হাইওয়ের নীল জ্যামিতি পর্ব ৭

haioer niil jyamiti prb 7

৩৮ বছর বয়স্ক সামিনা, ৪৫ বছর বয়সী মোর্শেদ। একটি ক্রুজার বাইক। অদম্য যৌনতা, মানসিক হেলদোল। চলুন ঘুরে আসি ওদের সাথে।

লেখক: BengaliLekhika

ক্যাটাগরি: ফ্যান্টাসি

সিরিজ: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি

প্রকাশের সময়:09 Mar 2026

আগের পর্ব: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি পর্ব ৬

পর্ব ৭ অসম সমীকরণ ও একজোড়া হেলমেট

থানার সেই গুমোট অন্ধকার, ফাইলের স্তূপ আর নোনা ধরা দেয়ালের ভ্যাপসা গন্ধ পেছনে ফেলে মোর্শেদ আর সামিনা যখন বাইরে বের হলো, তখন ঢাকার আকাশে বিকেলের এক মায়াবী রূপ খেলা করছে। দুপুরের সেই চামড়া পুড়িয়ে দেয়া রোদের তেজ এখন আর নেই। সূর্যের আলোটা কেমন যেন নরম হয়ে এসেছে, চারপাশের জরাজীর্ণ দালানকোঠা আর রাস্তার ধুলোবালিও সেই আলোয় এক অদ্ভুত সৌন্দর্যে সেজেছে। থানার ভেতরে ওসির রুমে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় এবং দুশ্চিন্তায় দুজনের শরীরই ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে ছিল। বাইরের খোলামেলা জায়গায় আসতেই বিকেলের একঝিলিক হিমেল বাতাস যখন তাদের ঘামে ভেজা শরীরে আলতো করে ছুঁয়ে গেল, তখন এক নিমেষেই দুজনের স্নায়ুতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এল। সেই ঠান্ডা বাতাসের পরশে ঘাম শুকানোর যে আরাম, তা যেন শরীরের সাথে সাথে মনটাকেও এক লহমায় ফুরফুরে করে দিল। মোর্শেদ তার জ্যাকেটের চেইনটা একটু আলগা করে দিয়ে বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। ঠিক এই সময়, থানার বারান্দার এক কোণ থেকে সজল ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার পরনের শার্টটা কুঁচকানো, চুলগুলো অবিন্যস্ত, আর চোখেমুখে এক ধরণের জড়তা। সে গুটিগুটি পায়ে এসে সামিনার সামনে দাঁড়াতেই সামিনার ভেতরের দমানো ক্ষোভটা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সামিনা রাগী চোখে সজলের দিকে তাকাল। তার দুচোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সজল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল, খালার চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই। সামিনা তিব্র এবং শাসনের গলায় বলতে শুরু করল— "কী রে সজল? খুব তো বীরপুরুষ হয়েছিস! একবারও কি নিজের কথা ভাবার আগে তোর মায়ের মুখটার কথা মনে পড়ল না? আর কত কষ্ট দিবি আমাদের সবাইকে? আর কত এভাবে তোর মা-কে তিলে তিলে জ্বালিয়ে মারবি তুই? ওদিকে তোর মা দুশ্চিন্তায় রক্তচাপ বাড়িয়ে বিছানায় পড়ে আছে, আর তুই এখানে থানার লক-আপে বসে আছিস! লজ্জা করে না তোর?" সামিনা এক মুহূর্ত থামল না। তার গলার স্বরে অভিমান আর ক্ষোভ মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। সে আবার বলতে শুরু করল— "তোর এই বয়সে হাতে বই থাকার কথা, অথচ তোর হাতে এখন হাতকড়ার দাগ! জীবনে কি কাউকে একটু শান্তিতে থাকতে দিবি না তুই? আমাদের মুখ পুড়িয়ে তোর কী লাভ হলো বল তো? নিজের জীবনটা তো ধ্বংস করছিসই, সাথে আমাদের মাথাগুলোও সমাজের কাছে নিচু করে দিলি। আর কতদিন আমরা তোর এই নোংরামি সামলাব?" সজল কোনো উত্তর দিতে পারল না। সামিনার প্রতিটি কথা চাবুকের মতো তার কানে বাজছিল। সে অস্ফুট স্বরে কেঁদে উঠে বলল, "মাফ করে দেন খালা। আমি বুঝতে পারি নাই এত কিছু হবে। আমায় এবারের মতো মাফ করেন।" সামিনা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার ভেতরে জমে থাকা বছরের পর বছর ক্ষোভগুলো যেন আজই উগরে দিতে চাইছিল। ঠিক তখনই মোর্শেদ এগিয়ে এল। সে খুব শান্তভাবে সামিনার কাঁধে নিজের হাতটা রাখল। মোর্শেদের হাতের সেই শক্ত অথচ ভরসার স্পর্শে সামিনা হঠাৎই থমকে গেল। মোর্শেদ নিচু স্বরে বলল, "থাক সামিনা, অনেক হয়েছে। ছেলেটা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। শাসনের চেয়ে এখন বোধহয় ওর একটু অনুশোচনা করার সুযোগ দেওয়া দরকার। বিকেলের এই বাতাসটা উপভোগ করেন, রাগ কমিয়ে শান্ত হন।" মোর্শেদের শান্ত ও গভীর গলার স্বরে সামিনার উত্তপ্ত মেজাজটা মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। বিকেলের সেই মিঠে রোদ তখনো তাদের ঘিরে এক মোহময় আবেশ তৈরি করে রেখেছে। সামিনার শাসনের তুবড়ি ছোটানোর মাঝেই মোর্শেদ এবার একটু সময় নিয়ে সজলের দিকে খুঁটিয়ে তাকাল। ছেলেটার বয়স খুব বেশি না হলেও উচ্চতায় সে প্রায় মোর্শেদের কাছাকাছিই। তবে বয়সের তুলনায় হাড় জিরজিরে শরীরটা এখনো ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। অবিন্যস্ত এক মাথা রুক্ষ চুল, আর গালে অযত্নে বেড়ে ওঠা একগাল দাড়ি তাকে একটা বুনো ছোকরাটে ভাব দিয়েছে। সজলের চেহারার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তার চোখ। সেখানে যেন অবদমিত এক ধরণের আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে; এক ধরণের জেদ আর অস্থিরতা। তবে এই মুহূর্তে সামিনার শাসনের চাবুক আর মোর্শেদের আভিজাত্যের সামনে লজ্জায় সেই আগুন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। সজল মাথা তুলে মোর্শেদের দিকে তাকাল। তার সেই আগুনের জায়গায় এখন কেবল গভীর এক কৃতজ্ঞতা। এরপর সে অপরাধীর মতো দুজনের উদ্দেশ্যেই মাথা নোয়াল। অস্ফুট স্বরে বলল, "আমারে মাফ করে দেন। আপনারা না থাকলে আজ আমার কপালে কী ছিল জানি না। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের।" মোর্শেদ সজলের চোখের দিকে তাকিয়ে এক ধরণের বিশেষ সম্ভাবনা লক্ষ্য করল। বহু মানুষ চেনার অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, কার চোখে কী লুকিয়ে থাকে। সজলের ওই কৃতজ্ঞতার চাহনিটা মোর্শেদের খুব পছন্দ হলো। এই চোখগুলো বড্ড বিশ্বস্ত; এমন এক ধরণের আনুগত্য সেখানে খেলা করছে যা সচরাচর দেখা যায় না। মোর্শেদ নিজের মনেই ভাবল—এই ছেলেটাকে যদি ঠিকঠাক মতো 'লীড' দেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে সে তার অনেক বড় কাজে আসবে। বিশ্বস্ত চোখ চিনে নিতে মোর্শেদের ভুল হয় না। মোর্শেদ তার পকেট থেকে দামী লেদার মানিব্যাগটা বের করল। সেখান থেকে দুটো এক হাজার টাকার চকচকে নোট বের করে সজলের দিকে বাড়িয়ে ধরল। মোর্শেদের গলার স্বর এখন অনেক কোমল, কিন্তু তাতে আদেশের সুর স্পষ্ট। সে বলল, "এই নাও। এখনই সরাসরি বাসায় চলে যাবে। আজ আর রাস্তায় একদম আড্ডা দিতে বের হবে না। ফেরার পথে বাসার জন্য ভালো কিছু খাবার বা দরকারি কিছু কিনে নিয়ে যেও। মা-র সাথে বসে বাসায় গিয়ে খেও।" সজল স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। মোর্শেদের বাড়ানো টাকাগুলোর দিকে সে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন সে কোনো অলৌকিক কিছু দেখছে। যাত্রাবাড়ীর এই ঘিঞ্জি গলিতে বড় হওয়া ছেলেটার কাছে বনানীর এই প্রভাবশালী মানুষের এমন অযাচিত মমতা আর দু’হাজার টাকার নোটগুলো কোনো স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু মনে হলো না। কৃতজ্ঞতায় সজলের চোখগুলো আবার ভিজে এল। মোর্শেদ যখন পকেট থেকে নোটগুলো বের করে সজলের দিকে এগিয়ে দিল, তখন সামিনা হুট করেই মোর্শেদের হাতটা চেপে ধরল। তার চোখেমুখে এবার একরাশ বিরক্তি আর রাগ ফুটে উঠেছে। সামিনা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, "আপনি ওকে টাকা দিচ্ছেন কেন মোর্শেদ সাহেব? ও এমনিতেই অপরাধী, তার ওপর আপনি ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? এভাবে টাকা দিলে ওর সাহস আরও বেড়ে যাবে।" মোর্শেদ খুব শান্ত চোখে সামিনার দিকে তাকাল। সামিনার রাগী চেহারাটাও তার কাছে এই মুহূর্তে বেশ মায়াবী লাগছে। সে নিচু স্বরে, গভীর এক শান্ত গলায় সামিনাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, "আচ্ছা সামিনা, এখন এসব কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। ছেলেটা অনেক ধকলের ওপর দিয়ে গেছে। ও আগে ঠিকঠাক মতো বাসায় পৌঁছাক। বাসায় গিয়ে কিছু খেলে ওর মাথাটা একটু ঠান্ডা হবে। বাকি শাসন পরে করলেও চলবে।" কথাটা শেষ করেই মোর্শেদ সামিনার হাতের বাঁধন আলগা করে সজলের হাতের তালুতে জোড় করে টাকাগুলো গুঁজে দিল। সজল একবার নোটগুলোর দিকে তাকাল, আর একবার মোর্শেদের দিকে। তার চোখে তখন প্রবল দ্বিধা—এই টাকা সে নেবে কি নেবে না। সজল ভয়ার্ত চোখে সামিনার দিকে তাকাল, যেন সে তার খালার অনুমতির অপেক্ষা করছে। সামিনা প্রথমে মুখ শক্ত করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেও, মোর্শেদের অকাট্য যুক্তি আর সজলের সেই অসহায় চাহনি দেখে তার মনটা একটু নরম হলো। সে আলতো করে সজলের দিকে তাকাল। সামিনার সেই চোখের চাউনিতে এবার আগের মতো কঠোরতা নেই, বরং এক ধরণের মৌন প্রশ্রয় লুকানো ছিল। খালার চোখে সেই গ্রিন সিগন্যাল বা প্রশ্রয় দেখতে পেয়েই সজল আর দ্বিধা করল না। সে কাঁপা কাঁপা হাতে মোর্শেদের থেকে টাকাগুলো গ্রহণ করল। কৃতজ্ঞতায় তার মাথাটা আবার নুয়ে এল। মোর্শেদ তার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে বলল, "যাও এবার, দেরি করো না।" সজল টাকাগুলো পকেটে পুরে নিতেই সামিনা কড়া গলায় বলে উঠল, "দাঁড়াও আগে! এখনই যাওয়ার দরকার নেই। আগে তোমার মা-কে একটা ফোন করে নেই, নইলে ওদিকে উনি দুশ্চিন্তায় শেষ হয়ে যাবেন।" সামিনা তার ভ্যানিটি পার্সটা খুলে একটা ফোন বের করল। মোর্শেদের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে গেল না যে, সেটা বেশ পুরোনো মডেলের একটা শাওমি ফোন। ফোনের স্ক্রিনটা জায়গায় জায়গায় মাকড়সার জালের মতো ফেটে আছে। বনানীর ঝকঝকে দুনিয়ায় অভ্যস্ত মোর্শেদের চোখে এই ভাঙা ফোনটা সামিনার জীবনযুদ্ধের এক নীরব সাক্ষী হয়ে ধরা দিল। সামিনা তার বড় বোন রুবানার নম্বর বের করে ডায়াল করল। ফোনের ওপাশে রুবানা আপার উৎকণ্ঠার শব্দ হয়তো মোর্শেদ শুনতে পাচ্ছিল না, কিন্তু সামিনার উত্তরগুলো ছিল স্পষ্ট। "সালাম আপা। না না, কোনো সমস্যা নেই। এই তো, মাত্র সব শেষ করে বের হলাম... হ্যাঁ, সজল আমার সাথেই আছে। ওকে এখনই একটা রিকশা ডেকে বাসে তুলে দিচ্ছি। ও সরাসরি বাসায় চলে আসবে।" কথা বলার মাঝেই সামিনা আড়চোখে একবার মোর্শেদের দিকে তাকাল। মোর্শেদও তখন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। চার চোখের মিলনে এক অদ্ভুত মৌন কথোপকথন হয়ে গেল—যেন সামিনা তাকে নিঃশব্দে ধন্যবাদ জানাচ্ছে, আর মোর্শেদ তার চোখে নতুন কোনো নীল জ্যামিতির ধাঁধা খুঁজছে। সামিনা ফোনের ওপাশে আবার বলতে শুরু করল, "না আপা, আজকে আর আসব না। টঙ্গী তো অনেক দূর, আপনি তো জানেনই রাস্তার জ্যামের কী অবস্থা। আজ নিজের বাসাতেই ফিরি... না আপা, খাওয়া-দাওয়া আরেকদিন হবে। আচ্ছা, অন্য সময় এসে খেয়ে যাব। আপনি বরং বাসায় আসিয়েন একদিন। আসি তাহলে, আসসালামু আলাইকুম।" ফোনের আলাপ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে সামিনা খেয়াল করল, সজল এক অদ্ভুত জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকে আর মোর্শেদকে দেখছে। ছেলেটার চোখে যেন এক ধরণের কৌতূহল—সে কি তার খালার সাথে এই অচেনা সুদর্শন লোকটার কোনো অদৃশ্য সম্পর্কের সুতো খুঁজে পাচ্ছে? সজলের সেই চাউনি দেখে সামিনা হঠাৎ খুব লজ্জা পেয়ে গেল। তার ফর্সা মুখটা অপমানে না কি এক অজানা শিহরণে আরক্ত হয়ে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে কথা শেষ করে ফোনটা ব্যাগে পুরে ফেলল। নিজের অস্বস্তি ঢাকতে সজলের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বলল, "কী দেখছিস অমন হাঁ করে? যা এবার, দেরি করিস না একদম!" সজল টাকাগুলো পকেটে পুরে নিতেই মোর্শেদ তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা মার্জিত এবং দামী বিজনেস কার্ড বের করল। কার্ডটা সজলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মোর্শেদ শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "এই নাও, এটা আমার কার্ড। এতে আমার পার্সোনাল নম্বর আছে। কাল দুপুরে ঠিক এই সময়ে আমাকে একটা ফোন করবে। ভুলে যেও না কিন্তু।" সজল বিস্ময়ভরা চোখে কার্ডটা নিল। একজন দামী বাইক রাইডার এবং প্রভাবশালী মানুষের কাছ থেকে এমন প্রস্তাব পাওয়া তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হলো। সে মোর্শেদকে একটা গভীর সালাম দিয়ে এবং সামিনার দিকে শেষবার কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে দ্রুতপায়ে থানার গেটের বাইরে মিলিয়ে গেল। সজল চলে যাওয়ার পর সামিনা একটু সময় নিল নিজেকে সামলাতে। সে মোর্শেদের খুব কাছে এগিয়ে এল। বিকেলের মরা আলোয় সামিনার চোখে তখন কৌতূহল। সে ভ্রু কুঁচকে মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, কার্ডের এই ঘটনাটা ঠিক কী মোর্শেদ সাহেব? ওকে হুট করে নিজের নম্বর দিয়ে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন যে?" মোর্শেদ তার বাইকের চাবিকাঠিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে একটা রহস্যময় হাসি হাসল। সে সামিনার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, "সব কাজ কি আর টাকার জন্য হয় সামিনা? কিছু কাজ করা হয় বিনিয়োগ হিসেবে। আমি সজলের চোখে এক ধরণের বিশ্বস্ততা দেখেছি। আর সত্যি বলতে, আমার ছোটখাটো কিছু প্রজেক্টে ওর মতো চটপটে ছেলেরই প্রয়োজন।" সামিনা একটু বাঁকা হাসল। "বিনিয়োগ? নাকি আপনার অন্য কোনো মতলব আছে? আমাকে ইমপ্রেস করার জন্য ওকে কাজ দিচ্ছেন না তো?" মোর্শেদ এবার এক পা এগিয়ে সামিনার আরও কাছে এল। তাদের দুজনের মাঝের দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি। মোর্শেদ নিচু স্বরে বলল, "যদি বলি আপনাকে ইমপ্রেস করার জন্য আমি পুরো থানাটাই কিনে নিতে পারতাম, তাহলে কি খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে?" সামিনা মোর্শেদের এমন সরাসরি উত্তরে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একটু লজ্জা মেশানো স্বরে বলল, "আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন। বনানীর মানুষগুলো কি আপনার মতোই ফ্লার্ট করতে ওস্তাদ?" মোর্শেদ হাসতে হাসতে সামিনার খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমি সবার সাথে ফ্লার্ট করি না সামিনা। কেবল তাদের সাথেই করি, যাদের চোখে আমি 'নীল জ্যামিতির' ধাঁধা খুঁজে পাই। আপনার সেই 'রঙিন ম্যাডাম' ইমেজটা কিন্তু এখন এই বিকেলের রোদে আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে।" সামিনা তার পুরোনো শাওমি ফোনটা ব্যাগে পুরতে পুরতে মুখ টিপে হাসল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার কথার জালে সে প্রতিমুহূর্তে জড়িয়ে যাচ্ছে। থানার রুক্ষ চত্বরটা যেন এই দুই অসম বয়সী মানুষের কাছে হঠাৎ করেই এক রোমান্টিক উদ্যানে পরিণত হলো। সামিনা আলতো করে বলল, "অনেক হয়েছে, এবার চলুন। জ্যাম বাড়ার আগে আমায় আমার ইকোসিস্টেমে পৌঁছে দিন।"সজল চলে যাওয়ার পর মোর্শেদ ধীরপায়ে তার মেটিওর ৩৫০ বাইকটা আনতে গেল। পার্কিং থেকে বাইকটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসার সময় তার দৃষ্টি আবার গিয়ে আটকে গেল সামিনার ওপর। সামিনা তখন একা দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলের ম্লান আলো তার মুখে এসে পড়েছে। মোর্শেদ বাইকের ওপর থেকেই অপলক চোখে সামিনাকে দেখল। সারাদিনের ধকল, থানার সেই বিভীষিকাময় কয়েকটা ঘণ্টা আর ভাগ্নেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে সামিনার ভরাট চেহারায় এখন একরাশ ক্লান্তির ছাপ। শুধু মুখশ্রীতে নয়, তার সারা শরীরেও সেই অবসাদ যেন এক মায়াবী মেঘের মতো লেপ্টে আছে। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে কিছুটা ঝুলে পড়েছে, অবিন্যস্ত চুলের কয়েকটা গুছি কপালে লেপ্টে আছে ঘামে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম ক্লান্তিতেও সামিনাকে মোর্শেদের চোখে কোনো অংশে কম সুন্দর লাগছে না। বরং এই বিধ্বস্ত রূপটাই যেন তাকে আরও বেশি কাম্য করে তুলেছে। মোর্শেদের রক্তে এক ধরণের আদিম নেশা চড়ে বসতে শুরু করল। সে অনুভব করল, তার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কামনার অসুরটাকে জাগিয়ে তোলার জন্য এই সামিনাই যথেষ্টের উর্ধ্বে। বাইকের ইঞ্জিনের ভরাট গুমগুম শব্দের মাঝে মোর্শেদ এক গভীর উপলব্ধি তে ডুবে গেল। সে বুঝতে পারল, সে কেবল সামিনার শরীরে নয়, বরং তার এই রহস্যময় মন আর শরীরের এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। মোর্শেদের মতো একজন অভিজ্ঞ, নিরাসক্ত মানুষের পক্ষে কোনো নারীর প্রেমে পড়া ছিল প্রায় অসম্ভব এক ব্যাপার। কিন্তু সামিনার এই ঘর্মাক্ত স্নিগ্ধতা আর তার ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে মোর্শেদ আজ অসহায়। সে মনে মনে হাসল; সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে, এই নারীর প্রেমে পুরোপুরি হাবুডুবু খেতে তার খুব বেশি সময় লাগবে না। মোর্শেদ বাইকটা নিয়ে একদম সামিনার পায়ের কাছে এসে থামল। হেলমেটের ভাইজরটা তুলে সে এক ধরণের সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকাল সামিনার দিকে। মোর্শেদ যখন বাইকটা নিয়ে একদম সামিনার সামনে এসে থামল, তখন সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল সামিনার মধ্যে এক ধরণের অস্থির ও সাহসী পরিবর্তন। সামিনা আর আগের মতো মোর্শেদের অনুমতির অপেক্ষা করল না। সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে বাইকের পেছনের হুকে ঝোলানো মোর্শেদের দামী গ্লসি হেলমেটটা আনহুক করে খুলে নিল। চুলে সেই রাজকীয় ঝোলা খোঁপা থাকার পরেও হেলমেটটা মাথায় পরতে আহামরি কোনো সমস্যা হলো না তার। সামিনা এবার বাইকে ওঠার প্রস্তুতি নিল। আগেরবার বাইকে ওঠার সময় যে জড়তাটুকু ছিল, এবার তা অনেকটা কেটে গেছে। সে তার শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে তার সেই নরম ও কোমল হাত দিয়ে মোর্শেদের চওড়া কাঁধটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। এরপর এক ধরণের ছন্দময় ভঙ্গিতে তার শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে মেটিয়রের পেছনের সিটে পাশ ফিরে চড়ে বসল। সামিনার রাজকীয় শরীরের ভারে বাইকটা আগের মতোই হালকা দেবে গেল, যা মোর্শেদের শরীরের প্রতিটি কোষে এক ধরণের রোমাঞ্চকর জানান দিল। মোর্শেদ তখন তার ডান পাশের লুকিং মিররে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে জানে, সামিনা যখন পা উঁচিয়ে বাইকের সিটে নিজেকে থিতু করতে যায়, তখন তার নিতম্বের সেই উত্তাল ঢেউ এক নিপুণ কামনার দৃশ্য তৈরি করে। মোর্শেদ সেই দৃশ্যের এক বিন্দুও মিস করতে রাজি নয়। আয়নার প্রতিবিম্বে সে দেখতে পেল সামিনার ঘামে ভেজা পিঠের ওপর ঝুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটা। হেলমেটের নিচ দিয়ে বেরিয়ে থাকা ওই খোঁপাটায় মুখ গুঁজে দিয়ে সামিনার শরীরের সেই বুনো কামজ ঘ্রাণ বুক ভরে শুঁকে দেখতে ইচ্ছে করছিল মোর্শেদের। এক তীব্র কামনা মোর্শেদের রক্তে যেন হাহাকার করে উঠল। সামিনা সিটে স্থির হয়ে বসতেই মোর্শেদ আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিল। সে নিজেকে কিছুটা সংযত করে মুচকি হেসে বলল, "ভালো করে ধরে বসুন মিস সামিনা জাহান। হাইওয়েতে কিন্তু আমি কাউকে করুণা করি না।" কথাটা শেষ করেই মোর্শেদ বাইকের ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। ৩৫০ সিসির সেই ভরাট গর্জন বিকেলের শান্ত বাতাসকে চিরে দিয়ে যেন এক নতুন যাত্রার ঘোষণা করল। মোর্শেদ ক্লাচ ছেড়ে এক্সিলারেটর ঘুরাতেই বাইকটা শিকারী চিতার মতো সামনের দিকে লাফিয়ে উঠল। মেটিয়রের ভরাট গর্জন তুলে মোর্শেদ এক্সপ্রেসওয়ের ওপরের উড়ালপথে না উঠে নিচের রাস্তা ধরল। বিকেলের পাতলা ভিড় ঠেলে বাইকটা রাজকীয় ভঙ্গিতে এগোতে শুরু করল। অফিস-আদালত এখনো পুরোপুরি ছুটি হয়নি, তাই এয়ারপোর্ট রোডে চিরচেনা সেই স্থবির জ্যামটা এখনো জেঁকে বসেনি। রাস্তার ধারের গাছগুলো বিকেলের মরা আলোয় কেমন এক রহস্যময় রূপ নিয়েছে। সামিনা লক্ষ্য করল মোর্শেদ এয়ারপোর্টের দিকে না গিয়ে উত্তরার ভেতরের দিকে এগোচ্ছে। হেলমেটের ভেতর থেকে বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দ ছাপিয়ে সামিনা মোর্শেদের কানের কাছে মুখ নিয়ে একটু চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, "কই যাচ্ছেন মোর্শেদ সাহেব? এই রাস্তা তো আমার বাসার দিকে না। কোথায় যাচ্ছেন আপনি?" মোর্শেদ আয়নায় সামিনার হেলমেট পরা মুখটা একবার দেখল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি। সে বাইকের গতি একটুও না কমিয়ে পালটা জবাব দিল, "আপনাকে নিয়ে পালাচ্ছি সামিনা জাহান! এই শহর, এই জ্যাম, এই থানা-পুলিশের দুনিয়া ছেড়ে অনেক দূরে পালাচ্ছি।" সামিনা হুট করে এমন কথা শুনে থমকে গেল। তার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। সে হাসি লুকানোর চেষ্টা করে বলল, "পালিয়ে যাবেন কোথায়? বনানীর রাজপুত্র কি আমার মতো এক সাধারণ স্কুল শিক্ষিকাকে নিয়ে পালানোর সাহস রাখে?" মোর্শেদ এবার একটু গম্ভীর হলো, কিন্তু তার স্বরে মাদকতা কমল না। সে বলল, "সাহস তো জন্মগত, সামিনা। কিন্তু পালাবার মতো সঙ্গী পাওয়াটাই ছিল কঠিন। আজ যখন পেয়েছি, তখন আর ফেরার পথ খুঁজতে চাইছি না। এই যে বিকেলের বাতাসটা আমাদের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, এর কি কোনো গন্তব্য আছে? আমাদেরও না হয় আজ কোনো গন্তব্য না থাকুক।" সামিনা আশ্চর্যের সাথে মোর্শেদের এই দার্শনিক রূপটা দেখল। সে নরম গলায় বলল, "গন্তব্যহীন যাত্রা শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন মোর্শেদ সাহেব। রাত হলে কিন্তু ঠিকই আমাদের যার যার ইকোসিস্টেমে ফিরতে হবে।" "তাহলে রাত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সময়টুকু না হয় আমাদের একার হোক," মোর্শেদের এই সংক্ষিপ্ত উত্তরে সামিনা আর কোনো তর্ক করল না। রাস্তার ছোটখাটো ঝাঁকুনিতে সামিনা নিজেকে সামলাতে বারবার মোর্শেদের চওড়া কাঁধটা আরও শক্ত করে খামচে ধরছিল। মোর্শেদ তার পিঠের ওপর সামিনার সেই নরম অথচ উত্তাল শরীরের প্রতিটি কম্পন অনুভব করছিল। সামিনার শরীরের ভার আর সেই বিকেলের উষ্ণতা মোর্শেদের স্নায়ুতে এক অদ্ভুত নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই রাস্তা যদি কোনোদিন শেষ না হতো! পথ চলতে চলতে মোর্শেদ উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের এক ছিমছাম, আভিজাত্যমাখা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে বাইক থামাল। বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশটা হঠাৎ খুব শান্ত হয়ে গেল। মোর্শেদ হেলমেট খুলে সামিনার দিকে তাকিয়ে আলতো হাসল। "নামুন ম্যাডাম। চলুন ভেতরে যাওয়া যাক।" সামিনা অবাক হয়ে চারপাশটা দেখল। মোর্শেদ তার দ্বিধা কাটিয়ে দিতে বলল, "থানায় বসে দুশ্চিন্তা করতে করতে ভুলেই গেছেন যে আজ আমাদের লাঞ্চ করা হয়নি। খালি পেটে অন্তত পালানো যায় না। চলুন!" সামিনা নামতে নামতে ভাবল, এই লোকটা শুধু শরীর আর মন নয়, তার ক্ষুধার খবরও কেমন করে যেন ঠিকই জানে। রেস্টুরেন্টে ঢুকেই এসি-র হিমেল স্পর্শে দুজনের শরীর জুড়িয়ে গেল। মোর্শেদ সামিনাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সারাদিন তো অনেক ধকল গেল, আগে ওয়াশরুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি এখানেই বসছি।” সামিনা গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। হেলমেটের ভেতর গরমে মুখটা লাল হয়ে আছে, কপালের কয়েকটা অবাধ্য চুল ঘামে লেপ্টে। মুখে পানির ঝাপটা দিতেই এক অদ্ভুত স্বস্তি পেল সে। মোর্শেদও ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলে বসল। সামিনা ফিরে আসতেই মোর্শেদ মেনু কার্ডটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “অর্ডারটা আজ আপনিই দিন। আমাদের প্রথম ডেট, আপনার পছন্দটাই আগে চলুক।” সামিনা মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখল। চাইনিজ বা কন্টিনেন্টাল খাবারের ভিড়ে সে খুঁজছিল একদম দেশীয় কিছু। অবশেষে মুখ তুলে মৃদু হেসে বলল, “আমি আসলে পুরোপুরি মাছে-ভাতে বাঙালি। দুপুরের খাবারে এই ভাত-মাছ বা মাংস না হলে আমার ঠিক জমে না।” মোর্শেদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বনানীর দামী রেস্টুরেন্টগুলোতে সে অভ্যস্ত স্টেক বা পাস্তায়, কিন্তু সামিনার এই সারল্য তাকে মুগ্ধ করল। সে বলল, “চমৎকার! তাহলে আমিও আজ আপনার সাথেই মাছে-ভাতে বাঙালি হয়ে যাই। দিন, ভাতেরই অর্ডার দিন।” অর্ডার দেওয়ার পর ওয়েটার চলে যেতেই সামিনা একটু লাজুক হেসে বলল, “আসলে আমি সাধারণত বাইরে খাই না। নিজের হাতের রান্নাই বেশি পছন্দ। বিনয় করছি না, কিন্তু আমি সত্যি খুব ভালো রাঁধতে পারি।” মোর্শেদ এবার সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে সামিনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “তাই নাকি? তাহলে তো একদিন আপনার হাতের রান্নার দাওয়াত নিতেই হয়। এমন একজন রাঁধুনীর খাবার না খেলে জীবনটাই বৃথা।” সামিনা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে এক ধরণের প্রশ্রয় ছিল। সে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, কোনো একদিন চলে আসুন আমার সেই যাত্রাবাড়ীর আস্তানায়। নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াবো। তবে সাবধান! খাবারের মধ্যে ওষুধ মিশিয়ে আপনাকে কিন্তু একদম কালো জাদু করে ফেলব।” মোর্শেদ একটুও না দমে সামিনার আরও কাছে ঝুঁকে এল। কণ্ঠস্বরটা খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “জাদু কি আর করতে বাকি রেখেছেন নাকি সামিনা? জাদু তো আপনি সেই প্রথম যেদিন মেসেজ দিয়েছিলেন, সেদিন থেকেই করে বসে আছেন। এখন শুধু বাকি আছে আপনার হাতের ওই রান্নার নেশায় পড়া।” সামিনা এবার মোর্শেদের কথার ধার দেখে একটু থমকাল, তারপর সামলে নিয়ে বলল, “আপনি না পারেনও বটে! লোকে ঠিকই বলে— যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে।” মোর্শেদ সামিনার পিঠের ওপর দুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে রসিকতা করে বলল, “চুল তো আপনার সেই শুরু থেকেই বাঁধা অবস্থাতেই দেখলাম। বাঁধতে আর দেখলাম কই? ওটা কি কখনো খোলে না?” সামিনা ঠোঁট উল্টে পাল্টা জবাব দিল, “চুল বাঁধতে দেখেননি বলে আক্ষেপ করছেন? এদিকে যে বললেন রান্না করি, সেই রান্না করতেই বা আমাকে কবে দেখলেন?” মোর্শেদ হাসল। এক গভীর এবং রহস্যময় হাসি। সে বুঝতে পারছে, এই নারীর কথার জাদুতে সে এখন পুরোপুরি বন্দি। রেস্টুরেন্টের মৃদু আলো আর সুস্বাদু খাবারের সুবাসে তাদের প্রথম ডেটটা যেন এক নিষিদ্ধ কিন্তু সুন্দর কাব্যে রূপ নিল।খাবার আসার অপেক্ষায় থাকা সেই মুহূর্তটিতে মোর্শেদ সামিনার চোখের দিকে তাকিয়ে আগের কথার খেই ধরল। তার গলার স্বরে এবার এক ধরণের গভীর মুগ্ধতা। সে খুব নরম গলায় বলল, "ঠাট্টা করছি না সামিনা, সত্যিই আপনার চুলগুলো অসম্ভব সুন্দর। সেই দুপুর থেকে আমি আপনার এই রাজকীয় চুলের প্রেমে পড়ে গেছি। একটা মানুষের চুল এতটা মায়াবী হতে পারে, আপনাকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।" সামিনা মোর্শেদের এমন সরাসরি প্রশংসা শুনে একটু থতমত খেয়ে গেল, পরক্ষণেই খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে সামিনা জবাব দিল, "বাহ! চুলের প্রেমে পড়েছেন শুনে ভালো লাগল। চুলের প্রেমেই সীমাবদ্ধ থাকুন মোর্শেদ সাহেব, আমার প্রেমে না পড়লেই হলো। আমার প্রেমে পড়া কিন্তু বড্ড বিপজ্জনক!" মোর্শেদ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ওয়েটার ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর ভাজি-ভর্তার বাটিগুলো নিয়ে হাজির হলো। খাবারের সুবাসে টেবিলটা মুহূর্তেই ম ম করে উঠল। তারা দুজন আর কথা না বাড়িয়ে ঝটপট খাওয়া শুরু করল। থানার ধকল আর বিকেলের ক্ষিধেয় যেন দুজনেরই ভাতের থালার দিকে পূর্ণ মনোযোগ। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মোর্শেদ একবার মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা সামিনা, রুবানা আপা তো খুব করে বলছিলেন ওনাদের বাসায় যেতে। টঙ্গী খুব একটা দূরেও ছিল না, গেলে হয়তো ওনারা খুশি হতেন। আপনি গেলেন না কেন?" সামিনা এক লোকমা ভাত মুখে তুলে চিবিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "এখন দরকার নেই আপার বাসায় যাওয়ার। পরে কোনো একদিন যাওয়া যাবে। তাছাড়া সজল মাত্র ওসব থেকে ছাড়া পেল, এখন গেলে আপা কান্নাকাটি করে একাকার করবেন। আমার এখন আর ওসব ভালো লাগছে না।" সামিনা আসলে আসল সত্যটা মোর্শেদের কাছে গোপনই রাখল। সে মনে মনে চাচ্ছিল না এই প্রথম দেখার দিনে মোর্শেদকে নিয়ে বড় বোনের বাসায় গিয়ে নতুন কোনো প্রশ্নের মুখে পড়তে। মোর্শেদের সাথে কাটানো এই একান্ত সময়টুকু সে নিজের মতো করে উপভোগ করতে চেয়েছিল, যা কারো পারিবারিক বলয়ে গিয়ে নষ্ট হোক তা তার কাম্য ছিল না। মোর্শেদ সামিনার কথার ভেতরে থাকা সেই প্রচ্ছন্ন এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিটা লক্ষ্য করল। সে মনে মনে হাসল। সে বুঝতে পারল সামিনা কেবল তার 'ইকোসিস্টেম' নয়, তার ব্যক্তিগত সীমানা নিয়েও খুব সচেতন। আর এই সচেতনতাই মোর্শেদকে সামিনার প্রতি আরও বেশি কৌতূহলী করে তুলছে। খাওয়া শেষ করে তারা যখন রেস্টুরেন্ট থেকে বাইরে বের হলো, ততক্ষণে আকাশের গোধূলি রঙ মুছে গিয়ে সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে নেমেছে। শহরের বাতিগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে, আর সেই কৃত্রিম আলো-আঁধারিতে চারপাশটা অন্যরকম এক মায়ায় ঢেকে গেছে। মোর্শেদ তার মেটিয়র ৩৫০-এর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সামিনা তার পাশে আসতেই মোর্শেদের শিকারী চোখগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠল। সে বাইকের ওপর উঠে বসে লুকিং মিররটা এমনভাবে সেট করে নিল যাতে পেছনের প্রতিটি দৃশ্য তার নজরে থাকে। সামিনা যখন বাইকে ওঠার জন্য পা বাড়াল, মোর্শেদ অপলক চোখে আয়নায় সেই দৃশ্য উপভোগ করতে লাগল। সামিনার শরীরের সেই রাজকীয় গঠন, তার ভারী নিতম্বের ছন্দময় দুলুনি আর বাইকে ওঠার সময় তার শরীরের যে মোচড়—সবকিছুই মোর্শেদের মনে এক ধরণের আদিম উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সামিনার শরীরের প্রতিটি খাঁজ আর শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা তার সেই ভরাট অবয়ব মোর্শেদের কামনার অনলকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। শুধু শরীর নয়, মোর্শেদের নজর আটকে রইল সামিনার পিঠের ওপর দুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটার দিকেও। বিকেলের রোদে যা তাকে মুগ্ধ করেছিল, রাতের এই মায়াবী অন্ধকারে তা যেন আরও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে। মোর্শেদ অনুভব করল, সামিনার শরীরের ঘ্রাণ আর তার এই সজীব উপস্থিতি তার সবটুকু যৌক্তিক চিন্তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সামিনা যখন মোর্শেদের কাঁধে হাত রেখে পেছনের সিটে থিতু হয়ে বসল, তখন মোর্শেদ অনুভব করল তার পিঠের ওপর সামিনার স্তনের মৃদু স্পর্শ। সেই নরম ও উষ্ণ অনুভূতিটা মোর্শেদের শিরদাঁড়া দিয়ে এক তীব্র শিহরণ বইয়ে দিল। মোর্শেদ বুঝতে পারল, এই নারীর সান্নিধ্য তাকে এমন এক গোলকধাঁধায় নিয়ে যাচ্ছে যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই। মোর্শেদ বাইকের স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের সেই ভারী গুমগুম শব্দের সাথে সাথে মোর্শেদের হৃদস্পন্দনও যেন পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল। সে ভাইজরটা নামিয়ে দিয়ে বাইকটা গতির দিকে নিয়ে গেল। রাতের ঢাকা যেন এক মায়াবী অরণ্য, আর সেই অরণ্যের বুক চিরে মোর্শেদের মেটিয়র ৩৫০ যেন ডানা মেলা এক শিকারী পাখি। এক্সপ্রেসওয়ে পেরিয়ে বাইকটা যখন মালিবাগের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন চিরচেনা সেই যানজট তাদের গতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। শত শত গাড়ির হেডলাইটের আলো আর হর্নের শব্দের মাঝে মোর্শেদ বাইকটা থিতু করল। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর দুপুরের ধকলের পর সামিনা যেন এখন অনেকটা ভারমুক্ত। সে মোর্শেদের পিঠের ওপর শরীরের ওপরের অংশের পুরো ভার ছেড়ে দিয়ে একরকম আয়েশ করে বসে আছে। ভ্যাপসা গরমে সামিনার শরীর ঘামে ভেজা, আর সেই ভেজা শাড়ি আর শরীর যেন আঠার মতো মোর্শেদের শার্টের সাথে লেপ্টে আছে। সামিনার শরীরের সেই উত্তাপ আর ভারী ওজনটা মোর্শেদের কাছে মোটেও বিরক্তিকর মনে হচ্ছে না, বরং সে প্রতিটা মুহূর্ত হাড় দিয়ে উপভোগ করছে। একজন নারীর শরীরের এমন নিবিড় সান্নিধ্য মোর্শেদকে এক ধরণের অদ্ভুত পুরুষালী অহংকারে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। জ্যামে স্থবির হয়ে বসে থাকতে থাকতে মোর্শেদের চোখ গেল লুকিং মিররের ওপর। আয়নায় দেখল তাদের ঠিক পেছনেই একটা সাদা রঙের প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের সিটে একজন মধ্যবয়সী লোক একা বসে—পোশাক আর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে নির্ঘাত কোনো উবার ড্রাইভার। মোর্শেদ লক্ষ্য করল, লোকটা ড্রাইভ করার বদলে হাঁ করে তাকিয়ে আছে সামিনার দিকে। আয়নার ফ্রেমে মোর্শেদ স্পষ্ট দেখল, লোকটা যেন সামিনার পেছনের সেই রাজকীয় সৌন্দর্য আর স্তূপীকৃত খোঁপাটা চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। ড্রাইভারের চোখের সেই তৃষ্ণার্ত চাহনি দেখে মোর্শেদ পরিষ্কার বুঝতে পারল—লোকটা মনে মনে মোর্শেদের ভাগ্য নিয়ে চরম ঈর্ষা করছে। মোর্শেদের মতো একজন মানুষের পেছনে এমন একজন ভরাট এবং মোহময়ী নারীকে দেখে ড্রাইভারের অবদমিত কামনা যেন হিংসায় রূপ নিয়েছে। দৃশ্যটা দেখে মোর্শেদ নিজের মনেই একটা তৃপ্তির হাসি হাসল। সে ভাবল, এই সামিনা যদি তার বাইকের ব্যাকসিটের স্থায়ী সঙ্গী হয়, তবে আজ শুধু এই ড্রাইভার কেন, পথের প্রতিটি মোড়ে শত শত পুরুষ তার দিকে এভাবেই ঈর্ষার চোখে তাকাবে। একজন পুরুষের কাছে এর চেয়ে বড় জয় আর কী হতে পারে—যখন তার অর্জিত সৌন্দর্যের দিকে পুরো পৃথিবী লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের একমাত্র মালিকানা থাকবে শুধু তার হাতে। মালিবাগের জ্যামটা একটু কমতেই মোর্শেদ এক্সিলারেটরে মোচড় দিল। সে জানত, এই ঈর্ষাগুলোই তার গতির জ্বালানি। মালিবাগের জ্যাম পেরিয়ে মোর্শেদ যখন যাত্রাবাড়ীর সেই পরিচিত ঘিঞ্জি গলিতে এসে থামল, তখন রাতের আঁধার আরও ঘনীভূত হয়েছে। সামিনার বাসার সামনেটা বেশ অন্ধকার। এটা একটা সস্তা দরের পুরনো চারতলা বাড়ি, যার দোতলার ছোট একটি ফ্ল্যাটে সামিনারা থাকে। বনানীর বিলাসবহুল প্রাসাদের বাসিন্দা মোর্শেদের কাছে এই পরিবেশটা একদমই বেমানান, তবু আজ এই গলির বাতাসও তার কাছে মায়াবী মনে হচ্ছে। সামিনা বাইক থেকে নামার সময় মোর্শেদ স্থির হয়ে বসে রইল। হেলমেটের ভাইজরের ফাঁক দিয়ে সে শেষবারের মতো আজকের এই দীর্ঘ ভ্রমণের পূর্ণতাটুকু দেখে নিতে চাইল। সামিনা যখন সিট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচে দাঁড়াল, তখন তার শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সেই ভরাট সৌন্দর্য আর ক্লান্তিতে নুয়ে পড়া শরীরটা মোর্শেদের পুরুষালী লালসাকে আবার উসকে দিল। মোর্শেদের চোখের মনিতে তখন এক ধরণের তৃষ্ণা—যা কেবল শরীর নয়, বরং এই রহস্যময়ী নারীকে পুরোপুরি জয় করার আকাঙ্ক্ষায় জ্বলছে। সামিনা হেলমেটটা খুলে মোর্শেদের হাতে দিয়ে মৃদু হেসে বলল, "আজ আমার জন্য আপনি অনেক করেছেন মোর্শেদ সাহেব। অনেক রাত হয়েছে, ওপরে আসবেন কি? এক কাপ চা খেয়ে যেতেন অন্তত।" মোর্শেদ সামিনার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তার সেই হাসিতে যেমন আভিজাত্য ছিল, তেমনি ছিল এক ধরণের গভীর টান। সে মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল, "আজ আর নয় সামিনা। আপনারও অনেক বিশ্রাম দরকার। আপনার হাতের সেই কালো জাদুর চা না হয় অন্য কোনোদিন এসে খেয়ে যাব। আজ শুধু এই সুন্দর মুহূর্তগুলো নিয়ে ফিরে যাই।" অন্যদিন আসার এই মধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোর্শেদ তার বাইকের স্টার্ট দিল। সামিনা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মোর্শেদের চলে যাওয়া দেখছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করল। মোর্শেদ বাইক ছাড়ার আগে তার নিজের মাথায় থাকা হেলমেটটা খুলে পেছনের হুকে ঝোলাল, আর এতক্ষণ সামিনা যে হেলমেটটা পরে ছিল, সেটা সে নিজের মাথায় পরে নিল। সামিনার শরীরের ঘ্রাণ আর চুলের স্পর্শ লেগে থাকা সেই হেলমেটটা মোর্শেদ পরম মমতায় নিজের মাথায় জড়িয়ে নিল। মোর্শেদ যখন গতির সাথে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন সামিনার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা শুধু তাকে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে না, বরং তার অস্তিত্বের একটা অংশ নিজের সাথে নিয়ে যাচ্ছে। মোর্শেদের এই নীরব পাগলামিটুকু সামিনার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণের জন্ম দিল।