নন্দিনীর বাপেরবাড়ি কাঁচরাপাড়ায়। মফস্সল এলাকায় থাকলেও তার পরিবার অনিকেতের শহুরে পরিবারের থেকে অনেক বেশি উদার। নন্দিনীর পড়াশুনা, বেড়ে ওঠা সেখানেই। কাঁচরাপাড়া কলেজ থেকে স্নাতক, তারপর কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ ইংরেজিতে। দ্বাদশ শ্রেণী অবধি সে স্থানীয় গার্লস স্কুলে পড়েছে, কিন্তু কলেজ জীবনের ফ্রেন্ড সার্কেলে ছেলে মেয়ে উভয়েরই উপস্থিতি ছিল, তবুও কখনো বেপরোয়া লাইফস্টাইল নিজের জন্য বেছে নেয়নি সে।
কলেজ জীবনে নন্দিনী অনেক স্মার্ট চটপটে ছিল। ফ্লুয়েন্ট ইংলিশে কথা বলতো। বাকি মেয়েদের মতোই জিন্স টপ পড়তো। বিয়ের পর হঠাৎ সব বন্ধ হয়ে গেল। শাশুড়ি মার নির্দেশে শাড়ি পরা হল শুরু। তারপর আর পরনে ওয়েস্টার্ন পোশাক ওঠেনি। অনিকেতের বাড়ির বউয়ের শাড়ি ব্যতীত অন্য কিছু পরায় চাপলো অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। পুরোনো জিন্স টপ টিশার্টের জায়গা হল বাপের বাড়ির আলমারিতে। স্বাধীন উন্মুক্ত জীবন ফেলে আসতে হল কাঁচরাপাড়ায়। [[image_1]]
বাবা মা যখন বিয়ের সম্বন্ধ দেখছিল তখন সে স্কুল সার্ভিস কমিশনের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় বসে। পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো চাকরি পরীক্ষার ফলাফল বেরোতে বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। বিয়ের পর সে চাকরিটা পায়। কলকাতার মধ্যে এবং স্কুল টিচারের চাকরি বলে শশুড়বাড়ির কেউ আর বাধা দেয়নি।
তবে চাকরি পেয়েই তার জীবনযুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। বরং নতুন করে শুরু। কারণ কর্মক্ষেত্রেও তাকে অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। স্কুলটা বাংলা মিডিয়াম হলেও কো-এডুকেশন। ফলে টিচিং ফ্যাকাল্টিতে শিক্ষক-শিক্ষিকা উভয়েরই নিয়োগ রয়েছে। কলেজ, ইউনিভার্সিটি, তারপর স্কুল যেখানে সে শিক্ষকতা করে, সব জায়গায় কেউ না কেউ থাকেই লোলুপ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে। ছলে বলে কৌশলে কাছে আসার প্রচেষ্টা চলতো এবং এখনো চলে।
কলেজেও এরকম ভাবেই নন্দিনী একটি ছেলেকে কষিয়ে চড় মেরেছিল তার সাথে অসভ্যতা করতে চাওয়ার জন্য। জাহাঙ্গীরকে প্রশ্রয় না দিয়ে উল্টে চড় মারাটা তার কাছে তাই নতুন কিছু নয়। সে আগেও এভাবে সকল নিষিদ্ধ কামনাকে প্রতিহত করে নিজের পবিত্রতা বজায় রেখে এসছে.... আপাতত।...
---------------------------------------------------------
চড় মেরে টিচার্স রুম থেকে বেরোলো নন্দিনী। আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা অন্য রুমটায় পৌঁছে সুস্মিতার পাশে গিয়ে আবার বসলো।
"কিরে, তোর প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গেছিলিস?", মুচকি হেসে সুস্মিতা জিজ্ঞেস করলো।
নন্দিনী তখন মজা করার বা নেওয়ার মানসিকতায় ছিলনা। তবু সে কোনো রিএক্ট করলো না। চারিপাশে অনেক লোকজন আছে। পাছে তারা কিছু আন্দাজ করে ফেলে তার আর জাহাঙ্গীরের মধ্যে ঘটে যাওয়া শীতল যুদ্ধের ব্যাপারে! তাই শুধু বিরক্তির স্বরে নন্দিনী বললো, "তুই একটু থাম এবার। সকাল থেকে খালি বাজে কথা বলে যাচ্ছিস!"
"দেখ, তোর শাশুড়িই আমায় দায়িত্ব দিয়েছেন তোকে চোখে চোখে রাখতে। পাছে তাঁর সাধের বউমা হারিয়ে যায় বা কারোর সাথে পালিয়ে যায়.."
"আবার??"
"সরি সরি! আচ্ছা সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করছি কোথায় গেছিলিস? টিচার্স রুমে?"
"হুম!", অন্যমনস্ক হয়ে জবাব দিল নন্দিনী।
"কি করতে গেছিলি আবার?"
"আমি তো........" প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মনে পড়লো, যে কাজের জন্য সে গেছিল সেটাই তো হয়নি! তার ফোন! সেটা তো খুঁজে পায়নি। তাহলে কি আবার যাবে একবার? নাহঃ নাহঃ! গেলে যদি আবার জাহাঙ্গীর ধরে! সে ভাবতেই পারে তার টানে ফিরে এসছে নন্দিনী। অহেতুক উৎসাহ পেয়ে যাবে তখন।.....
নন্দিনীকে চিন্তামগ্ন দেখে সুস্মিতা আবার জিজ্ঞেস করলো, "কিরে? বললিনা তো, কেন গেছিলিস?"
"কি..... ক্কি.. কিছুনা.. ওই কয়েকটা সই-সাবুত বাকি ছিল। ভুলে গেছিলাম করতে। মনে পড়লো, তাই সেরে আসলাম।"
ফোনের কথাটা ইচ্ছে করে বললো না, নাহলে হাজার একটা প্রশ্ন করতো। ফোনটা পেয়েছিস কিনা? তাহলে কোথায় গেল? জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞেস করেছিস কিনা? ইত্যাদি ইত্যাদি।..
সুস্মিতা যদি বান্ধবীর হেল্প করতে ফোন খুঁজতে যায় তাহলে না জানি জাহাঙ্গীর কি না কি বলে বসতে পারে! অনিশ্চয়তায় ভরে গেছিল মন-মস্তিস্ক! সবটা কিরকম ধোঁয়াশা লাগছিল। হাকিমপুর গ্রামটা না জানি কত পরীক্ষা নেবে তার? "ধুড়ড়ঃ!!" বিরক্ত হয়ে উঠেছিল নন্দিনী মনে মনে.... [[image_2]]
"হুমঃ!! বুঝি বুঝি, সব বুঝি! সই সাবুত কি পরে করা যেতনা? আসলে তুই জাহাঙ্গীরকে ডাকতে গেছিলিস খাওয়ার জন্য, এটা বললেই হয়।... নাহঃ এটা বলছি না যে তুই অন্য কোনো বিশেষ টানে গেছিস। আসলে প্রিসাইডিং অফিসার ম্যামের তো একটা দায়িত্ব আছে, তাঁর সকল সহকর্মী ঠিকমতো খেয়েছে কিনা দেখার, এবং আরো কত কি.... হি হি হি হি!...."
সুস্মিতা ক্রমাগত নিজের বান্ধবীর লেগ পুল করছিল। নন্দিনীর একেবারেই তা ভালো লাগছিল না। অন্য সময় হলে তাও হালকা মেজাজে সয়ে নেওয়া যেত, কিন্তু সে-ই জানে কিছুক্ষণ আগে টিচার্স রুমে তার সাথে ঠিক কি হয়েছে! তাই না পারতে অবশেষে সে সুস্মিতাকে হালকা ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিল।
সুস্মিতা নিজের বান্ধবীকে ভালো মতো চেনে। অনেকদিন হল একসাথে শিক্ষকতা করছে। কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে যে নন্দিনী খুব আপসেট হয়ে আছে সেটা বুঝতে আর বাকি নেই। এবং সম্ভবত সেটা টিচার্স রুমে যাওয়ার কারণে হয়েছে। সুস্মিতা ভাবলো ওই রুমে তো জাহাঙ্গীর ছাড়া আর কেউ নেই। তবে কি সে কিছু করেছে? এক গভীর রহস্য দানা বাঁধলো সুস্মিতার মনে।
জাহাঙ্গীর লাঞ্চ করতে আসেনি। নন্দিনী জানে সে এখন এমুখো হবেনা। তাড়াতাড়ি লাঞ্চটা সেরে সাহস করে আরো একবার টিচার্স রুমের দিকে পা বাড়ালো, ফোনটা খুঁজতে, সবার অলক্ষ্যে। সুস্মিতা ওর পিছু নিল, বিষয়টা খতিয়ে দেখতে। টিচার্স রুমে ঢুকে নন্দিনী দেখলো সেই একইভাবে জাহাঙ্গীর ঘরের কোণায় চেয়ারে বসে রয়েছে।
নন্দিনী গম্ভীরভাবে জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞেস করলো, "আপনি আমার ফোনটা দেখেছেন?"
জাহাঙ্গীর আবার চেয়ার ছেড়ে উঠলো। আবার কাছে আসতে দেখে নন্দিনী অবাক হয়ে গেল। চড় খেয়েও লজ্জা হয়নি লোকটার! সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে চায়? ভেবে আঁতকে উঠলো!
"বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।"
নন্দিনী এবার আগের থেকে অনেক বেশি দৃপ্ত ও প্রস্তুত, সকল অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে। তবে জাহাঙ্গীরের মন ততক্ষণে অন্য মোড় নিয়েছে। সে বুঝেছে নন্দিনীকে এভাবে বাগে আনা যাবেনা। হৃদয় অন্তঃসারশূন্য হলেও তা অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। বাইরের কেউ স্ট্রিক্টলি নট অ্যালাউড! অবলম্বনও তাই অন্য পথের করতে হবে। [[image_3]]
নম্রভাবে জাহাঙ্গীর পূর্বের ঘটনার জন্য নতমস্তক হয়ে নন্দিনীর কাছে ক্ষমা চাইলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে হাতে তুলে দিয়ে বললো, "আপনি এটা ভুলে গিয়ে ফেলে রেখে গেছিলেন। এরকম একটা জায়গায় অচেনা অজানা কারোর হাতে যাতে না পড়ে তাই ফোনটা নিজের জিম্মায় রেখেছিলাম।"
"তা আপনি আগে কেন দিলেন না?"
"ভুল হয়ে গেছে ম্যাডাম। ভেবেছিলাম একটু মজা করবো...."
"আর তাই একটা মেয়েকে একা পেয়ে অসভ্যতামো করার সাহস দেখালেন?"
"ছিঃ ছিঃ এরকম বলবেন না!.. আসলে তখন হঠাৎ মাথায় একটু দুস্টু বুদ্ধি খেলে গেল.. তাই বোকামিটা করে ফেললাম।"
"এটাকে বোকামি বলেনা, এটা রীতিমতো.... থাক্!"
"থামলেন কেন? বাকিটাও বলে দিতে পারতেন।"
"প্রয়োজন বোধ করছি না। তবে আপনি যেটা করেছেন সেটা আর যাই হোক পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই বোকামি বলে তা স্বীকৃত নয়..."
"অতিথি সমান প্রিসাইডিং অফিসার ম্যাডামের সাথে ফ্লার্ট করাটা যদি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ হয় তাহলে আপনার অপরাধী আপনার সামনে এই হাঁটু গেড়ে বসলো। পৃথিবীর যেকোনো আইনের দ্বারা আপনি আমাকে দণ্ডিত করতে পারেন। শুধু একটাই শর্ত, তারপর যেন এই অধ্যায়টা একেবারে ভুলে গিয়ে নতুন করে আপনি আমায় বিশ্বাস করতে শুরু করেন।"
এই বলে জাহাঙ্গীর নাটকীয়ভাবে নন্দিনীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ক্ষমা চাইতে লাগলো। নন্দিনী বেশ বিড়ম্বনায় পড়লো! এখন যদি কেউ চলে আসে, কি ভাববে? সবার তো মোটামুটি খাওয়া শেষ হয়ে এসছে।
কেউ দেখে ফেলার ভয়ে নন্দিনী জাহাঙ্গীরকে বারবার উঠতে বলছিল। কিন্তু জাহাঙ্গীর নাছোড়বান্দা, অত সহজে ছাড়বার পাত্র নয়। বলছিল দুটো চড় যথেষ্ট নয়, নন্দিনী তাকে আরো আঘাত করুক যদি তিনি মনে করেন অপরাধ আরো গর্হিত।
কেউ চলে আসলে কেলেঙ্কারি কান্ড বাঁধবে! কিন্তু জাহাঙ্গীর তার কথায় অনড়। যতক্ষণ না ম্যাডাম তাকে ক্ষমা করছেন ততক্ষণ সে ম্যাডামের পদতলে পড়ে থেকে নিজের পাপমোচন ঘটাবে।
জাহাঙ্গীরের পীড়াপীড়িতে অবশেষে নন্দিনী তার দাবি মানতে বাধ্য হল, এবং তাকে ক্ষমা করে দিল। লোকলজ্জার ভয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়ে। সাথে সাবধানও করে দিল এরকম ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়।
আত্মপক্ষ সমর্থনে জাহাঙ্গীর পুরো বিষয়টাকে এমনভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করলো যে উল্টে নন্দিনীর নিজের ভাবনাকে নিয়ে সংশয় তৈরি হল। ভাবলো গ্রামের মানুষ হয়তো ফ্লার্টিং আর টিসিং এর মধ্যেকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটা বোঝেনা, যতক্ষণ না তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হয়। সেই কারণেই হয়তো জাহাঙ্গীর ঝোঁকের বশে ভুলটা করে ফেলেছে। এমনিতে যতই হম্বিতম্বি করুক সে, আদতে তো লোকটা একটা গেঁয়ো ভূত। এই ভেবে নন্দিনী বিষয়টা নিয়ে আর জলঘোলা করলো না।
জাহাঙ্গীরকে ওয়ার্নিং দিয়ে নন্দিনী ফোনটা নিয়ে বহিঃপানে হাঁটা দিল। যেতে যেতে একবার ফিরে তাকালো, "লাঞ্চ করবেন না?"
"খিদে ছিলনা ম্যাডাম, তাই যাইনি। ভাবলাম পরে খাব। কিন্তু তারই মাঝে আপনার থেকে দু-দুটো চড় খেয়ে মন আর উদর দুটোই ভরাট হয়ে গেল।"
কথাটা শুনে নন্দিনী হেসে ফেললো, ""তা শুকনো চড়ে কি চিঁড়ে ভিজবে, নাকি গামছা ভিজিয়ে উত্তম মধ্যম দিতে হবে?"
নন্দিনীর কথায় জাহাঙ্গীরও হেসে ফেললো, ""না না, চিঁড়ে ভিজলেও হজম হবে না। আপনার হাসি মুখ দেখে এখন খিদে পেয়ে গেছে, তবে সেটা খাবারেরই...।"
"তাহলে যান, লাঞ্চটা সেরে নিন। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে..", বলে নন্দিনী বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
বাইরে থেকে সুস্মিতা সব শুনলো। নন্দিনী বেরোনোর আগেই সে দরজা থেকে সরে গেল যাতে নন্দিনী তাকে ধরে না ফেলে।