[[image_1]]
"কোথায় ছিলেন মহারানী? এতক্ষণ লাগে ফোনটা ধরতে?"
শাশুড়ির ফোনে বিকেলের ঘুম ভাঙলো নন্দিনীর।
"একটু চোখটা লেগে এসছিল..."
"হে ভগবান! আমার বাড়ির বউ কোন এক এঁদো গাঁয়ে সারারাত কাটাবে! লোকে কি বলবে? কিই দরকার বাপু, এরম ডিউটি করার?"
"মা, আমি একা কোথায়? সুস্মিতাও তো থাকবে আমার সাথে.."
"তা সেই উচ্চিংড়েটি কোথায়?"
নন্দিনীর মনে পড়লো সে তো সুস্মিতাকে অঙ্কিতের সাথে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছিল। বলেছিল সন্ধ্যের আগে ফিরে আসবে। বাইরে তাকিয়ে দেখলো বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে এসছে। সূর্য অস্তাচলে। সুস্মিতা কি এসেছে?
"কি হল বউমা? কোথায় তোমার বান্ধবী? তোমাদের যে বলেছিলাম অচেনা জায়গায় দুজনে একসাথে থাকতে!"
একদিনের জন্য সংসারের জাঁতাকল থেকে বেরিয়ে এসেও তার শান্তি নেই। এখানেও শাশুড়ি মা ফোনের ওপার থেকে হুকুম চালিয়ে যাচ্ছে!
"ও একটু বেরিয়েছে, চলে আসবে।"
সুস্মিতার তো চলে আসার কথা। নন্দিনী বিশ্রাম ঘর থেকে বেরোলো। ফোনের ওপার থেকে শাশুড়ি মায়ের আদেশ মেনে সুস্মিতাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগলো। শাশুড়িও জেদ ধরে বসেছিল, আগে বউমার কলিগের সাথে কথা বলে মনকে আস্বস্ত করবেন, তারপর ক্ষান্ত হবেন। ফোন তখনও কাটেননি।
"ওর চলে আসার কথা। হয়তো এখানেই আশেপাশে কোথাও রয়েছে। দাঁড়ান মা, খুঁজে দেখছি"
[[image_2]]
সন্ধ্যে নেমেছিল। শহরের মতো রাস্তায় লাইট নেই, অনেক দূরে দূরে এক একটা বাড়ি। জনঘনত্ব নেহাতই কম। চারদিক থম মেরে আছে। সাধেই নন্দিনীর শাশুড়ি এতটা বিচলিত হচ্ছিলনা! সে জানে এরকম গোধূলিলগ্নে অজ পাড়াগাঁয়ে কিরকম নির্জনতা বিরাজ করে। গা ছিমছিম করার মতো পরিস্থিতি হয়। আর এরকম একটা সময়ে এরকম একটা স্থানে তার বাড়ির বউ ডিউটিতে নিয়োজিত! ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে জানার বা তৎক্ষণাৎ যাওয়ার উপায়ও থাকবেনা।
নন্দিনী সুস্মিতাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ এইসময়েই তার ওকে খুব বেশি দরকার, শাশুড়িকে ঠান্ডা করতে। তবে কি সে আসেনি?
শাশুড়ি মা আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। ফোনের ওপার থেকে বকাবকি শুরু করে দিলেন। রেগেমেগে আগুন। বউমার একমাত্র সঙ্গিনী নিখোঁজ! সে এখন একা! কে দেখে রাখবে তাকে?
নন্দিনী শাশুড়িকে যতই বোঝানোর চেষ্টা করছিল, সুস্মিতা এই চলে আসবে, আর এলেই কথা বলিয়ে দেবে, ততই অনিকেতের মা আরো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠছিল। আদেশ করলো সব কাজ ফেলে সত্বর ফিরে আসতে কলকাতায়।
নন্দিনী জানে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাছাড়া একা ফিরবে কিভাবে? তাঁর ছেলে থোড়াই আসবে এখন নিতে!
শাশুড়ি যতই তাকে বিষোদ্গার করুক, তিরস্কার দিক, তার পক্ষে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হওয়া সম্ভব নয়। তাঁরা অনেক বিশ্বাস ও আস্থা রেখে নন্দিনীকে প্রিসাইডিং অফিসার বানিয়েছেন। নন্দিনীর এভাবে প্রিসাইডিং অফিসার পদে নিয়োগ সুস্মিতাকেও অবাক করে দিয়েছিল, সাথে একটু জেলাসও।
নন্দিনীর কান থেকে হঠাৎ ফোনটা নিয়ে শাশুড়ি মায়ের সাথে কথা বলতে লাগলো জাহাঙ্গীর, "কেমন আছেন মাসিমা?"
"তুমি কে হে বাছা?"
"আমি এই স্কুলের ভূগোল টিচার। আপনি মনে হয় মেয়ের জন্য অনেকটা চিন্তিত?.. কিন্তু একদম চিন্তা করবেন না। ম্যাডামের দেখভালের দায়িত্ব আমাদের সকলের। তিনি এই গ্রামের অতিথি। আর অতিথি তো নারায়ণ! আমরা হাকিমপুর গ্রামবাসী অতিথিকে মাথায় করে রাখি। তাই সুস্মিতা ম্যাডাম কখন আসবেন বা আদেও আজ ফিরবেন কিনা তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামাতে যাবেন না।"
"কেন? সে কোন এমন রাজ কাজ্জে গেছে? তার তো সাথে থাকার কথার ছিল..."
"উনি কাছে-পিঠে এক আত্মীয়ের বাড়ি গেছেন। থেকেও যেতে পারেন সেখানে। ইলেকশন তো কাল.."
"তাহলে..."
"...তবে আমরা তো আছি! লোকাল টিচার্স, পুলিশ, সকলে। আপনার মেয়ে আমাদের কড়া নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যেই রয়েছে, এবং কাল অবধি থাকবে। হাজার হোক প্রিসাইডিং অফিসার বলে কথা। আপনার তো তাকে নিয়ে গর্ব হওয়া উচিত!"
"নাহঃ, মানে একা আছে তো.. এতদূরে.. তাই আর কি...."
"কিচ্ছু হবেনা ওঁনার! আমরা গ্রামবাসিরা কিছু হতেই দেব না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, কেমন!"
একনাগাড়ে আস্বস্ত করে গেল জাহাঙ্গীর। এমনভাবে যে নন্দিনীর শাশুড়ি আর মুখে রা কাটতে পারলো না। কনভিন্স করে জাহাঙ্গীর ফোনটা নন্দিনীকে ফেরত দিল। নন্দিনী কথা বলে দেখলো তার শাশুড়ির গলা আগের চেয়ে বেশ নরম হয়েছে। বুঝতে বাকি নেই সেটা জাহাঙ্গীরের কথার জাদুতেই।
নন্দিনী আরো কিছুক্ষণ শাশুড়ির সাথে কথা বললো। নিমি, শশুরমশাই সবার খোঁজ নিল। ফোনটা কাটার পর সে প্রথমে জাহাঙ্গীরকে একটা ধন্যবাদ জানালো। পরক্ষণে চার্জ করতে লাগলো, না বলে ফোনটা হাত থেকে কেড়ে নেয়ার জন্য।
জাহাঙ্গীর যা করেছে ভালোর জন্যই তা মেনে নিয়েও নন্দিনী তাকে একটু ম্যানার্স ফলো করার নির্দেশ দিল। জাহাঙ্গীরের বারংবার এই সীমা লঙ্ঘন সে মোটেই ভালোভাবে নিচ্ছে না, সেটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিল। যদিও এবার জাহাঙ্গীর তার উপকারই করেছে। তবু অন্তত একবার নন্দিনীকে অবগত করতে পারতো ফোনটা ওভাবে নেওয়ার আগে।..
অবগত করলে কি নন্দিনী ফোনটা স্বেচ্ছায় দিত?.. নারী চরিত্র বেজায় জটিল!
"জানি ম্যাডাম, আমি একের পর এক ভুল করে যাচ্ছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার ইনটেনশন খারাপ নয়।"
"কিই? ইনটেনশন খারাপ নয়? তা দুপুর বেলায় যা করলেন, সেটা...."
"আপনি এখনো সেটা ভুলতে পারেননি?"
"আপনি মেয়ে নন, তাই বুঝবেন না.."
[[image_3]]
"ভুল হয়ে গেছে ম্যাডাম! সত্যি বলতে কি আপনার মতো সুন্দরী মেয়ে আমি আগে একটিও দেখিনি। সেই ট্রেনিং এর সময় থেকে আমি আপনার সৌন্দর্যে মুগ্ধ! আমরা গ্রামের মানুষ, শহুরেদের মতো অত ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলতে পারিনা। কাউকে ভালো লেগে গেলে ফিলিংস কন্ট্রোল করে রাখা দায়! তখন আনইনটেনশনালি এমন কিছু কথা বলে বসি যা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে খারাপ! আমার বলা কথা গুলোই যদি ইংরেজিতে সাজিয়ে বলতাম -- I am completely at your command, but if you are willing to indulge a massive admirer, then I think we could have some serious fun together.... হয়তো এটা অতটা খারাপ শোনাতো না। পাতি বাংলায় বললাম বলে মোলেস্টেশন হয়ে গেল?"
"যাই বলুন, আপনার ইঙ্গিতটা সুবিধের ছিলনা মোটেই"
"তর্কের খাতিরে আমি সেটাও মেনে নিচ্ছি, প্রস্তাবটা খুব সুরুচিপূর্ণ ছিলনা। তবে ভুল তো মানুষমাত্রই হয়, আমিও করেছি। কিন্তু তার এত বড় সাজা?"
"সাজা? কিসের সাজা? চড় মেরেছি বলে কি খুব গায়ে লেগেছে?"
"চড় মারার কথাটা বলছি না। সেই মুহূর্তে সেটা হয়তো আমি ডিসার্ভও করতাম। আমি বলছি তার চেয়েও বড় শাস্তি..."
"কি?"
"ভুল বোঝা, আমায়, সর্বক্ষণ, সব বিষয়ে।"
"বুঝলাম না.."
"..একদিকে মানছেন আপনার মাকে দায়িত্ব নিয়ে বোঝাতে পেরেছি, অপরদিকে আপনাকে না জানিয়ে ফোনটা নেয়ার জন্য বকছেনও। নিজে একজন শিক্ষিকা হয়ে সহকারী শিক্ষককে বলছেন ম্যানার্স শিখতে! এটা মানা যায় বলুন?"
"কারণ আপনি ওভাবে না জানিয়ে কান থেকে ফোনটা রীতিমতো কেড়ে নিয়েছিলেন, তাই..."
"আপনাকে জানিয়ে ফোনটা নিলে, আপনি দিতেন? নির্ঘাত প্যানিক করতেন। তখন বিষয়টা আরো ঘেঁটে যেত। কারণ ফোনের ওপারের ভদ্রমহিলা এটা দেখতে আসতো না যে কেন আপনি ঘাবড়েছেন? ফলত আপনার পক্ষে আরোই জটিল হত সবটা বোঝানো।..."
"আপনি আমার জন্য এতটা করতে গেলেন কেন?"
"আপনাকে পছন্দ করি বলে। মেনে নিতে কোনো বাঁধা নেই।"
"আমি বিবাহিতা।.."
"তাতেও তো অন্যায়ের কিছু নেই! মানুষের মন যেকোনো কারোর উপরই আসতে পারে, কারোর কি নিয়ন্ত্রণ থাকে? আপনার বান্ধবীকেই দেখছেন না?"
"আমার বান্ধবীকে দেখেছেন মানে?"
"আপনার কি মনে হয়, গ্রামে থাকি বলি আমি এতটাই বোকা? আজকে যেই ছেলেটার সাথে দুপুরে হ্যান্ডশেক করলেন, সুস্মিতা ম্যাডামকে নিতে যে এসছিল, সে যে তার স্বামী নয় তা দেখেই বেশ বোঝা যাচ্ছে। ছেলেটার বয়স বড়জোর পঁচিশ। আর আমরা সবাই ত্রিশোর্ধ্ব।"
"সুস্মিতার বিষয় কিছু জানেন? এসেছে কিনা? কোথায় আছে বা কখন আসবে?"
"নাঃ! আসেনি সে। আমাকে আলাদা করে কিছু জানিয়েও যায়নি। যা কথা বলার আপনার সাথে বলেছে। আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি, যেই ছেলেটা তাকে দুপুরে নিয়ে গেছে, সে-ই সকালে পৌঁছেও দিতে এসছিল।"
"জানি। অঙ্কিত তার নাম। বখাটে ছেলে একটা। কেন যে সুমি ওর পাল্লায় পড়লো?.."
"আমার সিক্সথ সেন্স বলছে উনি আজকে ফিরবেন না। একেবারে কাল সকালেই ডিউটিতে জয়েন করবেন। মিলিয়ে নেবেন.."
"তাহলে কি হবে? আমি এখানে একা...."
"আপনিও শুরু করলেন...? আপনার মাকে কি বললাম? আমি আছি তো নাকি।.."
"হুমঃ! তাই বলে আপনি আমাকে সুস্মিতার সাথে গুলিয়ে ফেলার একদম চেষ্টা করবেন না!"
"আমার সেই ধক্ কোথায়! আপনি যদি আমায় অ্যালাওই না করেন, তাহলে আমার মুখে বলাই সার। কাজে এমন কিছুই করবো না যাতে আমার বা এই গ্রামের নাম খারাপ হয়।"
"ঠিক আছে।.. বিশ্বাস করলাম আপনার কথা।.. বাই দা ওয়ে, যিনি ফোন করেছিলেন তিনি আমার মা নন, শাশুড়ি।"
"শাশুড়ি কি মা হয় না?"
"অনেকের হতে পারে.. আমার ক্ষেত্রে তিনি কখনো তা হয়ে উঠতে পারেননি।.. আচ্ছা, আপনার স্টেটাস কি? ম্যারেড?"
"হঠাৎ এই প্রশ্ন? যাচাই করছেন?"
"কি যাচাই করবো?"
"এই যে আমার একাকীত্বের তীব্রতা কতটা যা দিয়ে এই একাকী পরিবেশে আমার বেপরোয়া হওয়ার প্রবণতা মাপা যাবে...."
"নাহঃ! আমি অত কিছু ভেবে প্রশ্নটা করিনি। Just out of curiosity.. ছেলেদের তো দেখে বোঝা যায়না না, কে বিবাহিত কে নয়, কি হিন্দু কি মুসলিম!"
"এই কথাটা বেশ ভালো বলেছেন। But for your kind information, আমি বিবাহিত। তবে আপনি তো জানেন আমাদের জাতে চার বিয়ে জায়েজ আছে। তাই আপনার সাথে সম্পর্ক পাততে আমার কোনো বাঁধা নেই। হা হা হা হা হা!"
"খুব বাজে জোক! সবসময় গ্রামের মানুষ বলে পার পাবেন না আপনি। একজন বিবাহিতা মেয়েকে একা পেয়ে তাকে পরোক্ষভাবে দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলছেন? এটা কু-প্রস্তাব নয়? নাকি এখানেও সেই village card খেলবেন? বলবেন গ্রামের মানুষ বলে ইমোশন কন্ট্রোল করতে পারেননি? মনে রাখবেন, পরস্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ থাকা কোনো ধর্মেই জায়েজ নয়। মান্যতা নেই কোথাও, তা শহর হোক বা গ্রাম।"
জাহাঙ্গীর বুঝলো নন্দিনী অত সহজ পাত্রী নয়। খুব সমঝে কথা বলতে হবে। মাথা নিচু করে তাই বললো, "আই এম সরি ম্যাডাম!"
"ইট্স ওকে! বাই দা ওয়ে সন্তান ক'টি?"
"নেই। আসবে। বউ এখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।"
"Oh!.. Congratulations!"
"Thank you! Thank you!"
"তা সেই কারণেই বুঝি মন এখন বহির্গামী? অন্যত্র ছুঁক ছুঁক করে! ঘরে যেহেতু বউ ভালোবাসা দিতে পাচ্ছেনা, তাই তৃষ্ণার্ত কাকের মতো বাইরে পানি খুঁজছেন, তেষ্টা মেটাতে! আসলে এইসময়ে স্বামীদের মন উচাটন হয়ে ওঠে, স্ত্রীয়ের শরীর না পেয়ে।"
"এতটা শিওর হয়ে কিভাবে বলছেন? অভিজ্ঞতা আছে নাকি? মানে আপনার স্বামীও কি আপনার সময়....."
"কিই??........ নাহঃ, না না...... কিছু না...... কিচ্ছু হয়নি..... কিচ্ছু না......."
বলেই নন্দিনী অন্যমনস্ক হয়ে পিছনে ঘুরে জোরে পা চালালো। টিচার্স রুমের দিকে হাঁটা দিল। যেন কোনো এক রহস্য গোপন রাখার নিবিড় চেষ্টা তার মধ্যে। জাহাঙ্গীর বুঝতে পারলো না ঠিক কি হল নন্দিনীর? হঠাৎ আবার কিসে অফেন্ড হয়ে গেল?
হায় আল্লাহ! তুমি মেয়েমানুষকে এত জটিল কেন বানিয়েছো?? আকাশ পানে চেয়ে জাহাঙ্গীর নিজের খোদার কাছে প্রশ্ন রাখলো।