এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ৮

A Little Open Sky 8

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: নন্দিনী ও জাহাঙ্গীরের গল্প - এক মুঠো খোলা আকাশ

প্রকাশের সময়:14 Oct 2026

আগের পর্ব: এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ৭

গোটা স্কুল বিল্ডিং প্রায় অন্ধকারাচ্ছন। ভেতরে কয়েকটা বাল্ব জ্বলছে বটে, তবে তা সারা স্কুল ক্যাম্পাসে প্রভা ছড়াতে ব্যর্থ। নন্দিনী টিচার্স রুমে টেবিলে মাথা নিচু করে বসেছিল। বারবার জাহাঙ্গীরের বলা শেষ কয়েকটা কথা কানে বাজছিল -- "এতটা শিওর হয়ে কিভাবে বলছেন? অভিজ্ঞতা আছে নাকি? মানে আপনার স্বামীও কি আপনার সময়....."

নন্দিনী অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালীন অনিকেত কি কিছু ঘটিয়েছিল? যা অবৈধ? ব্যাভিচারিতা স্বরূপ!..

উত্তর আংশিক ইতিবাচক।....

নন্দিনী তখন প্রায় পাঁচ মাসের গর্ভবতী ঠিক যেমন এখন জাহাঙ্গীরের বউ, ছয় মাসের। নিমি পেটে এসছে। অনিকেতের ব্যাংকে নতুন এক মেয়ে ক্লার্ক হিসেবে জয়েন করেছিল। দেখতে সুন্দরী, নাম ইতি সাহা। যেমন নাম তেমনই তার কাম। ঠিক সময়ে নন্দিনী হাল ধরে অনিকেতের রাশটা না টানলে সত্যিই ইতি তাদের সম্পর্কে ইতি টেনে দিত।

প্রথম প্রথম নন্দিনী বিষয়টিকে খুব একটা আমল দেয়নি। ইতিকে অনিকেতের আর চার পাঁচজন কলিগের মতোই দেখতো। ধীরে ধীরে ইতির বাড়িতে আনাগোনা ক্রমশ ঘন ও নিয়মিত হতে লাগলো। নন্দিনী তখন ম্যাটার্নাল লীভে। প্রেগনেন্সিতে কিছু কমপ্লিকেশন দেখা দেওয়ায় ডাক্তার তাকে কমপ্লিট বেডরেস্টে থাকতে বলেছিল।

কাজের নামে নন্দিনীকে আড়ালে রেখে পাশের ঘরে চলতো অনিকেত ও ইতির গল্পগুজব। যা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হত। নন্দিনীর শাশুড়ির চোখ তা এড়ায়নি। বাড়িতে নতুন এবং অবৈধ সম্পর্কের আঁচ তিনিই প্রথম পেয়েছিলেন। তাই সময় থাকতে নিজের বউমাকে সাবধান করে দিতে পেরেছিলেন। ভাগ্যিস!.. যতই সে বউমার উপর বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তুষ্ট থাকুক না কেন, দিনের শেষে নন্দিনীই তাঁর বাড়ির বউ। বাড়ির বউয়ের মর্যাদা ও অগ্রাধিকার অন্য যেকোনো বাইরের মেয়ের থেকে অনেক বেশি।

নাহঃ, অনিকেতের সাথে ইতির সম্পর্কটি শারীরিক অবধি পৌঁছয়নি। তবে স্বামীর থেকে পাওয়া ইমোশন্যাল চিটিংও একটি বিবাহিতা নারীর জন্য সমান বেদনাদায়ক।

সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে না পেয়ে ইতিও ট্রান্সফার নিয়ে দূরে অন্য এক ব্রাঞ্চে চলে যায়। পরে খবর পাওয়া যায় তার বিয়ে হয়ে গেছে এক ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের সাথে। প্রথম দিকে অনিকেত ইতিকে ভুলতে না পারলেও, পরবর্তীতে নিমি কোলে আসায় এবং সময়ের সাথে সাথে ছেলে, স্বামী, তারপর বাবা হিসেবে আরো দায়িত্ব কাঁধে চাপায় অনিকেতের মন ও স্মৃতির পাতা থেকে ইতি একেবারে মুছে যায়। [[image_1]]

টেবিলের উপর মাথা রেখে পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে নন্দিনী আনমনা হয়ে পড়েছিল। দূর থেকে নন্দিনীকে এভাবে ভাবুক হয়ে বসে থাকতে দেখে জাহাঙ্গীর নতুন করে আর কোনো গোল বাঁধালো না। এখনো পুরো রাত পড়ে রয়েছে। সুস্মিতা দেবীর মতিগতি দেখে বোঝা গেছে সে আজ আর ফিরছে না। বয়ফ্রেন্ড ফিরতে দেবেনা। লোকাল শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীরাও বাড়ির পথ নিয়েছে। আজকের মতো যেহেতু তাদের কাজ সব শেষ।

নন্দিনী যখন বিশ্রাম নিচ্ছিল তখন তার অগোচরে জাহাঙ্গীর নিজের সর্দারি ফলিয়ে পুলিশ বাহিনীর অর্ধেক কর্মীদের থানায় ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। বাকি কর্মীর যারা নির্বাচনের প্রটোকলের জন্য রয়ে গেছে, তাদেরকেও স্কুল প্রেমিসেস থেকে দূরে নির্বাচনের জন্য তৈরি অস্থায়ী ছাউনিতে ঘাঁটি গাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন লোকাল ইনচার্জ। নিয়মমাফিক সেই পুলিশ ছাউনি ভোটিং কেন্দ্রের পাঁচশো মিটার রেঞ্জের মধ্যে তৈরি, যেখানে আজ রাত পাহারা দেবে অবশিষ্ট পুলিশ বাহিনী।

রয়েছে পড়ে শুধু এই মধ্যবয়সী কৌশিক মল্লিক। এঁনাকে ম্যানেজ করে সরিয়ে দিতে পারলেই গোল পোস্ট ফাঁকা! না কোনো গোলকিপার, না কোনো ডিফেন্ডার, আর না থাকবে ফাউল ধরার জন্য কোনো রেফারি। শুধু জাহাঙ্গীর আর নন্দিনীর মধ্যে খেলা হবে, ফাঁকা মাঠে। ফুটবল নাকি ছোঁয়াছুঁয়ি? [[image_2]]

কৌশিকবাবু তখন স্কুলের লনে পায়চারি করছিলেন। ওঁনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে আজ রাতটা এই ধ্যাধধেড়ে হাকিমপুরে কাটানোর কোনো ইচ্ছে নেই। পালানোর ফাঁকতাল খুঁজছেন। তাই পথের শেষ কাঁটাটা উপড়ে ফেলতে জাহাঙ্গীর কৌশিক বাবুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, "আপনার কি কাছেপিঠে কোনো আত্মীয়ের বাড়ি রয়েছে?"

"হ্যাঁ, ওই বসিরহাট সদরে। আমার শালাবাবুর কাকা-শশুরের।"

"ওহঃ বাঃবাঃ! সে তো অনেক দূর সম্পর্ক হয়ে গেল।"

"নাঃ, তবে আমার সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে।...."

"কিছু মনে করবেন না, আপনাকে দেখে লাগছে এখানে রাত কাটানোর মন নেই। শ্যালকের শশুরবাড়ির আপ্যায়ন পাওয়ার অদম্য আকুতি রয়েছে!"

"কি যে বলেন আপনিও?"

"ঠিক কিনা বলুন..."

"আসলে জাহাঙ্গীর বাবু, আপনাদের এই গ্রামটা সত্যি খুব সুন্দর, কিন্তু...."

"কিন্তু সেরকম কোনো ফ্যাসিলিটিস নেই, তাই তো? পর্যাপ্ত আলো নেই, সিগারেটের দোকান নেই ইত্যাদি ইত্যাদি...."

"ওই আর কি বোঝেনই তো, গ্রামে থাকার খুব একটা অভ্যাস নেই। বয়স হয়েছে, বাইরের খাবার খেলে একটু আধটু অম্বল লেগেই থাকে। সেরকম তো কোনো ওষুধের দোকানও দেখছি না... তাই...."

"বুঝি বুঝি! আমি তো আজ থেকে নই, আর হাকিমপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে এই প্রথম ভোটের কেন্দ্র পড়েনি। এর আগেও যারা যারা ভোটের ডিউটি করতে শহর বা শহরাঞ্চল থেকে এসেছে তারা সবাই এই একই বাহানা দিয়ে নাক সিঁটকেছে।"

"না মানে, এটা মানতে হবে আপনাদের গ্রামটায় একটা প্রাকৃতিক শোভা রয়েছে, যা মনকে একেবারে স্নিগ্ধ করে তোলে। শুধু একটু প্রত্যন্ত এলাকায় বলে...."

"কি করবো মশাই, একে গ্রাম তার উপর সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। সরকারের কাছে আমাদের দরকার শুধু ভোটের সংখ্যায়। সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী কিনা। ভোটটা যাকে দিই, একসাথেই দিই। আর তফশিলি জাতিদের তো মানুষ বলেই গণ্য করেনা। তাই আমাদের এখানে শুধু উন্নয়ন হয়, উন্নতি নয়।...."

"বেশ বলেছেন তো কথাটা। উন্নয়ন হয়, উন্নতি নয়। সাময়িক ভাতা রয়েছে কিন্তু স্থায়ী কর্মসংস্থান নেই!"

"কারণ সরকারের কাছে আমরা quantitative community, qualitative নই। তিরিশ শতাংশ জনগোষ্ঠী হয়েও আমাদের প্রতিনিধিত্ব কোনো ক্ষেত্রেই তিন শতাংশও থাকেনা।... ছাড়ুন সেসব কথা। আসল বিষয়ে ফেরা যাক। আমি বলি কি, এক্ষুনি নন্দিনী ম্যাডামের কাছে যান। গিয়ে বলুন আপনার আত্মীয় সদরে থাকে, রাতটা সেখানে কাটাতে চান, তাই তিনি যেন আপনাকে আজকের জন্য ছুটি দিয়ে দেন।"

"বললেই কি আর ছুটি মঞ্জুর হবে? এমনিতেও ইলেকশনের আগের দিন নিযুক্ত সংশ্লিষ্ট ইলেকশন অফিসারদের ভোট কেন্দ্রেই থাকার নিয়ম।"

"তবে প্রিসাডিং অফিসার চাইলে সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। নন্দিনী ম্যাডাম ছাড় দিতে পারেন। ওঁনাকে বলবেন, আপনার শশুরবাড়ি থেকে ফোন এসেছিল, আপনার শ্যালক খুব অসুস্থ। সে বউয়ের সাথে বসিরহাট সদরে স্থিত কাকাশশুরের বাড়িতে গিয়ে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বুকে ব্যাথা উঠে এখন সে শয্যা নিয়েছে। তাই আপনি আজকে সেখানে থাকার অনুমতি চান। ম্যাডামকে আস্বস্ত করবেন যে কাল সকাল হতে না হতেই আপনি আবার ফিরে আসবেন এখানে।"

"সুস্মিতা ম্যাডামও তো নেই দেখছি। আমি যেতে চাইলে ম্যাডাম রাগ করবেন না? সুস্মিতা দেবীকে যেতে দিয়েছেন কারণ উনি ম্যাডামের ভালো বন্ধু, একই স্কুলে পড়ান, তাই স্বজনপোষণ হয়েছে। আমার বেলা একই নিয়ম খাটবে না।"

"দেখুন ম্যাডাম এখন কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে খুব অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড হয়ে আছেন। এই সুযোগ!.. সুযোগ বুঝে কথাটা পেড়ে দিন। আপনার আর্জি ঠিক মঞ্জুর হয়ে যাবে। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি যাচ্ছি আপনার সাথে। কিছু এদিক-ওদিক হলে আমি সামলে নেব।"

"যদি ছুটি পেয়েও যাই তবু কর্তব্যের দিক দিয়ে এটা গাফিলতি হবেনা? নির্বাচনের এত গুরুত্বপূর্ণ সব নথি রয়েছে, ব্যালট পেপার, ব্যালট বক্স, ভোটার লিস্ট, সবকিছু আপনি আর ম্যাডাম সামলাবেন কি করে?"

"আরে মশাই ম্যাডাম তো আগে থেকেই আমাদের দুটো টিমে ভাগ করে দিয়েছেন, একটাতে আপনি আর নন্দিনী ম্যাম, আরেকটাতে আমি আর সুস্মিতা ম্যাম। তাই আজকের জন্য দুটো টিম থেকে একজন করে থাকলেই যথেষ্ট। আপনি অত চিন্তা করছেন কেন? আমি এখানকার লোকাল লোক। বেগতিক কিছু হলে আমার এক ডাকে গোটা গ্রাম জড়ো হয়ে যাবে। ভরসা রাখুন।.. বেশি কথা না বাড়িয়ে আপনি যান তো, গিয়ে ছুটিটা নিয়ে আসুন।"

[[image_3]]

ভোলাভালা সরল মনের কৌশিক বাবু জাহাঙ্গীরের উস্কানিতে প্রভাবিত হয়ে টিচার্স রুমে গেলেন, নন্দিনীর সাথে কথা বলতে। ঢুকে দেখলেন নন্দিনী ম্যাডাম টেবিলে মাথা নামিয়ে চোখ বুজে রয়েছেন।

ম্যাডামের কাছে গিয়ে জাহাঙ্গীরের শিখিয়ে দেওয়া বুলি আউড়ে গেলেন কৌশিক বাবু।

অনিকেত ও ইতির সেই পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে ওঠা মনমরা নন্দিনী তখন অত সাত পাঁচ না ভেবে কৌশিক বাবুকে পারমিশন দিয়েও দিলেন শ্যালকের শশুরবাড়ি যাওয়ার।

নন্দিনী প্রথম থেকেই কৌশিক বাবুকে সিনিয়র বলে বাড়তি সমীহ করে এসছে। তাই তাকে মানা করা এমনিতেও সম্ভব ছিলনা, অন্তত ভদ্রতার খাতিরে। নন্দিনীর চোখে কৌশিক বাবু সুস্মিতা বা জাহাঙ্গীর অপেক্ষা অধিক পরিণত, মার্জিত ও দায়িত্ববান। তাই তাঁর যেকোনো সিদ্ধান্ত বা কথার উপর আস্থা রাখাই যায়।

কৌশিক বাবুও নন্দিনীকে বেশি ভাবার সময় না দিয়ে কেটে পড়লেন। যাওয়ার আগে জাহাঙ্গীরকে চোখ টিপে ইশারায় ধন্যবাদ দিয়ে গেলেন। জাহাঙ্গীরও সেখানে উপস্থিত। মনে তখন লাড্ডু ফুটছে! গোটা স্কুলে শুধু সে আর নন্দিনী, সারারাত! ভেবেই লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে।

জাহাঙ্গীরকে সমক্ষে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলো, "তা আপনারও কি ছুটি চাই?"