নিয়োগ পর্ব ২৭

Niyog 27

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: নিয়োগ - এক অন্তঃসত্ত্বা জনিত পরকীয়া

প্রকাশের সময়:09 Dec 2025

আগের পর্ব: নিয়োগ পর্ব ২৬

পূর্ববর্তী প্ল্যান অনুযায়ী মানিক-মাধবী ঠিক করেছিল প্রথমে হোটেলের ফোন থেকে সান্যাল বাড়িতে ফোন লাগাবে। মানিকের ঠোঁটস্থ ছিল সান্যাল বাড়ির নাম্বার, আগেও অনেকবার কল দিয়েছে কিনা!.. ঝন্টু আসার আগে সমরেশের সমসাময়িক অবস্থান সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিলনা তাদের। তবু মনে মনে ধরেই নিয়েছিল যে এতক্ষণ নিশ্চই সে মাধবীকে বাইরে বাইরে খুঁজবে না, বাড়িতেই ফিরে আসবে। কারণ বিমলেরও সূর্যাস্তের পর নিজের স্ত্রীকে নিতে ফিরে আসার কথা।

ফোন করে সমরেশকে তারা এটাই জানাতো যে Madhobi was kidnapped!!... হ্যাঁ!.. তারা মিছিমিছি কিডন্যাপের নাটকই সাজাতো, যা অজান্তে সমরেশের সন্দেহের পালেই বাতাস দিত। ততক্ষণে যদি বিমল এসে পড়তো, তাহলে তাকেও কিডন্যাপিংয়ের আষাঢ়ে গল্প শোনানো হত। সমরেশের উপর সব দোষ চাপিয়ে বিমলকে বোঝানো হত যে তার বন্ধুর অবুঝপনার কারণেই মাধবীকে সান্যাল বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।

মানিক সমরেশকে এক বিশেষ মুক্তিপণ চেয়ে ধর্মতলায় ডাকতো। তাকে একা আসতে বলা হত, বাড়ি খোলা রেখে, তা বাড়িতে বিমলের উপস্থিতি থাকুক বা না। কারণ মুক্তিপণ পাওয়া হয়েগেলেই অপহরণ করে এনে রাখা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে মাধবীকে তৎক্ষণাৎ সান্যাল বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিত মানিক। তারপর কি হত সেটা নয় তোলা থাক আপাতত....

কিন্তু এত কিছু করা কেন? কি পাবে তারা এসব মিথ্যে নাটক সাজিয়ে? শুধুই কি বাড়ি হাতানোর মতলব? নাকি লুকিয়ে রয়েছে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র?

ঝন্টু এসে যখন তাদের জানালো যে সমরেশের ধারণা মাধবীকে নাকি কিডন্যাপ করেছে মানিক, তখন সমস্ত পরিকল্পনায় যেন নদী বয়ে গেছিল। কারণ কাকতালীয়ভাবে হলেও মাধবীকে নিয়ে কিডন্যাপিংয়ের সম্ভাবনাটাই সমরেশের মাথায় এসছিল।.. তার উপর সমরেশের অনুমানকে নাকচ করে ঝন্টু নিজের লোক মারফৎ আশ্বাস দিয়ে এসছিল যে মাধবী নিরাপদেই রয়েছে, এবং সে স্বেচ্ছায় মানিকের কাছে গ্যাছে।

তাদের কিডন্যাপিংয়ের মিথ্যে নাটকটা ঝন্টু নিজের অজান্তেই ভেস্তে দিয়েছিল। ফলে আবার মানিক মাধবীকে বসতে হল প্ল্যানিংয়ে। এবার ঝন্টুকে সাথে নিয়ে। তাকে সবকিছু খুলে বলা হল। একেবারে শুরু থেকে। বিমল কেন তার স্ত্রী মাধবীকে নিয়ে এসছিল সমরেশের কাছে, সেইখান থেকে শুরু হল বিস্তারিত বিবরণ।

ঝন্টুও জানতো না এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সম্পর্কে। মাধবী তাতে আলোকপাত করায় ঝন্টুরও মন কেমন যেন করে উঠলো। সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে মন চাইলো। কিন্তু তার তখন পেটে খিদে মুখে লাজ। সর্বোপরি খুনের মতো একটা ঘটনাকে বাস্তবায়িত করার গুরু দায়িত্ব এসে পড়েছে তার কাঁধে। মানিক সেই কাঁধেই বন্দুক রেখে চালাতে চায়।

ঘড়িতে আটটা বেজে গ্যাছে অনেকক্ষণ। সেদিকে কারোর ভ্রুক্ষেপ নেই। ইতিমধ্যে মানিক ধর্মতলায় যাওয়ার প্ল্যান ক্যানসেল করে দিয়েছে। বৈঠকে ঠিক করা হল যে মাধবীর স্বামী অর্থাৎ বিমলের থেকে কোনো কিছু গোপন রাখা হবে না। অতএব মাধবীর আর ধরা পড়ার ভয় রইলো না। মানিক তো আগেই বলে রেখেছে যে সে-ই হবে মাধবীর বিঘ্নহর্তা, তার রক্ষাকর্তা।

আদতেই মানিকের থেকে সেই প্রয়োজনীয় ভরসা-টা যথার্থই পাচ্ছিল মাধবী। কিন্তু সে চাইছিল কণ্টক মুক্ত এক জীবন। সেই প্রত্যাশায় সে ছুটে এসছিল মানিকের কাছে। কথা রেখে নিজের সবটা বিলিয়ে দিয়েছে এক গুন্ডাকে। তার পরিবর্তে মানিকও রাখবে তো নিজের কথা?

মাধবী চায় সন্তান তার একজনকেই বাবা বলে চিনুক, সে যারই ঔরসজাত হোক না কেন। কিন্তু মানিকের সংলগ্নে এসে কি তা আদেও সম্ভব? মাধবী তো মানিকের সাথেও মিলিত হয়েছে। হতেই পারে জন্ম নেওয়া সন্তানটা তারই হল! তখন মানিক কি এত সহজে নিজের অধিকার ছেড়ে দেবে? অধিকার বোধের মনোভাব যে তার সমরেশের থেকেও অনেক বেশি।

ওদিকে বিমলের গাড়ি বি কে পালে ঢুকলো। পাল মিষ্টান্ন ভান্ডারের ময়রা বটুচরণ তাকেও পুরোনো ফ্যাক্টরির পড়ো জমির রাস্তা দেখিয়ে দিল গাড়ি গ্যারেজের জন্য।

কেন জানি না বিমলের মন করলো একবার হর্নটা বাজিয়ে ১১/বি নম্বর বাড়িটায় উপস্থিত মানুষদের আগাম জানান দিতে তার আগমনের বিষয়ে। কিন্তু বিমলের পারভার্ট মন তো তার স্ত্রী ও বন্ধুকে ফের অপ্রস্তুত করতে চেয়েছিল। তাহলে হর্ন বাজালো কেন? অবচেতন মন বুঝি এখনো ভদ্রতার লেশ টুকু রেখেছে!

ফোর্ড গাড়ির নতুন মডেলের হর্নের আওয়াজ অনন্য, কলকাতার রাস্তায় চলা বাকি প্রাইভেট চার-চাকার গুলো থেকে আলাদা। তাই সেই বিশেষ হর্নের আওয়াজে সমরেশের চৈতন্য ফিরলো। সে জানেনা মানিক এলো না বিমল। তবে এসেছে তো বটেই তাদের মধ্যে একজন। সেই আশংকায় ঝটপট করবীকে জাগিয়ে উঠে বসলো। বললো আর দেরি করা যাবেনা। আগন্তুক আবার আগত।

করবীও সময় অপচয় না করে মেঝে থেকে ব্রা ও ব্লাউজ তুলে পড়ে নিল। প্যান্টি তার গোড়ালিতে আটকে ছিল, সমরেশের সহায়তায় তা পুনরায় গুদ-কে জড়িয়ে নিল। তারপর শাড়ি-সায়া ঠিক করে নিয়ে পরিপাটি হয়ে উঠলো রায় বাড়ির বউ। বাঁচোয়া একটাই.. না মানিক, না বিমল তাকে চেনে।

বলতে না বলতে কিছুক্ষণের মধ্যেই কলিং বেল বেজে উঠলো, "টিং টং..."

সমরেশ তাড়তাড়ি গিয়ে দরজাটা খুললো। বিমল দাঁড়িয়ে। খানিক অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো সমরেশ! এবার কি হবে? মাধবী ফিরে আসার আগেই বিমল হাজির! কি বাহানা দেবে এখন সে বিমলকে? তার কাছে যে রয়েছে, সে তো রবির স্ত্রী, বিমলেরটা কই?

"মাধবী কোথায়?"

"হুহঃ....", ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সমরেশ।

কিন্তু বিমল সমরেশের উত্তরের তোয়াক্কা বা অপেক্ষা কোনোটাই না করে তাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে এলো। দেখলো রান্নাঘর থেকে এক রূপসী বেরিয়ে আসছে। নাঃ! এ তো তার মাধবী নয়! বিমলকে দেখামাত্রই করবী জিজ্ঞেস করলো, "কাউকে খুঁজছেন?"

কিছু না ভেবেই বিমল উত্তর দিয়ে বসলো, "হ্যাঁ, আমার স্ত্রীকে....", বলেই সে ঠোঁট কাটলো। কারণ জানে এই কথার পাল্টা কি জবাব আসতে পারে। তাই এলোও। করবী বললো, "আপনার স্ত্রী আপনাকে ছেড়ে একা এখানে আসতে যাবে কেন?"

পিঠ বাঁচাতে বিমল বললো, "আপনিই বা এখানে কি করছেন?"

"আমি তো পাশের বাড়িতেই থাকি। সমরেশদা কে রান্না করা তরকারি দিতে এসছিলাম।.. আচ্ছা আপনি কি বক্সার থেকে এসছেন?"

করবীর মনে মাধবীকে নিয়ে একটা সন্দেহ ছিলই। তার উপর ছিল ঈর্ষা। মেয়েটি দালাল হয়েও তার প্রাণের মানুষকে নাম ধরে ডাকার দুঃসাহস দেখিয়েছে। তাই দালালের বলা সকল কথা সন্দেহাতীত-ভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলনা তার মন। সেই কারণেই মাধবী নিজেকে আইবুড়ো বলে দাবি করলেও করবীর মনে সন্দেহ জেগেছিল, বর্তমানে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আগুন্তুক স্ত্রী বলে যাকে খোঁজ করছে সে আর কেউ নয়, ওই শাকচুন্নিটাই!

"বক্সার?? না তো...."

সমরেশ বুঝলো কথা বেশি দূর এগোলে কেলেঙ্কারি একটা বাঁধতে পারে। তাই যেকোনো একজনকে সেই মুহূর্তে সরিয়ে দেওয়া জরুরি। বিমলকে সে তাড়াতে পারবে না, কারণ বউকে নিতে এসছে। ভালো হবে যদি করবী এখন মানে মানে বিদেয় হয়। তার তো যা চাওয়া তা পাওয়া হয়েগেছে। পরে নাহয় তার সাথে বাকি দেওয়া নেওয়ার হিসেবটা করে নেওয়া যাবে। এখন বিমলকে সামাল দেওয়াটা বেশি জরুরি।

"আচ্ছা, করবী।.. আমার মনে হয় মাসিমা তোমাকে ডাকছে। পাশের বাড়ি থেকে মনে হয় তারই আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আমি লাউয়ের চচ্চড়িটা খেয়ে বলবো কেমন হয়েছে। তুমি যাও গিয়ে দেখো কিসের জন্য উনি হাঁক দিচ্ছেন....", মাঝখান থেকে ইন্টারাপ্ট করলো সমরেশ।

করবী বুঝতে পারলো সমরেশ এখন তাকে তাড়িয়ে দিতে চাইছে। তাই সে আর বিন্দু বিসর্গ কথা না বাড়িয়ে সান্যাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। সমরেশ গিয়ে দোরটা দিয়ে এলো।

বিমল আবার মাধবীর খোঁজ করতে শুরু করলো। সে সিঁড়ি দিয়ে সোজা উঠে গেল দোতলায়। সমরেশ তাকে আটকালো না, কারণ জানে বিমলের চিরুনি তল্লাশির নিট রেজাল্ট শূন্য, মহাশূন্য। সারা বাড়িতে মাধবীকে কোথাও না পেয়ে পাগল পাগল অবস্থা বিমলের। তার উৎকণ্ঠা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অবশেষে বিমলকে সামাল দিতে সমরেশকে না পারতে সবটা খুলে বলতে হল।

তার স্ত্রী আরো এক পুরুষের সাথে....?? ভেবেই হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়ে অনুভূতি-শূন্য দেহ নিয়ে সোফায় বসে পড়লো বিমল। তার শরীর ক্ষোভে কষ্টে ঘেন্নায় অবশ হয়ে আসছিল। সমরেশ তা বুঝে তাকে শান্ত্বনা দিতে যেই হাত বাড়ালো অমনি বিমল নিজের রাগ সম্বরণ না করতে পেরে পাশে রাখা ফুলদানিটা দিয়ে সজোরে আঘাত করলো সমরেশের মাথায়!!

"আআআআআঃ.....", চিৎকার করে উঠলো সমরেশ।

করবী তখনো নিজের বাড়িতে ঢোকেনি। যে জানতো সমরেশ দা মিছে কথা বলে তাকে সরিয়ে দিয়েছে। তার মন বারবার ফিরে যেতে চাইছিল সান্যাল বাড়িতে। তাই বাড়ির বাইরেই বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। বেশি রাত হয়ে যাবার ভয়ে করবী কিছুক্ষণ যেতেই নিজের বাড়ির চৌকাঠে পা বাড়ালো।

নিজের বাড়িতে ঢুকতেই যাচ্ছিল কি তখুনি কানে ভেসে আসলো সমরেশের আর্তনাদ। আঁতকে উঠে পিছন ফিরে ছুটলো করবী। বিমলের সঙ্গে সঙ্গেই বোধদয় হল যে হঠাৎ চড়ে বসা রাগের বশে কি সাংঘাতিক কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে সে!

আসলে সবটা শুনে বিমলের মনে হয়েছিল যে এত কিছুর জন্য দায়ী একমাত্র সমরেশই। সমরেশ যদি নির্লজ্জের মতো তার স্ত্রীকে উলঙ্গ রেখে মানিকের জন্য দরজাটা না খুলতো তাহলে তার ঘরোয়া সম্ভ্রান্ত বউ এভাবে বারো ভাতারি হতনা। তাই সমরেশ যখন তাকে শান্ত্বনা দিতে উদ্যত হল তখন তার সারা শরীরটা যেন রে রে করে উঠলো। ক্ষোভের আগুনে হাত দুটো উল্কা পিন্ডতে পরিণত হল। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আছড়ে দিল সমরেশের মাথা ফুলদানি দিয়ে।

করবী আতংকিত হয়ে সান্যাল বাড়ির দরজা ধাক্কা দিতে লাগলো। তার প্রাণের মানুষের আর্তনাদ সে শুনেছে। আগন্তুককে সে চেনে না। মানিকের লোক তাকে মেরে ফেলতে আসেনি তো? এই ভয়ে কিছু না ভেবে চিৎকার চেঁচামেচি করে পাড়ার লোক জড়ো করতে লাগলো। সবাই মিলে হানা দিল ১১/বি লেখা সদর দরজায়। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দরজা ভেঙে পাড়ার লোক ঢুকে পড়লো। দেখলো মেঝেতে রক্তগঙ্গা বইছে। এবং উৎস একজনের মাথার ব্রহ্মতালু। লুটিয়ে রয়েছে সেই দেহ। বোঝাই যাচ্ছে কোনো সাড় নেই। তার সামনে হাঁটু গেঁড়ে জীবন্ত লাশ হয়ে বসে রয়েছে আরেকজন।

সমরেশ মৃত। খুনি বিমল। এবার??