ভোরটা খুব ধীরে এল।
যেন রাতের অন্ধকারও জানত, এই বাড়িতে কিছু বদলে গেছে। তাই সে তাড়াহুড়ো করে সরে যেতে চাইছিল না।
অয়ন প্রায় সারারাত ঘুমোয়নি।
টেবিলের ওপর খাতা খোলা। সেই খাতায় গত রাতের শব্দগুলো এখনও শুকোয়নি যেন—
“আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, সঙ্গীতা।”
শব্দটা মুখে বলার পরও অয়ন বিশ্বাস করতে পারছিল না, সে সত্যিই বলে ফেলেছে। এতদিন যে সত্যিকে সে যত্ন, মায়া, দায়িত্ব, রাগ, সুরক্ষা—নানা নামে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই সত্যি গত রাতে নিজের আসল নাম নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভালোবাসা।
শব্দটা সুন্দর। কিন্তু ভয়ংকরও।
কারণ এই শব্দের সঙ্গে অধিকার আসে, দাবি আসে, প্রত্যাশা আসে—অথচ অয়ন জানে, সে সঙ্গীতার কাছে কিছু দাবি করতে পারে না।
সে জানে সঙ্গীতা কারও স্ত্রী। সে জানে এই বাড়িতে সূর্য আছে। সে জানে সমাজ আছে। সে জানে বয়সের ব্যবধান আছে। সে জানে ভুলের সম্ভাবনা আছে। সে জানে, একটা ভুল পা সঙ্গীতার জীবনে আরও আঘাত আনতে পারে।
তবু সে এটাও জানে—মিথ্যে বললে সে নিজেকে আর দেখতে পারত না।
ঘরের বাইরে সকাল হচ্ছে। রান্নাঘর থেকে এখনও কোনো শব্দ আসেনি। সাধারণত এই সময় সঙ্গীতার পায়ের শব্দ শোনা যায়। আজ নেই।
অয়ন দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
গত রাতে সে স্পর্শ করেনি। এগোয়নি। কোনো দাবি করেনি।
তবু কি সে বেশি দূর চলে গেছে?
এই প্রশ্নটাই তাকে ভোর পর্যন্ত জাগিয়ে রেখেছে।
সঙ্গীতা সেদিন খুব দেরিতে উঠেছিল।
ঘুম হয়নি তারও। চোখ বন্ধ করেছিল, কিন্তু ভেতরে একটার পর একটা বাক্য ঘুরছিল।
“আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, সঙ্গীতা।”
তারপর নিজের কণ্ঠ—
“এই কথা শুনতে আমার ভয় লাগছিল… কিন্তু না শুনলেও মরতাম।”
সে কি সত্যিই বলেছে?
বলেছে।
নিজের মুখে।
একজন বিবাহিত নারী। স্বামীর ঘরে। স্বামীর আত্মীয়ের সামনে। একজন উনিশ বছরের ছেলের সামনে।
না—ছেলে নয়।
এই শব্দেই সে নিজেকে ধমকাল।
অয়নকে “ছেলে” ভাবলে নিরাপদ লাগে। বয়সের ব্যবধান, সম্পর্কের নাম, বৌদি-দেওর—সব যেন তাকে বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু অয়নকে যখন সে দেখে, তখন এই নিরাপদ শব্দগুলো ভেঙে পড়ে।
সে শুধু ছোট নয়। সে শুধু ছাত্র নয়। সে শুধু সূর্যের ভাইয়ের মতো নয়।
সে এমন একজন মানুষ, যার সামনে সঙ্গীতা অভিনয় করতে পারে না।
এটাই ভয়।
সঙ্গীতা বিছানা থেকে উঠে বসে ডায়েরি খুলল।
গত রাতের লাইনগুলো তাকিয়ে আছে—
“আমি কি তাকে ভালোবাসি?”
তার নিচে সে লিখেছিল—
“আমি আজ উত্তর লিখলাম না। কিন্তু আমার হাত কাঁপছে—এটাই উত্তর হতে পারে।”
আজ সেই লাইনগুলো দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।
না।
এভাবে চলতে পারে না।
গত রাতের আবেগ, বৃষ্টি, অন্ধকার, ভয়, confession—সব একদিকে। কিন্তু সকালে পৃথিবী আবার বাস্তব হয়ে যায়।
সে কারও স্ত্রী।
এই সত্যিটা কোনো ডায়েরির পাতায় বদলায় না।
সে খুব ধীরে ডায়েরির নতুন পাতায় লিখল—
“আজ থেকে নিজেকে সামলাতে হবে।”
তারপর কলম থামল।
অনেকক্ষণ পরে আরেকটা লাইন—
“কারণ আমি যদি নিজেকে না সামলাই, সে নিজেকে সামলাতে গিয়ে আঘাত পাবে।”
এই লাইন লিখেই সে বুঝল—সে denial করছে, কিন্তু অয়নকে আঘাত না দেওয়ার ভেতরেও অয়নের প্রতি টান আছে।
এটাই তো বিপদ।
সে ডায়েরি বন্ধ করল।
আজ সে চা নিয়ে অয়নের ঘরে যাবে না।
অন্তত এখন না।
সকালটা তাই অস্বাভাবিকভাবে নীরব ছিল।
অয়ন অপেক্ষা করল।
চায়ের কাপ এল না।
দরজার বাইরে পায়ের শব্দ এল না।
কেউ বলল না—“ওষুধ খেয়েছ?” কেউ বলল না—“চা ঠান্ডা হবে।” কেউ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল না।
অয়ন বুঝল।
Confession-এর পর প্রথম দূরত্ব শুরু হয়েছে।
এ দূরত্ব আগের দূরত্বের মতো নয়। আগের দূরত্ব ছিল ভয়, দায়িত্ব, PG, সূর্য, সমাজের অজুহাতে। আজকের দূরত্ব সরাসরি সেই শব্দের পর—
ভালোবাসা।
অয়ন উঠে দরজা খুলল।
করিডোর ফাঁকা। রান্নাঘর থেকে শব্দ আসছে, কিন্তু সঙ্গীতা তার দিকে তাকাল না। সে গ্যাসে দুধ বসিয়েছে, চা ফুটছে। তার চুল বাঁধা, মুখ ক্লান্ত, চোখে কড়া স্থিরতা।
অয়ন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
“চা হবে?”
সঙ্গীতা কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হবে।”
“আমারটা?”
“টেবিলে রেখে দেব।”
অয়ন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
“ভেতরে আসবে না?”
সঙ্গীতা এবার তাকাল।
দৃষ্টিটা শান্ত। কিন্তু সেই শান্তির নিচে লুকোনো ঝড় অয়ন বুঝল।
“আজ না।”
দুটো শব্দ।
কিন্তু যেন দেয়াল।
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
সে ফিরে গেল।
এই “ঠিক আছে” বলতে তার বুকের ভেতর ব্যথা হলো। কিন্তু সে নিজেকে মনে করাল—গত রাতের পর সঙ্গীতাকে জায়গা দিতে হবে। সে যদি ভয় পায়, সে পিছু হটবে। সেটাই তার প্রতিশ্রুতি, যদিও সে মুখে এখনও বলেনি।
সূর্য সেদিন বাড়িতেই ছিল সকালটা।
অফিসে later যাবে। ল্যাপটপ খুলে বসেছে। মাঝে মাঝে ফোন, মাঝে মাঝে বিরক্তি। তার কাছে সবকিছু আগের মতোই।
খাওয়ার টেবিলে তিনজন বসেছিল।
সঙ্গীতা ভাত দিল। ডাল দিল। অয়নের দিকে তাকাল না। অয়নও জোর করে কিছু বলল না।
সূর্য বলল,
“PG-এর ব্যাপারটা আবার ঝুলে গেল দেখছি।”
অয়ন শান্ত গলায় বলল,
“Admission final হোক। তারপর।”
“তোর বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“ও কী বলল?”
“পড়তে বলল।”
সূর্য হালকা হাসল।
“ওটাই তো মূল কথা। এসব বাড়ির আরাম-আদরে থাকলে মন নরম হয়ে যায়। ছাত্রদের একটু বাইরে থাকা দরকার।”
সঙ্গীতার হাত থেমে গেল।
অয়ন এবার খুব ধীরে বলল,
“মন নরম হওয়া সবসময় খারাপ নয়, দাদা।”
সূর্য তাকাল।
“মানে?”
অয়ন চোখ নামিয়ে বলল,
“কিছু না। পড়াশোনার ক্ষতি করব না।”
সূর্য মাথা নেড়ে আবার খেতে লাগল।
সঙ্গীতা বুঝল, অয়ন নিজেকে সামলাচ্ছে। সে সূর্যের কথার উত্তরে আর এগোয়নি। তার জন্য? নিজের জন্য? নাকি দুজনের জন্য?
সে জানে না।
কিন্তু অয়নের restraint তাকে আরও অস্থির করে তুলল।
কারণ সে যদি কোনো দাবি করত, সঙ্গীতা সহজে রাগ করতে পারত। সে যদি ভুল করত, সঙ্গীতা তাকে দূরে ঠেলে দিতে পারত। সে যদি শুধু আগুন হতো, সে জল ঢেলে দিত।
কিন্তু সে আগুনের পাশে জলও রাখে।
এই কথাটা সে গতকাল নিজেই বলেছে।
আজ তার নিজের কথাই তাকে তাড়া করছে।
দুপুরে সূর্য বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘর যেন নিঃশ্বাস নিল। কিন্তু আজ সেই নিঃশ্বাসে স্বস্তি নেই। বরং অস্বস্তি।
কারণ এখন বাড়িতে তারা দুজন।
একা।
এই একাকিত্ব আগে ছিল আশ্রয়। আজ বিপদ।
সঙ্গীতা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে বাসন ধুচ্ছিল। অয়ন নিজের ঘরে পড়ার চেষ্টা করছিল। দুজনেই জানে, অন্যজন ঘরে আছে। দুজনেই জানে, কিছু বলা দরকার। দুজনেই ভয় পাচ্ছে।
শেষে সঙ্গীতা নিজেই অয়নের দরজায় এল।
দরজার বাইরে দাঁড়াল।
“অয়ন।”
অয়ন বই থেকে মাথা তুলল।
“হ্যাঁ?”
“কথা আছে।”
অয়নের বুক কেঁপে উঠল।
সে উঠে দাঁড়াল।
“ভেতরে আসবে?”
সঙ্গীতা মাথা নাড়ল।
“না। তুমি বাইরে এসো।”
অয়ন দরজার কাছে এল। দুজন করিডোরে দাঁড়াল। আলো ম্লান। দুপুরের শহর ঘরের বাইরে, কিন্তু এই করিডোরে সময় যেন আলাদা।
সঙ্গীতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“গত রাতের কথা…”
অয়ন শান্ত গলায় বলল,
“আমি জানি।”
“না। তুমি জানো না।”
“তাহলে বলো।”
সঙ্গীতা গলা শক্ত করল।
“ওটা ভুল হয়েছে।”
শব্দটা অয়নকে আঘাত করল।
তবু সে মুখে কিছু দেখাল না।
“কোনটা?”
“সব।”
“সব?”
“তোমার বলা। আমার শোনা। আমার উত্তর। সেই কথাগুলো… সব।”
অয়নের বুকের ভেতর ভার জমল।
সে ধীরে বলল,
“তুমি মনে করো আমি বলা উচিত ছিল না?”
সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে বলল,
“উচিত-অনুচিতের হিসেব করলে এই কথার কোনো জায়গা নেই।”
“আর সত্যির হিসেব?”
সঙ্গীতা চোখ তুলল।
এই প্রশ্নটাই তার ভয়।
“সত্যি সবসময় বলা যায় না।”
“জানি।”
“সব সত্যি মেনে নেওয়াও যায় না।”
“জানি।”
“তাহলে?”
অয়ন চুপ করে রইল।
সঙ্গীতা যেন নিজেকে বোঝাচ্ছিল, অয়নকে নয়।
“আমি বিবাহিত, অয়ন। এই কথাটা আমরা ভুলতে পারি না।”
“আমি ভুলিনি।”
“আমি তোমার থেকে বয়সে অনেক বড়।”
“জানি।”
“তুমি এখনও পড়াশোনা করছ। তোমার সামনে জীবন আছে।”
“জানি।”
“আমি তোমার দাদার স্ত্রী।”
এইবার অয়ন চোখ বন্ধ করল।
এই সম্পর্কের নামই সবচেয়ে কঠিন দেয়াল।
সঙ্গীতা বলল,
“এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কোনো নাম নেই। কোনো সঠিকতা নেই।”
অয়ন খুব আস্তে বলল,
“তবু অনুভূতি আছে।”
সঙ্গীতা কেঁপে উঠল।
“অনুভূতি থাকলেই সব করা যায়?”
“না।”
“তাহলে?”
“আমি তো কিছু করতে বলিনি।”
“কিন্তু তুমি বলেছ।”
“হ্যাঁ।”
“সেটাই তো সব বদলে দিয়েছে।”
অয়ন মাথা নিচু করল।
“ক্ষমা চাইব?”
সঙ্গীতা অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি কি সত্যি ক্ষমা চাইতে পারবে?”
“যদি আমার বলা তোমাকে আঘাত করে।”
“আঘাত করেছে।”
অয়ন চুপ।
সঙ্গীতা আরও নিচু গলায় বলল,
“কিন্তু শুধু আঘাত নয়।”
অয়ন তাকাল।
সঙ্গীতার চোখে জল জমছে, কিন্তু সে সামলাচ্ছে।
“ওই কথাটা শুনে আমি ভয় পেয়েছি। কারণ আমি জানতাম, এটা একদিন শুনব। আবার আমি চাইছিলাম না তুমি বলো। আবার…”
সে থেমে গেল।
অয়ন বাকিটা জানে।
“না শুনলেও মরতাম,” সে খুব আস্তে বলল।
সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল।
“ওটা বলো না।”
“কেন?”
“কারণ ওটাই আমাকে দুর্বল করে দেয়।”
অয়ন ধীরে বলল,
“ওটা তোমার দুর্বলতা না। ওটা তোমার সত্যি।”
“এই সত্যি পাপ।”
“তোমার অনুভূতি পাপ নয়।”
“সমাজ তা বলবে না।”
“সমাজ অনেক কিছুই ভুল বলে।”
“তুমি সমাজকে হারাতে পারবে?”
অয়ন উত্তর দিল না।
সঙ্গীতা মৃদু তিক্ত হাসল।
“পারবে না। আমিও পারব না।”
“আজ না।”
সঙ্গীতা তাকাল।
“মানে?”
অয়ন শান্ত গলায় বলল,
“আজ আমরা কেউ কিছু পারব না। আমি ছোট, অসম্পূর্ণ, নিজের পায়ে দাঁড়াইনি। তুমি এই সংসারের মধ্যে আটকে। সত্যি আছে, কিন্তু শক্তি নেই। তাই আমি কোনো লড়াইয়ের কথা বলছি না।”
সঙ্গীতা চুপ।
অয়ন বলল,
“কিন্তু সত্যিকে পাপ বললে আমি মানতে পারি না।”
“তাহলে কী বলবে?”
অয়ন একটু ভেবে বলল,
“অসম্ভব।”
সঙ্গীতা তাকাল।
“হ্যাঁ,” অয়ন বলল, “এটা এখন অসম্ভব। ভয়ংকরও। বিপজ্জনকও। কিন্তু পাপ? আমি জানি না। কারণ আমি তোমাকে ভাঙতে চাই না। তোমাকে লুকিয়ে নিতে চাই না। তোমার বিশ্বাস ভাঙতে চাই না। তোমার শরীর না, তোমার বেঁচে ওঠাটাকে ভালোবাসি।”
সঙ্গীতার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
এই কথাগুলোই বিপদ।
এই কথাগুলোই তাকে নিজের denial থেকে বের করে আনে।
সে বলল,
“তুমি আবার সেইভাবে কথা বলছ।”
“কীভাবে?”
“যেভাবে শুনলে আমি রাগ করতে পারি না।”
অয়ন চোখ নামাল।
“তাহলে আমি চুপ থাকি।”
“চুপ থাকলেও কি তোমার চোখ চুপ থাকে?”
অয়ন উত্তর দিল না।
এই নীরবতায় পর্ব ১৭-এর বৃষ্টি ফিরে এল।
“আমাকে এভাবে দেখো না।”
দুজনেই যেন একইসঙ্গে সেটা মনে করল।
সঙ্গীতা একটু পেছনে সরে দাঁড়াল।
“আমাদের দূরত্ব দরকার।”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
“তুমি এত সহজে ঠিক আছে বলো কেন?”
“কারণ তোমাকে কঠিন কথা বলতে হচ্ছে।”
“তুমি কি বুঝতে পারছ না? আমি বলছি—এটা ভুল।”
“তুমি বলছ।”
“আর তুমি মানছ না?”
“আমি মানছি যে তুমি ভয় পাচ্ছ। মানছি, এটা বিপজ্জনক। মানছি, আমাদের সীমা দরকার। কিন্তু তুমি যদি বলো, গত রাতের সবটাই মিথ্যে—সেটা আমি মানব না।”
সঙ্গীতা গলা নিচু করল।
“আমি মিথ্যে বলিনি।”
“তাহলে?”
“আমি সত্যি বলেছি। কিন্তু সেই সত্যি নিয়ে এগোনো যাবে না।”
অয়ন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“তাহলে আমরা এগোব না।”
সঙ্গীতা তাকাল।
“মানে?”
অয়ন এবার খুব স্পষ্ট গলায় বলল,
“তুমি না চাইলে আমি আর এক পা এগোব না।”
সঙ্গীতা স্থির হয়ে গেল।
এই কথাটা সে আশা করেছিল, আবার করেনি।
অয়ন বলল,
“তোমার ভয় যেখানে শুরু, আমি তার আগেই থামব। তুমি যদি বলো কথা কম, আমি কথা কম বলব। তুমি যদি বলো ঘরে আসব না, আসব না। তুমি যদি বলো দূরত্ব চাই, দূরত্ব রাখব। তুমি যদি বলো এই শব্দ আর বলব না, আমি মুখে বলব না।”
সঙ্গীতার চোখ ভিজে উঠল।
“আর তোমার?”
“আমার কী?”
“তোমার কষ্ট হবে না?”
অয়ন হালকা হাসল।
“হবে।”
“তাহলে?”
“তোমার ভয়ের চেয়ে আমার কষ্ট বড় নয়।”
সঙ্গীতা মুখ ফিরিয়ে নিল।
এই উত্তর মানুষকে ভেঙে দেয়।
কারণ এতে কোনো অভিযোগ নেই। কোনো দাবি নেই। শুধু অদ্ভুত এক মর্যাদা।
অয়ন বলল,
“কিন্তু একটা কথা আমিও বলব।”
“কি?”
“আমি মিথ্যে বলব না। তোমার সামনে না, নিজের সামনে না। আমি তোমাকে ভালোবাসি—এই সত্যিটা মুছব না। কিন্তু সেই সত্যি দিয়ে তোমার ওপর চাপও দেব না।”
সঙ্গীতা কাঁপা গলায় বলল,
“এটা কীভাবে সম্ভব?”
অয়ন বলল,
“জানি না। শিখব।”
“যদি না পারো?”
“তাহলে নিজেকে সরিয়ে নেব।”
সঙ্গীতা দ্রুত তাকাল।
“সরিয়ে নেবে মানে?”
“যদি কখনো মনে হয়, আমার থাকা তোমাকে আঘাত করছে, তোমার ভয় বাড়াচ্ছে, তোমার জীবনে বিপদ আনছে—আমি দূরে যাব। কিন্তু পালিয়ে নয়। তোমাকে দোষ দিয়ে নয়। নিজের দায়িত্ব নিয়ে।”
সঙ্গীতা যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
সে তাকে দূরে যেতে বলছিল, কিন্তু যখন অয়ন নিজে দূরে যাওয়ার সম্ভাবনা বলল, তার বুকের ভেতর খালি হয়ে গেল।
এই খালিটাই তাকে ভয় দেখাল।
সে বলল,
“এত সহজে চলে যেতে পারবে?”
অয়ন চোখে চোখ রেখে বলল,
“না।”
“তবু বলছ?”
“কারণ ভালোবাসা যদি শুধু নিজের কাছে রাখার নাম হয়, তাহলে সেটা তোমার জন্য নিরাপদ না।”
সঙ্গীতা আর কিছু বলতে পারল না।
তার denial যেন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু denial-এর নিচের মাটি ভিজে গেছে।
সে বলল,
“আজ থেকে আমরা সাবধান থাকব।”
“হ্যাঁ।”
“বারান্দায় রাত করে দাঁড়ানো কমাব।”
“হ্যাঁ।”
“অকারণে ঘরে আসা-যাওয়া কমাব।”
“হ্যাঁ।”
“ডায়েরি নিয়ে…”
সে থেমে গেল।
অয়ন বলল,
“ওটা তোমার। আমি শুধু তখনই শুনব, যখন তুমি চাইবে।”
সঙ্গীতা মাথা নাড়ল।
“আর…”
সে বলতে পারল না—“আর আমাকে এভাবে দেখো না।”
কারণ সে জানে, সে নিজেই সেই দৃষ্টির দিকে হাঁটে।
অয়ন বুঝল।
“আমি চেষ্টা করব,” সে বলল।
“কী?”
“তোমাকে এমনভাবে না দেখতে, যাতে তুমি ভয় পাও।”
সঙ্গীতার গলা কেঁপে উঠল।
“আর যদি আমি নিজেই চাই তুমি দেখো?”
শব্দটা বেরিয়ে গেল।
দুজনেই স্থির।
সঙ্গীতা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল।
“আমি… আমি বলতে চাইনি।”
অয়ন গভীরভাবে শ্বাস নিল।
এই মুহূর্তে সে এগোতে পারত।
শব্দে। চোখে। এক পা সামনে গিয়ে।
কিন্তু সে দাঁড়িয়ে রইল।
“তুমি ক্লান্ত,” সে বলল। “আজ আর কথা না বলাই ভালো।”
সঙ্গীতা তাকাল।
তার চোখে বিস্ময়।
সে কি এটাই চেয়েছিল? না কি সে চাইছিল অয়ন থামুক না?
সে নিজেই জানে না।
অয়ন বলল,
“তুমি বিশ্রাম নাও।”
“তুমি?”
“আমি পড়ব।”
“পারবে?”
“চেষ্টা করব।”
“আমার জন্য?”
অয়ন একটু থামল।
“আমাদের দুজনের ভয় যেন আমাকে দুর্বল না করে—তার জন্য।”
সঙ্গীতা মাথা নিচু করল।
“তুমি খুব কঠিন মানুষ হয়ে যাচ্ছ।”
অয়ন মৃদু হাসল।
“না। খুব ভয় পেয়েছি। তাই সামলাচ্ছি।”
এইবার সঙ্গীতার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
সে দ্রুত মুছে ফেলল।
“যেও।”
অয়ন মাথা নেড়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল।
দরজা বন্ধ করল না।
আধখোলা রাখল।
সঙ্গীতা করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল।
দরজা আধখোলা।
দূরত্ব আছে।
তবু পথ পুরো বন্ধ নয়।
সেদিন বিকেলটা অদ্ভুতভাবে কেটে গেল।
অয়ন সত্যিই পড়তে বসেছিল। কিন্তু প্রতিটি অক্ষরের পাশে সঙ্গীতার মুখ এসে বসছিল। “ভুল”, “পাপ”, “অসম্ভব”—এই শব্দগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
তারপর নিজের কথা—
“তুমি না চাইলে আমি আর এক পা এগোব না।”
সে জানে, কথা দেওয়া সহজ। পালন করা কঠিন।
কিন্তু আজ সে অনুভব করল, ভালোবাসা শুধু বলার সাহস নয়; থামার ক্ষমতাও।
সঙ্গীতা নিজের ঘরে ডায়েরি খুলল।
আজ লিখতে বসে হাত কাঁপছিল। কারণ আজ সে denial লিখবে, নাকি স্বীকারোক্তির ভয়?
সে লিখল—
“আজ আমি তাকে বললাম—এটা ভুল, পাপ, অসম্ভব। সে বলল—অসম্ভব হতে পারে, পাপ নয়।”
কলম থামল।
তারপর লিখল—
“আমি দূরত্ব চাই। সে বলল—আমি এক পা এগোব না, যদি তুমি না চাও। এই কথাতেই কেন আমার কান্না এল?”
সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর আরেকটা লাইন—
“যে মানুষ জোর করে না, তাকে দূরে রাখা সবচেয়ে কঠিন।”
সে লাইনটা দেখে ভয় পেল।
তবু কাটল না।
সন্ধ্যায় সূর্য ফিরতে দেরি হবে বলে ফোন করল।
সঙ্গীতা স্বাভাবিক গলায় কথা বলল। ফোন রেখে রান্নাঘরে গেল।
চা বসাল।
দুজনের জন্য করবে?
না।
আজ নিয়ম বদলেছে।
দূরত্ব।
সাবধানতা।
সে শুধু নিজের জন্য চা করল।
তারপর অয়নের দরজার সামনে এসে থামল।
হাতে কোনো কাপ নেই।
তবু সে দাঁড়াল।
অয়ন পড়ছিল। দরজা আধখোলা। সে পায়ের শব্দ শুনে তাকাল।
সঙ্গীতা বলল,
“চা খাবে?”
অয়ন একটু অবাক।
“তুমি বানিয়েছ?”
“নিজের জন্য।”
“তাহলে থাক।”
সঙ্গীতা বলল,
“আমি আবার করতে পারি।”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“আজ না।”
সঙ্গীতার বুক কেঁপে উঠল।
“কেন?”
অয়ন বই বন্ধ করল।
“কারণ তুমি দূরত্ব চেয়েছ। আর আমি তোমাকে দেখাতে চাই, তোমার কথা আমি শুনেছি।”
সঙ্গীতা চুপ করে গেল।
এই ‘শোনা’ তাকে অদ্ভুতভাবে ব্যথা দিল।
সে নিজেই দূরত্ব চেয়েছিল। অথচ অয়ন দূরত্ব রাখছে দেখে মনে হলো, কেউ তার হাত থেকে উষ্ণ কাপটা সরিয়ে নিয়েছে।
“ঠিক আছে,” সে বলল।
অয়ন নরম গলায় বলল,
“রাগ করলে?”
“না।”
“আঘাত পেল?”
সঙ্গীতা উত্তর দিল না।
অয়ন ধীরে বলল,
“এই জন্যই কঠিন।”
সঙ্গীতা তাকাল।
“কী?”
“তুমি দূরত্ব চাইলে আমি দূরত্ব রাখি। তারপর সেই দূরত্বই তোমাকে আঘাত করে।”
সঙ্গীতা কাঁপা গলায় বলল,
“আমাকে বোঝাতে হবে না। আমি জানি আমি অন্যায় করছি।”
“তুমি নিজেকে এত শাস্তি দিও না।”
“কেউ না দিলে নিজেকেই দিতে হয়।”
“না।”
“অয়ন—”
“না,” অয়ন এবার একটু দৃঢ় হলো। “তুমি যতই বলো এটা পাপ, ভুল, অসম্ভব—আমি তোমাকে নিজেকে শাস্তি দিতে দেব না। দূরত্ব রাখব, কিন্তু তোমাকে ভাঙতে দেব না।”
সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে ফেলল।
“তুমি আবার এক পা এগোচ্ছ।”
অয়ন থেমে গেল।
তারপর মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক বলেছ। দুঃখিত।”
সে চুপ করে গেল।
এই চুপ করাই সঙ্গীতাকে আরও ব্যথা দিল।
কারণ সে বুঝল—অয়ন সত্যিই নিজেকে থামাচ্ছে।
সঙ্গীতা ধীরে বলল,
“চা খাবে না?”
অয়ন হাসল না।
“আজ না।”
সঙ্গীতা মাথা নেড়ে চলে গেল।
রান্নাঘরে গিয়ে নিজের কাপের চা হাতে নিয়ে বসে রইল।
চা ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে খেল না।
রাতে খাবার টেবিলে সূর্য ছিল না। ফোনে বলেছে, বাইরে খেয়ে নেবে। বাড়ি ফিরতে দেরি হবে।
সঙ্গীতা অয়নের জন্য খাবার রেখে দিতে গেল। তারপর থেমে গেল।
দূরত্ব।
সে দরজার বাইরে থেকে বলল,
“খাবার রাখা আছে। খেয়ে নিও।”
অয়ন বলল,
“তুমি খেয়েছ?”
সঙ্গীতা চুপ।
অয়ন দরজার কাছে এল না। নিজের জায়গা থেকে বলল,
“সঙ্গীতা, routine ভেঙো না।”
এই “সঙ্গীতা” নামটা শুনে সে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল।
আজ নামের ভেতর আগুনের চেয়ে বেশি মমতা।
সে বলল,
“খাব।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“আমি দেখে নেব না।”
“দরকার নেই।”
“বিশ্বাস করব?”
সঙ্গীতা খুব আস্তে বলল,
“করো।”
অয়ন বলল,
“করলাম।”
সঙ্গীতার বুকের ভেতর কিছু নরম হলো।
দূরত্বের মধ্যেও বিশ্বাস রাখা যায়।
হয়তো এটাই আজকের পাঠ।
রাত অনেক পরে সূর্য ফিরল।
তারপর খাওয়া-দাওয়া, কিছু সাধারণ কথা, ক্লান্তি, ফোন, ঘুম। সব আগের মতো। কিন্তু অয়ন আর সঙ্গীতার মধ্যে আজকের কথাগুলো নীরবে রয়ে গেল।
রাত গভীর হলে সঙ্গীতা বারান্দায় যায়নি।
অয়নও না।
দুজনেই নিজের ঘরে।
দুজনেই জানে—বারান্দা আজ বিপজ্জনক। কারণ বারান্দা তাদের চোখকে কথা বলতে শেখায়।
অয়ন খাতা খুলে লিখল—
“আজ সে বলল—ভুল। পাপ। অসম্ভব। আমি শুনলাম। তারপর বুঝলাম—ভালোবাসার প্রথম পরীক্ষা confession নয়; restraint.”
সে একটু থামল।
তারপর লিখল—
“আমি এক পা এগোব না, যদি সে না চায়। কিন্তু আমি এক পা পিছিয়েও মিথ্যে হব না।”
অন্যদিকে সঙ্গীতা ডায়েরিতে লিখল—
“আজ আমরা দূরত্বের নিয়ম করলাম। কিন্তু নিয়ম করার সময় দুজনেই জানতাম, নিয়ম তৈরি হয় সেই জিনিসকে আটকাতে, যেটা ভিতরে ইতিমধ্যেই জন্ম নিয়েছে।”
সে কলম নামিয়ে রাখল।
তার চোখে জল এল না।
আজ তার কান্না অন্যরকম। ভেতরে।
সে জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি নেই। তবু বাতাসে ভেজা গন্ধ।
গত রাতের বৃষ্টি এখনও পুরো শুকোয়নি।
যেমন তাদের বলা কথা।
ভোরের আগে সঙ্গীতা একবার দরজার কাছে গেল।
দরজা খুলল না।
শুধু দরজার কাঠে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়াল।
করিডোরের ওপাশে অয়নের ঘর। দরজা বন্ধ। আলো নিভে।
সে খুব আস্তে বলল,
“এক পা এগোবে না বলেছ…”
তার গলা কেঁপে উঠল।
“কিন্তু যদি আমি নিজেই একদিন দাঁড়িয়ে থাকতে না পারি?”
উত্তর নেই।
দরজার ওপাশে কেউ শুনল না।
তবু এই প্রশ্ন সেদিন রাতের অন্ধকারে রয়ে গেল।
অয়ন নিজের ঘরে আধঘুমে ছিল। হঠাৎ যেন অকারণে তার ঘুম ভেঙে গেল। সে দরজার দিকে তাকাল।
কেউ নেই।
তবু তার বুকের ভেতর কেমন কেঁপে উঠল।
সে জানে না কেন।
শুধু মনে হলো—দূরত্বের প্রথম রাতও শান্ত নয়।
কারণ তারা এক পা না এগোনোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কিন্তু হৃদয় কি পায়ের কথা শোনে?
ভোর হল।
ঘর আলো পেল।
আর খণ্ড ৩-এর প্রথম সকাল জানল—
স্বীকারোক্তির পর ভালোবাসা শেষ হয় না।
সত্যিকারের যুদ্ধ তখনই শুরু হয়।