জয় নিতাই

Joy Nitai

নন্দিনী তার শশুর বাড়ির লোকেদের মানিয়ে,তার স্বামীর সথে সুয়ে ঠান্ডা ঘরে নিজের মধ্যে উষ্ণ তরল অনুভব করেও কামতাড়নাই ভুক্তে থাকা শরীরের নিষ্পত্তি হবে?

লেখক: Limshow

ক্যাটাগরি: গৃহবধূর যৌন কাহিনী

সিরিজ: জয় নিতাই

প্রকাশের সময়:08 Nov 2026

আগের পর্ব: জয় নিতাই

ভোরটা পাটের বালিশের ঠান্ডা দিয়ে শুরু হয়। নন্দিনী চোখ খোলে, চোখ খোলার আগেই জানে যে ঘরটা ঠান্ডা। উঁচু পোড়ামাটির টালির মেঝে সারারাত শিশির কষে রেখেছে, আর সেই ঠান্ডা দিয়েই তার দিন শুরু হয়। চারটে তালে ঘরের প্রাচীর ঘড়ি টিক টিক করছে, পাশে ঘুমচ্ছন্ন স্বামীর পিঠ তার দিকে করা। তিন বছরে সে শিখেছে, পিঠটা করা মানে দিনটার মতো ঠান্ডা হবে।

নন্দিনী চাদর গুটিয়ে উঠে পড়ে। পায়ে চপ্পল পরে না আগে, প্রথমে আঙুল দিয়ে টালি ছুঁয়ে দেখে কতটা কাঁধাচ্ছে। তারপর উঠোনের দিকে যায়, হাতে কলস। কুয়োর পানি এই সময় বরফের মতো, হাত ঢুকিয়ে টানলে বুড়ো আঙুল শক্ত হয়ে যায়। সে দাঁতে দাঁত চেপে মুখ ধোয়ে, চুল বাঁধে, আর পিঠ শক্ত করে রাখে। পিঠ যদি ঢিলে হয়, চোখ পিছু টানে।

আন্দরে প্রথম যে গন্ধ তাকে ধাক্কা দেয়, তা কুচলানো মরিচের। ভাটির উপর মরিচ বাটার কাঁপা গন্ধ, তার সাথে কাঁচা লঙ্কা আর পেঁয়াজের । ঠাকুমা কড়াইয়ের পাশে বসে আছেন, শাড়ির আঁচল মাথায়, মুখটা যেন পাথর কাটা।

"ওঠেছিস তো সকাল হয়ে গেছে? আজ দেখি মহারানীর ঘুম ভাঙল।" ঠাকুমার গলা নিচু, কিন্তু প্রতিটা শব্দে পিন পাতা আছে। "মরিচ বাট আগে। অগ্রজের রুচি আছে, তেজ মরিচ চায়। ওর মুখে একটা স্বাদ না হলে সারাদিন ঘর দুর্গ হয়ে থাকে।"

"বাটছি।"

নন্দিনী শিলে বসে। হাতের মুঠো এখনো কুয়োর পানির ঠান্ডা বয়ে বেড়াচ্ছে, আর শিলপাটার হাতল ঠান্ডা তার তালুতে। বাটতে বাটতে সে ভাবে, মরিচের ধার চোখে ঢোকে, জল আসে, আর জলটা কেউ কান্না ভেবে জিজ্ঞেস করে না। এ ঘরে চোখের জল মানে শুধু মরিচ।

তখনই জ্যাঠাইমা ঢোকে। ফুলঝুরির মতো লম্বা শরীর, চোখে চশমা, হাতে মাচার নিচের ঠান্ডা আলগোছা। সে দাঁড়িয়ে দেখে নন্দিনীর হাতের কাজ, তারপর ঠোঁটের কোণ নামিয়ে হাসে।

"ও মা, কাপড়টা দেখো কী রকম জিরিয়ে গেছে।" জ্যাঠাইমা আলগোছাটা ছড়িয়ে নিজের গায়ে দেয়। "মেয়ে মানুষ চাই আঁচল বিঁধে কাজ করে। আমার ভাইবৌ তো বিদেশি রকম সেজে রান্নাঘরে নামেন, বাঁকা কোমরে। অথচ ভাইয়ের কথায় চোখ আনেন না দিনে দুটো সময়।"

নন্দিনী কথা বলে না। কথা বলার সাধ তিন বছরে কুয়োর পানির সাথে মিলিয়ে গেছে। সে জানে, উত্তর দিলে প্রশ্ন বাড়ে, প্রশ্ন বাড়লে ঠাকুমার মুখ আরও পাথর হয়।

"আর শুনি কী," জ্যাঠাইমা নেমে আসে উনানের পাশে, গলা ফেলে। "পাড়ার মেয়েরা কাল কলকাতা থেকে কথা দিয়ে গেছে মায়ের সাথে। বলেছে, তোমার নিজের বাপের বাড়ির জ্যাঠাঠাকুরডা তো দিনের পর দিন ঘুমিয়ে থাকে, অর্ধেক মরেই আছে বুঝি। আর তোমার শ্বশুরবাড়ির ভাগ্য দেখে মেয়েরা বিয়েতে আসতে ভয় পায়। শাশুড়ি মুখ কাল হয়ে গেল রে, কী বলব আর।"

নন্দিনীর শিলের উপর মুঠো খানিক জোরে চাপে। বিমলের কথা। তার বাবার কথা, এই মানুষগুলোর মুখে। অন্ধ, বাক্‌হীন, চার আঙুল খানি হাতে। তারা তাকে নিয়ে হাসে, আর নন্দিনী বাটে মরিচ। তার মুখে কোনো মন্ত্র নেই, শুধু একটা নিয়ম আছে: এ ঘরে সে জলের মতো, যেখানে ছেড়ে দেওয়া হয় সেখানেই জমে থাকে, পায়ে লাগলে শুকিয়ে যায়।

"শোনো," ঠাকুমা কড়াই থেকে ঘুরে তাকান। "অগ্রজ আজ ঘরে আসবে চারটে। খাবার সময়মতো থাকুক। আর তোমার মুখের রংটাও খানিক খুলে রাখো। মানুষ বউ নেয় ঘর ভাসাতে, মাটি করতে নয়। তিন বছর হলো, কোলে কোনো দানাই পড়ে না। জ্যাঠাইমা ঠিকই বলে, তোমার শরীরে এমন কী আছে বলো, যে ঘরটা না পুষে।"

জ্যাঠাইমা হাসে, পাতলা হাসি। "মা তো মিষ্টি কথা বলেন। আমি তো এ যাবত ভাবতাম, আমাদের বংশের স্ত্রীরা যেখানে এক ফোঁটা দুধে সাড়ে তিন ফোঁটা দেয়, এই মহারানী খালি পানি ঢালেন। এ যে বউ নয় রে মা, কলসির সরু মুখ, ঢালতে ঢালতে সব ফিঁকে যায়।"

নন্দিনী শিল ধুয়ে ওঠে। হাতটা কাঁপছে, তবু কাঁপাটা কেউ দেখুক না মরিচের জল নিয়ে। সে জানে তার শরীর দোষী নয়, তার স্বামী দোষী, যে তাকে ছুঁতে আসে ঘড়ি দেখে। কিন্তু এ ঘরে দোষের নাম নেই, দোষের নাম শুধু নন্দিনী।

অগ্রজ দুপুরে ঘরে আসে। মাধববাবু। চশমার পেছনে ভেজা পাতলা চোখ, পানের মতো শান্ত, বিষের মতো শান্ত। সে ঘরে ঢুকে পায়ের কাছে জুতো খুলে দেওয়ার অপেক্ষা করে, নন্দিনী খুলে দেয়। এটা তিন বছরে অনুমান নয়, নিয়ম।

"খাবার ঠান্ডা নেই তো?" এ ওর প্রথম কথা। দ্বিতীয় কথা হয় না।

"নেই।"

"ভালো।"

সে বসে খায়, বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে। নন্দিনী পাশে দাঁড়িয়ে ভাত দেয়, তরকারি দেয়, ঘড়ির দিকে তাকায় না এবার খানিক ধীরে হাত। মাধব খেয়ে উঠে হাত ধোয়ে গেলে নন্দিনী তার বাটি সারায়। ও দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে, চশমা মুছে।

"রাতে তালা দিয়ে দরজায় বসবে না।" সে বলে, এমন কণ্ঠে যেন বলছে রেলের সময়সূচি। "শুয়ে থাকো।"

নন্দিনীর আঁচলে আঙুল জমে যায়। "হুঁ।"

মাধব চলে যায়। পিঠটা দেখে নন্দিনী দাঁড়িয়ে থাকে, সেই পিঠে কখনো উত্তর লেখা থাকে না। কিছুদূরে জ্যাঠাইমা দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে হাসছে। "দেখলি? এ যেন ভাড়া গণ্ডি পরিশোধ করে গেল। তোর বিছানা তার জমি, রে। খাজনা দিতে তো পড়বেই।"

সন্ধেয় নন্দিনী গামলায় ঠান্ডা পানি ভরে গায়ে মাখে। সাবানের ফেনা, ঠান্ডা ত্বকে জায়গায় জায়গায় গায় হয়ে ওঠে। সে ভাবে, ব্যথাটা ভালো। ঠান্ডার ব্যথা কমপক্ষে বলে দেয়, শরীরে এখনো রক্ত আছে। এ ঘরের বাকি সব কিছু বলে না।

রাতে তালার শব্দ হয়। একটাই। ভেতর থেকে।

মাধব ঘরে ঢোকে। জামাবাট খোলে কোনো কথা না বলে, পাগড়ি না নামিয়েই। কেরোসিনের ঝরঝরে আলোয় নন্দিনী দেখে, স্বামীর মুখে আজও সেই একই নিরস ধৈর্য, যেন রাতের খাবারের বাজেট মেলাচ্ছে। সে তালাটা সরিয়ে রাখে, শাড়ি খোলে নিজেই। অপেক্ষা করার শিল্প ও শিখিয়েছে, শিখানোর সময় সে শিখেছে।

সে বিছানায় উঠে শোয়ে, শাড়ি ছাড়া, পেটিকোট-ব্লাউজে। ঠান্ডা চাদর। চাদরটা সবসময় ঠান্ডা, যেন এ বিছানায় কেউ কোনোদিন ঘামেনি।

মাধব চেপে আসে। কোনো হাত ছোঁয় না, কোনো বুক ছোঁয় না। প্রথম ছোঁয়াটা হয় পেটিকোটের গিঁটে, দক্ষ, ভোরের দুধ তোলার মতো দক্ষ। গিঁট খুলে কাপড় নামায়, তারপর ব্লাউজের হুক, একটার পর একটা, তিনটে মোট। তিনটে হুকের শব্দ নন্দিনীর কানে তিনটে বাজনার মতো শোনায়, খালি, ঠান্ডা।

ওর শরীরে কোনো তাপ নেই। চামড়ায় চামড়া লাগলে তাপ হয়, এ নন্দিনী জানে, নিজের ছোট্ট বেলার স্মৃতি থেকে, মা ঘুমের মধ্যে গুটিয়ে ধরলে যে তাপ হয়। মাধবের বুকটা যেন নারকেলের খোল, ঠান্ডা, সিলমোহর করা।

সে ভেতরে ঢোকে। এক ধাক্কাতেই, যেন দরজা খোলার অপেক্ষার শরীর আছে এই অভিমানে নয়, শুধু ব্যস্ততা। নন্দিনীর গলা থেকে শব্দ বেরোয়, ক্ষত, ব্যথার শব্দ। মাধব থামে না, থামলে মানুষ দরকার। ও শুরু করে, শৃঙ্খলিত তালে, দুধ ভাজার তালে, ভেজে, উল্টায়, ভেজে।

নন্দিনী চাদরের উপরে দিকে চোখ রাখে।

সিলিংয়ে কেরোসিনের আলোর মরীচিকা নড়ছে, লম্বা লম্বা দাগ। সে সেই দাগের মধ্যে ভাবে। ভাবে এমন এক হাত, যে হাত আগে বুকে বসে, তারপর নিচে নামে। এমন ঠোঁট, যে ঠোঁট কানের পাশে ফিসফিস করে কিছু বলে, বাজে কথা, আধখোলা কথা। সে কখনো এমন কথা শুনেনি, তার জীবনে কেউ এমন কথা বলেনি। তার বিয়ের রাতে মাধব বলেছিল, বিছানার নিয়মটা আগে বলে দিই, প্রতিদিন নয়, সপ্তাহে তিন। এটাই ওর জীবনের সবচেয়ে উষ্ণ কথা।

আর শরীরটা বাইরে থেকে সাড়া দিচ্ছে। প্রতিটা ধাক্কায় শরীর উঠে আসছে, পায়ের ভেতরে তার নিজস্ব সেই দেশ জমছে, যা দিয়ে সে নিয়ন্ত্রণ করে না। তার ত্বকে গাঁথা হচ্ছে, ভেতরটা ভিজছে, তার শরীর স্বেচ্ছায় বরবাদ হচ্ছে নিজের কাছে। নন্দিনী মনে মনে শরীরটাকে অন্য কারো দেহ ভাবে, একটা জমি, যেটা যার পায়ের নিচে পড়ে সবার মতো ফল দেয়। ফল দিলে মানুষ ভাবে জমিটা ভালো আছে।

"শব্দ করো না।" মাধব ফিসফিস করে বলে, ব্যথার মাঝে। "ঠাকুমার ঘর ওপাশে।"

নন্দিনী ঠোঁট চেপে ধরে। জল পড়ছে চোখের কোণে, সিলিংয়ের দিকে পড়ছে, মরীচিকার দিকে। মাধবের শ্বাস ছোট, ছন্দবদ্ধ, হিসেবের মতো। ওর হাত নন্দিনীর কোমরে স্থাপন করা, গিঁট ভাঙা নয়, স্থাপন করা। নন্দিনী কখনো লক্ষ করেছে, ওর স্বামী প্রতিদিন বিছানায় একই জায়গায় স্থাপন করে হাত, দুই আঙুলের ব্যবধান কোমরের সাথে, যেন প্রতিদিন একই হাঁড়ি উঠোনে বসানো হয়।

শরীরের ভেতরে ঢেউটা আসে, ঠান্ডা বিছানার চেয়েও অচেনা। নন্দিনীর পিঠ বাঁকে, গলা থেকে চাপা আর্তি ছটফট করে ওঠে, তার নখ বিছানার চাদর চেঁছে যায়। শরীর তার হয়ে চিৎকার করছে, আর সে চিৎকার করতে পারছে না। মুক্তিটা যে আসে, তা ভেতর থেকে ভেতরে, কারো সাথে মিশে উঠতে পারে না, চাদরের মতোই ঠান্ডা থেকে যায়।

মাধব শেষে ছেপে ওঠে। দুরন্ত নয়, ছাপে, যেমন কলম রাখে। তারপর পাশ সরে শোয়ে, চশমা টেবিলে রাখে, পাগড়ি ঠিক করে।

"আলো নিভাবো?" নন্দিনী জিজ্ঞেস করে।

"হুঁ।"

নন্দিনী উঠে হারিকেন নিভিয়ে আসে। অন্ধকারে ফিরে বিছানায় শোয়ে, ঠান্ডা পাশে। পাশে স্বামীর হাঁফ সমান হয়ে যাচ্ছে, ঘুমের সরু পথে পা দিয়েছে। মাত্র আধখানি মিলন হয়েছে, আর মিলনের পরে শূন্যতার ফাঁকটা এই ঘরে সবচেয়ে চওড়া। নন্দিনী চাদর টানে গুটিয়ে, নিজের ভেতরের ভেজা ঠান্ডাটা অনুভব করে। শরীরের ভেতরে এখনো ওর গরমটা আছে, তবু শরীরটা ঠান্ডা। এটা সে চেয়ে বুঝতে পারে, মানুষ শরীরে থাকতে পারে, বিছানায় থাকতে পারে, তবু জায়গাটা খালি থেকে যেতে পারে।

অন্ধকারে সে ভাবে নিজের বাপের বাড়িটা। ভাবে মায়ের হাতের ভাত, ভাবে উঠোনের দুর্গা পুজোর মাটির গন্ধ, ভাবে ওপারের সেই নদিয়ার পাড়া, যেখানে সে পালিয়ে গেলে কেউ জানত না। তারপর ভাবে, কেউ যদি একদিন জিজ্ঞেস করে, এ ঘরে তুমি কেমন আছো? উত্তরটা তার গলায় উঠে আসে, ভালো আছি, তারপর ভাঙে, ভালো নেই, তারপর ভাঙে, আমি কিছুই নেই।

ঘড়ি টিক টিক করছে। নন্দিনী চোখ বন্ধ করে, কাল সকালের জন্য শরীরটা গুছিয়ে নেয়। ঠান্ডা মেঝে, ঠান্ডা পানি, ঠান্ডা চোখ। সব ঠান্ডা, শুধু মরিচটা জ্বলে, আর জ্বলনটাও তার নয়, মরিচের।

ভোরটা আবার আসবে। পাশের বালিশ ঠান্ডা হবে। নন্দিনী ঘুমের কিনারায় ভাবে, যদি কোনোদিন কেউ তাকে গরম ডাকে। শুধু একবার। যদি কোনোদিন কোনো হাত আগে আসে, কথাটা পরে আসে।

আর ওই সময়ে, সেই ওপারের পাড়ায় নিতাই জানে না যে এ পৃথিবীতে তার এক আপন আরো আছে, যে রাতে ঠান্ডা চাদরের নিচে তার মায়ের গরমের মতো গরমের অপেক্ষায় জাগে সারারাত, কারো কাছে চিরকাল প্রার্থনা করে চলেছে কিছু না পেয়ে, কিছু না জেনে, বিছানার নাম ডাকে সম্পর্কের নাম ধরে।

আলো নিভে গেছে বহুক্ষণ। ঠাকুমার ঘরের তালার শব্দ হয়ে গেছে। এ দালানে সবাই তালা দিয়ে ঘুমায়। শুধু নন্দিনীর ভেতরে কোনো তালার চাবি নেই, তাই ওই দরজাটাই সারারাত খোলা থেকে যায়, শূন্য, ঠান্ডা, হাওয়া খেতে খেতে নিস্তেজ। নেই, তাই ওই দরজাটাই সারারাত খোলা থেকে যায়, শূন্য, ঠান্ডা, হাওয়া খেতে খেতে নিস্তেজ।

সকালে শ্বশুরমশাই ঘরে নামেন ন'টায়। ঠাকুমা পর্যন্ত তাঁর সামনে আঁচল মাথায় দেন, কিন্তু নন্দিনীর সেই অধিকার নেই। ও বড়োলোকের চোখের সামনে দিয়ে গেলে শ্বশুরমশাই তাকান না, খালি পায়ে হেঁটে ওঠে বারান্দায়, হুঁকোর পাইপ টানেন, আর সেই ধোঁয়ার গন্ধ সারা উঠনে ছড়িয়ে বসে।

"মাধব।" ওর গলার সাথে কেউ কথা বলেন না ভোর থেকে। "সাইকেলের চেইন ঘানি দে। আজ বন্ড অফিসে জমা দিতে হবে।"

"হুঁ।"

"টিফিন কী হবে?"

"লুচি, আলুরডম। রুচির হিসেব আছে।"

নন্দিনী ওনার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, গামলা হাতে। শ্বশুরমশাই ঘুরে তাকান না। মেয়েটা কে, কোথা থেকে এল, তিন বছর যাপন হলো কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁর মনে নেই বোধহয়। তাঁর চোখে নন্দিনী এ ঘরের দেয়ালে টাঙানো দাগ, যার দিকে দেখার দরকার নেই, চোখ ঘোরালেই তো দেখা যায়, এমন কী আছে তাতে। একদিন ও আঁতি করে দক্ষিণা বাড়িয়েছিল, টুপিটা নিতে। শ্বশুরমশাই টুপিটা পিছনের হাতে নিয়েছিলেন, চোখ সামনের দিকে। দক্ষিণাটা নিলেন, লোকটাকে দেখলেন না। অর্ধেক দক্ষিণা তার হাতে জমে থেকে গিয়েছিল, বরফ হয়ে।

"ও মেয়েটাকে বলো," শ্বশুরমশাই হঠাৎ ঠাকুমার দিকে বলেন, "দুপুরের হিসেবটা আগে মেলাক। কাল থেকে মার্কেটে দাম বেড়েছে, এ ঘরে সারাদিন হাড়ির গন্ধে বাড়ি ভাসে রে বুঝি, টাকাটা কোথা থেকে আসে জানে না।"

"শুনেছি " ঠাকুমা ঘুরে নন্দিনীর দিকে তাকান, চোখে সেই সূচালো হাসি। "শুনলি? বাবা হিসেব মেলাতে বললেন। যা, মোড়ে মোড়ে প্রাণ ভালো হয়ে যায়, মহারানী।"

নন্দিনী মাথা নামায়। উত্তর দেয় না। উত্তর দিলে প্রশ্ন বাড়ে।

ও ঘরে ঢুকে দুপুরের ভাতে হাত দেয়, আর হাত দিতে দিতে মনে পড়ে যায় সেই দিনটা। তিন বছর আগের দিনটা, যেটা এ ঘরের সবাই মনে রাখে নিজেদের মতো করে, আর ও মনে রাখে নিজের মতো।

সেদিন দুপুর থেকে বাড়ির উঠোনে গন্ধ ছিল আলতা আর সাবানের। মা তার মুখে হলুদ মাখিয়েছিলেন ভোরে, আঙুলের ছোঁয়া কাঁপছিল। "বড়োলোকের বাড়ি রে," মা বলেছিলেন, "বড়োলোকের বাড়িতে বউমা মুখ খুলে কথা বলে না। যা বলবে কানে কানে বলবে, নিজের মন সবার সামনে খুলিস না।" নন্দিনী তখন ঊনিশ। ঊনিশ বছরে সে কোনোদিন দেখেনি কাঁচা দিন, সব দিনই ছিল রান্না হয়ে যাওয়া, পরা হয়ে যাওয়া, চড়া হয়ে যাওয়া কাপড়ের সুগন্ধ।

বেনারসি শাড়িটা লাল, ঝার-ঝার সোনালি কাজে ভরা। মা শাড়িটা পরিয়ে দিতে দিতে কেঁদেছিলেন, চোখের জল লাল কাপড়ে পড়ে লুকিয়ে গিয়েছিল, কেউ দেখেনি। নন্দিনীর মাথায় মুকুট, কপালে চাঁদ, মুখ সিঁদুর দেওয়ার অপেক্ষায় খোলা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে চিনতে পারেনি, এমন রূপ সে কোনোদিন দেখেনি, এবং এইটাই প্রথম ভাবনাটা তার বুকের ভেতরে এসে পড়েছিল, এত সুন্দর হওয়ার দরকার ছিল কী? সুন্দর হলে বেশি চাওয়া হয় বলে মা একদিন শিখিয়েছিলেন না তাকে?

শিয়ালদহের লাইনে বউ ভাঙার গাড়ি যখন ছেড়ে এসেছিল, শেহনাই বাজছিল। ওর বাপের বাড়ির উঠোনে শেহনাইয়ের সুরটা চড়েছিল, লম্বা টানে, আর সেই সুরের প্রতিটা নোটে নন্দিনীর বুকটা টান খেয়েছিল। শেহনাই এমন বাজনা, যা খুশির সুরে বাজলেও কানে বিদায়ের সুর শোনায়। মায়ের হাত কপালে, বাপের চোখ পিছনে ঘুরে যাওয়া, আর সেই সময় কাঁটাচামচে মিষ্টি ভরা হাত ছিল, হাসিমুখ ছিল, আতরের গন্ধ ছিল, কিন্তু কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেনি, ভয় করছিস না তো?

ভয় করছিল। সে বলেনি। বউ মুখ খুলে কথা বলে না।

গাড়ি নদিয়ার এ পাড়ায় এসে থামে সন্ধেয়। উঠোনে আলো ছিল, হাজক ছিল, সিঁথির সিঁদুরের জায়গায় জল ঢালার নিয়ম ছিল, দুধের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ দেখার নিয়ম ছিল। সব নিয়ম তার সামনে ছিল, তার নিজের মতো কোনো নিয়ম ছিল না। মাধবকে প্রথম ভালো করে সেদিনই দেখে। পাতলা চশমা, চশমার পেছনে ভেজা পাতলা চোখ, আর মুখে কোনো ভাব নেই, কোনো অপেক্ষা নেই। দুধের সামনে সে কোনোদিন চোখ খাঁড়িয়ে তাকায় না, দেখে, তারপর ঘড়ির দিকে তাকায়, মুঠোফোনের দিকে।

রাত এগোয়।

আর রাতটা এগোতে এগোতে নন্দিনীর বুকের ভেতরে একটা ছোট্ট পশা নড়ে ওঠে, নাম তার নেই। জানে সে কী আসছে, মা রাতের আগে কানে কানে বলে গিয়েছিলেন, ভয় পেয়ো না, শরীরটা বুঝবে, তোমার কাজ শুধু শুয়ে থাকা। শুধু শুয়ে থাকা। কাজের মতো। তাই বলেই ভয়টা আরও বেড়ে যায়, কাজ ভুল হয় তো, কাজের ভুলে শাস্তি হয় তো।

ঘরে যখন তাকে শুইয়ে দেওয়া হয়, তখন হারিকেন একটা জ্বলছে, নিচু তালে। মেঝের টালি ঠান্ডা, নতুন শাড়ির কাঁচা সোনার ধার পিঠে চিকচিক করছে, আর নন্দিনীর হাত দুটো কোথায় রাখবে জানছে না। এক হাত চাদরে, এক হাত সায়ায়, তারপর দুটো সায়ায়, তারপর ভাঁজ করে বুকে। সে কাঁপছে। কাঁপাটা ছোট, শুধু আঙুলে, তবু সে নিজেই দেখে, নিজের আঙুলগুলো বার্বার নাচছে চাদরের উপরে, লতিয়ে যাওয়া কাপড়ের মতো।

মাধব ভেতরে ঢোকে। পাগড়ি মাথায়।

সে পাশে বসে, চশমা খোলে, টেবিলে রাখে। তারপর নন্দিনীর দিকে তাকায়, একবার, পুরোটা না, মুখের দিকে। চোখটা এখনো ভেজা পাতলা।

"নেড়েচেড়ে না থাকো," সে বলে। "ঘাড় ঘাড় করলে বুক নড়ে, মোবাইলে কান দিতে দুশ্চিন্তা হয়।"

নন্দিনী কাঁপা হাতে চাদর ঠিক করে। ওর হাত উঠে আসে তার শাড়ির আঁচলে, আঁচলটা নিজে পরা হয়েছিল না, এখন ও নামায়। সোনার ধার সরে যায় পিঠ থেকে। এবার ব্লাউজের হুক। প্রথমটায় নন্দিনীর শ্বাস উপরে ওঠে, গলার কাছে জমা থাকে। পেটের ভেতরে কী কাজ হচ্ছে বোঝা যায় না, ফাঁপা, খালি, একসাথে। মা বলেছিলেন শরীরটা বুঝবে। শরীরটা বুঝছে বলেই প্রশ্বাস ওঠে, পুরো পাঁজরের দিকে।

"ভালো।" মাধব বলে। "নেড়েচেড়ে করছিস না।"

নন্দিনী চোখ উপরে করে দেয় সিলিংয়ের দিকে। কেরোসিনের আলোর মরীচিকা নড়ে। ঠান্ডা হাওয়া দরজার ফাঁক দিয়ে আসে, তার খালি পেটে আঁচড় কেটে যায়, আর ত্বকে খেয়ে ওঠে গায়। বোঁটা দুটো শক্ত হয়ে ওঠে ঠান্ডায়, আর সেই শক্ত হওয়াটা তার নিজের অজানা শরীরের কাজ, ব্লাউজের কাপড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকে, কেউ দেখে না। সে দেখে। সে লজ্জা পায় নিজের শরীরকে, যে শরীর নিজেই সবচেয়ে বেশি চেনে, তার সামনে সে অচেনা হয়ে যাচ্ছে।

পেটিকোটের গিঁট খোলা হয়। দুই আঙুলের কাজ, দক্ষ, ভোরের দুধ তোলার মতো। নন্দিনীর চোখ বন্ধ হয়ে আসে, তারপর জোর করে খোলে। ভয় পাচ্ছে অন্ধকারে? না ভয় পাচ্ছে আলোয়? কোনটায় বেশি, বলে না যায়।

কাপড়টা নামে। ঠান্ডা হাওয়া খালি শরীরে ছুঁয়ে যায়। নন্দিনীর গলা থেকে ছোট্ট, ভেঙে যাওয়া শব্দ বেরোয়, এক হালকা হায়। মাধব তাকায় না সেই শব্দের দিকে।

ওর হাত নিজের বেল্টে যায়। নন্দিনী চোখ ফেলে দেয় পাশে, দেয়ালের দিকে। এ কাজটা কেউ তাকে দেখায়নি, মা শুধু বলেছিলেন ছেলে যা করবে সহ্য করবে। তারপর ওর হাতের ছোঁয়া আসে, নিচু হয়ে, তার জাংঘের ভেতরের নরম সেই দেশে, যেখানে কোনো হাত এ যাবত ঢুকেনি, মায়ের বাঁকানো আঙুল ছাড়া, শৈশবে স্নানের সময়। আঙুলগুলো এমন জায়গায় থামে, যে জায়গায় থামার কথা নন্দিনী ভেবেও দেখেনি। তার পায়ের ভেতরে মাসলটা শক্ত হয়ে ওঠে, নিজের অজান্তে। মাংস কাঁপে। সে কী করছে তা তার শরীর জানে, আর সে জানে না।

"ভালো বুঝছিস।" মাধব বলে। "শুয়ে থাক।"

তারপর ঢোকে।

প্রথম যে জিনিসটা নন্দিনী বুঝতে পারে, তা ভুল বুঝেছে সে। সে ভেবেছিল ঠান্ডা। না। জ্বলে। ধারালো, পোড়ানো জ্বলন, যে জ্বলনে কোনো সুড়ঙ্গে ঢোকার অনুভূতি নেই, শুধু ছেঁড়া খাওয়ার অনুভূতি আছে। তার শরীর তখনো তৈরি হয়নি, কেউ তাকে তৈরি করতে শিখায়নি, ভেজা হতে শিখায়নি, আর ও অপেক্ষা করে না। এক ধাক্কায় ঢুকে যায়, আর নন্দিনীর পেটের ভেতর থেকে লম্বা, ফেটে যাওয়া আর্তি ছিটকে ওঠে।

"আহ্‌..."

"শব্দ কোরো না। শ্বশুরমশাইয়ের ঘর ওপাশে।"

জ্বলনটা তখনো চলছে। নন্দিনীর পিঠ পেছনে বেঁকে গেছে, আঙুলগুলো চাদরে চেপে বসেছে, নখ কাপড়ে গেঁথে গেছে। তার ভেতরটা ভাঙছে, খালি চোখে তা সে বুঝে ফেলেছে, কিছু একটা সেখানে ছিঁড়ে যাচ্ছে, সারাজীবন বেঁধে রাখা ত্বক, এ যাবত কারো কাছে ফেরত না যাওয়া, এবার ছিড়ে গেল। জল পড়ছে চোখের কোণে, কানের দিকে বেয়ে নামছে, ঠান্ডা চাদরে শুষে যাচ্ছে। মা বলেছিলেন ভয় পাস না। মা বলেননি ব্যথা হবে কত, মা জানেননি কত, মায়ের সময়টা অন্যরকম ছিল বোধহয়।

ও নড়ে। নন্দিনীর শরীর উপরে ওঠে প্রতিটা ধাক্কায়, খাটের কাঠে দিত দিত শব্দ হয়, আর প্রতিটা ধাক্কার সাথে সাথে সেই পোড়া জ্বলনটা আসে, তারপর যায়, তারপর আসে। কাটা যাওয়ার মতো। ভেতরটা পেচিয়ে যায়, ছারখার হয়ে যায়। নন্দিনীর হাঁফ ছোট ছোট, গলার কাছে জমা।

তারপর কোথাও একটা মুহূর্তে, কোনো জানানি ছাড়াই, জ্বলনটা একটু কমে যায়।

ঠিক কমে যায় না। ঠান্ডা হয়ে যায় বললে ভুল হবে। গরমটা রয়ে যায়, তবে ধারটা মোটামুটি হয়ে যায়, তারপর ওই ধারে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্যে কোথায় যেন অন্য একটা কিছু জাগে, ছোট্ট, চাঁই-চাঁই করা, যা ভালো নয়, কিন্তু খারাপও নয়, যা শরীরের কোনো নাম না জানা জায়গায় খোঁচা দেয়। নন্দিনী চমকে ওঠে। কী করল এ শরীর? শরীর কেন সাড়া দিচ্ছে? ব্যথার মাঝে শরীর সাড়া দেয় তো? তার ভেজাটা এখনো নেই, কিন্তু ভিজতে শুরু করেছে, ধীরে, যেন কুয়োর ভেতরে সারারাত ছাঁকনি বসিয়ে রাখা হয়েছে, ফোঁটায় ফোঁটায় জল জমছে। প্রতিটা ধাক্কার সাথে ভিজাটা বাড়ে, আর বাড়তে বাড়তে আঙুলের সেই খোঁচাটা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে, ঠান্ডা দিয়ে গায়ে হয়ে ওঠা ত্বক, তারপর ভেতরে কোথাও গরম এক জায়গা জেগে ওঠে।

নন্দিনী চোখ খোলে। সিলিংয়ের মরীচিকার দিকে। এ কী করছে তার শরীর? এ কি ওর হিসেবে কাজ করছে? না, ও তো ঘড়ি দেখছে, ভেজার হিসেব দেখছে না। তার শরীর নিজের মতো করে, নিজের হয়ে, কারো কাছে হিসেব না দিয়ে, জেগে উঠছে। আর সেই জাগাটা নন্দিনীর বুকের ভেতরে লজ্জার ঢেউ তোলে, যে লজ্জা প্রথমবারের মতো লজ্জা নয়, অন্য কিছু, উষ্ণ, নামহীন। তার পায়ের ভেতরের মাংসটা তখন দিত দিত কাঁপছে, তার পিঠ প্রতিটা ধাক্কার সাথে উঠছে, আর ভেতরের সেই জায়গাটা, যেটা তার নিজের অজানা, প্রতিটা আঘাতে সাড়া দিয়ে ধরছে, ছাড়ছে, ধরছে, ছাড়ছে।

আর্তিটা তখন গলা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে, কিন্তু এবার ব্যথার আর্তি নয়। ছোট, চাপা, ভেজা কিছু, যা শুনে নন্দিনী নিজেই চমকে ওঠে, ঠোঁট চেপে ধরে। এ শব্দ তার নিজের, নিজের গলা থেকে আসছে, আর সেই শব্দে যে সুর আছে, সেই সুর তার বিয়ের আগের জীবনে কোনোদিন শোনা হয়নি।

মাধব থামে না, কিন্তু তালে খানিক দুলন আসে, একটা বাঁকা ভাব ঢোকে, আর সেই বাঁকা ভাবের মধ্যে ঘড়ির কাঁটার মতো সরল ছন্দটা একটু ভাঙে। নন্দিনীর শরীর সেই ভাঙাতেই হাত ছাড়া পায়, তার কোমরের ভেতরে ঢেউটা জমে ওঠে, তার পাঁজরের দিকে চড়ে যায়, আর তারপর সে ভাবে কী হচ্ছে, কী হচ্ছে, আমার শরীর কী করছে? ঢেউটা ফেটে পড়ে। ভেতর থেকে ভেতরে, কোনো শব্দ ছাড়া প্রায়, শুধু একটা ছেপে যাওয়া আর্তি, যা মাধব শুনেও শোনে না।

নন্দিনীর শরীর তখন কাঁপছে। ঠান্ডা নয়, কাঁপছে। তার ত্বকে ঘাম উঠেছে, কপালে প্রথম, তারপর বুকের ভাঁজে। তার বোঁটা দুটো এখনো শক্ত, স্নানের ঠান্ডার দিনের মতো, আর প্রতিটা কাঁপার সাথে সাথে সেই গরম জায়গাটা আরও কর্কশ হয়ে জ্বলছে। তার চোখে জল, তার ঠোঁটে অবাক ভাব। এ শরীর এমন করতে পারে? এ শরীর এমন জায়গায় যাওয়ার রাস্তা আছে তো? আর কেউ কোনোদিন বলেনি তাকে, এ রাস্তার নাম কী।

ওর শ্বাস ছোট হয়ে আসে, একবার কাঁপা, একবার গুরুগম্ভীর, তারপর ওর শরীর নন্দিনীর শরীরে চেপে বসে যায়, গরম ঢেউয়ের মতো কিছু তার ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। নন্দিনী অনুভব করে ভেতরটা পুরো ভরে গেছে, ছলাছলে, অচেনা। এবং সেই ভরাটের সাথে সাথে আরেকটা ভাবনা তার বুকে ঢোকে, ঠান্ডা, সূচালো: এ শরীর এখন ভরে গেছে এক মানুষের দিয়ে, যে মানুষ তার নামও জানে না ঠিকমতো, মুখও মনে রাখে না, শুধু তালে স্থাপন করে হাত, দুই আঙুলের ব্যবধান কোমরের সাথে।

আর সেই ঠান্ডা ভাবনাটা গরম ঢেউয়ের উপরে বসে থাকে, পাথরের মতো, আর নন্দিনীর বুঝতে বুঝতে ভেতরের ভেজা গরমটা ঠান্ডা হয়ে আসতে শুরু করে, তারপর সে মনে মনে কাঁদে, কোনো কান্নার জল ছাড়া, শুধু ভেতরের দিকে: এটা ফাঁদ। শরীরটা ফাঁদ। এই ভিজাটা, এই জ্বলাটা, এই ফেটে যাওয়াটা, সব মিলে একটা দড়ি বানিয়েছে, আর সেই দড়ি এই বিছানার খুঁটিতে বাঁধা হয়ে গেছে, তিন রাত পর পর, ঘড়ি দেখে, বিছানার নিয়মের মতো। শরীরটা যত ভালো জানবে, তত ভালো বেঁধে থাকবে, আর ভালো কেউ তাকে বলবে না, কারণ ভালো মানুষ তার বিছানায় নেই, তার বিছানায় আছে কেবল একটা নিয়ম।

ওর হাঁফ সমান হয়ে আসে।

"আলো নিভাবো?" নন্দিনী জিজ্ঞেস করে।

"হুঁ।"

সে উঠে হারিকেন নিভিয়ে আসে। ফেরার পথে তার পায়ের তলায় টালিটা ঠান্ডা, আর তার পায়ের ভেতরে এখনো সেই ভিজাটা পড়ে আছে, তার নিজের, যেটা ও তার হিসেবে তোলেনি, যেটা সারারাত সে তার চাদরের ভেতরে লুকিয়ে রাখবে, নিজের জমির ফসল, যার দাম দেবে কেউ না।

বিছানায় ফিরে সে শোয়ে, ঠান্ডা পাশে। পাশে স্বামীর হাঁফ সমান। ও ঘুমিয়ে গেছে, তিন মিনিটের মধ্যে। ঘুমের সরু পথটা তার পরিচিত, ঘড়ির মতো। আর নন্দিনী চাদর গুটিয়ে শুয়ে ভাবে, আজ থেকে তিন রাত পর পর এ বিছানায় ও আসবে, তালে স্থাপন করবে হাত, আর তার শরীরটা আবার জাগবে, নিজের হয়ে, কারো হিসেব না দিয়ে, আবার ফেটে পড়বে, আবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। এই প্রত্যাবর্তনটাই সাজা হয়ে যাবে, সারাজীবনের। শরীর যেটা শিখবে ভোগানো, মন সেটা শিখবে শাস্তি ভোগানো, দুটো একসাথে বাঁধা থাকবে এক দড়িতে, আর দড়ির ও প্রান্তে বসে থাকবে এক ঠান্ডা মানুষ, চশমার পেছনে ভেজা পাতলা চোখে ঘড়ি দেখছে।

ঘড়ি টিক টিক করছে।

শ্বশুরমশাইয়ের ঘরের হুঁকোর গন্ধ দেয়াল ভেদ করে আসছে, ভারী, পুরুষের। এ দালানের দেয়ালের মধ্যে যে কী পার করে, নন্দিনী তিন বছরে তা জেনেছে, কাঁদতে হলে মুখ মরিচের জলে ভান করতে হয়, আর কিছু না পেয়ে পাওয়া শরীরের অভিজ্ঞতাটা কাউকে বলা যায় না। সে চোখ বন্ধ করে ভাবে, কোনোদিন যদি কোনো হাত আগে আসে, কথাটা পরে আসে, আর যদি কোনোদিন কেউ জিজ্ঞেস করে, তোমার শরীর কেমন আছে? উত্তরটা তার গলায় তখন খোলা থাকবে, ভালো করে দেখাতে পারব, সে রাতেই ভিজে গিয়েছিল, নিজের অজান্তে, আর সেই ভিজাটাই তার একমাত্র জমি, যেটা এখনো কারো হয়নি।

ঠাকুমার ঘরে তালার শব্দ হয়। একটা। নন্দিনীর ভেতরের দরজাটা সারারাত খোলা থাকে, শূন্য। ঘড়িটা টিক টিক করতে করতে থেমে যায় কখনো, আর তখন অন্ধকারে নন্দিনী শুনে, নিজের হাঁফ ছাড়া এ দালানে আর কোনো শব্দ নেই, শুধু ওপাশে হুঁকোর ধোঁয়ার গন্ধ ভারী হয়ে নামে, দেয়ালের ভেজা চুনের উপরে, সারারাত। ।

রাতের ভেতরে একটা নতুন শব্দ আসে, হালকা, দূরের, ঘরের জানলার শিকে চড়ানো হাওয়া। আর তার সাথে মেঘ জমে, ব্রিষ্টির গন্ধ উঠোনে নামে। সেই ভেজা হাওয়া নন্দিনীর খোলা দরজার ভেতরে ঢুকে, তার ভেজা চোখের কোণে থেমে যায়। ঠান্ডা শরীর, ঠান্ডা চুনকালা দালান, আর শুধু বৃষ্টির গন্ধ গরম, মাটির মতো জীবন্ত।

ভোরে তালা খোলা হয় দূরে কোথাও। নন্দিনী উঠে পড়ে। কাল রাতের ভেজা ফসলটা চাদরের ভাঁজে লুকিয়ে আছে, তার নিজের, কেউ জানে না।

নীচে নামতেই নতুন একটা মুখ দেখে। ঠাকুমার কড়াইয়ের পাশে বসে জ্যাঠাইমা, আর ওদিকে বারান্দার ধারে, ঘাড়ে গামছা, হাতে তুলসীতেন্দুর গাছের হাঁড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে। কচি গলা, চওড়া কাঁধ এখনো হয়ে ওঠার পথে, আর চোখ, বড়ো, কালো, যে চোখ ভাবে আগে বলে পরে।

"বড়োবউ?" ঠাকুমা কাঠি নাড়ে। "নিচু হাঁড়িতে জল দে। বাড়ির ছেলেটার দেখার জিনিস তুলে না রাখি আমি।"

ছেলেটা ঘুরে তাকায়। নন্দিনীর চোখ আর তার চোখ এক রেখায় পড়ে, আধসেকেন্ড। তারপর ছেলেটা চোখ নামায়, হাঁড়ির মুখে গাছটা নামিয়ে দেয়, উল্টো দিকে চলে যায়। নন্দিনী ভাবে, ওর নাম কী। তিন বছরে এ ঘরে ওর নামের উল্টো পিছ কেউ করেনি। ছেলেটার হাতে জল ঢালছিল, তার তালুর ঠান্ডা বয়ে আসছিল শিলপাটার মতো, কিন্তু জলটা একবার সে দেখেছে, পরিষ্কার জল, হাঁড়িতে ভরা, কাউকে দেওয়ার জন্য।

দুপুরে জ্যাঠাইমা বলে, "ছোটু আসলে নামটা। দেবর তোমার, মহারানী, চিনে না নিচু করে তাকাই কেন? কলেজে পড়ে, খরচা আমাদের। পড়ে কী, ভগবান জানে।"

ছোটু। নামটা নন্দিনীর ভেতরে কোথায় জমে যায়।

সেই সন্ধেয় আন্দরে ওকে প্রথম কথা বলতে হয়। ঠাকুমা ঘরে যায় শ্বশুরমশাইকে চুনকাম দেখাতে, জ্যাঠাইমা পানের বাটা খাটোয়। নন্দিনী কড়াইয়ে তেল গরম করছে, আর দরজার ফাঁক দিয়ে ছোটু ঢোকে, গলায় মাত্র ফিসফিস।

"বড়োবউ। জলের হাঁড়িটা কুয়োর কাছে ভুলে রেখেছি আমি। শিকারি চুরি করবে এ ঘরে, তারা ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই।"

নন্দিনী ফিরে তাকায়। কড়াইয়ের হিস করা তেল, তার আঁচলের কাচা ধার, আর দরজার ফাঁকে দাঁড়ানো ছেলেটা। ওর গলাটা নিচু, কিন্তু তাতে কিছু আছে, ঠান্ডা নয়।

"কুয়োর কাছে ছিল।" নন্দিনী বলে। "আমি তুলে এনেছি।"

"আনেছেন।" ছোটু হাসে, ছোট্ট, চোখের কোণে। "তোমার দুইটা কাজ দেখেছি আমি। সবাই দেখে তোমার ভুল। আমি দেখি তোমার ভালো..।"

তেল কড়াইয়ে ফেটে উঠে। নন্দিনী মুখ ফিরিয়ে নেয়, কড়াই ধরা আঙুলে গাছ থেকে বড়োজোর ভাজা তোলে। ছোটু আর দাঁড়িয়ে থাকে না। কিন্তু দরজার ফাঁকটা বহুক্ষণ খোলা থেকে যায়, আর বাইরে ব্রিষ্টির গন্ধ উঠানে ভারী হয়ে জমে।

দুদিন পর জ্যাঠাইমা ঘরে ডাকে বড়োগলা। "আঁচল ঠিক করে নে রে, শ্বশুরমশাই এসে পড়েছেন। কাঁধে শাড়ি ছাড়া বউ থাকে কোন জাতে? তুমি কি হাওড়ার সার্কাসের মাদারি?"

নন্দিনী মাথা নামিয়ে আঁচল পরে, হাত কাঁপছে, ব্লাউজের হুকে আঙুল ধরা পড়ছে। আন্দরের মুখে জ্যাঠাইমা আরও ফেলে, "তিন বছরে একটা বাচ্চা তো না হলো, এখন পরার শিক্ষাও নেই। আমাদের বংশের মেয়েরা জন্মেই জানে, এ মহারানী কোন গ্রামের..."

"মশাই ডাকছেন ভাইবৌ।" ছোটুর গলা ভেতরের ঘর থেকে আসে, শান্ত, স্পষ্ট। "চুনকামের বিল নিয়ে। বউদি দিয়ে আঁচল ঠিক করানো যাবে না, টাকার হিসেব আমার হাতে।"

জ্যাঠাইমার মুখ পাথর হয়ে যায়। শ্বশুরমশাই বারান্দায় হুঁকোর পাইপ টানেন, বারি না করেন কাউকে। ছোটু পাশ করে চলে যায়, আর পাশ করার সময়, মাত্র এক সেকেন্ড, নন্দিনীর দিকে তাকায়। চোখে কিছু নেই, কিছু বলে না, শুধু একটা দেখা, পুরোটা দেখা, আঁচল থেকে মাথা পর্যন্ত, যে দেখায় কাউকে এভাবে দেখে না এ দালানে। নন্দিনীর ঘাড়ের ভেতরে গরম একটা রেখা নামে, নিজের অজান্তে। সে চমকে খাঁড়িটা সায়ায় টানে।

তারপর সেই মাইক্রো মুহূর্তগুলো। রান্নাঘরের দরজায় ছোটু জলের হাঁড়ি নিয়ে আসে, নন্দিনীর আঁচলে হাত লাগে না, তবু লাগে। রাতে মাধব তিন রাত পর পর বিছানায় আসে, ঘড়ি দেখে, তালে হাত স্থাপন করে, আর নন্দিনী সিলিংয়ের মরীচিকার দিকে তাকিয়ে থাকে, ভাবে ভাতের জায়গায় মাছ খায় কারো সাথে, ঠান্ডা ভাত নয়, গরম ভাত, যে ভাত পিঠ থেকে হাতে লাগে।

এক সন্ধেয়, ব্রিষ্টি ঘন হয়ে এলে, আন্দরে শুধু নন্দিনী। উনুনের ছাই ঠান্ডা, বাইরে ঝরঝর শব্দ। দরজার ফাঁকে ছোটু।

"কাকিমা পাশের বাড়িতে আছে। দাদা অফিস। বারি না এবার, দশ মিনিট।"

নন্দিনী দাঁড়িয়ে আছে, কড়াই হাতে, কোনো হাত নড়ে না। "ওরা জানলে..."

"জানবে না।" ছোটু ভেতরে ঢোকে, দরজা খানিক বন্ধ করে। ব্রিষ্টি টিনের চালে পড়ছে, ঘন, শব্দে ভরা। "তোমাকে কেউ প্রশ্ন করেছিল আমি দেখেছি, তোমার চোখ কেন লাল?"

নন্দিনী কড়াই রেখে দেয়। "মরিচের জল।"

"মরিচের জল নামে চোখে, মুখ পুড়ে যায়। তোমার মুখ পোড়েনি তিন বছরে একবারও, শুধু চোখ নামে।" ছোটু এক পা এগিয়ে আসে। তার জামার কাপড়ে ব্রিষ্টির ভেজা গন্ধ, আর নিচে সাবানের চেনা গন্ধ। "বউদি, আমি জানি এ ঘরে তুমি কে আসলে। শুধু তোমার ভুল এ ঘর দেখে, আমি দেখি তোমার ক্লান্তি। তোমার চোখের নিচের ভাঁজটা, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। ওরা তাকে দেখে না। আমি দেখি।"

নন্দিনীর গলা ভেঙে যায়। কথাটা আসে প্রথমবার, এ দালানে প্রথমবার, ভালো করে বলে ফেলা।

"আমার কেউ জিজ্ঞেস করেনি কোনোদিন, আমার শরীর কেমন আছে। তিন বছর।"

"আমি জিজ্ঞেস করছি।" ছোটু বলে। "তোমার শরীর কেমন আছে?"

নন্দিনীর চোখ থেকে জল পড়ে বুকে। সে উত্তর দেয় না শব্দে। উত্তর দেয় স্বামীর ঠান্ডা মুখের সামনে দাঁড়িয়ে নয়, ব্রিষ্টির গন্ধের ভেতরে, এক ছেলের বড়ো কালো চোখের সামনে। ছোটু হাত বাড়ায়, তার গালে জলটা মোছে, একবার। ছোঁয়াটা গরম, ছেলের হাতের, কুয়োর জলের মতো ঠান্ডা নয়।

"মা বলেছিলেন, বউমা মুখ খুলে কথা বলে না বড়োলোকের বাড়িতে।" নন্দিনী ফিসফিস করে বলে। "আমি মুখ খুলেছি।"

"শুনেছি।" ছোটু বলে। "আরো খুলবে?"

"কিছু করবে না আমার এ ঘরে, তুমি জানো না।"

"জানি না।" ছোটু বলে। "কিন্তু তোমার পাশে দাঁড়াতে জানি।"

সেই সন্ধে থেকে জিনিসটা এমন হয়, যা দুজনের ভেতরে নিজের মতো জমে, কাউকে বলা যায় না। ছোটু রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়ায় বহুক্ষণ। নন্দিনীর হাতে কড়াই, তবু কড়াইয়ের তাপটা আর তার হাতে লাগে না। এক রাতে মাধব তালে হাত স্থাপন করে, আর নন্দিনীর ভেতরে ঢেউটা আসে, কিন্তু ঢেউটা এবার ছোটুর গালের গরমের দিকে বয়ে যায়, সেই দিকে, যে দিকে তার শরীর নিজেই ফেরার পথ খুঁজে নিয়েছে। সে লজ্জা পায় নিজের শরীরকে, তবু শরীরটা থামে না।

এক দুপুর, ব্রিষ্টি বন্ধ, ঘরে সবাই শুয়ে আছে ভাতের পরের ফাঁকে। নন্দিনী জলের হাঁড়ি নিয়ে উঠোনে, আর ছোটু সেখানে, দাঁড়িয়ে, ভেজা চুল, সদ্যস্নান। জলের গন্ধ, তার গায়ের উপর ব্রিষ্টি পড়েছে।

"দাঁড়াও।" ছোটু বলে, গলা নিচু। "এক মুহূর্ত।"

নন্দিনী হাঁড়ি নেমে আসে মেঝেতে, তার অজান্তে। ছোটু এগিয়ে আসে, এক পা, আরেক পা, আর তার ছায়া নন্দিনীর গায়ে পড়ে, ঠান্ডা ছায়া, ব্রিষ্টির ভেজা শব্দের ভেতরে।

"বউদি।" ফিসফিসে। "তোমাকে ছোঁব?"

নন্দিনীর শ্বাস গলার কাছে জমা থাকে। "ওরা ঘরে আছে।"

"ঘুমে আছে।" ছোটুর হাত তার কোমরে, প্রথম ছোঁয়া, ধীরে, শাড়ির কাপড়ের উপর দিয়ে। ছোঁয়াটা গরম, ছেলের তালুর গরম, আর নন্দিনীর শরীর সামান্য এগিয়ে আসে, ব্রিষ্টির গন্ধের দিকে, সেই গরমের দিকে, তারপর সে নিজেই চমকে ওঠে। সে কী করল এখুনি? তার কোমর আগে কাত হলো, মন পরে সমান।

"ছোটু," ফিসফিস, ভেঙে যাচ্ছে। "তুই আমার দেবর।"

"জানি।" ছোটুর হাত কোমরে থাকে, চাপা চাপ দেয়। "তুমি আমার বউদি। কিন্তু তুমি আগে একটা মানুষ, যে মানুষকে এ দালানে কেউ দেখে না। আমি দেখি। আর দেখতে দেখতে আমার বুকের ভেতরে যা হয়েছে, তা আমি আর গুমিয়ে রাখতে পারি না। তুমি বলো, থামব কি না।"

নন্দিনী থামতে চায় না। এ জানাটা সে তার ভেতরে পেয়ে যায় মরিচের জলের মতোই স্পষ্ট, এক ঝড়ের মতো, তিন বছরের ঠান্ডার ভেতরে প্রথম গরম। সে মাথা নাড়ে। না, থামবে না।

"এই সায়ায় তালার চাবি থাকে, ঠাকুমার ঘরের।" সে ফিসফিস করে বলে। "কাল বিকেলে, মার্কেটে সবাই যাবে। আমি জানাব তোকে কড়াই ধুতে গিয়ে।"

ছোটু হাসে, ছোট্ট, চোখের কোণে। "কড়াই ধোয়া দরকার হবে আর না, তখন।"

কাল আসে। বিকেলে ঠাকুমা পানের বাটা নিয়ে পাশের বাড়ি, জ্যাঠাইমা মার্কেট, মাধব বন্ড অফিসের বাকি কাজে, শ্বশুরমশাই বারান্দায় হুঁকো টানতে টানতে ঘুম। দালানে শুধু দুজন। নন্দিনী কড়াই ধোয়ে ধোয়ে সময় গুনছে, আর ছোটু সিঁড়ি ভাঙে না, আসে, দরজা বন্ধ করে, তালা দেয় ভেতর থেকে।

"তালা দিলে?" নন্দিনী দাঁড়িয়ে, কড়াইয়ের ভেজা ভাঁজ হাতে।

"দিলে।" ছোটু এগিয়ে আসে। "এবার দেবরের জায়গা কোথায়, বউদি, তুমি বল।"

নন্দিনীর গলা থেকে উত্তর বেরোয় না। উত্তর বেরোয় শরীরে, হাত ছেড়ে যায় কড়াই, কড়াইটা মেঝেতে টুং করে পড়ে, আর তার পিঠ দেয়ালে, আঁচল এলোমেলো। ছোটু এসে তার মুখের সামনে দাঁড়ায়, এক হাত দেয়ালে ভর, আরেক হাত তার ঘাড়ে, ধীরে। তারপর ঠোঁট নামায়।

প্রথম চুম্বনটা কাঁপা। নন্দিনীর ঠোঁট বন্ধ, তারপর খোলে হালকা, আর ছোটু চুম্বনটা গভীর করে, জিহ্বা মিষ্টি একটা স্বাদ নেয়, লোনা, ভেজা। নন্দিনীর হাত উঠে আসে ছোটুর কাঁধে, কাঁপছে, তবু আঁকড়ে আছে। তার বুকের ভেতরে পশাটা এবার পুরো পাঁজরে, জ্বলে ওঠে, নামহীন, প্রথমবারের মতো নাম খুঁজছে।

"ছোটু।" মুখ ছেড়ে ফিসফিস। "আমার লজ্জা লাগছে।"

"লজ্জা পেয়ো না।" ছোটুর ঠোঁট তার কানের পাশে, নিঃশ্বাস গরম। "তোমার শরীরটা এ যাবত কারো কাছে ফেরত না যাওয়া। আজ ফেরাতে যাবে না। আজ তার মালিক হবে সে নিজেই, আমার হাতে।"

নন্দিনীর শরীর কাঁপছে। ছোটু তার আঁচল নামায়, শাড়ির পাড় খোলে, ধীরে, প্রতিটা ভাঁজ সরিয়ে। ব্লাউজের হুক, প্রথমটা, তার আঙুল কাঁপছে, ছেলের আঙুল। দ্বিতীয়, তৃতীয়। কাপড়টা পিঠ থেকে নামে, আর নন্দিনীর ত্বকে ব্রিষ্টির আগের ভেজা ঠান্ডা হাওয়া ছুঁয়ে যায়, গায় হয়ে ওঠে, বোঁটা দুটো শক্ত হয়ে জেগে ওঠে। ছোটু দেখে। পুরোটা দেখে, মুখ থেকে ঘাড়, ঘাড় থেকে কাঁধ, কাঁধ থেকে বুকের গভীর ফাঁক, পেটের নরম ভাঁজ। দেখাটা নন্দিনীর শরীরে ঢেউ তোলে, লজ্জার আগে আসে অন্য কিছু, গরম, চাঁই-চাঁই।

"সুন্দর তুমি।" ছোটু ফিসফিস করে বলে। "এ দালানে তোমাকে সুন্দর বলে কেউ বলেনি কোনোদিন, জানি। আজ বললাম।"

নন্দিনীর চোখে জল আসে, ভালোর জল, প্রথমবার। ছোটু তার বোঁটায় মুখ গুঁজে দেয়, ঠোঁটে নেয়, চুষতে শুরু করে। নন্দিনীর গলা থেকে লম্বা, গভীর শব্দ বেরোয়, তার পিঠ পেছনে বাঁকে। দাঁতের হালকা চাপ, তারপর জিহ্বার গরম, আর নন্দিনীর ভেতরে, পায়ের ভেতরের সেই দেশ, ভিজতে শুরু করে নিজের হয়ে, কারো হিসেব না দিয়ে।

ছোটু নিচে নামে। ধীরে, পেটের ভাঁজে মুখ, নাভির ফোঁড়ে জিহ্বা, তারপর পেটিকোটের গিঁট। নন্দিনীর হাত ছোটুর চুলে, টানে নয়, ধরে আছে। "ছোটু, থামো, আমার..." থামে না ছোটু, গিঁটটা খোলে, কাপড়টা পায়ের কাছে নামিয়ে দেয়, আর নন্দিনী খালি, দেয়ালে পিঠ, ব্রিষ্টির গন্ধে ভরা রান্নাঘর, তার নিজের ভেজা গন্ধ উঠছে উষ্ণ।

ছোটু হাঁটু গেড়ে বসে, মুখ তার জাংঘের ভেতরে নিয়ে যায়। নন্দিনীর শরীরে আগুন জ্বলে ওঠে। তার জিহ্বা মায়ের মতো নরম, গরম, তার ভেতরের ভাগে, উপরে নিচে, ধীরে। নন্দিনীর হাঁটু ভেঙে যায়, ছোটু তার পাছা দুই হাতে ধরে তোলে, দেয়ালের উপরে পিঠটা ধরে রাখে। নন্দিনীর গলা থেকে আর্তি ছিটকে ওঠে, চাপা, ভেজা।

"ছোটু... আমার শরীর..."

"তোমার শরীর।" ছোটু মুখ তোলে, ঠোঁটে ভেজা চকচকে। "আজ থেকে তোমার শরীরের হিসেব আমি রাখব। থামব না।"

নন্দিনীর পিঠ পেছনে বাঁকে, আঙুল ছোটুর চুলে গেঁথে যায়। তার ভেতরে ঢেউটা জমে ওঠে, কোমরের ভেতরে, পাঁজরের দিকে চড়ে যায়, আর তারপর সে ভাবে কী হচ্ছে, কী হচ্ছে, আমার শরীর কী করছে? ঢেউটা ফেটে পড়ে। ভেতর থেকে ভেতরে, কোনো শব্দ ছাড়া প্রায়, শুধু একটা ছেপে যাওয়া আর্তি, যা ছোটু শুনে শোনে, শোনে পুরোটা।

নন্দিনীর শরীর তখন কাঁপছে। ঠান্ডা নয়, কাঁপছে। তার ত্বকে ঘাম উঠেছে, কপালে প্রথম, তারপর বুকের ভাঁজে। ছোটু উঠে আসে, তাকে ধরে দেয়াল থেকে, নিজের বুকে। তার বুকটা গরম, নারকেলের খোল নয়, মাংসের মতো জীবন্ত, তার হাঁফ নন্দিনীর কানে পড়ছে, দ্রুত, বেপরোয়া।

"বউদি।" ছোটু ফিসফিস করে বলে। "আমার কাছে একটা জিনিস আছে, যা তোমার ভেতরে ঢোকার কথা। তুমি কোনোদিন এভাবে জেগে উঠেছিলে কি না, জানিনা। এবার যা হবে, তা ধীরে হবে, তোমার জন্য। তুমি চাও?"

"চাই।" নন্দিনী বলে, গলা ভেঙে যাচ্ছে। "আমার প্রথমবারের মতো চাওয়ার কিছু আছে।"

ছোটু তার হাত নিয়ে নিজের পেটের গিঁটে রাখে, নন্দিনীর আঙুল গিঁটটা খোলে, কাপড় নামে, আর ছোটুর শরীর থেকে সেই জিনিসটা বেরিয়ে আসে, কঠিন, ফুলে ওঠা, তার ছোট্ট হাতে বড়ো মনে হয়। নন্দিনী ধরে, প্রথমবার, নিজের হাতে, তার তালুতে গরম শক্ত মাংস, আর ছোটুর মুখে চোখ বন্ধ, দাঁত চাপা।

"বউদি," ফিসফিস, "সাবধানে।"

নন্দিনীর আঙুল উপরে নিচে চলে, ধীরে, তার নিজের হাতে প্রথমবার এমন ছোঁয়া। ছোটুর শ্বাস ছোট হয়ে আসে, তার হাত নন্দিনীর কোমরে, চাপ দেয়। তারপর ছোটু তার হাত সরায়, ধীরে, আর নন্দিনীকে তুলে নেয়, দেয়ালে পিঠ ভর দেয়, তার পাছা দুই হাতে ধরে।

"ভিতরে ঢুকি?" জিজ্ঞেস করে, ফিসফিসে।

"ঢুকো।" নন্দিনী বলে। "আমার ভেতরে। এখন।"

ছোটু ধীরে ঢোকে। প্রথম ছোঁয়াটা গরম, ভেজা, নন্দিনীর ভেতরটা প্রথমবার প্রস্তুত। তার ভেতরটা গরম, ভিজে, টানটান, তবু ছোটু ধীরে ঢোকে, এক ইঞ্চি, দুই ইঞ্চি, নন্দিনীর গলা থেকে লম্বা, গভীর শব্দ বেরোয়, এবার ব্যথার নয়। ভরাটের শব্দ, প্রথমবার।

"ছোটু..." তার পিঠ পেছনে বাঁকে, "আর থামিস না। কোনোদিন আর থামিস না।"

ছোটু থামে না। সে ধীরে ঠেলে, পুরোটা, তারপর টেনে বেরোয়, আবার ঢোকে। নন্দিনীর ভেতরটা তার চারপাশে জেগে ওঠে, ধরছে, ছাড়ছে, ধরছে, ছাড়ছে, প্রতিটা ধাক্কায়। ছোটুর তাল ধীর, লম্বা টানে, তার নিঃশ্বাস নন্দিনীর কানে পড়ছে, গরম, ভারী, তার হাত নন্দিনীর পাছায়, ধরে রেখেছে, তার পিঠ দেয়ালে পিছলে যাওয়ার ভয়ে কাঁপছে।

বাইরে ব্রিষ্টি ঘন হয়ে এলে, টিনের চালে ঝরঝর শব্দ, আর দালানের ওপাশে ঠাকুমার গলা উঠে আসে হঠাৎ, দূরে, কারো সাথে বিতর্কের গলায়, কড়া শব্দ। নন্দিনীর শরীরে ভয় আর ক্ষুধা একসাথে জ্বলে ওঠে। যদি ওরা আসে। যদি তালা খোলে। তার শরীর তখন ছোটুর ভেতরে, খালি, ভেজা, আর সেই ভয়টা নিষিদ্ধ শিহরণে ফুলে ওঠে, তার ভেতরটা ছোটুকে চেপে ধরে।

"শিউরে পড়েছো?" ছোটু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।

"হুঁ।" নন্দিনী বলে। "ওরা জানলে..."

"জানবে না।" ছোটু বলে। "এ ঘরে তোমার নামের উল্টো পিছ ওরা করে। আমার নামের পিছে তোমার নাম জুড়ে যাবে আজ থেকে।"

ছোটুর তাল দুলে ওঠে, ধীর টানে গভীরে, তার হাত নন্দিনীর বুকে আসে, বোঁটায়, আঙুলের চাপ, আর নন্দিনীর ভেতরে ঢেউটা আবার জমে ওঠে, এবার বড়ো, পাঁজরের দিকে চড়ে যায়, আর তারপর সে ভাবে কী হচ্ছে, কী হচ্ছে, আমার শরীর কী করছে? ঢেউটা ফেটে পড়ে। ভেতর থেকে ভেতরে, কোনো শব্দ ছাড়া প্রায়, শুধু একটা ছেপে যাওয়া আর্তি, যা ছোটু শুনে শোনে, শোনে পুরোটা। নন্দিনীর ভেতরটা তার চারপাশে কাঁপতে কাঁপতে ভেঙে পড়ে, ঢেউয়ের দ্বিতীয়টা প্রথমটার পিছু পিছু আসে, ছোট ছোট, আগুনের আঁচড়ের মতো, আর তার পায়ের ভেতরের মাংস ঠিক ধরে থাকতে পারে না আর।

ছোটুও তখন কান্ডারিনে। তার তাল ভেঙে যায় একেবারে, দ্রুত, হুড়মুড়, তার হাত নন্দিনীর পাছা চেপে ধরে নিজের দিকে টানে, গভীরে, শেষ ইঞ্চি পর্যন্ত, আর তার শরীর শক্ত হয়ে ফেটে যায়। নন্দিনী অনুভব করে ভেতরের ভেতরে গরম ঢেউ, একবার, দুবার, তিনবার, ছলাছলে ভরাট, আর সেই ভরাটের সাথে ছোটুর গলা থেকে চাপা, ভাঙা শব্দ বেরোয়, তার কপাল তার ঘাড়ের গোঁফখানায় বসে যায়, ঘামে ঘাম মিশে।

উভয়ে হাঁপাচ্ছে। দেয়ালে তার পিঠ ভেজা, ছোটুর বুকের ঘামে ভেজা। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে এখনো, তবে ধীরে, ফুরিয়ে আসার দিকে।

তারপর ঠাকুমার গলাটা আবার ওঠে, এবার কাছে। উঠোনের ধারে, পানের বাটা হাতে কারো সাথে ফেরছেন, কথা কাটাকাটির গলায়। পায়ের শব্দ কাদার উপরে, চাপচাপে।

নন্দিনীর শরীর কুঁকড়ে যায়।

পায়ের ভেতরে থেকে, মাংস পেঁচিয়ে, হাঁটু ভাঁজ হয়ে, পিঠ ঘোলাটে হয়ে, পুরো শরীরটা এক মুহূর্তে ছোট হয়ে যায়, ছোটুর বুকের ভেতরে মুখ গুঁজে, ভেতরের ভেজা জায়গা থেকে ছোটুর জিনিসটা বেরোনো হয়ে যায় খুব দ্রুত, ফিসফিস শব্দে, আর তার শরীর আরও কুঁকড়ে যায়, ভেজা চামড়া নিজের ভাঁজে লুকিয়ে, ঠান্ডা টালির দিকে চোখ নামিয়ে, যে ভঙ্গিতে শিশুরা কাঁদে।

"বউদি।" ছোটু ফিসফিস করে। "কী হলো?"

"ওরা।" দুটো শব্দ তার গলা থেকে পেরোয় না আর। "ওরা ফিরছে, তালাটা, তালাটা..."

ছোটু প্রথমে সেই গলার দিকে তাকায়, তারপর নন্দিনীর দিকে। কুঁকড়ে থাকা শরীরটা হাত দিলে ভেঙে যাওয়ার ভয়। সে জোরে নাড়ে না, ধীরে তার কাঁধে হাত রাখে, আঁচল পাশ থেকে তুলে দিয়ে দেয়, নিজের জামা তোলে পরতে। "তালা খোলার আগে দোকান ঠিক করো। হাঁড়ি, কড়াই, আমি জানলার পাশে। বিতর্কের গলাটা ওপাশের পাড়ার, ওরা ওঠানে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র, কয়েক মিনিটের সময় আছে।"

নন্দিনী নড়ে না। শরীরটা নড়তে রাজি নয়। কুঁকড়ে থাকাটাই তার একমাত্র অস্ত্র, তিন বছরে শেখা, এ ভঙ্গিতে কেউ প্রশ্ন করে না, কুঁকড়ে থাকা মানুষকে ওরা ফেলে দিয়ে যায়।

ছোটু হাঁটু গেড়ে বসে তার সামনে। তার ঠোঁটে এখনো ভেজা চকচকে, তার গায়ে এখনো তার ঘাম, তবু চোখটা শান্ত।

"বউদি।" ধীরে, প্রতিটা শব্দ আলাদা করে। "তুমি কাঁদো না। তুমি ভালো করেছো। তোমার শরীর ভালো করেছে আজ, এটা কারো লজ্জার নয়। তালাটা আমি সরিয়ে রাখব, আর তুমি কড়াই হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে, আমাকে ধমক দেবে, হাঁড়ি ভাঙার জন্য। শুনছো?"

নন্দিনী মাথা তোলে। ধীরে। তার চোখে জল নেই, জলের নিচে অন্য কিছু আছে, সে কী করল আমি এখুনি, আর তার পাশে ছায়ার মতো বসে আছে এমন এক ভয়, যে ভয়ের নিচে সেই ভেজা ফসলটা এখনো জ্বলছে।

"ধমক দেব।" সে ফিসফিস করে ফেলে মনে মনে। "হাঁড়ি ভাঙার জন্য।"

"ভেঙেছে তো, ভাঙার নাম ধমক।" ছোটু হাসে, ছোট্ট, চোখের কোণে। "উঠো।"

সে উঠে পড়ে। পেটিকোটের গিঁট বাঁধে, আঙুল এখনো কাঁপছে, গিঁটটা দুবার বাঁধে। ব্লাউজের হুক, আঁচল, মাথায় আঁচল। শরীরের ভেতরে ছোটুর গরম রসটা এখনো আছে, ভিজে, টালির উপরে নেমে আসার সাথে সাথে পায়ের ভেতরে ছলাচল করে, আর নন্দিনী লজ্জায় চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত। ছোটু জানলার পাশে দাঁড়ায়, হাঁড়িটা তুলে দেয় তার হাতে, তারপর তালাটা আগে থেকে রাখা জায়গায় সরিয়ে রাখে এমন করে, যেন না দিয়েই দিয়েছে।

দরজার ফাঁকে ঠাকুমা ঢোকে ঠিক তখনই। আঁচল মাথায়, মুখ ভারী, পানের বাটা হাতে, জ্যাঠাইমা পিছনে।

"কী রে মহারানী, কড়াই ধোয়ে ধোয়ে দুপুর হয়ে গেল?" ঠাকুমা ঘরের ভেতরে চোখ ঘোরায়। জলের হাঁড়ি, উনুন, ঘরের ভেজা হাওয়া। তার চোখ নন্দিনীর মুখে আসে, থামে। "মুখটা কেন লাল?"

নন্দিনীর বুকের ভেতরে হাতুড়ি বাজে। তার গলার কাছে উত্তরটা জমা থাকে, তারপর আসে, তার নিজের গলা দিয়ে, ব্যবহার করা গলা নয়, নতুন গলা।

"মরিচের জল, মা। আর ধমক দিয়েছি ছোটুকে, জলের হাঁড়ি উঠোনে ফেলে রেখে গেছিল। এ ঘরে পুরুষ মানুষ হাঁড়ি তোলার কাজও শিখে না আজ পর্যন্ত।"

জ্যাঠাইমা হাসে, পাতলা। "শুনলি মা, শাস্তি দিচ্ছে এ মহারানী। বিয়ে করে তিন বছর চুপচাপ বউ, আজ হঠাৎ ঘরের মালিক।"

"ঘরের মালিক তুমি মশাই, আমি কড়াইয়ের।" নন্দিনী কড়াই হাতে ঘুরে দাঁড়ায়। তার পিঠ এখনো ভেজা, আঁচলের নিচে ঠান্ডা লাগছে, আর তার ভেতরে ছোটুর গরম রস টা প্রতিটা শব্দের সাথে খোঁচা দিচ্ছে, কিন্তু গলাটা কাঁপছে না। "কড়াই যা বলে তা কড়াই মানে।"

ঠাকুমা আরও একবার ঘরের দিকে তাকান। ছোটু জানলার ধারে দাঁড়িয়ে, কিতাব হাতে, পড়ছে বলে ভান। তার চোখ ঘুরে ফেরে, নন্দিনীর পায়ের কাছে টালিতে কড়াইয়ের জলের ছোপ দেখে, তারপর পেটিকোটের গিঁটে, যেটা দুবার বাঁধা। কোনো কিছুই নিজে থেকে কথা বলে না। ঠাকুমা ফুঁ ছাড়ে।

"চলো রে, আন্দরে জ্যাঠাইমার একটা কাজ আছে।" সে ঘুরে যায়, দরজার মুখে একবার পিছন ফিরে তাকান। "আর মহারানী, তোর মুখের রংটা সারাদিন এই রকম থাকবে না তো? অগ্রজ সন্ধেয় আসবে।"

"রংটা তো দেখলেন। মরিচের।"

ঠাকুমা চলে যায়। জ্যাঠাইমা শেষ দৃষ্টিটা ফেলে যায় ছোটুর জামার উপরে, ঘাড়ের ধারে, যেখানে এক হালকা আঁচড় আছে, চুলের মধ্যে চাপা হাতের ছোপ। তার চোখে সেই সূচালো হাসিটা এবার ধীর হয়ে ওঠে, হিসেবের হাসি। তারপর সেও চলে যায়।

দরজা বন্ধ হলে নন্দিনীর পা নামে মেঝেতে। সে কড়াইয়ের কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, হাঁফ এখনো বড়ো, বুক থেকে বেরোচ্ছে না। ছোটু কিতাব নামিয়ে রাখে।

"তুমি ধমক দিলে।" সে ফিসফিস করে হাসে। "তোমার গলাটা এমন কোনোদিন শুনিনি।"

"আমিও শুনিনি।" নন্দিনী বলে। "গলাটা কোথা থেকে এল জানি না।"

"আমি জানি।" ছোটু এগিয়ে আসে, থামে এক পা দূরে, ছোঁয় না। "ও গলা তোমার শরীরের, আজকে জেগে ওঠা শরীরের। ও গলা আর ঘুমাবে না বউদি। ভেবে রাখো এটা।"

সে থাকে না বেশিক্ষণ। জানলার শিকে বৃষ্টির পরের ভেজা হাওয়া ঢোকে, আর নন্দিনী একলা ঘরে দাঁড়িয়ে থাকে, কড়াই হাতে, উনুনের ছাই ঠান্ডা। তার ভেতরে সব কিছু এখনো কাঁপছে, ভয়ে নয়। তার ভেতরে সেই কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটা ধীরে ধীরে খুলে আসছে আবার, ভাঁজ ভাঁজ সরে, হাঁটু ছাড়ছে, পিঠ ছাড়ছে, আর প্রতিটা খোলার সাথে সাথে সে একটা কথা জমিয়ে নেয়, ইটের মতো, ভিত্তির ইটের মতো: আজ এ ঘরের কেউ তাকে প্রশ্ন করেছিল, মুখ লাল কেন, আর সে উত্তর দিয়েছিল নিজের গলায়, মরিচের জল, আর ওরা তা মেনে নিয়েছে। প্রথমবার ওরা তার কথা মেনেছে।

সন্ধেয় মাধব ফেরে। বউ ভাঙার গাড়ির মতো নিয়মে, ঘড়ি হাতে, জুতোর খোলসে রাস্তার কাদা। নন্দিনী ভাত দেয়, তরকারি দেয়, মাধব খায় বই উল্টাতে উল্টাতে। কিন্তু আজ মাঝপথে তার কাঁটা থামে। সে তাকায় নন্দিনীর মুখে, একবার, দুইবার।

"তোমার চোখ কেমন আছে এ যাবত?" সে বলে, প্রথমবার প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করে। "গোলগাল চোখ, তোমার। আজ কেমন জ্বলছে।"

নন্দিনীর আঁচলে জল জমে যায়। তিন বছরে প্রথম, এই মানুষটা তার মুখটা দেখেছে, সত্যিকারের মুখটা। তার ভেতরের কুঁকড়ে থাকা শরীরটা আবার সরে যাওয়ার ভঙ্গি নেয়, তারপর থামে।

"মরিচের জল মাশাই। আর একটু জ্বরও ছিল, খারাপ লাগছিল দুপুরে। এখন ভালো লাগছে।"

"জ্বর মানে ওষুধ লাগে।" মাধব ভাত খায়। "কাল থেকে দেব, শোকসিকার।"

ও ভাত শেষ করে উঠে যায়, পাগড়ি ঠিক করে, চশমা মোছে। দরজার মুখে থামে, ঘুরে তাকায় না। "আজ শনিবার। বিছানার নিয়মে শনিবার নেই। তালা দিয়ে দরজায় বসো না তবু। ঘুমাও।"

সে চলে যায়। নন্দিনী খাবার সারায়, বাটি ধোয়ে, উঠোনে দাঁড়িয়ে সন্ধের ভেজা হাওয়া খায়। ওপাশে ছোটুর ঘরের জানলায় হারিকেনের আলো, আর সেই আলোর কিনারে ছায়াটা, দাঁড়ানো, অপেক্ষা করা ছায়া নয়, শুধু দাঁড়ানো। নন্দিনীর ভেতরে গরম রস টা এখনো আছে, ছোটুর দেওয়া, নিজের তোলা, দুটো মিলে, আর তার শরীরটা সারাদিনে প্রথমবার কোনো নিয়মের অপেক্ষায় দাঁড়ায় না।

রাতে সে তালা দেয় না দরজায়। শোয়ে, চাদর ঠান্ডা, পাশে স্বামীর হাঁফ সমান, তিন মিনিটের মধ্যে ঘুমের পথে। তারপর ঘড়ি টিক টিক করতে করতে নন্দিনী অন্ধকারে নিজের ভেতরটায় হাত নামায়, ধীরে, প্রথমবার, নিজের হাত, নিজের জমি। তার আঙুল সেই ভেজা, ফুলে ওঠা, কোমল দেশে নামে, বাইরের ধার আগে, চুলের নরম ভাঁজ, তারপর ওপরের ছোট্ট ঢিলে স্থাপত্যটা, যেখানে ছোঁয়া দিলে পেটের ভেতর থেকে একটা মাছ লাফিয়ে ওঠে। সে নিজেই চমকে ওঠে, হাঁটু ভাঁজ হয়ে যায় চাদরের নিচে, গোড়ালি বিছানায় চাপে, আর তার গলা থেকে ছোট্ট, চাপা শব্দ বেরোয়, এই তার নিজের হাত, এই তার নিজের গলার শব্দ, কারো হিসেবের অধীন নয়।

আঙুলগুলো ভিজে যায় ধীরে। কড়াকড়া ড্র্যাগ আস্তে আস্তে পিচ্ছিল হয়ে ওঠে, শব্দটা তার নিজের কানে ভারী, লজ্জার, তবু হাত থামে না। সে ভাবে ছোটুর মুখ, জানলার ধারে দাঁড়ানো ছায়া, তার ঘাড়ের সেই ছোপ, তার ঠোঁটের ভেজা চকচকে, আর তার শরীর সেই মুখের দিকেই পাহাড় পাহাড় উঠছে, কোমরের ভেতরে ঢেউ জমছে। একবার হাত কাঁপে, কোমরে ছোটুর হাতের ভেজা চাপ মনে পড়ে, তারপর আবার নামে। ঢেউটা ফেটে পড়ে একবার, ছোট, নিস্তেজ, কেউ শুনে শোনে না, কিন্তু ফেটে পড়ে।

নন্দিনী শুয়ে থাকে, আঙুল এখনো ভেজা, চাদরের ভাঁজে মুছে নেয়। ঘড়ি টিক টিক করছে। বিছানার নিয়মে আজ বিছানা খালি, আর এই খালিটা এবার শূন্য নয়। এই খালিতে তার নিজের হাঁফ পরিপূর্ণ, তার নিজের ভেজা ফসল দুবার জমে গেছে এক দিনে, যার দাম কেউ চায় না, তবু জমি তার।

দূরে ঠাকুমার ঘরে তালার শব্দ। একটা।

আর তার একটু পরে, খুব হালকা, উঠোনের ওপাশে, একটা পায়ের শব্দ থামে তার জানলার নিচে। কেউ জানলার শিক ছুঁয়ে যায়, একবার, নিশ্চিত হওয়ার ছোঁয়ার মতো, তারপর শব্দটা সরে যায়, নিজের ঘরের দরজার দিকে। নন্দিনী চোখ খোলে অন্ধকারে, ঠোঁটে হাসিটা আসে নিজের অজান্তে, বড়োজোর দমিত, ভয়ের চেয়ে বড়ো না, ঠিক ভয়ের পাশে বসা, এক বালিশ ভাগ করে নেওয়া হাসি।

সে বুঝে যায়, দরজার তালার চাবিটা তার হাতে ফিরে এসেছে, আজ সন্ধেয়, ওরা দেখেনি, কিন্তু জেনেছে। তালা দেওয়া উচিত, নিয়ম বলে তালা দিতে হয়। নন্দিনী উঠে বসে, তালাটা হাতে নেয়, ঠান্ডা ধাতু, তার তালুতে এবার ঠান্ডা লাগে না।

সে তালা দেয় দরজায়। বাইরে থেকে। অন্ধকারে তালাটা বরফের মতো ঠান্ডা। নন্দিনী তা ঘুরিয়ে দেয়, চাবির দাঁত শিকে বসে যায় এক নিস্তেজ টুং শব্দে, আর তার বুকের ভেতরে হাতুড়ি বাজে। কাজটা প্রথমবার করল, এ ঘরের নিয়মের বাইরে, নিজের হাতে। চাবিটা সায়ার ফাঁকে, আঁচলের ভেতরে গুঁজে সে খাটে ফেরে, চাদর টানে, চোখ বন্ধ করে।

ঘুম আসে না।

শরীরের ভেতরে সব জেগে আছে। পেটিকোটের গিঁটের কাছে এখনো ছোটুর আঙুলের ভেজা চাপ মনে পড়ে, আর সেই চাপটা সে একবার মনে করতেই তার হাঁটুর ভেতরের মাংস কুঁচকে ওঠে, নিজের অজান্তে। ঘড়ি টিক টিক। শ্বশুরমশাইয়ের ঘরে হুঁকোর ধোঁয়া নামছে দেয়ালে।

তারপর ঘড়িটা যখন টিক টিক করতে করতে হাজার বার করে ফেলেছে, তখন পায়ের শব্দ। উঠোনের কাদায় চাপচাপে, হালকা, তার জানলার নিচে থামে। নন্দিনীর শ্বাস গলার কাছে জমা হয়ে যায়। তার চোখ বন্ধ আছে, এবার সত্যিই বন্ধ, নিজেকে শক্ত করে বন্ধ ধরে রাখা।

জানলার শিকে হালকা চাপ। তারপর শিকটা সরে যায়, সাইকেলের চেইনের নিস্তেজ ঝাঁকুনি, আর উঠোনের ওপাশে ছোটুর পায়ের শব্দ সরে যায় সিঁড়ির দিকে।

নন্দিনী চাদরের ভেতরে পুরো শরীর শোনে। ঘুমার ভান করা কঠিন, ঘুমের হাঁফটা কোথায় পাবে, কত লম্বা হবে, সে জানে না। সে শুধু শরীরটা ভার করে দেয়, হাত বুকের উপরে ফেলে, হাঁফ দীর্ঘ করে টানে। ঘুমন্ত মানুষের হাঁফ এমনই হয়। শিখে নিয়েছে সে, তিন বছরে, এ দালানে যা করতে হয় না তা সব দেখানো শিখেছে, তাই ঘুমানোও দেখানো শিখেছে।

সিঁড়ির কাঠ কেঁপে ওঠে। এক ধাপ। দুই ধাপ।

দরজার সামনে পায়ের শব্দ থামে। তারপর তালার সাথে চাবিটা মেলে, আর নন্দিনীর বুকের ভেতরে সব থেমে যায়। চাবিটা সে নিজেই তালায় বসিয়েছিল, বাইরে থেকে। চাবি সায়ায় ঝুলত না, তালার গায়ে ঝুলত। ছোটু তা খুঁজে পেয়েছে, বুঝেছে, আর সেই বোঝাটাই তার এখন দরজার দিকে এগিয়ে আসা।

দরজাটা এক আঙুল পরিমাণ খোলে। ভেতরে ঢোকে ভেজা রাতের গন্ধ, মাটি, কাদা, আর তার সাথে সাবানের চেনা গন্ধ। দরজা আবার বন্ধ হয়, ধীরে, এমন করে যে শব্দটা কেউ ঘুমন্তের কানে পড়ে না।

নন্দিনী হাঁফ টানে। লম্বা, সমান, ঘুমন্তের।

"বউদি।" ফিসফিস, খুব কাছে, পাশের বালিশের কাছে। "বউদি, ঘুমাছো?"

সে উত্তর দেয় না। উত্তর না দেওয়াটাই উত্তর, সে জানে। তার হাঁফ একবার সামান্য কাঁপে, এক কাপাট, আর সেই কাপাটটা ছোটু দেখে ফেলে বলে তার অজান্তেই মনে হয়।

খাটের কাঠ সামান্য নড়ে। ছোটু পাশে বসেছে। নন্দিনীর চোখ বন্ধ, কিন্তু তার সারা শরীর জানে ও কোথায় আছে, কত দূরে, কী করে বসে। ঠান্ডা রাতের হাওয়া তার আঁচলের কাচা ধারে ছুঁয়ে যায়।

"চাবিটা তোমার হাতে ফেরত এসেছে আজ।" ছোটুর গলা নিচু, খুব নিচু, শ্বশুরমশাইয়ের ঘরের দেয়াল ভেদ করে যায় না বলে। "তালা দিলে ওপাশে থেকে। এ কাজ এ ঘরে কেউ করে না, বউদি। শুধু একজন করতে পারে, যে ঘুমোয় না তালার নিয়ম মেনে।"

তার হাত নামে নন্দিনীর কাঁধে। ধীরে, আঁচলের উপরে দিয়ে। নন্দিনীর ত্বকের নিচে গায় হয়ে ওঠে, আঁচলের কাপড়ের নিচে লুকিয়ে, আর সে ঘুমন্তের হাঁফ ধরে রাখার চেষ্টা করে, তবে হাঁফটা ছোট হয়ে আসে, গলায় জমে।

"তুমি ঘুমাচ্ছ না।" ছোটু বলে, প্রায় হাসিমুখে, হাসিটা তার গলার সুরে আছে শুধু। "হাঁফটা দেখো। ঘুমন্ত মানুষের হাঁফ পেট থেকে ওঠে, বউদি। তোমারটা বুক থেকে ওঠে, আর বুকটা নড়ছে এখন খুব দ্রুত।"

নন্দিনীর চোখ বন্ধই থাকে। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণ উঠে আসে, আধখোলা এক হাসি, তা সে নামাতে পারে না। প্রথমবার কেউ তার ঘুমকে প্রশ্ন করেছে, আর প্রশ্নটা করেছে এমন গলায়, যে গলায় প্রশ্ন মানে ধমক নয়, প্রার্থনা।

"মিথ্যে ঘুমের শাস্তি আছে বউদি।" ছোটুর আঙুল আঁচলের ভাঁজে ঢোকে, তার কাঁধের কাছে কাপড়ের ভেতরে চাপ দেয়। "জানো কী?"

"কী?" নন্দিনীর গলা থেকে শব্দটা বেরিয়ে আসে নিজের অজান্তে, চোখ বন্ধ, ভাঙা, বড়োজোর ঘুমন্তের ভান ভেঙে যাওয়ার আগ মুহূর্তের।

"মিথ্যে ঘুমানো মানুষটাকে তোলে আসল ঘুম থেকে, আর তোলার হাতটা আমার আছে এখন।"

নন্দিনী চোখ খোলে। অন্ধকারে ছোটুর চোখ দুটো তার সামনে, বড়ো, কালো, জ্বলছে। কারো সামনে তিন বছরে সে এমন চোখ দেখেনি। তার হাত চাদর থেকে বেরিয়ে আসে, ধীরে, আর ছোটুর হাতের উপরে পড়ে, তার নিজের হাত, তার নিজের ইচ্ছায়।

"তালা দিয়েছি আমি।" সে বলে, ফিসফিসে, কবুল করার মতো করে। "বাইরে থেকে। তারপর ভেবেছি, তালা দেওয়া উচিত নিয়মে। কিন্তু তালাটা আমার বিছানার খুঁটিতে বাঁধা থাকত তিন বছর। আজ প্রথম দরজায় বসেছে আমার হাতে।"

ছোটু থামে। তার হাঁফ একবার থামে তার মতো।

"তাহলে বুঝলাম।" সে বলে। "তালার চাবি তোমার হাতে, আর দরজাটা বন্ধ আছে। ওরা ওপাশে, তালার শব্দ নেই এ রাতে। মানে এ সময়টা আমাদের।"

"আমাদের।" নন্দিনী শব্দটা নেয় মুখে, প্রথমবার। শব্দটা তার জিভের উপরে গরম, তিন বছরে কোনো জিনিস তার জিভে এমন গরম হয়নি।

ছোটু নিচে ঝুঁকে আসে, তার নিঃশ্বাস নন্দিনীর ঠোঁটের কাছে। "তাহলে আবার প্রশ্ন করি, ঘুমন্তের সামনে নয়, জাগা মানুষের সামনে। তোমার শরীর এখন কেমন আছে, বউদি?"

নন্দিনীর উত্তর দেওয়ার দরকার পড়ে না। তার হাতটাই উত্তর দেয়, ছোটুর কলার ধরে টান দেয়, আর তার ঠোঁট উপরে উঠে যায় নিজের অজান্তে, তার শরীর আগে আসে, মন পরে। ছোটুর ঠোঁট নামে। চুম্বনটা কাঁপা নয় এবার, ভেজা, লম্বা, আর নন্দিনীর পেটের ভেতরে সেই মাছটা লাফিয়ে ওঠে, তার নিজের হাতে জাগানো মাছটা, এবার অন্য হাতে জাগানোর অপেক্ষায় থাকা।

খাট সামান্য নড়ে। ছোটুর হাত তার কোমরে, শাড়ির পাড়ের নিচে, গরম তালু, আর নন্দিনীর হাঁটু ভাঁজ হয়ে ওঠে চাদরের নিচে, এক পা সামান্য ফাঁক হয়ে যায়, তার নিজের অজান্তে। সে বুঝে ওঠে, লজ্জার ঢেউ তোলে, তবে পা ফেরত টানে না।

"আঁচল থেকে যাক।" ছোটু ফিসফিস করে। "পুরোটা খুলবে না এবার। শুধু যেটা তোমার হাত ছোঁয় নাই এখনো, সেটা ছুঁব।"

"ওরা জাগলে..."

"জাগবে না।" ছোটুর ঠোঁট তার কানের পাশে। "তুমি কাল বলেছিলে, কড়াই যা বলে তা কড়াই মানে। আজ বলো, এ ঘরে আজ রাতে কড়াই বলে কী?"

নন্দিনীর গলা থেকে হাসির সুর বেরোয়, চাপা, বালিশে ঢাকা। তার হাত ছোটুর জামার গিঁটে যায়, খুলতে খুলতে থামে, আবার যায়। "কড়াই বলে যা চলবে, তা চলবে।"

ছোটুর হাত আঁচলের নিচে ঢোকে, তার কাঁধের কাঁচা ত্বকে, ঠান্ডা রাতের হাওয়ায় খালি শরীরে গায় হয়ে ওঠে, আর সেই গায়ের সাথে সাথে তার বোঁটাগুলো শক্ত হয়ে জেগে ওঠে কাপড়ের নিচে। ছোটু তার গলার ধারে মুখ নামায়, ত্বকে গরম শ্বাস, তারপর ঠোঁটের আলতো ছোঁয়া, আর নন্দিনীর পিঠ খাটে কাঁপা এক বাঁক নেয়, তার হাঁফ বুক থেকে বেরিয়ে আসে এক আর্তির প্রথম অক্ষর হয়ে, সে নিজের ঠোঁট কামড়ে তা চেপে ফেলে।

"শব্দ কোরো না।" ছোটু হাসে তার ত্বকের উপরে, ঠোঁটের কাঁপা হাসি অনুভব হয়। "দাদার ঘর ওপাশে।"

"তুমিই কারণ।" নন্দিনী ঠোঁটের দাঁতের চাপ ছেড়ে বলে, ফিসফিসে, গলা ভাঙা। "তিন বছর আমার শরীর শিখেছিল চুপ থাকতে। তুমি এসে তা ভুলিয়ে দিলে তিন সন্ধেয়।"

ছোটুর হাত তার বুকের ভাঁজে নামে, ধীরে, কাপড়ের ভেতর দিয়ে, তার করার কাজের হাত, চুলকানোর নয়, মাপার। নন্দিনীর শরীর ওই হাতের নিচে জেগে ওঠে আবার, ধরছে, ছাড়ছে, আর ওপাশে মাধবের ঘরে ঘড়ি টিক টিক করছে, এবার নন্দিনীর কানে ওই শব্দটা শাস্তির টুং নয়, সময়ের হিসেব, তাদের সময়ের হিসেব, যা চলছে, যা থামছে না।

ছোটুর আঙুল তার ব্লাউজের হুকে যায়। এবার হাত কাঁপছে না। প্রথম হুক, দ্বিতীয়। নন্দিনীর বুকের ভাঁজে ঠান্ডা রাতের হাওয়া ঢুকে যায়, গায় হয়ে ওঠে, বোঁটা কাপড়ের নিচে শক্ত। ছোটু মুখ নামায়, ঠোঁটে নেয় একটা, চুষে, জিভের গরম বৃত্তটা আঁকা দেয়। নন্দিনীর পিঠ খাট থেকে উঠে আসে, কোমরের ভেতরে সেই ফাঁপা ক্ষুধা জেগে ওঠে। তার হাত ছোটুর পিঠে, নখ জামার কাপড়ে বসে যায়।

"আজ তালা আমি দিলাম।" সে ফিসফিস করে বলে, মুখ ছোটুর কানে। "কাল দেব না বোধহয়। কাল ভয় পাব বোধহয়।"

"কাল পাবে না।" ছোটুর ঠোঁট তার ঘাড়ের ধারে। "কারণ কাল আমি আগে আসব। ঘড়ি টিকটিক করতে করতে যে ফাঁকটা থাকে, দশ মিনিটের ফাঁক, মাধবদা চশমা মোছার ফাঁক। ওই ফাঁকে আমি জানলার নিচে।"

"পাগল তুই।"

"হুঁ।" ছোটু হাসে, হাসিটা তার ত্বকে অনুভব হয়। "তোমার জন্য।"

তার হাত পেটিকোটের গিঁটে যায়, খোলে। কাপড়টা নামে, আর নন্দিনী খালি, আঁচল এক কোণে চাপা ঠান্ডার ভেতরে। ছোটু উপরে উঠে আসে, তার নিজের জামা খুলে ফেলে, আর নন্দিনীর তালু তার খোলা বুকে পড়ে, গরম, স্নান করা সাবানের গন্ধ, ঘামের নিচে। ছোটুর শরীর তার উপরে, ভারটা ভালো, তিন বছরের শূন্য ভারের উল্টো।

"এবার ঢুকব, বউদি।" ছোটুর গলা ভারী, ফিসফিস। "শব্দ করো না, তবে চেপে ফেলো না। আমি শুনতে চাই আজ।"

নন্দিনী মাথা নাড়ে। তার পা নিজেই খুলে যায়, হাঁটু ছোটুর পাঁজরের দুই পাশে। প্রথম চাপটা আসে ধীরে, ভেজা দরজায় গরম মাথা, তারপর দীর্ঘ ঢোকা, এক টানে পুরোটা, আর নন্দিনীর গলা থেকে শব্দটা বেরিয়ে আসে আটকে যাওয়া হাঁফের ভেতরে, ভরাটের আর্তি। তার ভেতরটা ধরে, ছাড়ে, প্রতিটা ইঞ্চিতে জেগে ওঠে।

ছোটুর তাল ধীর, লম্বা টানে। খাটের কাঠ নড়ে না যত্নে সে শরীর ধরে রাখায়। তার নিঃশ্বাস নন্দিনীর কানে, গরম, ভাঙা। নন্দিনীর কোমর নিজেই উঠে আসে প্রতিটা ধাক্কার মিলে, তার শরীর আগে শিখেছে এ তাল, দুই রাতের পড়াশোনায়, এখন তা পরীক্ষা দিচ্ছে। তার বোঁটা ছোটুর বুকে ঘষছে, সেই ঘষায় ভেতরের ঢেউটা পাঁজরের দিকে চড়ছে।

"ছোটু," ফিসফিস, ভেজা, "ভালো লাগছে, আমার..."

"জানি।" তার হাত নন্দিনীর পাছার নিচে ঢুকে ধরে, তাল একবার গভীরে, শেষ ইঞ্চি পর্যন্ত, থেমে যায়, ছলাছলে লিঙ্গ। "এই লিঙ্গটা তোমার দরকার ছিল তিন বছর। এখন পেয়েছ।"

তাল আবার চলে, ধীরে, তারপর দ্রুত, হুড়মুড়। নন্দিনীর ভেতরে ঢেউটা ফেটে পড়ে, ছোট, দ্বিতীয় আসে প্রথমটার পিছু, তার পায়ের ভেতরের মাংস কাঁপছে, গোড়ালি ছোটুর পিঠে চাপ দিয়ে ধরে আছে। তার গলা থেকে চাপা আর্তিটা ছোটুর কাঁধে বসে যায়, আর ছোটুর শরীর শক্ত হয়ে ফেটে যায়, গরম ঢেউ ভেতরের ভেতরে, একবার, দুবার।

স্তব্ধতা। ঘড়ি টিক টিক। বাইরে ভেজা মাটির গন্ধ জানলার ফাঁক দিয়ে।

ছোটু পাশে সরে শোয়ে, নন্দিনীকে আঁচলের ভেতরে টেনে নেয়, জড়িয়ে। তার হাঁফ সমান হচ্ছে ধীরে। নন্দিনীর আঙুল তার বুকে, হৃদপিণ্ডের জায়গায়, সেই দ্রুত টুংটুং টের পাচ্ছে।

"এভাবে প্রতি রাতে আসবে?" সে জিজ্ঞেস করে, লজ্জার সুরে।

"যতবার পারব।" ছোটু বলে। "যতবার তুমি তালা দেবে।"

"আমি তালা দিলে ওরা প্রশ্ন করবে। ঠাকুমা দেখবে, জ্যাঠাইমার চোখ সব দেখে।"

"বউদি।" ছোটু উপরে উঠে আসে কনুইয়ে ভর দিয়ে, অন্ধকারে তার চোখ। "ওরা প্রশ্ন করবে, তুমি উত্তর দেবে। আজ দেখেছি আমি, তোমার গলা জেগেছে। মরিচের জল বলে বলে যাও, তারপর কড়াই হাতে দাঁড়িয়ে থাকো। ওরা ভয় পায় তোমার নতুন গলা থেকে, বুঝেছি আজ।"

নন্দিনী চুপ করে। তার ভেতরে কথাটা জমে, ইটের মতো, আরেকটা ইট। তার শরীরে এখনো ছোটুর গরম রস আছে, ভিজে, পায়ের ভেতরে ছলাচল করে সামান্য নড়লেই। সে ভাবে, এটা প্রতিদিন হবে এখন। সকালে মরিচ বাটা, দুপুরে কড়াই, রাতে এই ভিজা, এই ভরাট, এই বুকের টুংটুং। তিন বছরের ঠান্ডা দালানের ভেতরে গরম একটা দেশ খুলে গেছে, আর সে দেশের তালার চাবি তার আঁচলে।

"একটা কথা বলি তবে।" ছোটুর গলা আরও নিচু, কথার ওজন বাড়ছে। "জ্যাঠাইমা আজ আমার ঘাড়ের আঁচড়টা দেখেছে। তার চোখে হিসেব ছিল। ও কিছু বলবে না এখনই, ও জমাবে। তাই আগামীকাল থেকে আমি আর রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াব না। জলের হাঁড়ি নিয়ে আসব না। সবার সামনে আমরা একে অপরকে চিনব না, বউদি। দিনের বেলায় আমি তোমার দেবর, শুধু।"

নন্দিনীর বুকের ভেতরে ঠান্ডা একটা ফোঁটা নামে। তবে সে বুঝে, এটাই দাম। চোরের মতো চলতে হবে, আর চোর রা যে ভালোবাসে তার সাথে, তার নিয়ম আছে।

"তাহলে কখন?"

"রাতে। তালার রাতে।" ছোটু তার চিবুকে আঙুল রাখে, আলতো। "আর একটা দিন আছে, বউদি। বর্ষার একটা দুপুর, যখন সবাই ঘুমায় ভাতের পরে। ওই ফাঁকটাও আমার চোখে পড়ে আছে।"

"তুই সব ফাঁক দেখিস বোধহয়।"

"শুধু তোমার ফাঁক।" ছোটু হাসে। "সে ফাঁক দেখতে দেখতে আমার চোখ ওই দিকেই জেগে গেছে।"

সে উঠে পড়ে ধীরে, জামা পরে, দরজার দিকে যায়। তালায় চাবি মেলে নিস্তেজ শব্দে, দরজা খোলে এক আঙুল, ভেজা রাতের হাওয়া ঢোকে এক ফোঁটা। যাওয়ার আগে ঘুরে তাকায়।

"বউদি। কাল সকালে তুমি আমাকে ধমক দেবে, ভাত ঠান্ডা হয়ে গেছে বলে। মনে রেখো। ওরা দেখুক, আমরা বাইরে কি। দেখবে না, আমরা তালার ভেতরে কি।"

সে চলে যায়। উঠোনের কাদায় পায়ের শব্দ সরে যায়, সিঁড়ি কেঁপে ওঠে দুই ধাপ, তারপর ওপাশে তার ঘরের দরজার হালকা টুং।

নন্দিনী শুয়ে থাকে, আঁচলে চাদর টানে। তার শরীর কাঁপছে এখনো, ধীর ঢেউয়ে, আর তার ঠোঁটে হাসিটা এখনো আছে, অন্ধকারে লুকানো। ঘড়ি টিক টিক করছে, আর তার কানে ওই শব্দটা এবার হিসেব করছে, কতক্ষণ বাকি ভোর পর্যন্ত, কতক্ষণ বাকি কাল রাত পর্যন্ত, কতটা বাকি সেই বর্ষার দুপুর পর্যন্ত। সে প্রথমবার এ দালানে সময়ের অপেক্ষা করছে, শাস্তির অপেক্ষা নয়।

ভোরে তালা খোলা হয় দূরে। নন্দিনী উঠে পড়ে, পেটিকোটের গিঁট বাঁধে, এবার একবারেই বাঁধে, হাত কাঁপছে না। নিচে নামতে দেখে ছোটু উঠোনে, জলের হাঁড়ি মাথায়, ঠাকুমার দিকে পিঠ করে। সে তাকায় না, ছোটুও তাকায় না। শুধু হাঁড়িটা নামানোর সময় ছোটুর হাত একবার সায়ার ফাঁকে থামে, এক সেকেন্ড, আঁচলের ভাঁজের কাছে, যেখানে চাবিটা বাঁধা। তারপর সে চলে যায়, কলেজের ব্যাগ কাঁধে, ঠিক এক বছর আগে।

ঠাকুমা কড়াইয়ের পাশ থেকে বলে, "বড়োবউ, ভাত গরম রাখ।" আজ জ্যাঠাইমা বলল," তোর ব্যবহারটা একটু দেখতে ইচ্ছে করছে।"

নন্দিনী আঁচল ঠিক করে, চাবিটা ভাঁজের ভেতরে চেনা ঠান্ডা চাপ দেয় তার কোমরে। "গরম রাখব মা। দেখবেন যা দেখতে ইচ্ছে।"

সে উনুনে আগুন জ্বালায়, আর আগুনের তাপ মুখে এলে সে ভাবে, দেখবে সব। কিন্তু এ দালানে এখন একটা জিনিস আছে যা কড়াই ঢেকে রাখে, আঁচলের ভেতরে, তালার চাবির সাথে বাঁধা, প্রতিদিনের।