নিয়োগ পর্ব ২৮

Niyog 28

এক ঢিলে দুই পাখি এলিমিনেট। সমরেশ পটল তুলেছে, তার দায়ে বিমল যাবে শ্রীঘরে। তাহলে মাধবীর জীবনে আর পড়ে রইলো কে?

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: নিয়োগ - এক অন্তঃসত্ত্বা জনিত পরকীয়া

প্রকাশের সময়:24 Dec 2025

আগের পর্ব: নিয়োগ পর্ব ২৭

নতুন করে তৈরী হওয়া প্ল্যান মোতাবেক মাধবীকে নিয়ে ঝন্টু রওনা দিল সান্যাল বাড়ির উদ্দেশ্যে। মানিক পা বাড়ালো আহিরীটোলা ঘাটের দিকে।

বি কে পালের মোড় তখন জন অরণ্যে পরিণত। পুলিশের গোটা দুয়েক ভ্যান দাঁড়িয়ে। পাড়ার হরেন ডাক্তার সমরেশকে মৃত ঘোষণা করেছে। করবী সমাজের তোয়াক্কা না করে সমরেশের নিথর দেহটাকে জড়িয়ে আত্মহারা হয়ে কাঁদছে। আজকেই তো সে বহু প্রতীক্ষিত ভালোবাসার পরশ পাথরটি খুঁজে পেয়েছিল সমরেশের মধ্যে দিয়ে, এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে গেল! কেন? কেন? নিজের কপালকে দুষছিল। যদি সমরেশের কথা মেনে বেরিয়ে না আসতো, তাহলে হয়তো এই অঘটন ঘটতোই না।

ঝন্টুকে নিয়ে মাধবী বি কে পালে উপস্থিত। কিসের এত ভিড় বুঝে পাচ্ছিলোনা। লোকের জটলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও, তার ঘনত্ব বেশি ছিল ১১/বি বাড়িটার সামনে। তা দেখে মাধবীর মন আতংকিত হয়ে উঠলো। ভিড় কাটিয়ে বাড়িটার সামনে আসতেই তার ভিরমি খাওয়ার উপক্রম। সাদা পুলিশে ঘিরে রেখেছে বাড়ি। হাতকড়া পরিয়ে বিমলকে টেনে বাড়ি থেকে বের করে আনা হচ্ছে। মাধবী ছুটে গেল তার স্বামীর কাছে..

"বিমল!!.. কি হয়েছে?"

বিমলের চোখে তখন মাধবীর জন্য একরাশ ঘেন্না। সমরেশের মুখে শুনেছে নিজের স্ত্রী ও এক অচেনা প্রোমোটারের মধ্যে হতে পারা এক সম্ভাব্য যৌনমিলনের আশংকার কথা। সমরেশ করেছিল সৎ স্বীকারোক্তি। জানিয়েছিল মানিকের গোপন অভিলাষের বিষয়ে, মাধবীকে কাছে পাওয়ার। বোঝেনি তার সততাই তার কাল হবে।

বিমল ছোট থেকেই শর্ট টেম্পার্ড। চট করে রাগ ওঠে, আবার তাড়াতাড়ি স্তিমিতও হয়ে যায়। সকালেও প্যান্টি চুরির অপবাদে সমরেশকে মারতে বিমল তার বুকের উপর চড়ে বসেছিল। এছাড়াও আগের দিন সে নিজের স্ত্রীয়ের খোঁজে সমরেশকে ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়েছিল সান্যাল বাড়িতে এবং উঠে গেছিল দোতলায়। অতীতে এরকম অনেক নিদর্শন রয়েছে তার ক্ষণিকের ক্রোধের। কিন্তু এর পরিণাম এতটা সাংঘাতিক এই প্রথমবার হতে দেখছিল সমাজ।

বিমল কোনো কথা না বলে পুলিশ কনস্টেবলের সাথে গিয়ে ভ্যানে উঠে বসলো। মাধবীকে ধৃতের কাছে গিয়ে কথা বলতে দেখে জোড়াবাগান থানার বড়বাবু এগিয়ে এলেন, জেরা করতে শুরু করলেন। তা দেখে ঝন্টু হালকা করে সেখান থেকে কেটে পড়লো। আস্তে আস্তে পিছিয়ে গিয়ে লোকারণ্যের মধ্যে মিশে সবটা দূর থেকে অনুধাবন করতে লাগলো।

পুলিশ জানতে চাইলো মাধবীর কি সম্পর্ক বিমলের সাথে? সান্যাল বাড়ির সাথেও বা তার কি যোগ? হঠাৎ সে এমুখো হল কেন? এরকম ঘটনা ঘটার কোনো পূর্বাভাস কি তার কাছে ছিল?

পুলিশের মুখে মাধবী শুনলো সমরেশ খুন হয়েছে! খুন করেছে তার স্বামী!.. কেন??.. খানিক দূর থেকেই দেখলো নিথর দেহটার পাশে উস্কো খুস্কো চুলে একজন অর্ধমৃতের মতো বসে রয়েছে। বিকেলে যার সাথে তার ছাদে আলাপ। সেও বা কি করছে এখানে?

পুলিশের সন্দেহ হল এই খুনের সাথে স্বামী স্ত্রী উভয়ই জড়িত, তাই মাধবীকেও ভ্যানে উঠতে বলা হল। দূর থেকে ঝন্টু সবটা দেখলো। বিমল ও মাধবীকে নিয়ে পুলিশের একটা ভ্যান থানায় রওনা হল। সেই দেখে ঝন্টু সঙ্গে সঙ্গে পা চালালো আহিরীটোলা ঘাটের দিকে, মানিককে সবটা জানাতে।

পুলিশের একটা টিম করবীর থেকে জবানবন্দি নিল। করবী এতটাই শোকাচ্ছন্ন ছিল যে মাধবী কখন এসে গ্রেফতার হয়ে চলেও গেল সেটা নজরের মধ্যে পড়েনি। করবীর স্বামী তাকে বাড়ি নিয়ে গেল। সে জানলো তার বউ সমরেশ দা-কে লাউ চচ্চড়ি দিতে এসছিল, ফেরার পথে আওয়াজ শুনে সে-ই লোক জড়ো করে খুনিকে ধরিয়ে দেয়। ব্যস! এইটুকুই।

বসু মল্লিক বাড়িতে খবর দেওয়া হল। বিমলের মা ব্রজবালা দেবীর তো যাই যাই অবস্থা। রুক্মিনী মনে মনে খুশিতে আত্মহারা। এবার সব সম্পত্তি তার স্বামী-সন্তানের হবে। অমল কিন্তু আদর্শ ভাইয়ের মতো দাদার পাশে দাঁড়াতে ছুটে গেল থানায়।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান ছিল বাড়ি নিয়ে বিবাদের কারণেই হয়তো সমরেশের প্রাণটা গ্যাছে। করবীর বয়ান অনুযায়ী সে আজ বিকেলে একটি মেয়েকে সান্যাল বাড়ির ছাদে কাপড় মেলতে দেখে। জিজ্ঞেস করায় মেয়েটি প্রথমে নিজেকে সমরেশের মৃত স্ত্রী নিরুপমার পাতানো ভগিনী বলে পরিচয় দেয়। পরে আবার নিজেই বলে সে নাকি মানিক মিত্তিরের নিকটতম সখি এবং সমরেশেরও পরম বন্ধু। বিহারের বক্সারে বাড়ি। কলকাতায় কয়েকদিনের জন্য এসছে, মানিক মিত্তিরের আস্তানায় উঠেছে। পেশায় একজন দালাল, এবং এই সান্যাল বাড়ি নিয়ে মধ্যস্থতা করার উদ্দেশ্যে তার আগমন।

মানিক নামটা শোভাবাজার এলাকায় বেশ পরিচিত নাম। বিশেষ করে পুলিশ ও রাজনৈতিক মহলে। এই কেসে তার ভূমিকা সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীন তথ্য পেতে পুলিশ আরো জেরা করায় তদন্তে উঠে আসে যে, মানিক চাঁদ মিত্তির প্রোমোটারির জন্য অনেকদিন ধরে ওৎ পেতে ছিল বাড়িটার দিকে। করবীর বয়ানে মানিকই সেই মেয়েছেলে দালালকে পাঠিয়েছিল।

দালাল নিজেকে অবিবাহিতা বলে দাবি করলেও পরে করবীর মনে সন্দেহ জাগে, এই খুনি হলেন দালালেরই স্বামী। কারণ করবী দেখেছে আততায়ী বাড়িতে ঢুকে কারোর একটা খোঁজ করছিল। জিজ্ঞেস করায় বলে স্ত্রীকে খুঁজছে। মনে তখন সন্দেহ জাগলেও বিশেষ কিছু জানতে পারেনি। কোনোরূপ জটিলতা এড়াতে সমরেশ দা তাকেই সেখান থেকে চলে যেতে বলে। কথা না বাড়িয়ে করবীও বহির্মুখো হয়। তারপর বাইরে বেরিয়ে নিজের বাড়ির পানে পা বাড়াতেই কানে ভেসে আসে সেই ভয়ানক আর্তনাদ!

এদিকে বিমলের বয়ান অনুযায়ী সমরেশ নাকি তার স্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করায় ঝোঁকের বশে সে ফুলদানি দিয়ে আঘাত করেছিল। এটা কোনো পূর্ব পরিকল্পিত খুন নয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঘটে যাওয়া এক মস্ত বড় ভুল। বিমল শুধু তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে বন্ধুর বাড়ি গেছিল।

কিন্তু তার স্ত্রীই বা সেখানে গেছিল কেন?

বিমল জানায় সমরেশ তার বাল্যকালের বন্ধু। সময়-অসময়ে তারা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। সমরেশ যেহেতু একা থাকে তাই তার বাড়িটা একটু গুছিয়ে দিতে সে সকালে মাধবীকে রেখে এসছিল। কথা ছিল সন্ধ্যেতে অফিস থেকে ফেরার পথে নিজের স্ত্রীকে তুলে নিয়ে ফিরবে।

তাহলে মাঝখান থেকে তার স্ত্রী কোথায় উধাও হয়ে যায়? কারণ ঘটনাস্থলে যখন পুলিশ আসে তখন তো মাধবী দেবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না? পরে এলেন কারোর একটা সাথে, যাকে পুলিশ ট্রেস করতে পারেনি।

বিমল এক্ষেত্রে নিরুত্তর থাকে এবং বলে এ ব্যাপারে সে বিশেষ কিছু জানেনা, তার স্ত্রী ভালো বলতে পারবে। বিমল জানতো না মাধবী অন্যত্র কোথাও গ্যাছে, তাই সান্যাল বাড়িতে ঢুকে তাকে দেখতে না পেয়ে পাগলের মতো খোঁজ করছিল।

পুলিশ বিমলকে আরো জিজ্ঞেস করে, নিহত সমরেশ সান্যাল তার স্ত্রীকে নিয়ে কি এমন কটূক্তি করেছিল যে সে এতটা রণং দেহি মেজাজ ধারণ করে?

এবার বিমল চাপের মুখে একপ্রকার বাধ্য হয় কিছুটা সত্যি বলতে। পুলিশের কাছে সে মাধবী ও মানিকের মধ্যে হতে পারা সম্ভাব্য মিলনের কথা তুলে ধরে। অনিচ্ছাকৃতভাবে খুন করার আগে বিমল মাধবীর ব্যাপারে সমরেশের কাছে জানতে চায়। তখন সে সবটা খোলসা করে বলে।..

বাড়িটা নিয়ে মানিক মিত্তির নামক এক কুখ্যাত প্রোমোটারের সাথে সমরেশের ঝামেলা চলছিল। আজ দুপুরে সেই কারণে লোকটা আবার আসে। এসে তার কু-নজর পড়ে মাধবীর উপর। বাড়ির বদলে মাধবীকে চেয়ে বসে। তবে সমরেশ রাজি হয়না। মাধবীকে বাঁচাতে শেষে বাধ্য হয়ে নিজের দলিল তুলে দিতে চায় মানিকের হাতে।

দলিল আনতে যখন সমরেশ উঠে যায় দোতলায়, তখন মাঝখানের সময়টার মধ্যে কিছু একটা বোঝাপড়া হয় মাধবী ও মানিকের মধ্যে। মাধবী চেয়েছিল সমরেশের বাড়িটাকে বাঁচাতে। তাই মানিকের সাথে কিসের একটা ডিল করেছিল যার সম্পর্কে সমরেশকেও বিশেষ কিছু জানায়নি সে। সমরেশ দলিল নিয়ে নিচে নেমে আসলে দেখে তারা বসার ঘরে নেই। ডাকাডাকি করায় বেরিয়ে আসে উত্তর-পূর্বের একটা ঘর থেকে। তারপর মানিক যেন একেবারে নিজের ভোল পাল্টে ফেলে। সে বিবাগীর মতো সবকিছু ছেড়ে দিতে রাজি হয়। আর কোনো ঝামেলা না করে চলে যায়। মাধবীকে জিজ্ঞেস করায় সে শুধু ভাসা ভাসা কথা বলে। বলে নাকি বাড়িটা বাঁচাতেই মানিকের সাথে কথা বলছিল। পরে বিকেলের দিকে সমরেশ ঘুমিয়ে পড়লে মাধবী চুপচাপ বাড়ির দলিল নিয়ে মানিকের সাথে সওদা করতে বেরিয়ে যায়।

সমরেশ জানলো কি করে মাধবী দেবী মানিকের সাথে দেখা করতে গেছিল?

বিমল বলে সমরেশ নাকি মাধবীর খোঁজে মানিকের পার্ক সার্কাসের প্রোমোটারি অফিসে যায়। সেখানে জামাল নামে মানিকের পরিচিত এক ব্যবসায়ী তাকে জানায় যে মাধবী নাকি স্বেচ্ছায় মানিকের সাথে দেখা করতে কোথাও একটা গ্যাছে এবং সঠিক সময়েই ফিরে আসবে।

তাহলে এর মধ্যে কটূক্তি কোথায় ছিল?

হয়তো ছিলনা।.. সমরেশ শুধু নিজের আশংকার কথা জানিয়েছিল। জানতো একবার হাতের কাছে পেলে মানিক মাধবীকে অত সহজে ছাড়বে না। মাধবী যদি নিজের প্রচেষ্টায় সান্যাল বাড়িটা বাঁচিয়েও ফেলতো তাহলে তার মাশুল তাকে কড়ায় গণ্ডায় দিতে হত। মানিক মিত্তির এই লোকসানের সবটা মাধবীর শরীর থেকে সুদে আসলে উসুল করে নিত। আর মাধবীও সেটা ভালোমতো জানতো। হয়তো জেনে বুঝেই দেখা করতে যায়, এবং মানিকের মতো গুন্ডার সাথে ইতিমধ্যে আপোষ করে বসে।

এইসব কথা শুনে বিমলের মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। সমরেশকে সবকিছুর জন্য দায়ী করে তার মন। তার মন নিজেকেই জিজ্ঞাসা করে, সমরেশের বাড়ি বাঁচাতে খামোখা মাধবীই কেন নিজের আব্রু-র সাথে আপোষ করতে যাবে? মনের থেকে কোনো সদুত্তর না পাওয়ায় হঠাৎ সমরেশের প্রতি খুব রাগ মাথায় চড়ে বসে। নিজের মাথা আর ঠিক রাখতে পারেনা তখন। ঠিক ভুল বিচার না করে সব রাগটা সমরেশের উপর উজাড় করে উগড়ে দেয়। সমরেশ তাকে শান্ত্বনা দিতে এলে সে ঝোঁকের বশে ফুলদানি দিয়ে আঘাত করে। তারপর..... সব শেষ। ..নিজের কথা শেষ করেই ভেউ ভেউ করে শিশুর মতো কেঁদে ওঠে বিমল।

মাধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করায় সে প্রথমে স্বীকার করে নেয়, বিকেলে ছাদ থেকে ছাদে হওয়া ক্ষনিকের আলাপে পাশের বাড়ির বউটিকে নিজের সম্পর্কে সকল তথ্য ভুল দিয়েছিল সে। করবীকে চিনতো না বলেই তার এমন ইচ্ছাকৃত ভুয়ো পরিচয় দেওয়া।

কিন্তু সেটা কি খুব জরুরি ছিল? কি হত সত্যিটা বললে?

এর কোনো সদুত্তর মাধবীর কাছে ছিলনা।

পুলিশ জানতে চায় দোর্দণ্ডপ্রতাপ মানিক মিত্তিরের সাথে তার ঠিক কি সম্পর্ক যে কাউকে কিছু না বলে সে একেবারে বাড়ির দলিল নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে চলে যায়?

মাধবী বলে সে মোটেও দলিল নিয়ে যায়নি। দুপুরে বাড়ি বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দু পক্ষের মধ্যে যে বাকবিতন্ডা হয়েছিল যার সুরাহা করাই ছিল তার প্রকৃত উদ্দেশ্য, এবং সেটার জন্য কোনো দলিলের প্রয়োজন ছিলনা। সান্যাল বাড়ির দলিল এখনো সান্যাল বাড়িতেই রয়েছে। মানিক মিত্তিরকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বিদায় করার পর সে দেখে সমরেশ হেলায় বাড়ির দলিলটা সোফায় ফেলে রেখেছে। গুরুত্বপূর্ণ নথি বলে সে সেটাকে নিয়ে উত্তর-পূর্বের ঘরের পড়ার টেবিলের প্রথম ড্রয়ারে গুছিয়ে রেখে দেয়। পুলিশ চাইলে সার্চ করে দেখতে পারে।

পুলিশ ফের জিজ্ঞেস করে সান্যাল বাড়িতে যদি সে সমরেশের হাতে হাতে ঘরের কাজ করে দিতেই গেছিল তাহলে হঠাৎ সেখান থেকে কোথায় উধাও হয়েগেছিল সে? কখনই বা হল? মানিক নামক প্রোমোটারের সাথে তার কি এমন গভীর সম্পর্ক? কারণ এক দিনের পরিচয়ে কেউ এতটা বিশ্বাস নিয়ে পৌঁছে যেতে পারে পরপুরুষের আস্তানায়?

মাধবী অপমানিত বোধ করলেও জবাবে বলে, দুপুর নাগাদ মানিক নামক এক প্রোমোটারের আগমন হয় সান্যাল বাড়িতে। বাড়ি বিক্রির বিষয় নিয়ে কিঞ্চিৎ উষ্ণ বাক্য বিনিময় হয় দু' পক্ষের মধ্যে, অর্থাৎ প্রোমোটার মানিক মিত্তির ও বাড়িওয়ালা সমরেশ সান্যালের মধ্যে। মাধবীর নিজ প্রচেষ্টায় সেই বাক্যালাপে সাময়িক বিরতি দিতে পারলেও বোঝে যে এই ঝামেলার নিস্পত্তি অত সহজে হওয়ার নয়। তাই বিকেলের দিকে সমরেশের চোখটা লেগে এলে সে কিছু না জানিয়েই বেরিয়ে পড়ে মানিকের আস্তানার খোঁজে।

মানিক বাবুর আস্তানার খোঁজ তিনি কিভাবে পেলেন?

উত্তর আসে, মাধবীর মধ্যস্থতা করার ইচ্ছে দেখে মানিকই তাকে ঠিকানা দিয়েছিল। কিন্তু সমরেশ চায়নি তার বন্ধুর স্ত্রী এই ঝামেলায় পড়ুক। তাই সমরেশকে না জানিয়েই সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল।

কিন্তু মাধবী দেবী উপযাজক হয়ে এই ঝামেলায় জড়াতে গেলেন কেন? কিসের স্বার্থ আছে তার এই বাড়ি নিয়ে? করবী দেবীকেও তিনি বলেছেন তিনি নাকি এই বাড়ির বিষয়ে কথা বলতেই এসেছিলেন!

মাধবী এর বিপক্ষে এক নিস্তেজ যুক্তি খাঁড়া করে বলে সমরেশ যেহেতু তাদের পারিবারিক বন্ধু ছিল, তাই সেই তাড়নায় সে ছুটে গেছিল মানিকের কাছে বাড়িটা নিয়ে কথা বলতে।

কিন্তু পুলিশ মানিককে সন্দেহ করায় মাধবী তখন স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে এই খুনের সাথে মানিক কোনোভাবেই জড়িত নয়। সে সারাটা বিকেল সন্ধ্যা মানিকের সান্নিধ্যেই কাটিয়েছে। বাড়িটা নিয়ে মিটিং করেছে। কিন্তু তার স্বামী মানিককে চেনে না। এমনকি মাধবীর দাবি মাধবী নিজেও এই খুনের সাথে কোনোভাবে জড়িত নয়। সে শুধু ফিরে এসে দেখে তার স্বামী ক্রোধের বশীভূত হয়ে এরকম লংকাকান্ড বাঁধিয়েছে।

পুলিশ বাড়ি তল্লাশি করে দেখেছে ছাদে কারোর একটা কাপড় সায়া ব্লাউজ মেলা আছে.. সমরেশ বাবু বিপত্নীক, তাহলে শাড়িটা কার? মাধবী দেবীর? মাধবী ইতিবাচক স্বীকারোক্তি দেয়, এবং বলে সমরেশের ঘর গুছিয়ে দিতে এসে তার কাপড় চোপড় নোংরা হয়, তাই সেগুলো কেচে শুকোতে দিতে ছাদে যায়, আর সেখানেই পাশের বাড়ির বউটার চোখে পড়ে।.. আলমারি থেকে সমরেশের মৃত স্ত্রীয়ের একখান কাপড় পরিধানের জন্য নিয়েছিল, যেটা সে এখনো পড়ে রয়েছে।..

যার সাথে পুলিশ মাধবীকে সান্যাল বাড়িতে ফিরতে দেখে সেই অজানা ব্যক্তির বিষয়ে জিজ্ঞেস করায় মাধবী বলে লোকটা মানিক মিত্তিরের, নাম ঝন্টু মন্ডল। তাকে পৌঁছে দিতে এসেছিল শুধু।..

কেস ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। মানিকেরও খোঁজ লাগালো জোড়াবাগান থানার পুলিশ। অমল তখন হাজির থানায়। ঝন্টু তাড়াতাড়ি আহিরীটোলা ঘাটে গিয়ে সবটা জানিয়েছিল মানিককে। শুনে মানিকের চক্ষু চড়কগাছ! তাদের পুরো প্ল্যানটাই কেঁচে গেছিল। জামাল সেই থেকে ধর্মতলায় দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু টার্গেটের দেখা নেই। ঝন্টুও সময়মতো তাকে ফোন করে কোনো আপডেট দেয়নি, ভুলে গেছিল।

সমরেশের দেহ মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হল। সান্যাল বাড়ির শেষ প্রদীপ নিভে গেল। পাড়ার কিছু চেনা পরিচিতের উদ্যমে দূরদূরান্তে থাকা কয়েকজন আত্মীয়ের কাছে খবর পাঠানো হল।

মানিক বুঝেছিল পালিয়ে লাভ নেই। সে সরাসরি এই খুনের সাথে যুক্ত নয়। তাছাড়া তার অনেক পলিটিক্যাল কানেকশন রয়েছে। সো নো চাপ! এমনিতেও খুনটা মাধবীর স্বামী করেছে, তাতে তার পোয়া বারো। এক ঢিলে দুই পাখি এলিমিনেট। বিমলের জেল হয়েগেলে মাধবী শুধু তার। কারণ সমরেশ পটল তুলেছে, তার দায়ে বিমল যাবে শ্রীঘরে। তাহলে মাধবীর জীবনে আর পড়ে রইলো কে? মানিক মিত্তির, আবার কে!!

মানিক তাই ঠিক করলো পুলিশের কাছে নিজেই যাবে ধরা দিতে। সন্দেহের তালিকায় যখন নাম উঠেইছে, তখন এক দু'দিন মামার বাড়িতে কাটিয়ে এলে ক্ষতি বিশেষ নেই! পাকাপাকি ভাবে তো যাবেনা, তা যাবে বিমল।

অমল থানায় গেলেও তার করার কিছু ছিলনা। পুলিশ তার দাদাকে অন দা স্পট ধরেছে। স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। ফলে খুনের মামলা রুজু হয়েছে, অত সহজে জামিন মিলবে না।

মাধবী বসে বসে বিমলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছিল, "এটা তুমি কি করলে বিমল? আমি তো শেষমেশ তোমাকেই বেছে নিতাম। চেয়েছিলাম তোমার সাথেই জীবনটা কাটাতে। তার জন্য কত ফন্দি আঁটলাম। তাহলে খুনটা তুমি করতে গেলে কেন? আমি ছাড়া পেয়ে গেলেও তুমি তো আর পাবেনা! আমাদের তো আর একসাথে থাকা হবেনা। তাহলে কেন করালে আমাকে দিয়ে... এই নিয়োগ??...