যাই হোক, অবশেষে সেই দিনটা এল যেদিন অরুণ মনীষার কাছে নিজের কথাটা খুলে রাখলো....
"মনীষা ....."
"হ্যাঁ, বলো।.."
"তুমি আমাকে ভালোবাসো?"
"এটা কোনো কথার কথা হলো? তোমার কোনো সন্দেহ আছে?"
"আহঃ, তাও বলোনা। ভালোবাসো আমায়?"
"হ্যাঁ। নিজের থেকেও বেশি!"
"তাহলে আমার সব কথা রাখবে?"
"আজ পর্যন্ত কোন কথাটা রাখিনি?"
"তাও কথা দাও, আমি যেটা বলবো সেটা মেনে নেবে.."
"আচ্ছা, বলো।.."
"তুমি তো জানো মনীষা আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। প্লিজ, রবির মতো তুমিও শান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করোনা, আমি বাচ্চা নই। সত্যিটা-কে অ্যাকসেপ্ট করতে জানি। এবং তুমিও সেটা অ্যাকসেপ্ট করে নাও।"
"তুমি বলতে কি চাইছো?"
"আমার একটা শেষ ইচ্ছে রয়েছে। তুমি সেটা রাখবে?"
"ওভাবে বলো না প্লিজ! আমার কষ্ট হয়না??.." কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো মনীষা।
অরুণ তাকে কাছে টেনে নিয়ে বললো, "কি বললাম, সত্যিটাকে মেনে নিতে, তাহলে কষ্ট কম হবে। এবার বলো আমার একটা ইচ্ছে রাখবে?"
"কি??"
"তুমি আবার নিজের জীবনটা-কে নতুন করে শুরু করো।"
"মানে?"
"তুমি বিয়ে করো।"
শোনা মাত্রই সঙ্গে সঙ্গে অরুণের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠলো মনীষা, "তুমি কি পাগল হয়েছো?"
ততটাই নমনীয় ভাব রেখে অরুণ বললো, "শান্ত হও মনীষা। Calm down! নিজের কথা না ভাবো, অন্তত আমাদের পরীটার কথা তো ভাবো। আমার কি আছে যা রেখে যাবো তোমাদের জন্য? তোমরা তো শেষে পথে বসবে! তাহলে তো আমি মরেও শান্তি পাবোনা।"
মনীষা কাঁদতে কাঁদতে বললো , "প্লিজ অরুণ, তুমি চুপ করো। আমি আর কিচ্ছু শুনতে চাইছি না।"
এই বলে মনীষা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অরুণ বুঝলো এইভাবে মনীষা-কে কনভিন্স করানো যাবেনা। অন্য পথ দেখতে হবে।.. অরুণ তাই খাওয়া-দাওয়া, ওষুধ নেওয়া সব বন্ধ করে দিল। দিতে আসলেই সব ছুড়ে ফেলে দিত। মনীষা জিজ্ঞেস করলো কেন অরুণ এরকম করছে? এভাবে চললে তো ও আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে! জবাবে অরুণ বলতে লাগলো, সে তাড়াতাড়ি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চায়। কারণ সে দাঁড়িয়ে থেকে তার পরিবারের দুর্গতি আর দেখতে পারবে না। তার স্ত্রী যখন ঠিকই করে নিয়েছে তার মৃত্যুর পর নিজের ও মেয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে রেখে দেবে তখন তার আশাহত হয়ে দ্রুত মরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
মনীষা বুঝতে পারলো অরুণ কেন এরূপ ব্যবহার করছে। সে তার স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করলো যে সে তার স্বামী ব্যতীত আর কাউকে নিজের জীবনে জায়গা দিতে পারবে না। অরুণও উল্টে তাকে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
"আচ্ছা, ধরো মেনেও নিলাম তোমার কথা। কিন্তু এমন কাউকে কোথায় পাবো যে আমাকে তোমার মতো করে ভালোবাসবে?"
"পাবে, নিশ্চই পাবে।"
"তা আমার হাসবেন্ড আমার জন্য নতুন বর খুঁজে দেবে? কোথা থেকে এনে দেবে শুনি?"
"যদি বলি, খোঁজা হয়ে গেছে।"
"কে? কার কথা বলছো তুমি?", মনীষা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
"আগে বলো, তুমি কোনো রিএক্ট করবে না। ধীর স্থির হয়ে আগে সব কথা শুনবে.."
"ঠিক আছে...."
"রবি কে তোমার কেমন লাগে?"
"কি!! তুমি রবি কে......"
"আগেই বলেছি, রিএক্ট করোনা।"
"রবি এসব জানে? তুমি এ কিসব ভাবনা মাথায় চাষ করছো!!.."
"দেখো, তুমি আমাকে খারাপ ভাবো, ভুল বোঝো, যা ইচ্ছে তাই করো! তবুও আমি বলবো আমি যা বলছি খুব ভেবেচিন্তেই বলছি। মনীষা, তুমি কেন বুঝতে পারছো না, আমি চলে যাওয়ার পর ইউ ব্যাডলি নিড সামওয়ান। আর আমি রবি ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করতে পারবো না। একমাত্র রবিই তোমার আর আমাদের মেয়ের দায়িত্ব নিতে পারবে। তাই তোমাকে রবির হাতে তুলে দিলে আমি অন্তত শান্তিতে মরতে পারবো। এইটুকু তুমি আমার জন্য করতে পারবে না? আমার জন্য না হলেও আমাদের পরীর জন্য?"
"কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব! আমি রবির সম্পর্কে এসব কখনো দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করিনি।"
"বালাই ষাট! রবি তোমার দুঃস্বপ্ন হতে যাবে কেন? সে তোমার আগামীর নির্মল প্রভাত। দুঃস্বপ্ন তো আমি, যাকে তোমায় ভুলে যেতেই হবে, আমার দিব্যি! এখন থেকে তুমি ওকেই কল্পনা করবে। ওর কথাই মনে মনে ভাববে। রবি শুধু আমার বন্ধু নয়, সে তোমারও খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছে। তা তুমি বুঝতে পারছো না, বা চাইছো না মানতে। এরকম একটা নিঃস্বার্থ মানুষকে যদি তুমি বাকিটা জীবন জীবনসঙ্গী হিসেবে পাও, তাহলে তুমিও ভালো থাকবে আর সেও।"
"এসব কথা ভাবার আগে তুমি একবারও রবির সাথে কথা বলেছো? সে কি চায় তা জেনেছো? মেনে নিলাম তোমার পয়েন্ট অফ ভিউ দিয়ে দেখতে হলে তুমিই হয়তো ঠিক। কিন্তু তুমি কি করে কাউকে না জানিয়ে তার মতামত না নিয়ে তার জীবন সম্পর্কে এতো বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে পারো? আমার সম্পর্কে তুমি বলতেই পারো এসব কথা, কারণ আমি তোমার স্ত্রী। তোমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে আমার এবং আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কিন্তু রবি? ওর উপর তুমি কিছু চাপিয়ে দিতে পারোনা। তাছাড়া আমি কারোর জীবনে বোঝা হতে যাব কেন? ওর তো অন্য কাউকে পছন্দ হতে পারে।"
"রবি সিঙ্গেল। এবং ও রাজি আছে তোমায় বিয়ে করতে। আমি ওর সাথে আগেই কথা বলে রেখেছি।"
"কি !!!!......", মনীষা আকাশ থেকে পড়লো অরুণের এই কথা শুনে।
"আমি ঠিকই বলছি মনীষা। আমি রবিকে রাজি করিয়ে নিয়েছি। সে প্রস্তুত তোমার আর পরীর দায়িত্ব নিতে। এবার তোমার পালা। তুমি যদি রাজি থাকো এই সম্পর্কে, তাহলে আমি এই শেষ ক'টা দিন শান্তিতে কাটাতে পারবো, তারপর নিশ্চিন্তে মরতে পারবো।.. যদি সেটা তুমি চাও। আর নইলে, আমাকে বুকভরা কষ্ট, ও হাজারো চিন্তা মাথায় নিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। মরেও আমার আত্মা শান্তি পাবেনা। এবার তুমি ডিসাইড করো, কি চাও? আমাকে একটু শান্তি দিতে নাকি নিজের স্ত্রী ধর্ম পালনের নামে আমাকে এক কষ্টকর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে?"
অরুণের কথা শুনে মনীষা বসে পড়লো। সে বুঝতে পারছে না, সে কি করবে। স্ত্রী ধর্ম পালন করবে নাকি স্বামীর ইচ্ছের মর্যাদা রাখবে? সেদিন মনীষার আর কোনো কাজে মন লাগলো না। রাতে ঠিকমতো ঘুমোতেও পারলো না। দু'দিন এভাবে কেটে গেল।
অবশেষে মনীষা হার মানলো, অরুণের জেদের কাছে। তার কাছে যে আর অন্য কোনো পথ খোলা ছিলনা। জীবন তাকে এমনই এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, যেখান থেকে উভয় দিকেই তার নৈতিক পরাজয় নিশ্চিত। সে অরুণকে গিয়ে বললো যে সে রাজি, এবং জানতে চাইলো তাকে কি কি করতে হবে, তার স্বামীর ইচ্ছে রাখার জন্য?
"সবার প্রথমে তুমি আমাকে ডিভোর্স দেবে।"
"কিই!!"
"হ্যাঁ, ঠিকই শুনলে। সবার আগে আমাদের ডিভোর্স হবে। তারপর আমি দাঁড়িয়ে থেকে তোমাদের চার হাত এক করবো। ঠিক যেভাবে রবি আমাদের বিয়ে দিয়েছিল মন্দিরে নিয়ে গিয়ে। এবার আমার জায়গায় থাকবে রবি, আর রবির জায়গায় আমি। তারপর রবি এই বাড়িতে এসেই থাকবে, যতোদিন আমি রয়েছি। আমি পরীকে নিয়ে অন্য ঘরে শিফট করে যাবো। আর তুমি ও রবি একই রুমে থাকবে স্বামী-স্ত্রীর মতো।"
"অসম্ভব! আমি এটা কিছুতেই করতে পারবো না। জীবিত থাকতে তোমাকে ত্যাগ করতে পারবো না।"
"তোমাকে করতেই হবে। কি গ্যারান্টি আছে আমি মরে যাওয়ার পর রবি আমার কথা রাখবেই? আমি তাই সবকিছু চাক্ষুষ দেখে যেতে চাই। তোমার নতুন সংসারটা গুছিয়ে দিতে চাই। আমার জন্য না হোক, নিজের জন্য না হোক, আমাদের মেয়ের জন্য তোমাকে এই পদক্ষেপ নিতে হবে, নিতেই হবে।"
মনীষা অনর্গল কাঁদতে লাগলো। কান্না থামার নামই নিচ্ছিলো না। অরুণের মনও অনেকটাই ভারাক্রান্ত ছিল। তবুও সে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলো মনীষা-কে শান্ত্বনা দিয়ে বোঝানোর। মনীষার কাছে আর অন্য কোনো রাস্তা পড়ে ছিলনা, নিজের স্বামীর কথায় রাজি হওয়া ছাড়া।
অবশেষে একদিন অরুণ রবি-কে ডাকলো। মনীষার সামনেই রবিকে তার সব পরিকল্পনা বুঝিয়ে বললো। রবি ফের একবার অরুণ-কে বললো তার সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনা করে দেখতে। অরুণও বললো সে অলরেডি যা ভাবার ভেবে নিয়েছে। সে জানে তার আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই মনীষার সাথে। কিন্তু তার স্ত্রী ও মেয়ের আছে, রবির সাথে। তাদের ভবিষ্যৎ-টা সুরক্ষিত হাতে রেখে যেতে হবে।