হঠাৎ মেঘনার চরে পর্ব ৫

Hotath Meghnar Chorre 5

কেন এমন হলো? কার শুক্রাণুর দোষে মেঘনা দ্বিতীয়বারের জন্য সন্তানসম্ভবা? অজিত তো ভাবছে এটা তারই। আদতেই কি তার?

লেখক: Manali Basu

ক্যাটাগরি: পরকীয়া

সিরিজ: মেঘনার গল্প

প্রকাশের সময়:06 Feb 2026

আগের পর্ব: হঠাৎ মেঘনার চরে পর্ব ৪

বাথরুমের ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল, কিন্তু তা চাপা গলায়, নিম্নস্বরে। খুব ভোর ভোর উঠে পড়েছিল সে, তাও আবার এই কনকনে শীতের সকালে। তাড়া ছিল তার, টেনশনে সারারাত ঘুম হয়নি। শরীর বলে দিচ্ছে কোনো এক অঘটন ঘটেছে। সেটা নিশ্চিত করতেই সূর্যোদয় হতে না হতে বাথরুমে আগমন।

তার আশংকাই সত্যি! তাই সে ক্রন্দনরত। অ্যাটাচ বাথরুম হতে মৃদু অশ্রুর শব্দতরঙ্গ লাগোয়া বেডরুম অবধি পৌঁছোচ্ছিল। ফলে সহবাসী পুরুষটার ঘুম ভেঙে গেল। কম্বলের ভেতর থেকে পাশে হাত ঘুরিয়ে অনুভব করলো তার সঙ্গিনীটি বিছানায় নেই। কোথায় সে? এত ভোরে? ঠান্ডায় হাত পা বাইরে বেরোতে চাইছিল না তবু জোর করে কম্বলের ঘেরাটোপ থেকে নিজেকে মুক্ত করে সে বিছানা থেকে নামলো।

কান্নার আধো আধো আওয়াজ বাথরুম থেকে আসছে? গিয়ে দেখলো ভেতর থেকে লক করা। মেঘনা তাহলে ভেতরেই রয়েছে। কিন্তু সে কাঁদছে কেন? অজিতের মনে প্রশ্ন জাগলো। সে নক করলো। নাম ধরে ডাকলো। ভেতর থেকে কোনো উচ্চবাচ্য এল না, উল্টে কান্না থেমে নীরবতা নেমে এলো।

বউয়ের এহেন আচরণ তার মনে শঙ্কার সংকেত এলো। সে দরজায় কয়েকবার চাপড় মারলো। চোখ মুখ মুছে মেঘনা বেরিয়ে এলো, হাতে একটা স্ট্রিপ নিয়ে। সেখানে দুটি লাল সমান্তরাল সরলরেখার দাগ ছিল। অজিত সেটা হাতে নিতেই বুঝলো আসল বিষয়টা। ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটে উঠলো। এই হাসি নতুন নয়, তবে বড়ই আনন্দদায়ক। দ্বিতীয়বারের জন্য এমন এক সুখানুভূতির সুযোগ এসে পড়েছে।

হ্যা! মেঘনা প্রেগন্যান্ট। সে মা হতে চলেছে, আর অজিত? বাবা? সত্যিই? অজিতের তো তাই মনে হচ্ছিল, তাই এত ভোরেও সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েছিল, নাচতে ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু এতটাই খুশি মেঘনা কেন হতে পারছিলনা? উল্টে সে যথেষ্ট আড়ষ্টভাব দেখাচ্ছিল অজিতের সাথে নাচতে! কি হয়েছে তার? কিছু কি লুকোচ্ছে? বার বার ফোনটার দিকে চেয়ে দেখছে। ভাবছিল কখন ভোর থেকে সকাল হবে আর তখন সে একজনকে ফোন করবে, অজিতের অজ্ঞানতায়।

মেঘনা তার স্বামীকে শান্ত হতে বললো। নাহলে পাশের ঘরে তিতান উঠে যাবে, উঠে যাবে বাইরের ঘরে শুয়ে থাকা কমলা মাসিও। অজিত তাও কিচ্ছু শুনতে চাইছিল না। তার যে আজ খুশির কোনো সীমানা নেই। সে বরাবরই চেয়ে এসছে তিতানের একটা ভাই বা বোন হোক, তবেই নাকি তার পরিবার সম্পূর্ণ হবে। ওই যে বলেনা হাম দো হামারে দো। তাই তিতান হওয়ার পর থেকেই অজিত আরেকটি সন্তান নেওয়ার বাহানা ধরে।

বাদ সাধতো মেঘনাই। বলতো অজিত তো তাকে বাচ্চা কোলে দিয়ে জাহাজে করে দূরদিগন্তে সাগর পাড়ি দেবে। স্বামীকে ছাড়া একা একা তাকেই বাচ্চা মানুষ করতে হবে। সেই কারণে মেঘনা এতদিন ওয়ান চাইল্ড পলিসি নিয়েই রেখেছিল। কিন্তু আচমকা যে তার গর্ভে নতুন জীবনের আবির্ভাব হবে সেটার পূর্বাশঙ্কা সময় থাকতে সে করতে পারেনি।

কেন এমন হলো? কার শুক্রাণুর দোষে মেঘনা দ্বিতীয়বারের জন্য সন্তানসম্ভবা? অজিত তো ভাবছে এটা তারই। আদতেই কি তার? মানুষ কত কিছুই না ভাবে, কতই না স্বপ্ন বোনে, সব কি সত্যি হয়? তবে মনকে শান্ত রাখতে ও শান্ত্বনা দিতে ছলনার অবয়বে নিজের সুখ ভালোবাসাকে ঢেকে রেখে অনেকে অনেকসময় মিথ্যেটাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। এতে অজিতের কোনো দোষ নেই। সে তো রক্ত মাংসেরই মানুষ।

ঘড়িতে তখনো মেরে কেটে ছ' টা কুড়ি বাজে। সাতটা বাজতে এখনো অনেক দেরি। সাতটা না বাজলে সে তো ফোন অন করেনা। প্রাত্যহিক নিয়ম তার।

অজিত চুমু খেতে কাছে টানছিল কিন্তু মেঘনার উপর এক অদ্ভুত জড়তা বিরাজ করছিল। সে নিজেরই স্বামীকে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল বাহানা দিয়ে তার শরীরটা ভালো নেই বলে। অজিত আর বেশি জোর করলো না। ঘুমটা যখন একবার ভেঙেই গ্যাছে তখন সেও বাথরুমে গেল ফ্রেশ হতে। সেই ফাঁকে মেঘনা ফোনটা হাতে নিয়ে একটা ম্যাসেজ টাইপ করলো, এবং একটা বিশেষ নাম্বারে সেটা সেন্ড করে দিল। জানতো ডেলিভার হবেনা, যেখানে পাঠিয়েছে সেই নাম্বারটা অফ আছে। তবু সে-ই ব্যক্তি ফোনটা অন করলে ম্যাসেজটা তো পাবে। আজকে অজিত খুশিতে পাগল হয়ে সারাটা বাড়ি মাথায় করে রাখবে। পরে এই খবরটা আসল জনকে দিতে সময় পাবে কিনা তা নিয়ে নিশ্চিত নয় মেঘনা।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে অজিত বললো, আজ সে, মেঘনা, তিতান আর কমলা মাসিকে নিয়ে নিকো পার্ক যাবে। এই আনন্দের খবরটাকে সেলিব্রেট করতে। মেঘনা মুখে নকল হাসি দিয়ে সম্মতি প্রদান করলো। সে আর পারছিলনা এই মিথ্যেভরা চাউনি নিয়ে নিজের স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। অজিতকে এড়াতে তাই রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। কফি বানাতে।

অজিত সকালে ব্ল্যাক কফি পছন্দ করে, আর মেঘনা চা। আরেকজনেরও চা খুব ফেভারিট যার ফোন অন হবে সাতটায়। ম্যাসেজ পেয়ে বাই চান্স যদি কল করে সেই কারণে ফোনটাকেও সাথে নিয়ে গেল রান্নাঘরে। হাতছাড়া করলো না। যদিও অজিত কখনো তার ডিজিটাল প্রাইভেসী নষ্ট করেনা। তবুও ধরা পড়ার একটা ভয় সর্বদা বিদ্যমান, গত ছ' মাস ধরে তা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে মেঘনা। না জানি কবে শেষ হবে এই দোলাচল। কফি বানাতে বারবার তার চোখ যাচ্ছিল ফোনের স্ক্রিনে। মনে মনে ভাবছিল কখন সাতটা বাজবে, সেই ফোনটা অন হবে আর তারপর তার পাঠানো ম্যাসেজটা সীন হবে।

কফি বানিয়ে ট্রে তে করে সাজিয়ে বেডরুমে নিয়ে গেল। অজিত বসে সময় কাটানোর জন্য টেবিল থেকে অর্ধ পঠিত আগাথা ক্রিস্টির নভেল "দা সেভেন ডায়াল মিস্ট্রি" বইটা হাতে নিয়ে পড়ছিল। মেঘনা ঘরে ফিরে আসায় সেটা নামিয়ে মেঘনা ও কফিতে মনোযোগ দিল। দুটোই যে তার খুব প্রিয়। ঘরে বসে একসাথে কফি খেতে খেতে দু'জনা কিছু কথা বলে সময় অতিবাহিত করতে লাগলো।

এভাবে ঘড়ির ঘন্টার কাঁটা সাতটায় এসে দাঁড়ালো। অজিতের সাথে খেজুরে কথা বললেও মেঘনার চোখ ছিল সেদিকে। সাতটা বাজতেই সে ফের বাহানা দিয়ে অজিতকে ছেড়ে রান্নাঘরে ফিরে এলো। ব্রেকফাস্ট বানাতে বানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল একটা কলের। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছাড়িয়ে আটটার দিকে ধাবিত হলো, কোনো কল এলনা তার ফোনে। মেঘনা তখন ফোনটা সাইলেন্ট করে ঘরের কাজে মন দিল।

অজিতের আনন্দধারা যেন বাঁধ পাচ্ছিল না। মুখের অভিব্যক্তিতে উপচে পড়ছিল। ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে এই সুখবর সে বয়োজ্যেষ্ঠা কমলা মাসিকে জানালো। তিতানকেও বললো তার একটা ভাই বা বোন আসতে চলেছে। সবাই খুব খুশি ছিল। মেঘনাও তাদের দেখে খুশি হওয়ার ভান করলো। ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল সকাল অজিত বাজার করতে বেরোলো। আজ সে বড়ই সুখী। সুখের তাড়নায় হয়তো গোটা বাজারই মাথায় করে নেবে।

অজিত বাড়ি থেকে বেরোনোর পর কমলা যথারীতি তিতানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আর মেঘনা নিজের ফোনটা নিয়ে ঘরে গিয়ে দরজা ভেতর থেকে লক করে দিল। ফোন লাগলো সেই নম্বরে যেই নম্বরে সে ভোরে ম্যাসেজ করেছিল।

বেশ কয়েকবার রিং বাজার পর অবশেষে ওপার থেকে ফোনটা রিসিভ করা হল, "হ্যালো...."

"ম্যাসেজটা পড়েছো?"

"হুম!"

"কিছু বলার নেই তোমার?"

"তোমার বর জানে?"

"ওকেই প্রথমে জানিয়েছি.."

"তাহলে আমাকে জানাতে গেলে কেন?"

"তুমি জানোনা কেন?"

"ফোনটা রাখো, পরে এই নিয়ে কথা হবে। আমার এখন অনেক কাজ", বলেই ওপার থেকে ফোনটা রেখে দিল। মেঘনা তারপরও কয়েকবার হ্যালো হ্যালো করলো। বিশ্বাসই হচ্ছিলনা, যার জন্য নিজের সবটা বাজি রেখেছে তার থেকে এরূপ শীতল অভ্যর্থনা সে পাবে। নিজেকে কিরকম খেলো লাগছিল!

অজিত বাজার থেকে ফিরে এল এলাহী বাজার করে। মেঘনা জানতে চাইলো, তারা যদি আজ নিকো পার্কেই যায় তাহলে এত বাজার করে আনা কেন? কিছুটা বেখেয়ালি হয়ে পড়া অজিত আস্বস্ত করলো বাড়িতে ফ্রিজ আছে বলে, আজকের কেনা বেশিরভাগ শাক-সবজির ঠাঁই হবে সেখানেই। না হয় এই থেকে যৎসামান্য কিছু রান্না করে তা মুখে দিয়ে দুপুরে রওনা দেওয়া যাবে নিকো পার্ক। শুনে মেঘনা তাতে রাজি হল। অজিত এফোর্ট দিচ্ছে সেটা ভেবেই ভালো লাগলো তার।

দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে চারজন মিলে রওনা হলো নিকো পার্কে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। তিতান প্রায় সব রাইডেই চড়তে চাইছিল। তবে ওর বয়স ও শরীরের ধকল নেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী কিছু কিছু রাইডে চড়ছিল, আর বাকি কিছু বাদ ছাঁট দিচ্ছিল ওর বাবা মা। রোপওয়ে চড়তে অজিত ও তিতান দুজনেই ভালোবাসে কিন্তু মেঘনার কথা চিন্তা করে সেইমুখো হলনা।

সারাটা বিকেল সন্ধ্যে হৈ হৈ করে কাটালো তারা। তবে তার মধ্যেও মেঘনা বারবার ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে নিজের ফোন চেক করেছে, কিন্তু একবারও সেই কাঙ্ক্ষিত কল আসার দরুন বেজে ওঠেনি তার রিংটোন। মেঘনা তবুও বেশ কয়েকবার ম্যাসেজ দিয়েছিল, কোনো উত্তর আসেনি।

ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরলো তারা। অজিত রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার প্যাক করে নিয়ে এসছিল যাতে বাড়ি গিয়ে আবার হাত পুড়িয়ে রান্না করতে না হয় মেঘনাকে।

তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে যে যার রুমে চলে গেল। কমলা আগে তিতানকে ঘুম পাড়ালো তারপর নিজের ঘরে গেল। বিছানায় অজিত মেঘনাকে কাছে চাইলো, কিন্তু পেলনা। মেঘনা বললো এসময়ে এইসব এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়। কথায় যুক্তি আছে ভেবে অজিতও আর জোরাজুরি করলো না, শুয়ে পড়লো। সারাদিনের এত ফুর্তি এত মজা তাকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। তাই বিছানায় গা এলাতেই ঘুমপাখি নামলো এসে চোখে।

মেঘনা ঘুমোনোর ভান করে জেগে রইলো। তক্কে তক্কে রইলো কখন সবাই গভীর নিদ্রায় নিমজ্জিত হবে, পাশ থেকে হালকা নাক ডাকার আওয়াজ আসবে, এবং তখন সে উঠে বসবে। ফোন নিয়ে ব্যালকনিতে যাবে। কথা আছে তার, বিশেষ একজনের সাথে।