এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ৪

A Little Open Sky 4

জাহাঙ্গীর নিজের দু'হাত নন্দিনীর দুই দিকে করে দেওয়ালে রাখলো, এমন করে যেন সে নন্দিনীকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছে, অথচ তাকে স্পর্শ করেনি।

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: নন্দিনী ও জাহাঙ্গীরের গল্প - এক মুঠো খোলা আকাশ

প্রকাশের সময়:05 Oct 2026

আগের পর্ব: এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ৩

নুরুল ইসলাম চলে যাওয়ার পর নন্দিনী আর জাহাঙ্গীর ফের টিচার্স রুমের দিকে পা বাড়ালো। দুজনকে একসাথে ঢুকতে দেখে সুস্মিতার ঠোঁটের কোলে একটা দুস্টু হাসি খেলে উঠলো। সে মনে মনে বাসনা করলো এই জুটির রসায়ন যাতে আরো গভীরতর হয়। দুজনকে বেশ ভালোই মানিয়েছে। আলাদা ধর্ম, আলাদা বর্ণ, আলাদা সংস্কৃতি, এবং সর্বোপরি আলাদা আর্থ-সামাজিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠা এক্কেবারে দুই ভীন্ন মেরুর মানুষ। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই দুই বিপরীত ধারার নদী জীবনে চলার পথে একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়েছে ততবারই প্রলয় অবশ্যম্ভাবী হয়েছে।

টিচার্স রুমে এসে নন্দিনী নিজের টিম মেম্বারদের উদ্বুদ্ধ করতে একটা পেপ টক দিতে চাইলো, "guys, আমরা নিশ্চই জানি আমরা কি কারণে এখানে এসছি! আমরা সকলেই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কাজ নিয়ে অবগত। সকলেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। নতুন করে আমার আপনাদের দিকনির্দেশন করার মতো কিছু নেই। তবুও কিছু কথা বলে রাখা ভালো। প্রথমত, যতই লোকমুখে আমরা শুনিনা কেন যে এলাকাটা খুব অশান্ত, ঝুট-ঝামেলা লেগেই থাকে, তাও আমরা এসবে বিন্দুমাত্র ভীত সন্ত্রস্ত হব না। তবে সতর্ক থাকতে হবে সকল অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির জন্য। দ্বিতীয়ত, যতক্ষণ না ইলেক্শন কমিশন কাল আমাদের থেকে সবকিছু বুঝে নিয়ে ব্যালট বাক্সগুলি নিজেদের জিম্মায় নিচ্ছে ততক্ষণ এই ব্যালট গুলো সযত্নে সামলে রাখার দায়িত্ব আমাদের। তৃতীয়ত, আমরা কোনো রাজনৈতিক চাপে মাথা নত করবো না। শেষ কথা, যতই ঝড়ঝাপটা আসুক না কেন, আমরা একসাথে এক ইউনিট হয়ে তার মোকাবেলা করবো, কেমন!"

"ঠিক বলেছেন ম্যাডাম, আমরা এক ইউনিট এক পরিবারের মতো কাজ করবো, কি বলেন আপনারা?", নন্দিনীর বলা কথাগুলোর প্রবলতা আরো বাড়িয়ে দিতে একা কোরাস গাইলো জাহাঙ্গীর।

সবাই সেই তালে তাল মিলিয়ে নন্দিনীকে ইতিবাচক অভিবাদন জানালো।

"হ্যাঁ, ঠিক ঠিক! আমরা সবাই প্রিসাইডিং অফিসার ম্যাডামের সাথে রয়েছি, কোনো চিন্তা নেই", টিচার্স রুমে উপস্থিত পুলিশকর্মীরা একযোগে বলে উঠলো। অন্যান্য কর্মীরাও তাতে জোরালো সমর্থন জোগালো।

নন্দিনীর নিজেকে নিয়ে কিছুটা গর্ববোধ হচ্ছিল। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে কোনো নির্বাচনের দায়িত্ব পাওয়া চারটি খানি কথা নয়। তার উপর সে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে। এটা একটা বড় সুযোগ নিজেকে প্রমাণ করার। শশুরবাড়িতে তাকে বড্ড দমিয়ে রাখা হয়। আর চার-পাঁচটা বাঙালি ঘরোয়া ছেলেদের মতোই অনিকেত নিজের বাবা-মা বিশেষ করে মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে স্ত্রীর হয়ে স্ট্যান্ড নিতে পারে না। [[image_1]]

দুর্গম এলাকায় ইলেক্শন ডিউটি পড়েছে জেনে কম ঝক্কি পোয়াতে হয়নি তাকে। প্রচুর কাঠ-খড় পুড়িয়ে শশুড়-শাশুড়িকে রাজি করাতে পেরেছে। এই প্রথম নন্দিনী একা বাড়ির বাইরে রাত কাটাবে, তা শাশুড়ির একেবারে না-পসন্দ! বাড়ির বউ দূর প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে থাকবে, নৈব নৈব চ!

শাশুড়ি চেয়েছিল অনিকেতও সাথে থাকুক সেখানে। কিন্তু ইলেক্শনের কিছু প্রোটোকল থাকে। তাছাড়া অনিকেত যে খুব আগ্রহী ছিল এমন তো নয়, শুধু মায়ের সামনে ভালো থাকার জন্য মুখে রা কাটেনি। নন্দিনী তা বিলক্ষণ জানতো। সবটা তাকে একাই সামলাতে হয়েছিল।

নন্দিনী প্রায় হাতে পায়ে ধরে অনিকেতের বাবা মাকে রাজি করায়। অনেক কষ্টে পারমিশন আদায় করে হাকিমপুরে এক রাত থাকার। বিশেষ করে শাশুড়ির থেকে। কারণ যাওয়ার ব্যাপারে তিনিই বেশি বেঁকে বসেছিলেন।

নন্দিনীর কাছে এই ট্রিপটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ স্কুলে তার নরম স্বভাবের জন্য উঠতে বসতে তাকে সহকারী শিক্ষকদের দ্বারা অবমূল্যায়নের শিকার হতে হয়। বিশেষ করে পুরুষ শিক্ষকরা মেয়েদের একটু বেশিই হেয় করে। মেয়েদের নিয়ে জোকস্ মারা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করাটা তাঁদের একপ্রকার দৈনন্দিন রুটিন। সুস্মিতা এসব গায়ে না মাখলেও নন্দিনীর জাত্যাভিমানে লাগে। নারী হিসেবে কেউ তাকে ছোট করবে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা। [[image_2]]

যখন হাকিমপুরে তার ইলেক্শন ডিউটি পড়লো, স্কুলের প্রিন্সিপাল সমেত সহ-শিক্ষকরা সবাই একযোগে বলেছিল, নন্দিনীর শশুরবাড়ি যা রক্ষণশীল তাঁরা কিছুতেই বাড়ির বউকে অত দূরে পাঠাবে না। স্কুলে চাকরি করতে দিচ্ছে এই অনেক। নন্দিনী তখন দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিজ্ঞা করেছিল সে শুধু ডিউটি করতেই যাবেনা, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করে সবার মুখে ঝামাও ঘষে দেবে। স্কুলের সহকর্মী থেকে শুরু করে বাড়ির লোক, যারা যারা তাকে নরম স্বভাবের মেয়ে বলে হেয় করে, দুর্বল ভাবে, প্রত্যেককে উচিত জবাব দেবে। নন্দিনীর কাছে এই নির্বাচনটা নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই।

নন্দিনী খেয়াল করেছিল যখন সে পেপ টক দিচ্ছিল তখন জাহাঙ্গীর মুগ্ধভাবে একনাগাড়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছিল। এভাবে সবার সামনে হাঁ করে তাকিয়ে থাকাটা খুব একটা ভালো জেস্চার নয়। বাকিরাও তো উপস্থিত রয়েছে, তারা দেখলে কি ভাবতো? নন্দিনী বোঝে জাহাঙ্গীরের তার প্রতি একটা অতিরিক্ত উৎসাহ রয়েছে। সুন্দরী মেয়ে দেখলে আকছার পুরুষদের মধ্যে এরকম ঘটে থাকে। কিন্তু সেটা সবাইকে জানান দেওয়ার কি খুব দরকার? এছাড়াও যখন নন্দিনী নিজের কথা শেষ করলো তখন গোটা রুমের মধ্যে একমাত্র জাহাঙ্গীরই কথা বলে উঠলো, হোক না তা সমর্থনের জন্য.. নন্দিনী কি তার কাছে কোনো বিশেষ সমর্থনের আবদার রেখেছে?

পুলিশকর্মীদের সাথে জাহাঙ্গীরের ভালো তাল মিল রয়েছে। ভাইজানকে 'খুশি' করতেই তাঁরা একযোগে নন্দিনীর পাশে দাঁড়িয়েছে। আদতে তাঁরা ভাইজানের সাথে রয়েছে। ভাইজানের পাল যেদিকে তাঁদের নৌকোও সেদিকে। দুইয়ে দুইয়ে চারের বদলে বাইশ এইভাবেই হয়।.. কিন্তু স্কুলে উপস্থিত কিছু শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের অতটাও প্রিয় পাত্র নয় জাহাঙ্গীর। স্থানীয় হওয়ার সুবাদে শুধু পরিচিতিটা আছে। হয়তো জাহাঙ্গীরের দাপুটে স্বভাব-চরিত্র তাঁদের পোষায় না।

জাহাঙ্গীর লোকটা কি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য? এত সহজে সেটা মানা উচিত হবে? তার চেয়ে বরং লোকটাকে নিজের থেকে একটু দূরে রাখতে হবে। ভেবে নন্দিনী একটা উপায় বার করলো।.. ভোটিংয়ের জন্য আপাতত স্কুলে দুটি রুম বরাদ্দ। প্রিসাডিং অফিসার ঘোষণা দিলেন টিমটাকে দু' ভাগ করার, দুটি আলাদা রুমের জন্য। একটির নেতৃত্বে থাকবে সে ও কৌশিক বাবু, অপরটির দায়িত্ব সুস্মিতা ও জাহাঙ্গীরের। এই সিদ্ধান্ত শুনেই জাহাঙ্গীর নন্দিনীকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে থামিয়ে দেওয়া হল। ম্যাডামের সিদ্ধান্তই এখানে শেষ কথা।

জাহাঙ্গীর স্বভাবতই খুব হতাশ হল। কিন্তু তার কিছু করার নেই। প্রকাশ্যে সে নন্দিনীর সাথে থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করতে পারবে না। খুবই দৃষ্টিকটু ঠেকবে। লোকাল পুলিশকর্মীরা একে অপরের দিকে চেয়ে ইশারায় আকার ইঙ্গিতে ফিসফিস করে ম্যাডামকে নিয়ে কিছু একটা বলছিল। নন্দিনী তা বুঝতে পেরে সটান তাদের গোটা গ্রাম ঘুরে রেকি করে আসার অর্ডার দিল! সুস্মিতাকে বললো ভোটার লিস্টটা নিয়ে এসে চেক করতে কতজন ভোটার রয়েছে গ্রামে। কৌশিক বাবুকে নির্দেশ দিল স্টোরেজ রুমে গিয়ে দেখে আসতে ব্যালট বাক্স গুলো সব ঠিকমতো সিল করা আছে কিনা।

জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞেস করলো কাল ভোটের পর কমিশন কখন ব্যালট বাক্স গুলো নিয়ে যাবে? উত্তরে জাহাঙ্গীর বললো সে যতদূর জানে কাল সন্ধ্যের পর সদরের কন্ট্রোল অফিস থেকে লোক পাঠাবে ব্যালট বক্স গুলো নিতে। জাহাঙ্গীরকে নির্দেশ দিল যেকোনো ভাবেই হোক সঠিক সময়টা জেনে তাকে বলতে।.. আসলে সেইমতো সে অনিকেতকে কাল আসতে বলবে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

রমেন দা টিচার্স রুমে জলের বোতল নিয়ে এল। তাঁর কাছ থেকে নন্দিনী গ্রামের আবহাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলো। অর্থাৎ, বৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা? রমেন দা অভিজ্ঞ মানুষ। আবহাওয়াবিদ না হলেও তাঁর মতো গ্রামের মানুষদের আকাশের চরিত্র সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা থেকে থাকে। চাষবাস করেই তাদের বেশিরভাগের জীবনযাপন চলে, তাই। সেই অভিজ্ঞতার উপর ভর করেই রমেন দা বললো, বৃষ্টির সম্ভাবনা তো রয়েছে, তবে তা আনুমানিক পঞ্চাশ শতাংশই। [[image_3]]

নন্দিনী মনে মনে প্রার্থনা করলো কাল অবধি যেন আকাশের মুখ ভার না হয়। এখনকার মতো রৌদ্রোজ্জ্বল ঝলমলে পরিবেশ থাকে যেন। গ্রামের বৃষ্টি কবিতা সাহিত্যে ভালো লাগে। শহর থেকে ডিউটি করতে এসে পাঁকে পা পড়লে, এবং বৃষ্টিতে কাপড় ভিজলে রোম্যান্টিসিজ্ম সব জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাবে।

কিছুক্ষণ পর পুলিশের টিম রেকি করে ফিরে এল। তাদের থেকে গ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলো নন্দিনী। উত্তর আশানুরূপ হল না। ওই ব্লক সভাপতি নুরুল ইসলাম নিজের সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে জটলা বেঁধেছে। কোনো ঘোঁট পাকানোর তালে রয়েছে বলে পুলিশের অনুমান। সতর্ক থাকতে হবে।

নন্দিনী এই কথায় বিন্দুমাত্র আর ভয় না পেয়ে খুব দৃপ্ত কণ্ঠে পুলিশকর্মীদের আদেশ দিল কোনোভাবেই কোনো রাজনৈতিক নেতা যেন ভোটারদের ভয় দেখিয়ে প্রভাবিত করতে না পারে। ম্যামের এই আগ্রাসী মনোভাব দেখে পুলিশকর্মীদের মনোবলও বেড়ে গেল। তাদের মনে নন্দিনী ম্যাডামকে নিয়ে শ্রদ্ধা জন্মালো। এতক্ষণ যেই নন্দিনী ম্যাডামকে মেয়ে বলে তারা দুর্বল ভাবছিল, সুন্দরী হওয়ার দরুন পিঠ পিছনে তাকে জাহাঙ্গীর স্যারের সাথে জড়িয়ে নানান কাল্পনিক রসালো গল্প ফাঁদছিল, সেই তারাই ম্যাডামের সামনে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে একসুরে "ইয়েস ম্যাম" বলে স্যালুট জানালো!

নন্দিনী চাইছিল এক্সট্রা ফোর্সের জন্য সদরের কন্ট্রোল অফিসে আবেদন করতে। কিন্তু পুলিশকর্মীর মধ্যে একজন তাকে বললো, পঞ্চায়েত নির্বাচন বলে কেন্দ্রীয় বাহিনী পর্যাপ্ত না থাকার দরুন নিরাপত্তা রক্ষীর অভাব প্রায় প্রতি বুথেই হবে। সুতরাং কন্ট্রোল অফিসে বললেও রিইনফোর্সমেন্ট পাওয়া যাবেনা। তাই তিনি যেন বুথে উপস্থিত পুলিশকর্মীদের উপরই ভরসা রাখে।

নন্দিনী তাও কন্ট্রোল অফিসে ফোন করে জানিয়ে রাখলো গ্রামের বর্তমান অন্তর্নিহিত অবস্থার কথা, যাতে এমার্জেন্সির সময় এক্সট্রা ফোর্স চাইলেই পাওয়া যায়।

লাঞ্চের সময় হয়ে আসলো। রিংকু নিজের রিক্সা করে আলির দোকান থেকে বিরিয়ানির প্যাকেট পার্সেল করে নিয়ে এসছিল। নন্দিনী সচরাচর রেড মিট খেতে পছন্দ করেনা। তাই মটনের বদলে সে চিকেন বিরিয়ানি অর্ডার দিয়েছিল। সুস্মিতাও তার বান্ধবীর দেখা দেখি চিকেন বিরিয়ানি আনতে বলেছিল। আর বাকিদের জন্য ছিল আলির দোকানের রেওয়াজি খাসির স্পেশাল এ-ওয়ান মটন বিরিয়ানি!

খাবার পাশের রুমে সার্ভ করার ব্যবস্থা হয়েছে। টিচার্স রুম থেকে একে একে সবাই বেরিয়ে পাশের ঘরে যাচ্ছিল। নন্দিনীও যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। কিন্তু জাহাঙ্গীরের কোনো হেলদোল ছিলনা। সে চুপচাপ চেয়ারে বসে ছিল। নন্দিনীর তা দেখে একটু অদ্ভুত লাগলো। একবার ভাবলো ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞেস করবে কিনা, কখন খেতে যাবে? পরক্ষণে ভাবলো শুধু শুধু অপ্রয়োজনীয় কথোপকথনের দরকার নেই। কথায় কথা বাড়বে। তাছাড়া সে তো শুনেছে পাশের ঘরে রিংকু আর রমেন দা মিলে খাবার সার্ভ করছে সবাইকে। খিদে পেলে আপনিই আসবে। নন্দিনীর অহেতুক নাক গলানোর তো দরকার নেই। এইভেবে নন্দিনী রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। রইলো পড়ে শুধু জাহাঙ্গীর।

জাহাঙ্গীর খেয়াল করলো নন্দিনী ম্যাডাম ফোনটা ফেলে গেছেন। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। কেউ আসার আগে ঝট করে ফোনটা সরিয়ে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নন্দিনী টের পাবে, ফোনটা সে ফেলে এসছে। তখন আবার ফিরবে টিচার্স রুমে। সেই অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে ওঁত পেতে বসে রইলো জাহাঙ্গীর।

ঠিক সেইমতো নন্দিনীর হঠাৎ খেয়াল হল ফোনটা সে নিয়ে আসেনি। টিচার্স রুমেই ফেলে এসছে। তা নিতে আবার গেল। দেখলো জাহাঙ্গীর সেই তখন থেকে চুপচাপ এক কোণায় চেয়ারে বসে আছে। নন্দিনী নিজের বসার জায়গায় ফোনটা খুঁজছিল। কিন্তু আশ্চর্য ভাবে ফোনটা সেখানে ছিলনা! তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাচ্ছিল না। অবশেষে জাহাঙ্গীর নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠলো। নন্দিনীর দিকে এগোতে থাকলো।

জাহাঙ্গীরকে এভাবে হঠাৎ উঠে আসতে দেখে নন্দিনী কিছুটা ঘাবড়ে গেল। রুমে কেউ নেই। কোনো অন্যায় সুযোগ নেবে না তো?

নন্দিনী চারদিকটা ভালো করে তাকালো। সত্যিই ঘরে সে এবং জাহাঙ্গীর ব্যতীত আর কেউ উপস্থিত নেই। ঘরে তো কেউ নেই-ই, উপরন্তু দরজার বাইরেও এমন কেউ নেই, যার উপস্থিতি জাহাঙ্গীরের কদম নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। টিচার্স রুমে তখন কেবল দুটি মানুষ, জাহাঙ্গীর ও নন্দিনী।

নন্দিনী ফের বাইরের দিকে চেয়ে দেখলো। নাহঃ! সত্যিই সেইমুহূর্তে সেই জায়গা দিয়ে এমন কেউ যাচ্ছেনা যাকে দেখে জাহাঙ্গীর সাবধান হয়ে যাবে। একটাই বাঁচোয়া, রুমের দরজাটা খোলা। ফলে কারোর হঠাৎ আগমনের শঙ্কা নিশ্চই জাহাঙ্গীরের মধ্যেও বিদ্যমান! সুতরাং তার এমন কোনো দুঃসাহসী উদ্যোগ নেওয়া উচিত হবেনা যা তাকে বিপাকে ফেলতে পারে! সেই ভয় নিশ্চই জাহাঙ্গীরের মধ্যে অবশিষ্ট আছে?

কিন্তু কোথায় কি..... সে ওসবের তোয়াক্কাই করেনা। নন্দিনীর বারবার দরজার দিকে তাকানোতে জাহাঙ্গীর বুঝলো তার শিকার হয় পালাতে চাইছে নতুবা বাইরে থেকে কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই একান্ত মুহূর্তটা নষ্ট করতে চাইছে। তাই সে নন্দিনীকে চমকে দিয়ে টিচার্স রুমের দরজাটা গিয়ে বন্ধ করে দিল। তারপর আবার নন্দিনীর পানে পা বাড়ালো। বেপরোয়া ভাবে এগিয়ে যেতে লাগলো নিজের লক্ষ্যের দিকে।

জাহাঙ্গীর নন্দিনীর যত নিকটে যাচ্ছিল, তত ম্যাডামের হৃদস্পন্দন বেড়ে চলেছিল। নন্দিনী হরিণীর মতো দাঁড়িয়ে আছে হিংস্র নেকড়ের সামনে। পালাবার পথ নেই। খুব কাছে চলে এসেছে সে। মুখ দিয়ে ভগ ভগ করে সিগারেটের নেশাময় দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। নন্দিনীর গা গুলিয়ে উঠছে। নন্দিনী সিগারেট বা তামাকজাতীয় কোনো নেশার ধোঁয়া বা গন্ধ একদম সহ্য করতে পারেনা।

অনিকেতের হাজার দোষের মধ্যেও এই একটা গুণ তাকে কিছুটা হলেও স্বামী হিসেবে ভালো নম্বর দেয়। সেও আগে খুব ধূমপান করতো। বিয়ের পর বউয়ের কথায় তা যথেষ্ট কমিয়ে আনে। এখন মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে সঙ্গ দিয়ে কাউন্টারে টান মারলেও, নন্দিনীর সামনে কখনো সিগারেটে হাত দেয়না অনিকেত।

জাহাঙ্গীরের থেকে দূরে যেতে নন্দিনী দু'পা করে পিছতে লাগলো। পিছতে পিছতে অবশেষে দেওয়ালে ধাক্কা খেল। পেছোনোর আর জায়গা নেই। জাহাঙ্গীর আরো কাছে আসায় নন্দিনী দেওয়ালের সাথে একেবারে সিঁটিয়ে গেল। জাহাঙ্গীর নিজের দু'হাত নন্দিনীর দুই দিকে করে দেওয়ালে রাখলো, এমন করে যেন সে নন্দিনীকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছে, অথচ তাকে স্পর্শ করেনি।

জাহাঙ্গীরের এরূপ মনোভাব দেখে নন্দিনী প্রবলভাবে আতংকিত হয়ে পড়লো। জাহাঙ্গীরের এই উন্মাদনার ব্যাপারে সবাইকে অবগত করতে তার মন চাইছিল চিৎকার করে উঠতে। কিন্তু সে তো প্রিসাইডিং অফিসার। একজন লোকাল ইনচার্জ এভাবে তার র‍্যাগিং করছে সেটা জানাজানি হলে লোকে তার উপরই হাসবে। মেয়ে বলে ফের হেয় করবে। তাই তাকেই এই পরিস্থিতি একা হাতে সামাল দিয়ে মোকাবিলা করে বেরিয়ে আসতে হবে।

জাহাঙ্গীরের দিকে চেয়ে দেখলো, ছয় ফিট লম্বা হাট্টাগোট্টা দানবাকৃতি লোকটা তার মতো ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির কোমল শরীরের সামনে দন্ডায়মান হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে!

নন্দিনীকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জাহাঙ্গীর বললো, "আপনি খালি আমার থেকে দূরে সরে সরে থাকেন কেন? আমি কোথায় আপনার সাহায্য করতে মুখিয়ে আছি, আর আপনি সবসময়ে আমার থেকে গা বাঁচিয়ে চলছেন!"

জাহাঙ্গীরের কথা ছিল আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ। একটা ডোন্ট কেয়ার অ্যাটিটিউড! তার এলাকায় দাঁড়িয়ে কেউ তাকে কিচ্ছু বলতে পারবেনা গোছের মনোভাব।

"আমি থুড়ি আপনাকে খেয়ে ফেলবো! এত ভয় পাচ্ছেন কেন?", নন্দিনীর নীরবতা ভাঙতে জাহাঙ্গীর আবার বলে উঠলো।

নন্দিনী নিজের সকল সাহস একত্রিত করে জাহাঙ্গীরের চোখের দিকে তাকালো। ভাবলো আত্মবিশ্বাসের সাথে চোখে চোখ রাখলে জাহাঙ্গীর হয়তো একটু সমঝে যাবে, তাকে দূর্বল ভাববে না। কিন্তু জাহাঙ্গীর মিঞা তো তার এই দুই নয়নে ডুবে যেতে চায়।

তাই উল্টে ঘোরাচ্ছন্ন চোখে সে নন্দিনীর দিকে চেয়ে রইলো। নন্দিনী জাহাঙ্গীরের চোখের ভাষা বেশ ভালোই বুঝতে পারছিল, কিন্তু কোনো কল্পনাপ্রসূত ভাবনাকেই এন্টারটেইন করলো না।

জাহাঙ্গীর ফের বলে উঠলো, "এই গ্রামে আপনি আমার অতিথি। আপনার যত্ন করা আমার পরম কর্তব্য। চিন্তা করবেন না, বিনা অনুমতিতে আমি আপনার সাথে এমন কিচ্ছু করবো না যাতে আপনাকে কোনো অস্বস্তিতে পড়তে হয়।"

এই কথা শুনে নন্দিনী একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নন্দিনী চেষ্টা করলো একটা সৌজন্যের হালকা হাসি দেওয়ার। কিন্তু স্নায়বিক দুর্বলাবস্থার চাপে তার চোয়াল এতটাই শক্ত হয়ে গেছিল যে তখনকার মতো ঠোঁট চওড়া করে সৌজন্যের হাসিটুকুও আর নন্দিনীর মুখে ফুটে উঠলো না।

নন্দিনী দেখলো জাহাঙ্গীরের চোখ দুটোর নজর তার চোখ থেকে নেমে এসে সেই শক্ত হয়ে আসা চোয়ালের উপরিভাগে উপস্থিত ঠোঁটের উপর গিয়ে পড়ছে। ঠোঁটের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে জাহাঙ্গীর বললো, "এটা ঠিক যে আমি আপনার অনুমতি ছাড়া একটা কদমও আগে বাড়াবো না। তবে যদি আপনি এই অধমের উপর কৃপা করেন তাহলে আমাদের মধ্যে অনেক কিছুই হতে পারে....."

নন্দিনীর বুঝতে সময় লাগলো না জাহাঙ্গীর ঠিক কি মিন করতে চাইছে!..

লজ্জায়, অপমানে তার মাথায় আগুন চড়ে বসলো। আর কিচ্ছু না ভেবে কষিয়ে একটা চড় বসালো জাহাঙ্গীরের গালে, "ঠাঁসসস্স!!"

জাহাঙ্গীর হতবাক! কিছু বুঝে ওঠার আগে আরো একটা সজোরে চড় এসে বসলো অপর গালে! সেই তীব্রতায় জাহাঙ্গীর ছিটকে গিয়ে পিছিয়ে পড়লো। সেই ফাঁকে নন্দিনী সটান দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। ফিরে তাকালোও না একবারো।