এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ১০

A Little Open Sky 10

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: নন্দিনী ও জাহাঙ্গীরের গল্প - এক মুঠো খোলা আকাশ

প্রকাশের সময়:28 Oct 2026

আগের পর্ব: এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ৯

গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না...

যে গ্রামে নন্দিনী রয়েছে সেখানকার বেশ মান্যিগন্যি লোক জাহাঙ্গীর রুবেল হাসান, তার একটু অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। অথচ নন্দিনী ফোনে ডায়াল করে চলে সুদূর কলকাতাস্থিত অনিকেত চ্যাটার্জিকে। না চাইতেও তাই বারবার অনিকেতের সাথে জাহাঙ্গীরের তুলনা মন টেনে তোলে।

এক দিকে সবুজাভ উর্বর জমি, অন্যদিকে অনুর্বর শুষ্ক মরুভূমি। কিন্তু সেই মরুভূমিটাই তার আপন, উর্বর মৃত্তিকাটা নয়। যার কাছে ভালোবাসা চায় সে দেয়না, আর যে তার জীবনে কোনো জায়গা রাখেনা সে কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই ভালোবাসা বিলিয়ে চলেছে। ভেবেই নন্দিনীর মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম।

তাই এসব উদ্ভট ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে আরো একবার সুস্মিতার নম্বর ডায়াল করলো। যদি সে ধরে। কপাল করে এবার ফোনটা ধরা হল ওপার থেকে। ..হ্যালো বলতেই রে রে করে উঠলো নন্দিনী।

"তোর কি কোনো আক্কেল নেই? বলেছিলিস সন্ধ্যে হওয়ার আগেই ফিরবি। সন্ধ্যে পেরিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার হতে চললো কোনো পাত্তা নেই তোর? জানিস তোর জন্য আমি শাশুড়ির কাছে কত কথা শুনলাম! তোকে ফোনে চাইছিল কিন্তু কি বলতাম? সে পরিবার ডিউটি সব লাটে তুলে প্রেমিকের সাথে ঘুরতে গেছে?"

"রিল্যাক্স নন্দিনী, এত চাপ নিসনা। ফোনটা সাইলেন্টে ছিল বুঝতে পারিনি।"

"আজ রাতটা আমাদের একসাথে থাকার কথা ছিল।.. শাশুড়ির কথা না হয় বাদই দিলাম, তোর নিজের কথার কোনো দাম নেই? তুই বলেছিলিস ফিরে আসবি? এই আসার নমুনা?"

"আমি জানি রে, কিন্তু কি করবো, অঙ্কিত হঠাৎ একটা উদ্ভট প্ল্যান বানিয়ে ফেলবে তা কে জানতো?"

"কিসের প্ল্যান?"

"জানিস অঙ্কিত আজ আমায় একটা রিসর্টে নিয়ে এসছে! সদর থেকে প্রায় আধ ঘন্টা দূরত্বে এই জায়গাটা।.. প্রথমে আমরা বাংলাদেশ বর্ডারে ইছামতীর নদীর ধারে কিছুক্ষণ ঘুরলাম। সময় কাটালাম সেখানে। তারপর সন্ধ্যে নামতেই আমি যখন ফিরতে চাইলাম, আমাকে নিয়ে হাকিমপুরে না গিয়ে সোজা রূপসী বাংলা রিসর্টে এল শয়তানটা। আমি তো অবাক, and also impressed.. অঙ্কিতের থেকে এই সারপ্রাইসটা আশাই করিনি।"

"একদম মিথ্যে বলবি না! কোনো সারপ্রাইস নয়। এসব তোদের প্রিপ্ল্যান ছিল। তোরা আগে থেকেই টাকি যাবি বলে ঠিক করে রেখেছিলিস, তাই না?"

এত দৃপ্ত আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে নন্দিনী কথাটা বললো যে সুস্মিতার সাহসে কুলালো না কোনো বাহানা দেয়ার। অগত্যা সত্যিটা স্বীকার করে বললো, "তুই ঠিকই ধরেছিস, টাকি যাবার প্ল্যানটা আমাদের আগে থেকেই ছিল। তবে রিসর্টের প্ল্যানটা একমাত্র অঙ্কিতের। আমি কিছুই জানতাম না। সত্যিই ফিরতে চেয়েছিলাম রে।"

"ছাড়..! এখন আর এসব বলে কি লাভ!.."

একটা ছোট্ট নিস্তব্ধতা, ফোনের দু'পার হতে। কোনো অপ্রত্যাশিত সমাচার প্রাপ্তির আশংকা। সাসপেন্স ভেঙে সুস্মিতা যা বললো তা শুনে নন্দিনীর চক্ষু ললাটগামী হল প্রায়।

"নন্দিনী, একটা কথা বলবো?"

"কি?"

"ফাইন্যালি সব হয়ে গেল! It was so good that I can't explain!"

"সব হয়ে গেল মানে?"

"মানে অঙ্কিত আর আমি অবশেষে নিজেদের কামনার চরম শিখরে পৌঁছলাম। We have just finished our very first ever sexual encounter!" [[image_1]]

"কিই!! Are you serious? সত্যি করে বল!"

"সত্যি সত্যি, তিন সত্যি। অঙ্কিতকে দেখে বোঝাই যেত না রে ওর মধ্যে পুরুষত্বের আগুন এতটা দাউ দাউ করে জ্বলছে! দেখতেই ওকে কিশোর কিশোর মনে হয়, আসলে সে আদ্যোপান্ত পুরুষ। He Man!"

"অঙ্কিত এখন কোথায়? পাশেই রয়েছে?"

"না, ওয়াশরুমে গেছে, ফ্রেশ হতে। ফিরে আবার হামলে পড়বে। আমি যাতে পালাতে না পারি তাই আমার সব পোশাক খুলে রুমের আলমারিতে তালা দিয়ে রেখে দিয়েছে। এখন পুরো বিবস্ত্র হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছি। পাগল ছেলে একটা!"

"তাহলে তুই শেষমেশ সুমনকে ঠকিয়েই ফেললি!"

"এটা তো হওয়ারই ছিল বোন। ও যে এতদিন ধরে আমাকে অবহেলা করে এসছে, তার শাস্তি ওকে পেতে হবেনা? তাছাড়া অন্য সবদিকে পিছিয়ে থাকলেও বিছানায় Ankit is far better than Sumon.. মানতেই হবে, কোনো তুলনা চলেনা। পার্থক্যটা বাড়ির খাবারের সাথে ফাইভ ষ্টার রেস্টুরেন্টের। জানি বাড়ির খাবারটা নেসেসারি, রেস্টুরেন্ট লাক্সারি। কিন্তু রোজ রোজ ডাল ভাত খেতে খেতে মুখটা মেরে গ্যাছে। Sumon is so boring, but Ankit.. Ankit is wild.. He is hungry to get me in his pants!"

"কিন্তু তোর সংসার?"

"তা চলবে, আপন নিয়মে। এখনও কোনো বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি, হয়তো হবে। নেই নেই করে তো প্রায় ছয়টা বছর কেটে গেল। এখনো কোলে সন্তান এলনা। জানিনা সমস্যাটা কার? সুমনকে বলে লাভ নেই, ওর ওসব মেডিক্যাল টেস্ট করাতে পুরুষত্বে বাঁধবে, যেমনটা প্রায় সব পুরুষমানুষের হয়ে থাকে। দেখি, অঙ্কিত আমাকে মা হওয়ার সুখ দিতে পারে কিনা। তাহলে সেটাকেই সুমনের সন্তান বলে চালিয়ে দেব।"

"কেন?"

"কারণ মুখে যাই বলিনা কেন, আমি তো আর সত্যি সত্যি অঙ্কিতের সাথে পালিয়ে যাব না। আর পালিয়ে যাবই বা কোথায়? আমাকে এই সমাজেই সকলের মাঝে থাকতে হবে, স্কুল, বাড়ি, সংসার নিয়ে। অঙ্কিতের কোনো চাল-চুলো নেই, নেই কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ও যে শুধু শরীরের টানে শরীরের চাহিদা মেটাতে আমার জীবনে এসছে তা আমি বিলক্ষণ বুঝি। তাই অঙ্কিতকে নিয়ে কোনো আকাশকুসুম ভাবনা পোষণ করার মতো বোকামি করিনা। আমিও ওকে টাইম পাশ হিসেবেই দেখি। থাকবো আমি সুমনের সাথেই, তবে প্রেম করবো অঙ্কিতের সাথে, চুপি চুপি!"

"যদি ধরা পড়িস?"

"তোকে বলেছি না, বুদ্ধি খাটিয়ে পরকীয়া করলে গোবেচারা মার্কা স্বামীরা কখনোই জানতে পারেনা। Husband doesn't know!"

"Husband doesn't know!"

"ইয়েস বেবি। তাই জন্যই তো বলি, তোরও সুযোগ রয়েছে। তুইও এই ফাঁকে একটা ছোট্ট মিষ্টি প্রেম করেই ফেল জাহাঙ্গীরের সাথে। তোরটাকেও তো আমি ভালো মতো চিনি, সেই অর্থে সুমন আর অনিকেতের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই।"

"তুই আবার শুরু করলি?"

"I am just saying babe.. দেখ আজ রাতে আমার না ফেরাতে শাপে বর হয়েছে। যদি ওই কৌশিক বাবুকে কোনোভাবে ম্যানেজ দিতে পারিস তাহলেই কেল্লা ফতে!"

"কৌশিক বাবু নেই। সদরে গেছেন। ওঁনার শালাবাবু অসুস্থ, তাকে দেখতে। তিনিও আজ রাতে ফিরবেন না।"

"বাহঃ! তাহলে তো অল সেট্! একেবারে সোনায় সোহাগা। নে এবার তুইও হাত ধুয়ে লেগে পড়।"

"বাজে কথা বলিস না তো! তুই আমাকে একেবারে একা করে দিয়ে চলে গেলি.."

"Again, I am so sorry নন্দিনী। আচ্ছা অঙ্কিত এলে বরং বলে দেব তোকে একটা সরি লিখে ম্যাসেজ করে দিতে। হি হি!"

"কোনো দরকার নেই ওর sorry এর.."

"রাগ করিস না। আমি তো ফিরতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার পাগল প্রেমিকটা আজ আমায় ছাড়বে না। গায়ে একটা কাপড় নেই। পরতেও দেবে না মনে হয়। বাড়ি থেকে ভাতের সাথে শিলাজিৎ মেখে খেয়ে এসছে বোধহয়।"

"সুমনকে ফোন করিসনি।"

"নাহঃ! জাস্ট একটা ম্যাসেজ করে দিয়েছি, গ্রামে নেটওয়ার্ক খারাপ বলে ফোন করতে পারবো না লিখে। ওর তাতে কিছু যায়ও আসেনা। ওকে ওর মতো থাকতে দে, আমাকে আমার মতো।"

"কিন্তু তাও, সে তোর হাসবেন্ড। একটা ফোন করা উচিত ছিল।"

"ধুড়! বাদ দে তো! ওর কথা আলোচনা করে মুডটা নষ্ট করিসনা আমার।.. বরং তোর বিষয়টা নিয়ে একটু খোলাখুলি কথা বলি...."

"আমার আবার কি বিষয়?"

"হুঁহুঁ, ন্যাকা! কিছু বোঝেনা যেন আমি কার কথা বলছি?"

"জাহাঙ্গীর?"

"ইয়েস, প্রিসাইডিং অফিসার ম্যাডাম।"

"ও একটা জানোয়ার, গেঁয়ো ভূত। অশিক্ষিত, অভদ্র। হয়তো রিজার্ভ কোটায় চাকরি পেয়েছে। এখন টিচার হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। কোথায় ওর স্ট্যান্ডার্ড, আর কোথায় আমার? তুই বল!"

"আমাদের মেয়েদের এই ধরণের জানোয়ারদের কেই শেষে দরকার পড়ে নিজের ক্ষুদা মেটানোর জন্য। অঙ্কিতও খুব অভদ্র! হি হি!.. তবে আমার স্থির বিশ্বাস জাহাঙ্গীর ওর থেকেও বেশি গেছো, জংলী হবে। তুই একবার ওকে চান্স দিয়ে দেখ নন্দিনী, নিরাশ হবিনা। এই তো দুটো দিন, তারপর তুই কোথায়, ও কোথায়.. বেচারার উপর একটু করুনা কর। সেই সকাল থেকে তোর পিছনে ঘুর ঘুর করছে। আমি হলে তো কখনই পটে যেতাম। তুই মিছে সেই দুপুরের ঘটনা নিয়ে অফেন্ডেড হয়ে রয়েছিস। ইট্স ওকে, এরকম ছোটোখাটো ভুল হয়ে যায়। Let's move on ....." [[image_2]]

সুস্মিতা এই সুযোগে নন্দিনীর ব্রেইনওয়াশ করতে উঠে পড়ে লাগলো। দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে জাহাঙ্গীরের গুণাবলী গুনে দিতে লাগলো। কিন্তু নন্দিনী সেসবে পাত্তা দিতে চাইলো না। কথা বলতে বলতে সেই সন্ধিক্ষণ চলে এল, যখন অঙ্কিত স্নান সেরে কোমরে শুধু একটা তোয়ালে জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরোলো।

সুস্মিতাকে ক্ষুধার্ত নয়নে দেখছিল সে। বিছানায় নগ্ন হয়ে বসে সুস্মিতা কার সাথে হেসে খেলে কথা বলছে? নিশ্চিতরূপে তার প্রথম পছন্দ ও টার্গেটে থাকা নন্দিনী চ্যাটার্জি ম্যাডামের সাথে! এত খোলা মনে সুস্মিতা তাঁর সাথেই কথা বলে। [[image_3]]

নন্দিনীর বিষয় ভেবে অঙ্কিতের সময় অপব্যয় করার কোনো অবকাশ ছিলনা। কারণ কালকে সুস্মিতা ভোরে উঠেই রওনা দেবে। তেমনই কথা হয়েছে। তাই ডিনারের পর no sex! ডিনারের আগে যত রাউন্ড খেলতে পারবে ততটুকুই পাওনা। তাই সে সটান বিছানায় এসে উপস্থিত। দেখে বোঝাই যাচ্ছে কি চায় সে? তা বুঝে সুস্মিতা নন্দিনীকে জানান দিল অঙ্কিতের পুনরায় আগমনের কথা। সুতরাং আর বিলম্ব করা যাবেনা। এখন তাকে ফোনটা রাখতে হবে। আশ্বাস দিল কাল ভোর হতে না হতেই রওনা দেবে হাকিমপুরের উদ্দেশ্যে। এই বলে ফোনটা রেখে দিল।

রাখতেই অঙ্কিত সুস্মিতাকে বিছানায় ফেলে তার উপর চড়ে বসলো, সেকেন্ড রাউন্ডের জন্য। ওদিকে নন্দিনী তা ভেবেই শিউরে উঠলো, যে তার বান্ধবী জীবনে প্রথমবার স্বামী ব্যতীত অন্য পুরুষের বক্ষ বেষ্টিত হচ্ছে। ঘেন্নার পরিবর্তে তার শিরায় শিরায় ধমনীতে উত্তেজনার তরঙ্গ কেন বইছিল সেটাই সে বুঝতে পারছিল না! তবুও সেসব কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে টিচার্স রুম থেকে বেরোলো।

সুস্মিতার সাথে কথা বলে মন মেজাজটা একটু হলেও ফুরফুরে হয়েছিল। নন্দিনী একবার জাহাঙ্গীরকে খুঁজলো। লোকটা এখন কি করছে তা জানতে কৌতূহলী হল তার মন। স্কুল প্রেমিসেসে এসে দাঁড়ালো তার পা দুটি। বেশি খুঁজতেও হলো না। কিছুটা দূরেই চাতক পাখির মতো তার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে জাহাঙ্গীর।

স্বামীর থেকে অবহেলিত এবং বান্ধবীর কথায় খানিক প্রভাবিত নন্দিনীর মনে কিছুটা হলেও জাহাঙ্গীরের জন্য মায়া জন্মেছে। তার প্রতি জাহাঙ্গীরের এই আপাত নিরামিষ মোহ-র মধ্যে আর কোনো খাদ খুঁজে পাচ্ছেনা সে। এগিয়ে গেল জাহাঙ্গীরের দিকে, কথা বলার উদ্দেশ্যে। স্কুলে সে ছাড়া কথা বলার মতো আর কেউই নেই যে তখন।

নন্দিনীকে আসতে দেখে জাহাঙ্গীরের ভেতরটা ধুকপুক ধুকপুক করতে লাগলো! অত বড় দুঃসাহসী লোকটারও হাত পা প্রবল স্নায়বিক চাপে শীতল হয়ে আসে যখন সে এরকম সুন্দরী এক অপ্সরাকে কোনো কারণ ছাড়া অপ্রত্যাশিতভাবে তার পানে এগোতে আসতে দেখে।

কাছে গিয়ে নন্দিনী জিজ্ঞেস করলো, "আমাকে বলো রাতে থাকার কিরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে? সুস্মিতাকে ফোন করে উঠলাম। সে সত্যিই ফিরবে না। আমার টিমের সবাই তো কোনো না কোনো অজুহাত দেখিয়ে বেরিয়ে গেল, তুমিই বা কেন পড়ে রয়েছো? তোমার তো এই গ্রামেই বাড়ি, পারমিশন দিলাম, যাও চলে যাও। থাকতে হবেনা কাউকে", মুখে বললেও নন্দিনী মনে মনে চাইছিল জাহাঙ্গীর থেকে যাক, for the safety reason...

নন্দিনীর সত্যিই ভয় লাগছিল একা রাতে এত বড় স্কু'ল বিল্ডিং-এ থাকতে। জাহাঙ্গীর লোকাল দাপুটে লোক। নন্দিনী নিজেই দেখেছে শাসক দলের ব্লক সভাপতি নুরুল ইসলাম থেকে শুরু করে পুলিশ সুপার সুবীর ভুতোড়িয়া সবাই ওকে সমঝে চলে। নিঃসন্দেহে এই লোকটার প্রভাব রয়েছে গোটা গ্রামে। তাই সে থাকলে নন্দিনী নিজেকে নিরাপদই মনে করবে।

কিন্তু মুখ ফুটে বলার জো নেই। পাছে জাহাঙ্গীর তাকেও সুস্মিতার সাথে একই ক্যাটেগরিতে ফেলে দেয়, যাকে বলে বাচাল মেয়েদের ঘরানা!..

জাহাঙ্গীরকে সে যতটুকু চিনেছে তাতে জানে সে যতই পারমিশন দিক না কেন জাহাঙ্গীর ওকে একা ফেলে যাবেনা। তবুও জাহাঙ্গীরকে বাড়ি যেতে বললো যাতে সে নিজেকে নন্দিনীর কাছে অপরিহার্য বলে মনে না করে।

জাহাঙ্গীর বললো, "না নন্দিনী, সেটা কক্ষনো সম্ভব নয়। তুমি বললেও আমি এখান থেকে এক পাও নড়ছি না। তুমি আমার গ্রামের অতিথি, তার উপর আমারই স্কুলে প্রিসাইডিং অফিসার হয়ে এসেছো। তোমাকে আমি বন্ধু বলে মেনেছি। একা ফেলে যাই কি করে? আমার বোধ বুদ্ধি কি লোপ পেয়েছে? মনে নেই তোমার শাশুড়িমা-কে আমি কি কথা দিয়েছি? আবার বলছি এই জাহাঙ্গীর রুবেল হাসান জবান কা একদম পাক্কা আছে। তোমার নিরাপত্তা এখন আমার দায়িত্ব!"

জাহাঙ্গীরকে নন্দিনী ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করলো। বুঝতে চাইলো জাহাঙ্গীরের বলা কথাগুলির অন্তর্নিহিত অর্থ। কারণ নন্দিনী বুঝে পাচ্ছিল না, তার এটা ভেবে আস্বস্ত থাকা উচিত যে এত বড় স্কুলে জাহাঙ্গীর থেকে যেতে চাইছে কেবল তাকে সঙ্গ দেয়ার উদ্দেশ্যে! তাকে নিরাপত্তা দিতে? নাকি দুপুরে ঘটে যাওয়া অনভিপ্রেত ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার সুপ্ত বাসনা নিয়ে জাহাঙ্গীর থেকে যেতে চাইছে? কোনটা? ওইসব বন্ধুত্ব, দায়িত্ববোধ কি সব ছলনা? মুখে সে যতই বড় বড় কথা বলুক তার মন জয় করার জন্য, তবুও এত সহজে জাহাঙ্গীরকে বিশ্বাস করবে না বলেই প্রাথমিকভাবে ঠিক করে নিয়েছিল নন্দিনী।

স্কুল প্রাঙ্গনে সর্বস্তরে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করছে। তারই মধ্যে জাহাঙ্গীরের মুখটা কিরকম নিষ্পাপ কিন্তু মায়াবী ঠেকছিল! হাবভাব দেখে নন্দিনী বোঝার চেষ্টা করছিল বটে জাহাঙ্গীরের মনের ভেতর কি চলছে, কিন্তু কিছুই উদ্ঘাটন করতে পারছিলনা। সিন্ধু সভ্যতার লিপির থেকেও কঠিন ছিল জাহাঙ্গীরের চোখের ভাষা পড়া! রহস্যের আরেকনাম হয়ে উঠেছিল জাহাঙ্গীর রুবেল হাসান!

গোটা স্কুলে সেই অর্থে শুধু নন্দিনী আর জাহাঙ্গীরই তো রয়েছে। তাই আর কোনো উপায় না দেখে, না না করেও নন্দিনীর কেন জানিনা জাহাঙ্গীরকে বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছে হল। দুপুরে এত নাটক হওয়ার পরও। বারবার তার মনে হল জাহাঙ্গীর যা করেছে তা হয়তো ঝোঁকের বশে, আর এখন যা বলছে তা হয়তো সত্যি মন থেকে বলছে। সে নন্দিনীর পাশে থাকার জন্যই স্কুলে থেকে যেতে চাইছে। নন্দিনী ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলো জাহাঙ্গীর যেন কোনো কু'মতলবে তার সাথে স্টে করার প্ল্যান না করে।