ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামী পর্ব ১৭

Cancer Affected Husband 17

সত্যিই রবির কোনো তুলনা হয়না! মনটা যেন মোমের মতো গলে গেল! টেস্ট করে দেখলো টোস্ট ও টি দুটোই বেশ ভালো হয়েছে, মন থেকে বানালে যা হয়!

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: অরুণ রবি ও মনীষা - ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামীর আত্মত্যাগের গল্প

প্রকাশের সময়:29 Sep 2026

আগের পর্ব: ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামী পর্ব ১৬

রবি ক্লান্ত তৃপ্ত হয়ে বাথরুমের মেঝেতে শুয়েই চোখ বুজলো। মনীষা তাকে ডিস্টার্ব করলো না। না হোক নিজের রাগমোচন। পরে নাহয় কখন... যাক! ভেবে মনীষা বাথরুমের মেঝে ছেড়ে উঠলো। কল থেকে তখনো টুপ্ টাপ্ বিন্দু বিন্দু জল ভরা বালতিতে পড়ে যাচ্ছিল। মনীষা নবটা ভালো ভাবে এঁটে দিল। এখন আর প্রতিফলনের কাজ নেই। খেলা শেষ, আপাতত।

দরজা খুলে নগ্নাবস্থায় বাইরে বেরোলো। হ্যাঙারে টাঙানো গামছা নিয়ে সারা গা মুছলো। তারপর ওই অবস্থায় রান্নাঘরে গিয়ে ঈষৎ উষ্ণ জল গরম করে তা দিয়ে বার কতক গার্গল করলো। বেসিনে মাউথওয়াশ মুখে নিয়ে ভেতরটা ভালো ভাবে কুলকুচি করে ফেললো। বমি পাওয়ার সকল সম্ভাবনা নির্মূল করতে রান্নাঘরের মিটসেফ থেকে একটু মুখশুদ্ধি বার করেও খেল।

ঘরে গিয়ে দেখে মেঝেতে ছেঁড়া সায়া ব্লাউজ, সাথে প্যান্টি শাড়ি সব এলোমেলো হয়ে পড়ে রয়েছে। আগে কাবার্ড থেকে একটা নাইটি বের করে পরলো। মেঝেতে পড়ে থাকা তার আর রবির সকল বস্ত্র এক এক করে কুড়িয়ে তা ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে এল।

পরীর ঘরে যাওয়ার আগে রবির কথা চিন্তা করে একটা চাদর নিয়ে বাথরুমে রবির উপর চড়িয়ে দিল। তারপর পরীর ঘরে গিয়ে মেয়ের পাশে শুয়ে তাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙে রবি বাথরুমের ভেজা মেঝেতে শায়িত অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করলো। নগ্ন গায়ে চাদর মেলা। ভেবে ভালো লাগলো মনীষা গতরাতে তার জন্য চাদর এনে দিয়েছে। সে উঠে বসলো। বালতির জল শরীরে ঢেলে গা-টা একটি বার ধুয়ে নিল। চাদরটা দিয়ে কোনোমতে গা মুছে সেটাকেই লুঙ্গি বানিয়ে কোমরে জড়িয়ে বেরিয়ে এল।

মা-মেয়ে তখনো ঘুমোচ্ছে। রবি নিজের ঘরে গিয়ে জামাকাপড় পরে নিল। চাদরটা ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে রান্নাঘরে পৌঁছে মনীষা ও পরীর জন্য জলখাবারের ব্যবস্থা করতে লাগলো।

রবি আজ নিজের হাতে পরীর জন্য স্পেশাল ব্রেকফাস্ট বানাবে। গতরাতে মেয়েটার সাথে যথেচ্ছ দুর্ব্যবহার করেছে। শিশুমনে তার প্রভাব পড়তে দেওয়া যাবেনা। এইভেবে সে আজ স্থির করেছে পরীর মন জয় করার।

পরীর ফেভারিট মিল্ক শেক এবং সাথে নরম ব্রাউনি বানিয়ে ভালোমতো ট্ৰে তে সাজিয়ে রবি হাজির সেই ঘরে, যেখানে পরী তার মায়ের সাথে সুখনিদ্রায় নিমজ্জিত। ট্ৰে-টা পাশের টেবিলে রেখে রবি দুজনকেই ঘুম থেকে তুলতে লাগলো। প্রথমে মনীষার ঘুম ভাঙলো। মনীষা দেখলো রবি পরীর জন্য সুন্দর করে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে নিয়ে এসছে, এবং তাকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে আদর করে মেয়েটার ঘুম ভাঙাচ্ছে।

চোখ কচলাতে কচলাতে পরী ঘুম থেকে উঠলো। রবি আংকেলকে দেখে কিছুটা গুটিয়ে গেল। মনীষা ও রবি উভয় তার কারণ জানে। রবি তাও হার মানলো না। খোলাখুলি ভাবে পরীকে জিজ্ঞেস করলো, "কালকের ব্যাপারটা নিয়ে আপসেট আছো পরী মা?"

পরী মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো। রবি আলতো ভাবে মাথায় স্পর্শ করে আবার জিজ্ঞেস করলো, "কি হল, বলো?"

"আমি.. জানি তোমরা খেলছিলে...."

"খেলছিলাম? মানে?"

মনীষা তখন ওদের মাঝে ইন্টারভিন করে রবিকে সবটা বুঝিয়ে বললো, কিভাবে অরুণ পরীকে নিজের মতো করে সবকিছু বুঝিয়েছে। আসলে সেদিন রাতে পরীর ঘুম ভেঙে গেছিল তাদের শীৎকারে। পরী আবার জেদ ধরেছিল মাকে দেখার, তখন অরুণ পরীকে বুঝিয়ে বলে যে মা রবি আংকেলের সাথে একটা খেলা খেলছে যেখানে যে যত বেশি চিৎকার করবে সে হবে বিজয়ী।..

মনীষা রবিকে বুঝিয়ে সবটা বলছিলই কি তখুনি পরী মাঝখান থেকে বলে উঠলো, "বাবা আরো বলেছে যে এই খেলা খেলে একদিন বাবা আর মা আমাকে স্বপ্নপুরী থেকে নিয়ে এসছিল, আর তোমরাও নাকি আমার মতো আরেকটা ছোট বেবি নিয়ে আসবে, যাকে আমায় দেখে রাখতে হবে.."

রবি পরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, "তাই নাকি সোনা, বাবা এরকম বলেছে?.."

"হ্যাঁ.... তো...."

"তাহলে তো পরীকে চটপট ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে স্ট্রং হয়ে উঠতে হবে নাহলে বড় দিদি হয়ে দায়িত্ব সামলাবে কি করে?..."

রবির এই কথা শুনে মনীষা একটু লজ্জা পেল। রবি ও পরীকে নিজেদের মধ্যে সব মনোমালিন্য ভুলে গিয়ে একসাথে একই প্লেটে ব্রাউনি শেয়ার করে খেতে দেখে প্রাণটাও জুড়িয়ে গেল মনীষার। দু' চোখ ভরে এই দৃশ্য উপভোগ করছিল সে। মনে মনে অরুণকে ধন্যবাদ দিল, ভবিষ্যতে তাঁর অবর্তমানে রবির মতো একটা শক্ত খুঁটি তাদের কাছে উপহার হিসেবে রেখে দিয়ে যাচ্ছে বলে।

মনীষা; পরী ও তার নতুন বাবাকে ঘরে রেখে রান্নাঘরে এসে দেখলো, রবি তার জন্যও চা, ডিম্ টোস্ট সব বানিয়ে রেখেছে। সত্যিই রবির কোনো তুলনা হয়না! মনটা যেন মোমের মতো গলে গেল! টেস্ট করে দেখলো টোস্ট ও টি দুটোই বেশ ভালো হয়েছে, মন থেকে বানালে যা হয়!

হঠাৎ একটা ফোনে সারা বাড়ি গমগম করে উঠলো। রবি পরীকে রেখে ডাইনিং রুমে এসে কলটা রিসিভ করলো।

হাসপাতাল থেকে ফোন। রবি তুলতেই দুঃসংবাদ কানে আসলো। পেশেন্টের অবস্থা সংকটজনক। সকাল থেকে হঠাৎ খুব বৃদিং প্রবলেম শুরু হয়েছে মিস্টার রায়ের। এক্ষুনি হসপিটালে আসার নির্দেশ পেশেন্ট পার্টি-কে।

মনীষাকে খবরটা জানাতে কেঁপে উঠে হাতের টোস্ট হল ভূ-পতিত। ইমার্জেন্সি সিচুয়েশন বলে পরীকে নিয়ে মনীষা ও রবি দুজনেই ছুটলো হাসপাতাল। সেখানে গিয়ে দেখে অরুণকে আইসিউ থেকে ভেন্টিলেশনে শিফট করেছে, লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। বাঁচার আশা ক্ষীণ, একেবারে নেই বললেই চলে। কাল সারারাত নাকি পেশেন্ট কোনো অজানা কারণে ঘুমোতে পারেনি। হয়তো তার মন অশনি সংকেত দিয়েছিল জীবনের আগে ভালোবাসার সঙ্গ তাকে ছেড়ে দেওয়ার। সেটা অবশ্য ভুলও ছিলনা।

ডাক্তারের কথা শুনে মনীষা বসে পড়লো। সাথে মনটাও। জানতো এইদিন একদিন আসবে তবে তা এত তাড়াতাড়ি, সেটা ভাবেনি। সেই মুহূর্তে রবি শান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলো না, জানে তা হবে বৃথা। বরং তার মনোযোগ ছিল পরীকে সামলানোর।

দুপুরের দিকে তারা বাড়ি ফিরলো। অরুণের প্রাণ তখনো রয়েছে। মনীষা মুখে কিছু তুললো না। রবি দাঁতে কাটার মতোই যেমন তেমন করে লাঞ্চ সারলো। তার আগে পরীকে সে খাইয়ে দিল। এখন থেকে মনীষার সাথে সাথে পরীর দায়িত্বও তার।

বিকেলবেলা রবি একা গেল হাসপাতালে। দেখে আসলো অরুণকে। জানেনা এটাই অরুণকে জীবিত অবস্থায় শেষ দেখা কিনা। মনীষা যেতে চাইছিল তবু ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়িতে রেখে এসেছিল। সারাটা দিন মেয়েটা কেঁদে কেঁদে একসা হয়েছে। সি নিড সাম রেস্ট।

রবি ডাক্তারের সাথে আবার কথা বললো। কোনো আশার বাণী পেল না। বাড়ি ফিরে সেই নিরাশার কথাই ব্যক্ত করলো মনীষাকে, এবং মনটা শক্ত করতে বললো। মনীষার নতুন করে আর কান্না পেল না। চোখের জল শুকিয়ে গ্যাছে, না চাইতেও মেনে নিয়েছে ভবিতব্য-কে। এখন শুধু অপেক্ষা, সেই দুঃসংবাদ আসার।

রাতে রবি বাইরে থেকে খাবার আনিয়েছিল। তারও ইচ্ছে করছিল না খাবার বানানোর। শুধু পরীর খাবারটা বানিয়ে নিয়ে সময়মতো তাকে খাইয়ে দিয়েছিল। মনীষাও বাচ্চাদের মতো জেদ ধরেছিল খাবো না বলে। রবি অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে নিজের হাতে অল্প কিছু মুখে তুলে দিল। সাথে একই পাতে নিজেও খেল। সকালে পরীর সাথে ব্রেকফাস্ট শেয়ার করে খেয়েছে, রাতে মনীষার সাথে ডিনার। এতকিছুর মধ্যেও এই বিষয়টা মনীষার ভাবনা এড়ায়নি।

তারা দুজন কঠিন সত্যিটা মেনে নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য এখন পরীকে সামলানো। কিভাবে তাকে বোঝাবে তার বাবার চির নির্গমনের বিষয়? শিশু মন যেন কোনো শক্ না পায়!

রবির মনে পড়লো সকালে ব্রেকফাস্টের সময় পরীর কথাগুলো। মনীষা চলে যাবার পর বেশ কিছুক্ষণ রবি ও পরী একান্তে কথা বলেছিল। তারই মাঝে রবি জেনে নিয়েছিল অরুণ তাকে কি কি বলেছে! সে জেনেছে অরুণ তার মেয়েকে বলেছে কয়েকদিন পর অরুণ স্বপ্নপুরীতে চলে যাবে, তারপর রবিকেই নাকি বাবা বলে ডাকতে হবে।

স্বপ্নপুরীর কথা মাথায় আসতেই রবি গেল পরীর কাছে। পুতুল নিয়ে তখন আপন মনে খেলছিল সে। খেলনা পুতুলগুলো সরিয়ে রবি বিছানায় পরীর কাছে এসে বসলো। মনীষাও পাশাপাশি ছিল।

পরীকে কাছে টেনে এনে রবি বললো, "পরী সোনা, মনে আছে তোমার বাবা তোমাকে কি বলেছিল?"

পরী মুখে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললো, "কি?"

"ওই যে স্বপ্নপুরী নিয়ে.. আজকে সকালেই তো বললে তোমার বাবা নাকি বলেছে সে কিছুদিনের মধ্যে স্বপ্নপুরীতে চলে যাবে।...."

"ওহঃ, হ্যা.. বলেছে তো.. এটাও বলেছে যে আমি চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে প্রে করলেই বাবা আমাকে দেখা দিয়ে যাবে...."

কথাটা শুনে মনীষা নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না। তা দেখে পরী তার মা-কে জিজ্ঞেস করলো সে কাঁদছে কেন? রবি পরীকে বললো তার মা তার মতো স্ট্রং নয়, তাই কথায় কথায় কেঁদে ফেলে। এখন থেকে পরীকেই দায়িত্ব নিয়ে সামলে রাখতে হবে তার মা-কে।

পরী আবার কারণ জিজ্ঞেস করায় রবি এবার খোলসা করে বললো, "দেখো পরী মা, তোমার বাবার যে এবার স্বপ্নপুরীতে যাওয়ার সময় হয়ে এসছে। তাই তোমাকেই তোমার মা-কে সামলে রাখতে হবে, তুমি না খুব স্ট্রং!"

"বাবা এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে?"

এবার রবিরও আঁখি ভরে এল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, "হ্যাঁ, সোনা। তবে চিন্তা করছো কেন, তোমাকে তো বাবা বলেছে, আকাশের দিকে চোখ বুজে প্রে করলেই বাবা তোমায় দেখা দিয়ে যাবে।"

"তাহলে কি এখন থেকে তোমাকে বাবা বলে ডাকতে হবে?"

"সেটা তোমার ইচ্ছে। তুমি আংকেল বলেও ডাকতে পারো, আমি তাও তোমাকে খুব ভালোবাসবো।.."

"সত্যি?"

"সত্যি সত্যি সত্যি... তিন সত্যি...", বলেই পরীকে জড়িয়ে ধরলো রবি। মনীষা নিজের কান্না থামাতে না পেরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ডিনার হয়েগেছিল। তাই রবি সবটা তার মতো করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পরীকে ঘুম পাড়াতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমে ঢলেও পড়লো পরী সোনা। ঘুমের ডিস্টার্ব যাতে নাহয় তার জন্য বাইরে থেকে দরজাটা ভালোমতো ভিজিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে এল, যেখানে মনীষা ক্রমাগত ক্রন্দনরত।

"তুমি চাইলে পরীর সাথে ঘুমোতে পারো.."

মনীষা মুখ তুলে রবির দিকে চাইলো, "তুমিও আমাকে নিজের জীবন থেকে বের করে দেবে?...."

শুনেই রবি দৌড়ে গিয়ে মনীষাকে জড়িয়ে ধরলো, "এমাঃ ছিঃ ছিঃ! আমি ওইভাবে বলতে চাইনি সোনা। আমি ভাবলাম...."

মনীষা রবির ঠোঁটে হাত রেখে বললো, "আর বেশি ভেবো না, এখন আমি শুধু তোমার...." বলে দূর্বল চিত্তে মনীষা নিজের মাথা রবির বুকে রাখলো। রবিও সাদরে মনীষাকে গ্রহণ করে নিল।

"কালকের অসম্পূর্ণ বন্য প্রেম আজ শেখাবে না?"

"আজ..??.."

"হ্যাঁ, আজই.. আমি আর এই কষ্ট নিতে পারছি না। তোমার সান্নিধ্যে সকল দুঃখ ভুলে থাকতে চাই।.. যার যাবার সে যাবেই, তাকে আমি আর বেঁধে রাখতে পারবো না। এবার নতুন দড়ি আনতে হবে তোমায় আমার কাছে বেঁধে রাখতে...."

রবির মুখ থেকে একটা হালকা প্রসন্নতার হাসি বেরিয়ে এল। আঁকড়ে ধরলো তার মনীষাকে। হাসপাতালে অরুণ জীবনের শেষ কয়েকটা শ্বাস নিচ্ছে, আর বাড়িতে তার মনীষা প্রস্তুত হচ্ছে নতুন পুরুষকে নিজের সবটা বিলিয়ে দিতে।....