইনে চলে গেছে।

আর বসে থাকতে ইচ্ছে করল না মোর্শেদের। বাইক টেনে সে বাসায় চলে যাবে এখনই। খলিলের থেকে গাজা নিয়ে সে বাইকে চড়ে বসল।

নিকুঞ্জের সেই ধোঁয়াটে আস্তানা ছেড়ে মোর্শেদ যখন বনানীর ফ্ল্যাটে ফিরল, তখন রাত বারোটা পার হয়ে গেছে। লিফটে ওঠার সময়ও সে বারবার ফোনের স্ক্রিনটা চেক করছিল, কিন্তু সামিনা সেই যে কিছু না বলে অফলাইন হলো, আর ফেরেনি। মোর্শেদের মনের ভেতর একটা খচখচানি রয়েই গেল। সামিনা কি ইচ্ছা করেই চ্যাটটা ওভাবে শেষ করল? নাকি সে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে?

ফ্ল্যাটে ঢুকে মোর্শেদ কোনো আলো জ্বালাল না। বারান্দার বড় কাঁচের জানালা দিয়ে আসা শহরের নিওন আলোয় ঘরটা এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ নিয়েছে। সে জ্যাকেটটা সোফায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে একটা জয়েন্ট জ্বালিয়ে নিল। নিকুঞ্জ থেকে আনা সেই কাঁচা ঘাসের তীব্র ঘ্রাণে ঘরটা ভরে উঠছে। নেশাটা তার মগজের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়তেই সে সোফায় গা এলিয়ে দিল।

মাথার ভেতর সামিনার সেই কথাগুলো লুপের মতো বাজছে— "মগজে তো ঢুকেছেন, হৃদপিণ্ডে আর হাইওয়ের পালসটা মেলাতে চাই।" সে কি বেশি ফ্লার্ট করে ফেলল? সামিনা কি ভয় পেল? নাকি এই যে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া, এটাও সামিনার কোনো এক জ্যামিতিক চাল?

মোর্শেদ ভাবছিল দ্বিতীয় জয়েন্টটা ধরাবে কি না। ঠিক তখনই তার ফোনটা নীল আলোয় জ্বলে উঠল। একটা মেসেজ টোন। মোর্শেদ অনেকটা ছোঁ মেরে ফোনটা তুলল।

সামিনা অনলাইনে। সে লিখেছে: "সরি মিস্টার রাইডার। হুট করে কারেন্ট চলে গিয়েছিল বলে ওয়াইফাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফোনের ডাটাও কাজ করছিল না। আপনি কি ভেবেছিলেন আমি পালিয়েছি?"

মোর্শেদ এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে হাসল। তার দুশ্চিন্তার মেঘগুলো যেন এক নিমেষে কেটে গেল। সে দ্রুত টাইপ করল: "পালানোর পথ তো আমি আপনাকে দেব না সামিনা। তবে এই যে হঠাৎ করে অন্ধকার হয়ে যাওয়া, এটা আপনার রহস্যটাকে আরও বাড়িয়ে দিল। আমি তো ভেবেছিলাম আপনি কোনো মরীচিকা হয়ে বিলীন হয়ে গেলেন।"

সামিনা উত্তর দিল: "মরীচিকা হলে তো দেখা দেওয়া সহজ ছিল। রক্ত-মাংসের মানুষ বলেই তো নেটওয়ার্ক আর কারেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই যে অন্ধকারে বসে আছি, আমার জানালার বাইরে এখন শুধু রাস্তার একটা টিমটিমে আলো। মনে হচ্ছে আমি একটা শূন্যতায় বসে আছি।"

মোর্শেদ লিখল: "সেই শূন্যতায় আমার বাইকের হেডলাইটের আলো ফেললে কেমন হয়? আপনার অন্ধকার জানালায় যদি হঠাৎ কোনো আগন্তুক শব্দের জোয়ার নিয়ে আসে?"

সামিনা এবার একটা দীর্ঘ রিপ্লাই দিল: "শব্দের জোয়ার নিয়ে আসা সহজ, কিন্তু সেই স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া কঠিন। মিস্টার মোর্শেদ, এই অন্ধকারের একটা সুবিধা আছে জানেন? মানুষ তখন নিজের ভেতরের শব্দগুলো পরিষ্কার শুনতে পায়। আপনার ওই নীল পাহাড়ের বাইক রাইডিং-এর কথা ভাবতে ভাবতে আমি আসলে নিজের এই একঘেয়ে জীবনের মানে খুঁজছিলাম।"

মোর্শেদ বুঝতে পারল, নেশার ঘোরে সে সামিনার মনের আরও গভীরে প্রবেশ করছে। সে দ্বিতীয় জয়েন্টটা জ্বালিয়ে নিল। আগুনের ফুলকিটা অন্ধকারে একবার জ্বলে উঠল। সে লিখল: "মানে খোঁজার দরকার নেই সামিনা। জীবনটা কোনো ড্রয়িং বুক নয় যে সব রঙ পারফেক্ট হতে হবে। মাঝেমধ্যে হাইওয়ের মতো অগোছালো গতিতেও আনন্দ থাকে। আপনি আজ বোর্ডে বাইক এঁকেছেন, এটা কোনো ভুল নয়—এটা আপনার মুক্তির এক অবচেতন বহিঃপ্রকাশ।"

সামিনা লিখেছে: "আপনি খুব ভয়ঙ্কর ভাবে কথা বলেন। মানুষের মনের আগল খুলে ফেলার জাদুমন্ত্র আপনার জানা আছে। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো—এই যে মধ্যরাতে একজন অপরিচিত নারীর সাথে এভাবে কথা বলছেন, আপনার কি কোনো ভয় করে না?"

মোর্শেদ হাসল। সে টাইপ করল: "ভয় তো তাদের লাগে যাদের হারানোর কিছু আছে। আমি তো পাঁচ বছর আগেই সব হারিয়ে একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছি। এখন আমি শুধু খুঁজে পেতে চাই। যেমন আজ আপনাকে খুঁজে পেয়েছি।"

অন্ধকার ঘরে মোর্শেদ আর সামিনার এই শব্দ-সংঘাত এখন এক ভিন্ন মাত্রা নিচ্ছে। ফোনের স্ক্রিনের আলোয় মোর্শেদের মুখটা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার চোখে তখন এক শিকারী অথচ তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি। ওপাশে সামিনাও হয়তো অন্ধকারের গহ্বরে বসে নিজের অজান্তেই হাইওয়ের নীল জ্যামিতির জালে আটকে পড়ছে।

অন্ধকার ঘরে মোর্শেদের হাতের জয়েন্টটা নিভে এসেছে। ফোনের স্ক্রিনের নীল আলোয় তার মুখটা এখন অনেক বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, সামিনার সাথে এই 'অপরিচিত' থাকার খেলাটা বেশিক্ষণ চালিয়ে গেলে হয়তো সামিনা আবার গুটিয়ে যাবে। ফ্লার্ট করার চেয়ে এখন সামিনার জীবনের গভীরে একটু উঁকি দেওয়া দরকার। সামিনা মানুষটা ঠিক কেমন, তার জীবনের বাঁকগুলো কোথায়—সেটা না জানলে হাইওয়ের এই নীল জ্যামিতি পূর্ণতা পাবে না।

মোর্শেদ বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে টাইপ করল, "আচ্ছা সামিনা, অনেক তো বাইক আর বোর্ড নিয়ে কথা হলো। এবার একটু আপনার কথা শুনি? যাত্রাবাড়ীর এই স্কুল শিক্ষিকার জীবনে রঙ আর তুলি ছাড়া আর কী আছে? মানে, বাড়ি ফিরলে আপনার জন্য অপেক্ষা করে থাকে এমন কেউ?"

ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসতে কিছুটা সময় নিল। হয়তো সামিনা ভাবছে কতটুকু বলবে। তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল, "অপেক্ষা করার মতো মানুষ বলতে আমার মা। আর ভাই-ভাবির সংসার। আমি আসলে এই সংসারের এক কোণে নিজের একটা ছোট্ট জগত বানিয়ে নিয়েছি। আমার জীবনে এখন আর নতুন করে কারও অপেক্ষা করার অবকাশ নেই।"

মোর্শেদ সরাসরি পয়েন্টে গেল, "অর্থাৎ আপনি একা? মানে আপনার দাম্পত্য জীবন..."

সামিনা এবার বেশ সোজাসুজি উত্তর দিল, "আমি ডিভোর্সি। আজ প্রায় তিন বছর হতে চলল। একটা ভুল সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পর মনে হয়েছে, একাকীত্ব আসলে অনেক বেশি নিরাপদ। অন্তত এখানে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না।"

মোর্শেদের বুকে একটা চিনচিনে অনুভূতি হলো। সে টাইপ করল, "জানেন সামিনা, আমাদের জীবনে মিল অনেক। আমি আজ পাঁচ বছর হলো ডিভোর্সি। আমার এই বনানীর বিশাল ফ্ল্যাটটা আসলে একটা ১৬০০ স্কয়ার ফিটের খাঁচা। এই খাঁচায় আমি রাজা হতে পারি, কিন্তু দিনশেষে আমি ভীষণ একা। এই জন্যই হয়তো রাতের বেলা বাইক নিয়ে হাইওয়েতে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।"

সামিনা লিখল, "তার মানে আমরা দুজনই দুটো আলাদা গোলার্ধের একাকী মানুষ। অদ্ভুত না? ইন্টারনেটের এই ভিড়ে আমরা আমাদের নিঃসঙ্গতাগুলোকে ভাগ করে নিচ্ছি।"

মোর্শেদ এবার একটু দুষ্টু হাসি হেসে লিখল, "নিঃসঙ্গতা ভাগ করা তো ভালো, কিন্তু এই তিন বছরে আপনার জীবনে কি নতুন কোনো 'অনুপ্রেরণা' আসেনি? মানে কোনো বয়ফ্রেন্ড? নাকি আপনি এখনো সেই পুরনো স্কুলের আর্ট টিচারের মতোই একদম সিঙ্গেল?"

সামিনা উত্তর দিল, "বয়ফ্রেন্ড? এই বয়সে এসে আবার প্রেম করার এনার্জি কোথায় মিস্টার রাইডার? বাচ্চারা জ্বালিয়ে মারে, স্কুল সামলাই, বাড়ি ফিরে মায়ের সেবা করি। প্রেম করার মতো বিলাসিতা আমার নেই। আমি 'প্রাউডলি সিঙ্গেল'। আর আপনার কী খবর? আপনার মেটিওরের পেছনের সিটে বসার জন্য নিশ্চয়ই মেয়েদের লাইন লেগে থাকে?"

মোর্শেদ লিখল, "মেয়েদের লাইন হয়তো লাগে, কিন্তু আমার পেছনের সিটটা বড় বেশি জেদি। সে সবাইকে জায়গা দেয় না। আপনি যেহেতু বললেন বাইকে চড়তে ভালোবাসেন, তাই ভাবছি আমার এই সিঙ্গেল সিটটা আপনার জন্য একবার উন্মুক্ত করা যায় কি না।"

সামিনা রিপ্লাই দিল, "আপনি কিন্তু আবার সেই ফ্লার্ট করা শুরু করলেন! হাইওয়ের রাইডাররা কি সবাই এমন হয়? কথায় কথায় মেয়েদের বাইকে তোলার স্বপ্ন দেখায়?"

মোর্শেদ মুচকি হেসে লিখল, "সবাই হয় কি না জানি না, তবে আমি কেবল তাকেই স্বপ্ন দেখাই যার কল্পনায় ড্রয়িং বোর্ড আর ক্রুজার বাইক এক হয়ে যায়। আচ্ছা সামিনা, এই যে আমরা ফ্লার্ট করছি, আপনার কি মনে হচ্ছে না যে আপনি আগুনের সাথে খেলছেন?"

সামিনা একটা হাসির ইমোজি দিয়ে লিখল, "আগুন যদি শব্দের হয়, তবে তাতে পুড়তে খুব একটা ভয় নেই। বরং উষ্ণতা পাওয়া যায়। তবে সাবধান মিস্টার মোর্শেদ, আমি কিন্তু আর্ট টিচার, আগুনের রঙও পাল্টে দিতে জানি!"

রাত গভীর হচ্ছে। মোর্শেদ অনুভব করল, সামিনা আর কেবল মেসেঞ্জারের ওপারে থাকা কোনো আইডি নয়, সে এখন তার অস্তিত্বের গভীরে ধীর পায়ে প্রবেশ করছে। দুজনের একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেম এখন একে অন্যের সাথে মিশে গিয়ে এক নতুন জ্যামিতি তৈরি করছে।

অন্ধকার ঘরে দ্বিতীয় জয়েন্টটার শেষাংশটুকু অ্যাশট্রেতে পিষে ফেলল মোর্শেদ। নেশার আবেশে তার চারপাশটা এখন থিতু হয়ে এসেছে, কিন্তু মনের ভেতরে এক ধরণের চপলতা দানা বাঁধছে। সামিনার সাথে এই 'একাকীত্বের সমীকরণ' মেলাতে মেলাতে সে এখন অনেকটা সাহসী হয়ে উঠেছে।

সে টাইপ করল, "আচ্ছা সামিনা, কথা তো অনেক হলো। কিন্তু আমার কল্পনার ক্যানভাসটা না এখনো একটু অপূর্ণ রয়ে গেছে। আপনার রূপ নিয়ে কিছু ভাবব, তার তো কোনো উপায় রাখলেন না।"

সামিনা দ্রুত উত্তর দিল, "রূপ? ওমা! আপনি কি আমার রূপ দেখেছেন নাকি যে হুট করে এমন কথা বলছেন?"

মোর্শেদ কীবোর্ডে আঙুল চালাল, "দেখতে দিলেন কই? দুনিয়ার সবাই ফেসবুকে নিজেদের জীবনের অ্যালবাম খুলে বসে থাকে, আর আপনার ওয়ালে কেবল ওই অন্ধকার জানালার ছবি। আমি তো জানি না ওপাশে থাকা মানুষটা কি পরীর মতো সুন্দর, নাকি এক সাধারণ মায়াবিনী। আমাকে কি একবার দেখা দেওয়া যায় না?"

সামিনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা হাসির ইমোজি পাঠিয়ে লিখল, "না মিস্টার রাইডার, দেখা দেওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমি আসলে পর্দার আড়ালে থাকতেই ভালোবাসি। তাছাড়া আমি তো আগেই বলেছি, আমি এক অতি সাধারণ স্কুল শিক্ষিকা। দেখলে আপনার ওই রাজকীয় বাইকের সাথে আমাকে মেলাতে পারবেন না।"

মোর্শেদ ছাড়ার পাত্র নয়। সে লিখল, "সাধারণই হোক বা অসাধারণ—মানুষের তো একটা অবয়ব থাকে। আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? নাকি নিজের সৌন্দর্য নিয়ে খুব বেশি সচেতন?"

সামিনা লিখল, "ভয়? না না। তবে একটা কথা বলে রাখি—দেখলে যদি প্রেমে পড়ে যান, সেই দায়িত্ব কিন্তু আমি নিতে পারব না। এই বয়সে এসে ওসব প্রেমের দায়ভার সামলানোর শক্তি আমার নেই।"

মোর্শেদ হেসে ফেলল। নেশার ঘোরে তার হাসিটা আজ অনেক বেশি প্রাণবন্ত। সে লিখল, "প্রেমের দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে না, ওটা আমার একাকীত্ব বুঝে নেবে। আচ্ছা ঠিক আছে, ছবি দিতে হবে না। কিন্তু আপনি তো আর্ট টিচার, ক্যানভাসে ছবি না এঁকেও তো শব্দ দিয়ে রূপের বর্ণনা দেওয়া যায়। নিজেকে একটু এঁকে দেখান না দেখি আপনার ওই শব্দের তুলিতে। আপনার চোখ দুটো কেমন? নাকি আপনার হাসিটা ওই বোর্ডে আঁকা বাইকের বাঁকের মতোই রহস্যময়?"

সামিনা রিপ্লাই দিল, "আপনি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন, মিস্টার রাইডার। নিজের বর্ণনা নিজে দেওয়াটা বেশ লজ্জার। তবে এটুকু বলতে পারি, আমার চোখে আপনি হয়তো একরাশ ক্লান্তি আর অবহেলার ছায়া ছাড়া আর কিছুই পাবেন না। আমি কোনো রূপবতী রাজকন্যা নই।"

মোর্শেদ লিখল, "ক্লান্তিতেই তো আসল মায়া থাকে সামিনা। বর্ণনাটা কি আরেকটু ডিটেইলড করা যায়? আর্ট টিচার তো এসব ভালো পারার কথা।"

কিছুক্ষণ ইনবক্সে 'typing...' লেখাটা ভেসে থাকল, যেন সামিনা কিছু একটা লিখতে গিয়েও মুছে ফেলল। মোর্শেদের হৃদস্পন্দনটা তখন বেশ চড়া। সে আশা করছিল সামিনা হয়তো এবার নিজের সম্পর্কে কোনো একটা ইঙ্গিত দেবে।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর সামিনা লিখল, "বর্ণনাটা আজ না হয় তোলা থাক। রাতের অন্ধকার এখন একটু বেশিই ঘন হয়ে গেছে। শব্দের তুলি দিয়ে নিজেকে আঁকতে গেলে হয়তো আমি নিজেই নিজের কাছে অচেনা হয়ে যাব। আজ আর নয়, মিস্টার মোর্শেদ। হাইওয়ের রাইডাররা যেমন গন্তব্য ছাড়াই বেরিয়ে পড়ে, আজকের আলাপটাও না হয় সেই গন্তব্যহীন মোড়েই শেষ হোক।"

মোর্শেদ কিছু একটা টাইপ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই দেখল সামিনার নামের পাশের সবুজ বাতিটা নিভে গেছে। সামিনা কোনো বর্ণনা বা ছবি না দিয়েই এক অদ্ভুত অতৃপ্তি রেখে অফলাইন হয়ে গেল।

মোর্শেদ স্তব্ধ হয়ে ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা যেন এক রহস্যময়ী শিল্পী, যে মোর্শেদকে একটা সুন্দর ছবির সামনে দাঁড় করিয়ে ঠিক যখন পর্দাটা তোলার কথা, তখনই স্টুডিওর আলো নিভিয়ে দিয়েছে।

অন্ধকার ঘরে মোর্শেদের মনে হলো, এই রহস্যটাই হয়তো সামিনাকে তার কাছে আরও বেশি অনিবার্য করে তুলছে।

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনের লক বাটনটা টিপে দিল। বনানীর এই ফ্ল্যাটে এখন আবার সেই 'একাকীত্বের ইকোসিস্টেম' ফিরে এসেছে, তবে আজকের নিঃসঙ্গতাটা একটু অন্যরকম—সেখানে হাইওয়ের বাতাস আর এক অদৃশ্য নারীর মায়া মিশে আছে।

অন্ধকার ঘরে মোর্শেদ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ফোনের স্ক্রিনটা নিভে যাওয়ার পর ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সামিনা অফলাইন হয়ে যাওয়ার পর বনানীর এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটা এখন আবার তার কাছে এক প্রকাণ্ড মরুভূমির মতো মনে হচ্ছে।

একাধিকবার সে সামিনার প্রোফাইল পিকচারটা জুম করে দেখল—সেই একই বৃষ্টিভেজা আবছা জানালা। ৩৮ বছর বয়সের এক নারী, যার শব্দের মধ্যে অদ্ভুত এক পরিপক্বতা আর রহস্য আছে, সে দেখতে কেমন হতে পারে? সে কি খুব ছিপছিপে গড়নের, নাকি তার শরীরে মধ্যবয়সের এক ধরণের ভারী আভিজাত্য আছে? তার গায়ের রঙ কি চাপা নাকি উজ্জ্বল শ্যামলা? মোর্শেদ কল্পনা করতে চাইল সামিনা যখন আর্ট ক্লাসের বোর্ডে সেই ক্রুজার বাইকটা আঁকছিল, তখন তার চোখের দৃষ্টি কি তীক্ষ্ণ ছিল? কিন্তু বেশিক্ষণ সে যুক্তিতে স্থির থাকতে পারল না। নিকুঞ্জ থেকে নিয়ে আসা সেই গাঁজার নেশাটা এখন তার রক্তে জোয়ারের মতো বইছে। দ্বিতীয় জয়েন্টটা শেষ করার পর থেকে তার স্নায়ুগুলো ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে, আর কল্পনাগুলো হয়ে উঠছে লাগামহীন।

মোর্শেদ সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। নেশার ঘোরে ঘরের সিলিংটা যেন এক বিশাল নীল হাইওয়েতে পরিণত হলো। সেই হাইওয়ের একপাশে কোনো এক ছায়া শরীর দাঁড়িয়ে আছে। সে সামিনাকে কল্পনা করার চেষ্টা করল, কিন্তু সামিনার কোনো স্পষ্ট মুখাবয়ব তার সামনে ফুটে উঠল না। কেবল ফুটে উঠল এক জোড়া সুডৌল বাহু, শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে জেগে ওঠা এক ভাঁজ করা উদর আর হাইওয়ের বাতাসে উড়তে থাকা একরাশ কালো চুল।

মোর্শেদের কামনার পারদ চড়তে লাগল। সে অনুভব করল, তার মেটিওরের পেছনের সিটে কেউ একজন বসে আছে। তার দু’হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে মোর্শেদের কোমর। বাতাসের প্রচণ্ড গতির কারণে সেই রহস্যময়ী নারী মোর্শেদের পিঠের সাথে লেপ্টে আছে। মোর্শেদ তার পিঠে অনুভব করতে পারল এক জোড়া উষ্ণ মাংসল চাপের অস্তিত্ব। সেই নারীর গায়ের থেকে ভেসে আসা আর্দ্র গন্ধ আর ঘামের একটা বুনো সুবাস মোর্শেদের মগজে কামনার আগুন জ্বালিয়ে দিল।

নেশা আর একাকীত্বের চরম মুহূর্তে মোর্শেদের কল্পনা এখন বল্গাহীন। সে ভাবল, সেই অচেনা নারী যদি এখন এই ঘরে থাকত? যদি এই অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে সামিনার শাড়ির প্রতিটি পিন একে একে খুলে ফেলত? সামিনা কি বাধা দিত? নাকি হাইওয়ের গতির মতোই সেও নিজেকে বিলিয়ে দিত এই উত্তপ্ত ইকোসিস্টেমে? মোর্শেদের আঙুলগুলো অবচেতনেই সোফার কুশনটা শক্ত করে খামচে ধরল। তার কল্পনায় সামিনা এখন এক আদিম মানবী, যার কোনো মুখ নেই, কিন্তু যার শরীরের প্রতিটি বাঁক মোর্শেদের জন্য এক একটি নীল জ্যামিতির ধাঁধা।

কামনার এই তীব্র স্রোতে মোর্শেদ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। ঘরের এসিটা ১৬ ডিগ্রিতে চললেও তার কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে। সামিনার সেই না বলা শব্দগুলো এখন তার কানে কামুক ফিসফিসানি হয়ে বাজছে। হাইওয়ের সেই নীল জ্যামিতি এখন আর কোনো রাস্তার মানচিত্র নয়, তা হয়ে উঠেছে দুই অতৃপ্ত শরীরের এক গোলকধাঁধা।

নেশার ঘোর আর কামোত্তেজক কল্পনার চরম শিখরে পৌঁছানোর পর মোর্শেদ একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ল। বাইরের রাতটা এখন অনেক বেশি শান্ত, কিন্তু মোর্শেদের মনের ভেতর যে তুফান সামিনা তুলে দিয়ে গেছে, তার রেশ কাটতে হয়তো অনেক সময় লাগবে। সে এখনো জানে না সামিনা দেখতে কেমন, কিন্তু সামিনার সেই ‘ছায়া শরীর’ আজ রাতে মোর্শেদের এই বিলাসবহুল একাকীত্বকে তছনছ করে দিয়ে গেছে।