সুস্মিতা একটু বেপরোয়া গোছের মেয়ে। সংসারে তার শান্তি নেই। মন টেকেনা। স্বামী একদম ভালো নয়। মাঝে মাঝেই চলে রাগের মাথায় মারধর। সুস্মিতা তাই মন দিয়েছে বাইরে। একটা এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার হয়েছে। ছেলেটির সাথে ফেসবুকে আলাপ, তারপর প্রেম, লুকিয়ে চুরিয়ে। নন্দিনী এই বিষয়ে অবগত। সুস্মিতা ওর থেকে কোনো কিছুই লুকোয় না।
ছেলেটিকে নন্দিনী মাঝে সাঝেই দেখে সুস্মিতার সাথে। কখনো স্কুলের বাইরে অপেক্ষা করে, কখনো বা গায়ে পড়ে ওদের সাথেই বেরিয়ে পরে ঘুরতে। নন্দিনীর তাকে একদম পছন্দ নয়, কমবয়সী বখাটে ছেলে একটা। সুস্মিতাকে সে বারবার সাবধান করে, এইসব অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকতে। যতই হোক, সুস্মিতা বিবাহিতা, সেটা ওকে বুঝতে হবে। উল্টে সুস্মিতা নন্দিনীকে প্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করে তারই মতো একটা পরকীয়াতে জড়াতে। নন্দিনী এসব কথা কানেই তোলে না। ভাবা তো দূর অস্ত।
নন্দিনী জানতে পারে অঙ্কিতই সুস্মিতাকে নিয়ে এসছে। অনিকেতের মতই সুমনেরও সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই হয়নি। তবে নন্দিনীর কোনো বিকল্প মানুষ না থাকলেও সুস্মিতার রয়েছে। তাই স্বামীর বদলে প্রেমিকের বাহনে সওয়ার হয়ে সুস্মিতা ডিউটিতে এসছে।
সুস্মিতার এই বেলেল্লাপনায় নন্দিনী বেজায় অসন্তুষ্ট। সে বিবাহের বন্ধনটাকে অনেক বেশি মর্যাদা দেয়। স্বামী যেমনই হোক না কেন, সে স্বামীই। তার কোনো প্রতিস্থাপন হয়না, হওয়া উচিতও না। বারবার তা বুঝিয়েও সুস্মিতাকে বাগে আনা যায়না। প্রত্যুত্তরে বরং নন্দিনীকেই সুস্মিতার থেকে শুনতে হয় পরকীয়ার বিবিধ উপকারিতা।
দুটিতে মিলে রিংকুর আনা চা খেতে খেতে না বিষয় নিয়ে গসিপ করছিলোই কি স্কুলে এসে হাজির জেলার পুলিশ সুপার। পোলিং অফিসার ও ভোট কর্মীদের সুরক্ষা সম্পর্কিত কাজ ও প্রোটোকল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যই তাঁর আগমণ। রিংকু দৌড়ে গিয়ে নন্দিনীকে খবর দিল। এস পি স্যারের সাথে সাক্ষাৎ করতে নন্দিনী ও সুস্মিতা বাইরে যাওয়ার তোড়জোড় করছিলোই কি ভুতোড়িয়া সাহেব সটান টিচার্স রুমেই এসে উপস্থিত। [[image_1]]
পুলিশ সুপার নন্দিনীকে প্রথম দেখায় বিভোর হয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলো। এসেছিলেন তিনি প্রিসাডিং অফিসারকে ভোট কর্মীদের সুরক্ষা সম্পর্কিত কাজ এবং প্রোটোকল বোঝাতে। কিন্তু সামনে আস্ত একটা পরীকে দেখে থতমত খেয়ে গেলেন। অবাক হয়ে নন্দিনীকে জিজ্ঞেস করলেন তিনিই কি প্রিসাইডিং অফিসার?
নন্দিনী দেবী ইতিবাচক ভঙ্গিতে মস্তক নাড়ালেন।
কোনো নারী এত সুন্দরীও হয়? এ যেন সাক্ষাৎ ঊর্বশী স্বর্গ থেকে এই অভাগা মর্তে নেমে এসেছে। ভুতোড়িয়া সাহেব কিছুক্ষণ একভাবে নন্দিনীর দিকে দৃষ্টিপাত করে রইলেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে কাজ বুঝিয়ে দিতে লাগলেন।
নন্দিনী মন দিয়ে সব নির্দেশাবলী শুনছিল। পাশ থেকে সুস্মিতা চিমটি কেটে বান্ধবীকে টিজ করছিল। কিন্তু নন্দিনী এই ধরণের লোলুপ চাউনিতে অভ্যস্ত।
স্কুলে আকছার পুরুষ শিক্ষক বিশেষত প্রধান শিক্ষকের 'কুনজরে' পড়তে হয় তাকে। তবে সে সবসময় নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তা বজায় রেখে চলে বলেই কারোর সাহস হয়না সীমা অতিক্রম করার। শুধু দূর থেকে সবাই নিজেদের চোখ সেঁকে, আর বাড়ি যাওয়ার আগে বাথরুম হয়ে আসে। না জানে কতবার কতজনের অলীক কল্পনায় অনিকেতের স্ত্রীকে নগ্ন হয়ে তাদের শয্যাসঙ্গিনী হতে হয়েছে! [[image_2]]
কিছুক্ষণ পর টিচার্স রুমে জাহাঙ্গীর এল। পুলিশ সুপারকে সে চেনে। গল্প গুজব শুরু হয়ে গেল তাদের মধ্যে। নন্দিনী একটা বিষয় উপলব্ধি করলো যে এই জাহাঙ্গীর লোকটা সবার সাথে জলের মতো মিশে যায়, রিংকু রিকশাওয়ালা থেকে এস পি ভুতোড়িয়া। জাহাঙ্গীর নন্দিনীকে সুবীর ভুতোড়িয়ার সাথে ভালো ভাবে ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দিতে চাইলো, হয়তো ইমপ্রেস করার জন্য। কাকে? এস পি সাহেবকে নাকি প্রিসাইডিং অফিসার ম্যাডামকে? উইন উইন সিচুয়েশন ফর জাহাঙ্গীর!
"স্যার! আমাদের বুথের প্রিসাডিং অফিসার মিস নন্দিনী চ্যাটার্জি। উপপস্স! মিসেস নন্দিনী চ্যাটার্জি।"
"হা হা, জাহাঙ্গীর বাবু , ওনাকে দেখে কেউ বলবে না উনি মিসেস, নিজেকে খুব মেইনটেইন করে রেখেছেন। নাহলে তো আজকালকার মেয়েরা বিয়ের পরপরই বৌদি না হয়ে একবারে কাকিমার মতো হয়ে যায়। কি বলেন, হা হা হা হা!"
দুই পরপুরুষের মধ্যে নিজেকে নিয়ে এহেন আলোচনা নন্দিনীকে বড়ই বিড়ম্বনায় ফেলছিল। শুনতে একেবারেই ভালো লাগছিল না। কিন্তু কি আর করা যাবে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলে কথা। কোনো নারী নিজের যোগ্যতায় কোনো উচ্চপদে অভিষিক্তা হলে আশেপাশের কিছু পুরুষরুপী জন্তু তার আত্মবিশ্বাসের কাপড় খুলে নগ্ন করতে চায়, কল্পনায় বা বিছানায়।
"শুধু তাই নয়, খুব বুদ্ধিমতী মানুষ ইনি.. চট করে সবকিছু শিখে ফেলেন", জাহাঙ্গীর নন্দিনীর নামে প্রশংসার মালা গাঁথছিল। কিন্তু জাহাঙ্গীরের তার প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য দেখে নন্দিনী খানিক বিরক্ত বোধই করলো। কিন্তু মুখে কিছু বললো না।
"তা মশাই আপনি কি করে জানলেন, এখনো তো আমাদের পোলিং এর কাজ শুরুই হয়নি"
"আসলে নন্দিনী দেবী আমার সাথেই ট্রেনিং করেছেন কলকাতায়। এটা ওঁনার প্রথম ইলেকশন হলেও উনি খুব সম্ভাবনাময়ী নারী, দেখবেন ঠিক পারবে।"
"হুমঃ! পারলেই ভালো। এলাকাটা তো খুব একটা ভালো নয়, বিশেষ করে ভোটের সময়। অবশ্য আপনার চেয়ে বেশি তা ভালো কে জানে।.. যাই হোক, নন্দিনী দেবী আশা করি আমি আপনাকে সব বোঝাতে পেরেছি।"
নন্দিনী শুধু ইতিবাচকভাবে মাথাটা নাড়ালো।
"তাহলে আমি চলি। আমার আর এখানে বিশেষ কাজ নেই। আল দা বেস্ট মিস নন্দিনী। উপপস্স! মিসেস.. হা হা হা হা!.."
নন্দিনী অনেক কষ্টে হেসে তাঁর অভিবাদন স্বীকার করলো। বাকিদের সাথে কিছু ফরমাল কথাবার্তা সেরে পুলিশ সুপার মিস্টার ভুতোড়িয়া বিদায় নিলেন। ভুতোড়িয়া সাহেবকে জাহাঙ্গীর এগিয়ে দিতে গেল।
তারপর সুস্মিতা যথারীতি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় নন্দিনীকে খোঁচা মারতে উদ্যত হল। নন্দিনী তাতে বিশেষ আমল দিলনা। জায়গাটা তার একদম ভালো লাগছিল না। কোন্ এক এঁদো গ্রামে এসে সে পড়েছে, যেখানে তাকে দুটো দিন এবং গোটা একটা রাত কাটাতে হবে! পরিবার ছেড়ে স্বামী-সন্তান ছেড়ে, একা! সুস্মিতা ব্যতীত সব অজানা অচেনা মানুষদের সাথে থাকতে হবে! তার উপর এখানে শিক্ষক থেকে পুলিশ অফিসার সকলে শুধু তার রূপ চর্চায় ব্যস্ত। সুন্দরী হওয়াটা কি পাপ? [[image_3]]
সুস্মিতা প্রিয় বান্ধবী হলেও, ভরসা করা যায়না এখন। কারণ সে বখে গেছে, পরকীয়া করছে। তাই তার থেকে কোনো সদুপদেশ আশা করা বৃথা। অবসর সময়ে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে গসিপ করা আলাদা, কিন্তু টেনশন হলে সিরিয়াস ম্যাটার নিয়ে ডিসকাশন, নট্ পসিবল উইথ সুস্মিতা।
নন্দিনীর মনে পড়লো অনেকক্ষণ হয়েছে এখানে এসে কিন্তু বাড়িতে ফোন করে ওঠা হয়নি এখনো। সে চট করে ফোন নিয়ে রুম থেকে বেরোলো। প্রত্যন্ত গ্রামে নেটওয়ার্ক পাওয়া শহরের তুলনায় একটু কঠিন। তার উপর রোদ এখনো প্রখর। নেটওয়ার্ক ও ছায়ার খোঁজে নন্দিনী সেই অশ্বত্থ গাছের তলায় এসে দাঁড়ালো। বাড়ির নাম্বার ডায়াল করলো।
শাশুড়ি মা ফোন ধরলো, "এতক্ষণে সময় হল মহারানীর? সেই কোন সক্কালে বেড়িয়েছো। আমাদের বুড়ো বুড়ির কথা নাহয় ছেড়েই দাও, বাচ্চাটার প্রতিও কোনো মায়া নেই তোমার?"
"মা, আপনি এসব কি বলছেন? ওই ভীড় বাসে শ্বাস ফেলার জায়গা ছিলনা। লোকের এত কোলাহল, চিৎকার, কথা বলতাম কি করে? আর এখানে আসতে না আসতেই পুলিশ সুপার এসে হাজির, কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। এখন ফাঁকা পেয়েই আপনাকে ফোন করলাম।.."
"থাক, থাক! বাহানা তোমার ঠোঁটের গোড়ায় লেগেই থাকে। তোমার সাথে তক্ক করা বৃথা। আচ্ছা, তোমার ওই উচ্চিংড়ে বান্ধবীটা, সুস্মিতা, সে যায়নি?"
"হ্যাঁ, এসছে তো। আমার আগেই... কথা বলবেন?"
"না থাক! দুজনে মিলে যেখানে আছো, সাবধানে থাকো। নতুন যুগ পড়েছে। বাড়ির বউরা এখন কাজ দেখিয়ে ড্যাং ড্যাং করে হিল্লি দিল্লি ঘুরে বেড়াবে। আবার তাদের কিছু বলাও যাবেনা! যাই হোক, কাল সূর্য্যি থাকতেই তাড়াতাড়ি রওনা দিয়ে দেবে। বাবু যাবে, তার সাথেই যেন আসা হয়। পাকামো মেরে একা ফিরতে যেও না।"
"আমি তো আজকেও অনির সাথে আসতে চেয়েছিলাম। আপনার ছেলেই তো..."
"ঠিক আছে, ঠিক আছে। রাখো এবার ফোনটা, মেলা কাজ পড়ে রয়েছে..."
"মা, নিমিকে একটু ফোনটা দেওয়া যাবে.... হ্যালো.. হ্যালো!.. মা...."
নন্দিনী দেখলো তার শাশুড়ি ফোনটা কেটে দিয়েছে। মেয়ের সাথে কথা বলা হলনা। ভালোই আছে নিশ্চই, ঠাম্মি ঠাকুর্দার কাছে। কিছু হলে তো মুখ ঝামটা দিতই শাশুড়ি মা। এটা শাশুড়ি মায়ের হবি।
তারপর সে অনিকেতকে কল করলো। অফিসে আছে বলে অনিকেত পৌঁছনোর খবর পেয়েই ফোনটা রেখে দিল। নন্দিনী চেয়েছিল আরেকটু কথা বলতে। সে তো ঘরবাড়ি, স্বামী সবাইকে খুব মিস করছিল। মুখ ফুটে সবটা বলতে পারেনা। ইন্ট্রোভার্ট মেয়ে, নিজের ছোট ছোট ইচ্ছে গুলো মনের মধ্যেই দাবিয়ে রাখে। অনিকেতও রাখেনা তার মনের খবর। না করে করেও সাত বছর অতিক্রান্ত। পেছন ফিরে তাকালে সবটাই মরীচিকার জলের মতো মনে হয়। দৃশ্যমান অথচ প্রবাহমান নয়। তাই বর্তমান বাস্তব কেবল একরাশ শূন্যতা।
নন্দিনী যখন আক্ষরিক অর্থেই পিছন ফিরলো তখন দেখে সেই বৃহদাকার চেহারার আদিম অকৃত্রিম জাহাঙ্গীর রুবেল হাসান তার সমক্ষে পাথরের ন্যায় দন্ডায়মান।
"এ কি আপনি? এখানে!", চমকে উঠলো নন্দিনী।
"আমি তো আপনাকেই খুঁজছিলাম। কয়েকটা ডকুমেন্টসে সাইন করতে হবে। সুস্মিতা ম্যাডামকে জিজ্ঞেস করলাম তো উনি বললেন একটু বাইরে গেছেন। খুঁজতে খুঁজতে শেষে অশ্বত্থের তলায় পেলাম।"
"ওহঃ! তা ওয়েট করতে পারতেন কিছুক্ষণ। এত তাড়া কিসের যে এখানে চলে এলেন? যাই হোক.."
"আপনি আপনার হাসবেন্ডের সাথে কথা বলছিলেন না?"
"দ্যাটস নান অফ ইওর বিসনেস", রাগে চোখ কটমটিয়ে বললো নন্দিনী।
"আমি জানি। কিন্তু কি বলুন তো আপনাকে দেখলেই বোঝা যায় আপনি সুখী নন, সুখে থাকার ভান করেন শুধু। আপনার এরূপ অবস্থা আমাকে বিচলিত করে তাই স্বামীর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে ফেললাম। ক্ষমা করবেন, আপনার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর জন্য আমি দুঃখিত", বলে জাহাঙ্গীর সাইন না করিয়েই চলে গেল।
জাহাঙ্গীর যা করার করে দিয়েছিল। নন্দিনীর মনে নিজেকে নিয়ে ধন্ধের বীজ পুঁতে দিয়ে। নন্দিনী থ মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। কিছু সময় পর নিজেকে সামলে নিয়ে রওনা দিল টিচার্স রুমের দিকে।
রুমে জাহাঙ্গীর অপেক্ষা করছিল ডকুমেন্টস হাতে নিয়ে। দুজনে একসাথে যাবতীয় জরুরি যা সই সাবুত করার তা সারলো। একজন প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে তো একজন অ্যাস্ এ লোকাল ইনচার্জ। বুথের সেকেন্ড পোলিং অফিসার সুস্মিতা সেনগুপ্ত আগেই নিজের সব ফর্মালিটিস পূরণ করে রেখেছিল। সে তখন নীরব দর্শক হয়ে নন্দিনী ও জাহাঙ্গীরের গতিবিধি নিরীক্ষণ করার মধ্যে দিয়ে তাদের রসায়নের আনুমানিক ভবিষ্যৎ চিত্রনাট্য মনে মনে এঁকে চলেছিল।
সুস্মিতা তো জানে নন্দিনীও তার মতোই অভাগা, শুধু সে নিজে মানতে চায়না। সুমন ও অনিকেতের মধ্যে সেরম কোনো পার্থক্য নেই। অনিকেত হয়তো সুমনের মতো স্ত্রীয়ের গায়ে হাত তোলেনা। তবে সেটাই কি শুধু ভালো স্বামী হওয়ার মাপকাঠি? কে জানে? স্বামী জাতটাই বড় বিচিত্র। তাই নন্দিনী তাকে যতই ভুল বুঝুক না কেন, সুস্মিতা আশা রাখে নন্দিনী একদিন ঠিক খুঁজে পাবে এক মুঠো খোলা আকাশ। হতেই পারে তা হাকিমপুরের আকাশ।