গাড়ির কাঁচে ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছিল টুপটাপ শব্দে। প্রতিটি ফোঁটা যেন আকাশের বুক থেকে ঝরে পড়া কোনো গোপন দীর্ঘশ্বাস।
দুপুর পেরোয়নি, তবু মেঘে ঢাকা আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল সন্ধ্যা আগেভাগেই শহরের গায়ে হাত রেখে দিয়েছে। কলকাতার রাস্তা ভিজে চকচক করছে। কোথাও জমে থাকা পানিতে গাড়ির আলো কেঁপে উঠছে, কোথাও ছাতার নিচে মানুষজন দ্রুত পা ফেলছে।
অয়ন চৌধুরী জানালার পাশে বসে ছিল চুপচাপ।
চোখ বাইরে, কিন্তু মন পড়ে আছে অনেক দূরে—বর্ধমানের সেই সবুজ গ্রাম, খোলা মাঠ, পুকুরপাড়, মায়ের মুখ, বাবার কড়া অথচ মায়ামাখা গলা, আর ছোট বোনের অকারণ বকবকানির মধ্যে।
আজ সে ঘর ছেড়েছে।
স্বপ্নের জন্য।
নিজেকে বড় করার জন্য।
বাবা-মা আর ছোট বোনকে পিছনে রেখে সে এসেছে কলকাতায়—দ্য সিটি অফ জয়। অথচ আনন্দের শহরে পা রাখার আগেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা জমে উঠেছে। মানুষ যখন নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটে, তখন পথের শুরুটা অনেক সময় খুব একা লাগে।
অয়নেরও তাই লাগছিল।
গাড়ি এগিয়ে চলল ভেজা রাস্তা ধরে। দূরে কোথাও ট্রামের ঘণ্টা বেজে উঠল। সেই শব্দে অয়নের বুক কেঁপে উঠল অকারণে। কলকাতা যেন তাকে বলল—
“এসেছ? তাহলে প্রস্তুত হও। এই শহর মানুষকে শুধু আশ্রয় দেয় না, বদলেও দেয়।”
অয়ন বর্ধমানের এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। কিন্তু তার পরিচয় শুধু গ্রামের ছেলে বলে শেষ হয়ে যায় না। সে মেধাবী, শান্ত, আত্মমর্যাদাবোধে ভরা, আর ভীষণ গভীর মনের মানুষ।
ছোটবেলা থেকেই বই তার সবচেয়ে আপন সঙ্গী। অন্য ছেলেরা যখন মাঠে দৌড়াত, অয়ন তখনও দৌড়াত—কখনো বইয়ের পাতায়, কখনো কবিতার লাইনে, কখনো নিজের কল্পনার ভেতর।
স্কুলজীবনে সে ছিল সবার প্রিয়। পড়াশোনায় ভালো বলে শিক্ষকরা তাকে ভালোবাসতেন, আর গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে ডাকত “অয়ন স্যার” বলে। কারণ সুযোগ পেলেই সে তাদের পড়াত। জ্ঞান ভাগ করে দিতে তার অদ্ভুত আনন্দ লাগত।
অয়নের বাবা সামান্য কৃষক, কিন্তু সংসার অভাবে জর্জরিত নয়। মাটি চাষ করে, ঘাম ঝরিয়ে, সততার সঙ্গে তিনি সংসার গড়েছেন। ছেলের মেধা দেখে তিনি বুঝেছিলেন—এই ছেলেকে গ্রামে আটকে রাখা অন্যায় হবে।
তাই বুকের ভেতর হাজার কষ্ট চেপে আজ তিনি অয়নকে নিয়ে এসেছেন কলকাতায়, সূর্যর কাছে।
সূর্য অয়নের জেঠুর ছেলে। বহু বছর আগে অয়নের জেঠু কলকাতায় এসে সংসার পেতেছিলেন। সূর্য এখন প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার। শহরে নিজের ফ্ল্যাট, চাকরি, সংসার—সবই আছে তার। অয়ন এখানেই থাকবে, পড়াশোনা করবে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে।
কিন্তু ভবিষ্যৎ নামের এই অদেখা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অয়নের মন বারবার পিছনে তাকাচ্ছিল।
গ্রামের কাঁচা রাস্তা।
পুকুরপাড়।
বিকেলের আড্ডা।
মায়ের হাতের ভাত।
সবকিছু যেন বৃষ্টির কাঁচের ওপারে ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
গাড়ি এসে থামল বেহালার এক বহুতল বাড়ির সামনে।
অয়ন জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে তাকাল। উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি। চারপাশে শহুরে ব্যস্ততা। এ একেবারে আলাদা জগৎ। এখানে মানুষের দরজা আছে, কিন্তু উঠোন নেই। জানালা আছে, কিন্তু পুকুরপাড়ের হাওয়া নেই।
অয়নের মনে হল, এই বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই তার পুরোনো জীবনটা হয়তো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে।
দারোয়ানের কাছ থেকে ফ্ল্যাটের ঠিকানা জেনে অয়ন আর তার বাবা লিফটে উঠে গেল পাঁচতলায়।
দরজার সামনে এসে বাবা বেল টিপলেন।
ভেতর থেকে পায়ের শব্দ এল।
তারপর দরজা খুলল।
আর সেই মুহূর্তে অয়নের পৃথিবী যেন একবার থেমে গেল।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল এক নারী।
না, প্রথম দেখায় তাকে “বউ” বলা যায় না। হাতে শাখা-পলা না থাকলে কেউ বিশ্বাসই করত না, সে কোনো সংসারের গৃহবধূ। মেঘলা দুপুরের আলোয় তার মুখটা যেন অদ্ভুত শান্ত দেখাচ্ছিল। চোখে ছিল নরম গভীরতা, আর ঠোঁটে এমন এক হাসি—যা অপরিচিত মানুষকেও মুহূর্তে ঘরের মানুষ করে নিতে পারে।
অয়ন তাকিয়ে রইল।
এক মুহূর্ত।
দুই মুহূর্ত।
তারপর বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
এটা কি শুধু সৌন্দর্যের ধাক্কা?
না কি এমন কিছু, যার নাম সে এখনো জানে না?
জীবনে সে সুন্দরী মেয়ে দেখেনি তা নয়। স্কুলে থাকতে অনেকেই তাকে পছন্দ করত, কেউ কেউ সরাসরি প্রস্তাবও দিয়েছিল। কিন্তু এই মেয়েটির মধ্যে অন্যরকম কিছু ছিল। তার সাজ নয়, তার চোখ নয়, তার হাসিও নয়—সব মিলিয়ে যেন এক অদৃশ্য টান।
যেন বৃষ্টিভেজা দুপুরে হঠাৎ কোনো অচেনা গান কানে এসে লাগে, আর মানুষ বুঝতেই পারে না কেন বুক ভারী হয়ে উঠছে।
মেয়েটি হেসে বলল,
“নমস্কার, কাকাবাবু! কেমন আছেন? আমি তো অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। আপনারা এলেন এত দেরি করে!”
তার গলায় শহুরে ভদ্রতা ছিল, কিন্তু স্বরে ছিল ঘরের মানুষের উষ্ণতা।
অয়নের বাবা একটু লজ্জা মেশানো হাসি দিয়ে বললেন,
“আর বলো না মা, রাস্তা-ঘাট কিছুই ঠিকমতো চিনি না। তার ওপর ট্রেনও দেরি করল। তাই একটু দেরি হয়ে গেল।”
“ইসস! সকাল থেকে বেরিয়েছেন, আর এই দুপুরে এসে পৌঁছালেন! আসুন, আসুন, ভেতরে আসুন।”
মেয়েটি দরজা আরও খুলে পাশে সরে দাঁড়াল।
অয়ন তখনও কিছুটা মুগ্ধ, কিছুটা অপ্রস্তুত। সে জানত, এই মেয়েটিই সূর্যদার স্ত্রী—সঙ্গীতা। বাবার মুখে, পিসির মুখে বহুবার শুনেছে, সূর্যর বউ নাকি খুব সুন্দরী।
কিন্তু শোনা আর দেখা যে এত আলাদা হতে পারে, তা সে আজ বুঝল।
ফ্ল্যাটের ভেতরে পা রাখতেই অয়নের মনে হল, বাইরে যে বৃষ্টি ছিল, তার একটা অংশ যেন দরজার ওপারেও থেকে গেছে। ঘরটা পরিপাটি, সুন্দর, শহুরে। ডাইনিং স্পেসে সাজানো টেবিল, পাশে সোফা, দেয়ালে কিছু ছবি। ঘরের কোথাও অগোছালো ভাব নেই, কিন্তু কোথাও যেন এক অদৃশ্য নীরবতাও আছে।
যেন এই ঘরে সব আছে।
শুধু কারও অপেক্ষা নেই।
সঙ্গীতা বলল,
“কাকাবাবু, আজ আমাদের সঙ্গেই থেকে যান না! কাল সকালে ট্রেন ধরে যাবেন।”
অয়নের বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
“না মা, বাড়িতে অনেক কাজ পড়ে আছে। আর এই ইট-পাথরের দুনিয়া আমার ভালো লাগে না। তুমি বরং এই ছেলেটার দিকে একটু খেয়াল রেখো। ওর পড়ার খুব ইচ্ছা, তাই তোদের কাছে রেখে যাচ্ছি।”
সঙ্গীতা এবার প্রথমবার ভালো করে তাকাল অয়নের দিকে।
অয়ন চোখ নামিয়ে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে।
তার লজ্জাটা এত স্পষ্ট ছিল যে সঙ্গীতার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল। ছোটবেলায় ছবিতে অয়নকে দেখেছিল সে। তারপর আর দেখা হয়নি। সেই ছবির ছেলেটা কবে যে এমন লম্বা, শান্ত, সুগঠিত যুবক হয়ে উঠেছে, তা ভাবেনি।
অয়নের বয়স কম, কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে।
সঙ্গীতা নরম গলায় বলল,
“কেমন আছো, অয়ন?”
অয়ন মাথা নিচু করেই উত্তর দিল,
“ভালো।”
মাত্র একটা শব্দ। তবু সেই শব্দে গ্রামের সরলতা, নতুন শহরের অস্বস্তি, আর অচেনা এক নারীর সামনে দাঁড়ানোর লজ্জা—সব মিলেমিশে গেল।
সঙ্গীতা হেসে বলল,
“চলুন কাকাবাবু, আপনাদের রুমটা দেখিয়ে দিই। ফ্রেশ হয়ে নিন। ততক্ষণে সূর্যও চলে আসবে।”
অয়ন বাবার সঙ্গে ঘরের ভেতর এগিয়ে গেল। কিন্তু তার মন যেন দরজার কাছেই পড়ে রইল—সেই মিষ্টি হাসির কাছে, সেই চোখ দুটোর কাছে, সেই প্রথম দেখা দুপুরের কাছে।
ঘরটা আহামরি বড় নয়, কিন্তু একজনের থাকার জন্য যথেষ্ট। জানালার পাশে পড়ার টেবিল, একপাশে বিছানা, আর ছোট্ট বারান্দা। বারান্দা দিয়ে ভেজা বাতাস ঢুকছিল। অয়ন ব্যাগ খুলে বইগুলো টেবিলে সাজাতে লাগল। বইগুলো সাজানোর সময় তার হাত একবার থেমে গেল।
কারণ বাইরে থেকে সঙ্গীতার হাসির শব্দ এল।
সামান্য হাসি।
কিন্তু অয়নের বুকের ভেতর আবার সেই অদ্ভুত ধাক্কাটা ফিরে এল।
সে নিজেকে ধমক দিল।
“এইসব ভাবার সময় না, অয়ন। এখানে পড়তে এসেছিস।”
তবু মানুষ কি সবসময় নিজের মনকে বোঝাতে পারে?
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার আগেই সূর্য বাড়ি ফিরল।
দরজা খুলতেই সে দ্রুত ভেতরে ঢুকল, কাঁধে অফিস ব্যাগ, কপালে সামান্য ক্লান্তির ভাঁজ। অয়ন উঠে দাঁড়াল। সূর্য তাকে দেখে হেসে বলল,
“কিরে অয়ন! অনেক বড় হয়ে গেছিস তো!”
অয়ন এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“ভালো আছো দাদা?”
“হ্যাঁ রে, চলছে। তুই কেমন? যাত্রায় কষ্ট হয়নি তো?”
কথাগুলো ছিল ঠিকই, কিন্তু অয়ন বুঝল—সূর্যের গলায় তাড়াহুড়ো আছে। যেন সে কথা বলছে, কিন্তু পুরো মন দিয়ে নয়। ফ্রেশ হওয়ার জন্য সে ঘরের দিকে যেতে যেতে সঙ্গীতাকে বলল,
“চা আছে? মাথাটা ধরেছে।”
সঙ্গীতা তখন ডাইনিং টেবিলে জল রাখছিল। সে একবার মৃদু হেসে বলল,
“আছে, করে দিচ্ছি।”
সূর্য আর কিছু বলল না। সে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আধখোলা রেখে দিল।
অয়ন সেই দৃশ্যটা চুপচাপ দেখল।
খুব সাধারণ দৃশ্য।
স্বামী অফিস থেকে ফিরেছে, স্ত্রী চা বানাবে।
কিন্তু কোথাও যেন উষ্ণতা নেই। কথায় নেই কোনো খোঁজ, চোখে নেই কোনো থামা, স্পর্শে নেই কোনো আপন ভাব।
অয়নের মনে অকারণে একটা প্রশ্ন জাগল—
এই ঘরে কি সত্যিই সংসার আছে?
নাকি শুধু সংসারের সাজানো আসবাব?
সে জানত না, এই প্রশ্নটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় নিষিদ্ধ উত্তরের দিকে তাকে টেনে নিয়ে যাবে।
সেদিন বৃষ্টিভেজা কলকাতার বিকেলে অয়ন শুধু পড়াশোনা করতে আসেনি।
সে এসে পড়েছিল এমন এক গল্পের ভেতর, যার প্রথম পাতা খুলতেই তার নিজের বুকের শব্দ বদলে যেতে শুরু করেছে।
আর সঙ্গীতা?
সেও জানত না, দরজায় দাঁড়িয়ে যে লাজুক ছেলেটাকে সে আজ প্রথম দেখল—একদিন সেই ছেলেটাই তার নিঃশব্দ জীবনের সবচেয়ে বড় শব্দ হয়ে উঠবে।
চলবে আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: Ko-fi) ব্যবহার করে সাপোর্ট নেওয়া বা দেওয়া বেশ জটিল। তবুও অনেক পাঠক বন্ধু আমাকে আর্থিকভাবে কিছুটা সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যাতে আমি লেখালেখির এই যাত্রাটি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সচল রাখতে পারি।আপনারা যারা স্বেচ্ছায় আমাকে কিছুটা সাপোর্ট করতে চান বা 'কফি ট্রিট' দিতে চান, তারা আমার টেলিগ্রামে (Telegram) একটি মেসেজ দিতে পারেন। সেখানে আমি আমার বিকাশ বা নগদ নম্বরটি শেয়ার করব। আমার টেলিগ্রাম আইডি: @sexstorylover24 একটি বিষয় নিশ্চিত করছি: এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে কোনো প্রকার জোর করা হচ্ছে না। গল্প আগের মতোই নিয়মিত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আপনাদের এই ছোট ছোট ভালোবাসা আমাকে আগামীর পর্বগুলো আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। যদি কোনো মতামত থাকে জানাতে ভুলবেন না। আমাকে ইমেইল করতে পারেন al3807596@gmail.com অথবা টেলিগ্রাম এ এসএমএস দিতে পারেন @sexstorylover24 এই নামে। আপনাদের এসএমএস এ আমি উৎসাহ পাই। তাই আমাকে বেশি বেশি করে উৎসাহ দিবেন এই আশা করি।