এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ১৩

A Little Open Sky 13

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: নন্দিনী ও জাহাঙ্গীরের গল্প - এক মুঠো খোলা আকাশ

প্রকাশের সময়:02 Nov 2026

আগের পর্ব: এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ১২

"তুমি কোথায় শোবে?", হাত মুখ ধুয়ে আসা জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসা করলো নন্দিনী।

"এই তো করিডোরেই, তোমার রুমের বাইরে।"

"মাটিতেই?"

"হ্যাঁ, কি আর করা যাবে। তাছাড়া বাইরে বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে..."

"কিন্তু শোয়ার ব্যবস্থা?"

"সেটাও রয়েছে। রিংকু আমার জন্যও চাদর, বালিশ, তোশক সব দিয়ে গ্যাছে, টিচার্স রুমে রাখা আছে।"

"ওহঃ! তাহলে নিজের শোয়ার ব্যবস্থাটা করে নিও। আমি এখন একটু যাই আমার ঘরে, বাই!", বলে নন্দিনী পিছন ফিরে নিজের রুমের দিকে অগ্রসর হল। খাবার পর তাদের কথোপকথন এতটা সীমিত হবে তা জাহাঙ্গীর আন্দাজ করেনি। তবুও নন্দিনীকে জোর করে আটকালো না। ভাবলো এবার থেকে যা হবে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই। দেখাই যাক কি আছে কিসমতে লেখা?

ভাগ্যে থাকলে শহুরে পাখি নিঃসঙ্গতার কবলে পড়ে নিজে থেকে খড়ের খাঁচায় বন্দি হবে। জাহাঙ্গীরের নিজের ভবিতব্যের উপর অগাধ আস্থা। সুদূর কলকাতা থেকে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ পেরিয়ে নন্দিনীর অন্তিম ঠাঁই হবে অবশেষে তার বুকেই! কিছু না করে নন্দিনী চ্যাটার্জিকে বাড়ি ফিরতে দেওয়া যাবে না।

এই ভেবে জাহাঙ্গীর পিছন থেকে নন্দিনীর উদ্দেশ্যে বললো, "কিছু দরকার পড়লে, ডাকবে আমায়। আমি তোমার দরজার বাইরেই থাকবো.. তোশক পেতে বসে।"

নন্দিনী বিনা বাক্য ব্যয়ে পিছনে ফিরে না তাকিয়ে শুধু মাথাটা ইতিবাচকভাবে নাড়লো। নীরবে এই "নিরামিষ প্রস্তাবে" সম্মতি দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। ভেতর থেকে দোর দিয়ে দিল। যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। ভাবলো একবার অনিকেতকে ফোন করে খোঁজ নিয়ে দেখবে সে বাড়ি ফিরেছে কিনা? তাহলে নিমির সাথে কথা বলবে একটু। সেইমতো স্বামীকে কল দিল..

অনেকক্ষণ বেজে যাওয়ার পর প্রথম কলটা কেটে গেল। দ্বিতীয়বার করায় তখন ধরলো অনিকেত, "হ্যাঁ বলো, নন্দিনী! কি খবর ওখানাকার?"

"এখানে সব ঠিক আছে। খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে আমার। তুমি বলো, বাড়ি ফিরেছো?"

"এই মানে... এখনো....", অনিকেতকে ফের আমতা আমতা করতে শুনে নন্দিনী রেগে গিয়ে বললো, "এখনো বাড়ি ঢোকোনি? আমি বাড়ি নেই বলে হাতির পাঁচ পা দেখেছো? ওদিকে বাড়িতে আমার মেয়েটা কেমন আছে আমায় ছেড়ে, কে জানে!"

"তুমি তাহলে মাকে ফোন করে জেনে নাও না! তোমার কথামতো আমি মাকে সুস্মিতার ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে দিয়েছি। এখন চিন্তা নেই তোমার, তুমি নিশ্চিন্তে এবার মাকে একটা কল করতে পারো।"

"তুমি পাগল হয়েছো? বিকেলে একরাশ কথা শুনিয়েছে হাকিমপুরে আসা নিয়ে। আর তুমি বলছো আবার আরো একপ্রস্ত ঝাড় খেতে কোনো কারণ ছাড়া?"

"না.. মানে.. মা যা বলে আমাদের ভালোর জন্যই তো বলে..."

"আমি কি তাঁকে আমার এত ভালো চাইতে বলেছি? আমি তো লুকিয়ে চুরিয়ে কোনো ব্যক্তিগত কারণে আসিনি। প্রশাসনিক কাজে সরকারের থেকে দায়িত্ব পেয়ে আগে থেকে বাড়িতে বলে কয়ে পারমিশন নিয়েই এসেছি। তবুও কেন বারংবার আমাকে কথা শুনতে হবে তোমার মায়ের কাছে? কিসের এত সমস্যা ওঁনার আমাকে নিয়ে, তুমি বলতে পারো অনি?"

"আচ্ছা আচ্ছা, বুঝেছি। তুমি অত রেগে যাচ্ছ কেন? জানোই তো মায়ের স্বভাব।... তোমাকে তাহলে ফোন করতে হবেনা। বরং এখন যেখানে আছো, সেখানে শান্তিতে থাকো। মন দিয়ে কাজ করো। নিমিকে মা ঠিক সামলে নেবে, তুমি অত চিন্তা করোনা মেয়েটাকে নিয়ে।"

"চিন্তা করতে হয় অনি, কারণ আমি মা। তাছাড়া তুমি কি করছো? তোমার কোনো দায়-দায়িত্ব নেই? স্বামী হিসেবে? বাবা হিসেবে? শুধু বউয়ের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বন্ধুদের সাথে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ালেই সব হয়ে যাবে?"

"আহাঃ, ব্যাপারটা তা নয়। তুমি ঠিক বুঝছো না..."

"তুমি বুঝছো না! তোমরা কেউ আমায় বোঝো না। আর বুঝতেও হবেনা। আমার জীবনটা ছারখার হয়ে গেল তোমাদের বাড়িতে বিয়ে করে আসার পর", এই বলে রাগে অভিমানে কাঁদতে কাঁদতে নন্দিনী ফোনটা অনিকেতের মুখের উপর কেটে দিল।

ফোনটাকে তোশকের এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলো। ক্রন্দনের আওয়াজ যাতে বাইরে থাকা জাহাঙ্গীরের কান অবধি না পৌঁছয় সেই কারণেই বালিশে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল মেয়েটা, হাকিমপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে নিযুক্ত আগামীকালের প্রিসাইডিং অফিসার নন্দিনী চ্যাটার্জি। একটি মেয়েকে ঘরে বাইরে কত ঝড়ঝাপটা সামলাতে হয়, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ নন্দিনী। [[image_1]]

কিছুক্ষণ বাদে নন্দিনী ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞেস করলো স্কুলে স্নানের ব্যবস্থা রয়েছে কিনা? আই মিন কোনো বাথরুম? একে তো গ্রাম, তার উপর এটা স্কুল। স্কুলে সাধারণত শৌচাগার অর্থাৎ টয়লেট থাকে কিন্তু স্নানাগার অর্থাৎ বাথরুম কতিপয় স্থানে দর্শনীয়।

গরম লাগছে, তার উপর অনিকেতের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য কষ্ট পেয়ে নন্দিনী অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেছে। She needs to be fresh...

ভাগ্যক্রমে স্কুলটা কো-এডুকেশন, এবং গ্রামের একমাত্র। তাই প্রায় সবরকম সুবিধা মজুত। তবে নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে ভঙ্গুর অবস্থায়। জাহাঙ্গীরও তা স্বীকার করলো। আলোরও পর্যাপ্ত জোগান নেই। কম পাওয়ারের বাল্ব। বলতে না বলতেই কারেন্ট অফ! হঠাৎ গর্জন দিয়ে উঠলো মেঘ। নন্দিনী খুব ভয় পেয়ে গেল। কিছু না ভেবে সে জাহাঙ্গীরকে জড়িয়ে ধরলো। খোদার উপর আস্থা রেখেছিল জাহাঙ্গীর। ভাবনার সাথে তাই বাস্তব মিলে গেল। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কলকাতার নন্দিনী অসহায় হয়ে আশ্রয় নিল হাকিমপুরের মেঠো বুকে।

জাহাঙ্গীর যেন বুকে চাঁদ পেল! নন্দিনী তো চাঁদের মতোই সুন্দর। শুধু কোনো কলঙ্ক নেই। সেটাও না লেগে যায় জাহাঙ্গীরের দোহায়।

বহু সঞ্চিত বাসনা বুকেতে -

হৃদয়ে রয়েছে আঁকা, পুরোনো অতীত স্মরণে দিলে -

শুধু দিলে নাকো দেখা।।

পদচিহ্ন আঁকিয়াছ তুমি -

মাটির পথের বুকে,

প্রিয়তম যেমন প্রিয়ারে ছুঁইয়া -

থাকে ওরা মহাসুখে!!

[[image_3]]

জাহাঙ্গীর অতি আদরে নন্দিনীকে জড়িয়ে ধরলো। স্বামীর কাছ থেকে অবহেলা পেয়ে নন্দিনী একপ্রকার ভুলেই গেছিল সে কার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে। কিছুক্ষণ যাবৎ কোনো প্রতিরোধ না দেখিয়ে সেও ওভাবে রইলো। যখন বাস্তব উপলব্ধি হল, অনুভব করলো জাহাঙ্গীরের জংলী ছাতি, তৎক্ষণাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে সরে এল।

খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। লজ্জায় জাহাঙ্গীরের চোখে চোখ মেলাতে পারছিল না। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে নিজের চুল ঠিক করতে লাগলো। জাহাঙ্গীরও খানিক লজ্জা পেয়েছে বটে। কল্পনায় স্বপ্ন বোনা, আর তা বাস্তবে ঘটতে দেখার মধ্যে কিছুটা উত্তেজনার হ্রাস বৃদ্ধি তো চলেই।

দুজনে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজমান হল। আরো বেশ কয়েকবার মেঘ গর্জন দিয়ে উঠলো। কিন্তু নন্দিনী আর জাহাঙ্গীরের বুকে এল না। [[image_2]]

জাহাঙ্গীর সেই নীরবতা ভঙ্গ করে নন্দিনীর স্নানাগার যাত্রা বিষয়টা উত্থাপন করলো। অন্ধকারে তার পথপ্রদর্শক হতে চাইলো। নন্দিনী কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে ঘরে গিয়ে ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালালো। ব্যাগ থেকে রাতে পড়ার কুর্তি, পাজামা, গা মোছার গামছা, ও একটা সাবান বার করলো। সেই সকাল থেকে এক শাড়ি পড়ে রয়েছে। ঘেমে নেয়ে শরীর প্রচন্ড অস্বস্তিতে রয়েছে। immediately needs some fresh cool water to ease...

নন্দিনী নিজের সাজ সরঞ্জাম নিয়ে ঘর থেকে বেরোলো। জাহাঙ্গীর ওর জন্য অধীর আগ্রহে দরজার বাইরে অপেক্ষারত ছিল। নন্দিনীকে পথ দেখাতে পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালাতে যাচ্ছিল, তখুনি নন্দিনী তাকে বাধা দিয়ে বললো, সে নিজের ফোনের সাহায্যেই একা চলে যেতে পারবে। শুধু স্নানাগারে যাওয়ার রাস্তাটা জানতে চাইলো, সঙ্গে যেতে বারণ করলো। কিন্তু এখানেও জাহাঙ্গীরের সোনায় মোড়া কিসমত তার সাথ দিল।

ফোনের দিকে তাকাতেই নন্দিনী খেয়াল করলো ফোনের ব্যাটারিতে একটি লাল দাগ রয়েছে। তার মানে প্রচন্ড পরিমাণে লো। যেকোনো সময়েই অফ হয়ে যেতে পারে ফোন। এখানে এসে চার্জও দেওয়া হয়নি। এখন লোডশেডিং!

অগত্যা উপায় নেই। জাহাঙ্গীরের সাহায্য নিতেই হবে। করতে হবে তাকে পথপ্রদর্শক।

জাহাঙ্গীর ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালালো। আলোর তীব্রতা নন্দিনীর ফোনের চেয়ে ছিল অধিক। হঠাৎ করে অন্ধকারাছন্ন পরিবেশ আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো। জাহাঙ্গীরের দেখানো পথে নন্দিনী হাঁটা শুরু করলো। পিছনে নন্দিনী সামনে জাহাঙ্গীর, প্রেমিকার রাস্তা সুগম করতে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে...