জয় নিতাই

Joy Nitai

মালিকের কাছে জোর পূর্বক লাঞ্ছিত হওয়া মা কে কি তার ছেলে রক্ষা করতে পারবে নাকি খুলে যাবে এক নিষিদ্ধ সম্পর্কের দরজা?

লেখক: Limshow

ক্যাটাগরি: মা ছেলের মিলন

সিরিজ: জয় নিতাই

প্রকাশের সময়:07 Nov 2026

দুপুরের নদিয়ার রোদ টিনের চালে পড়ে চাটু করে উঠছে। ভেতরে তেল জ্বলছে, সরষের তীব্র গন্ধের সাথে মিশে আছে কাঁচা মরিচ ভাজার ধোঁয়া। নীতাই কড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে, ঘাম তার অফহোয়াইট গেঞ্জির পিঠ ভিজিয়ে দিয়েছে। ডান হাতে চামচ, বাঁয়ে হাতের কবজিতে তামার গোটা গাঙ্গেয় আলো ধরে আছে।

"ভাই, দুটো মুড়ি জোলদি দে," পাশের দোকানের কার্টন মিস্ত্রি বলে।

নীতাই উত্তর দেয় না। হাতটা তাড়াতাড়ি নড়ে। আলুরচোপ তেল থেকে উঠে আসছে, ঝরঝরে সোনালি। বছরের পর বছর এই হাতের রাস্তাটা তার জানা। কোন কাস্টমার কী চায়, কে বেশি কাটা পেঁয়াজ খায়, কে তাজা চপ চায়, সব মুখস্থ। বাজারের লোকেরা তাকে বাবু ডাকে, সম্মান দেখায়। তবু মনের ভেতরে একটা ফাঁকা জায়গা, যেটা কোনো ফ্রাইং প্যান ভরাট করতে পারে না।

বিকেলের দিকে কলেজ ছুটির সময় হলো।

প্রথমে আনন্যা ঢুকল, সাথে তিনজন বন্ধু। পরনে লাল প্রিন্টের কুর্তি, জিন্সে বেঁধে বোঁটা হাওয়ায় দুলছে। রোদে পোড়া সোনালি শরীর, ছোটখাটো, কিন্তু পুরো রাস্তার মতামত তার মুখে উঠে আসে।

"নীতাইদা, আজকে কী দিচ্ছিস?" আনন্যা কাউন্টারে হাত ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। কুর্তির কলার ফাঁকে ভেজা চামড়া, ঘামের হালকা তাপ। সস্তা গোলাপ পারফিউমের গন্ধ, আর তার নিচে তরুণ মেয়ের নিজস্ব ঘ্রাণ।

নীতাই চোখ তোলে, তারপর নামায়। "কী চাও বলো, সেটাই দেব।"

"আরে কী জালা!" আনন্যা হাসল, কানের বালিতে শিক নড়ে। "সব ভালো খেতে ইচ্ছে করছে আজ। তুমি তো রাঁধো, বল না কী ভালো হবে?"

নীতাই মনে মনে চোখ বুলায় মেয়েদের উপর। সামনেরটার কুর্তির প্লিট দুটো কোমরে ঘেঁষে ঢুকে গেছে, তার ভেতর দিয়ে তরুণ পাছার বাঁক ধরা পড়েছে। পেছনেরটা হাঁটতে হাঁটতে স্কার্ফ সরিয়ে ঘাড়ের কালচে দাগ মুছছে। ঘামে ভেজা টি-শার্টের নিচে ছোট্ট বুকের ভাঁজ স্পষ্ট, নিপলের ছোঁয়া। নীতাই গলা খুঁচড়ায়, কড়াইয়ে চামচ ডিগবাজি খায়।

"পকড়ি ভাজা মুড়ি, ভাজা চপ, বেগুনি,তার উপর ডিম, রোল, চাউমিন। খাবে?"

"এই নাও দা, পুরো মেনু বলে দিলে!" আনন্যা ভাঁজ করে হাসছে। "কিন্তু একটা কথা, তোমার খাওয়া এত ভালো হয়, তুমি এখনো একলা থাকো কেন?"

নীতাই মেয়েদের হাসির শব্দে তেলে ডিম ভাঙে। হলুদ কুসকুসে সাদা বরফ ছড়িয়ে পড়ে, হিস করে ওঠে। এই মেয়েদের দিকে তাকানো ভালো লাগে, স্বীকার করে। কিন্তু ভেতরে একটা ক্ষুধা, যেটা এই ছোট্ট মেয়েদের ফ্লার্ট দিয়ে মেটে না। এদের হাসিটা পাতলা, উপরের দিকে ওঠে না। যা সে চায়, সেটা এদের মধ্যে নেই।

আনন্যার বন্ধু সুন্দরী একটা দাঁত বের করে তাকিয়ে ফিসফিস করে হাসে। নীতাই সেটা দেখে, ধরে ফেলে। মুখে নিরুদ্বেগ রেখে প্লেট বানায়। চপ মুড়ি ,বেগুন ভাজা লাল, উপরে কাটা পেঁয়াজ সঙ্গে একটু লেবু নিচুড়ে।

"খাও, আর কিছু লাগবে?"

আনন্যা এক থাবা মুড়ি হাতে নিয়ে বলে, "বড়ো ভালো লাগছে দা। আরেকদিন আসব, তখন ফ্রি দিবি তো?"

"একদিন হিসেব করব, তখন বলব।"

মেয়েরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়। ঘরে যায় তাদের পারফিউমের হালকা গন্ধ। নীতাই তার পেছনে পেছনে তাকায়, জিন্সের ভেতরে আটকে থাকা ছোট্ট পাছা নেড়ে চলে যায়। তারপর চোখ ফেরায় কড়াইয়ে, আর মনের ভেতরে একটা ক্ষিধে গিঁত কামড়ে ধরে। এ যেন একটা ক্ষুধা, যেটা এই সব সস্তা হাসি দিয়ে ভরে না।

আকাশের দিকে তাকায়। সকাল থেকেই চালের উপর ধুলো উড়ছিল। এখন পুরু কালো মেঘ জমছে, ভারী, পানি ভরা। বাতাস থেমে আছে, পড়ন্ত বিকেলের ভেজা ভার নেমে এসেছে। নাকের ডগায় মাটি ভেজা হবে, এমন কাঁচা গন্ধ।

এক তলায় ঝাপটা পড়ল আকাশ। তারপর বৃষ্টি নামল, ঝুরঝুরে নয়, ঢালু, ধারালো। টিনের চালে এমন শব্দ, যেন কেউ পাথর ছুঁড়ছে। নীতাই দ্রুত দোকানের সব গুছিয়ে শামিয়ানা ছানি দিল।

"আজ আর বেশিদূর হবে না।"

শেষ কাস্টমার চলে গেল। দোকানের পর্দা নামায়, তালা দেয়। বৃষ্টির জলে ভেজা রাস্তায় নিজের পায়ের নিচে ধোঁয়া ওঠা কাদা দেখে। চাদর মাথায় দিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে যায়। ভেজা শরীর, ভেজা গেঞ্জি পিঠে ঠান্ডা লাগছে, তবু মনে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা।

বাড়ির দরজা ধাক্কা মেরে খোলে। ভেতরে অন্ধকার, ভেজা মাটির গন্ধ। ঘরের ভেতর যে শব্দ, সেটা প্রায় নেই। দেয়ালের কাছে খাটে শুয়ে আছে বিমল, নীতাইর বাবা। গায়ে চাদর, মুখের চামড়া চিকন হয়ে গেছে বছরের ওষুধ আর ঘামে। হাতে চারটা আঙুল নেই। চোখ বড়ো বড়ো, ফাঁকা, কোথাও না পড়া দৃষ্টি।

নীতাই দাঁড়িয়ে দেখে। ঘরের বাতাসে পুরনো ওষুধের তীব্র গন্ধ, আর তার নিচে সুস্থ হওয়ার গন্ধ নেই, যে গন্ধ একটা বাড়িকে বাড়ি বানায়। বিমল চোখ তোলে, একবার দেখে, তারপর আবার সেই ফাঁকা দৃষ্টি। কোনো কথা নেই।

"খেয়েছ?" নীতাই জিজ্ঞেস করে।

বিমল মাথা নাড়ে। না।

নীতাই মনে মনে ভাবে, এই ঘরের ভেতর একটা কিছু ক্ষয়ে যাচ্ছে বহু বছর। একটা ফাঁকা জায়গা, যেটা কেউ ভরে দেয় না। তার মায়ের শরীরে, তার মায়ের চোখে, সেই ফাঁকের ছায়া পড়ে আছে। সে ভাবতে ভাবতে ঘরের ভেতরের দিকে তাকায়, যেখান থেকে রান্নাঘরের দিকে জল পড়ার শব্দ আসছে।

নীতাই চোখ তুলে তাকায়, আর সেই তাকানোর ভেতরে একটা নতুন কিছু ঘটছে, যেটা সে এখনো নাম দিতে পারছে না। দুর্বল হয়ে আসা সেই দৃষ্টিটা সে চোখের পাতা নামিয়ে লুকিয়ে ফেলে। ঠিক তখনই বাইরের দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ। কাঠ কাঁপে, আর ভেজা বাতাসের এক থাবা ঘরে ঢুকে পড়ে।

নীলিমা ঢোকে না, ভিজে ঢোকে। গায়ে কোনো ছাতা নেই, পাগড়ি নেই, কিছুই নেই। বৃষ্টি তাকে পুরোপুরি গিলে নিয়েছে। ফেড-ইন্ডিগো শাড়িটা শরীরে চিপকে দ্বিতীয় চামড়ার মতো বেঁধে আছে। সে হাঁটে, আর প্রতিটা পায়ে তার পুরনো হাওয়াই চটি চটচট করে জল ছোঁড়ে। মাটিতে পায়ের ছাপ পড়ে, ভেজা, চকচকে।

"এ কী, এমন ভিজে গেলি?" নীতাই উঠে দাঁড়ায়, গলা কেঁপে যায় মনে হয়।

"ব্রতীন্দ্রবাবুর বাড়ি থেকে ফিরতেই ঢাল খুলল।" নীলিমা মাথার জল হাত দিয়ে সরায়। "ছাতা নিলে আর বাজারের ব্যাগ হাতে রাখব কী করে?"

সে ব্যাগটা খাটের পাশে রাখে। নীতাই তার দিকে তাকায়, আর তাকানোটা আর ওই কলেজের মেয়েদের তাকানো নয়। নীলিমার চওড়া পিঠের উপরে শাড়ির আঁচলটা চিপকে গেছে, তার নিচে কোমরের ভাঁজ দুটো স্পষ্ট। ভেজা কাপড় যেখানে যা আছে সব দেখায়, লুকায় কিছুই না। পিঠের চামড়া ফ্যাসল ফ্যাসল করে দেখা যাচ্ছে আঁচলের ফাঁক দিয়ে, আর নীতাই মনে মনে গুনে যায়, চওড়া বাঁকটা কোথায় নেমে পাছার গোল পাড়ে মেশে।

"তুই আবার ভিজলি না ?" নীলিমা জিজ্ঞেস করে, গেঞ্জির দিকে চোখ রাখে।

"দোকান বন্ধ করতে করতে ভিজেছি।" নীতাই তার জন্য একটা শুকনো গামছা আনতে যায়, তারপর ফেরে। হাত নড়ছে না।

নীলিমা বসে, খাটের কিনারায়। পায়ের পাতার জল ঝরে মাটিতে। ঝুঁকে পড়তে গিয়ে পেটের নরম মাংসটা ভাঁজ হয়ে ওঠে, শাড়ির পাটা সেই ভাঁজের উপর দিয়ে চিকন হয়ে টান পড়ে। নীতাই সেটা দেখে। ছোট্ট, গোল উঁচুটা। কলেজের মেয়েদের চিকন পেটে এই জিনিসটা নেই। এটা নরম, বাঁচা, খাওয়াদাওয়া করা শরীরের দাগ। নীতাই নিজের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে দেখে।

"তোর বাবা খেয়েছে?"

"না।" নীতাই মাথা নাড়ে। "আমি রান্নি?"

"রান্নি না, আগে এই ভেজা কাপড়টা খুলে বদলে নে। ঠান্ডা লাগবে।"

"আচ্ছা।" নীলিমা উঠতে গিয়ে হাওয়াই চটিতে পা পিছলে যায়, নীতাই ঝাঁকুনি দিয়ে হাত ধরে।

হাতটা ভেজা। রান্নাঘরের সাবানের গন্ধের নিচে, বৃষ্টির জলের নিচে, একটা নরম, উষ্ণ গন্ধ তার নাকে এসে পড়ে। নারীর শরীরের নিজস্ব গন্ধ। ঘাম, জল, সাবান, আর তার নিচে কী যে মাংসল, বাঁঝা গন্ধ। নীতাই হাত ছাড়ায় বড়জোর।

"তো এ কী, পড়ে যাবি আবার?" সে বলে, পিঠে ঘাম নামছে।

"বয়স হয়েছে বুঝলি।" নীলিমা হাসে, চোখের কোণে ক্ষুদ্র রেখা দুটো গড়িয়ে।

সে ভেতরের ঘরের দিকে যায়, প্রতি পায়ে চটি চটচট করে। নীতাই পেছনে পেছনে হাঁটে, আর তার চোখ যায় নীলিমার পাছার দিকে। ভেজা শাড়িটা সেই চওড়া, গোল অংশটার উপর টানটান হয়ে বাঁধা, প্রতিটা নড়াচড়ায় কাপড় তলতল করে ওঠে। কোমরটা বেল্টের মতো সরু, তার নিচে দুটো গোল ঢিল। নীতাই মনে মনে নাম্বারগুলো জানে না, তবে চোখ গুনে যায়। চওড়া, বাঁকা, ভারী। তার বাবার ঘরে শোয়া মানুষটার দিকে তাকিয়ে তার কপাল পুড়ে যায় নিজের ভাবনায়।

নীলিমা আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে আঁচল খোলার সেফটিপিন ছাড়ে। আঁচলটা জল ভিজে শরীর থেকে ছাড়তে কষ্ট হয়, তার উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে, নীতাইকে বলে।

"বাইরে থাক, কাপড় বদলাচ্ছি।"

নীতাই ঘর ছেড়ে যায়, দরজা বন্ধ হয়। কিন্তু ছবিটা চোখে লেগে আছে। আঁচল ছাড়তে গিয়ে সে যে ভুল দিকে ঘুরেছিল, সেই এক মুহূর্তে পেছনের চওড়া ব্লাউজের ফাঁক, হুকের ছোট্ট বাঁধন, চামড়ার রেখা। নীতাই ভিজা চুল মুছতে মুছতে খাটের পাশে বসে। বিমল তাকায়, তারপর কিন্তু কিছু বলে না।

ভেতর থেকে কাপড় খোলার খসখস শব্দ, শাড়ি জল ঝরানো, তারপর নীলিমার গলার হালকা শব্দ। নীতাই নিজের চোখ বন্ধ করে, সেই শব্দগুলোর পেছনে সে দেখে। ভেজা শাড়ি শরীর থেকে উঠে যাওয়া, চিকন ব্লাউজ, বেল্টের মতো কোমর, পেটের নরম ভাঁজ। তার মা। সে জানে কে। তবু শরীরের ভেতর কিছু জ্বলছে, যেটা নাম মানে না।

নীলিমা পুরনো সুতির সালোয়ারে বেরিয়ে আসে, চুল খোলা। ভেজা চুলের সমাবেশ গুলো ঘাড়ে পড়ে আছে। সে ভেজা শাড়িটা একগোঁছ করে তুলে বলে, "এটা ছাদে মেলে দে, ঝুলিয়ে রাখ। পিচ পিচে করে উঠছে।"

নীতাই হাত বাড়িয়ে নেয়। শাড়িটা ভারী, জল ভরা, আর প্রগাঢ়। সাবান, বৃষ্টি, আর সেই নরম নারীগন্ধ কাপড়ের ভেতরে তলে তলে জমে আছে। সে ছাদের দিকে যায়, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে শাড়িটা মুখের কাছে আসে। নাক দিয়ে গন্ধ নেয়, ধীরে, একবার।

ছাদে দাঁড়িয়ে সে শাড়িটা তারে মেলে। বৃষ্টি এখন ঝরঝরে নেমেছে, ঠান্ডা ফোঁটা তার ঘাড়ে পড়ে। নীচে ঘরে নীলিমার শব্দ, খাবার রান্নার আওয়াজ, হাওয়াই চটির চটচট। নীতাই ভেজা শাড়ির কোণাটা ছাড়ে না, আঙুল চিপে ধরে রাখে দীর্ঘ এক মুহূর্ত। তারপর ভাবনায় নিচে ফিরে যায়, মুখে কিছু নেই, ভেতরে আগুন জ্বলছে।

দাঁতে দাঁত চাপ দেয় নীতাই। ছাদের ইট ভেজা, ঠান্ডা জল পায়ের তলায় পড়ে আছে। আজ এই চোখটা নিয়ে সে বড়জোর বিমলের ঘরে দাঁড়িয়ে থাকে।ভেতরে আগুন জ্বলছে। সে শাড়ির কোণা ছেড়ে দেয়, নিজের হাতটা দেখে, অদ্ভুত লাগে হাতটা। ঠান্ডা বৃষ্টির ফোঁটা ঘাড় বেয়ে নামছে, তবু শরীরের ভেতর তপ্ত কিছু ঘোলাটে হয়ে আছে।

সিঁড়ি নামতে নামতে হঠাৎ পেছনে চলে যায় কোনো এক বর্ষার সন্ধ্যা। সে তখন ছয় সাত বছরের ছেলে, জ্বরে পুড়ে কাঁদছে ঘুমের ঘোরে। নীলিমা তার মাথাটা কোলে তুলে নিয়েছিল। তার নরম হাতটা কপাল মুছেছিল, চুলের গোছাটা এলিয়ে পড়েছিল বুকের উপর, আর সেই চুলের গন্ধ, নারকেল তেল আর নিজস্ব এক নরম উষ্ণতা, তার পুরো ভয় দূর করে দিয়েছিল। ছোট্ট নীতাই তার আঁচল ধরে ঘুমিয়ে পড়েছিল, নিশ্চিন্ত। মা মানে সেখানে নিরাপত্তা। মা মানে ক্ষুধা মেটানো হাত, ছোঁয়ার ভেতর শাসন আর স্নেহ মিশে থাকা।

সেই স্মৃতিটা আজ কেমন অন্যরকম হয়ে ফিরে আসছে। একই শরীর, কিন্তু দৃষ্টিকোণ বদলে গেছে।

নিচে নেমে দেখে রান্নাঘরে আগুন জ্বলছে, নীলিমা লাউ কাটছে। সালোয়ারের উপরে ভাঁজ করা পাটকা পিঠে। ভেজা চুল এখনো খোলা। নীতাই দরজায় দাঁড়ায়, আর চোখটা সেখানে যায়। ঘাড়ের পেছনের নরম সাদা চামড়া, চুলের ভেজা কালো রেখা, তার নিচে ঘাড়ের ভাঁজ।

"দাঁড়িয়ে আছিস কেন?" নীলিমা ফিরে তাকায় না, শুধু গলায় বলে। "খেয়ে নে আয়, তোর বাবাকে আগে দে একটু।"

নীতাই খাটের পাশে বসে, প্লেটে ভাত তুলে নেয়, কিন্তু চামচ নড়ে না। রান্নাঘর থেকে নীলিমা এসে বিমলের মাথার কাছে বসে, প্লেট হাতে নেয়। ঝুঁকে পড়তে গিয়ে কাপড়ের নিচে তার বুকটা ভারী হয়ে ঝুলে পড়ে, পুরনো সুতির কাপড়টা টান পড়ে ফুলে ওঠা বুকের গোলাই ধরা দেয়। হাওয়া চলে গেছে একবার, তারপর আবার নিঃশ্বাসে বুকটা উঠে নামে, ধীরে, ভারী করে। বৃষ্টিতে হাঁটা হাঁপানির ছোঁয়া এখনো তার শ্বাসের ভেতর আছে। নীতাই সেই উঠেনামাটা দেখে, আর তার মুখ গোঁজার মতো জ্বলে ওঠে।

বিমল চামচ হাতে নেয় না। নীলিমা তার হাতটা ধরে চামচ তুলে দেয়, আর সেই ভাঙা হাত, চারটা আঙুল ছাড়া, তার মায়ের নরম আঙুলের মাঝে অসহায় হয়ে পড়ে আছে। একটা বারো বছরের বাচ্চার মতো বিমল ভাত খায়। নীলিমা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে ঘাড় না সরিয়ে, যেন এটা সে সামলে নিয়েছে বহু বছর ধরে।

"তোর খাওয়া হলো?" নীলিমা জিজ্ঞেস করে নীতাইয়ের দিকে।

"আমার না খেতে ইচ্ছে করছে না।"

"ভাত আছে, দেরি করিস না।"

সে উঠে রান্নাঘরে ফিরে যায়। নীতাই প্লেটের দিকে তাকায়, তারপর আবার তার মায়ের দিকে। এখন সে জানে, সে আর ছেলের চোখে দেখছে না। ছেলের চোখে মা মানে আঁচলের নিরাপত্তা, ছয় বছরের জ্বরের রাতের কোল। কিন্তু আজ সে দেখছে কোমরের নিচের চওড়া পাড়, বসে থাকলে চিরে ফাটা শাড়ির ভাঁজ, কাপড়ের নিচে ফুলে ওঠা বুক, ঘাড়ে লেগে থাকা ভেজা চুলের কালচে গোছাটি। শরীরের ভেতর থেকে কোনো এক জায়গা থেকে গরম কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে, আর সেটা লজ্জার সাথে লড়ছে।

এটা তার মা। সেই শরীরটা তাকে পেট থেকে কোলে তুলেছিল, ক্ষুধার রাতে খাইয়ে ছিল। সেই হাতটাই কতদিন তার কপালে জ্বর মেপেছিল। নীতাই দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে, আর যখন খোলে, সেই চোখ আবার সেখানেই চলে যায়। পার্থক্যটা এটাই, সে বুঝতে পারে। ছেলে ভিতরে ঢুকে যায় না, ছেলে স্নেহ নেয়। কিন্তু নারী চায়। আর সে এখন চেয়ে বসে আছে, নিজের মাকে।

বিমল কোনোদিন এই ক্ষুধার ভাগ নেয় না। এই ঘরে নীলিমার শরীরটা ফুলে উঠেছে বছরের পর বছর, আর কেউ সেটাকে ছুঁয়ে দেখে না, চেয়ে দেখে না। একটা ফাঁপা, অদৃশ্য শূন্যতা তার মায়ের চারপাশে জমে আছে, আর সেই শূন্যতার গন্ধই ঘরের ভেজা বাতাসে তলে তলে মেশে।

নীলিমা গিয়ে রান্নাঘর থেকে ডাকে, "এই, তোর প্লেট এই জায়গায় আন, এখানে বসে খা। ভিজে যাবি বুঝি ওখানে?"

নীতাই প্লেট হাতে উঠে যায়। রান্নাঘর ছোট্ট, ধোঁয়ায় গন্ধ হয়ে আছে লাউর ঝোলের। নীলিমা পাশে বসে তার নিজের প্লেট হাতে নেয়, আর বসতে গিয়ে তার কাঁধটা নীতাইয়ের কাঁধে ছোঁয়া লাগে। গরম, নরম ছোঁয়া। নীতাইয়ের চামচ প্লেটে থেমে যায় আধমুহূর্ত।

"কী হলো? খাস না কেন?" নীলিমা জিজ্ঞেস করে।

"খাচ্ছি তো।"

"আজকে মুখটা কেমন নিষ্পলক হয়ে আছে। দোকানে কিছু হলো?"

"না, মা। ওমন কিছু না।"

নীলিমা আর জিজ্ঞেস করে না। সে খেতে শুরু করে, চুলের একটা সূক্ষ্ম গোছা হাত দিয়ে কানের পাশে তুলে রাখে, আর সেই ছোট্ট নড়াচড়ায় তার পিঠের নরম মাংসটা একবার শিথিল হয়ে টান পড়ে। নীতাই চোখ নামায় প্লেটের দিকে, বড়জোর চামচ চালায়। ভাতের স্বাদ নেই, কিন্তু মুখে শুধু সেই ঘোলাটে জ্বলনটা আছেই।

খাওয়ার শেষে নীলিমা প্লেট তুলে যায়, আর নীতাই বাইরের উঠোনে বেরিয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টি এখন ঝরঝরে। ছাদে তার মায়ের ভেজা শাড়িটা তারে মেলা আছে, ফেড-ইন্ডিগো কাপড়টা ঝুলে জল টপকাচ্ছে। নীতাই সেটার দিকে তাকায়, আর জানে, চোখটা আর ফিরবে না আগের জায়গায়। সে আর ছেলে নয় এই চোখে। সে একটা পুরুষ, আর তার মা একটা নারী, যাকে সে এভাবে দেখা শুরু করেছে, আর এই সত্যিটা তার মুখের উপর পড়ে থাকা বৃষ্টির চেয়েও ঠান্ডা। সেই ঠান্ডার মধ্যেই ভেতরের ঘর থেকে নীলিমার গলা ভেসে আসে।

"নীতাই, একটু আয় তো।"

সে ঢোকে। ভেতরের ঘরে হারিকেন জ্বলছে, কম তেলে কাঁপছে লোমশ আলোটা। নীলিমা খাটে বসে আছে, পাশে গামছা আর নারকেল তেলের বোতল। ভেজা চুল পিঠে ছড়িয়ে পড়েছে, কালো নদীর মতো, কোমর পর্যন্ত নামছে। ঘরে সেই নরম গন্ধ, তেল, ভেজা চুল, আর তার নিচে শরীরের উষ্ণতা।

"চুলটা মেলে দেব, হাত নষ্ট হয়ে গেছে। মেশে দে একটু, তারপর খোঁচা দিয়ে মুছে দে।"

"আমি? ঠিক আছে মা, ওটা তুমি তো নিজেই..."

"আরও নাকচ। তোর বাবার হাতে যা হয়েছে, সেটা দেখছি আর কতদিন। আয় বস।"

নীতাই খাটের পাশে বসে। হারিকেনের আলোয় নীলিমার পিঠের উপরে ভেজা সালোয়ার কুর্তি চিকন হয়ে লেগে আছে, কাপড়ের নিচে ব্রাস্ট্র্যাপের সরু রেখা। ঘাড়ের পেছন খোলা। সে তেল হাতে নেয়, দুই হাতে ঘষে।

নীলিমা মাথা নিচু করে। নীতাই আঙুলগুলো তার ঘাড়ের ভাঁজে গুঁজে দেয়।

ঠান্ডা। তার আঙুলের তাপ পুরোপুরি গরম, আর মায়ের ঘাড়ের চামড়া বৃষ্টিতে ঠান্ডা হয়ে আছে। সেই পার্থক্যটা তার হাত দিয়ে ডিগবাজি খেয়ে শরীরে ঢুকে যায়। নীলিমা কাঁধ কেঁপে ওঠে, হালকা, একবার।

"গরম হাত তোর।"

"মাসির বাড়ি থেকে ফিরছি, হাত জ্বলছে।"

নীতাই আঙুল চালায়। চুলের ভেতর দিয়ে, মাথার খুলির উপর দিয়ে, ধীরে। মালিশ করার নাম করে করছে, কিন্তু চোখ যাচ্ছে অন্য জায়গায়। ঘাড়ের নিচে, কুর্তির কলার ফাঁক দিয়ে দেখা কোলারবোনের রেখা, তার উপর জলের ফোঁটা এখনো লেগে, হারিকেনের আলোয় কাঁচের মতো চিকচিক করছে। ফোঁটাটা নেমে যাচ্ছে, ধীরে, কোলারবোনের গোল খাঁজ বেয়ে, তারপর কুর্তির কাপড়ে মিশে যাচ্ছে। নীতাই সেই ফোঁটার রাস্তাটা পুরোটা দেখে।

"ভেজা চুলের গন্ধে মাথা ঘোরে," নীলিমা বলে, চোখ বন্ধ করে। "তোর বাবার আগে চুল মেশে দিত এমন।"

নীতাই কিছু বলে না। তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আঙুল নামছে মাথা থেকে, পেছন ঘেঁষে, ঘাড়ের নরম চামড়ায়। সেখানে ঘামের তাপ আছে, বৃষ্টির ঠান্ডার নিচে শরীরের নিজস্ব গরম। তার নিঃশ্বাস গুনছে, এক, দুই, মুখ দিয়ে।

নীলিমা একবার মাথা ঘোরায়। কানের লতির পাশ দিয়ে তার নিঃশ্বাস নীতাইয়ের হাতে পড়ে, গরম। চোখ এখনো বন্ধ।

"তুই কী চুল মেশাচ্ছিস আর, বেকার মেশাচ্ছিস। আবার এতো বড়ো হয়ে গেছিস, চুল মেশানো শেখা হয়েনি।"

"আর কিছু শেখার সময় কোথায়, মা।"

নীলিমা হাসে, চোখ এখনো বন্ধ। হাসিতে কাঁধ দুটো নড়ে, আর নীতাই সেই নড়াচড়াটা দেখে, কুর্তার কাপড়ের নিচে পিঠের নরম মাংস কেমন সরে যায়, ফেরে। তার পায়ের দিকে জামার ভেতরে কিছু টান পড়ে উঠছে, ক্রমশ কঠিন, ক্রমশ স্পষ্ট। সে পা ভাঁজ করে চেষ্টা করে লুকাতে, কাপড় ব্যর্থ হয়।

আঙুলগুলো এবার চুল আলগা করতে গিয়ে ঘাড়ের চামড়া ছুঁয়ে যায়, আসল ছোঁয়া, কাপড় ছাড়া। নীলিমার গলা থেকে একটা ছোট্ট শব্দ বেরোয়, অর্ধেক দম। তার মাথা একটু পেছনে হেলে যায়। নীতাই দেখে তার মায়ের গলার সামনের দিক, বুকের উপরের চওড়া, সাদা চামড়া, জলের ফোঁটার রেখা এখনো সেখানে শুকোয়নি।

"মা," নীতাইয়ের গলা ফেটে যায়।

"হুঁ?"

কিছু নেই বলার। নীতাই গামছা হাতে নেয়, মাথা মোছা শুরু করে। গামছার নিচে আঙুল, তার আঙুল, মায়ের মাথার খুলি ঘেঁষে চলছে, প্রতিটা নড়াচড়ায় সে নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ শুনছে কানে। নীলিমা পুরোপুরি শান্ত হয়ে বসে আছে, এমন শান্ত, যেন এটা বহু বছরের অভ্যেস। আর ঠিক সেই অভ্যেসের সান্ত্বনাটাই নীতাইকে ভেঙে দিচ্ছে, কারণ সে জানে এই সান্ত্বনার দিকে তার শরীর কী উত্তর দিচ্ছে।

নীলিমা হঠাৎ মাথা তোলে। ঘাড় ঘুরে পেছন ফিরে তাকায়।

চোখ দুটো মেশে। তার মাত্র এক ফুট ব্যবধান। নীতাইয়ের চোখ তার চোখে পড়ে, তারপর নীলিমার চোখ নামে, এক ফাঁপা মুহূর্ত, তার ছেলের কোমরের নিচে ফোলা জামার ভেতরে।

কেউ কথা বলে না। হারিকেনে তেল কম, শিখা কাঁপে। বাইরে ঝরঝর বৃষ্টি। নীলিমার নিঃশ্বাস একবার থামে, তারপর আবার চলে, গভীর করে। তার মুখে কোনো রাগ নেই, কোনো ধাক্কা নেই, আছে একটা দীর্ঘ, ভেজা স্তব্ধতা, যেন কোনো প্রশ্নের উত্তরটা সে বহু বছর ধরে খুঁজছিল আর উত্তরটা অন্য ঘরের খাটে শুয়ে আছে, চার আঙুল ছাড়া।

"গামছাটা দে," নীলিমা বলে, গলাটা নিচু, সাধারণ, কিন্তু সেই সাধারণতার ভেতর দিয়ে কিছু বারবরাস পার হয়ে যাচ্ছে। "ঘাড়টা মুছে দে। নিজে হাত ওঠে না আর।"

নীতাই গামছা দেয় না। সে নিজেই গামছা ভেজা ভাঁজে নিয়ে মায়ের ঘাড়ে ছোঁয়ায়। ঠান্ডা চামড়া, উষ্ণ কাপড়। তার বৃদ্ধাঙ্গুলো ঘাড়ের পাশে চেপে বসে, তাপ দুটো মেশছে সেখানে, তার গরম আর মায়ের ঠান্ডা। নীলিমা সামান্য এগিয়ে আসে, এমন ছোট্ট নড়া, যেটা ইচ্ছার না হয়ে বাধার মতোই দেখায়, শরীর নিজেই এগিয়ে এসেছে তাপের দিকে, বহু বছরের ঠান্ডা থেকে।

তার কাঁধটা নীতাইয়ের বুকে ছোঁয়া লাগে। নীতাইয়ের নিঃশ্বাস আটকে যায়।

"মা, আমি..."

"মোছে দে বলেছি।"

নীলিমা চোখ বন্ধ করে বসে থাকে, মাথা নিচু, ঘাড় তার সামনে খোলা। কিন্তু তার দমটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, গভীর হচ্ছে, আর হারিকেনের কাঁপা আলোয় নীতাই দেখে তার মায়ের হাঁটুর উপর হাত দুটো, আঙুলগুলো সালোয়ারের কাপড় ধরে চেপে আছে, এমনভাবে, যেন কেউ না দেখলে বুঝবেই না, কিন্তু সে দেখছে।

আর সেই দেখাটাই তার শেষ রক্ষা। নীতাই গামছাটা খাটে রেখে দেয়, পেছনে সরে বসে, পা দুটো আরও ভাঁজ করে চেষ্টা করে ঢাকতে, অসফল। ঘরের স্তব্ধতায় তার নিজের হার্টবিটটাই শব্দ করে ওঠে।

"মুছলি?" নীলিমা জিজ্ঞেস করে, চোখ এখনো বন্ধ।

"মুছেছি।"

"তাহলে যা, শোয়ার পাতে পড়। ভোরে আবার দোকান খুলতে হবে।"

নীলিমা উঠে দাঁড়ায়। হারিকেন ঘেঁষে গেলে আলোটা তার শরীরে ঝাপটা দেয়, এক মুহূর্তের জন্য কুর্তির কাপড় আবার সব বলে দেয়, তারপর সে ঘরের কোণে যায়, ছাদের রাস্তার দিকে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার ফিরে তাকায়।

"চুল মেশে দিয়েছিস।" সে বলে। "ভালো করে মেশেছিস।"

নীতাই মাথা নাড়ে, গলা দিয়ে কিছু বেরোয় না। নীলিমা সিঁড়ির দিকে হাঁটে, হাওয়াই চটির চটচট শব্দ সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে ফিকে হয়ে যায়। নীতাই একলা বসে থাকে অন্ধকার ঘরে, পাশেই বিমলের ফাঁকা হাঁফ, আর মনের ভেতরে সে বুঝে নিচ্ছে, মায়ের চোখে ঠিক সেই মুহূর্তে কী পড়ে ছিল। রাগ নয়, লজ্জা নয়। চেনা ক্ষুধার আরেকটা নাম, যেটা সে নিজের মধ্যে বহু বছর চিনতে পারেনি, কারণ নামটার মুখ দেওয়ার মানুষটাই পাশের খাটে শুয়ে আছে, নিঃশব্দে। ভোর হলে সেই রাতের কথা ধোঁয়ার মতো উঠে যায়, কিন্তু চোখটা থেকে যায়।

ভোরের নদিয়া আঠারো মতো লেগে আছে। পাশের বাড়িতে মাছ ভাজার গন্ধ, তার সাথে ধুনোপাতার তীব্র ধোঁয়া মিশে উঠোনে ভাসছে। নীতাই দোকান খোলার আগে ঘরে ঢোকে, আর রান্নাঘরের দরজায় থমকে দাঁড়ায়।

নীলিমা হাঁড়ি নামাচ্ছে নিচের তাক থেকে। ঝুঁকে পড়তে গিয়ে শাড়িটা পাছার গোল পাড়ে টানটান হয়ে বাঁধা, কোমরের নিচের চওড়া বাঁকটা একবারে ধরা দিয়েছে। ঘামে ভেজা ব্লাউজ পিঠে চিপকে আছে, মেরুদণ্ডের খাঁজ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সে সোজা হয়, হাঁড়িটা কোমরে ঠেকায়, আর পিঠের নরম মাংস দুটো একবার নড়ে স্থির হয়।

নীতাই চোখ নামায় না এবার। আগে নামাত। আজ সে দেখছে, শোনছে, গুনছে। হাঁড়ি রাখার শব্দ, নিঃশ্বাসের হালকা হাঁক, কাঁকরে খালসি ঘষার খড়খড়।

"দাঁড়িয়ে আছিস কেন দরজায়?" নীলিমা ফিরে তাকায় না। "হাত ধুয়ে বোটি কাট, বাজারের আগে তোকে দোকানে যেতে হবে।"

নীতাই হাত ধুয়ে পাশে বসে। কাঁচা পেঁয়াজের জল চোখে পড়ে ঝাপটায়, তবু চোখটা পাশে সরে। নীলিমার হাতে বোটির ধার, আর নীতাইয়ের মাথায় ভোরের সেই ঘাড়, গামছার নিচে ঠান্ডা চামড়া, শিখার কাঁপা আলো।

কলেজের মেয়েদের কথা মনে এলে সে নিজের ভেতরে হাসে। ওরা ফল। সস্তা, রসালো, হাতের মুঠোয় ধরা পড়ে যাওয়া ফল। আর তার মা মহাসাগর। পুরুষ ফল খায়, কিন্তু ডুবে যায় সাগরেই। নীতাই জানে সে ডুবছে, আর সাঁতার শেখার কোনো ইচ্ছে নেই।

"আমি আজ ব্রতীন্দ্রবাবুর বাড়ি যাব," নীলিমা বলে, বোটির তাল ভাঙে না। "মাসিমার বাড়ির কাজ আগে শেষ করে যেতে হবে, বেলা বারোটায় চলে যাব। দুপুরের খাওয়া গামছা দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছি।"

"ও বাড়িতে কাজ কম তো, মা।"

"কাজ কম না, পয়সা বেশি। তোর বাবার ওষুধের টাকা ওইখান থেকেই ওঠে।"

নীতাই আর কিছু বলে না। ব্রতীন্দ্রবাবু। জমিদারি বাড়িটা শহরের রাস্তার ওপাশে, লোহার ফটক, মরা সিংহদুয়ার। নীলিমা যায়, টাকা আনে, আর ফিরে আসে চুপচাপ, সন্ধেবেলা শরীরে খারাপ ক্লান্তি নিয়ে। আজ প্রথম নীতাই ভাবে, সেই ক্লান্তিটা কোথা থেকে আসে।

বেলা বারোটা। ব্রতীন্দ্রের বাড়ির দালানে রোদও ঢোকে না। ঠান্ডা, চুনকালা দেয়াল, মার্বেলের মেঝেতে নীলিমার হাওয়াই চটি আওয়াজ করে চলে। সে ঘষছে দোতলার রেলিং, কাপড়ের দলা হাতে। নিচে পাড়ার কোনো শব্দ এখানে আসে না, শুধু ঘড়ির টিকটিক।

ব্রতীন্দ্র প্রথম দোতলার ঘরে হাজির হন। পাঞ্জাবি, বাঁকানো হাঁটু, হাতে হুঁকোর নল। পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বয়স, মুখে বহু বছরের আদেশের চর্বি।

"এই মেয়ে, রেলিংটা আগে করেছিলি তো কাল? আবার কেন ঘষছিস?"

"কাল পোকা পড়ে দাগ হয়েছে বাবু।"

"দাগ হয়েছে, তাই। তোদের কাজে এই কথাগুলোই বেরোয়।" সে নিচে থুতনি চালায়। "পেছনে যা, সেটা একটু গোছা করে কাজ কর। এই কী ভাঁড়ার ঘরের দুর্গন্ধ নিয়ে হাঁটছিস।"

নীলিমা মাথা নিচু করে আলতো বলে, "বাবু, ভাঁড়ার ঘরে না ঢুকলে জিনিস গুছাব কী করে।"

"ওই ঘরের তালার কথা বলেছি। কালকের মতো খুলে রেখেছিলি কেন? চুরি হলে আমি তোর মজুরি কাটব, মনে রেখেছিস?"

"মনে রেখেছি।"

ব্রতীন্দ্র চলে যায়। নীলিমা নিঃশ্বাস ছাড়ে, হালকা, একবার। কাপড় ফেলে ভাঁড়ার ঘরে ডাল মাপতে যায়। ঘরটা ছোট, জানলা নেই, মশারির পিছনে চালের বস্তা।

ঠিক তখনই দরজার কাঠ আটকে ওঠে।

ব্রতীন্দ্র ভেতরে ঢোকে, পেছনে দরজা বন্ধ। তালা ধাক্কা মাখে না, কিন্তু শব্দটাই যথেষ্ট। নীলিমা ঘুরে দাঁড়ায়, হাতে মাপার বাটি।

"দ্বারা এসেছি," ব্রতীন্দ্র বলে, গলাটা নিচু, মসৃণ। "তোর মজুরির হিসেব দেখব।"

"হিসেব তো দরজার কাছে খাতায়..."

"ব্যাটা মেয়ে, খাতা লাগবে না।" সে এগিয়ে আসে, এক পা। "মাস দশেক হলো এই বাড়িতে চাকরি করছিস। আজ পর্যন্ত কোনোদিন ভালো করে তাকিয়ে দেখিনি তোকে।"

নীলিমা পিছিয়ে যায়। পিঠটা চালের বস্তায় ঠেকে যায়। বাটিটা হাত থেকে পড়ে, মার্বেলে টুং করে শোনায়।

"বাবু, দয়া করে..."

"দয়া?" ব্রতীন্দ্র হাসে, দাঁতে হুঁকোর দাগ। "তোর মতো রাঁধুনির জন্য দয়া দেখাতে আমি জন্মাইনি। এতদিন খেয়েছিস, পরেছিস, তার দাম এখন মেটাতে হবে।"

সে হাত বাড়ায়। ঠান্ডা, চিকন, আঙুলে রিংয়ের ধাতব ঠান্ডা। হাতটা নীলিমার ঘাড়ে পড়ে না, শাড়ির আঁচল ধরে টানে। আঁচলটা গাঁথা ছেঁড়ে যায়।

"বাবু, আমি চিৎকার করব।"

"চিৎকার করে দেখ। পাড়ার লোক জানল জমিদার বাড়ির দুয়ারে দাঁড়িয়ে রাঁধুনি ডাকল। সবাই ভাববে তুই তালা ভেঙে চুরি করছিস। তারপর পুলিশ, তারপর রাস্তা। তোর অন্ধ বাঁড়া বর আর মেয়ে,ছেলে কার মুখে ভাত খাবে বল?"

নীলিমার গলা শুকিয়ে যায়। সে চিৎকার করে না। ব্রতীন্দ্রের হাত এবার শাড়ির পাটা তুলে কোমরে ঢোকে, উদ্দাম নয়, হিসেব করা, মালিকানার হাত। ভেজা ঘামে ভেজা পেটের নরম মাংসে আঙুল চাপ দেয়। নীলিমা মুখ ঘুরিয়ে নেয়, চোখ বন্ধ, দেয়ালের চুনকালা দাগ চোখের সামনে। তার বুকটা দ্রুত ওঠে নামছে, ব্লাউজের কাপড় সেই ছন্দে টান পড়ছে, আর ব্রতীন্দ্র সেটা দেখে মুচকি হাসে।

"এত ভয় পাচ্ছিস কেন? স্বামী আছে বুঝি যে একবারও ছুঁয়ে দেখেনি। এই কালো শরীরটা এখনো কেঁচোর মতো ফর্সা তো।"

সে শাড়ি, সায়া টেনে নামায়। ভাঁড়ার ঘরের স্তব্ধতায় কাপড় পড়া শব্দটা অস্বাভাবিক জোরে বাজে। নীলিমার চোখ খোলে, উপরে ছাতার কাঠে চড়ে থাকা মাক্রিক দেখে, তারপর আবার বন্ধ করে। ব্রতীন্দ্র তাকে বস্তার উপর চাপ দেয়, তার নিজের শরীরের ওজনে। তার চুম্বনটা নিচু, ঘাড়ের চামড়া কামড়ে ধরার মতো। নীলিমার গলা থেকে শব্দ বেরোয় না। সে শুধু ব্রতীন্দ্রের পাঞ্জাবির বোতাম নিজের বুকে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে, ঘরের তাপমাত্রা মনে করে, চালের গন্ধ মনে করে, যা কিছু এই হাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

ব্রতীন্দ্র শেষ হয় চার মিনিটে। উঠে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি ঠিক করে, হুঁকোর নলটা ঠোঁটে ধরে।

"আজ থেকে বারোটার কাজ এই ঘরে। খাতায় অতিরিক্ত দশ টাকা লিখে দিয়েছি। মুখ বুজে কাজ কর, চাকরি থাকবে।"

সে চলে যায়। দরজা খোলার শব্দ, তারপর ঘড়ির টিকটিক। নীলিমা মেঝেতে বসে থাকে বহুক্ষণ। শাড়িটা ঠিক করে, পেটিকোট আর ব্লাউজ বাঁধে। গোছানো ব্যাগে ওষুধের টাকার নোটগুলো চাপা দেয়, এমন চাপ দেয় যেন নোটগুলো দাগ হয়ে যাবে।

সন্ধেবেলা বাড়ি ফেরে। বৃষ্টি থেমেছে, রাস্তায় কাদার গন্ধ। নীতাই দোকান ভাঙছিল, মাকে রাস্তার মাথায় দেখে হাত থেমে যায়। মায়ের হাঁটা ঠিক আছে, মুখটা ঠিক নেই। মুখটা ফাঁপা, বাঁঝা দেওয়া ফাঁপা।

"মা?"

"আজকে মাথাটা ঘুরচ্ছিল একটু।" নীলিমা হাসে, ঠোঁটের উপরে হাসে। "এই যা দোকান ভাঙছিস? চল, বাড়ি যাই।"

নীতাই পেছনে পেছনে হাঁটে। মায়ের হাওয়াই চটির চটচট আগের চেয়ে ধীর। ঘরে ঢুকে নীলিমা আলো জ্বালাতে যায়, হাত কাঁপছে, দেয়ালে দেশলাইয়ের কাঠি ভাঙে দুটো। নীতাই তা দেখে। সে এগিয়ে যায়, মায়ের হাত থেকে দেশলাই নিয়ে নিজে হারিকেন জ্বালায়।

"মা, ও বাড়িতে কেউ কিছু বলেছে?"

নীলিমা চোখ তোলে। হারিকেনের আলোয় তার চোখ ভিজে আছে, এক ফোঁটা জল পাতার কিনারে আটকে আছে, পড়ে যায় না।

"কিছু বলে না," সে বলে। "ওই যা, হাত ধুয়ে খেতে বস।"

কিন্তু নীতাই যায় না। সে দাঁড়িয়ে থাকে, আর মায়ের কাঁপা হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকে, ভেতরে কিছু একটা কড়াইয়ের তেলের মতো ফুঁসে ওঠে।

রাতে খাওয়ার পরে নীলিমা পাত ধুতে রান্নাঘরে চলে যায়। নীতাই ভেতরের ঘরে ঢোকে, হারিকেন হাতে। বিমল শুয়ে আছে, চোখ খোলা, ছাদের কাঠির দিকে তাকানো।

"উঠতে পারো, বসে একটু?" নীতাই জিজ্ঞেস করে।

বিমল মাথা নাড়ে। না। নীতাই খাটের পাশে বসে, বালিশ ঠিক করে দেয়, ভাঁজ করা কম্বলটা বুক পর্যন্ত টেনে দেয়। বিমলের ভাঙা হাতটা কম্বলের উপরে বেরিয়ে থাকে, চারটা ঠোঁটকাটা আঙুলের গোছা।

"আজ ওষুধের দোকানের পুঁজি," নীতাই বলে, কথা চালিয়ে যাওয়ার জন্যই। "কাল যেতে হবে। মা দুপুরে ব্রতীন্দ্রবাবুর বাড়ি গেল, ফিরল সন্ধেয়। মাথা ঘুরচ্ছিল বলছিল।"

বিমলের চোখ সরে আসে ছাদ থেকে। ছেলের মুখে পড়ে।

"ও বাড়ির কাজ একটাও কমে না। দুপুরে খেয়েছিল কিনা জানি না। আমি প্লেটে ভাত রেখে দিয়েছিলাম, দেখিস কোথায়।" নীতাই থামে। "ওর হাত কাঁপচ্ছিল, বাবা। দেশলাই ভাঙল দুটো।"

বিমলের হাঁটুর উপরের কম্বল একবার নড়ে। তার গলা থেকে আওয়াজ বেরোয় না, বহু বছর ধরে বেরোয় না। কিন্তু চোখটায় কিছু ঘন হয়ে জমছে, জলের আগের সেই ভার। লজ্জা। একটা পুরুষের নিজের অসহায়ত্বের লজ্জা, যা সে নিজের ছেলের সামনে নিচু হয়ে বইতে পারছে না।

"বলব মাকে কিছু?" নীতাই জিজ্ঞেস করে।

বিমল মাথা নাড়ে। আবার নাড়ে, বড়জোর, হ্যাঁ। তার ঠোঁট দুটো নড়ে, কিছু চায়, শব্দটা বেরোয় শুধু ফাঁপা হাওয়ার মতো। নীতাই ঝুঁকে আসে।

"কী?"

বিমল নিঃশ্বাস ছাড়ে। ফিরিয়ে নেয় মুখ, ছাদের দিকে।

নীলিমা পাত ধুয়ে ভেতরের ঘরে ঢোকে। ঘামছা হাতে চিরতে চিরতে সে বলে, "ওষুধ খেয়ে ঘুমাও যা, ব্রতীন্দ্রবাবু। কাল আবার ডাক্তার দেখবেন।"

বিমলের চোখ স্ত্রীর দিকে যায়, তারপর ছেলের দিকে। নীতাই তখন উঠে দাঁড়িয়েছে, হারিকেন হাতে, আর তার চোখটা মায়ের পেছনে পেছনে চলে, কোমরের রেখা, সায়ার উপর আঁচলটা এবার গোছানো নেই। বিমল দেখে সেই চোখ। ছেলের নয় এমন চোখ। পুরুষের চোখ। আর সেই চোখের জায়গাটা যেখানে, সেই জায়গার মালকড়া একটা মৃত পুরুষের বুকে চাপা আগুনের মতো জ্বলে ওঠে। বলতে পারে না। ধরতে পারে না। হাতে আঙুল নেই, গলায় শব্দ নেই। শুধু চোখ দুটো ছেলের মুখে আটকে যায়, আর ঘরটা তার কাছে অন্ধকার হয়ে আসে।

নীলিমা ফিরে তাকায়। "কী দাঁড়িয়ে আছিস? যা, শোয়ার পাতে পড়।"

নীতাই হারিকেন রেখে যায় বিমলের মাথার পাশে। জ্বলছে, কাঁপছে শিখাটা।

বাইরের ঘরে নীতাই পা বাড়ায়, আর নীলিমা তখন কোণে ভেজা কাপড়ের দলা গোছাচ্ছে। তার কাঁধের পাশ দিয়ে সরে যাওয়ার সময় হাতটা ছোঁয়ায় যায়।

নীলিমা হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ে, এক মুহূর্তে, স্পন্দনের মতো।

"মা?"

"ছুঁইনি তো বুঝলি, ভয় পেয়েছিলাম একটু। মশা কামড়েছে বুঝি।" সে জোরে হাসে, খুব জোরে।

কিন্তু নীতাই দেখেছে। দেখেছে ভাঁজ হওয়াটা। আর দেখেছে বাহুর ওপরের দিকে, ব্লাউজের হাতা আর কাঁধের সেলাইয়ের ফাঁকে, গোল, কালচে ছোপটা। স্বচ্ছ ছাপ, দাঁতের গোলাইয়ের মতো ফাঁক। মশা তা কামড়ায় না।

"হাতা ছেড়ে দেখা যায় না?" নীতাই বলে। "দাঁতের দাগ মশার না।"

নীলিমা হাত সামান্য টানে। "কাল বাজারে গেটে খাঁটিতে পড়েছিলাম।"

"খাঁটিতে পড়ে দাঁতের ছাপ পড়ে শরীরে?"

ঘরে ফ্যান নেই, নেই জানলা খোলা হাওয়া। শুধু দূরে কোথাও কুকুর ঘেউ হাঁকছে, আর নীলিমার নিঃশ্বাসটা একবার বন্ধ হয়ে আবার চলে। নীতাই এগিয়ে যায়, হাত বাড়ায়।

নীলিমা চোঁয়ায় না। নীলিমার গলা পাথরের মতো।

নীতাই থামে না। ব্লাউজের হাতা আলতো টানে উপরে তোলে। ছোপটা পুরোটা বেরিয়ে আসে। লাল, ফোলা, ব্লাউজ সেলাইয়ের নিচে ঘেঁষে নামা দুটো দাঁতের খাঁজ, তার পাশে আরেকটা হাতের ছাপের ফ্যাকাশে রেখা। কোনো মশা, কোনো খাঁটি এ নয়। কোনো মানুষের মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা ছাপ।

নীলিমা হাত টেনে নেয়, হাতা নামায়। "ওহ আরও টানে। শেষ রাতে বড়ো জটিল হয়ে গেছিস।"

"মা।"

"শুবি যা। কাল ভোরে দোকান খুলতে হবে তোকে।"

সে সোজা কাপড়ের দলার দিকে মুখ ফেরায়। আঁচলটা গলার কাছে চেরা দেখে, গাঁথার জোড়টা ছেঁড়া। নতুন ছেঁড়া, ধারগুলো ভেজা কাপড়ে খসখসে। নীতাই সেটাও দেখে। সব দেখে।

তার পাঁজরের ভেতরে কিছু ভাঙে, তারপর ওই ভাঙা জায়গাটা থেকে একটা নতুন জিনিস জন্মায়, কড়া ঘন, গোলগাল, যার নাম নেই। ব্রতীন্দ্রবাবু। জমিদারি বাড়ি, লোহার ফটক, চুনকালা দালান। মা ফিরে আসে সন্ধেয়, চুপচাপ, শরীরে ক্লান্তি। বহু মাসের ক্লান্তি, আজ বুঝল সে, আজ লালচে ছোপ দেখল তার চোখ নামে না এমন ছেলের।

"মা, ওই বাড়ির কাজ আর করিস না।" নীতাই বলে, গলাটা শান্ত, আরও শান্ত করে করে। "ওষুধের টাকা আমি জোগাব।"

"তুই জোগাবি কী করে?" নীলিমা ঘুরে তাকায়। "দোকানের লাভে তোর আর বোনের খাওয়াপোশাক চলে। আমি জানি হিসেব।"

"মা, দাঁতের ছাপ কোথা থেকে এল বল।"

নীলিমার মুখ এক মুহূর্তে সাদা হয়ে যায়। তারপর সে নিজের সামলে নেয়, চিরচেনা সেই ধীর শ্বাস।

"তুই ভালো ছেলে। ভুল বুঝিস না কাউকে। পাড়ায় লোকে কথা বাড়ায় দেখে কী নাকি।" সে কাপড়ের দলাটা বুকে চেপে ধরে। "আমার ঘুম আসছে। যা, শোয়ার ব্যবস্থা কর।"

কিন্তু তার চলে যাওয়ার রাস্তাটা ঘরের অন্ধকার কোণে, যেখানে বিমলের হারিকেনের আলো পৌঁছায় না। নীলিমা ওই কোণে দাঁড়াতে গিয়ে আঁচলের গাঁথাটা একবার হাতে ছুঁয়ে নেয়, ছেঁড়া ধারে। এক সেকেন্ড। তারপর চলে যায়।

নীতাই খাটে বসে বহুক্ষণ। মনের ভেতরে ভাবনাগুলো গোছা হচ্ছে না, গোল খাচ্ছে, ফুঁসে উঠছে। ব্রতীন্দ্র, এই বাড়ির ওষুধের খাতা নয়, এই বাড়ির মায়ের শরীরের ছোপ। আর তার বাবা শুয়ে আছে পাশের ঘরে, চার আঙুল ছাড়া, শব্দ ছাড়া, রক্ষা করতে পারে না একবারও। দশ বছর ধরে পারে না।

নীতাই ঘর ছেড়ে ভেতরের ঘরের দরজায় দাঁড়ায়। হারিকেন জ্বলছে। বিমল তাকায় ছেলের দিকে। নীতাই জানে না বাবা কী দেখেছিল এক্ষুনি, কিন্তু তার নিজের চোখটা আর লুকায় না। সে মাকে রক্ষা করবে। আর রক্ষা মানে এখন আর ছেলের মতো রক্ষা নয়।

"ঘুমাও, বাবা," সে বলে, আর শিখাটা নিভিয়ে দেয় নিজের হাতে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে শুনতে পায়, বিমলের হাঁফ ধীরে সমান হচ্ছে। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি ফের নামছে। নীতাই ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে, আর দেখে রান্নাঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো বেরোচ্ছে। নীলিমা এখনো জাগা।

সে ভেতরে ঢোকে। নীলিমা পাত ঘষছে, পিঠ তার দিকে ফিরে। গোসল করে বেরিয়েছে বোধহয়, চুল আধশুকনো, ঘাড়ের পেছনে বাঁধা। গায়ে শুধু পেটিকোট আর ব্লাউজ, শাড়ি নেই। সাবানের গন্ধ, নিমপাতার তীব্র ভেজাটা, আর তার নিচে তাজা শরীরের সেই উষ্ণ, মাংসল গন্ধ রান্নাঘরের সরু জায়গাটাকে ভরিয়ে রেখেছে।

"এখনো ঘুমোচিস না?" নীলিমা ফিরে তাকায় না।

"তুই না শুয়ে পড়লে আমার ঘুম আসে না, মা।"

"কথা বড়ো বলিস। যা, প্লেটের নিচের দিকটা ধুয়ে দে।"

নীতাই পাশে বসে পড়ে। রান্নাঘরটা ছোট, কোলাঘাটে কোলা লাগে। সে মাটি ঘষছে, কিন্তু চোখ যাচ্ছে মায়ের কোমরের দিকে। পেটিকোটের নড় ফ্যাসল করে বাঁধা, তার নিচে কোমরের নরম, ফুলে ওঠা মাংসের ভাঁজ দুটো স্পষ্ট। মেরুদণ্ডের শেষ খাঁজটা পিঠের নিচে গভীর হয়ে ধরা পড়েছে, আর সেই খাঁজ থেকে গোলাইটা নেমে যাচ্ছে নিচের চওড়া পাড়ে। নীতাইয়ের গলা শুকিয়ে যায়।

"মা, ব্যথা হয় না পিঠে? দিনে এত কাজ।"

"হয় তো। বয়সের দাম। ওই যা, শেষ হলো?"

"শেষ। কিন্তু পিঠটা... আমি একটু মেশে দিই? বসে তো।"

নীলিমা ঘষার হাত থামায়। এক মুহূর্ত স্তব্ধতা। তারপর টেরিকোটার তলা ঘষার শব্দ আবার শুরু হয়।

"লাগবে না তোর হাতে। সারা দিন কড়াই ধরে আসবি..।"

"হাত ভালোই আছে, মা। ঘাড়টাও মেশেছিলাম কাল। বলেছিলে ভালো হয়ে গেছে।"

নীলিমা আর বাধা দেয় না। সে পাতটা রাখে, শুকনো হাতে পেছনে ঘুরে বসে, পাশের বেঞ্চে। নীতাই পেছনে তার ঘেঁষে উঠে বসে। এই প্রথম তার বুকটা মায়ের পিঠের এত কাছে। গোসল করা ঠান্ডা চামড়ার উপর দিয়ে তার নিজের ঘামের তাপ ছড়াচ্ছে, আর সেই মেশাটা তাকে মাথা ঘুরিয়ে দেয়।

"সাবান নেই হাতে।"

"আছে মায়ের তেল, বারান্দায়।"

নীলিমা হাসে, একবার। "ওস্তাদ হয়ে গেছিস।"

নীতাই তেল আনে, দুই হাতে ঘষে। আঙুল নামায় মায়ের কাঁধে। এবার কালকের মতো ঠান্ডা নয়। গোসলের পরের উষ্ণতা, চামড়ার নিচে ভাসছে। তার বৃদ্ধাঙ্গুলো মেরুদণ্ড বেয়ে নামছে, ধীরে, প্রতিটা খাঁজ গুনে গুনে। নীলিমা মাথা নিচু করে, নিঃশ্বাস গভীর করে।

"উপরে বেশি ভার না, কোমরের কাছে বেশি ব্যথা হয়," সে ফিসফিস করে বলে, কেন যেন।

নীতাইয়ের হাত নামে। পেটিকোটের নড়ের উপরে, কোমরের ভাঁজ দুটোর ওপরে। নরম। নিচের ঠোঁটের মতো নরম। তার আঙুল সেখানে থেমে যায়, চাপ দেয়, তারপর আর ওঠে না। তার শ্বাস মায়ের ঘাড়ের পেছনে পড়ছে, গরম হাওয়ার মতো। নীলিমার ভুরু কুঁচকে যায় না, পালিয়ে যায় না।

"নীতাই..."

"হুঁ?" সে কানের কাছে ঝুঁকে আছে। মায়ের সুগন্ধ তার নাকে ভরে আছে।

"হাতটা ওখানেই রাখ। ভালো লাগছে।"

নীলিমা নিজের কথাটা শুনে চোখ বন্ধ করে। কোনো সংশোধন নেই, কোনো পিছিয়ে যাওয়া নেই। তার পিঠটা সামান্য পেছনে হেলে আসে, এক ইঞ্চি, দুই ইঞ্চি। ব্রতীন্দ্রবাবুর ঠান্ডা, রিংওয়ালা আঙুলের সেই চোঁয়াটা তার শরীরে এখনো পোড়ে, আর এই গরম হাতটা সেই দাগের উপর হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। তার বুকটা ধীরে ধীরে ওঠে নামছে, প্রতিবার নিঃশ্বাসে কাপড় ফুলে উঠছে, আর নীতাই সেই উঠেনামাটা পেছনে ঘেঁষে অনুভব করছে।

নীতাইয়ের ঠোঁট মায়ের ঘাড়ের পেছনে এসে আটকে আছে, ছোঁয়ায় না, কিন্তু তার শ্বাস ছোঁয়ায়। তার হাত এবার সেই সাহসটা নিয়ে আঙুল ছড়ায়, কোমর ঘেঁষে দুই পাশে। মায়ের শরীরটা তার দুই হাতের মধ্যে উষ্ণ, প্রাণবন্ত। তার নিজের ধড়ের ভেতরে কিছু ত্রিশুলের মতো খোঁচা দিয়ে জেগে উঠছে, আর সে জানে পিছনে আটকে থাকা কাপড়টা আবার ফুলে উঠছে, লুকাতে পারছে না।

নীলিমা তা অনুভব করে পিঠে। কিন্তু সে সরে যায় না। তার হাত দুটো হাঁটুর উপর ভাঁজ হয়ে বন্ধ হয়ে আছে, আঙুল শক্ত করে সালোয়ারের কাপড় চেপে ধরা। ঠিক যেমনটা নীতাই হারিকেনের আলোয় দেখেছিল। সে তার নাকটা মায়ের ঘাড়ে ছোঁয়ায় বড়জোর। শুধু শ্বাস নয়, ছোঁয়া। উষ্ণ, হালকা, চামড়ার সাথে চামড়া।

নীলিমার গলা থেকে একটা শব্দ বেরোয়। কালকের সেই অর্ধেক দমটারই ভাই, কিন্তু এবার গভীর। তার ঘাড়টা পেছনে ঝুঁকে যায় আধ ইঞ্চি, সেই আধ ইঞ্চিতে বহু বছরের ক্ষুধার একটা ফোঁটা বেরিয়ে আসে। নীতাই দেখে মায়ের বুকের উপরের কালু চামড়া কেমন টান পড়েছে, দুই হাঁটুর ফাঁক ভাঁজ হয়ে গেছে।

তারপর নীলিমা চোখ খোলে।

অন্ধকার রান্নাঘরের দেয়াল তাকায়। তারপর কেপে ওঠে, শক্ত এক ঠেলায় সামনে হাঁটু গেড়ে বসে, তেলের বোতলটা নিয়ে নীতাইয়ের হাত থেকে।

"বাহ।" গলাটা ধারালো, কিন্তু কাঁপছে। "হাত ওঠে না বলে বলিস না, মেশে দেওয়া শেখা হয়ে গেছে তোর।"

"মা, আমি..."

"যা, শোয়ার পাতে পড়। রাত হয়ে গেছে।" সে তেলের বোতল তাকের ভেতর গুঁজে দেয়, পিঠ ঘোরায়, আর সেই পিঠটা এখনো কেঁপছে, নীতাই দেখে।

নীতাই উঠে দাঁড়ায়। রান্নাঘরের দরজায় পা রেখে থামে।

"মা, কাল ব্রতীন্দ্রবাবুর বাড়ি যাবি না?"

নীলিমার চোখ দুটো তার মুখে ধাক্কা খায়। এক ফাঁপা মুহূর্ত।

"যাব না। কেন?"

"যাবি না। বলে দিচ্ছি।" নীতাইয়ের গলাটা নিচু, কিন্তু পাথর। "ওই বাড়ির দরজা তোমার জন্য আর খুলবে না।"

"তুই জানিস কী বলচ্ছিস? তোর খাওয়াপোশাক..."

"আমি জানি কী বলছি।" সে এক পা ভেতরে নেয়। "দাঁতের ছাপটার হিসেব আমি নেব। তুমি শুধু প্রতিশ্রুতি দাও, যাবি না।"

নীলিমা কথা বলে না। তার নিঃশ্বাস একবার থামে, তারপর চলে গভীর করে। তেলের বোতলের জায়গায় হাত বসিয়ে সে তাকের দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, যেন কাপড় গোছাচ্ছে। কিন্তু তার গলা যখন শেষে বেরোয়, তখন তা সাধারণ নয়।

"যাব না।"

দুটো শব্দ। নীতাই সেগুলো বুকের ভেতর নিয়ে ঘরে ফিরে আসে, আর প্রথমবার সে লক্ষ করে, নিজের হাতটা এখনো মায়ের কোমরের নরম মাংসের গন্ধে ভরে আছে। সে সেই হাতটা দেয়ালের বাঁশখুঁটির সাথে ঘষে না। রেখে দেয়। সেই হাতেই পরদিন সকালে কড়াই ভাজে নীতাই। অন্যান্যরা এসেছে, একলা নয়, আজ সাথে আরও তিনজন। তেল গরম, পাঁচ পিঁয়াজ ছড়ানোর প্রস্তুতি। ঠিক তখনই দোকানের সামনে দুটো সাইকেল থামে।

চেনা মুখ নয়। পাড়ার টোলা বাজারের লোক, হরিপদ আর তার ভাইপো। হরিপদের গলায় গামছা, চোখে বিরক্তির ভান।

"নীতাইবাবু, তোমার দোকানে অভিযোগ উঠেছে।" হরিপদ কাউন্টারে হাত রাখে। "তেলে কী যে দিস, ছেলেমেয়ে খেয়ে পেট খারাপ করেছে বলছে। ব্রতীন্দ্রবাবুর নির্দেশ মিটিং না করে দোকান বন্ধ করতে হবে এই সপ্তাহে।"

আনন্যারা থমকে যায়। নীতাই চামচটা কড়াইয়ের ধারে রাখে। ধীরে, শব্দ না করে।

"কে খেয়ে খারাপ হয়েছে বল?"

"ওসব দরকার নেই। অভিযোগ উঠেছে, তাই..."

"নাম বল।" গলাটা নিচু, কিন্তু এমন গভীর, যে পাশের দোকানের মিস্ত্রিও তাকায়। "নাম, তারিখ, কী খেয়েছিল। না পারলে এখান থেকে উঠ।"

হরিপদের মুখটা ঢোল পেটে যায়। সে ভাবতে আর ভাবতে পারে না, ব্রতীন্দ্রবাবুর লোক এই ছেলেকে চেপে আসতে এসেছিল, আটকে যায়।

"বাবু শুনবে তো সব..."

"বাবুকে বলিস।" নীতাই এক পা এগিয়ে যায়। "দোকান বন্ধ হবে না। অভিযোগটা লিখে আনতে পারলে আন, মামলা করতে চাইলে কর। যা।"

লোক দুটো সাইকেল ঘুরিয়ে চলে যায়। আনন্যা ফিসফিস করে হাসে, "দা, তুমি তো দানব হয়ে গেছ।"

কিন্তু নীতাই হাসে না। সে বুঝে গেছে। ব্রতীন্দ্র শুধু মায়ের শরীর লুটোচ্ছে না, দোকানটা নামাতে চাইছে। দোকান গেলে নীতাই হাঁটু গেড়ে বসবে, আর নীলিমার তখন ওই চুনকালা দালানের দরজা ছাড়া উপায় পাবে না। শিকলটা তার গলায় নয়, পুরো পরিবারের গলায়।

বিকেলে দোকান বন্ধ করতে করতে অনন্যা আসে, একলা। বইয়ের ব্যাগ কাঁধে, মুখে সেই খেলনা হাসি। কিন্তু চোখে অন্য কিছু।

"দা, একটু থামো তো।" সে কাউন্টারে হাত ভর দেয়। "সেই লোক দুটো কার কোথায় এসেছিল, জানি না। কিন্তু অবাক হলাম, তোমার চোখ আজ সকাল থেকে কোথায় যাচ্ছিল জানিস? ওপারে, ওই ধোপার লেনের মোড়ে, তোমার মা আর মাসিমা হাঁটছিলেন। আর তুমি তাকিয়ে আছিলে এমন, যে তাকানোতে আমি ছিলাম না বলেই মনে হয়েছিল।"

নীতাইয়ের হাত থেমে যায় শামিয়ানার দড়িতে।

"কী বলছো তুমি?"

"কিছু না দা।" আনন্যা হাসে, কিন্তু হাসিটা এবার পাতলা নয়, ধারালো। "শুধু একটা কথা বলি। তোমাদের বাড়িতে হাওয়া কেমন ভারী, লক্ষ করেছি আমি। দরজা বন্ধ থাকে, জানলা বন্ধ থাকে, আর ভেতরে কী চলে কেউ জানে না। গোপন কথা এই পাড়ায় বেশিদিন গোপন থাকে না, দা। তাই বললাম।"

সে স্কার্ফটা ঠিক করে, ঘুরে চলে যায়। নীতাই দাঁড়িয়ে থাকে বহুক্ষণ। টিনের চালে শিউলি পাখির ডাক, আর তার বুকের ভেতরে হাতুড়ির মতো রক্ত। ধরা পড়ার ভয়টা কোথায় যেন অন্য জিনিস হয়ে ফুলে উঠছে, নিষিদ্ধ শিহরণের মতো।

বাড়ি ফেরে সন্ধেয়। নীলিমা রান্নাঘরে, তেল গরম করছে। নীতাই প্রবেশ করে, এবং প্রথমবার সে জানে, সে এখন ওই ছেলেটা নয়, এই ঘরের পুরুষ।

"মা।" গলাটা নিচু, কিন্তু ঘন, নতুন মতো। "দোকানে আজ হরিপদ এসেছিল। ব্রতীন্দ্রবাবুর লোক। দোকান বন্ধ করতে বলে গেছে।"

নীলিমার হাতের কাঠি থামে। সে ফিরে তাকায়।

"কী বললি? দোকান কেন? তার সাথে তোর কী?"

"সাথে নেই।" নীতাই দুই পা ভেতরে নেয়, রান্নাঘরের সরু জায়গাটা ভরে যায় তার শরীরের তাপে। "সাথে আছে আমার, এবং তোমার। ও চায় আমি নিতে বসে থাকি, আর তুমি বারোটায় ওই ভাঁড়ার ঘরে যাও। একটা শিকল সে বানাচ্ছে, আমাদের দুজনের গলায়। আমি আজ তা ভেঙেছি। ভাঙব। প্রতিদিন ভাঙব।"

নীলিমা কড়াইয়ের তলায় কাঠিটা রেখে দেয়। তার ছেলের মুখের দিকে তাকায়, আর দেখে সেই চোখ, যে চোখ কাল রাতে তার ঘাড়ে নেমেছিল, আজ তার উপরে দাঁড়িয়ে আছে। পুরুষের চোখ, স্বামীর মতো চওড়া কাঁধ, তার ছেলের মুখে। তার বুকের ভেতর কোথায় যেন চটচটে গরম একটা ঢেউ উঠে আসে, লজ্জার আগে, লজ্জার সাথে, লজ্জার চেয়ে দ্রুত। সে নিজেকে সামলায়, মুখ ফিরিয়ে নেয়।

"তুই কী করব বলছিস? ও জমিদার, এই পাড়া তার..."

"পাড়া তার, ভাত আমাদের।" নীতাই কথাটা এমন জোরে বলে, যে ঘরের বাইরেও ভেসে যায়। "মা, তুই শুধু একটা কথা বল। ওই ভাঁড়ার ঘরে তুই কে হও বল, আর আমি কী করব বল। আজ বলব।"

রান্নাঘরের স্তব্ধতা গাঢ় হয়ে ওঠে। তেল কড়াইয়ে হিস করছে, দেয়ালের ঘড়ি টিকটিক করছে, ভেতরের ঘর থেকে বিমলের ফাঁপা হাঁফ। নীলিমার নিঃশ্বাস একবার থামে। তার চোখ ভিজে আসছে, কিন্তু শরীরটা পিছিয়ে যাচ্ছে না। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়, আর তার গায়ের পেটিকোট-ব্লাউজ ছোঁয়ায় নীতাইয়ের গেঞ্জি।

"ও আমাকে ছোঁয়," ফিসফিসে, ভাঙা গলায়, "অনেকবার হয়েছে। আর..."

আর কথাটা শেষ হয় না। কারণ নীতাইয়ের হাত উঠে এসেছে, তার গালে। গরম, কড়াই ধরা আঙুল, তার মায়ের ভেজা গাল মোছে। নীলিমার চোখ বন্ধ হয়ে যায়, আর তার শরীর সামান্য এগিয়ে আসে, সেই তাপের দিকে, বহু বছরের ঠান্ডা থেকে।

"আর ছোঁবে না ও তোমাকে।" নীতাইয়ের গলা মায়ের চুড়োর কাছে পড়ে, নিচু, পাথর। "বলে দিয়েছি। ব্রতীন্দ্রবাবুর বাড়িটার হিসেব আমি নেব। আজ তোকে একটুও ছোঁয়নি, তাই না?"

নীলিমা মাথা নাড়ে। না। তার কাঁধ কাঁপছে, আর সেই কাঁপা কাঁধে তার ছেলের শ্বাস পড়ে আছে, গরম, ভারী, নিষিদ্ধ। তার মুখে কান্নার সাথে মিশে আছে অন্য কিছু, একটা নামহীন উষ্ণতা, যা সে পঁচিশ বছরে কোনোদিন অনুভব করেনি।

"নীতাই," সে ফিসফিস করে, "তোর এমন গলা আগে শুনিনি।"

"এই গলা এখন থেকে শুনবি।" তার হাত গাল থেকে নামে, কাঁধে থেমে থাকে। "আর ওই দালানের ভাঁড়ার ঘরটার দরজা থেকে তালা আজ নামবে। কাল আমি সাথে যাব। তুমি একলা আর যোগ নেই।" ।" তারপর থামে নীতাই। "বলে দিও, কাল ও বাড়ি গেলে আমি তোমাকে রাস্তায় অনুসরণ করব।"

নীলিমা আর কিছু বলে না। শুধু মাথা নিচু করে, আর তার ভেজা চোখ থেকে জল পড়ে নিচে তাকের কাঠে।

পরদিন বৃষ্টি আর চায় না পড়তে। রোদ তীব্র, আঠারোর মতো নদিয়া। নীলিমা সকালে বাড়ি থেকে বেরোয় না, নীতাই তাকে বারণ করেছে। কিন্তু দুপুরে যখন সে দোকান থেকে ফেরে, তখন তার মা নেই। পাশের ঘরে বিমল দেখে জানায়, ও ব্রতীন্দ্রবাবুর লোক এসে ধাক্কা মেখে নিয়ে গেছে।

নীতাইয়ের শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। সে দৌড়ে যায়, লোহার ফটক ধাক্কা মেখে ঢোকে, আর ভাঁড়ার ঘরের কাছে পৌঁছে দেখে কাজ শেষ।

নীলিমা মেঝেতে পড়ে আছে। চুনকালা মেঝেতে তার পাশে জলের ছিটা। শাড়ি ছেঁড়া, ব্লাউজের নিচের হুক খোলা, ঘাড়ে আবার নতুন ছোপ। চোখ বন্ধ, শ্বাস ছোট ছোট। ব্রতীন্দ্র নেই, দরজা খোলা।

"মা!" নীতাই ঝাঁকিয়ে তোলে।

নীলিমা চোখ খোলে। চোখে কোনো জল নেই, কোনো ভয় নেই। শুধু ফাঁপা ক্লান্তি, বহু বছর ক্ষয়ে যাওয়া শরীরের ক্লান্তি।

"আমার জামা পড়ে গেছে," সে ফিসফিস করে বলে। "তুলে দে।"

নীতাই মায়ের শাড়ি, সায়া গোছায়। তার হাত কাঁপছে। নীলিমা উঠতে পারে না, নীতাই তাকে তুলে কোলে নেয়, নিজের কাঁধে তুলে বাড়ির রাস্তায় দৌড়ে চলে যায়।

বাড়ি ফিরে সে মায়ের কাপড় খোলে। ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত হাতে। শাড়ি নামায়, ব্লাউজ খোলে, দাগগুলো দেখে। ঘাড়ে নতুন কালচে ছোপ, কাঁধে রিংয়ের ছাপ। নীলিমা কাঁপছে, চোখ বন্ধ।

নীতাই তাকে শুইয়ে দেয়, গামছা ভিজিয়ে দাগ মোছে। মায়ের চামড়া ঠান্ডা, তার হাত গরম। মোছতে মোছতে নীলিমার চোখ থেকে জল পড়ে, চুপচাপ, শব্দ ছাড়া।

"মা..."

নীলিমা কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসে, নীতাইয়ের বুকে মুখ গুঁজে দেয়। আর তারপর কাঁদে, হাউমাউ করে, বহু বছরের সব জমে থাকা কান্না এক মুহূর্তে ফুঁসে ওঠে। নীতাই তাকে জড়িয়ে ধরে, মায়ের কাঁপা পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।

কান্না থেমে যায় ধীরে। কিন্তু নীলিমা সরে যায় না। তার নিঃশ্বাস নীতাইয়ের গলার কাছে পড়ছে, গরম, ভারী। তার কান্নার জলে ভেজা মুখ, ঘাম, নিজস্ব সেই মাংসল গন্ধ, সব মিশে নীতাইয়ের নাকে ঢুকে যাচ্ছে। সে আর রক্ষা পায় না।

তার হাত উঠে যায় মায়ের ঘাড়ে, তারপর মুখে। নীলিমা তাকায় উপরে, চোখে ভেজা প্রশ্ন। নীতাই উত্তর দেয় না, শুধু ঠোঁট নামায়।

প্রথম চুম্বনটা হালকা, ভেজা, লোনা। নীলিমা কাঁপে, তারপর তার ঠোঁট খোলে হালকা, আর নীতাই চুম্বনটা গভীর করে দেয়। তার জিহ্বা মায়ের ঠোঁটের ভেতরে ঢোকে, স্বাদ নেয়, লোনা আর মিষ্টি একসাথে। নীলিমার হাত বুকে থেকে কাঁধে উঠে আসে, তার আঙুল ছেলের চুলে গায়।

নীতাই মায়ের শাড়ির আঁচল টানে, তারপর পেটিকোটের নড়ে হাত রাখে। নীলিমা থামে, এক মুহূর্ত। তার চোখ খোলে, দেখে ছেলের চোখ। তার ভেতরে লজ্জা আর ক্ষুধা একসাথে লড়ছে। তারপর সে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ।

নীতাই পেটিকোটের নড় খোলে, শাড়ি টানে নামায়। তার মায়ের শরীরটা ধীরে ধীরে খোলে আসছে, ব্লাউজের হুক খুলে দিয়ে, পিঠের সেলাই সরিয়ে। নীলিমার বুকটা এবার পুরোপুরি বেরিয়ে আসে, বড়ো, ফুলে ওঠা, বাঁঝা, দুই পাশে ঝুলে পড়া। নীলিমার বোঁটা, ছোট্ট, ফুলে উঠছে ঠান্ডায়। পেটে নরম ভাঁজ, কোমরে চওড়া পাড়, তার উপরে বিস্তারিত স্ট্রেচ মার্ক, মায়ের বয়স হয়ে যাওয়ার দাগ। নীতাই দেখে, মুগ্ধ হয়।

"তুমি সুন্দর," সে বলে, গলা ফেটে যাচ্ছে। "মা, তুমি কী সুন্দর।"

নীলিমা হাসে, আধখোলা ঠোঁটে। নীতাই তার বুকে মুখ গুঁজে দেয়, বোঁটা ঠোঁটে নেয়, চুষতে শুরু করে। নীলিমার গলা থেকে লম্বা, গভীর শব্দ বেরোয়। তার পিঠ পেছনে বাঁকে, বুকটা আরও উঁচু হয়ে ওঠে।

নীতাই বিমলের ঘরের পাশের ঘরে, নিজের খাটে। তার মাকে তুলে নিয়ে শুইয়ে দেয়। বিমল পাশের ঘরে শুয়ে আছে, দরজার ফাঁকে হারিকেন নিভে গেছে। তবু নীতাই জানে ও আছে, আর সেই ভাবনাটাই তার ক্ষুধাকে আরও তীব্র করে।

নীলিমা পেটিকোটের দড়ি খোলে নিজেই, শেষ কাপড়টা নামিয়ে দেয়। তার শরীরটা পুরোপুরি খোলা, প্রথমবার ছেলের সামনে। নীতাই তার জাঙ্গিয়া খোলে, কঠিন, ফুলে ওঠা জিনিসটা বেরিয়ে আসে। নীলিমা দেখে, হাত বাড়ায়, ছোঁয়। তার নরম, মাংসল আঙুল নীতাইয়ের উপর চাপ দেয়, আর নীতাই আর সহ্য করতে পারে না।

সে মায়ের পাছা ধরে তুলে নেয়, পা ফাঁক করে। নীলিমার গুপ্তো ভাগ, নরম, কালো চুলে ভরা, আর ভেতরে ভিজে থাকা। তার লাল, মাংসল ভেতরটা দেখে নীতাই মাথা ঘুরিয়ে দেয়।

"ঢুক," নীলিমা ফিসফিস করে বলে। "আমার ভেতরে। এখন।"

নীতাই ঢোকে। ধীরে, এক ইঞ্চি, দুই ইঞ্চি। মায়ের ভেতরটা গরম, ভিজে, টানটান। নীলিমার শরীর কাঁপে, তার পিঠ বাঁকে, তার গলা থেকে আবেগের বিস্ফোরণ বেরোয়।

নীতাই সে মুহূর্তে জানে, এ কেউ থামাতে পারবে না আর।

সে ঠেলে ঢোকে, পুরোটা। নীলিমার গলা থেকে দীর্ঘ, নিম্ন শব্দ বেরোয়, তার নখ ছেলের পিঠে বসে যায়। নীতাই শুরু করে, ধীরে, তারপর দ্রুত, ক্রমশ জোরে। তার মায়ের বুকের দুই দুধও উপরে নিচে উঠছে, নিপল সেখানে খেলছে, তার হাতে নরম পাছা, চামড়া চামড়ায় চটচটে শব্দ। বাইরে ফের বৃষ্টি নেমেছে, ঝরঝরে, আর ঘরের ভেতরে নীলিমার হাওয়াই চটি মেঝেতে পড়ে আছে, দুই পাশে।

"নীতাই," নীলিমা কানে কানে ফিসফিস করে, তার চোখে জল, তার শরীরে জ্বলন্ত ক্ষুধা। "আর থামিস না। কোনোদিন আর থামিস না।"

নীতাই থামে না। সে জোরে ঠেলে, গভীরে, প্রতিটা ধাক্কায় মায়ের শরীর উপরে ওঠে, মেঝের খাটে টুং করে শোনায়। নীলিমার ভেতরটা চেপে ধরে, কাঁপতে থাকে, আর নীতাই তার ছেলের চোখে নিজের মায়ের শরীরের প্রথম বিস্ফোরণ দেখে, সেই চোখে তার নিজের ক্ষুধার প্রথম মুক্তি। আর নীতাইয়ের শরীর শেষ মুহূর্তে কাঁপতে কাঁপতে ফেটে যায়, তার ক্ষুধার বিস্ফোরণটা নীলিমার ভেতরে গরম ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। দুজনে এক সারিতে হাঁপাচ্ছে, ঘাম মিশে যাচ্ছে ঘামে। খাটের কাঠ এখনো টুং টুং করে প্রতিধ্বনি ছেড়ে আসছে।

তারপর স্তব্ধতা।

নীলিমা প্রথম নড়ে। ছেলের বুক থেকে নিজের মুখটা তুলে নেয়, আর সেই মুখে কান্না শেষ, শুধু ফাঁপা ক্লান্তি। নীতাই তার পাশে সরে শোয়, আর তখনই এসে পড়ে ঢেউটা, যা এত প্রবল, যে তার পাঁজর শোঁকে। কী করল সে এক্ষুনি। তার মা। যে শরীর তাকে দশ মাস বহন করেছিল, সেই শরীরের ভেতরে তার জিনিসটা এই মুহূর্তেও ঢুকে আছে, ভেজা, উষ্ণ। মায়ের ভেতরে ছেলের বীজ। নীতাই চোখ বন্ধ করে ধোঁয়ার মতো লজ্জা নামতে দেয়, ধোঁয়াটা নামে, তবু শরীরের ভেতরে সেই নিষিদ্ধ শিহরণটা ফুরোয় না, বরং গাঢ় হয়ে জমে।

"নীতাই," নীলিমা ফিসফিস করে। "কী করলি তুই আমাদের..?"

নীতাই চোখ খোলে। মায়ের মুখটা তার দিকে, অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না, শুধু ঠোঁটের কাঁপা রেখা।

"তুমি আমাকে ডাকলে," সে বলে। "ঢুক বলেছিলে, তুমি।"

"হুঁ।" নীলিমার হাত ছেলের বুকে নামে, ধীরে, আঙুল চাপ দেয়। "হুঁ, আমি ডেকেছিলাম। চল্লিশ বছরে প্রথম কাউকে ডেকেছি এভাবে।" সে থামে, নিঃশ্বাস গভীর নেয়। "ওর হাত ঠান্ডা, নীতাই। ব্রতীন্দ্রবাবুর রিংওয়ালা হাত। তোর হাত জ্বলে। আমি ঠান্ডায় বাঁচতে বাঁচতে ভুলে গেছিলাম শরীরে গরম কেমন লাগে।"

তার আঙুলগুলো উঠে আসে নীতাইয়ের চিবুকে, ছোঁয়। ছোট্ট ছোঁয়া, তবু তার ভেতরে এমন ভার নামে, যে নীতাই বুঝে যায়, ফেরত যাওয়ার পথ আর খোলা নেই। দরজাটা তারা দুজনেই বন্ধ করেছে। সে মায়ের পাছা আবার ধরে, নরম, ফুলে ওঠা মাংস, আর একবার প্রবেশ করে, ধীরে, আবার শুরু করে, এবার ধীর তালে, লম্বা টানে। নীলিমা কান বন্ধ করে মুখ চাদরে গুঁজে নেয়, গলা থেকে চাপা সেই শব্দ, আর নীতাই মনে মনে বলে, এই শরীরটা এবার থেকে তার।

বিকেলে সে পানি আনতে উঠোনে যায়, ফিরে আসতে দেখে ভেতরের ঘরের দরজাটা ফাঁক। ফাঁকটা আগে থেকে ফাঁক ছিল না। আজ খোলা।

বিমল জেগে আছে।

হারিকেন জ্বলছে না, তবু দুপুরের ধোঁয়াটে আলো ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে খাটের উপরে। নীলিমা পাশে বসে ওষুধ দিচ্ছে, আর বিমলের চোখ নীলিমার মুখে নেই। চোখটা দরজার ফাঁক দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের দিকে। চোখে রাগ নেই, নিন্দা নেই। চোখটা ভাঙা, তবু ভাঙা ঘরের মতো, যেখানে নতুন কেউ চলে এসে বসতে শুরু করেছে, আর পুরনো মালিক সেটা দেখে বসে আছে, হাতে চার আঙুল ছাড়া, গলায় শব্দ ছাড়া। প্রতিস্থাপনের চোখ।

নীলিমা পেছন ফিরে দেখে নীতাইকে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর দেখে স্বামীর চোখ কোথায়। ঘরটা এক মুহূর্তে বরফ হয়ে যায়। বিমল কাউকে কিছু বলে না, বলতে পারে না, শুধু চোখটা নামিয়ে নেয় । সেই নামানোটাই স্বীকারোক্তি।

নীলিমা দরজা বন্ধ করে দেয়, ধাক্কা মেরে। বাইরে উঠোনে নীতাই হাঁড়িতে জল রেখে দাঁড়িয়ে থাকে বহুক্ষণ। তার মুঠো ঠান্ডা, তবু বুকের ভেতরে চটচটে গরম জমছে। বাবা দেখেছে। বাবা বুঝেছে। আর ভয়টা কোথায় যেন না থেকে, শিহরণটা আরও ফুলে উঠেছে। এই বাড়ির পুরুষ এখন সে।

সন্ধেবেলা নীলিমা তার পাশে বসে, পাঁচশো টাকার নোট হাতে। "ব্রতীন্দ্রবাবুর সাথে হিসেব চুকিয়ে দিলাম আজ। বলেছি আর যাব না। ও হাসল, বলল, ভাত তো খেতেই হবে।"

"খেতে হবে না।" নীতাই নোটটা হাতে নেয়, ভাঁজ করে। "ওষুধের টাকা আমার পকেটে আছে, বলেছিলাম তো। আর ও বাড়ির কাজের শিকল আজ পড়ে গেল ফটকের বাইরে।"

"ও লোক মারবে তোকে, জানিস?"

"মারবে, দেখব তখন।" নীতাই মায়ের ঘাড়ের নতুন ছোপটার দিকে চোখ নামায়, ধীরে আঙুল বুলিয়ে দেয়। নীলিমা কাঁপে না এবার, বরং ঘাড় সামান্য কাত করে দেয় ছোঁয়ার দিকে। "মা, একটা কথা বলি? আমার লজ্জা লাগছে, কিন্তু তবু বলব। আমি রাতে শুয়ে ভেবেছি, তোমার লজ্জা লাগে না তোমাকে ছোঁয়ায়। লাগে সেটায়, যে চল্লিশ বছর লেগেছে এই ছোঁয়া পেতে। আর কেউ যদি প্রশ্ন করে, উত্তর দেব আমি। পাড়ায়, মিটিংয়ে, থানায়। তুমি শুধু আমার পাশে থাকো।"

নীলিমা চোখ তুলে তাকায়। চোখে জল নেই এবার, আছে অন্য কিছু, চেনা ক্ষুধার স্থির জ্বলন।

"তুই কে হলি এক্ষুনি আমার?" সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।

নীতাই উত্তর দেয় না শব্দে। উত্তর দেয় হাতে, মায়ের কোমরের ভাঁজে আঙুল বসিয়ে, আর মনের ভেতরে শপথটা নিয়ে নেয়, কড়া ঘন: ব্রতীন্দ্রের দালান আর এই শরীরের দরজায় কবলাবে না, কোনোদিন না। ভাত যার, দোকান যার, শরীরটাও তার। বাইরে রাত নামছে, দূরে ব্রতীন্দ্রের লোহার ফটক চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, আর ভেতরের ঘরে বিমলের হাঁফ ধীরে সমান হচ্ছে, এক বাদামের মতো চাপা আলোয়, যে বাদামের মালিক আর কেউ নয়।