হাসপাতালের করিডোরে মনীষা ও রবি অপেক্ষা করছিল, অরুণের বায়োপসি রিপোর্ট আসার। মনীষা নিজের ছোট্ট মেয়েটি-কে কোলে নিয়ে বসেছিল। রবি অরুণের ছোটবেলার বন্ধু। সবকাজে সবসময় এক আদর্শ বন্ধু হিসেবে পাশে থেকেছে। মনীষা-কে বাড়ি থেকে পালাতেও সাহায্য করেছে, এবং দাঁড়িয়ে থেকে মনীষা ও অরুণের চার হাত এক করেছে।
বায়োপসি রিপোর্টে ধরা পড়লো অরুণের মারণ রোগ ক্যান্সার, তাও আবার অ্যাডভান্স স্টেজ। হাতে আর বেশি সময় নেই। শুনেই মনীষা ভেঙে পড়েছিল। রবি ওকে শান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু তারও মনের অবস্থা ভালো নয়। বন্ধুর এরূপ অবস্থা সেও সহ্য করতে পারছে না।
অরুণকে বাড়ি নিয়ে আসা হল। যতোদিন আছে ততোদিন যত্ন নেওয়ার পরিকল্পনা। মনে পাথর রেখে মনীষা নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে চাইলো স্বামীর জন্য। অরুণের প্রাইভেট জব ছিল। জীবনের আগে প্রথমে তার চাকরিটা গেল। দিন দিন তার অবস্থা সবদিক দিয়ে শোচনীয় হয়ে যেতে লাগলো। চিকিৎসার খরচা, ছোট্ট মেয়েটির ভবিষ্যৎ, সবমিলিয়ে এক অভাবের সংসার।
কিন্তু এই দুঃসময়ে একমাত্র তার প্রিয় বন্ধু রবিই নিঃস্বার্থ ভাবে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালো। অর্থনৈতিক সাহায্য থেকে নৈতিক সাহায্য সবই রবির কাছ থেকে তারা পেত। একজন আদর্শ পারিবারিক বন্ধু যেরকম হয় আর কি।
দিন দিন অরুণের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। সে এবার ঠিক মতো উঠতে চড়তে পারছিলনা। নিজের উপর কেবল ধিক্কার দিচ্ছিলো তার এই করুণ অবস্থার জন্য। বারবার নিজেকে সংসারের বোঝা হিসেবে মনে হচ্ছিল। সে এখন একা একা বাথরুম পর্যন্ত যেতে পারেনা। তার জন্যও তাকে বউয়ের সাহায্য নিতে হয়। সে জানে তার হাতে বেশি সময় নেই। তাই বারংবার নিজের মৃত্যুকামনাই করে চলে। এইভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভালো। কিন্তু মনীষা? ওর কি হবে? ওদের মেয়ে পরীরও বা কি হবে? ওদের ভবিষ্যৎ কি অরুণের চলে যাওয়ার পর? এই কথাগুলো অরুণকে সবসময়ে চিন্তায় রাখতো।
রবি প্রায় আসতো তাদের বাড়ি। ওদের খোঁজখবর নিতে এবং আর্থিক সাহায্য করতে। যখুনি অরুণের ডাক্তারের অ্যাপয়ন্টমেন্ট থাকতো, রবি ঠিক এসে হাজির, যেত ওদের সাথে। সবসময়ে মনীষা যেতে পারতো না মেয়েটার জন্য, তখন রবি একাই নিয়ে যেত তার বন্ধুকে।
রবি ও মনীষার মধ্যে প্রায় কথা হত। কখনো ফোনে, কখনো সামনাসামনি, এবং বেশিরভাগটাই অরুণকে নিয়ে। অরুণের চিকিৎসা, খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি। অরুণ লক্ষ্য করতো যে ওর পর যদি কেউ মনীষার এত যত্ন নেয় সেটা আর কেউ নয় তার বন্ধু রবি। সে একদিন ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলো অনেকক্ষণ। ভেবে অরুণ একটা চরম সিদ্ধান্ত নিল। নিজের পরিবারের জন্য, মেয়ের জন্য, বিশেষত মনীষার জন্য।.. রবিকে একদিন তলব করলো, জরুরি কথা বলার দোহাই দিয়ে। .....
-------------------
"বল অরুণ, কেন ডাকলি?...."
"রবি, তুই তো সবই জানিস। আমি আর বেশিদিন নেই।"
"প্লিজ , এইভাবে বলিসনা। তুই ঠিক হয়ে যাবি, বিশ্বাস কর। .."
"কেন মিথ্যে আশা দিচ্ছিস ভাই? তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, তোর মুখে এরকম ফর্মাল কথা মানায় না। আমি আমার ভবিতব্য মেনে নিয়েছি।.."
রবি চুপ করে গেল। সত্যিই তো সে মিথ্যে আশাই দিচ্ছিল। তাই কিছু বলতে পারলো না। অরুণ বললো, "মন খারাপ করিস না ভাই। জীবন থাকলে মৃত্যু আসবেই, কারোর আগে, তো কারোর পরে...."
রবি নিজের বেদনা ঢাকতে মাথা নিচু করে বললো, "বল তবে, কি জরুরি কথা বলার আছে, যার জন্য আজ আসতে বললি।.."
"আমি একটা কথা কয়েকদিন ধরে ভাবছি যে আমি চলে যাওয়ার পর মনীষা ও পরীর কি হবে? আমার চাকরি নেই, পেনশন থাকবে না, ইন্সুরেন্সও করা নেই।.. কি করে জানবো বল যে এত তাড়াতাড়ি মৃত্যু কড়া নাড়বে দরজায়! আমি যাওয়ার পর কি ওরা না খেতে পেয়ে মরবে? আগে জানলে তো পরীকে এই পৃথিবীতেই আনতাম না ", এই বলে অরুণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
রবি ওকে শান্ত্বনা দিতে দিতে বললো, "কাঁদিস না ভাই। আমি তো আছি।.."
"তাই জন্যই তো আজ তোকে ডেকেছি। আমার একটা আর্জি আছে তোর কাছে। আমি অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ......"
"মানে? কি আর্জি? কিসের সিদ্ধান্ত?"
"আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দে...."
"বল.."
"মনীষাকে তোর কেমন লাগে?"
"ভালোই। .. তুই খুব লাকি, মনীষার মতো একজন স্ত্রীকে পেয়েছিস, সে এই কঠিন সময়েও হাল ছেড়ে দেয়নি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তোকে সঙ্গ দিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে।"
"বাদ দে। আমি কতো লাকি সেটা তো দেখতেই পাচ্ছিস আমার অবস্থা দেখে। কিন্তু তুই সেই লাকি ব্যক্তি হতে পারিস।"
"..বুঝলাম না! ঠিক কি বলতে চাইছিস তুই?"
"তুই মনীষাকে বিয়ে কর।"
"কি!! তুই কি পাগল হয়েছিস!", বলেই রবি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। হকচকিয়ে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললো, "তোর মাথার ঠিক আছে? আগে মনে হয় তোকে মাথার চিকিৎসাটা করানো দরকার.."
রবি তখনো পর্যন্ত মনীষাকে অন্য চোখে দেখতো না।
"শান্ত হ রবি। আমি যা বলছি খুব ভেবেচিন্তেই বলছি। দেখ, তুই এখনো বিয়ে করিসনি। চাকরি করিস, ওয়েল এস্ট্যাব্লিশড। আর মনীষা মেয়ে হিসেবেও তো খারাপ নয়, তুই তো এক্ষুনি বললি। তাছাড়া দেখে কেউ বলবে ওর একটা ছোট্ট মেয়ে আছে। অসম্ভব সুন্দরী। তুই তো একবার মজার ছলে বলেছিলিস না যে ওকে দেখতে একেবারে ঈশা সাহার মতো।"
রবি মাথা ঝাঁকিয়ে নেতিবাচক সুরে বললো, "না না না, এটা হয়না!!"
অরুণ পাল্টা জিজ্ঞেস করলো, "কেন হয়না? তুই ভালোমতোই জানিস আমার কাছে আর বেশি দিন পড়ে নেই। আমি চলে যাওয়ার পর আমার বউ বাচ্চা কোথায় যাবে? কে তাদের দেখবে?"
"মানছি, লজিক্যালি তুই যা বলছিস তা হয়তো অনেকাংশে ঠিক। ভবিষ্যতে তোর অবর্তমানে মনীষা এবং পরীর একটা অবলম্বন দরকার। কিন্তু তা বলে আমি??.. কি করে?......"
"কেন নয়??.. ওহঃ! বুঝেছি। আসলে কি বলতো, ক্ষুদিরাম সবসময়ে পাশের বাড়ি থেকে হলেই আমাদের ভালো লাগে। আমরা লোক-কে মহান দেখতে চাই, কিন্তু নিজে হতে পারিনা। কারণ তার জন্য লাগে অনেক বড়ো স্যাক্রিফাইস। তুই আমার দুরবস্থার সম্পর্কে অবগত। আমি চাইলেও মনীষা আর পরীর জন্য কিছু রেখে যেতে পারবো না, শুধু মাত্র তোকে ছাড়া। মনীষা অর্থনৈতিক, মানসিক, এবং শারীরিক সবদিক দিয়ে একা হয়ে যাবে। তোকে ছাড়া আমি আর কাকেই বা এই ভার দিই বল? তুই একমাত্র এবং শেষমাত্র ভরসা আমার।"
"কিন্তু আমি কখনো মনীষাকে ওই চোখে দেখিইনি, আর না কখনো মনীষা আমাকে।..."
"এবার দেখ। অন্তত মনীষা ও আমার মেয়েটার স্বার্থে। আমি জানি তুই সিঙ্গেল। আর মনীষার যদি বিয়ে না হত তাহলে সেও তোর জন্য একদম পারফেক্ট ছিল।"
"কিন্তু......."
"আর কোনো কিন্তু নয় ভাই। তুই মনীষা কে আপন করে নে প্লিজ। তাহলে আমি একটু শান্তিতে মরতে পারবো।"
"মনীষা আমার হয়ে গেলে তুই সহ্য করতে পারবি?"
"আলবাত পারবো! আমার থেকে বেশি খুশি তখন কেউ হবেনা। আমি মনীষাকে সেটেলড্ করে যেতে চাই। আমার মেয়ের ফিউচার সিকিউর করে যেতে চাই। আর সেটা তখুনি সম্ভব যখন তুই মনীষার হাতটা ধরবি।"
"মনীষা জানে তোর এই পাগলামোর কথা?"
"ওকে এখনো বলিনি। আগে তুই রাজি হও, তারপর আমি ওকে ঠিক রাজি করিয়ে নেবো। ও আমার কথা ফেলেনা। এটাও ফেলবেনা, ঠিক রাখবে।"
"দেখ তুই যা বলছিস তা সত্যি আমার খুব অদ্ভুত লাগছে। কিরকম যেন একটা মনে হচ্ছে। আমাকে একটু সময় দে ভাববার জন্য। তুইও ভাব, যেটা তুই করতে চলেছিস সেটা উচিত হবে কিনা।"
"আমার আর কিছু ভাবার নেই। আমি ভেবেচিন্তেই কথাটা পেড়েছি। এবার সিদ্ধান্ত তোর। তুই তোর বন্ধুর পরিবারটা-কে বাঁচাতে চাস কিনা? তুই সময় নিতে চাইছিস, নে সময়। কিন্তু দেখিস, বেশি সময় নিস না। আমার হাতে কিন্তু সময়টাই খুব কম। আমি তোদের ঘর সংসার গুছিয়ে দিয়ে যেতে চাই।"
রবি চিন্তাভরা মুখ নিয়ে চলে গেল। বেশ কয়েকদিন রবি এলনা। তারপর একদিন অরুণের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পড়লো। মনীষা রবিকেও ডাকলো। অরুণকে নিয়ে একসাথে হাসপাতালে গেল রবি ও মনীষা। রবি মাঝে মাঝে মনীষার দিকে আড় চোখে অদ্ভুতভাবে তাকাতে লাগলো। মনীষাকে যেন সে নতুনভাবে আবিষ্কার করছিল। মনে মনে ভাবতে লাগলো যদি সত্যিই নিজের বন্ধুর বউকে বিয়ে করতে হয় তবে কেমন হবে ব্যাপারটা?
নো ডাউট মনীষা এক অপরূপ সৌন্দর্য্যের অধিকারিণী। যেকোনো পুরুষের মন ওর জন্য বিচলিত হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু রবির মনে এতদিন সেই মনোভাব বাসাই বাঁধেনি সম্পর্কের বাধ্যবাধকতায়। তবে দেরিতে হলেও পরম বন্ধুর স্ত্রীকে নিয়ে মনে মনে সুপ্ত বাসনা এবার রবির হৃদয়ে জাগতে শুরু করেছিল।
রবির নজর তাই বারবার কারণে অকারণে মনীষার দিকে ধাবিত হচ্ছিল। মনীষা নোটিস না করলেও অরুণের নজর তা এড়ায়নি। সে বুঝলো রবি তার প্রস্তাবে প্রায় রাজি করিয়ে নিয়েছে নিজেকে। কিন্তু তাও কেন অরুণের খারাপ লাগছিল মনীষার দিকে রবির অকারণ চেয়ে থাকা দেখে? আসলে সে তো মন থেকে চাইনি নিজের স্ত্রী-কে অন্যের হাতে তুলে দিতে। পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করছে। সে তার স্ত্রীকে ভালোবাসে, খুব ভালোবাসে। তাই চায় তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করে রাখতে।
বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করার পর থেকে মনীষার বাড়ির সাথে সম্পর্ক পুরোপুরিভাবে ছিন্ন। অরুণেরও একুল ওকূলে সেরকম কেউই নেই। দূর সম্পর্কের যারাও বা আছেন তারা আর যাই হোক কেউই সুজন বা শুভাকাঙ্খী নন। তাহলে তার মৃত্যুর পর মনীষা যাবে কোথায়? কে দেখে রাখবে তাকে আর ছোট্ট পরীকে? তাই তো মনে পাথর চেপে রেখেও অরুণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে মনীষাকে রবির হাতে তুলে দিতে।
বাড়ি ফিরেই অরুণ রবিকে জিজ্ঞেস করলো ওর সিদ্ধান্তের কথা। রবি মাথা নিচু করে অরুণের প্রস্তাবে মৌন সম্মতি দিল। অরুণের বুকটা হঠাৎ ছ্যাৎ করে উঠলো। মনীষা এবার অন্য কারোর হয়ে যাবে! তবু সব দুঃখ কষ্ট চেপে অরুণ রবিকে নির্দেশ দিল সে যেন এখন থেকেই মনীষার কাছাকাছি যাওয়ার এবং থাকার চেষ্টা করে। অরুণের মুখ চোখ দেখে রবি বারবার নিজের প্রিয়বন্ধু-কে জিজ্ঞেস করলো, সে সত্যিই এসব চায় কিনা?
অরুণও বারবার দাঁত চেপে প্রকাশ করলো নিজের সম্মতির কথা। অবশেষে রবি অরুণের কথা মেনে নিল। তবে সে বললো মনীষার সাথে এই ব্যাপারে কথা অরুণ-কেই বলতে হবে। অরুণও রাজি হয়ে গেল। তবে একটু সময় চেয়ে নিল। আর এই সময়ের মধ্যে অরুণ চাইলো রবি যেন মনীষাকে একটু বেশি সময় দেয়, বন্ধু হিসেবেই নাহয়।
দুই বন্ধুর মধ্যে কথা ফাইনাল হল। তারপর কয়েকদিন রবি নিয়ম করে রোজ অরুণের বাড়ি আসতে লাগলো। মনীষার ঘরোয়া কাজে তাকে সাহায্য করতে লাগলো। মনীষা ব্যাপারটাকে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ হিসেবেই দেখলো। কারণ রবি প্রথম থেকেই খুব হেল্পফুল। ওই তো অরুণ ও মনীষাকে কাছাকাছি নিয়ে এসছিল, তাদের প্রেমে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। ও না থাকলে অরুণ এবং মনীষার বিয়েটাই হত না।
যাই হোক, অবশেষে সেই দিনটা এল যেদিন অরুণ মনীষার কাছে নিজের কথাটা খুলে রাখলো....