ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামী পর্ব ৩

Cancer Affected Husband 3

আজকেই হয়তো তার মনীষা তার বন্ধুর হয়ে যাবে, চিরকালের জন্য। সারাজীবনের জন্য সে তার স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলবে। ভেবেই অরুণের বুকটা যেন কষ্টে ফেটে যাচ্ছিল।

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: অরুণ রবি ও মনীষা - ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামীর আত্মত্যাগের গল্প

প্রকাশের সময়:20 Mar 2026

আগের পর্ব: ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামী পর্ব ২

অবশেষে একদিন অরুণ রবি-কে ডাকলো। মনীষার সামনেই রবিকে তার সব পরিকল্পনা বুঝিয়ে বললো। রবি ফের একবার অরুণ-কে বললো তার সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনা করে দেখতে। অরুণও বললো সে অলরেডি যা ভাবার ভেবে নিয়েছে। সে জানে তার আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই মনীষার সাথে। কিন্তু তার স্ত্রী ও মেয়ের আছে, রবির সাথে। তাদের ভবিষ্যৎ-টা সুরক্ষিত হাতে রেখে যেতে হবে।

সেই কথামতো অরুণ ও মনীষার ডিভোর্স হয়ে গেল, মিউচুয়ালি। সম্ভবত এটা পৃথিবীর প্রথম ডিভোর্স যেখানে স্বামী স্ত্রী অনিচ্ছাকৃত সত্ত্বেও শুধুমাত্র পরিস্থিতির কবলে পড়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে বাধ্য হল। ঠিক হল তাদের মেয়ের কাস্টডি মা-ই পাবে, খুব স্বাভাবিক কারণে। কয়েকদিন পর অরুণ মন্দিরে নিয়ে গিয়ে রবি ও মনীষার বিয়ে দিয়ে দিল। বিয়েটাকে আইনি স্বীকৃতি দিতে তাদের রেজিস্ট্রি ম্যারেজও করালো।

------------------------------------------------

সেদিন ছিল রবি ও মনীষার একসাথে বিয়ের পরের প্রথম রাত। বাসর রাত বলা যায়। রবি অরুণের বাড়িতে শিফট হয়েগেছিল। মনীষা কাঁদতে কাঁদতে অরুণের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলো যে সে কি করে একই ছাদের তলায় তার ও রবি দুজনের সাথে এই অদ্ভুত পরিচয় নিয়ে বসবাস করবে? বিশেষ করে রবির সাথে, যেখানে পাশের ঘরেই তার প্রাক্তন কিন্ত প্রকৃত স্বামী অরুণ থাকবে!

অরুণ তখন ওকে মহাভারতের উদাহরণ দিয়ে বোঝালো যে দ্রৌপদীরও পাঁচ স্বামী ছিল, এবং প্রত্যেকের সহিত তার সন্তানও হয়েছিল। সন্তান হওয়ার কথা শুনে মনীষা চমকে উঠলো! সে অরুণের কাছ থেকে এরূপ উদাহরণ দেওয়ার অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে চাইলো?

অরুণ বললো সে তাকে বোঝাতে চাইছে যে মহাভারত কাল থেকে নারী চাইলে একই সাথে একাধিক স্বামীর সহিত সহবাস করতে পারে। ছেলেদের ক্ষেত্রে যেটা হয় পলিগ্যামি, মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা পলিএন্ড্রি।

"আর সন্তান হওয়ার কথাতে তুমি এতো বিচলিত কেন হলে? আজকে রবি আমার সংসারটা-কে বাঁচাতে তোমায় বিয়ে করেছে। কাল রবির স্বামী হিসেবে নিজস্ব কিছু চাহিদা থাকতেই পারে। তোমার তখন উচিত হবে নিজের স্ত্রীর ধর্ম পালন করা, রবির স্ত্রী হিসেবে।.."

মনীষা অবাক পানে চেয়ে অরুণ-কে জিজ্ঞেস করলো, "তুমি কি করে পারছো এসব করতে? কি করে পারছো এতোটা কঠিন হতে?"

"আমি এখন সব পারা আর না পারার ঊর্ধ্বে উঠে গেছি। ভাগ্য আমাকে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন করিয়েছে, সেখান থেকে দাঁড়িয়ে আমি এখন আর আমার কথা ভাবছিনা। ভাবছি তোমার কথা, আমাদের সন্তানের কথা। আর আমার মনে হয়, তোমারও সেটাই ভাবা উচিত। আমি এখন ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় প্রবেশ করছি।"

অরুণের কথা শুনে মনীষা কাঁদতে কাঁদতে অরুণকে জড়িয়ে ধরলো। অরুণ বললো সে এখন তার কাছে পরপুরুষ। তাই নিজের স্বামী থাকতে মনীষার মতো রুচিশীল মেয়ের এরূপ অন্য পুরুষের সহিত আলিঙ্গনে লিপ্ত হওয়া শোভা পায়না। অরুণ নিজের মনে জোর রেখে মনীষা-কে আস্তে আস্তে রবির দিকে ঠেলে দিচ্ছিলো। তাই বারংবার মনীষাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলো যে এখন তার স্বামী রবি, সে নয়।

মনীষা নিজের ঘরে বসেছিল। অরুণ মেয়েকে নিয়ে পাশের ঘরে শিফট হয়ে গেল। কিচ্ছুক্ষণ পর রবি মনীষার বেডরুমে প্রবেশ করলো। রবিকে দেখে মনীষার মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করতে লাগলো। দুজনের মধ্যে বেশ কিচ্ছুক্ষণ কোনো কথা হলো না। 

তারপর মনীষা নিজেই রবিকে বললো, "দেখো রবি, তুমি আমাদের অনেক সাহায্য করেছো। তার জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু তোমার নববিবাহিতা স্ত্রী হিসেবে আমার কাছ থেকে তুমি কিছু আশা করোনা প্লিজ। নাহলে তোমাকে বারংবার আশাহত হতে হবে। তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি কি পরিস্থিতিতে এই বিয়েটা করতে বাধ্য হয়েছি.."

"আমি বুঝি মনীষা। তুমি চিন্তা করোনা, আমি কখনো তোমার অ্যাডভান্টেজ নেওয়ার চেষ্টা করবো না। তুমি আমার কাছে এখনো অরুণের স্ত্রী হিসেবেই যথাযথ সম্মান পাবে।"

কিচ্ছুক্ষণ পর রবি আবার বলে উঠলো, "আমি কিন্তু ইচ্ছে করে বিয়েটা করতে চাইনি। তুমি চাইলে অরুণের সাথে থাকতে পারো।"

"অরুণ নিজেই আমার সাথে থাকতে চায়না। সে আমাকে পর করে দিয়েছে এখন ", খুব দুঃখে ও অভিমানের সাথে মনীষা কথাটি বললো।

"অরুণ যা করেছে তোমার আর পরীর ভালোর কথা ভেবে করেছে।"

"আমি তো এতোটা ভালো চাইনি।"

রবি আর কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না। সে আর কথা না বাড়িয়ে মনীষাকে বিছানার এক ধারে শুয়ে পড়তে বললো। রবিও একই বিছানায় শুলো কিন্তু মনীষার সাথে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে।

এভাবে কিছুদিন কেটে গেল। মনীষা স্বপ্নেতেও রবিকে নিজের ধারের কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছিলো না। রবিও নিজের সীমা লংঘন করার সাহস দেখায়নি। অরুণ বুঝতে পারছিল যে রবি ও মনীষার বিয়ে হলেও তারা এখনও পরস্পরের প্রতি দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে, বিশেষ করে মনীষা। কিন্তু এভাবে চললে তো তারা সারাজীবনেও এক হতে পারবে না। অরুণকে তো নিজের মৃত্যুর আগে সবকিছু ঠিক করে দিয়ে যেতে হবে। তাই সে রবির সাথে এই নিয়ে কথা বলবে বলে ঠিক করলো। রবির সাথে সে একান্তে একদিন বসলো।

- "দেখ রবি, তোকে একটা সহজ কথা জিজ্ঞেস করছি, তোরা কি আমার কথা ভেবে একে অপরের থেকে দূরে সরে রয়েছিস?"

- "সত্যি বলতে মনীষাই তো এখনো মন থেকে আমায় মেনে নিতে পারেনি। ও এখনো তোকেই নিজের স্বামী বলে ভাবে, এবং সারাজীবন হয়তো তাই ভাববে।"

- "তুই যদি ওর কাছাকাছি না যাস, ও কখনোই তোকে নিজের মনে জায়গা দেবে না।"

- "আমি সেটা কি করে করবো! সর্বোপরি তুই আমাকে বলছিস নিজের বউয়ের কাছাকাছি যেতে।"

- "রবি, ও এখন তোর স্ত্রী, আমার নয়।"

- "সেটা পরিস্থিতির কারণে অরুণ। তুই ওকে বাধ্য করেছিস আমায় বিয়ে করতে।"

- "আমার কাছে যে অন্য কোনো রাস্তা খোলা ছিলনা।"

- "জানি ভাই, তাই জন্যই তো তোকে সম্পূর্ণ দোষ দিতে পারছিনা। দোষটা আমাদের কপালের।"

- "এভাবে হাল ছেড়ে দিলে তো হবেনা ভাই। আমার নয় জীবনটা প্রায় শেষের দিকে, কিন্তু তোদের তো জীবন এখনো অনেকটা পড়ে রয়েছে। বিশেষ করে আমার বাচ্চাটার কি হবে? জানি তুই ওর নতুন বাবা হিসেবে সব দায়িত্ব নিবি, কিন্তু ওর মা-কে সবসময়ে এরকম উদাস মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখলে ওরও তো মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।"

- "তাহলে তুই আমাকে এখন কি করতে বলছিস বল?"

আরো একবার বুকে পাথর চেপে অরুণ বললো, "তুই আজকে রাতেই ওর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা কর।"

- "অরুণ! তুই এই কথাটা বলতে পারলি! মনীষা তোকে কতো ভালোবাসে। যতোই আমাদের নাম কে ওয়াস্তে বিয়ে হয়ে যাক না কেন, ও এখনো শুধু তোকেই ভালোবাসে। আমি ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কি করে এসব করবো?"

- "ওকে আমিও যে খুব ভালোবাসি। আর ভালোবাসি বলেই তো ওর ভালো চাই। আর তাই তোকে এসব করতে বলছি। যাতে ও নতুনভাবে তোর সাথে জীবনটা শুরু করতে পারে, সেটা মারা যাওয়ার আগে আমি নিশ্চিত করে যেতে চাই।"

- "কিন্তু ও আমাকে নিজের শরীর স্পর্শ করতে দেবে না।"

- "তুই একবার চেষ্টা তো কর ওর কাছে যাওয়ার। আমি জানি প্রাথমিকভাবে বাধা দিলেও পরে ও ঠিক তোকে আপন করে নেবে। শরীরের জ্বালাও তো একটা বড়ো জ্বালা রে। ও কতোদিন এভাবে উপবাসী হয়ে থাকবে আমার জন্য! কতোদিন হয়ে গ্যাছে ওর সেই সুন্দর কোমল শরীরে কোনো পুরুষের স্পর্শ পড়েনি। এটা তো ওর সৌন্দর্যের প্রতি চরম অন্যায় করা হচ্ছে। এতোদিন আমিই একমাত্র পূজারী ছিলাম এই রূপের। যে সুন্দর শরীরকে প্রতি রাতে আমার পুজো করা উচিত, তাকে আমি হেলায় ফেলে রেখেছি, নিজের শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে। এখন তুই সেই পূজারী হয়ে ওঠ রবি। তুই ওর ভবিষ্যৎ, আমার এখন বাস্তব থেকে ওর স্মৃতিতে প্রবেশ করার পালা।"

অরুণের কথাগুলো শুনে রবির রোম খাড়া হয়ে গেল। অরুণ যৌনতাকে কি সুন্দরভাবে বর্ণনা করতে পারে, সত্যিই! মৃত্যু-পথযাত্রী মানুষ যখন জানতে পারে তার মৃত্যু আসন্ন, তখন হয়তো সে আপনা-আপনি কবি বা দার্শনিক হয়ে ওঠে। কারণ সে ধীরে ধীরে সব জাগতিক মোহ-মায়া কাটিয়ে উঠতে শুরু করে।

যাই হোক, অরুণের সাথে কথা বলে রবি ডিনার-টা সেরে নিল। অরুণ যথারীতি নিজের ঘরেই ডাক্তারের প্রেসক্রাইব করা ডায়েট খাবার খেলো, যা মনীষা রান্না করে অরুণের জন্য নিয়ে এসছিল। রাতে মনীষা নিজের কাজবাজ সেরে ঘরে চলে গেল ঘুমোতে। অন্য ঘরে অরুণের পাশে তাদের ছোট্ট মেয়ে পরী চুপটি ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ব্যালকনিতে রবি সিগারেটে টান মারছিল এবং অরুণের বলা প্রতিটি কথাকে পুনরায় স্মরণ করছিল।

সিগারেট শেষ করে রবি মনীষার ঘরের দিকে যেতে লাগলো। অরুণের ঘরের দরজা খোলা ছিল। অরুণ বালিশে হেলান দিয়ে বই পড়ছিল। তারও যে ঘুম আসছিলোনা আজ। সে যে নিজের বন্ধুকে একপ্রকার লাইসেন্স দিয়ে ফেলেছিল তার স্ত্রীয়ের শরীরের উপর অধিকার ফলানোর।

আজকেই হয়তো তার মনীষা তার বন্ধুর হয়ে যাবে, চিরকালের জন্য। সারাজীবনের জন্য সে তার স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলবে। ভেবেই অরুণের বুকটা যেন কষ্টে ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু তাকে তো এই কঠিন পদক্ষেপটা নিতেই হতো, তার পরিবারের মঙ্গলের জন্য।

মনীষা যদি এভাবে রবির থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে, খালি দূরে দূরে পালায়, তাহলে হয়তো একদিন রবি বিরক্ত হয়ে তার বন্ধুর চাপিয়ে দেওয়া সংসারের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে চাইবে। তখন মনীষা ও পরীর কি হবে?

একটি মেয়ে যখন তার স্বামীকে হারিয়ে ফেলে, এবং সেই মেয়ে যদি অপরূপ সৌন্দর্য্যের অধিকারী ও এক সন্তানের জননী হয়, তখন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হিংস্র হায়নার রূপ ধারণ করে, এবং সেই বিধবা মেয়েটিকে কেবল নিজের শিকার ভাবতে শুরু করে। শুধু শোষণ করতে চায়, দায়িত্ব কেউ নিতে চায়না।

তাই অরুণের হাতে আর কোনো উপায় নেই, নিজের স্ত্রীকে নিজের বিশ্বস্ত বন্ধুর হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া। রবির কাছে মনীষা ও তার মেয়ে পরী অন্তত সুরক্ষিত ও নিরাপদ থাকবে।

রবি মনীষার ঘরে যাওয়ার আগে একবার অরুণের ঘরের দিকে তাকালো। দেখলো অরুণ চাতক পাখির মতো ওর দিকে চেয়ে রয়েছে। রবি প্রশ্নভরা মুখ নিয়ে অরুণের দিকে তাকালো, যেন সে জানতে চাইছে অরুণের সত্যি সম্মতি রয়েছে কিনা? অরুণও চোখের ইশারায় তাকে মনীষার ঘরে যেতে বললো। সম্মতি দিল নিজের স্ত্রীকে আপন করে নেওয়ার।