এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ৬

A Little Open Sky 6

পরকীয়ার পথ একজন পুরুষ বেছে নেয় যৌনলালসার তাড়নায়, কিন্তু এক নারী সেই পথে পা বাড়ায় মানসিক সুখ খুঁজে না পেলে।

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: নন্দিনী ও জাহাঙ্গীরের গল্প - এক মুঠো খোলা আকাশ

প্রকাশের সময়:11 Oct 2026

আগের পর্ব: এক মুঠো খোলা আকাশ পর্ব ৫

সুস্মিতার একটা কল এসছিল। তড়িঘড়ি অশ্বত্থ গাছের তলায় গিয়ে কলটা রিসিভ করলো। দূর থেকে নন্দিনী দেখলো তার বান্ধবী ফোনে কারোর সাথে কথা বলছে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল ফোনের ওপারের মানুষটা সুমন নয়। স্বামীর সাথে এত হেসে হেসে কথাই বলেনা সে। এ নির্ঘাত সেই লোফার অঙ্কিতটার কল।

"উফ্ফ্ফঃ! এই মেয়েটা দেখছি নিজের সংসারটা ভেঙেই ছাড়বে", মনে মনে ভেবে সুস্মিতার দিকে পা বাড়ালো নন্দিনী। তাকে আসতে দেখা মাত্রই সুস্মিতা চট করে ফোনটা রেখে দিল।

"কি রে? এখানে সবার আড়ালে কার সাথে কথা বলছিলিস? ওই অঙ্কিতটার সাথে?"

"সবই তো জানেন প্রিসাইডিং অফিসার ম্যাডাম, তাও কেন জিজ্ঞেস করছেন?"

"করছি কারণ তোকে সাবধান করার জন্য। তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, আমি তোর খারাপ কখনোই চাইবো না!.."

"সত্যি তুই আমাকে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবিস?"

"তোর কোনো সন্দেহ আছে?"

"আছে..."

"তাই! কেন?.."

"নাহলে বল, জাহাঙ্গীরের সাথে তোর এক্সাক্টলি কি হয়েছে?"

এখানে আপন বলতে শুধু সে-ই। তাই সুস্মিতাকে সবটা খোলসা করে বলাই যায়।

মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে সবটা খুলে বললো সুস্মিতাকে।

সবটা শুনে সুস্মিতা আন্দাজ করতে পারলো জাহাঙ্গীর ঠিক কতটা ডেসপারেট তার বান্ধবীর জন্য। একবার ভাবলো তার কি পরামর্শ দেওয়া উচিত নন্দিনীকে? জাহাঙ্গীরের কাছে যেতে উৎসাহ দেবে? নাকি তার থেকে দূরে থাকার সাবধানবাণী দেবে? তাতে জাহাঙ্গীরকে লঘু পাপে গুরু দন্ড দেওয়া হবে না তো? তাছাড়া সুস্মিতা খুব করে চায় তার মতো নন্দিনীর জীবনেও একজন প্রেমিক আসুক। সেটা জাহাঙ্গীর হলে মন্দ কি?

"কি রে, কি ভাবছিস? কিছু বল...", সুস্মিতাকে ঝাঁকিয়ে ওর ভাবনা ভাঙালো নন্দিনী।

নন্দিনীর ঝাঁকুনিতে বাস্তব চেতনায় ফিরে সে পরামর্শ দিল জাহাঙ্গীরকে ক্ষমা করে দেওয়ার, "তোর কথা শুনে যা বুঝলাম, জাহাঙ্গীরের মধ্যে অনুশোচনা কাজ করছে। ওকে একটা সুযোগ দেওয়াই যায়.."

"কিসের সুযোগ?"

"তোর বিশ্বাস জেতার।"

"ধ্যাৎ! আমার অত বিশ্বাস তাকে জিততে হবে না.."

"সেটা জাহাঙ্গীরকে বুঝতে দে, হবে কি হবে না.. তুই শুধু ওকে একটা সুযোগ করে দে। দেখবি ও কিরকম উঠে পড়ে লাগবে তোর জন্য। আই মিন তোর বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করার জন্য।.. আর তাতে তোরই সুবিধা হবে। একবার ভেবে দেখ, ও এখানকার লোকাল ইনচার্জ। তোর ওকে হাতে রাখতেই হবে। আর যখন সে নিজে থেকে তোর হাতের মুঠোয় আসতে চাইছে, তাহলে ওকে আসতে দে। ইলেকশনের এই গুমোট পরিস্থিতিতে আপাতত জাহাঙ্গীরই তোর এক মুঠো খোলা আকাশ।"

"এক মুঠো খোলা আকাশ! তার মানেটা কি?"

"সেটা না হয় নিজেই বুঝে নিবি পরে। এখন তোকে আমার সম্পর্কে কিছু কথা বলার আছে"

"বল..."

"অঙ্কিত আসবে আমাকে নিয়ে যেতে"

"মানে?", নন্দিনী যেন আকাশ থেকে পড়লো।

"বসিরহাট সদরেই অঙ্কিতের মামারবাড়ি। আমার জন্য সেইখানেই আজকে স্টে করেছে। ওখান থেকে এসে এখন আমাকে নিয়ে একটা জায়গায় যেতে চায়। আমাকে ফোন করেছিল, ও আসছে সেটা বলতেই।"

"তুই কি পাগল হয়েছিস সুস্মিতা? ভুলে গেছিস এখানে আমাদের ডিউটি পড়েছে, কাল ইলেকশন!"

"আমাদের সেই ডিউটি তো কালকে। আজকের যাবতীয় কাজ ও ফর্মালিটিস তো সব সারা। এখন এখানে থেকে কিই বা করবো? তার চেয়ে একটু ঘুরেই আসিনা!"

"সুস্মিতা তুই বুঝতে পারছিস তুই কি করছিস? আগুন নিয়ে খেলছিস তুই! যেদিন সুমন জানতে পারবে সেদিন যে কি হবে সেটা ভেবেই আমি বারবার শিউরে উঠি!"

"Don't worry darling! ঠিকমতো বুদ্ধি খাটিয়ে পরকীয়া করলে স্বামীরা কখনোই জানতে পারেনা। Husband doesn't know!"

"husband doesn't know!"

"ইয়েস বেবি! তাই জন্যই তো তোকে বলছি জাহাঙ্গীরকে পুরোপুরি ক্ষমা করে দিয়ে তুইও একটা চান্স নিয়ে দেখতে পারিস।"

"আমার কোনো দরকার নেই এসব চান্স নেওয়ার। আমি অনিকেতের বউ হয়েই সুখে আছি।"

"আমিও তো সুখে থাকতেই চেয়েছিলাম নন্দিনী। আজ যদি সুমন আমার দিকে একটু নজর দিত, একটু খেয়াল রাখতো, আমি কি ওই অঙ্কিতকে পাত্তা দিতাম! সুমন সবদিক থেকে ওর থেকে ফার বেটার। কিন্তু স্বামীদের সময়ই হয়না নিজের স্ত্রীদের দেয়ার। তোকেই দেখ না, তোর অবস্থাও কিন্তু একইরকম। আমি যতদূর দেখেছি অনিকেতও তোর দিকে খুব একটা নজর দেয়না। সবসময়ে মায়ের কথায় ওঠে আর বসে। কিন্তু তুই নিজের চারিপাশে একটা মিথ্যে অবয়ব তৈরী করে রেখেছিস। আমি তোর মতো কম্প্রোমাইস করে সুখে থাকতে চাইনা রে। তাছাড়া নন্দিনী, তুই তো জানিস অঙ্কিত কতোটা আমায় চায়, আই মিন সময় কাটাতে, একসাথে। আমারও শুধু ওই একটাই চাওয়া, সময়...." [[image_1]]

অনিকেতকে নিয়ে সুস্মিতার পর্যবেক্ষণ একেবারেই ফেলে দেয়ার যোগ্য নয়, তা নন্দিনী জানে। কিন্তু সুস্মিতার মতো অত স্পর্ধা দেখানোর সাহস কি তার আছে? আচ্ছা, পরকীয়া করতে কি সাহস লাগে? যারা স্বামী সন্তান নিয়ে অ্যাডজাস্ট করে চলে তারা কি ভীতু? উত্তর মেলা ভার।

তবু নন্দিনী কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। সুস্মিতাকে বারবার বোঝাতে লাগলো এই ইলেকশনটা তাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে নিজেদের প্রমাণ করার ক্ষেত্রে। এটা কোনো ছেলেখেলার বিষয় নয়। কিন্তু সুস্মিতাও জেদ ধরে বসে রইলো। বলতে লাগলো রাত হওয়ার আগেই সে ঠিক ফিরে আসবে।

অবশেষে সে নন্দিনীকে রাজি করিয়ে ফেললো। পারমিশন পেল অঙ্কিতের সাথে ঘুরতে যাওয়ার।

অঙ্কিত ও সুস্মিতা প্ল্যান করে রেখেছিল বাড়ি থেকে দূরে এসে এই অছিলায় তারা শারীরিক ভাবে মিলিত হবে। কলকাতায় থাকতে সেই সুযোগ নেই। সুস্মিতা শশুরবাড়িতে থাকে, অঙ্কিত বেকার। যতটুকু সময় পায় তারা, তাতে বড়জোর সবার অগোচরে রাস্তাঘাটে, পার্কে হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে পারে, এবং শুধু গল্প করে সময় কাটাতে পারে। কিন্তু শারীরিক চাহিদা কারোরই মেটেনা। এখানে এসে হয়তো এবার সেই খরা মিটবে। [[image_2]]

সুস্মিতা জানে তার বান্ধবী তাকে যতটা ভরসা করে ততটা আর কেউ করেনা। তার স্বামীও নয়। তাই জন্যই সে এই ভুল পথটা ভুল জেনেও বেছে নিয়েছে। নাহলে কোনো বিবাহিতা মেয়ে জেনেবুঝে নিজের বিবাহিত জীবন বাজি রাখতে চায়? পরকীয়ার পথ একজন পুরুষ বেছে নেয় যৌনলালসার তাড়নায়, কিন্তু এক নারী সেই পথে পা বাড়ায় মানসিক সুখ খুঁজে না পেলে।

বলতে না বলতেই স্কুলবাড়ির সামনে ধোঁয়া উড়িয়ে একটি বাইক এসে দাঁড়ালো। সুস্মিতা নন্দিনীকে নিয়ে মেইন গেটের সামনে এসে হাজির। হেলমেট খুলতেই বোঝা গেল বাইক চালক আর কেউ নয়, স্বয়ং অঙ্কিত রায়। বেকার বাউন্ডুলে একটা ছেলে! অন্তত নন্দিনীর তো তাই মনে হয়।

"হাই নন্দিনী! কেমন আছ?", হ্যান্ডশেক করার বাসনায় অঙ্কিত হাত বাড়িয়ে দিল।

সৌজন্যের খাতিরে নন্দিনী হাত মিলিয়ে শুধু বললো, "ভালো আছি।"

সুস্মিতার থেকে নন্দিনীকেই বেশি মনে ধরে অঙ্কিতের। তবে অঙ্কিত জানে নন্দিনী তাকে সহ্য করতে পারেনা। নন্দিনীর মতো মেয়েকে প্রেমের জালে ফেলা নেক্সট টু ইম্পসিবল একটা টাস্ক! অগ্যতা টাইম পাশের জন্য তার বান্ধবীই সহায়।

দূর থেকে জাহাঙ্গীর মাস্টার সব দেখছিল। তার প্রিয় ম্যাডাম এক বাইকারের সাথে করমর্দন করছে! মনে একটু ঈর্ষা জন্মালো।

অঙ্কিত নন্দিনীর চক্ষুশূল। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে যদি তাদের যাওয়াটাই ক্যান্সেল করে দেয়! তাই আর বেশি কথা না বাড়িয়ে সুস্মিতাকে পিছনে বসিয়ে সাইঁ করে বেড়িয়ে গেল, আবার ধুলো উড়িয়ে। নন্দিনীর নাকে মুখে গেল তার কণা। বিরক্তির সাথে মনে মনে বললো, "এর চেয়ে জাহাঙ্গীর ঢের ভালো। অন্তত চাকরি-বাকরি করে সমাজে কিছু অবদান রাখে। এই অঙ্কিতের মতো বাপের পয়সায় ফুটানি মেরে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায় না!"

কিন্তু হঠাৎ সে অঙ্কিতের সাথে জাহাঙ্গীরের তুলনা টানলোই বা কেন? জাহাঙ্গীর তো কারোর অবৈধ প্রেমিক নয়! তবে?.. নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো। উত্তর পেল না।

নন্দিনী পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখে জাহাঙ্গীর দাঁড়িয়ে। পকেট থেকে রুমাল বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল, মুখ মুছে নেয়ার জন্য। তবে তার পক্ষে এত তাড়াতাড়ি জাহাঙ্গীরের সাথে স্বাভাবিক হওয়া সহজ নয়। তাই সে তাকে এড়িয়ে গেল।

সামনেই রিংকু আসছিল। রিংকুকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো তার আর সুস্মিতা ম্যাডামের থাকার ব্যবস্থা কোথায় হয়েছে? রিংকু বললো স্কুলেরই একটা ক্লাস রুম ফাঁকা করে ব্যবস্থা করা হয়েছে। নন্দিনী তাকে নিয়ে যেতে বললো সেখানে। একটু বিশ্রাম নেবে সে। সেইমতো রিংকু নন্দিনীকে নিয়ে গেল সেথা। জাহাঙ্গীর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। নিজেকে কিরম প্রত্যাখ্যাত মনে হল, তাও আবার রিংকুর সমক্ষে। [[image_3]]